মঙ্গলবার, ৯ নভেম্বর, ১৯৯৯

কষ্ট

নিজেকে মাঝে মাঝে বড় ক্লান্ত লাগে--
সেই একই কাজের শেষে
ঘর্মাক্ত শরীরে ঘুপচি ঘরে ফেরা।
তালা খুলতেই গুমোট গন্ধটা নাকে লাগে।
তারে ঝোলানো ময়লা তোয়ালে, ভেজা গেন্জি
বিছানায় তেল চিটচিটে বালিশ
টেবিলে আধ কাপ বাসি চা, চায়ের পিরিচে
পিঁপড়ে আর পোকা মাকড়ের ঘর বসতি,
শ্রান্ত ক্লান্ত দেহে যখন গা এলিয়ে দেই বিছানায়
শুরু হয় মশককূলের সুরসঙ্গীতের রেওয়াজ।


একটা সময় ছিলাম আপন ভূবনে
সেই ভূবনের সৌন্দর্যে আমি নিজেই মুগ্ধ হতাম
তারপর.....তারপর একজনের সাথে দেখা হলো
ধীরে ধীরে কাছে আসা, পরিচয়, পরষ্পরকে বোঝা
সে আমাকে স্বপ্ন দেখালো, মায়াবী
সেই অপরূপ স্বপ্লগুলো বাঁচার প্রেরণা দিলো।
এক রূপালি রাতে মাথার ওপরে প্রচণ্ড আকাশ
চাঁদের জ্যোৎস্নাধোয়া চারপাশে এক অপার পবিত্রতা
তখন তাকে দিলাম আমার সবচেয়ে দামী আর প্রিয়
সেই আপনভূবন - সারা জীবনের এক পরম ঐশ্বর্য
সেদিন তাকে লাগছিল যেন পূর্ণিমার প্রতিমা!
যার খোঁজে আর অপেক্ষায় কাটিয়েছি কত দিন, বিনিদ্র রজনী।


দিন যায়, ঘড়ির কাঁটাগুলো অতিক্রম করে দীর্ঘপথ
একদিন অবাক বিস্ময়ে নিজের মাঝে আবিষ্কার করলাম
কেমন যেন অনুভূতি ; প্রেম নয়, ভালোবাসা
তার কাছাকাছি হলেই কেমন নড়াচড়া করে বুকের মাঝে
আর দূরে যাই তো সেখানে অনুভব করি
.............আদিগন্ত বিস্তৃত শূন্যতা।
যে শূন্যতার আছে শুধু কুরে কুরে খাওয়ার ক্ষমতা
আমাকে যা করে দেয় রিক্ত, শূন্য।
আবার সে আসে, যেন এক ঝড়ের মতো
লণ্ডভণ্ড করে দেয় আমার অস্তিত্ব।


তারপর, তারপর হয়তো একদিন, এক ঘোর অমাবস্যায়
সে চাইল মুক্তি, আমার আপাত বিরক্তিকর ( তার কাছে যা অসহ্য )
ভালোবাসার মায়াজাল থেকে। নিজেই পারতো;
কিন্তু মানসিক দুর্বলতার হেতু সে আমার কাছে রেহাই চাইল
অকস্মাৎ অভিমানী বিপ্লবে ডুকরে উঠলাম।


তারজন্য সেদিন নিয়ে এসেছিলাম রক্তলাল গোলাপ
লুকালাম সেগুলোকে দক্ষ ক্ষিপ্রতায়।
কারণ সে এগুলোর প্রয়োজন ফুরিয়েছে আগেই
জানালো তার অপারগতা আর অক্ষমতা, সবশেষে
নিঃসন্দেহ আর্তিতে সে মুক্তি চাইল।


এই আমি ফিরে চলেছি
হাতের গোলাপগুলে যেন কেমন ঠাট্টা করছে
স্ট্রীট ল্যাম্পের সারিবাঁধা দল যেন একাকী দাঁড়িয়ে
গাছের পাতা অল্প অল্প শিরশিরায়
আকাশের তমসাচ্ছন্নতায় হাজার লক্ষ নিযুত কোটি তারা
আমি টের পাই, অন্ধকারে হাতড়ে দেখি নি:সীম শূন্যতা
সাজানো স্বপ্নগুলো ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ে
পারি না ধরে রাখতে, বেঁধে রাখতে,
রেখেই বা কী লাভ?
যাকে প্রবল ভালোবাসায় ধরে রাখতে পারিনি;
তার দেয়া স্বপ্ন গুলো
যাক না হয় ঝরে, যাক না হয় হারিয়ে।
এখন আর কোন কিছুতেই কিছু আসে যায় না।


সবার প্রতি তীব্র অভিমান হলো
অজানা আক্রোশে যখন হৃদয়টা পূর্ণ হলো
তখন চলে এলাম এক নিভৃতে
যেখানে কেউ আসবে না আমাকে কষ্ট দিতে
আমার অসীম নিজস্ব মানবিক কষ্ট নিয়ে
আমি কাঁদব, ঘুমাব, আবার ঘুম ভেঙ্গে কাঁদব
বুকের সেই শূন্যতায় পেয়িং গেস্ট হিসেবে
থাকতে দিয়েছি কষ্টগুলোকে, বড় বেশি চড়া ভাড়ায়
যাতে আর কখনো কেউ সেই শূন্যতা
পূর্ণ করতে না পারে।


আসলেই নিজেকে বড় বেশী ক্লান্ত লাগে।

মঙ্গলবার, ৬ জুলাই, ১৯৯৯

প্রশ্ন

হলুদ আলোয় ভরা এক সিঁড়িতে
সিঁড়ির তৃতীয় ধাপে দাঁড়িয়ে,
নির্দোষ আহ্বানে তাকে ডাকলাম কাছে,
ইতস্তত পদবিক্ষেপে কাছাকাছি হয়ে তার প্রশ্ন-
"কি?"

মনের অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে গলি থেকে
যে প্রশ্নটা হামাগুঁড়ি দিয়ে বেরোলো - তার
মুখাবয়ব অচেনা না হলেও, কেমন যেন
ভয় লাগল প্রশ্নটাকে। হয়ত সেজন্য
নিজের কাছে না রেখে সেটা ছুঁড়ে দিলাম তার দিকে।

বিস্ময়ানুভূতির প্রাথমিক ধাক্কা কাটতেই
সেই হলুদ সিঁড়িধাপ থেকে সে
অবনতিপূর্বক; নিষ্ক্রান্ত হলো।
হয়ত এতেই সে মুক্তির পথ পেয়েছিল।

কিন্তু জগতের সকল পুনরাবৃত্তির ন্যায়
সে ফিরে এলো সেই হলুদাভ সিঁড়িতে-
সেখানে আমি না থাকলেও-
ছিল প্রশ্নের কর্তাকারক।
পরবর্তী কতগুলো মুহূর্তে তার হাতে
জমা হলো ভাঁজকরা কাগজ, যাতে লেখা
একজনের দ্রবীভূত আর আরেকজনের
বাষ্পীভূত হওয়ারই ঘোষণা!

একজন নির্লজ্জ চশমখোর
এই কবিতার লেখক হওয়ায়
নির্লজ্জের মতই তার কাছে পুনরায় প্রশ্ন করি
এবারেরটাকে তো চেনাচেনা লাগছে।

প্রশ্নটা হলো...
আরে! পুনরায় তার নিকট আর কোন
প্রশ্ন করার অবকাশ নেই
কারণ সে মোর বড় আপন ছিল,
কিন্তু এখন বহুদূরের।
এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল