রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

ঘূর্ণাবর্তের দিন

১৯ ফেব্রুয়ারি

আজকে রোদ উঠেছে। চড়চড়ে তামাটে করে দেয়া রোদ। সরাসরি চামড়ার ভাঁজে ঢুকে যাচ্ছে। আমি বাইরে বেরিয়েছি সকালেই, এক বন্ধুর সাথে। সে বাসায় এসেছিল, ওকে নিয়ে বেরিয়েই টের পেয়েছি তুমুল উৎসবে মেতেছে সূর্য। অনেকদূর থেকে তার উত্তাপ আসছে শলাকার মতো বিঁধে ফেলছে আর আমি জড়বৎ সম্মোহিত হচ্ছি। সেই রূপালি-রেলিং পেরিয়ে নিয়মানুগ রিকশায় উঠি/ কালো চামড়ায় ফুলে ওঠা রগ দেখি/ স্বল্পচুল মাথা থেকে গড়িয়ে পড়া জ্বলন্ত ঘাম দেখি। দেখে দেখে আমি নিজের ভেতরেও লাভার ফুঁসে ওঠা টের পাই। নাহ্‌, আজকে অনেক গরম!

একটু পরেই ভীড়-রাস্তার মোড়ে সাঁই সাঁই করে ছুটে যাওয়া টাউন-বাস, সিএনজি, মাইক্রোবাস, গাড়ি এড়িয়ে আমি রাস্তা-পেরুনোর ধান্দা করতে থাকি। এসময় খুব সজাগ থাকতে হয়, সব ক'টি ইন্দ্রিয় বেগ-দূরত্ব-গতি-রেখ খুব ভালো করে পাঠ করে অবান্ধব যানবাহনগুলোর। সেখানে ভুলচুকের কোন অবকাশ নাই। জীবনকে কোন শালা ভণ্ড ভালোবাসে না? আমিও হাল্কা হাঁটা, হাল্কা দৌড় মিশিয়ে রাস্তা পেরোই। ওপাশেও সূর্য, পেছনে সূর্যের আঁচ আছড়ে পড়ে। বন্ধু বিদায় নিয়েছে রিকশাতক এসে, আমি তাই একা একা সূর্য-হলুদ মাখি বিনা-বিবাহের আয়োজনেই।

একটু ছায়া পেলেই হাঁটার গতি শ্লথ হয়ে পড়ে, চামড়ারও একটা অসহায় পরোয়া আছে এমন রোদকে, আমি সেটুকু প্রশ্রয় দেই। কখনো দ্রুত, কখনো ধীরে এগুতে থাকি। আশে পাশের মানুষগুলোও একাগ্রতায় হেঁটে যায়, কেমন মোহগ্রস্ত যাযাবর কাফেলা বলে মনে হয় ফুটপাতকে। একটা সময়ে বিরান বিস্তৃত মাঠের ভিতর, জঙ্গলের ভিতর, নদীর ওপর দিয়ে আমাদের পূর্ব-পুরুষেরাও এভাবে জনপদ পাড়ি দিত, গোত্র বানাতো। ফাঁকা জমিনকে চাষ করতো। এভাবেই একটা সময়ে দেশ-জাতি-ধর্ম বিলি-বন্টন হয়েছে! আবারও আমরা সেই রচিত জনপদেই হাঁটি পা ফেলে পর পর সারি বেঁধে!

এই যেমন আজ দুপুর পড়ে এলে আমি বইমেলার গেটের সামনে নিশ্চল লাইনে দাঁড়িয়েও এই কথাটি ভাবছিলাম! গেট খোলেনি তখনও। তাই সবাই পুলিশ পাহারার লোহা-চিহ্নক পেরিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছে! মেয়ে-শিশু-বুড়ো-জোয়ান-ছাত্র-প্রেমিকা সকলের লাইন দেখেও পূর্বজদের মনে পড়লো। উল্টোমুখেও একই দীর্ঘ ঘনোসারি মানুষ! সবাই বিনোদন-প্রত্যাশী। ঘর থেকে বের হয়ে বইমেলার পরিসরে হাঁটাহাঁটি গলাগলি করতেই অনেকের আসা। কেউ কেউ বাইরের স্টলগুলোতেই দাঁড়িয়ে কেনা শুরু করে দিয়েছে। আমি লাইন ভেঙে সরে গেটের কাছেই দাঁড়ালাম। গেট-টা খুলে দিলে প'রে মানুষ গুটি গুটি শান্ত ঢুকে যাচ্ছে দেখে মনে হলো আমরা দিনে দিনে সভ্য হচ্ছি, শিখছি। নাকি?

বেশি সময় ছিলাম না, আমার গন্তব্য আবারও কর্মস্থল। তাই ঘোরাঘুরি শেষে আবার টিএসসি থেকে সিএনজি নিলাম। একটা ল্যাব আছে, ওটা নিতে হবে। বেরসিকের মতোন মানুষের মেলা থেকে ফিরে শেখাতে হবে কীভাবে যন্ত্রগণক হিশেব করে, কেন সে ভুল করে না, কেন সে অমানবিক দক্ষতায় সব মেপে ফেলে! আমার বোধহীন ছাত্রেরা সেটুকু শিখে কী আলোপ্রাপ্ত হবে? জানিনা। তাদের কাছে টার্মশেষের গ্রেডটা জরুরি, যন্ত্রগণকের স্বভাবচরিত নয়।

রাতে ঘরে ফিরে এলে আমার আর গরম লাগবে না। এই যন্ত্রগণকের সামনেই আবার বসবো, তারসাথেই আবার সময় কাটানো। মাঝে মাঝে মনে হয় সে নিজেও বুঝি অপেক্ষা করে আমার জন্যে, যেভাবে আমি প্রতিটা দিনশেষে তার জন্যে অপেক্ষা করি। কী জানি ছাই, আমি আর এমন কি বুঝি?

শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

গোলক ও ট্যাক্সি

আকাশ থেকে চুরি করা এক পোঁচ নীল মেখে গাড়িটা একটু ঝাঁকিতেই রাস্তা মেপে এলোমেলো ত্বরণে ট্র্যাকে ফিরে আসে টু-ওয়ে রোডের শাদা দাগগুলো চোখ রাঙিয়ে তাকে সরে যেতে বলছিল বলে এবং ট্যাক্সি নামক বেপরোয়া বালক সাজতে নীলরঙ মেখেই হেহ্‌ হেহ্‌ করে একটু বিশ্রী হাসি ছুঁড়ে এগুতে থাকে ঘোঁৎ ঘোঁৎ এবং ঠিক তখনই আমি ব্যাকসীটে উঁকি মেরে একটা ধাতব গোলক দেখি যেখানে কালো ঢ্যাপ খাওয়া তিনটি চাকা লাগানো।


উল্টে যাওয়া বিরাট বিকট গোলক খুব ভয়ানক বসে আছে বাবু সেজে আর ফ্রন্টসীটে মাথা নিচে দিয়ে দণ্ডায়মান লোকটা গোলক মহাশয়ের সেক্রেটারি বা পিএ নিশ্চয়ই তাই খুব তটস্থ ইতিউঁতি তাকাচ্ছে আমাকে দেখেই থুথু ছুঁড়ে দিল বা থুথু মুছে ফেলে তেড়ে গেলেই ঘাড় ফিরিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে আর উল্টো ফিরে বারকয়েক দ্যাখে গোলকের মসৃণ বুকে মুখে পিঠে গালে আরো কতক ঢ্যাপ খেয়ে গেল কী না তবে তেমন আশংকিত হওয়ারও কারণ পায় না যেহেতু নীলেরা আকাশ থেকে সরে গেছে বা লং ড্রাইভের বাতাস সাঁই সাঁই করে উইণ্ডশীল্ড কেটে ফেলছে এবং চালকের সীটে আমি বেপরোয়া স্টিয়ারিঙে চেপে চেপে হাত রাখি দানব ট্রাকেরা বাসেরা মহাজনেরা আমাকে পিষে দিতে গিয়েও ছেড়ে দেয়...


নোটিশঃ গোলকের শেষ খবর জানা যায়নি।

রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

একটি মূর্তিনির্মাণের সময় যা যা ঘটে

"উদভ্রান্ত সফেদ, দুলে ওঠো নীল তেপান্তর!"
আমি তার প্রান্তরেখায় তোমার মূর্তি বানাই,
ক্রমশ এগিয়ে আসা তারাদল; সেখানে
স্মিত হাসিমুখঃ নিয়ন-সুলভ- এঁকে রাত জেগে থাকে। আর
আমি হাতুড়ি বাটাল মেপে, নিখুঁত আঘাতে
প্রান্তরেখা ঝকঝকে ধারালো করি


যারা পর্যটক ছিলেন। আমাদের দেশে, মাটি ঘেঁষা সে'সকল
জটাচুলো পথিকেরা, এসে খুব মনোযোগী, দেখে
আমার কেরদানি। মূর্তির গায়ে দিগন্তভেদী আলো জমে থাকে,
আর আমার হাতের শিরায় জেগে ওঠে শীত পেরুনো গান!


একটু একটু রেখা ফুটে ওঠে
যেমন কালোস্তন, মেঘের বৃন্তেরা, আর সবুজ ঘামকণা,
প্রভৃতি লেগে থাকে অবহেলা-ভঙ্গিমায়।


আমি হাত সরিয়ে ফেলি।


পর্যটক-কাফেলায় মৃদু গুঞ্জন, ছলকে ওঠা
আর বিস্মিত দর্শকের চোখে সুখ, প্রকাশিত হওয়া
এমন বাস্তব ঘটনায় আমাদের প্রান্তরেখায়
সপ্তাশেষের হাট বসে। বিক্রীত হয়ে যায় চকিত অর্থমূল্যে
দৈনন্দিন ঘটনাবলী, সাধারন ক্রিয়াবাচকতা
এবং নেহায়েত মামুলি আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত,
স্বপ্নরহিত ভোর বা আশাবাদী বিকেলরঙ।


মূর্তিনির্মাণের সময়েই এইসব ঘটে যায় নিয়ম মেনে
তাই জড়ো হওয়া মানুষেরা রাগ করেন না
মন খারাপ করেন না
সুখী বা অসুখী হন না
এমনকি উদ্দীপিত/নির্বাপিতও হতে ভুলে যান
আমি হাত মুছে ফেলি আর একটু সরে এসে মূর্তির চোখে নিজেকে মরে যেতে দেখি
প্রান্তরেখায় জ্বলজ্বলে সত্যের মত, অনির্বাণ ধ্রুবতায় আমার মৃতদেহ ভাস্বর হতে থাকে।



রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

দৈনিক খবরাখবর এবং বিষয়াশয়, অনুষঙ্গ

তেরছা হয়ে বাঁধা মশারিটা সকালে জানিয়ে দিল, এরকম অযত্নে টাঙানো হলে সে কালকে থেকে ধর্মঘট শুরু করবে। আমি সব শুনে একটু নিরুপায় বোধ করছি। ভাবলাম, দাবি-দাওয়া মেনে নেই; রাতে মশা খুব জ্বালায়। ঘরের কোণে কোণে খুঁজে পেতে কয়েক টুকরা দড়ি পেলাম। সেগুলো হাতে পায়ে জুড়ে দিতেই মশারির মুখে কী বিগলিত হাসি! আমারও ভালো লাগলো, যাক বাবা। এবারে খুশি, হলো তো?


এরকম ভেবে পা ডুবিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। একটু এগুতেই দেখা গেল দরজার কোণে গতরাতে রহিমার ছড়িয়ে দেয়া সাদা চকের মত বিষে মুখ ডুবিয়ে দুটি কিশোর-তেলাপোকা মরে আছে। তাদের ঊর্ধ্বমুখী ছয়-ছয়টি পা নির্দেশ করছে একটা গুরুতর প্রোপাগাণ্ডা: পতিতার মেলে ধরা উরুর মত ব্যক্ত হয়ে গেছে জীবন আর কৈশোরের আকুল কৌতূহল। আমার খারাপ লাগে। আচমকাই গলার মাঝে খট করে একটা দলা আটকে যায়। ইদানীং এই বাজে ব্যাপারটা ঘটছে। বেশ আগে, একটা সময়ে খারাপ লাগার ব্যাপারগুলো আমার অনুভূতিকে দেউলিয়া করে দিতো আর সেসময়ে নানামুখী ব্যস্ততায় আমি সেই বিপন্নতা ঢেকে ফেলতাম। আজকাল সেটা হচ্ছে না (কিছুটা স্বস্তিকর ব্যাপার। সর্বদা ঢাল-তলোয়ারে প্রস্তুত থাকাটা কষ্টের), আবার এহেন উটকো গলায়-আটকে-থাকা দলার প্রকোপও বাড়ছে। আমি বেশ দুশ্চিন্তায় থেমে থাকি কিছুক্ষণ।


কিশোর তেলাপোকাদের ঠেলে সরিয়ে দিই একটু। পৃথিবীর পাঠ চুকেছে, এখন পিঁপড়েরা আসবে ভূরিভোজের আহার্য নিয়ে যেতে। আমি সেই ফিস্টের হাট-বাজার একটু স্থানান্তরে পাঠিয়ে ঘটিয়ে ভুলে থাকতে চাই যে আমার গলায় একটা কিছু আটকে আছে।
সামনে এগিয়েও পিছনে ফিরে যাওয়া যেতে পারে। যেমন আমি নীল দানাদার কলয়েডীয় পেস্ট টেনে নিই, শিশ্ন টেপার মতো বের করে আনি সরস মাজক, এরপরে ব্রাশে লাগিয়েও কিছু সময় নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকি!


পরে ফিরে এলে দেখি চৌকো চৌকো আলোবাক্স ঘরের মাঝে অ্যাসেম্বলি বসিয়েছে। বসে পড়তে পড়তে তারা খিক করে হাসে, ঠ্যালা দেয় একে অপরকে, দুলে ওঠে সম্মোহনে। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই তারা জোরে চেঁচিয়ে ওঠে, "ওমা! তুমি তো পুরাই নগ্ন! হে হে হি হি হু হু!"


আমি একটু ঝামটে উঠি, কিংবা সেখানেও আমার গলায় আটকে থাকা দলাটি সরে যায় না বলে আমি নীরবই থাকি। "সরো সরো, জায়গা দাও দেখি!" আমি বললেই তারা সরে যাবে এমনটাও ঘটে না। আমাকে অনেক কিছু করতে হবে এখন। সাদা-রঙিন জামা জড়াতে হবে, এবং ভুলে যেতে হবে যে একটু আগেই নগ্নতা আমাকে আরাম দিচ্ছিল। আলোবাক্সেরা গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল হেসে কুটি কুটি, সেটা এখন পারবে না, এই সত্য মেনে নিতে নিতে আমি আরো একবার হেরে যাই। আমাকে আরো প্রসাধনে চর্চিত হতে হবে, চুল আঁচড়ে নিপাট ভদ্রলোক সেজে বেরুতে হবে বাইরে। এসকল নিছক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রণা মেখে আমি পথে নামি।


রোদ চিরে যেতে থাকে যেভাবে তাতে আমি আরাম পাই। জামার অশ্লীলতা ভেদ করেও সুস্থ রোদ আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে এমনটা ভাবি, ভাবতে ভাবতেই একরাশ ধুলো জুতোর ওপরে এসে পড়ে। ফুটপাতের পাশে অলস-শয্যাবাসী ধুলো। মনে পড়ে যায় জুতোটার চামড়ার গর্তে গর্তে কত অজ্ঞাত ধুলো জমছে রোজ। দুয়েকদিন পর পর আমি কালি মেখে দিলে গর্তে বসবাস করা ধুলোরাও হোলি খেলে, কালো হোলি! তারপরে আবার নীরবতা, নতুন অতিথিরা আসে, গল্প জুড়ে দেয়, কুশল বিনিময়, হাপিত্যেশ! অতঃপর পুনরায় হোলি। চক্রাকারে আমি আর ধুলো একটা সম্পর্ক স্থাপন করেছি পরষ্পরের সজাগ সম্মতি ছাড়াই। সেই কথাও মনে পড়ে।


ফুটপাতের পাশে নগর-রূপায়কেরা রেলিং দিয়েছে, সার সার রূপালী রেলিং। রোদ মেখে ঝিকিয়ে উঠছে চিৎকারে। আমি একটু ছুঁয়ে দিতেই আঙুলে ফালা ফালা তড়িতের মতো তাপ ঢুকে পড়ে। আমি কৌমার্য হারানোর মতোন হতাশা আর বেকুবি আর হা-হুতাশ আর গ্লানি আর অসহায়ত্ব টের পাই। সিদ্ধান্ত নিই, এবারে হাত রাখা যায় রেলিং সঙ্গমে। এবারে ঘর্মাক্ত হওয়া যায়, অবসন্ন হওয়া যায়। এবারে রেলিংকে ভেতরে টেনে ঢুকিয়ে বীর্যহীন করে দেয়া যায়। আমি উল্লাসিত হই!


তারপরে আমি লম্বা পা ফেলি সামনে। মনে পড়ে যায় তেলাপোকা কিশোরদ্বয় আমার মতোই বেরিয়েছিল, আমার ঘরের কালো-পথে ওরা হাঁটতে হাঁটতে মিশে গেছে পা ছড়িয়ে। মনে পড়ে চৌকো আলোবাক্সগুলোকে, ওরা নিশ্চয়ই এখন জমাট রুলটানা ঘরে বাসর সাজিয়ে ফেলেছে। মনে পড়ে একটা নীলবীর্য-শিশ্ন রেখে এসেছি মুখ না লাগিয়েই, ওখানে এখন স্বতঃস্ফূর্ত নিঃসরণ হবে, ভিজে যাবে ক্রমশই আমার বেসিন, টাইলসের খাঁজ, চৌকাঠ, কার্পেট, আলোবাক্সের কাফেলা!

শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

দ্বিঃ২

======
চব্বিশ পেরোনো এক বালককে চিনি
আয়নার ওপাশে
অসম দূরত্বে দাঁড়িয়ে, বসে, অথবা শুয়ে;
প্রায়শঃ আমার দিকে খুব নির্বাক চোখ
বিম্বের সরলতায় তাকিয়ে থাকে।


শরীরে ক্রমশ পড়ছে বুড়িয়ে যাওয়া পলি-ছাপ,
ঘন চুলের ফাঁকে লুকিয়ে কেউ কেউ
বিশ্বাসঘাতকতার সূত্রে নীরবে শাদা হয়
ধবল বকের মত, কালোপানির খালে দাগ জেগে ওঠে।


কনুইয়ের উল্টোপিঠে বাহু-ভাঁজ, সেখানে
রেখার আঁচড়, বয়স লিখিত হয় গলার নিচে,
মুখের চারপাশে শ'য়ে শ'য়ে নতুন সূচালো শ্মশ্রু-ঘাম জমে থাকে।


তার করতল থেকে শৈশব আর দুধ-গন্ধ ঝরে গেছে
গ্রন্থিতে, পেশিতে, মাংশে ভেঙে পড়ছে আকৈশোর প্রেম
এবং প্রেমিকারা-
অভিমানী মন নিয়ে চলে গেছে বিম্বের সামনের পারদে।


গাঢ়তম আঁধারে ঢেকে থাকা রাতে
আমি বিম্ব-নিবাসী বালকের প্রৌঢ়ত্বে
অনেক বিষণ্ণ হয়ে পড়ি; বুঝি,
বালকের চোখের একটি প্রশ্নও তখন
বেঁচে ছিল না।




***

বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

বাষ্প-কাচ

আমি জানি এভাবে বেঁচে থাকার কোন মানে নাই ব'লে সবাই নিঃশ্বাস ছাড়ে নিয়মিত।
"অথচ নিঃশ্বাসের শেষে জমে থাকা বাষ্পও সে উত্তর জানে!"

মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

অ্যাবসার্ডিটি

"প্রস্তাব ছিল, আমরা যখন যূথবদ্ধ শিকারী তখন আমাদের কেশরের ফুলে ওঠায় শিউরে উঠবে বাগানের সকল বিড়াল"- এই শালা চুপ কর! কথায় কথায় অশ্লীলতা টানিস কেন?


আমার দিকে খুব খেউড়ে ওঠা দৃষ্টি ছুড়ে দেয় মাইদুল। কাজী মাইদুল হক। আমাদের গুরু। আর আমরা তার চ্যালা। চ্যালা হতে পেরে আমরা খুব খুশি। মাইদুল হকের মত মানুষ আমাদেরকে তার পদতলে রাখছেন, মাঝে মাঝে লাথি-ঝাঁটা মারছেন, খ্যা খ্যা করে হেসে উঠছেন অবান্তর। তখন আমরা মুখ চাউয়াচাউয়ি করি মহাবেকুবের মতোন, তারপরে খুব বুদ্ধিমানের মতো হাসার চেষ্টা করি। দাঁত বের হয় আর অল্প আলোতে সেগুলো ঝিকমিকিয়ে ওঠে। কালোমানুষের দাঁত ঝকঝকে হয়। তবে শব্দ বের হয় না। কালো মানুষের কোন কণ্ঠস্বর থাকে না শুনেছি। সেই শ্রুতবিদ্যার ভরসায় আমরা নিঃশব্দে হাসি। মাইদুল হকের তাতে মন ভরে না, সে শূন্যতা ভরতে আরো জোরে খা খা করে হাসতে থাকে। একটা পর্যায়ে তাকে আমাদের হিস্টিরিয়ার রুগী বলে ভ্রম হয়। আবার কখনও মাইদুল হককে খুব বিষণ্ণতায় পেয়ে বসে, সে তখন আমাদের নতুন লেখাগুলো পড়তে বলেন। আমরা ভয়ে ভয়ে খাতা খুলি, মনে মনে বলি, মাইদুল শালা খিঁচড়ায়ে আছে। আর কপালটাও খারাপ! প্রথমে আমাকেই বললো পড়তে। শুরুতে গুরুর মেজাজ বেশি খারাপ থাকে, পরে ঝাড়তে ঝাড়তে রাগ পড়তে থাকে। আজকে পুরো ঝড় আমার উপর দিয়ে যাবে মনে হচ্ছে!


আমি পড়তে শুরু করলাম-
"প্রস্তাব ছিল, আমরা যখন যূথবদ্ধ শিকারী তখন আমাদের কেশরের ফুলে ওঠায় শিউরে উঠবে বাগানের সকল বিড়াল"
এটুকু বলতেই গুরু চটে গেল আজকে। খিস্তিখেউড়ের ফাঁকে যা বুঝলাম তা হলো আমি ভালো উপমা দিতে পারিনি। যূথবদ্ধ শিকারী মানে যে শিশ্ন আর বিড়াল মানে যে যোনী, তা সহজেই বুঝা যাচ্ছে। এভাবে লিখলে লেখার কাজ বন্ধ করে দিতে হবে। এর চাইতে সচিবালয়ে গিয়ে ঝাড়ু মারাও উত্তম কাজ! (গুরু সুযোগ পেলেই এই খোঁচাটা মারবে। আমি একবার বিসিএস দিয়ে টিঁকেছিলাম, তাই বলে সকাল বিকাল সেটা মনে করিয়ে দেয়ার কী দরকার?)। রাগে দুঃখে আমি ভরসার জন্যে আমার সঙ্গীসাথীদের দিকে তাকাই। তারাও গোপন হাসি ঠোঁটের ভাঁজে লুকিয়ে ফেলে খুব অমায়িক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। "শালার খচ্চরের দল!"


সেদিন রাতেই আমি কবিতাটা পুড়িয়ে ফেলি, সিগারেট ধরানোর জন্যে দেয়াশলাই পাচ্ছিলাম না। পাকঘরের চুলায় কাগজটা মেলে ধরতেই হলদে আগুন চুমু দিল। আমি সেই লেলিহান কামুক চুমুটা আমার সিগারেটের মাথায় ধরিয়ে দিলাম! কাগজ পুড়ছে, আমার মুখ-চুল-ত্বক-নাক আলোকিত হয়ে উঠছে। দূরে ... টের পেলাম, মাইদুল হক ব'সে ছিল বারান্দায়। আমি অবলীলায় তার কাছে গিয়ে গলাটা চিরে ফাক করে দিতে চাই। কিন্তু শেষমেশ পায়ে পড়ে ডুকরে উঠি, "গুরু! আমাকে ক্ষমা করো, আমার ভুল হয়ে গেছে।!"


কাজী মাইদুল হক তখন স্মিত হাসি দিচ্ছিল এবং আমি মুখ তুলে তার মাথার পেছনে আধকাটা চাঁদটারে অশ্লীল হেসে উঠতে শুনেছিলাম।
এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল