মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ, ২০১১

একটি প্রস্তাবনা -

Epigraph
ঝিনুক নীরবে সহো ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভিতরে বিষের বালি মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও

Prologue
কবিতার সঙ্গে সম্পর্ক প্রাক্তন-মোহের মতো হয়ে গ্যাছে। ক্রমাগত জীবন যাপনের ক্লেদ ও ক্লেশ কবিতাশূন্য করে দিয়েছে। শুনেছি উদ্দীপনা উপকারী, কিন্তু যদি সকল সময় উদ্দীপ্ত থাকতে হয়, তাহলে সে বড়ো ক্লান্তিকর। স্নায়ু-বৈকলন অবশ্যম্ভাবী। যতোটা বুঝি, আশেপাশের ক্রমাগত পীড়নে সেদিকে স্নোবলের মতো এগিয়ে যাচ্ছি।

গতি ক্রমশ বাড়ছে,
পথের বাধা দেয়ার মতো গাছ-পাতা-বন খড়কুটোসম উড়ে যাচ্ছে,
আমি ক্রমশ স্নায়ু-শক্তিতে প্রকাণ্ড হচ্ছি,
অতি নিচে,
অতি-নিম্ন-নিচে দেখতে পাই খাঁড়ির জল মেলে ধরে হা করে আছে সমুদ্র,
আমাকে গিলে খাওয়ার আনন্দে সে চকচক করছে,
ফেনায়িত করে তুলছে গালের কষ!

এটাও বুঝতে পারছি পতনের সাথে সাথে গলন শুরু হবে আমার। স্নায়ু ও মস্তিষ্ক এই পতন বা গলন ঠেকাতে পারবে না। ন্যূনতম ফাঁক-ফোকর খুঁজছি। পথ বেঁকে অন্য কোথাও আশ্রয় খুঁজছি। শব্দহীন হয়ে ওঠার অভিশপ্ত আবশ্যিক পতন ও গলন ভয়ঙ্কর!

হঠাৎ একটি ঢাল। এক টুকরো চড়াই। উতরাতে গিয়ে মনে হলো আশা পেলাম... মনের বদভ্যাসে আশায় বুক বাঁধি...
Manifesto
মোমালোর শরীর কোমলে কঠিন,
তবুও স্ফূটিত কম্পনে অবয়ব কায়াহীন
লঘুচালে অতীব্র-আবেশে ক্রমকম্প শরীর নরোম
নিভে গেছে সকল ক্ষুধা; অস্থিরতা, নির্ব্যাপী শোক


গলিত জমাট মোমের মতোই জমাট হয়েছে
ধমনীজ নদী, ভরাট হয়ে গেছে কাপুরুষ মেরু
কশেরুকা অনিশ্চিত, ভেঙে যেতে দেখেছি
অস্থিগত আগুনে-লাল অপ্রিয়তম ঋজুতা


শঙ্কাহীনের চোখে দেখি গাঢ় বিদায়ের ঘোর
এ গহ্বর তোমার - আমাদের যাবতীয় জীবন, গহ্বর
অভেদ দেখি না এখানে, প্রতিদিন ঘাসের মতোই
অবিকল্যে বদলে যাচ্ছে পুরোনো কথার পাতা।



Epilogue
নেমেছি অজান্তে অতল অকূলে অনিঃশেষ ঘৃণা শুধু তোমার জন্যে, হে অচল অকাট্য নিস্পৃহতা!

বুধবার, ২৩ মার্চ, ২০১১

ইনসমনিয়া-

ইদানিং ইনসমনিয়া ফিরে আসছে।
ইনসমনিয়ার বাংলা অনিদ্রা। দুটো একই শব্দ, অথচ শব্দ দুটোর চরিত্র কী আলাদা! ইনসমনিয়া শুনলে মনে হয় জ্যাজ শুনছি। নিদেনে কোনো পুরানো ব্লুজ, পঞ্চাশের দশকের পিয়ানোর সুর। সাথে নিশ্চুপ রাত, রাতের পিঠে অন্ধকার সরীসৃপের মতো জানালার বাইরে শুয়ে আছে। শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। হয়তো একটু পরে আমার ঘরে ঢুকে পড়বে। বাইরে সতর্ক পাহারা দিচ্ছে গলির আলোর শীর্ষক। ঘরে মিয়ানো আলো জ্বালিয়ে রেখেছি। রাত গভীর তাই উজ্জ্বল আলোয় চোখ পুড়ে যেতে পারে!
অনিদ্রা শুনলে এরকম কিছু মনে হয় না। বরং কেমন পাঁশুটে বুড়োর মতো লাগে নিজেকে। মনে হয় রোগা জিরজিরে হয়ে গেছি, খুকখুক কাশি জমেছে, মাঝে মাঝে থক করে গলা পরিষ্কার করে আসছি বেসিনে গিয়ে। ঘুম আসছে না, হাসফাঁস গরম কিংবা জলতেষ্টা। বাইরে কে আছে না আছে খবর নেই। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে আছি।
তাই এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা বোঝাতে শব্দ দুটোকেই ব্যবহার করি। এই এখন আমি ইনসমনিয়ায় ভুগছি - আজ রাত কেবলই ইনসমনিয়ার। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ হিউ লরির গাওয়া একটা গান পেলাম। সামনে সলো ব্লুজ অ্যালবাম বের করছেন। একটা গান ফ্রি বিলাচ্ছে। ফেসবুকে ‘লাইক’ দিলেই মেইলে গান চলে আসে! অভিনব প্রচারণা এবং বিনামূল্যে গান ছড়ানো দেখে ভালো লাগলো।
গানের কথাগুলো বেদনা-বিধুর। প্রেয়সী চলে গেছে। অনেক ভালোবাসার কথা, অনেক মায়াময় স্মৃতি ফেলে রেখে নিষ্ঠুরের মতো চলে গেছে। এখন তার কিছুই করার নেই। প্রেমের সময়ে সে টের পায় নি, এরকম কিছু হবে, ভাবতেও পারে নি যে প্রেমিকা এভাবে ছেড়ে চলে যাবে। এই বিরহে, এই যাতনার চোখ কাঁদছে। মন কাঁদছে। এরকম সরাসরি বেদনার কথা এখন আর আমরা বলি না। হয়তো মনে করি কথাগুলো ক্লিশে হয়ে গেছে। সবাই বলে বলে এমন করেছে, যে এই কথা এই অনুভব সত্য হলেও কেউ বিশ্বাস করবে না। চলে যাওয়া প্রেমিকাও বিশ্বাস করবে না! তাই আমরা ভণিতা করি, ভানে ভানে জড়িয়ে, উপমায় ডুবিয়ে বোঝাতে চাই সরল কথাটিকে। হয়তো সেই উপমা আর ভানের ভারে আসল কথা ঠিকঠাক ঠাহরও করা যায় না। বিগত-প্রেমিকা বুঝে কি না ছাই তা কে জানে!
====
You told me you were leaving
After all we’ve been through
Guess I’m a fool
Falling in love with you
There ain’t no use in cryin’
Do what you have to do
Guess I’m a fool
Falling in love with you
You told me that the kind of love we had
Will last for a million years
I believe everything you say
You filled my heart with tears
So long, pretty baby
Go break some other heart and two
Guess I’m a fool
Falling in love with you
=====

এইসব উচ্চকিত, শিল্পিত, চর্চিত অনুভবের প্রকাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ করে সরল-প্রকাশ পেলাম। ভালো লেগে গেলো। ইনসমনিয়ার সময় খুশি হলো। এখন এই ব্লুজে চেপে তোমার কথা ভাববো। মাঝে মাঝে এমন বিশেষ অবকাশ দরকার হয়ে পড়ে! 

বুধবার, ৯ মার্চ, ২০১১

পদার্থের ভান

প্রচণ্ড শব্দের গতি, তারচেয়েও প্রচণ্ড আলোকের বেগ। পদার্থবিদ্যায় পড়েছিলাম, শব্দ ও আলোক শক্তির দুই রূপ। মানব পদার্থ কেবল, ভেতরে অণুপরমাণু তিলে তিলে রক্ত-মাংস গড়ে তুলেছে। শক্তির কাছে পদার্থের হার নিশ্চিত, তাই শব্দে আমাদের ধাক্কা লাগে, আলোকে আমরা পুড়ে পুড়ে যাই!

দুপুর রৌদ্রের রশ্মিগুলো তীব্রতায় একে অপরের সাথে মিশে যায়, খালি চোখে তাকালে গতি-দ্রুততায় আমার ধাঁধা লাগে, বুঝতে পারি না ঠিক কী দেখছি, কেমন দেখছি। রশ্মিগুলো ঠিকরে ঠিকরে চোখের ভেতর সেঁধিয়ে যেতে থাকে আর অনূদিত হতে থাকে যাবতীয় দৃশ্য, পাখি ও বৃক্ষ, রাজপথ ও রাজন্যের শাসন। প্রাচীন শহরে বাস করি, শহর নিজস্ব সময়ে প্রাচীনতার ওপর চাকচিক্যময় প্রলেপ দিয়েছে, সেসব আমাকে প্রতিমুহূর্তে বোকা বানায়। আমি বেকুব থেকে বেকুবতর হই। আপাত-নবীন প্রাণে-প্রাচীন শহরে প্রাগৈতিহাসিক যানে চলাচল করি। যানচালকের লুঙ্গি ও গেঞ্জি কালো শরীরে কালো ঘামে সেঁটে আছে। শরীরের ভেতরে সাপের মতো কিলবিলে পেশী ও ক্ষুধা, আমার সাথে তার লেনদেন রফা হয়েছে দশ টাকা। দশমুদ্রার বিনিময়ে তার কয়েকশো বিন্দু ঘাম ও কয়েক হাজার কিলোক্যালোরি এটিপি কিনে নিয়েছি। রিকশা টানছিলো সে, প্রবল ক্লেশে, দশ মুদ্রার উজান-টানে। ঝাঁঝালো রৌদ্রের তীর পিঠে বিঁধতে বিঁধতে সে ও আমি এগুতে থাকি। আমাদের মাঝে উলম্ব ঝুলছে কতোগুলো প্রথাগত শ্রেণীর সিঁড়ি। সিঁড়িটি তার পিছনদিকে, সেদিকে তার খেয়াল নেই। সিঁড়িটি আমার সামনে, তবে আগ্রহ নেই পেরুনোর।

এই একঘেঁয়ে দৃশ্যটি কেন বর্ণনা করছি? কেন খোল-নলচে খুলে ফেলছি এই দায়সারা যাপনের? কেন চেষ্টা করছি মুহূর্তের ভাঁজের ভেতরের মুক্তোকে তুলে আনার? এরকম আটপৌরে বর্ণন কে শুনেছে কবে? আমারও তো জানা ছিলো না, এই মুহূর্তের পিঠে এক অভূতঘটন ঘটে যাবে। যে ঘটনার সাথে আমি বা সে জুড়ে যাবো না; আবার ভেবে দেখি যে আমি ও সে জুড়ে গেছি নিরুপায়! আমরা উত্তরদিকে যাচ্ছিলাম, ডান গালে হেলে পড়া সূর্যরশ্মির তোড়ে ভাসতে ভাসতে। আমাদের উল্টোদিকের রাস্তাটি ফাঁকা ছিলো, সেখানে কেউ ছিলো না কেবল শব্দহীনতা ও আলোক প্রাচুর্য। আলোর বেগেই এক দ্রুতযান ছুটে এলো। গতিময় দ্বিচক্রযান। মোটা মোটা টায়ারের মোটর বাইক গোঁ গোঁ করে ছুটে যাচ্ছিলো চোখের পলকে। তবু তা একঘেঁয়ে, তবু তার মধ্যে কোন উদ্দীপনা নেই। আমি বা সে কেউই তাকাই নি সে'দিকে। আমাদের পথ ছিলো উত্তরমুখী।

বিকট শব্দের চুম্বক আমাদের টেনে নিলো। প্রকাণ্ড বাজ পড়েছে খালি রাস্তায়। বাতাসের পর্দা ফ্যাড়ফ্যাড় করে চিরে ফেলেছে কেউ। ল্যাতপ্যাত করছে ভাঙা মোটর বাইক। সামনে ছিটকে চলে গেছে অশ্বারোহীর হেলমেটটি। অশ্বারোহী মোটরবাইক থেকে কিছুটা পিছনে। রাস্তার গায়ে এক জ্বালামুখ, আগ্নেয়গিরিসম ফুলকি দেখলাম সেখানে গনগনে ফুটছে। অশ্বারোহীর ছিন্নমুখ, খিন্নচোয়াল, সেখানে কটকট করে তড়পাচ্ছে। আমার ও চালকের প্রবল বমিতে উত্তরমুখী রাস্তাটি ভেসে ভেসে যেতে থাকলো। পদার্থের ভেতর থেকে দুইমুখা রাস্তায় গলগল করে বেরিয়ে আসছে শব্দ ও আলোকরশ্মিময় শক্তি... শক্তি!...
এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল