মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০০৯

ভ্রমোলগ: ক্লান্ত ঢাকাত্যাগ এবং ক্রমশ সবুজায়ন


ভ্রমণে বেরোলেই অপরিচিত মুখগুলোকে কেন আমার পরিচিত মনে হয়? এমন না যে এটা আজকেই ঘটছে। আমি আগেও খেয়াল করেছি, সহযাত্রীদের, অপেক্ষমাণ মানুষের মুখ আমার কাছে আপন মনে হয় খুব। অথচ সেই মুখটাকেই এই স্টেশন, প্ল্যাটফর্মের বাইরে দেখলে আমি ফিরেও তাকাতাম না! ঘরের বাইরে বেরিয়ে আমি কি কিছুটা বিপন্ন হয়ে পড়ি? এজন্যে অচেনাকেও আপন মনে হয়? অথবা আমি একটু সাহসী রোমাঞ্চপ্রিয় হয়ে উঠি, তাই অপরিচিতকেই ভাল লাগে! এই সব আবোলতাবোল ভাবছিলাম।

রাত বাড়তে থাকে, আমি স্থবির বসে অপেক্ষা করি। আমার চারপাশে মানুষের ভীড় বাড়তে থাকে। তারা সবাই বেরুচ্ছে এই শহর থেকে। ব্যাগগুলো কালো, খয়েরি, নীল, সবুজ, বেগুনি রঙয়ের। পেটমোটা ভারি ব্যাগ কাঁধে হাতে কিংবা টেনে এনে কাউন্টারে রেখে সবাই একটু একটু হাঁপায়। আমি বসে বসে সেই চেহারা গুলো দেখি, মাপি। সেখানে আমি আশাজনক কিছু খুঁজে পাইনা। মুখগুলো ক্লান্ত, বিমর্ষ আর হতাশ।
কেউ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চলে যাওয়াতে হতাশ।
কেউ আওয়ামীলীগ সরকার পত্তনে হতাশ।
কেউ বিএনপি হেরে যাওয়ায় হতাশ।
কেউ হয়তো জামাতে-পিছলামি হেরে যাওয়াতে হতাশ (!)।
কেউ সামরিক অফিসারদের মরে যাওয়াতে ক্ষুব্ধ, কেউ গুলি খাওয়া রিকশাওয়ালা আর সাধারন্যের জন্যে কাতর, কেউবা বিডিআর জওয়ানদের জন্যে সমব্যথী।

আমাদের সকলের চোখে মুখে আমি সেই দুঃখবোধ ঝরে পড়তে দেখি। শাদা-ধূসর হয়ে ওঠে পটভূমি। সেখানে আমি শ্রান্ত রাতের শেষ বাসের তীক্ষ্ণ হর্ণ শুনতে থাকি। সেই অশ্লীল চিৎকার ঢাকতে আমি কানে ধুম ধাড়াক্কা গান গুঁজে দেই।
আমি আজকে এই শহর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি কয়েকদিনের জন্য। আজকের রাতে আটত্রিশ বছর আগে কালো কালো ছোপ ছোপ রক্তে ঢাকা শহর ভিজে গিয়েছিল। কত রক্ত একরাতে ঝরেছিল? মৃত, নিথর মানুষগুলোর শরীরের রক্তে কতগুলো সুইমিংপুল বানানো যেত? সার সার দেহ। আমি ছোটবেলায় যখন প্রথম শাদাকালো ছবিগুলো দেখেছিলাম, আমার ভয় লেগেছিল; আর কান্না পেয়েছিল। আর মনে আছে আমি বইটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কারণ আমি ভেবেছিলাম বই খুলে রাখলে ঐ সার সার দেহগুলো উঠে এসে আমার পাশে দাঁড়াবে হই হই করতে করতে!
কোন কারণ ছাড়াই এভাবে লাশ হয়ে যাওয়া যায়!! এখনও নির্মিত হয় মানুষের লাশ। কোন নিখুঁত কারিগর এই দেহ বানায়, তারপরে সেখানের অণু-পরমাণুর টান তুচ্ছ করে মাংশ-পেশী-রক্ত-চর্বি-হাড়গোড় সব নির্জীব হয়ে যায়! এই সব লাশেরা নোনতারক্ত মেখে আমার কানের ভেতরে ভারি সীসার মত ঢুকে পড়ে। আমার কয়েকজন বন্ধু এসে আমাকে সেখান থেকে টেনে তোলে।

ওদের সাথে অনেকদিন পর দেখা হলো আজ। আমার ভালো লাগতে থাকে। আমি তাদের সাথে গল্প-আড্ডায় মেতে লাশগুলোকে দূরে ঠেলে দিতে চাই। ছবিগুলো ভুলে থাকতে হবে আমাকে। যাবতীয় জাগতিক ভণ্ডদের ছেড়ে আমি কিছুদিন ছুটি নিতে চাই। ওরা সাধারন গল্প ফাঁদে। পুরনো দিনের গল্প, যখন আমরা সবুজ ছিলাম সে সময়ের গল্প। যখন আমরা দুইটাকার চা তাড়াতাড়ি খেতে গিয়ে জিব পুড়িয়ে ফেলতাম, দুপুরে দৌড়াতে দৌড়াতে ল্যাবে ঢুকতাম অ্যাটেন্ডেন্স মিস হয়ে যাবার ভয়ে। তখন আমরা অল্প অল্প ঘুমাতাম, সারারাত জাগতাম আর স্বপ্ন দেখতাম জেগে জেগে। সেইসব দিনের কথা বলতে বলতে আমার চেহারার ময়লা রঙের মাঝে কিছুটা সবুজ ফিরে আসে। লাশেরা কবরের গভীরে নীরব হয়, আপাতত!

আমার যাত্রা শুরু হয়। আমি যাব অনেক দূরে, তিনশ কিলোমিটারেরও বেশি। স্থানিক দূরত্বের চেয়েও আমার কাছে বেশি জরুরি মানসিক দূরত্বটা। আমি এই শহর ছেড়ে বেরুচ্ছি। ঢাকা শহরের মাদকে গত ছয় বছরে আমি ক্রমশ ডুবেছি, ভেসেছি, সাঁতরেছি। এই শহরের সবকিছুই আমার ভাল লাগে। প্রচণ্ড বেহিসেবী জ্যাম, ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়ার মতো ক্লান্ত দিনরাত, ধোঁয়া ধুলো চিৎকার হর্ণ মানুষ গাড়ি বাস সিএনজি রিকশার জটা-কালো সময় আমার হৃদয়ে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে দিয়েছে। আমি অনেকটাই এখন নির্ভর করি ঢাকার উন্মাদনার উপরে। এই শহরের খারাপ জিনিশগুলোও আমার এখন ভালো লাগে।

কিন্তু সেই আমিও এখন একটু নির্ভার হতে চাই, এই শহরটা ছেড়ে কিছুদিন ছুটি চাই। অনেক জোরে জড়িয়ে ধরলে যেমন হাসফাঁস লাগে, আমার কিছুদিন ধরে তেমনই লাগছে বলে আমি পালাতে চাই। রাতের আঁধারে, ব্যাকপ্যাকে করে কয়েকদিনের রসদ নিয়েই আমি পালাই। সাথে একটা ক্যামেরা নিয়েছি গলায় ঝুলিয়ে। আর কানের মধ্যে বেশি করে অর্ণব, ফুয়াদ, রক অন, দিল্লী ৬, কোল্ডপ্লে, ড'ট্রিকে পুরেছি। আমি সব ইন্দ্রিয়গুলোকে একটু ঝালাই করতেও চাই।
সাথে গত পাঁচ বছরের দোসররাও যাচ্ছে। সবারই গত এক বছরে বয়স বেড়ে গেছে, দেখলেই মনে হয় পৃথিবীর ভার একটু একটু করে সবার কাঁধকে ভারি করে দিচ্ছে। কেউ কেউ ইতিমধ্যেই ঢাকা, বাংলাদেশ ছেড়েছে। আরো কয়েকজন এবছরই ছেড়ে যাবে! তাই এই শেষ ভ্রমণ, অনাগত ভবিষ্যতের আগে।

বাসের দোল খেতে খেতে আমি বুঝে যাই এসব কথা। এই দোসরদের সাথে কাটানো এই কয়েকটা দিন পরবর্তীতে অশরীরীর মতো ঘুরে বেড়াবে। আমি ছবি তুলে বেঁধে রাখলেও ফ্রেমের বাইরে চলে যাবে যাবতীয় আনন্দ, হাসি আর গানের সুরগুলো! বাইরে তখন মধ্যরাত পেরিয়ে যাচ্ছে। আমি ঢাকার প্রান্ত ছাড়িয়ে যাচ্ছি। মুজিব হয়েছে বন্দী, পুলিশ লাইনে রক্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে রক্ত ততক্ষণে নালা ভরে ফেলেছে। পরের দিনগুলোতে যারা উর্ধ্বশ্বাসে পালাবে আমিও তাদের মতো পালাচ্ছি। পার্থক্য অনেক; তবুও...

কুমিল্লা পেরোনোর পরে বাস থামল। গিঁটে খিল কাটানোর জন্যে নিচে নামলাম। রাতেও সরব রেস্তোরাঁ। ঘুম ভাঙা মুখে সবাই খাচ্ছে। ভাত, মুরগী, মাছ কিংবা শুধুই চা। আমি পরোটা দিয়ে সব্জি খেলাম, সাথে চা। তারপরে বাসে চেপে বসলাম। গানযন্ত্রের দম ফুরিয়ে গেছে। এখন কান নীরব, চোখ খোলা। চায়ের মাঝে কী ছিল, আর ঘুম আসে না। রাস্তায় হঠাৎ বাসচালকের কী হলো, গাড়ির গতি দেখি বেড়ে গেল। ওভারটেকিং চলছে এদিকে ওদিকে হেলে পড়ে। এই দোলনেই, অথবা বাইরের সরে যাওয়া দৃশ্যপটে ভাসতে ভাসতে আমি আবার ঘুমে তলিয়ে যাই। তবে এই সন্তরণ খুব বিভ্রান্ত। আমি সেইঘুমের মাঝেও টের পাই এগিয়ে চলেছি দ্রুততায়...

বিদঘুটে কিছু স্বপ্ন দেখি সারারাত। অথবা হয়তো আমি দেখি নাই। চলন্ত বাসের ভেতর শীতল বাতাসে স্বপ্ন দেখিনি কিন্তু অস্বস্তিকর যাত্রার কারণে মনে হয়েছে যে দেখেছি। সেটাও হতে পারে। সম্ভাবনার অঙ্কগুলো যে কেন শিখেছিলাম! ভোর যখন আসছে, জানালার বাইরের গাছগুলো ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে উঠছে। আমার গায়ে, মুখে লেগে থাকা ময়লা সবুজটাও ধীরে ধীরে আরো সবুজ হয়ে উঠতে থাকে। আমি সাগরের কাছাকাছি চলে এসেছি। এখন সামনের নীলের তীব্রতায় ঢাকাতে রেখে আসা লাশের স্মৃতি কিছুটা ম্লান হয়। আমি তাদেরকে কিছুদিন ঘুমুতে বলি। আবার ফিরে আসবো এই আশ্বাস পেয়ে তারা আমাকে আগামী তিন দিনের জন্যে ছেড়ে দেয়।

=======
১.৪.৯

শনিবার, ২১ মার্চ, ২০০৯

ভোরের একটু আগে


রাত শেষ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। আকাশের দিকে তাকালে এখনও সময়টা আন্দাজ করা যায় না। আমি উঠে পড়ি। এপাশ ওপাশ অনেকক্ষণ তো হলো! বিছানাবালিশ ধীরে ধীরে উষ্ণ মনে হচ্ছে। আর কতোক্ষণ এভাবে গড়াগড়ি করা যায়?
আমি উঠে পড়ি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি কিছু পরিষ্কার হয় না। তাও কী মনে করে তাকিয়েই থাকলাম। হালকা কুঁজো হয়ে বসলাম। আমি সবসময় এভাবে বসি। ছোটবেলায় নানী রেগে যেত, বলতো "পিঠ সোজা কইরা বয়। ব্যাঁকা হইয়া যাইবো জন্মের লাহান।"
আমার নানী একেবারেই অল্পশিক্ষিতা। মনে হয় তাঁর ছোটবেলার বড়োবোন বা গুরুজন শিখিয়ে দিয়েছিল, পিঠ বাঁকা করে বসলে ওরকমই হয়ে যায়। ভীতু মনে সেটা নিশ্চয়ই গেঁথে গেছে! তাঁর ধমকে আমি তখন তড়িঘড়ি পিঠ সোজা করে বসতাম।
কিন্তু এখন তো আর আমাকে কেউ দেখছে না। তাই আমি জবুথবু হয়েই বসে থাকি। এভাবে থাকতে আমার ভাল লাগে। বৃদ্ধবয়সের অনুশীলন করছি বলে মনে হয়।
পাখিরা ঝাপ-ঝাপ করে উড়তে শুরু করেছে। আকাশ ফর্শা হওয়ার আগেই ওরা উঠে যায়। রাত যে তাড়াতাড়ি এসেছিল ওদের ঘরে, সন্ধ্যে নামতেই। আমি সন্ধ্যের পরে ওদের দেখি নাই। খড়বুননের পেলব সংসার! নিশ্চয়ই অতোটুকুন জায়গার মধ্যে তিন-চারটা জীবন। এখন পাখা ঝাপটে রাতঘুম ভেঙে উঠে পড়ছে। অথচ আমি কেন ঘুমাতেই পারলাম না! ওরা তো এখন হাই তুলবে, পাখা টানটান করে আড়মোড়া ভাঙবে। তারপরে উড়তে বেরুলেই আমাকে দেখে অবাক হবে।
মানুষ-ছানা কেন লাল চোখে, ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে বসে আছে! ওরা তো সারাক্ষণ কথা বলে। হৈহুল্লোড় করে। শব্দ করে গান শোনে।এখন কেন এমন নির্বাক, চুপচাপ? নিশ্চয়ই এসব ভেবে মাথা নেড়ে ওরা চলে যাবে উড়ে। ওদের তো সময় নেই আমার মতো।


“কালকে কয়েকটা চিঠি সকালেই পাঠাতে হবে বাইরে।”
“ক্লায়েন্ট আসবে, অথবা ফোন করবে, কবে আসতে পারে সেকথা জানাতে। টেকনিক্যাল টীমগুলো খুবই চামারের মতোন। এসেই নাক শুঁকতে থাকবে।”
“বসের গত পরশু থেকে মন মেজাজ দেখছি চড়া, কালকে আমার উপরে না ঝাড়লেই হয়।”
এইরকম নানাবিধ চিন্তাগুলো পাখির পাখা ঝাপ্টার সাথে মাথায় ঢুকে পড়ে। কিন্তু এগুলো আমি ভাবতেই চাই না। সারাদিনই তো এসব নিয়ে থাকি। আজকে ফেরার পথেও তো এসব ভাবছিলাম। প্রতিদিনই ভাবি। মানুষ কেমন প্রাণী! একটা সময়ে, যখন শিশুর মতো ভাবতাম, তখন সারাদিনের চিন্তাগুলো কতোই না অন্যরকম ছিল।


“আজকে কি আম্মা আইসক্রিম কিনে দিবে?” (পলিথিনের লাঠির ভেতরে কমলা রঙের আইসক্রিম পাওয়া যেত। ওটা খেলেই মুখে ঠাণ্ডা লাগতো! আর ঠোঁট-জিহ্বা সব লা…ল হয়ে যেতো!) “দিবে তো?”
“কালকেই আমার রাবারটা ফেরৎ নিতে হবে নাজমুলের কাছ থেকে। ওর ভাবভঙ্গি সুবিধার না। নিয়ে নিলে আমি অতো সুন্দর রাবার কোথায় পাব?”
“ইস! খেয়াল করি নাই। জুতাটা ময়লা হয়ে গেল! এখন? আম্মা তো চেইতা ফায়ার হয়ে যাবে। কী বিপদ!!”
এরকম নিরন্তর-দুশ্চিন্তাগুলো কেন হারিয়ে গেল? কবে এভাবে ভাবা বন্ধ করেছি মনে নাই। কোন নোটিশ এসেছিল কি? "অদ্য রবিবার হইতে এই সকল অনুৎপাদনশীল বিচ্ছিন্ন চিন্তাক্রিয়া রদ করিতে নির্দেশ দেয়া হইলো। আদেশক্রমে, কর্তৃপক্ষ।"
কই, আসে নাই তো এমন কিছু। তাহলে আমি কেন এভাবে সব বদলে ফেলেছি? এখন সেগুলো চিন্তা করে হঠাৎ বিষাদ কামড়ে ধরলো। ঘুনঘুনে কাশির মতো দলা দলা দুঃখ বুকের মধ্যিখানে জমে রইলো।
আমি আজকাল কেবলই অফিসের কথা ভাবি। বাবা-মা'র কথা ভাবি, বুড়ো হয়ে গেছেন ওঁরা। মাঝে মাঝেই অসুখ-বিসুখ। বয়স হলে মানুষ একটু ঘ্যানঘ্যান করা শুরু করে। খুব ক্লান্ত থাকলে আমিও হয়তো কটু কথা বলে ফেলি আর একটু পরেই সেজন্যে খারাপ লাগে। তাঁরা তো কিছু বলেন না, অভিমান চেপে রাখার একটা সিন্দুক আছে ওঁদের দু'জনেরই...
আমার বন্ধুগুলোকেও দেখি সবাই ব্যস্ত। চাকরি, সংসার, ছেলে-মেয়ের স্কুল আর বেতন, চাল-ডালের দাম, সরকার, ট্যাক্স, ফ্ল্যাট-লোন এসবেরই চিন্তা করে সারাদিন। কেউ কেউ আরেকটু সময় পেলে ব্যক্তিগত হয়। “মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে, রাতে ঘুম হয় না” ( শুনে আমি তাকে আপন ভাবি, আমার মতোই তো!)। কেউ কেউ “অফিসের সহকর্মীর সাথে...” “বাসায় বনিবনা নাই। ছোট ছেলেটা...” বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে থেমে থেমে। আমি বুঝি, আর দেখি ওদের শার্টে, কামিজে লেগে থাকা শৈশবের সব রঙ, ঝিমধরা দুপুরের ফেরিওয়ালারা নিরাশ হয়ে নিরুদ্দেশ হয়।
আমিও কি ওদের মতোই হয়ে গেছি না কিছুটা? এই জীবনটা, এভাবেই পেরিয়ে যাচ্ছি সব সেকেন্ড-মিনিট-দিন-সপ্তাহ। সারাদিনের একটাই কার্যকর চিন্তা, তা হলো অফিসের কাজগুলো ঠিকঠাক করছি কী না। এমনকি এই ফর্শা হয়ে ওঠা ভোরের কাছাকাছি সময়েও আমি তাই ভাবছিলাম! এখনও?
পাশে হঠাৎ নড়াচড়া শুরু হয়। কাঁথার নিচে পরিচিত শরীর নড়ে। পা দুটো বুঝতে পারি। এমনকি চওড়া পিঠের আদলটাও স্পষ্ট। ক্রমশ ঝটপটানো। পাখির পাখার চেয়েও দ্রুত। ছোটবেলায় একটা খোঁড়া পাখি ধরেছিলাম দু'হাতের মাঝে। সেই ধুকপুকানির মতো বিছানা দুলে ওঠে! কী হচ্ছে! কী ঘটছে! প্রবল আশঙ্কায় আমি আমূল কেঁপে উঠি।
আমি বিছানা থেকে সরে গিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। মনে হচ্ছে ধপ করে পড়ে গেলাম। পায়ের মাঝে একেবারেই সাড় নাই। দ্রুত ভাবার চেষ্টা করি, হয়তো অনেকক্ষণ বসে থেকে ঝিঁঝিঁ ধরে গেছে। এখনই আবার এটাও টের পাই যে আমার পুরো শরীরেই আর কোন ভারবোধ নাই। একটু আগেও যে কুঁজো হয়ে বসে ছিলাম, সেই ওজনটা টের পাই না আর। ফর্শা চাদরের নিচে শরীরটা ততক্ষণে নিথর। বাইরের আকাশটাও চাদরের মতোই... ফর্শা ধাঁধানো রঙ নিচ্ছে। জানালার সামনে তারজালি। মাঝখানে কাঁচ। তার বাইরে গরাদ। ওপাশে দূরে, অনেক দূরে, আকাশের শেষমাথায় নিঃশব্দ দুদ্দাড়ে কমলা ভোর আসছে। ঠিক স্কুলের বাইরের সেই আইসক্রীমের মতোন। আমি ভরহীন হয়ে আশৈশব আকাঙ্ক্ষার কমলা আইসক্রীমের দিকে তাকিয়েই থাকি!




***

সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০০৯

শৈশব-ইন্দ্রিয়ের গান

ঘুড়ির লেজে করে উড়ে গেছে দুরন্ত আটপৌরে রোদ। শরীরে ঘুমপ্রিয় ক্লাশরুমেরা একা একা অযথাই ফাঁকা হয়ে বসে থাকে। ক্লাশের মেয়েরা বেণীর পেছনে মেঘের দরজা খুলে নেমে আসে, ওড়নাপ্রান্তে বেঁধে নিয়ে নিজ নিজ হোমওয়ার্ক। হাত বাড়িয়ে মেঘপ্রান্তের ঢেউ ছুঁয়ে দেখেছি, সেখানে শুভ্র রাতের ওপারে কুসুম কমলা ভোর আঁকা। পানিতে ঢেউ কেটে কেটে একবালিকার অবসন্ন রাত থরথরিয়ে ওঠে, দ্রুত নেমে যায় নিঠুর কাঁপন! যেমন ভেবেছি: কাটাকুটি খেলার গোপন টিফিন-আওয়ার, টয়লেটের দেয়ালে দ্বিমাত্রিক স্তন আর সুগোল উরু ঝাঁজালো অ্যামোনিয়ার সাথে নাসা অন্দরে, চোখের ভেতরে, খুলির নিবিড়ে, গোপনে ঢুকে পড়ে আর প্রসারিত বস্তির উল্লাস মাপে। কাদা-মাখা ন্যাংটো শৈশব হি হি করে হেসে দেয়, জানে উস্থূর নগ্নতায় মিশে যাবে সকল কোলাহল, অবিমিশ্র হাসি আর গান। আহা, বিষণ্ণ দুপুর-ভাঙা হলুদ ফিতে, ছাদে নেড়ে দেয়া ভিজে সালোয়ারের কুঁচি শুকোনোর পরেও সিক্ত মনে হয় আর সেখানে চিলেকোঠার পুরোনো বালিশ গোলাপী দাগের মত সারাদিন তাকিয়ে থাকে।



----

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০০৯

আমরা যেভাবে মেঘ মাপি

বোদলেয়ারে বিশ্বাস নাই, ব্যাটা ভণ্ড প্রতারক
আমাদের চোখে আশ্চর্য মেঘদল গুঁজে দিয়ে
বেকুব মরণের ওপারে চলে গেছে চুপচাপ।
আমরা কতিপয় অসহায় সংহার তার
বিস্ফারিত চোখে খুঁজি ফাঁকা নীলাকাশ,
তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমাদের আকাশ
নীল থেকে ক্রমশ ধূসর হয়;
এবং আমাদের অমনোযোগে
চামড়ায় রেখাপাত,
প্রবল বাতের টান পূর্ণিমায়,
আর গিঁটের অশক্ত কাঁপন জমতে থাকে।
আমরা বেখেয়ালী তবুও আকাশেই মেলি চোখ
নিষ্পলক চাহনি পিঁচুটি জমে ঢেকে যায়
তারপরে আমরা ক্লান্ত হয়ে ঘাড় নামিয়ে আনি।
ঠিক তখনই চতুর শার্দুলের মতোন
উঁচু আকাশের রিখ্টার কাঁটা দুলে ওঠে
আমাদের হেঁট মাথায় ছায়া ফেলে
উড়ে যায় বোদলেয়ারের প্রিয় মেঘদল।

শনিবার, ৭ মার্চ, ২০০৯

রাজপথ


প্রবল আলো-মাখা পথ মৃদু ঝাঁকিতে
আমার সামনে তাতাথৈ নৃত্যে মাতে
আমি শুধু সেইপথে নিজেকে ধরে রাখতে চাই।
আকাঙ্ক্ষার গায়ের রঙ জানা নেই বলে, আমি
নিয়মিত ব্যর্থ হই, মগ্ন হই, শ্রান্ত হই


পরাক্রান্ত গোলাকার অতিকায় মহীরুহ
চোখের সামনে স্ট্রীটলাইট বনে যায়,
কিংবা বিপরীত নিয়মে কিছু হলুদ সোডিয়াম
বিম্বিসার বনের মাঝে আমাকে ডাকতে থাকে।
এহেন চাতুর্যে অবাক হলেও কিছু করার থাকে না
বহুরূপী মানুষের চেয়ে কোমলাভা সোডিয়াম লাইট ভালো


সমুখের রাত তাকে কুর্নিশ করছে- এমন বিভ্রম ঘটে
এবং চকিতেই আমি পুরো ঘটনাটি বুঝে উঠতে পারি
হা লুম্বিনীর রাত!
অবোধ্য চিৎকার মেখে নিথর থমকে থাকো!


জন্মান্তর হবে না জেনে গৌতমের কেমন লেগেছিল
সেই সত্য আমার কাছে পরিষ্কার হয়!




***

বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০০৯

স্মৃতিভার এবং বিপ্রতীপ বাস্তবতায় আমার সুখ

অনেকের কোন কিছু হয়ে ওঠা হয় না। অনেকে সেটা শুরুতেই বুঝে যায় যে তাদের কিছু হয়ে ওঠা হবে না। তখন তারা একধরনের হাল ছেড়ে দেয়া অনুভবে ভাসতে থাকে। তারপরে একটা সময়ে সেই এলিয়ে পড়া অনুভূতিটাই তাদেরকে অভ্যস্ত করে ফেলে দৈনন্দিন ঘটনাবলীতে। তারা বুঝে ফেলে যে এই কোন কিছু না হয়ে ওঠা, কোনকিছু না করে ফেলাটাই একটা বড়ো কঠিন কাজ। এবং এরকম ক্রিয়াটি সুসম্পন্ন হলে তারা তৃপ্ত হয়।


আমিও ধীরে ধীরে কোনকিছু না হয়ে ওঠাদের দলে চলে যাচ্ছি। আজ একটা বন্ধু এসেছিল, স্কুল-কলেজ সময়কালের বন্ধু। একেক জনের পথ বেঁকে চুরে একেক দিকে চলে যাওয়ার পরেও কিভাবে কিভাবে জানি ওর সাথে মাঝে মাঝে মিলে যায়। আমিও বাৎসল্য দেখাই। ছেলেটা মাঝে একটা ভয়াবহ রোড এক্সিডেন্টে স্মৃতি হারিয়েছিল। কাউকেই চিনতো না, সবাইকে নাম বলে, ফটো দেখিয়ে চেনাতে হতো। তারপরেও ভুলে যেত প্রায়ই। এমআইএসটি-তে পড়তো, সে পড়াশোনাও মুলতুবি হলো, সারাদিন বাসায় বসে মস্তিষ্কের ব্যায়াম করে। আমি একবারই দেখতে গিয়েছিলাম, দেখে মনে হচ্ছিল ও যেন লুকোচুরি খেলায় নেমে কাউকে খুঁজে না পেয়ে হতাশ! আমাকেও চিনে নাই তখন। তারপর কিছু সময় থেকে চলে এসেছিলাম। আমার পুরোনো বন্ধুটার ছায়া পাই নাই।


পরে ধীরে ধীরে কোনওএক অদ্ভুত নিয়মেই, ওর স্মৃতি ফিরে আসে একটু একটু করে। এখন আবার সুস্থ, হাসিখুশি নির্মল মুখটা! পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল, ভর্তিও নাকচ হয়ে গেল বলে অন্য একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। আবারও পড়াশোনা শুরু করেছে, যদিও যথেষ্ট কষ্ট করে পড়তে হচ্ছে। পুরোনো পড়া বেশি মনে নাই, নতুন পড়া মুখস্থ হয় না। মোটামুটি নিজের অসুখ, অপারগতা নিয়ে সে এখন বিব্রত-ই কিছুটা। আগে যারা এটাকে সহানুভূতি দিয়ে দেখতো, তারাও একটু একটু অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সকল প্রতিক্রিয়াই তীব্র থেকে লঘুগামী; আর এই গমনও, এক্সপোনেনশিয়াল রাশিমালার সূত্র মানে।


বন্ধুটি আমার কাছে কিছু কিছু পড়া বুঝতে আসে। পড়ার চেয়ে বেশি হয় গল্প। তার সাথে গল্প করার মজা হলো, সে কোনকারণে সকল সামাজিক আচরণ-প্রণীত ল্যাঙ্গুয়েজ হারিয়ে ফেলেছে। বা সে টেরও পায় না যে সামাজিকভাবে যেগুলো অসৌজন্যতা বলে গণ্য হয় সেগুলো কী কী! খুব সহজেই সে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেলে, আর নিজের মতামতটাও কারো তোয়াক্কা না করে বলে দেয়। আমি এই একটা কারণে তাকে বিশেষ পছন্দ করি, স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি কারণ আমাকেও কাস্টম-মেইড কোন মুখোশ পরতে হয় না। অবলীলায় আমি কলেজ-জীবনের সরলতার অভিনয় করতে থাকি।


ওর সাথে আজকে বাসা থেকে বেরিয়েই টের পাই আমাদের অবস্থানগত বাস্তবতার ফারাক! এই স্বাচ্ছন্দ্যের অবস্থান, ওর জন্যে যা প্রতিদিনের ধ্রুব সত্য, যেই সত্যকে নাকচ করে সে আমাদের কষা-রুগ্ন বাস্তবতায় খাপ খাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে, সে অবস্থানে কিছু সময় অভিনয় করতে আমার একেবারেই খারাপ লাগে না। আমি বরং ওর সময়টাতেই নিজেকে আটকে রাখতে চাই! খুব কামনা করি ওর সঙ্গ। নিজের মুরোদ নাই কোন দেয়াল ভাঙার, কিন্তু একজন আংশিক বেসামালের আড়াল নিয়েও আমি একটু তৃপ্তি পাই অভিনয়হীনতার। কিংবা সরলতার অভিনয় করতে আমার ভালোই লাগে বলে আমি সরল সাজতে চাই।
===

সোমবার, ২ মার্চ, ২০০৯

স্কুল ভ্যান, শোকমোচনের অপর পাতা

প্রতিদিন আমার যাত্রাপথের সময়টুকু আমি খুব অনুভব করি।


কিছুদিন আগেও ঝাঁ ঝাঁ রোদ ছিল না, বেশ মোলায়েম একটা বাতাস থাকতো, অনেক সময় আকাশ ঘন ধূসর হয়ে থাকতো আর সাথে একটা শীতল বাতাসও বইতো, আমার খুব ভাল লাগতো। এখন সেরকম নাই, শুষ্ক বাতাস ডাইনির মতো উড়ে বেড়ায়, সাথে চড়চড়ে রোদ! চামড়া পুড়িয়ে রোদের ঝাঁজ মাংশে গেঁথে যায় বলে আমি শিহরিত হই, যদিও এমন শিহরণে ক্রমশ মজে থাকা যায় না! নেশা ছুটে যাবার মত জেগেও উঠি।

তারপরে একটা সময়ে আমি হাঁটতে শুরু করি। আমার চলার পথে দুটো স্কুল পড়ে। সেখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের স্কুল শেষ হয়, একদম দশটা এগারোটার দিকেই। হয়তো তাদের কাছে দিনের ক্লান্তি তখনও ধরা দেয়নি, তাই রেলিং দেয়া ফুটপাতে তাদের ছোটাছুটি থামে না! আমার ভাল লাগতে থাকে, ধীরে ধীরে আমি ক্ষতহীন, শোকহীন হয়ে উঠতে থাকি।



এখানে সেই রোদে আমার কেবলই তাদের মতো হয়ে যেতে মন আঁকুপাঁকু করে। এখন জীবনের হিসেবগুলো বদলে গেছে, জটিল হয়ে গেছে সরল অঙ্ক। এখন আমাকেও কথা বলার আগে দু'বার ভাবতে হয়, যাকে বলছি, যে শুনছে সে কীভাবে নিতে পারে। আমার কথার ভিত্তিতে আমাকে সে যাচাই করবে যেহেতু আমাকে সে পুরোটা চেনেনা। এই জীবন এতো গতিময় হয়েছে আর আমরা গতির ঘূর্ণনে ক্রমশই অপরিচিত হয়ে উঠছি একে অপরের কাছে। এখন ক্ষণিকেই আমরা মিলিত হই, সহবাসেও সম্ভবত ক্ষণিক-পুলকই সার! আমরা বিজ্ঞাপন পছন্দ করি, রোজ রোজ ২০ মিনিটের ডেলি-সোপ চুষে চুষে খাই। খবরের মাঝেও বিরতি দেখি। তিন ঘন্টা মুভি এখন বিরক্তিকর একঘেয়েঁমি।
তাই আমার ওদের মতো হতে ইচ্ছা করে। ওরা নিশ্চয়ই এখনও দীর্ঘ দিন কাটায়! একটু এগুতেই দেখি দু'জনে মিলে একটা ফাঁকা স্কুলভ্যান ঠেলছেন। সামনের জন বালক, পেছনের জন বালিকা। ক্লাশ ওয়ান, কি টু। কী একাগ্রতায়, নিবিষ্ট আগ্রহে ঠেলা ঠেলি চলছে, কোথায় নেবেন তারা স্কুল ভ্যানটিকে? চালক নাই, এই ফাঁকে 'চল, ঐটা ঠেলি!' বলে হয়তো দু'জনে জুটে গেছেন। যূথবদ্ধ খেলায় হয়তো তারা মজা পাচ্ছেন না আজ। বালিকাটিও বেণি সরলদোলকের মত দুলিয়ে পিছু নিয়েছেন। আমার মনের ভেতর কোমল হয়ে গেল...



কিন্তু আর সকল চলমানতার সূত্রানুযায়ী, আমি একটু পরেই স্কুলভ্যান ঠেলক-ঠেলিকাদ্বয়ের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে এলাম। সামনের রেলক্রসিংয়ে আটকে আছি। ঘট ঘট করে দানবীয় ট্রেন যাচ্ছে। সাথে চারকোণা ফ্রেমে মুখেদের আটকে নিয়ে চলে যাচ্ছে দূরে। আমি দেখতেই ভাবি, অনেকদিন ট্রেনে চড়ি না! কতদিন? বুঝতে পারলাম যে আমিই হয়তো ট্রেনের কাছ থেকে দূরে সরে গেছি। ও তো আগের মতোই একই রেলের ওপর দিয়ে দিন রাত দৌড়ে চলছে। আমিই খালি তার চলপথের আড়াআড়ি যেতে চাই, সমান্তরালে নয়!


একটা পর্যায়ে গুলশান চলে আসে। আমার কাছে গুলশানের ফুটপাত খুবই উদ্ভিন্ন যৌবনা মনে হয়। আমি তখন ধীরে ধীরে রেলিং দেয়া সেই শিশুসমারোহী ফুটপাত ভুলে যেতে থাকি। কিংবা হয়তো তারা আমার সাথেই চলে এসেছে, শার্টে, জামায়, হাতায় অণু-পরমাণু হয়ে মিশে মিশে? কেননা অফিসে বসেও আমি ভুলি না। ক্লাশ নিতে নিতেও আমি ভুলি না। সহকর্মীর সাথে লাঞ্চ করতে করতেও ভুলি না। আমার করোটির মাঝে স্কুলভ্যানের চাকার মন্থর ঘূর্ণন জমে পাথর হয়ে থাকে!
***
এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল