রবিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১২

পাইয়ের জীবন - রূপকজাদু!


আজকে দেখে এলাম লাইফ অফ পাই। ইয়ান মার্টেলের বিখ্যাত বইয়ের চলচ্চিত্ররূপ। অ্যাং লিয়ের কাজ আমার খুব পছন্দের, তার বেশ কয়েকটি ছবি দেখা হয়েছে - যেমন "সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি", "ব্রোকব্যাক মাউন্টেইন", "ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্র্যাগন" ইত্যাদি। ছবিগুলো দেখে তার ব্যাপারে আমার একটা প্রত্যাশার মাত্রা তৈরি হয়েছিল। সব পরিচালককে নিয়েই হয়। আমার কাছে সিনেমার এক এবং একমাত্র শিল্পী হলেন পরিচালক। অভিনেতা, ক্যামেরাম্যান, স্ক্রিপ্টরাইটার - এরা হলেন কেবল সেই শিল্পীর আঁকার ভিন্ন ভিন্ন তুলি, এর বেশি কিছু না। অ্যাং লিয়ের ব্যাপারেও একটা নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছিল আমার, কিন্তু আজকে সেই ধারণা ভেঙে গেল। অ্যাং লি তার পূর্বের সব সীমানা ও সীমাবদ্ধতাকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলেছেন। তার এই ছবিটা সম্ভবত তার কর্মজীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হতে যাচ্ছে। টেরেন্স ম্যালিকের যেমন "ট্রি অফ লাইফ", অ্যাং লিয়ের তেমন "লাইফ অফ পাই"...
ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে হলো Piscine Patel বা সংক্ষেপে Pi, অভিনয় করেছেন ইরফান খান। চরিত্রটির নাম নিয়ে অংশটুকু বারবার ইরফানের আরেক ছবি "দ্যা নেইমসেক"-এর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। সেখানে গোগোলের নিজের নাম নিয়ে যে টানাপোড়েন, হীনম্মন্যতা - তার কাছাকাছি হীনম্মন্যতাও পাইয়ের জীবনে ছিল। ছোটবেলা থেকে পাইয়ের মাঝে যে গভীর আত্মজিজ্ঞাসা, ধর্ম ও জীবনকে বোঝার নিষ্কলুষ চেষ্টা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ছোট ছোট জিজ্ঞাসা তার মাঝে - আমরা কে - স্রষ্টা কে - স্রষ্টা কেমন - ধর্ম কী, এগুলো তো আমাদেরও মনে কখনো না কখনো আসে। সেই ছোট্ট কিশোর পাই-এর আকুতি তাই বড়ো চেনা মনে হয়। পাইয়ের মায়ের চরিত্র করেছেন টাবু, এবং বরাবরের মতই অনবদ্য তার অভিনয়। মুম্বাইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আসলে বুঝলো না টাবু কত বড়ো অভিনেতা, বিদেশি পরিচালক আর মিডিয়া বুঝলো। বলিউডে তাকে সারাজীবন অফট্র্যাক আর বাণিজ্য-অসফল কিছু মুভি করতে হলো। (ব্যাপক আফসোসের ইমো)
তবে এদের দুইজনকেও ছাপিয়ে গেছে সুরজ শর্মা। অভিনয়ে অভিষেক হলো তার এই ছবির মাধ্যমে - এবং এক মুহূর্তের জন্যেও মনে হয় নি কোন অভিনয় দেখছি। তার উৎকণ্ঠা, তার মরণের ভয়, তার বেঁচে থাকার প্রবল চেষ্টা- এই সবকিছুর মধ্যে কতটা বাস্তব আর কতটা অভিনয় ফারাক করা মুশকিল।
ছবিটার গল্প তেমন কিছু বলবো না। আপাতদৃষ্টিতে বেশ সাধারণ গল্প (উপরের লিংকে দেখলেই বুঝবেন)। কিন্তু যেটা নিয়ে বলো সেটা হলো ছবিতে রূপকের অভিনবত্ব নিয়ে। ছবিটি দেখার সময় অবশ্যই হাতে দু'ঘণ্টা সময় নিয়ে বসবেন। যারা দেশে দেখবেন, ভালো প্রিন্টের জন্য অপেক্ষা করুন। এই ছবি বাজে প্রিন্টে দেখলে রীতিমত হতাশ ও ক্ষুব্ধ হবেন। মেজাজ খারাপও হতে পারে। কিন্তু ভাল প্রিন্ট দেখে অনুভূতি হবে ঠিক উল্টোটা! সিনেমাটোগ্রাফি আর ফটোগ্রাফি দেখে হতবাক হয়ে গেছি। আমি ঠিক জানি না এর চেয়ে নয়নাভিরাম ছবি আর দেখেছি কী না। পুনরুক্তি হলেও বলি - ট্রি অফ লাইফ-এ মহাজাগতিক সৃষ্টির যে অসহ্য সুন্দর চিত্রায়ন দেখেছিলাম, তার থেকে সুন্দর লেগেছে লাইফ অফ পাই-এর সমুদ্র-সকাল-ঝড়-বিদ্যুচ্চমক! এমন সৌন্দর্য হতবাক করে দেয়, ইন্দ্রিয় দখল করে নেয়। কিন্তু ছবিটায় কি এগুলোই সব? এত ঠাট-ঠমকের বাইরেও চোখে পড়লো জীবন দর্শন নিয়ে টুকরো টুকরো কথা। রূপকগুলো আমি নিজেও সব ধরতে পারি নি, এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে অপারগতা স্বাভাবিক। এজন্য ছবিটা আরো কয়েকবার দেখবো। বইটাও পড়বার ব্যাকুল আগ্রহ হচ্ছে। যে জীবন দোয়েলের, ফড়িংয়ের - তাকে একবার ছুঁয়ে দেখবার সাধ হচ্ছে।
ছবিটা শেষ করার পর অনেকক্ষণ আমার মাথায় কিছু ঢুকছিল না। কী দেখলাম, কেন দেখলাম। এই দু'চোখে যা দেখি, তার সবই কি সত্যি? তার বাইরে কি আর কোন সত্যি নাই? এমন কি হতে পারে না যে একই জীবনের একাধিক রূপ পাশাপাশি সমান্তরালে চলছে! হতে পারে না যে কোন রূপই আসলে সত্যি না, কিংবা সবগুলোই সত্যি। বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পাইয়ের বাবার একটা উক্তিঃ You can believe whatever you want, but believing everything does not mean anything. It only means you don't believe in anything. (স্মৃতি থেকে লিখছি, মূল উদ্ধৃতিটা পেলাম না)
এ'বছর বেশ কিছু ভাল ছবি বের হয়েছে। আমার প্রিয় কিছু ছবিও আছে। তবে এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারি যে লাইফ অফ পাই এই বছরের সেরা ছবি। শুধু তাই না, এটি সম্ভবত এই দশকের সেরা ছবির লিস্টে প্রথম পাঁচে থাকার দাবি করে।
এর বেশি বললে আসলে ছবিটা দেখার মজা নষ্ট করা হবে। তাই এটুকুই থাক...
আর সব কথা বলা হয়ে গেলে নীরবতার কণ্ঠস্বর শুনবেন কীভাবে?

বৃহস্পতিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১২

আমরা যেমন-

প্রথমেই বলি এটিও আগেরটির মতো একটি ফাঁকিবাজি পোস্ট। অর্থাৎ কাজে ফাঁকি দিয়ে লেখা পোস্ট।
পোস্টের শিরোনাম লিখতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভাবলাম। পাঁচমেশালি পোস্ট বলে শিরোনাম ঠিক করা একটু কঠিন মনে হচ্ছিল। শেষমেশ 'আমরা যেমন-' ঠিক করলাম। তার কারণ গত চার মাসে কিছু নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে, যা ঘুরে ফিরে আমাকে নিজের এবং আমার চারপাশের মানুষদের আচরণের ব্যাপারে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করছে। একে একে বলি:
- প্রথম অভিজ্ঞতাটা হয়েছে সময় নিয়ে। এখানে আসার পর এপার্টমেন্ট ভাড়া করতে হবে। একদিন বাড়িওয়ালার সাথে দুই-তিনটা এপার্টমেন্ট দেখে একটা ঠিক করলাম। পরের দিন বিকেল চারটায় লিজ সাইন করার মিটিং। যে এপার্টমেন্ট ঠিক করেছি, সেখানেই। জেট ল্যাগের কারণে পরের দিন বিকেলে চরম ঘুম দিলাম, তবে ঘড়ির এলার্মের কল্যাণে কোনোমতে তৈরি হয়ে হাজির হলাম দশ মিনিট পরে। বাংলাদেশের হিসাবে এটা কোন ব্যাপারই না। কিন্তু এখানে দেখি বাড়িওয়ালা সেই রকম খাপ্পা হয়ে গেছে! লিজ নিয়ে কটমট করে রিশিডিউল করে চলে গেল (কারণ তার আরেক জায়গায় আরেকটা অ্যাপয়ন্টমেন্ট আছে)। সেদিন লিজ সাইন করা হলো না। করলাম পরের দিন। যা বুঝলাম, এখানে সময়ের হিসাবটা একেবারে GMT-6 হিসেবে। সবার ঘড়ি এক জায়গায়, দুয়েক মিনিটও কেউ এদিক-ওদিক করতে চায় না।

কথায় বলে বুদ্ধিমানরা দেখে শেখে, আর বোকারা ঠেকে শেখে। আমি যেহেতু বোকামানুষ, তাই ঠেকেই শিখলাম। এই জিনিসটা আমাদের দেশে মিসিং।
- আমার শিক্ষক এবং সহকর্মীভাগ্য বরাবরই ভাল। দেশেও দারুণ কিছু মানুষের সাথে কাজ করতাম, যদিও শেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (অর্থাৎ বুয়েটের) শিক্ষকদের বেশিরভাগকেই আমার পছন্দ হতো না। এখানে এসে আমার এডভাইজার (অর্থাৎ বস) আর তার পোস্ট-ডক (অর্থাৎ সেমি-বস) দুইজনের সাথে পরিচয় হলো। সামনা-সামনি এই প্রথম কথা হচ্ছে, তাই যা বলার তারাই বেশি বললেন। এখানে কাগজে কলমে ছাত্রদের কাজ করার কথা সপ্তাহে বিশ ঘণ্টা। কিন্তু কাগজের হিসাব কি আর বাস্তবে মেলে? এই লেভেলে ছাত্র বা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট মানেই সারা সপ্তাহ ল্যাবেই পড়ে থাকতে হবে। ক্লাস থাকলে আলাদা কথা, কিন্তু ক্লাস নাই অথচ তুমি ল্যাবে নাই - এরকম দেখলে খবরাছে! এটা মোটামুটি ভালই বুঝিয়ে দিলেন তারা। অভিযোগেরও কিছু দেখি না, কারণ প্রফেসর নিজেই সপ্তাহে ষাট ঘণ্টা কাজ করেন। (আজকে তার অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছে গেছি মিটিং শিডিউল করতে, কিছু কাগজ সাইন করাতে হবে। কোনোমতে দশ দিন পরে তিরিশ মিনিট সময় পাওয়া গেল!) সুতরাং আমি কোন তুচ্ছপ্রাণ, কাজ না করে কই যামু? যা বুঝলাম, এখানে গাধার খাটুনি দিতে হবে, তবে গাধার মগজ ব্যবহার না করে মানুষের মগজ ব্যবহার করতে হবে। শুধু গাধার মত খেটে গেলে মাইনক্যা চিপায় পড়া সময়ের ব্যাপার।

আরেকটা ভুল ধারণা আছে দেশের মানুষের মনে, যে পশ্চিমের মানুষ সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ করে আর দুইদিন খুব আরাম করে। Not necessarily, sire! এখানে কাজটাই বড়ো কথা। কাজ শেষ না হলে কিসের উইকেন্ড? উইকেন্ডের মজা গজা বানিয়ে খাইয়ে দেবে। বড় কম্পানিগুলো যেমন 'প্রফিট'-ভিত্তিক, এখানে এমন বড়সড় রিসার্চের জায়গাগুলো হলো ডেডলাইন-ভিত্তিক। সামনে ডেডলাইন? নাওয়া-খাওয়া কয়েক সপ্তাহের জন্য ভুলে যেতে পারেন!
- সহকর্মী ছেলেটাকে নিয়ে বলি। খুবই ভাল একটা পোলা। দেখতে অনেকটা দ্যা বিগ ব্যাং থিওরির শেলডনের মত, শুকনা-পাতলা। আমার চেয়ে বয়সে একটু ছোট, কিন্তু পড়াশোনার বহর দেখে আমি রীতিমত টাশকি খেয়েছি। বিজ্ঞানের হেন বিষয় নেই যে বিষয়ে তার আগ্রহ নেই। থোরিয়াম-রিয়্যাকটর থেকে শুরু করে প্লাজমিওন, জিন-বেইজড চিপ থেকে শুরু করে প্রোগ্রামিং সব দিকে সমান আগ্রহ। প্রচুর পড়ে, সারাদিন ল্যাবে থাকে, প্রায় আশিভাগ সময়ই সে কাজ করছে। সবচেয়ে ভাল যে দিকটা তার, সেটা হলো খুবই বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাভাবনা। দেশে এমন কিছু ছেলেপুলের সাথে আমি যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতাম, যারা তাদের চারপাশটাকে নাম-কা-ওয়াস্তে না নিয়ে ক্রমাগত নিরিখ করে দেখতে চায়। এই লাইনের চিন্তাভাবনা খুব উপকারী। তুমি যেমন মানুষই হও না কেন, তোমার মধ্যে এই গুণ চর্চা করে তৈরি করতে হবে। এই গুণ থাকলে প্রশ্ন করার অভ্যাস হবে। প্রশ্ন করার অভ্যাস হলে যাবতীয় ভুল ধারণা ও ভুল প্রথার অন্তঃসারশূন্যতা ধরা পড়বে। আর তখনই কেবল সেগুলো থেকে উত্তরণের রাস্তা বের হতে পারে। এই গুণ থাকলে প্রেজুডিস সহজে তৈরি হতে পারে না। এই ছেলেটার মধ্যেও প্রেজুডিস একেবারেই নেই! বাংলাদেশ নিয়ে তার প্রবল আগ্রহ। আমাকে প্রায়ই প্রচুর বকবক করতে হয় বাংলাদেশ নিয়ে, আমার ভালই লাগে। এই ধরনের মানুষ আমাদের দেশে খুব কম। সবাই যার যার গণ্ডিতে নিজের ধ্যান-ধারণা নিয়েই বসে থাকি। আর আমরা এমন একটা বয়সে পৌঁছে গেছি যে আর বদলানো সম্ভবও না। তবে নতুন প্রজন্মের পক্ষে সম্ভব চর্চা করে এই গুণগুলো আয়ত্তে আনা। (প্রচুর বাকোয়াজ লেকচার কপচে ফেললাম। ক্ষমার্হ...)
- ছোটবেলায় একটা বিরক্তিকর প্রশ্ন ছিল - 'কাকে বেশি ভালোবাসো - আম্মু না আব্বু?'। এখানে আসার পর থেকে এরকম একটা বিরক্তিকর প্রশ্ন আবিষ্কার করেছি - 'পড়াশোনা শেষ করে প্ল্যান কী? দেশে যাবে না এখানেই থাকবে?'। প্রথম দিকে জবাব দিতাম, "চলে যাবো"। কেন যাবো তার কারণ বর্ণনা করার আগেই প্রশ্নকর্তা(রা) বলেন, "এখন এই কথা বলছো, কিন্তু কয়েক বছর গেলে আর বলবে না। ফিরে যাবার সময় হলে দেখবে আর যেতে ইচ্ছে করছে না"। তারা হয়তো অভিজ্ঞতা থেকেই এমন বলে, তাই আমি তর্ক করি না। মেনে নেই। তবে গোপন কথা হচ্ছে, তাদের সবার এই জবাবগুলো শুনে শুনে আমার জিদ চেপে যাচ্ছে। বেশ ছেলেমানুষি-ভরা একরোখা জিদ। কে জানে, হয়তো তাদের ভুল প্রমাণ করতেই তল্পি-তল্পা গুটিয়ে দেশে ফিরে যাবো! 

বুধবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১২

ভিন্‌

হেনরি নামের যে বুড়ো লোকটা আমাদের শাটলের ড্রাইভার, তাকে আমার বেশ লাগে। মিশুক গল্পবাজ। একদিন সকালের প্রথম ট্রিপে উঠেছি, ঘুম ঘুম লাগছে আর ভাবছি ল্যাবে ঢুকেই কফি খেতে হবে। হেনরি কী মনে করে কৌতুক বলা শুরু করলো।
দুই ভাই, জন আর স্টিভ। দুইজনেই মহা চামার। প্রচুর পয়সা বানিয়েছে মানুষ ঠকিয়ে। একই শহরে বাস করে তারা, এবং তাদের খারাপ স্বভাবের কারণে শহরের কেউই তাদের দুই চোখে দেখতে পারে না। একদিন স্টিভ মারা গেল। সৎকার অনুষ্ঠানের আগে আগে জন পাদ্রিকে বললো, "দেখেন, আমি জানি আমার ভাইয়ের ওপর আপনি আর শহরের বাকিরা ক্ষেপে আছেন। কিন্তু আমি চাই তার এই অনুষ্ঠানটা ভালোমত হোক। আপনি যদি আপনার বক্তব্যের মাঝে (যাকে ইংরেজিতে বলে ইউলজি) ওর প্রশংসা করেন, তাহলে আপনাকে এক লাখ ডলার দেব।" পাদ্রি পড়লেন মহা ফ্যাসাদে। একদিকে এতোগুলো টাকার লোভ, আরেকদিকে চার্চের ভেতরে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলতেও মন সায় দিচ্ছে না, তাও আবার পুরো শহরবাসীর সামনে!
যাই হোক, পরদিন অনুষ্ঠানের সময় ইউলজি পাঠ করতে উঠলেন পাদ্রি সাহেব। বলতে শুরু করলেন, "এই স্টিভের মত খারাপ মানুষ হয় না। সে এই শহরের প্রায় সবাইকেই ঠকিয়েছে, মিথ্যা বলতো হরদম, মানুষের সম্পত্তি জবরদখল করেছে। তার পাপকর্মের ইয়ত্তা নাই!...
...
...
...
... কিন্তু তার ভাই জনের অপকর্মের তুলনায় স্টিভ একেবারে ফেরেশতা!"
হেনরি লোকটা সাদাসিধা, হাসিখুশি মানুষ। প্রতিদিন ল্যাবের কাজ শেষে বাসায় ফেরার সময় দশ-পনের মিনিট তার সাথে কথা বলি, সময়টা উপভোগ করি। দেশের কথা তখন আর মনে পড়ে না। বাসায় ফিরে ফেসবুক খুলে দেখি মানুষের ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্না। কখনো ফিলিস্তিন আর কখনো আশুলিয়া। হাসি পায় এমন ছেলেমানুষি দেখে। এগুলো করে কী হবে? কিস্যু না। কান্নাকাটি, চিল্লাচিল্লির কোন দাম নাই। সবই ফাঁপা শব্দমালা।

বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১২

অবিশ্বাস্য

দেখি বিস্তীর্ণ রোদ। সামনেই ঢেউ খেলিয়ে ছলনার ঢঙে চলে গেল,
তাই রোদের দিকে তাকিয়ে অকারণ কারণে দীর্ঘশ্বাস ফেলা হলো না
দীর্ঘশ্বাসের দীর্ঘ মুহূর্তের জন্য আরো ধীরবহ রৌদ্র-নদ প্রয়োজন
ওকে বুকে নিয়ে রোদের অপেক্ষা করছি,
শুনলাম অনেকটা গুজবের মত অবিশ্বাস্য চড়ুইয়ের ডাক!
এই ভূঁইফোঁড় দেশে চড়ুই
কোত্থেকে এলো! পথ ভুলে আমার মতই, হয়তো;
নিজেকে অমন প্রবোধ দিই। কিন্তু মনে মনে
ঠিক জানি, এই চড়ুই আমার মত নয়,
আমার আগমন পথ-বিভ্রান্ত নয়
ক্রমশ ছলনা খেলি নিজের সাথেই
ওই দ্রুতগামী অস্থির রোদটুকুর মত
হয়তো আমাকেও শুনছে কেউ -
আমি যেমন এইমাত্র শুনছিলাম চড়ুইয়ের স্বর,
তেমনি আমাকেও শুনতে পেয়ে অবিশ্বাস্য ভেবে
অবাক হচ্ছে কেউ, বিস্ময়ে নিজেকে ভাবছে
এসব তুচ্ছ ঘটনা - তুচ্ছ রটনা - অস্থিরতার দিনলিপির পাতায় কালো কালো অক্ষর হচ্ছে

রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১২

যাকে আমি ভাল পাই না তাকে আমার সিটিএনঃ একটি রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারী ভাবনা

আদি আরম্ভ ছিল মা, জননী, জনয়িত্রী, প্রসূতি। নাড়ির বন্ধন পেঁচিয়ে কোঁকড়ানো চামড়ার সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিল। আরম্ভের সেই মুহূর্তটিতে আসলে অস্তিত্বের স্বকীয়তা সৃষ্টি হয়। জ্ঞানতঃ ওটাই ব্যক্তির প্রথম পরিচয়। পরিচয়ের আদিবিন্দু। ওই বিন্দুর চলার পথকে রেখা বলা হবে, সেই রেখাটি তার ব্যক্তি পরিচয়ের রূপরেখা নির্মাণ করে। ব্যক্তি তার লিঙ্গনির্বিশেষে এই বিন্দুটিকে চেনার চেষ্টা করে নিজের অজান্তেই! যে কোন ব্যক্তির অস্তিত্বের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো জন্মমুহূর্তের কোনো স্মৃতি তার কাছে নেই। এখানে বলে রাখি যে স্মৃতি কিন্তু হুবহু তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে না। যে কোন ঘটনার একটি বড় অংশ আমাদের স্মৃতিতে থাকে না। আমাদের মস্তিষ্কের অভিনব সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার কারণে হারিয়ে যাওয়া অংশটিকে সে জুড়ে নিতে থাকে আশেপাশের তথ্য থেকে। এজন্য আমাদের সকল স্মৃতির একটি অংশ বানানো, সরাসরি ঘটনাটি নয়। যাক, সে অন্য আলাপ। যা বলছিলাম, ব্যক্তির মস্তিষ্কে তার জন্মমুহূর্তের তথ্য জমা করা নেই। থাকলেও সচেতন মস্তিষ্ক সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। তাই সে ধরে নেয় একটি কল্পনার মুহূর্ত ঘটেছিল তার জন্মের সময়। এই শেকড়ের স্মৃতিটি নেই বলেই তার বিপন্নতা। অস্থিরভাবে সে খুঁজে বেড়াতে থাকে কোথায় শুরু, কোথায় আরম্ভ। এই খোঁজের বিপন্নতা থেকে নানাবিধ অবলম্বন দরকার হয় ব্যক্তির।
আচ্ছা, চলুন তো, এই ব্যক্তিকে ভুলে আমরা একটু নৈর্ব্যক্তিক দিকে যাই। বেশ কয়েকবছর আগে, আমি বান্দরবানের বগা লেক থেকে হেঁটে রুমা বাজার চলে এসেছিলাম বন্ধুদের সাথে। প্রায় ছয় ঘণ্টার পাহাড়ি পথ পিঠে একটি ব্যাকপ্যাক নিয়ে হাঁটতে হয়েছিল। প্রথমে আমরা বগা লেকের পাহাড় থেকে সরু পথ ধরে নেমে এসেছিলাম। আগের রাতে শিশির পড়ে পথটি বেশ পিচ্ছিল হয়ে ছিল মনে আছে, ট্যুর গাইড পাহাড়ি লোকটি বেশ অবলীলায় নেমে যাচ্ছে দেখেও আমরা নামতে পারছিলাম না অনভ্যস্ততায়। সেই পথ থেকে নেমে এসে আমরা প্রায় দুই ঘণ্টা একটি ঝরণার পথ পাড়ি দিয়েছিলাম। ঝরণাটি আসন্ন শীতের কারণে শীর্ণদেহ, ঝিরঝিরি পানি বয়ে চলেছে। চারপাশে বৃহদাকার ধূসর পাথর থম ধরে আছে। পাথরগুলো খুলে খুলে এসেছে দুই পাশের পাহাড় থেকে। পাহাড়ের গায়ে গুল্মের চাদর বিস্তীর্ণ সবুজ হয়ে আছে। পকেটের মোবাইল ফোনটি বের করে দেখলাম কোন নেটওয়ার্ক নেই সেখানে। দুয়েকটা পাখির পাখনার ঝাপ্টানো শোনা যায় কি যায় না। জনবিহীন সেই ঝিরিপথে হেঁটে যেতে যেতে সহসাই আমার মনে হল এই বিপুল প্রকৃতির মাঝে আমি অসহায় ও একাকী হতে পারতাম। এখানে আমি আদিম ও নিরক্ত হতে পারি। এই প্রকৃতি শত শত বছর ধরে এমনই আছে। ঋতুর বদলে তার চেহারা বদলায় বটে, কিন্তু সেটাও পর্যায়বৃত্তিক। আমি ক্ষুদ্র একটা প্রাণী, এখানে এসেছি, এবং আবার চলেও যাচ্ছি। আমার পদচ্ছাপও এখানে থাকবে না। এই প্রকৃতির ত্বক স্পর্শ করে চলে যাওয়া অসংখ্য মনুষ্য প্রাণীর কারো কথাই সে মনে রাখবে না। আমরা তার কাছে সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক। যদি এটাই সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে এই প্রকৃতির স্থায়িত্বের ব্যাপারটিই ধ্রুব, আমাদের চলমানতা আসলে জরুরি না। অসীম ঘটনার অসীম সমুদ্রে একজন ব্যক্তির জীবনের সকল ঘটনা খুব ছোট্ট একটি চলক। তাই এর প্রভাব মূল সমীকরণে উপেক্ষণীয়।
আমরা যে বিষয় ও ঘটনাগুলো আমাদের চারপাশে ঘটতে দেখে সেগুলোর মূল্য ও গুরুত্ব পরিমাপ করি, সেগুলোকে জরুরি বা ফালতু দুইটি প্রান্ত ধরে নানাভাবে মাপি, সেগুলো আসলে লম্বা সময়ের বিচারে কোন আঁচড়ই ফেলতে পারে না। তাহলে এই মুহূর্তেই একটি প্রবোধ দিন নিজেকে। আপনার কাছে জরুরি একটি ঘটনা আসলে জরুরি না। কিছু যায় আসে না সেটাকে নিয়ে মাথা না ঘামালে। ফেলে দিতে পারেন, জাস্ট ফর কিউরিসিটিস সেইক, ফালতু মনে করে ফেলে দিয়ে দেখুন আদৌ কোনো পরিবর্তন হয় কি?
ফুটনোটঃ এই লেখাটি যে মুহূর্তে লিখছি, সে মুহূর্তে প্রায় চৌদ্দ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে একটি মহাসাগর ও দুটি মহাদেশ পাড়ি দিয়ে যদি বাংলাদেশে তাকানো যেতো, তাহলে দেখতে পেতাম কিছু তুচ্ছ ইসলামী দল সেখানে হরতাল করছে। ইস্যুঃ (তাদের দাবিতে) ইসলামের মহানবী মুহাম্মদের চরিত্র হনন করা হয়েছে। তাই জ্বালাও পোড়াও। আবার এটাও শুনেছি যে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদার সফর উপলক্ষে তিনটি জেলায় হরতাল হবে না। সুতরাং, (তারা ছাড়া বাকি সবাই যা বুঝছে) এটি মূলত নাশকতামূলক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠান সরকারি শক্তিগুলো (পুলিশ, র‍্যাব) দমন করছে না, কারণ তাহলে ওই বাকি সবার বুঝটা উল্টে যাবে।
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুনার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
(অদ্ভুত আঁধার এক / জীবনানন্দ দাশ)

শনিবার, ৭ জুলাই, ২০১২

মোনাম্যো'

ভালোবাসায় জোর জবরদস্তি চলে না, এ এমনই এক সর্বগ্রাসী অদ্ভুত অনল
যা হাজার চেষ্টায়ও জ্বলে না, আবার একবার জ্বলে উঠলে ঝড়ঝাপ্টাতেও নেভে না।

Ishq par zor nahin, hai yeh woh aatish Ghalib
Jo lagaye na lage, aur bujhaye na bane

[Love can't be tamed, it's like a fire that overpowers everything else
At times, it doesn't start even after repeated tries; but once started, it's impossible to extinguish.]

পলিমাটির ওপর যে সবুজ ঘাস জন্মেই বেড়ে ওঠে দুরন্ত বাতাসে,
সেই ঘাসের মনের কথা শুনলে হয়ত দেখতে পেতাম এক উড্ডীন শখ তার মনে।
সে ভেবেছে সে একদিন এই পলিমাটি ছেড়ে উড়ে যাবে,
শেকড়ের মায়া তার কাছে বন্ধন, এই অর্গল ভেঙে যাবে
বাতাসের মৃদু হাসি তার শীর্ষ ছুঁয়ে যায়, আলোর রশ্মি তার ত্বকে মোলায়েম পরশ বুলায়
সে অপেক্ষা করে...

পলিমাটির মনের কথা জানতে পেলে দেখবো, অণু অণু মৃত্তিকা কণায় বেঁধেছে সে চিরহরিৎ জাল
তার গোপন প্রেম এই তরুণ ঘাসের সাথে, সে কোন কথা বলে না, শরমে মরমে মরে
তার নিঃশব্দ হাসিই বলে দেয়, প্রেমে পড়েছে সে, তাই নিঃশব্দেই জাল বোনে সে ঘাসের শেকড়ে
কালো নিকষ শেকড়টুকু ঘাস লুকিয়ে রেখেছিল পলিমাটির বুকে, সেই কালোকেই বুকে টেনে নেয় মাটি - বিনা আপত্তি

I hope you don't mind that I put down in words
How wonderful life is while you're in the world

কালো পলিমাটি অবাক হয়ে দুরন্ত ঘাসের সৌন্দর্য দেখে - উজ্জ্বল কান্তি যার, বিশীর্ণ হরিদাভা! ঈষৎ বাতাসে দুলছে সে! কী অপার্থিব কোমল তার শরীর! পলিমাটির বিস্ময় ঘোচে না। সে অপলক তাকিয়ে থাকে...

রাত নামে চরাচরে-

এই চন্দ্র-কাতর রাতের সৌন্দর্য দেখ, তোমার আরক্তিম কুন্তলের 'পরে সে যেন ঝিকিমিকি-মুকুট
তোমার লাল রঙ মেখে সে লজ্জাবনত মিশে যাচ্ছে তোমার আটপৌরে পোশাকের প্রান্তে
তোমার জীবন-ক্লান্ত চোখের কোণে শুভ্রাভা মিশিয়ে দিচ্ছে সে
পথবালিকা, রাজরাণী, আমার অভিবাদন নাও, ভগ্নহৃদয়ের কান্না নাও

La lune trop bleme pose un diademe sur tes cheveux roux
La lune trop rousse de gloire eclabousse ton jupon plein d'trous
La lune trop pale caresse l'opale de tes yeux blases
Princesse de la rue soit la bienvenue dans mon coeur brise

[The moon, all too fair, in your russet-red hair sets a sparkling crown
The moon, all too red with glory, is spread on your poor, tattered gown
The moon, all too white, caresses the light in your world-weary eyes
Princess of the street, do allow me to greet you, my broken heart cries]

তুমি চিরঞ্জীবী-সুধা, তুমিই সৌরভ প্রাণময়
নিশ্চুপ ফিসফাসে আমায় স্পর্শ কর, চাহনিতে ছুঁয়ে যাও
জাগরণে-অজাগরণে তোমায় প্রণমি

Chhooti hai mujhe sargoshi se, aankhon mein ghuli khamoshi se
Main farsh pe sajde karta hoon, kuchh hosh mein kuchh behoshi se

[You are like the fragrance of life itself,
You're the desire that touches me with a whisper and with the silence in your eyes
I bow to you, only partly conscious of myself]

পলিমাটি আর ঘাসের এই গল্পটা অসমাপ্ত থাকুক। কিছু কিছু গল্প চিরন্তন। অনন্তকালব্যাপী সেই গল্পগুলোর অনুরণন হতে থাকে। ক্ষুদ্র আমি সেই গল্পের কতটুকুই বা জানি, আর কতটুকুই বা বলতে পারি?...



*****
[মোনাম্যো' - Mon Amour - My Love]
[কৃতজ্ঞ‌তাঃ জাঁ রেনোয়াঁ, গুলজার, মির্জা গালিব, বাজ ল্যুরম্যান]

বৃহস্পতিবার, ২১ জুন, ২০১২

মানবচরিত বিষয়ক পরীক্ষা

বেশ অনেকদিন হলো একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। অনার্স লেভেলের পড়াশোনা শেষ করে পড়াতে ঢুকেছিলাম, তারপর থেকে এই কাজটাই ভাল লাগে। অনেকের কাছে শিক্ষকতা একটা "বোরিং জব", অনেকের কাছে এটা কেবলই একটা চাকরি, কোচিং করিয়ে টাকা উপার্জন ছাড়া মোটা দাগে এর থেকে পাওয়ার কিছু নেই। সত্যি বলতে কি, এই চাকরিটাকে শুরুতে আমিও এরকমই ভেবেছিলাম। আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে পড়াতে ভাল লাগতো। সেই ছোটবেলা থেকে (এসএসসি পাশের পর থেকে) ছাত্র পড়াচ্ছি। নিজে একটা কিছু মোটামুটি বুঝতে পারছি এবং সেটা আরেকজনকে শেখাতে আমার মজা লাগে। মনে হয় ইলেকট্রন ট্রান্সফার হচ্ছে (খুবই হাস্যকর চিন্তা) দুইজন মানুষের মাঝে! কিন্তু আমি পেশা হিসেবে এটা নিয়ে ভাবি নি। চাকরিতে ঢোকার পরে দুই তিন টার্ম (প্রায় পাঁচ ছয় মাস) তাই এক ধরণের 'চাকুরে' মানসিকতা নিয়ে কাজ করেছি। তারপর হলো কি, বেশিদিন একটা জায়গায় থাকলে কেমন মায়া জন্মে যায়, আমারও তেমনি মায়া জন্মে গেল। একটা সময় পরে দেখলাম আমি এই পড়ানোর কাজটাকে এনজয় করছি।

আমাদের সমাজে শিক্ষকদের কোন স্ট্যাটাস নাই। মুখে মুখে প্রচুর ভাল ভাল কথা বলা হয়, কিন্তু মনে মনে এক টাকার সম্মান দেয়া হয়। শিক্ষকরাই এজন্য দায়ী। আজকের ছাত্রকে গড়ে পিটে মানুষ করার দায়িত্বটা তারা পালন করেন না, যার ফলে বড়ো হয়ে সেই মানুষটা সম্মান দেয়া শেখে না। একইভাবে শিক্ষকদের নিজেদের মনুষ্যত্ব ও বিবেকবোধ নিয়েও আমার সন্দেহ আছে। প্রচুর নিম্ন-মাঝারি মানুষ টিচার হয় যাদের একাডেমিক রেকর্ড হয়তো ঈর্ষণীয় কিন্তু টিচার হিসেবে তারা জঘন্য। নীতি-নৈতিকতার বিবেচনায় তারা হয়তো আড়তদার হবার যোগ্য (নো অফেন্স টু সাকসেসফুল আড়তদারস)। কথাটা এলিট শোনাচ্ছে, শ্রেণীচেতনা ইত্যাদি বিবেচনায় আপত্তিকরও মনে হচ্ছে। তবে আমি মনে করি ভুল শিক্ষকের চেয়ে বিপদজনক আর কিছু নাই। প্রতিটা ভয়ানক নীতিহীন মানুষ বেড়ে ওঠার পেছনে খোঁজা হলে কোনো না কোন শিক্ষককে পাওয়া যাবে (অথবা কোন শিক্ষককেই পাওয়া যাবে না)! কোন দিক দিয়ে দেশ ও দশের চৌদ্দটা তারা বাজান, সেটা শনাক্ত করাও দুঃসাধ্য, কারণ তাদের এই প্রভাব পরোক্ষ।

সে যাকগে, আমি মোটামুটি একটা ধারণে পেয়ে গেছি এই সোসাইটির। এখানে যেমন হাসিখুশি প্যাঁচহীন মানুষ আছেন, তেমনি ঘোরালো-মনের ধান্দাবাজেরও অভাব নেই। গলার জোরে বা প্রভাব খাটিয়ে তারাই বেশি আওয়াজ করেন। পাশাপাশি ছাত্রচরিত নিয়েও খুব মজার অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি যেখানে পড়াই, সেখানে মূলত মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষজন ছেলেপুলেকে পড়াতে পাঠান। খুব বেশি ঠাট-বাট নেই, টিউশন ফি-ও তুলনামূলকভাবে কম। আমাদের সমাজে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে শস্তা জিনিস আসলে ফালতু জিনিস। আমরা ভাবি বেশি দাম দিয়ে কিনলেই "খুব জিতলাম"। সেই ধারাতেই আমরা ভাবি, "অনেক কাড়ি কাড়ি টাকা দিয়ে তিন-চার বছর পড়ে যে ডিগ্রিটা পেলুম, সেটা বেশ দামি"। কিন্তু প্রাইভেট ভার্সিটিগুলোর কর্তাব্যক্তিরা ছাত্রদের মতো ভাবেন না মোটেও। মুখে প্রচুর বারফাট্টাই করা লোকজন আসলে ভিতরে ব্যবসায়ী। ব্যবসার শর্তটা হলো আয় বাড়াও। দাম বাড়াও। ছাত্ররা সব হলো নধর প্রোডাক্ট। আর তারা ছাত্রও পান ভাল। পাবলিক ভার্সিটির সেশনজটে পড়ে আমাদের মতো আবলুস কাঠ কেউ আর হতে চায় না। যাদের সামর্থ আছে, তারা পয়সা খরচ করে টেনেটুনে হলেও প্রাইভেটেই পড়ে। সেইসাথে আছে ভার্সিটিগুলোর নানাবিধ চমৎকার বিজ্ঞাপন ও প্রজ্ঞাপন। এদিক দিয়ে যারা নিজেদের একটা ইমেজ দাঁড় করাতে পারে নি বা চায় নি, তারা স্বভাবতই কম ছাত্র পায়, তুলনামূলক খারাপ ছাত্র পায়।

আমার ভার্সিটিটাও ছোটখাট। ছাত্রগুলো মেরিটের দিক থেকে একেবারেই মাঝারি। মর্নিং শিফটের ছাত্রদের মধ্যে মাঝে মাঝে খুব বুদ্ধিদীপ্ত ছাত্র পাই। প্রচুর পড়তে পারে এবং মেধার দিক থেকে তুখোড় ছাত্র। এদের জন্য সে'সব কোর্সে খাটুনি বেড়ে যায় (হেহেহে)। কিন্তু গড়পড়তা ছাত্ররা মোটামুটি একই মানের, এবং তাদের প্রায় সবাই-ই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কল্যাণে একেকজন মুখস্তবিদ। আমি যে সময় চাকরিতে ঢুকেছি, তখন দেখলাম পরীক্ষাগুলোতে বেশ নকল হচ্ছে। একটা কারণ যে প্রশ্নগুলো প্রথাগত। ক্লাশে যা পড়ানো হচ্ছে বা বইয়ে যা আছে, সেগুলোই যদি পরীক্ষায় আসে, তাহলে নকলের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাছাড়াও শিক্ষকরাও বেশ উদাসীন ছিলেন বা ছাত্ররা বেপরোয়া ছিল হয়তো (কারণ কোন ব্যবস্থা নেয়া হতো না)। আমাদের সিনিয়র দুই-তিনজন ভাইয়াও লেকচারার হিসেবে ছিলেন। সবাই মিলে নকল-উৎপাটনের প্রজেক্ট (!) হাতে নিলাম। পরীক্ষাক্ষেত্র কুরুক্ষেত্র হয়ে গেল। প্রতি পরীক্ষায় সাত-আটটা নকল ধরা পড়তে শুরু করলো। আমরা সেগুলো থ্রু করে দিলাম কর্তাব্যক্তিদের কাছে। ফলাফলে দুয়েকজন ছাত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো। এর পরেই একটু একটু করে নকল করার চল একেবারেই কমে এলো। পরীক্ষার হল আবার শান্ত। নতুন যারা লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছিল, তারাও মোটামুটি সেই মান বজায় রাখলো। আমার এখনও মনে হয় এই কাজটা আমি খুব মনোযোগ দিয়ে করেছিলাম। ক্লাশে যতোটা ভাল বা বন্ধুভাবাপন্ন হবার চেষ্টা করেছি, পরীক্ষার সময় ঠিক ততোটাই কঠোর। তারপরেও বেশ কিছুদিন চলে গেছে, প্রায় বছর দুয়েক হলো এমন চণ্ডমূর্তি ধরতে হয় না।

সেদিন একটু ভিন্ন কিছু করতে গিয়ে অভিনব অনুভব হলো। বেশ তাড়াহুড়া ছিল। আমার একটা কোর্সের ছোট্ট একটা কুইজ নিতে হবে। সন্ধ্যার এই কোর্সটায় ছাত্রসংখ্যা ৪২, বেশ ভরভরন্ত অবস্থা। তাই পরীক্ষা নেয়ার আগে চেয়ারগুলো দূরে দূরে সাজানো লাগে। কিন্তু তাড়াহুড়ায় আমি বলতে ভুলে গিয়েছি, ক্লাশে গিয়ে দেখি সবাই বেশ ঘন হয়ে পাশাপাশি বসে আছে। এদিকে আমি প্রশ্ন এনেছি একটাই সেট, সবার একই প্রশ্নের পরীক্ষা। কী করি? প্রশ্ন দেয়ার আগে একটু বুদ্ধি করলাম। বললাম, "আজকে সবাই এভাবেই কাছাকাছি বসে পরীক্ষা দিবেন, তবে যদি কেউ পাশের জনের খাতার দিকে তাকান, তাহলে সবার নম্বর শূন্য হয়ে যাবে"। বলার সাথে সাথেই সমস্বরে সবার প্রতিবাদ, "না স্যার!", এটাই আশা করছিলাম। আমি তবু আমার সিদ্ধান্তেই অটল। মাঝ থেকে এক ছাত্র বললো, "স্যার, যে আজকে ভাল পড়ে আসে নি, সে তো ইচ্ছা করে দেখে সবাইকে শূন্য পাইয়ে দেবে"। একটু ভেবে বললাম, "বেশ, যার কারণে আপনারা বাকিরা শূন্য পাবেন, তার নামটা বলে দেব"। ম্যাজিকের মতো কাজ হলো। যে অপরের খাতা দেখবে, তার কপালে গণ-মাইর নিশ্চিত! আমিও একটু কৌতূহল নিয়েই পরীক্ষাটা শুরু করলাম।

এখানে বলে রাখি, ওপেন-ক্রেডিট সিস্টেমের কারণে সব কোর্সেই অনেক ব্যাচের ছাত্র থাকে। সবাই সবার ক্লাসমেট না, বন্ধুও না, অনেকে পরিচিতও না। সুতরাং অপরের ওপর ভরসা ও অপরের সততার ওপর ভরসার একটা অভাব এদের মাঝে থাকতে পারে। আমি আরো ভাবছিলাম যে যদি সত্যিই সবাইকে একজনের কারণে শূন্য দিয়ে দেই, এবং তারপর যদি সে কোনোভাবে মার খেয়ে যায়, তাহলে তো সেটা ঠিক হবে না। শিক্ষক হিসেবে এই দিকটাও বিবেচনা করতে হবে। আবার এটাও ঠিক যে একবার যেহেতু বলে ফেলেছি, ক্রেডিবিলিটির প্রশ্ন উঠে যাবে যদি ফলো-আপ না হয়। এসব ভাবনার পাশাপাশি খুব কৌতূহলবোধ করছিলাম যে আসলেই কি এই ডানে-বামে-তাকানোর যুগে এই পরীক্ষাটা সফল হবে কি না।

এসব ভাবতে ভাবতেই দশ মিনিটের পরীক্ষা শেষ। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম, কেউ ঘাড় ঘোরালো না, পাশের জনের খাতার দিকে তাকালো না, এমন কি নিজের খাতা থেকে মাথাই তুললো না। পরীক্ষা শেষ করে অনেকে সময়ের আগে খাতাও দিয়ে দিল! একদম শেষ মুহূর্তে খাতা নেয়ার সময় দুইজনকে দেখলাম পাশের জনের খাতা দেখার চেষ্টা করছে (এটা মনে হয় একটা প্যানিক রিফ্লেক্স!)। মনটা ভরে গেল। পরীক্ষা নিয়ে ছাত্রদের ধন্যবাদ দিলাম, এতোটা আমি আশা করি নি। ওদের বললাম, "আপনারা আজকে যেভাবে পরীক্ষা দিলেন, সেটা আজকালকার যুগে প্রায় অসম্ভবের জায়গায় চলে গেছে। এই তুচ্ছ কুইজের উত্তরে আসলে কারোই তেমন কিছু আসবে যাবে না হয়তো। বেস্ট ফোর আউট অফ ফাইভ গোনা হবে, হয়তো এই কুইজের নম্বরটা গোনাই হবে না। কিন্তু এই পরীক্ষাটা আপনাদের মোরালিটির ব্যাপারে অনেক বড়ো একটা সিদ্ধান্ত দিল। সেটা হচ্ছে- আপনারা ছাত্র যে যেমনই হন না কেন, চাইলেই আপনারা কারো অনৈতিক সাহায্য ছাড়া পরীক্ষা দিতে পারেন। সদিচ্ছা থাকলে আমার এখানে এতোকিছু বলতেও হতো না। তার মানে আপনাদের মধ্যেই ভালোত্বের শক্তি বিরাজ করছে। অথচ পরের ক্লাসের পরীক্ষাতেই আপনারা ঠিক আগের মতো হয়ে যাবেন। আফসোস এটাই যে আপনারা অবলীলায় যে মোরাল ফাইবার ধরে রাখতে পারেন, সেটাকে উপেক্ষা করেন!"

দেখাদেখি করা ওই দুইজনের জন্য বাকিদের শূন্য পাওয়ার কথা ছিল (আমার কথা মতো)। ভেবে দেখলাম, আমাদের সামাজিক জীবনে এই ঘটনাটা অহরহ ঘটছে। আমরা সবসময় কয়েকজন কালপ্রিটের জন্য ভুগে চলেছি। আমাদের একটা চোর ইঞ্জিনিয়ারের কারণে সেতু ভেঙে এই সেদিনই কতোজন মারা গেল! কয়েকজন মহান নেতার কারণে দেশটা আখের ছোবড়া হয়ে গেছে। এমনই উদাহরণ ভুরি ভুরি দেয়া যাবে। অথচ সেই কালপ্রিটদের কিছু হয় না। ক্ষতি হয় বাকিদের। তাই ঠিক করলাম, সবাইকে যার যার প্রাপ্য নম্বরই দেব। তবে ওই দুইজনকে কৃতকর্মের ফল পেতে হবে।

দেশ-দশের দুর্দশা নিয়ে মিথ্যে বানোয়াট ফুলঝুরি ছুটিয়ে অনেকে মুখে মুখে হাতি ঘোড়া মেরে ফেলেন। তিনজন বাঙালি এক জায়গায় হলে দশ মিনিট সরকারকে গালি দেয় (যে সরকারকে তাদের মাঝে দুই জন ভোট দিয়েই এনেছে)। তারপর "এ-দেশের কিস্যু হবে না" বলে হা হুতাশ করতে থাকে। তিনজনের মাঝে একজন হয়তো ফোলানো-ফাঁপানো উপদেশের কথা বলে - আদর্শ, দেশপ্রেম, বিবেক (উচ্চমাধ্যমিক পাঞ্জেরি বাংলা গাইড দ্রষ্টব্য) ইত্যাদি মিশিয়ে একটা ঝালমুড়ি বানায়। সেই ঝালমুড়ি খেয়ে বাকি দু'জন মাথা নাড়ায়। ঘটনা শেষ। আসলে আমরা যেখানে ছিলাম, সেখানেই আছি। একচুলও নড়ি নি। প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীও নিজের অক্ষে শত শত মাইল সরে গেছে ততোক্ষণে। কিন্তু আমরা সেখানেই আছি। কিন্তু আমাদের একটু একটু করে হলেও এগুতে হবে। আমি প্রচণ্ডরকম নিরাশাবাদী চিন্তার জায়গা থেকেও মনে করি, বাঙালির সহজাত ভালোত্ব যে কোন জাতির নিঃস্বার্থবাদী বৈশিষ্ট্যের সাথে পাল্লা দিতে পারবে। একে অপরকে না চিনেও আমরা সাহায্য করতে পারি। নিজের সাময়িক ক্ষুদ্র লাভের চিন্তা না করে সবার ভাল ভাবতে পারি। খালি একটু প্রণোদনা দরকার, একটু ঠ্যালা, একটু বকা।

বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১২

যোনি স্বগতোক্তি

ভূমিকাঃ
আমরা বর্তমানে যে বাংলাদেশে বসবাস করছি, সেই বাংলাদেশকে আমার এক দুর্বৃত্তকবলিত দেশ বলে মনে হয়। আমি প্রতিমুহূর্তে অনিরাপদ বোধ করি। একজন পুরুষ হিসেবেও আমি শারীরিক বা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করি। আমি কল্পনা করার চেষ্টা করি যে একজন নারী কতোটা অনিরাপদ বোধ করেন। ঢাকা শহরটিকে আমার মানুষের ভীড়ে একটি বিপদজনক শহর বলে মনে হতে থাকে। আমি কল্পনা করতে পারি একজন নারীর জন্য এই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। নারী হিসেবে সমাজের শত সহস্র কুটিলতা তাকে সর্বদাই আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে।

একটি কিংবা অজস্র খবরঃ
একটি ভয়ঙ্কর খবর দিয়ে শুরু করি। সময়টা ২০১১ সালের জুন মাস। তপ্ত গ্রীষ্ম এবং খরার কাল, তাই একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধের খবর আমার বা আমাদের চোখে পড়ে নি। রাঙামাটির লংগদু এলাকায় একটি ধর্ষণ ঘটে। ধর্ষকের নাম ইব্রাহিম এলাহি। ধর্ষণের মামলায় ইব্রাহিম গ্রেফতার হয়, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও বিচার শেষে ইব্রাহিমের জেল হয়। আট মাস জেল খাটার পরে আদালতের কাছে আবেদন করায় ইব্রাহিম জামিনে মুক্তি পায় এই বছরের মে মাসের শুরুতে। জামিনপ্রাপ্তির পরপরই ইব্রাহিম লংগদুতে ফিরে যায়, সেখানে ধর্ষিতার ক্লাস ফোরে পড়ুয়া বোনকে (যে কিনা উক্ত মামলার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী) পাহাড়ি ছড়ার কাছে ধরে নিয়ে ধর্ষণ করে এবং কুপিয়ে হত্যা করে। মেয়েটির বয়স এগারো বছর। এই ঘটনাটি ৯ মে, ২০১২-এর। পরের দিনই ইব্রাহিম ধরা পড়েছে, তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তে ধর্ষণ ও খুনের আলামত পাওয়া গেছে।
খবর এইটুকুই। এবারে পাঠক, একটু ভাবুন তো, এই মামলার ফলাফল কী হতে পারে? আপনার কি মনে হয়, ইব্রাহিমের কেমন শাস্তি হতে পারে? একজন নাবালক কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার শাস্তি কী? বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আপনি কি জানেন আইন কী বলে? এর পাশাপাশি এটাও ভাবুন, যে এই যে ক্রমাগত ধর্ষণ ও খুনের খবর আমরা পড়ি পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতল জনপদে, অর্থাৎ এই পুরো বাংলাদেশে, সেই মামলাগুলোর শতকরা কতো ভাগ মীমাংসা হয় কিংবা অপরাধীর শাস্তি পায়। মনে মনে একটু হিসাব করুন। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমাদের আরামদায়ক স্বচ্ছন্দ জীবনের বুদবুদে এই শতকরা হিসাবটি বেশ হৃষ্টপুষ্ট দেখাবে। হয়তো আমরা ভাবছি, প্রায় ৫০ ভাগ মামলা নিষ্পত্তি পায়, হয়তো আমরা ভাবছি এদের মাঝে খুনী ধরা পড়ে প্রায় আশি ভাগ, হয়তো আমরা ভাবছি তারা শাস্তি পায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। অনেকে হয়তো ভাবছি তাদেরকে মৃত্যুদণ্ডই দেয়া হয়।
আচ্ছা, এই চিত্রটা ঢাকার বাইরে কি আরেকটু ভাল? নাকি বিস্তীর্ণ বাংলা একটি ধর্ষণপ্রবণ ও খুনপ্রবণ এলাকা? আপনি নিজের এলাকা সম্বন্ধে একটু ভেবে দেখুন। দেখতে পাবেন, অসংখ্য নারী ও শিশু ক্রমাগত ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। এই অপরাধ এতটাই অহরহ ঘটে চলেছে যে আমরা আর বিচলিত হই না। হয়তো আমাদের মত দেশে বেঁচে থাকাটাই সার্থকতা, তাই ধর্ষণকে গুরুত্ব দেই না (কথাটা অমানুষিক নির্দয় শোনালেও সত্যি)। অনেকের কাছে এই লেখাটি তাই অযথা মনে হতে পারে। মনে হতে পারে যে এতো এতো কঠিন সমস্যার মাঝে (যেমন ইলেকট্রিসিটি নাই, পানি নাই, বিদ্যুৎ নাই, দ্রব্যমূল্য চড়া ইত্যাদি) এসব পুরানো সমস্যার আলাপ কেন? অন্য সমস্যা এবং এই অনেকের মতামতকে বিন্দুমাত্র খাটো না করেও বলতে পারি, এই অপরাধগুলো অমোচনীয় হয়ে উঠেছে। এই অপরাধগুলো বাংলাদেশের একটি ইমেজ দাঁড় করাচ্ছে আমার মনে, তা হলো ধর্ষক ও খুনীর। আমার মনে হচ্ছে, চারপাশে পোটেনশিয়াল ধর্ষক ও খুনী ঘুরে বেড়াচ্ছে! কোনই নিশ্চয়তা নেই, যে এরা হঠাৎ কেউ ক্ষেপে উঠে ধর্ষণ করবে না।
এরকম অজস্র খবর আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, প্রতিটি থানা, প্রতিটি গ্রাম থেকে ধর্ষণ ও খুনের খবর আসছে। আপাতত, আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু পরিসংখ্যান এখানে তুলে দিচ্ছি-
• বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারী ও শিশু ধর্ষণকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।(International CHT Commision Report: “Life Is Not Ours”, 1991)
• ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে ঘটিত ধর্ষণ অভিযোগের শতকরা ৯৪ ভাগ অপরাধী নিরাপত্তারক্ষা বাহিনীগুলোর সদস্য। ধর্ষণের অভিযোগগুলোর মাঝে শতকরা ৪০ ভাগ ধর্ষিতার বয়স ১৮ বছরের নিচে ছিল (জাতিসংঘের মতে, অনূর্ধ্ব ১৮ = শিশু) (‘Autonomy for Peace in the CHT’, Bangladesh, CHT Hill Women’s Federation, Bangladesh, 30 August – 10 September, 1995, UN World Conference on Women, NGO Forum on Women, Beijing.)
• ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আগে, ’৯১-’৯৪ সময়কালে প্রায় ২৫০০ আদিবাসী নারী ও শিশু সামরিক বাহিনী ও বাঙালি সেটলারদের হাতে ধর্ষিত হয়েছে। [Ume Mong, “Bangladesher Adibasi narider nirapatta: Parbattya Chattagramer adibasi pahari nari (Security of Indigenous Women in Bangladesh: Hill Women of the Chittagong Hill Tracts)”, Bangladeshe adivasi narir nirapatta (Security of Indigenous Women in Bangladesh), (Dhaka: Forum on Women in Security and International Affairs, 2000)]
আপডেট: এই তথ্যগুলো যে লেখা থেকে সংগৃহীত সেটির লিংক এখানে
এই অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে বাংলাদেশের আইন কী বলে – এবার একটু দেখি।
Punishment for rape 
376. Whoever commits rape shall be punished with [imprisonment] for life or with imprisonment of either description for a term which may extend to ten years, and shall also be liable to fine, unless the woman raped is his own wife and is not under twelve years of age, in which case he shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to two years, or with fine, or with both.
সূত্র
বিস্তারিত
এই কঠোর শাস্তির নিয়ম আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। প্রয়োগ থাকলে ইব্রাহিমের মত নরকের কীট ছাড়া পেত না।

বদলের গানঃ
তাহলে এই সমস্যা দূর করার উপায় কী? আদৌ কোন উপায় কি আছে? নাহ। ভাল ভাল বুলি আউড়ে আসলে কোন লাভ হয় না। এই লেখাটি পড়ার পরপরই ওই ভাল ভাল কথা আপনি ভুলে যাবেন। আমিও ভুলে যাব। তারপর আবার দৈনন্দিন আলুপোড়াপুড়িতে ফেরত যাব। আর ভাল ভাল কথাও বোরিং জিনিস, তাই না? কাঁহাতক আর চেতনা, বিবেক, আদর্শের ‘প্যাঁচাল’ শুনতে ভাল লাগে!
আমি মনে করি, “অধিকার” ব্যাপারটি পুরোপুরি বুজরুকি। একজন মানুষের আপাতদৃষ্টে কোন অধিকার নেই। তার জীবন, জীবিকা, কর্ম, কীর্তি, বিত্ত ইত্যাদি তাকে জোগাড় করেই নিতে হয়। অধিকাংশ মানুষ মূলত এই বিষয়গুলো অর্জন করতে চেষ্টা করেন। কেউ তাকে যেচে পড়ে দেয় না। অধিকার মূলত ক্ষমতার সাথে জড়িত। যার ক্ষমতা বেশি, তার অধিকারও সবচেয়ে বেশি, অধিকার আদায় করার সুবিধাও সে বেশি পায়। তাই নারীর নিরাপত্তা এবং বেঁচে থাকার অধিকার তার নিজেকেই আদায় করে নিতে হবে। এজন্য দরকার নারীর ক্ষমতায়ন। কিন্তু এই ক্ষমতায়ন ব্যাপারটি আমাদের সমাজে ভুলভাবে ইন্টারপ্রিটেড হয়। প্রথাগত ক্ষমতায়নে আমরা মনে করি, নারীকে চাকরি বাকরি করতে দেয়াটাই তার ক্ষমতায়নের মূল ফলাফল। নারীর লিঙ্গের প্রতি পুরুষতান্ত্রিক গোঁড়ামো এর জন্য দায়ী। নারীকে একটি যোনি দিয়ে বিচার করা হয়, যৌনতার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, এবং সন্তান-জন্মদানেই তার সর্বোচ্চ মহত্ত্ব – এমন একটি বানোয়াট ভূমিকা বানানো হয়। এর সবই প্রকাণ্ড পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মনোভাব। এই মনোভাবের অংশ আমরা সবাই – নারী ও পুরুষ উভয়ই!
কিন্তু এই মনোভাব একদিনে বদলাবে না। আদৌ বদলাবে কি না, বদলের উপায় কি, সেটাও আমাদের পুরোপুরি জানা নেই। তবে আমি এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি, এই বদলের জন্য সর্বপ্রথমে প্রয়োজন নারীদের মনোভাব বদলানো। এই যে ভ্রান্ত-দাসত্ব, পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাগুলো তাদের চিন্তায়, মননে, কাজে, লক্ষ্যের ভেতর গেঁথে গেছে, সেটাকে একাগ্রতায় ভাঙতে হবে। এই ভাঙনের শুরু, আমাদের যৌথ বেদনা থেকে। নারী যেভাবে আক্রান্ত হয়, নিহত হয়, নির্যাতিত হয়, ধর্ষিত হয়... সেই প্রচণ্ড পরিস্থিতি থেকেই কেবল প্রেরণা আসতে পারে।

The Vagina Monologue (যোনি স্বগতোক্তি):
স্বনামধন্য লেখিকা ইভ এন্সলার রচিত দ্যা ভ্যাজাইনা মনোলগ (রচনাকাল ১৯৯৬) –এর ব্যাপারে আমি জেনেছি গত বছর। পুরো পাণ্ডুলিপিটি হাতে পাওয়ার পরে আমি রুদ্ধশ্বাসে পড়ে ফেলি। নারীর যৌনতা, তার আত্মবিশ্লেষণ এবং তার শারীরিক স্বকীয়তা নিয়ে স্বগত সংলাপ। এই সংলাপ আমার কাছে অনন্য মনে হয়েছে, অচেনা রাজ্য আবিষ্কারের মত – অকপট – স্বচ্ছ – নিবিড়। দ্যা ভ্যাজাইনা মনোলগের একটা বড় অংশ সামাজিক ট্যাবুকে তীক্ষ্ণ আক্রমণ করে। যে রাখঢাক এবং লুকোচুরি দিয়ে একটি অপরিহার্য বিষয়কে সমাজ ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘নেতিবাচক’ বানিয়ে রেখেছে, সে বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ জরুরি। এই শতকে এসেও যে অন্ধকার আমাদের মনে জমে আছে, যে জড়তা আমাদের অথর্ব করে রেখেছে, সেই অন্ধকরের পেছনে মূল কারণ অজ্ঞতা। এই মনোলগটি যে কারণে অনন্য হয়ে ওঠে, সেটা হলো নারীর অভিজ্ঞতার সরাসরি বর্ণনা – কঙ্গো, বসনিয়া কিংবা নিউ ইয়র্কের একজন নারীর নিজস্ব কষ্ট, নিজস্ব নিপীড়ন যখন আমাদের সামনে অভিনীত হয়, তখন সেই অভিজ্ঞতা দর্শকের ব্যক্তিগত অনুভব হয়ে ওঠে। যেন তার ব্যক্তিগত ক্ষতের মুখ খুলে যায়। দর্শক ও অভিনেতা এই স্বগত সংলাপের ভেতর দিয়ে যুক্ত হয়ে পড়েন, তারা বুঝতে পারেন যে এই নিপীড়ন সার্বজনীন। এই যন্ত্রণার কোন দেশ – কাল – মানচিত্রের সীমানা নেই। বাংলাদেশের ধর্ষিত ও নির্যাতিত নারীর সাথে কঙ্গোর লিঙ্গকর্তনের শিকার নারীর কোন পার্থক্য নেই। দু’জনের অভিজ্ঞতা আরো অনেকের সচেতনতা ও রক্ষার মাধ্যম হয়ে ওঠে।
আশার কথা, এত নেতিবাচকতার মাঝেও ছোট ছোট আলোর রেখা দেখতে পাই। হঠাৎ এমন ঘটনাগুলো আশ্বাস দেয়, সাহস দেয়, পরিবর্তন একজন একজন করেই ঘটে। সম্প্রতি দ্যা ভ্যাজাইনা মনোলগের মঞ্চায়নের খবর পেলাম। নারীর জন্য প্রতিকূল জনপদে এমন মঞ্চায়ন হয়ত সেই পরিবর্তনের চিহ্ন। এই পরিবর্তন কিছু মানুষ আনয়নের চেষ্টা করছে। তাদের দেখাদেখি আরো আরো মানুষ জড়ো হবে। প্রতিটি পরিবর্তিত মানুষ আমাকে মানুষের শুভবোধের বিজয়ের চিহ্ন ধারণ করেন। অনুষ্ঠানে যারা অংশ নিতে চান, তাদের জন্য ইভেন্টের লিংক দিয়ে দিচ্ছি। বিস্তারিত সেখানে দেখে নিন।

ওয়ান-বিলিয়ন-রাইজিং:
সম্প্রতি একটি জরিপে জানা গেছে যে প্রতি তিন জনের একজন নারী জীবদ্দশার কোনো না কোনো সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পৃথিবীর জতnerনসংখ্সযা এখন সাতশ কোটি। অর্ধেক তার নারী, এবং তার এক তৃতীয়াংশ নির্যাতনের শিকার। অর্থাৎ প্রায় একশ কোটি নারী, নানাবয়েসী, নানাদেশী, নানাজাতির মানুষ নির্যাতিত হচ্ছেন। তাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, যৌনাঙ্গ কেটে দেয়া হচ্ছে, অপহরণ করা হচ্ছে, নিপীড়ন করা হচ্ছে, খুন করা হচ্ছে। এই একশ কোটি মানুষ তো আমাদেরই কেউ না কেউ। হয়তো আমরা তাদের চিনি, যারা এই লেখা পড়ছেন, তাদের অনেকের পরিচিতের জীবনেই এমন ঘটনা আছে। এই অত্যাচারিতের শক্তি আমাদের যৌথ শক্তি হয়ে উঠুক। বিশ্বব্যাপী এক সার্বজনীন আর্তচিৎকার উঠুক আগামী বছর, ২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। ইভ এন্সলারের সাথে আমিও একাত্ম স্বরে বলতে চাই –
ONE IN THREE WOMEN ON THE PLANET WILL BE RAPED OR BEATEN IN HER LIFETIME.
ONE BILLION WOMEN VIOLATED IS AN ATROCITY
ONE BILLION WOMEN DANCING IS A REVOLUTION
*****

সোমবার, ২ এপ্রিল, ২০১২

দ্বিঃ১


আমার যে বন্ধুটির নাম অনীক, সে বেশ হিলহিলে ছিল এই তো কয়েক বছর আগেও। পাতলা ফতুয়া পরলে তার উঁচু হাড় বেরিয়ে থাকা কাঁধ দুটোকে হ্যাঙ্গারের মতো দেখাতো। গলার হাড় বেরিয়ে আছে, চোয়াল বসে আছে। দুই গাল যেন কোন অখ্যাত হোমিওপ্যাথের চেম্বারের বসবার সোফা, তোবড়ানো ঢ্যাপ খাওয়া। ওকে যতোটা শুকনা ও অপুষ্টিক্লিষ্ট লাগতো, সেটা দেখে কয়েক বছর আগে আমি যথেষ্ট সহানুভূতি ও সমপরিমাণ করুণা অনুভব করতাম। সেই অনীক কয়েক বছরে খাওয়া দাওয়া করেছে অনেক, বিশ্রামও নিয়েছে প্রচুর। হোমিওপ্যাথের চেম্বারের সোফা বদলে গেছে কর্পোরেট সোফার মত হৃষ্টপুষ্টতায়। পুষ্টিও জুটেছে তার শরীরে, মনে। তাই সে বেশ হাস্যোজ্জ্বল, সুখী মানুষের মতো নির্লিপ্তি ল্যালপ্যাল করে ওর চোখে। আমার অফিসে এসেছে আজ অনেকদিন পর। আমরা একটা সময় একসাথে ঘুরে বেড়িয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো - সেইসব চোয়াড়ে ডিমভাজি খেয়ে দিন পার করা দিনগুলোয় আমি আর অনীক বিষম বন্ধু ছিলাম। আমাদের মতে মিলতো না প্রায়শই, আমাকে অনীক সম্ভবত উন্নাসিক কেউকেটা ধরে নিয়েছিল। আমিও সম্ভবত অপুষ্টিকাতর অনীককে ফালতু শ্যালো ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু এই ধরে নেয়ানেয়ি টপকে আমাদের দহরম-মহরম বন্ধুত্ব ঘটে গেল। জগতের আর সকল র‍্যান্ডমনেসের মতই সুন্দর বন্ধুত্ব। ঘুরে বেড়াতাম, রাজ্যের বিষয় নিয়ে তর্ক আর আড্ডা হতো। বেশি হতো ঝগড়াই, তবে একে অপরের ঘাড়ের ওপর কোপ মারতে চাওয়ার আগেই সেটা মিটমাট হয়েও যেত। হয়তো মিটমাট হতো কারণ আমাকে অনীক উন্নাসিক ভাবতো আর আমি তাকে ভাবতাম ফালতু। ঝগড়া জিইয়ে রাখার জন্য সেয়ানে সেয়ানে টক্করটা জরুরি।

সেই পুরানো অনীক আমার সামনে বসে আছে। দুঃখিত, ভুল বললাম পুরানো অনীক না, নতুন অনীক। আগের বোতলে নতুন মদ। হৃষ্টপুষ্ট তেলতেলে অনীক বসে হাসছে। গলায় বেশ চৌকস একটা টাই ঝুলছে। আমি ওকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি - চুল দেখি, নিপাট, আঁচড়ানো। জুলফির কাছে সূক্ষ্ণ রেজরের টান চোখে পড়ে। শার্টটা চকচকে ইস্ত্রি করা, মনে হচ্ছে ব্র্যান্ডের শার্ট। হাতের কব্জিতে ঝিকিয়ে উঠছে রুপালি ঘড়ি। এগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে আমার ঘাড় শিরশির করে। এসির বাতাস হিমশীতল লাগতে থাকে। অনীক কি খেয়াল করে আমার এই নার্ভাসনেস? মনে হয়। ঠোঁট চেপে মিটিমিটি হাসছে! আমিও মিটিমিটি হাসছি। আমাদের বসার ভঙ্গি এক। হুবহু হাত- হুবহু পা- হুবহু চুলের বিন্যাস। আমি অনীকের দিকে তাকিয়ে ভ্রূ নাচাই, চোখ টিপ দেই। অনীকও আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রূ নাচায়, চোখ টিপ দেয়। আমি জিজ্ঞাসা করি, কেমন আছিস? অনীকও আমাকে জিজ্ঞাসা করে, কেমন আছিস? আমি উত্তর দেই না। অনীক উত্তর দেয় না। আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়েই থাকি। তাকিয়েই থাকি। অনীক আমাকে আর উন্নাসিক ভাবে না। আমি অনীককে আর ফালতু ভাবি না।

শনিবার, ১৭ মার্চ, ২০১২

অপত্যগাঁথা

যে গল্পটি জরায়ু থেকে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে, সে গল্পটি অশ্রুর মতো সুন্দর, বেদনার মতো সত্য। গল্পটির শরীর নরম ও নাজুক, হাড়-মাংস কিছুই তেমনভাবে তার গায়ে লাগে নি। তাই গড়নে হালকা-পাতলা এবং হিলহিলে দেখায় তাকে। আমি বলছি দেখায়, কারণ আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পারছি সে টলমল করছে, দু'পায়ে ভর রাখার চেষ্টা করছে, কোনোমতে তাল সামলে নিচ্ছে। গল্পটির জন্য আমার কেমন এক অপত্য মায়া হতে থাকে। আহারে! পায়ে জোর নেই, সহায় নেই, সম্বল নেই, দিশেহারা একটি গল্প। পিটপিট করে তাকাচ্ছে মনে হলো। কাউকে খুঁজছে, খুব ব্যাকুল চোখে এদিক ওদিক তড়পাচ্ছে গল্পটা। নতুন শরীরে ভিন্নজগতের একটা গন্ধ লেগে আছে ওর। আমার মনে হয় ওকে আরেকটু সময় দেয়া দরকার ছিল। ওর গায়ে এখনো মাতৃকার আঁশটে গন্ধ। মাছের মত সাঁতরে বেড়ানোর বয়স ওর। চোখ বন্ধ করে নিভৃত আদরে ঘুমিয়ে থাকবে জলজ শয্যায়। নিশ্চিন্তে বড় হবে, পুষ্টি পাবে। অথচ এমন নিরাপদ মুহূর্তে সে এতটুকুন স্বস্তিও পাচ্ছে না। আঁশটে-গন্ধা শরীরেই টলমল দাঁড়িয়ে আছে। আরেকটু সময় পেলে ওর শরীর তরতাজা হতো, শক্তপোক্ত হতো। সেই সুস্থ সবল নিয়তি মনে হয় ওর কপালে নেই। এ এক ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা, কোন সন্দেহ নেই!
সোমার দুই ফ্যালফ্যাল চোখের দিকে তাকিয়ে আরিফের মনে হলো দু'চোখে গ্রানাইটের পেরেক পুঁতে দেয়া হয়েছে। সোমা আনান, আরিফ আনানের বউ, তাকিয়ে আছে। ধবধবে শাদা টাইলসের ওপর এক বিন্দু ময়লাও নেই। ওপরে এনার্জি-সেভিং লাইটগুলো প্রখর আলোতে ঝলসে দিচ্ছে চারদিক। সোমার শরীরের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে আরিফ, কিন্তু গ্রানাইটের পেরেক থেকে চোখ সরাতে পারে না। আমরা, যারা গল্পটিকে দেখছিলাম, তারা টাইলসের ওপর দেখতে পাই বিশুদ্ধ রক্তিম নদী। সোমার পাললিক জমিন থেকে দ্রুত পরিণত হচ্ছে খরস্রোতা নাব্যতায়। গন্তব্য আরিফের পায়ের কাছে অবস্থিত ঝাঁঝরি, গহন গভীর।

শনিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

আসেন সমকামিতা নিয়ে মতামতগুলো ভাঙি তো!

ভূমিকাঃ
প্রতিটা জিনিসের পিছনে নির্দিষ্ট ও ব্যাখ্যাকৃত কারণ আছে। কার্যকারণ ছাড়া কোনকিছু ঘটে না। আমরা ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাই সেই কারণগুলো বের করার। কারণ না পেলে সাধারণ প্রবণতা হলো সেটাকে 'অলৌকিক', 'অতিপ্রাকৃতিক', 'অশরীরী', 'কুদরত' ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করে মূল প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়া। এই প্রবণতা বুদ্ধিনষ্টকারী, চিন্তাহানিকারক। তাই সর্বদা পরিত্যাজ্য। সম্প্রতি সমকামিতা নিয়ে চতুর্মাত্রিকের একটা পোস্টে ও কমেন্টে উঠে এলো নানা দিক। নানা প্রচলিত ধারণা যা হয়তো ভুল, কিংবা অমীমাংসিত, সেগুলো বিস্তারিত বলার জন্য এই পোস্ট। এই লেখার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব অভিজিৎ রায়ের লেখা 'সমকামিতা' গ্রন্থটির (প্রকাশক - শুদ্ধস্বর, ২০১০)। বইমেলায় আগ্রহীরা পাবেন, মুক্ত-মনা ব্লগেও সম্ভবত অনলাইনে আছে, খুঁজে দেখুন। আমি চেষ্টা করছি যথাসম্ভব সরল ভাষায় বৈজ্ঞানিক গবেষণাপ্রাপ্ত বিষয়গুলো উপস্থাপন করার। আমার আলোচনার কেন্দ্রে জেনেটিকস। পাশাপাশি আসবে পরিবেশ, কারণ জিন একা কাজ করে না, পরিবেশের প্রভাবে তার অন-অফ ঘটে থাকে।
যারা একটু বড়ো পোস্ট পড়তে চান না, তাদের জন্য সারসংক্ষেপ শুরুতেইঃ

ক. সমকামিতা মানসিক বা শারীরিক রোগ না।
খ. সমকামিতা এক ধরণের যৌনপ্রবৃত্তি, যা প্রতিটি মানব জনগোষ্ঠীতে দশ জনে এক জনের মাঝে থাকে (প্রকাশ্য বা গোপন)। এই প্রবণতা কম বেশি আমাদের সবার মাঝেও আছে, বিষমকামীদের প্রকট প্রবণতা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ, কিন্তু কেউই ১০০ভাগ বিষমকামী বা ১০০ভাগ সমকামী নয়।
গ. সমকামিতা একটা জেনেটিক বৈশিষ্ট্য (প্রকরণ বা ভ্যারিয়েশন) বলে মীমাংসিত হয় নি। গবেষণা চলছে। এটি জেনেটিক রোগও না।
এবারে বিস্তারিত আলাপঃ
মানুষ মস্তিষ্ক দিয়ে চলে। আমাদের সকল অনুভূতি এই মগজ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। সমকামিতা নিয়ে যে চিন্তা সেটাও আমরা মগজ দিয়ে করি। তো, সমকামিতা নিয়ে আমাদের মগজে আসা মতামতগুলোর ক্যাটাগরি করি -
১। ইহা জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, বিবর্তনের ফলাফল।
২। ইহা জেনেটিক সমস্যা/রোগ, বিবর্তনের ফলাফল (মিউটেশন) তবে নিরাময় সম্ভব।
৩। ইহা জেনেটিক কিছু না। সমাজ বা পরিবেশের প্রভাবে ঘটে।
৪। ইহা জেনেটিকও না, সমাজের প্রভাবেও ঘটে না। সম্পূর্ণ নিজস্ব চয়েসে যে কেউ সমকামী হতে পারে।
শেষেরটির ব্যাপারে কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা সম্ভব না। কারণ যদি সমকামিতা একটি ব্যক্তিগত চয়েস হয়ে থাকে, তাহলে হাজার উপাত্ত বিশ্লেষণ করেও একজন মানুষের ওরিয়েন্টেশন নির্ধারণ সম্ভব নয়। এবং কোন সিদ্ধান্তে আসাও সম্ভব নয়, বিধায় এটা আলোচনার বাইরে থাকবে।
১. ইহা জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, বিবর্তনের ফলাফলঃ
১.১ সমকামী মানুষের মগজ বিপরীত লিঙ্গের মত কাজ করে, তাই তারা সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হয়ঃ
এই গবেষণায় মগজের যে জায়গাটা আলোচনায় আসে, সেটার নাম হাইপোথ্যালামাস। এই অঞ্চলটা মানুষের যৌনপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে। হাইপোথ্যালামাস বিশাল এলাকা, সেই এলাকাতেও নির্দিষ্ট করে খুঁজলে পাওয়া যায় INAH নামের এলাকা, ইন্টারস্টিশিয়াল নিউক্লিই অফ দ্যা অ্যান্টেরিওর হাইপোথ্যালামাস। আশির দশকে পাওয়া গেল - এই INAH এলাকার নিউক্লিয়াসের মধ্যে ৩ নম্বরটা (INAH3) ছেলেদের মধ্যে মেয়েদের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বড়। দেখা গেল, সমকামী পুরুষদের INAH3 বিষমকামী মেয়েদের সমান।
এটা পেয়ে একটা প্রচলিত স্টেরিওটাইপিং বেশ বাতাস পেয়ে গেল। সেটা হলো 'সমকামী পুরুষদের মধ্যে মেয়েলিভাব বেশি' 'A female spirit in a male body'। কিন্তু পুরো বাতাস পাওয়ার আগে আরেকটা পর্যবেক্ষণ এসে সেই ধারণাকে ভণ্ডুল করে দিল। হাইপোথ্যালামাসের সুপ্রাকিয়াস্ম্যাটিক নিউক্লিয়াস (SCN Nucleus) এলাকাটা ছেলেদের ক্ষেত্রে মেয়েদের চেয়ে আকারে বড়ো থাকে। উপরের হিসাব অনুযায়ী সমকামী ছেলেদের এই এলাকা মেয়েদের সমান হওয়ার কথা, কিন্তু দেখা গেল তাদের মগজে এটার আকার বিষমকামী ছেলে, মেয়ে সবার চাইতেই আকারে অনেক বড়।
এই পুরো গবেষণায়, মেয়ে সমকামীদের মগজে কোন প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যায় নাই। সুতরাং এই ধারণাটা আর ধোপে টিকলো না।
১.২ সমকামীদের এক বিশেষ জিনের কারণে তারা সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হয়ঃ
সোজা বাংলায় গে জিন। গে জিন থাকলে মানুষ গে হয়, লেসবিয়ান হয়। গে জিন না থাকলে হয় না। এই ধারণাটি পরখ করতে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। এখনো হচ্ছে। মূলত দুইটা ফিল্ডে কাজ হচ্ছে। একটা হলো পারিবারিক ইতিহাস দেখা, লিনিয়েজে সমকামী থাকা/না-থাকা'র কারণে উত্তরবংশে সমকামী হওয়া/না-হওয়ার পরিসংখ্যান। দেখা হচ্ছে জমজদের মধ্যে (আইডেন্টিকাল ও ফ্র্যাটার্নাল) একজন সমকামী হলে অন্যজনের সমকামী হবার সম্ভাবনা কত। এই গবেষণায় যেটা বেরিয়ে এসেছে, সেটা হলো মায়ের দিক থেকে এই প্রবণতা প্রবাহিত হয়। সেক্স ক্রোমোজোম (ছেলেদের বেলায় X ও Y, এক্স দেয় মা, ওয়াই দেয় বাবা; মেয়েদের বেলায় X ও X, এক্স দেয় মা, অন্য এক্স দেয় বাবা) দুটার মধ্যে এক্স ক্রমোজোমের মাধ্যমে এটি আসে। যেহেতু মেয়েদের বেলায় দুটাই এক্স, সেহেতু বুঝাই যায় যে ওয়াই ক্রোমোজোম এটাকে বহন করলে দুনিয়াতে কোন মেয়ে সমকামী থাকতো না। এখন খুঁজতে হবে যে এক্স ক্রোমোজোমের কোন জিন বা জিনগুলো এই বৈশিষ্ট্য ঠিক করে দেয়।
১৯৯৩ সালে ডিন হ্যামার এই গবেষণা করেছিলেন, তার উপাত্ত ছিল ৪০ জন সমকামী, যাদের ৩৩ জনের এক্স ক্রোমোজোমের প্রান্তসীমায় Xq28 নামক জায়গা পাওয়া গেল। এই মার্কারটা বিষমকামীদের মধ্যে নাই। বাকি ৭ জন সমকামীর মধ্যেও নাই। তাই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো না। তবে এটা একটা সিগনিফিক্যান্ট ডাটা। বলা যেতে পারে যে সমকামিতার প্রবণতায় Xq28 অত্যাবশ্যকীয় জিন না, তবে এর প্রভাবে সমকামিতা ত্বরান্বিত হয়, প্রভাবিত হয়। ডিন হ্যামারের বয়ানে-
এই অংশটির দৈর্ঘ্যে চার মিলিয়ন বেইজপেয়ারের সমান, যা সমগ্র জিনোমের শতকরা ০.২ ভাগের চাইতেও ছোট। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই অংশে অবলীলায় কয়েকশ জিন এঁটে যেতে পারে। এই এলাকায় সমকামিতার নিয়ামক জিন খুঁজে বের করা অনেকটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই। হয় আরো বেশি স্যাম্পল নিয়ে কাজ করতে হবে, নয়তো সম্ভাব্য সকল এলাকার ডিএনএ'র অনুক্রমের সম্পূর্ণ তথ্য চাই।
ডিন হ্যামারের পরে ১৯৯৫ সালে একইরকম ফলাফল পেয়েছেন এস হু, এ এম পাত্তাউচি, সি প্যাটারসনরা। আবার ১৯৯৯ সালে কানাডার জর্জ রাইস উপাত্তের সংখ্যা বাড়িয়ে পরীক্ষা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তর্কাতর্কিও শুরু হয়ে গেছে কারণ এমন বলা হচ্ছে যে রাইসের পরীক্ষার শুরুতেই তিনি গে জিনের ব্যাপারে নেগেটিভ মতামত দিয়েছিলেন। এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এতকিছুর পরে, গে জিনের ব্যাপারটি বিজ্ঞানীমহলে 'অমীমাংসিত মামলা'। এখনো গবেষণা চলছে, দেখা যাক সেই গবেষণায় কী বেরিয়ে আসে। গবেষণা চলছে এপিজেনেটিক্সের পথেও। যে পথে উপরের সমস্যা বা বিভ্রান্তির একটা ইন্টারেস্টিং সমাধান দেয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে কোন জিন একা একা কাজ করতে পারে না। এরা কাজ করে পরিবেশ থেকে পাওয়া সংকেতের মিথস্ক্রিয়ায়। অনেকটা লাইটবাল্বের মত। পরিবেশের সংকেত জিনকে অ্যাক্টিভ করে বা ডিঅ্যাক্টিভ করে। এ প্রক্রিয়ার নাম মিথাইলেশন। যার কারণে আইডেন্টিকাল টুইনদের জেনেটিক কোড এক হওয়া সত্ত্বেও তারা একই মন মানসিকতার হয়ে ওঠে না। তাই একই জেনেটিক কোড থাকা সত্ত্বেও কোন মানুষ সমকামীও হতে পারে, বিষমকামীও হতে পারে সেই জিনের অ্যাক্টিভেশন বা ডিঅ্যাক্টিভেশনের কারণে। এই ধারণার সপক্ষে কিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে। সমকামী সন্তানের জন্ম দেয়া মায়েদের এক্স ক্রোমোজোমের সক্রিয়তা অন্যদের চেয়ে বেশি। এই বেশি হওয়াটাও নির্ভর করছে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসোল। এই হরমোনের আধিক্য সমকামী সন্তানের জন্মদাত্রী মায়েদের এক্স ক্রোমোজোমের সক্রিয়তাকে প্রভাবিত করেছে।
খুব খিয়াল কৈরাঃ
এই জেনেটিক গবেষণা এখনো অসম্পূর্ণ। এর সিদ্ধান্তগুলো তত্ত্বের মর্যাদা পায় নি। তাই সরল অঙ্কের মত ইহা=উহা ধরে নিবেন না। কারণ সে যুক্তি ধোপে টিকবে না। আমাদের করণীয় হলো নিজেদের ভুল ধারণাকে প্রাপ্ত জ্ঞানের সাপেক্ষে শুধরে নেয়া। এবং অপরকেও অবহিত করা।
সমকামিতা নিয়ে ৩নং ধারণা ("ইহা জেনেটিক কিছু না, সমাজ বা পরিবেশের প্রভাবে ঘটে।") নিয়ে অলরেডি বলে ফেলেছিঃ অমীমাংসিত ব্যাপার, গবেষণা চলছে। এবারে বলব সবচেয়ে বিতর্কিত ধারণাটি (২নং) নিয়ে।
২. ইহা জেনেটিক সমস্যা/রোগ, বিবর্তনের ফলাফল (মিউটেশন) তবে নিরাময় সম্ভবঃ
শুরুতেই বলি, এটাকে বিতর্কিত বলার কারণে এই ধারণার ভিত্তিতে অসংখ্য মানুষকে সিস্টেমেটিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। অনেকের অঙ্গহানি হয়েছে, অনেকে মারাও গেছেন। উগ্র ধর্মবাদীরা তো আব্রাহামিক ধর্মের শুরু থেকেই ছিলেন, সেইসাথে জুড়েছিলো মনোবিজ্ঞানী নামক চিজেরা। রিচার্ড ফ্রেইহার ইবিং-এর সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস (১৮৮৬) বইটা সমকামীদের মানসিক রোগী বানিয়ে দিয়েছে, সেই ধারণা এতকিছু আবিষ্কারের পরেও দূর হয় নি। সিগমান্ড ফ্রয়েড এই ধারণাকে সমর্থন দেন নি। তিনি সমকামিতাকে যৌন প্রকরণ (sexual variation) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যদিও তার মত জনপ্রিয়তা পায় নি। বহু কনভার্শনের চেষ্টা হয়েছে, বহু ট্রিটমেন্ট হয়েছে, বহু নারকীয় পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে (ইলেকট্রিক শক, অ্যাভারশন থেরাপি, পুরুষাঙ্গে শক দেয়া, মরদেহ থেকে পুরুষাঙ্গ কেটে সমকামীর দেহের ভেতর স্থাপন করা হতো টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর জন্য ইত্যাদি)। এই ঘটনাগুলো জানলে তীব্র বিবমিষাই জেগে উঠবে।

কম্পিউটার সায়েন্সের বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ অ্যালান ট্যুরিংকে সমকামিতার অপরাধে ১৯৫২ সালে শাস্তি দেয়া হয়। তাকে জেল কিংবা "চিকিৎসা" বেছে নিতে বলা হয়। সেই চিকিৎসা হলো তাকে এস্ট্রোজেনসহ বিভিন্ন হরমোনাল ড্রাগ ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে দেয়া হতো। প্রায় দুই বছর ধরে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে এই ড্রাগ নিতে হয়েছে। এর প্রভাবে তার শরীরে ইম্পোটেন্সি ঘটে, তিনি যে পর্যায়ের গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন, তা ব্যাহত হয়, এবং তার শরীরে গাইনোকোম্যাস্টিয়া নামের অসুখ দেখা দেয়। অসুখটা কী, তা লিখতে রুচি হচ্ছে না, আগ্রহীরা গুগল করে দেখতে পারেন। এই "চিকিৎসা" সহ্য করতে না পেরেও ট্যুরিং ১৯৫৪ সালে সায়ানাইড বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। এছাড়াও ১৯৬২ সালে এই অ্যাভারশন থেরাপির শিকার হয়ে ক্যাপ্টেন বিলি ক্লেগ হিল নামের এক রোগী কোমায় চলে যান এবং মৃত্যুবরণ করেন। অবশেষে ১৯৭৩ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন স্বীকার করে নিয়েছে যে,সমকামিতা কোন রোগ নয়, এটা যৌনতার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। [ বিস্তারিত ]
যাক গে সে কথা। বহু চিল্লাফাল্লা করে মনোবিজ্ঞানীরা তো থামলো। কিন্তু আরেকদল দাঁড়িয়ে গেল সমকামিতাকে জেনেটিক ডিফেক্ট হিসেবে দেখানোর জন্য। কিন্তু এই যে আপনি, পাঠক, পোস্ট পড়ছেন, আপনার কি এখনো মনে হচ্ছে জেনেটিক কারণে সমকামিতা ঘটে এটাই প্রমাণিত? প্রমাণিত না। সমকামিতার সাথে জিনের সম্পর্কই তো ঠিকমত প্রমাণ হয় নি। গে জিন বলে কোনোকিছু এখনো আবিষ্কৃত হয় নি। এর সাথে হিসাবে আনতে হবে পরিবেশ, এপিজেনেটিক্স। তাই এখনই সমকামিতাকে পুরোপুরি জেনেটিক দাবি করা যায় না। আর জেনেটিক রোগ বলা তো দূরের কথা!
সমকামিতা একটা জেনেটিক প্রকরণ, বা ভ্যারিয়েশন। যেমন নীল চোখ, বা সোনালি চুল একেকটা ভ্যারিয়েশন। বাংলাদেশে কটা চোখের কাউকে রোগাক্রান্ত বলা যা, সমকামীদের রোগাক্রান্ত বলাও তা। এটা আপনাকে, আমাকে বুঝতে হবে আগে।
এটা একটা জেনেটিক মিউটেশন বটে। এখন ভাবি, এটা কি ভাল মিউটেশন নাকি খারাপ? সিদ্ধান্ত নেয়া যায় প্রাকৃতিক নির্বাচনের উপর ভরসা রেখে। যে সকল মিউটেশন অনুপযুক্ত বা ক্ষতিকর, সেটা আপনা আপনিই বাতিল হয়ে যায়। কারণ ক্ষতিকর মিউটেশনবাহী জীব বংশবৃদ্ধি করার আগেই মৃত্যুবরণ করে, ফলে উত্তরাধিকার থাকে না। কিন্তু যে মিউটেশন আমাদের বাড়তি সুবিধা দেয় (যেমন দুই পায়ে দাঁড়ানোবা মগজের বড় আকার ইত্যাদি) কিংবা নিরপেক্ষ (যেমন নীল চোখ বা সাদা হাড়) সেগুলো নির্বাচনে টিকে যায়। সমকামিতা যদি সত্যিই জেনেটিক ডিফেক্ট হত, তাহলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছাঁকনিতে আটকে বহু আগেই বিলুপ্ত হত। কিন্তু এটা লক্ষ লক্ষ বছর টিকে আছে, খালি মানুষেই না, প্রাণিজগতের আরো হাজার হাজার প্রাণীর মধ্যে।
সমকামিতা যে রোগ না, তার আরেকটি যুক্তি হলো সংখ্যাধিক্য। আলবার্ট কিনসে'র রিপোর্ট অনুযায়ী যে কোন জনগোষ্ঠীর দশ ভাগ সমকামী। বিজ্ঞানীরা বলেন, জেনেটিক রোগের ডিগ্রি অফ রেয়ারিটি ঠিক করা হয় দুইটা ঝামেলাযুক্ত ফ্যাক্টরকে হিসাবে এনে। একটা হলো মিউটেশনের মাধ্যমে ফর্মেশন, আরেকটা হলো ন্যাচারাল সিলেকশনের দ্বারা বর্জন। এই দুইটা মারামারি করে যে হিসাব পাওয়া যায় তাকে বলে "মিউটেশন-সিলেকশন সাম্যাবস্থা"। এই ফিটনেস টেস্ট অনুযায়ী যদি কোন বৈশিষ্ট্য ক্ষতিকর হয়, তাহলে সেটা ১ মিলিয়নে ১বার ঘটে। এটা হলো (১০০%ফিটনেস) জেনেটিক রোগ। রোগের তালিকায় পড়ে এমন বৈশিষ্ট্যের বেলায় (৫% ফিটনেস) হিসাব হলো ৫০ হাজার জনে ১। সেখানে সমকামিতার হিসাব ১০ জনে ১। সুতরাং এই হিসাবে এটাকে রোগ বলা যায় না।

সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

ডিলেমা

আত্মা বলে কিছু নেই, যা সচলসক্রিয়, তা আমাদের মস্তিষ্ক
হৃদয় বলে কিছু নেই, হৃৎপিণ্ড কেবল রক্তসঞ্চালনে আগ্রহী
হৃদয় বললে বুঝি ওই মস্তিষ্কই!
দ্বিমুহূর্ত পরের মুহূর্তে -
এ সত্য শুরুতে কদর্য লেগেছে।
এ সত্য এক লহমায় সকল উপমা, দৃশ্যকল্প, চিত্রকল্প ও রূপককে
ফাটা বেলুনের মতো ছিন্নভিন্ন করে দিল।
মাধ্যাকর্ষণের টানে ওগুলো ধ্রুব ত্বরণে পড়ে গেল, সুউচ্চ কল্পনার চূড়া হতে।
সত্য উদঘাটিত হলে কদর্যই লাগে। ডিনায়্যাল। অস্বীকৃতির ক্রোধ জাগে। তারপর বার্গেইন করি, মুলামুলি, টানাটানি। ফিরিয়ে দে অলীক রূপকগুলো, আমার বিভ্রান্তিকর মিথ্যা সুখ। ফিরিয়ে দেয় না কেউ। তাই কদর্য সত্যগুলোর দিকে ভ্রূকূটি করে তাকাই। ধীরে ধীরে তারা অবয়ব নিতে থাকে। অ্যামিবার মতো নড়ে চড়ে। পর্দা সরে যায়, ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে রূপ। তখনই দেখি বিস্ময়কর দেহের ভেতর কারুকার্য।
সত্যের মতো সুন্দর এই মস্তিষ্কের ভাঁজ, যেন বয়ামে রেখে দেয়া কিছু। জান্তব। সচলসক্রিয়। নিউরনে বিদ্যুতের বেগে খবর ছড়িয়ে পড়ে। মস্তিষ্ককে চিনে নেয়ার তথ্যটাও জমা পড়ে মস্তিষ্কেই। মস্তিষ্ক ভাবে মস্তিষ্ককে নিয়ে এবং সেই ভাবনা জমা রাখে নিজের ভেতর। আবার মস্তিষ্কের ভাবনার ভেতরেও থাকে মস্তিষ্কই। ইনসেপশন। ঘুলঘুলি।
একটি কথোপকথন -
: জানার কোন শেষ নেই। জানতে কেউ নিষেধ করে নি। জানতে চাওয়া ভুল না। কোরানে কোথাও বলে নি জানতে পারবা না। আল্লাহ বলেন নি যে প্রশ্ন করতে পারবা না।
: কিন্তু সীমানা তো নির্দিষ্ট করে দেয়া। প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্র ঠিক করে দেয়া। সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। নিষেধ করা হয়েছে, তাই না?
: কোথায়? বলো। কোথায় নিষেধ করা হয়েছে?
: উমম, যদি বলি - নিষেধ করা হয়েছে আল্লাহকে নিয়ে প্রশ্ন করতে? যদি বলি তার অস্তিত্বকে মেনে নেয়ার একচ্ছত্র অধিকারকে অস্বীকার করা নিষেধ?
: হ্যাঁ, তা বটে। ইসলাম মানে আত্মসমর্পণ। আল্লাহর অস্তিত্বে নিঃশর্তে বিশ্বাস করতে হবে। প্রমাণ খুঁজলে পাবে না। পেলেও দেখবে, সংশয় দূর হবে না, সারাজীবন এই সংশয়েই কাটাতে হবে। তাই সংশয় দূর করো। বিশ্বাস স্থাপন করো।
: কিন্তু আমি তো এই প্রশ্নের উত্তর চাই। নিরেট, নির্ভেজাল সত্য।
: উত্তর আছে তো! বলা আছে - এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ, সর্বশক্তিমান, অসীম দয়াময়, পরম করুণাময়।
: কিন্তু এটা চাপিয়ে দেয়া উত্তর। সিদ্ধান্ত। এটার প্রমাণ নেই। উপাত্ত নেই।
: (নিশ্চুপ)
ডিলেমা কাটলো না। বিভ্রান্তি দূর হলো না। সংশয় আরো গাঢ় হয়ে উঠলো। ঈশান কোণের মেঘের মতো ঘন থরথরে মেঘ জমে উঠলো। এই সংশয় আমার কাছে কদর্য লাগে, মাঝে মাঝে। যদি সৎবাক্য বলি - হ্যাঁ, মাঝে মাঝে লাগে। কৃষ্ণমেঘ পুষি মনের কোণে। না, না, ভুল হলো - মস্তিষ্কের কোষে। সেখানে লালন-পালন করি সংশয়ী মেঘ। প্রশ্ন আছে - উত্তর নেই। উত্তরহীনতার মাতৃকা মেখে প্রশ্নগুলো হাসে। সে হাসি নিরাবেগ। আমার সে হাসি ভাল লাগে। থাকুক প্রশ্নগুলো, বৃথা রহস্যময়তা আর অত্যাশ্চর্য মিরাকলের আবর্জনায় না মেখেই প্রশ্নগুলো থাকুক। একদিন এদের উত্তর বের হবে - মীমাংসিত সত্য সুন্দর উত্তর। সেই উত্তরের জন্য এক জীবন অপেক্ষা করা যায়। সেই উত্তরের অপেক্ষায় এক জীবনও তুচ্ছাতিতুচ্ছ!

বুধবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

নিবিড় নিশীথ

নিশীথ বানানটা কি ঠিক লিখলাম? দীর্ঘ ঈ-কার হবে? নাকি হ্রস্ব ই-কার? ভাবছি। ইদানিং বানান-ফোবিয়া হয়েছে। বাটে পড়ে কিছু লেখায় বানানশুদ্ধি করতে হয়েছে। ফলে লাভের চাইতে ক্ষতি হলো বেশি। যা বানান ঠিকঠাক জানতাম, শুদ্ধ করতে গিয়ে সেগুলো এখন ভুল জানি। ভুলভাল করে তারপর নিজেই নিজেকে অবোধ দেই, দার্শনিক হয়ে যাই। সক্রেটিস বলেছেন পৃথিবীতে ভুল শুদ্ধ কিছু নাই*। চালাইতে পারলে সবই ঠিক, চালাইতে না পারলে সবই ভুল। কিশোর কুমারের গানের মত ‘ভুল, সবই ভুল’।
ইদানিংকালের কথা বলছিলাম। ছোটবেলায় ইশকুলের মাঠে যেসব খেলা খেলতাম, সেগুলোর একটা কমন ফ্রেম ছিল। খেলার কোন না কোন পর্যায়ে একটা ছক বা গণ্ডির মধ্যে ঢুকতে হত। যে গণ্ডির মধ্যে নিরাপত্তা কিংবা গণ্ডির বাইরে নিরাপত্তা। যেমন ছোঁয়াছুঁয়িতে সেফ-প্লেস থাকত, কিংবা মেয়েদের বউচি টাইপের খেলা। আমার মনে হয় ছেলেবেলায় ওভাবে খেলতে খেলতে সবার আচরণে এটা ঢুকে যায়। গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা। তুচ্ছ একটা দাগ মাটিতে। হয়ত নিজেই দিয়েছি। কিন্তু কী এক অজানা কারণে সেটা পেরুতে পারছি না। নিজেই নিজেকে আটকে বসে আছি! আবার মনের এক কোণে চিন্তাও হচ্ছে – যদি পেরুতে পারতাম, কতোদিন গণ্ডির বাইরে পা রাখি না। আজব ডিলেমা।
ইদানিং বেশি বেশি এই ডিলেমা ফিরে আসছে। বেশিরভাগ সময় মূল কাজটুকু করার আগে পরের এই ডিলেমা নিয়ে ডিল করতেই বেশি সময় আর চিন্তাভাবনা নষ্ট হচ্ছে। ইংরেজিতে মনে হয় এটাকেই প্রোক্র্যাস্টিনেশন বলে। বড়োলোকের রোগ গরীবের হলে সেটাকে বলে ঘোড়া রোগ। আমি শালার হাম-যক্ষা-ম্যালেরিয়া-হুপিং কাশি কিছুর হাতে ধরা খেলাম না, খেলাম তো খেলাম, শেষমেশ ঘোড়া রোগের হাতে!

গণ্ডির মধ্যে ঢুকে থাকলে একটা ইল্যুশন তৈরি হয়। মনে হয় কোন সাবানের বুদবুদের মত বাইরের কিছু আর আমাকে স্পর্শ করতে পারছে না। ‘এই বেশ ভালই আছি’ টাইপের ধারণা হয়। গণ্ডির বাইরের যে দৃশ্যগুলো দেখি, দেখি চারপাশের মানুষ, সাধারণ, মামুলি মানুষ, তারা তাদের সাধারণ চাকুরি, টাকা, জমি, দেনা ও খাবার দাবার নিয়ে দিনাতিপাত করছে। দেখে ভাল লাগে। আমার একটা মস্তিষ্ক আছে এবং সে মস্তিষ্ককে আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি – এটা ভেবে ভাল লাগে। চিন্তা করি নানা কিছু নিয়ে, সেগুলোর সব প্রকাশ করার উপায় নেই। প্রকাশ করতে যে সময় লাগবে, সেই সময়ে আরও কয়েক কোটি চিন্তা করে ফেলবো – সেগুলোর কী হবে? তাই আমি চারপাশ দেখি আর ভালোলাগা জমাই।
গত সেপ্টেম্বর থেকে জীবন একটু বদলে গেছে। পাঁচ মাস ধরে পার্টনার ঘরের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে – খবরদারি করে। অন্যরকম অভিজ্ঞতা। এখন মস্তিষ্ক আমার সাথে একটু বিট্রে করেছে। নিজে নিজে গণ্ডি সম্প্রসারণ করে পার্টনারকে ভিতরে এনেছে – এখন চিন্তাভাবনাগুলো শেয়ার করা লাগে। কিছু কিছু মিলে যায় – সহমত। বেশিরভাগই মিলে না – উপভোগ্য তর্ক। তর্কের এক পর্যায়ে ক্ষান্ত দেই, ঘোড়া রোগের রোগীদের বেশি তর্ক করতে নাই। এ কারণেই বোধহয় ব্লগিং কমিয়ে দিয়েছি। একটা সময়ের পরে সবই রিকারেন্স – সেই একই আলাপ, একই হাসি-তামাশা-ঝগড়া। মতামতের মিল কিংবা মতের অমিল। নিজের কথাও বারবার বলতে ভাল লাগে না, তাই অনেক ক্ষেত্রে নীরবতা শ্রেয় অপশন মনে হয়।
খুব সম্প্রতি আরেকটা বেশ বড়ো ব্যাপার হলো – আমার এই বন্ধুটার সন্তান জন্মালো। ব্যাপারটা কী ভয়াবহ, সেদিনের পুঁচকা, আমার লগে ঝগড়াঝাটি করত, এখন কি না এক পোলার বাপ। এমন না যে সে আমাদের ইনটেকের প্রথম বাপ, এর আগে অনেকেই বাপ হয়েছে, একজন তো দুইবার এই কৃতিত্ব অর্জন করে ফেলেছে এরই মধ্যে। কিন্তু ওর বেলায় আসলে আমার অন্যরকম অনুভূতি হলো। এতো দিনের বন্ধু, বাবা হতে যাচ্ছে, খবরটা পেয়েই খুশি হয়েছিলাম! ওর সবচেয়ে বড়ো গুণের একটা হলো পিতৃসুলভ বৈশিষ্ট্য। বটগাছের মত দাঁড়ায় যায়, ক্রাইসিসে একদম ইস্পাত-স্নায়ু। এরকম সবার হয় না, সবাই পারে না। নতুন অতিথির আগমনী বার্তায় তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। আমিও একদিন পার্টনারকে নিয়ে গেলাম, ছোট ছোট জামাকাপড় কিনে নিয়ে এলাম বন্ধুপুত্রের জন্য। ঘরোয়াভাবে একটা অনুষ্ঠানও হয়ে গেল ওর বাসায়!
ভবিতব্য খুব নিষ্ঠুর ধরণের অদ্ভুত আচরণ করে! তাই ওর ছেলে জন্মানোর এক মাস আগে, ওর আব্বা মারা গেলেন। যেন কিছুই হয় নি, হুট করেই। সকালে বেরিয়েছিলেন বাজার করতে। বাজার পর্যন্ত পৌঁছুতে না পৌঁছুতেই স্ট্রোক। বড়ো ছেলের ঘরে নাতি আসছে – নাম ঠিক করে রেখেছিলেন… সব শেষ।
আমার বন্ধুটিকে আমি এরপরও ভেঙে পড়তে দেখি নি। এক মাস পরে সন্তানের জন্ম। বন্ধুপত্নী বললো, ছেলের নাম রাখবে দাদার নামে।
মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবীটা একেবারে খারাপ জায়গা না। ভুল শুদ্ধ বলেও তাই, তেমন কিছু নাই!

বুধবার, ১১ জানুয়ারী, ২০১২

আমার নিজস্ব ডিসকোর্স, নিজের সাথে

১। মানব বুদ্ধিমত্তা, সৃষ্টিশীল কল্পনাপ্রবণতা এবং ভালবাসার ক্ষমতা আমার সর্বোচ্চ আদর্শ। অন্য সকল মতামতের ওপরে আমি এগুলোকে শ্রদ্ধা করব।


২। কোন বস্তু বা মতবাদকে আরেকজন মানুষের ওপর স্থান দেয়া যাবে না। (আসেন ধর্ম-নির্ধর্ম, আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামাত, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে চিল্লাইতে চিল্লাইতে বারোটা বাজায় ফেলি, কিন্তু আপনার বাড়িতে যদি আগুন লাগে, বা আপনাকে কেউ আক্রমণ করে, তাহলে আমি সবার আগে এগিয়ে যাব সকল মতভেদ ভুলে)


৩। যা বলব, তা মনেপ্রাণে মেনে বলব। (আগে ছোটোবেলায় স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে "আমি শপথ করছি..." ধরনের)


৪। কিছু সময় একান্ত নিজের করে আলাদা করে রাখতে হবে, যখন আমি কেবল বিশ্রাম নেব আর চিন্তা করব। আর কিছু নয়।


৫। নিজের পরিবার, নিজের বাবা-মা, নিজের সন্তান ও নিজের পার্টনারের সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকব।


৬। প্রতিটি মানব জীবনকে শ্রদ্ধা করব এবং রক্ষার চেষ্টা করব। (সেটা অপরাধী কেউ হলেও, তার সুষ্ঠু বিচার হোক, মৃত্যুদণ্ড না হোক, প্রয়োজনে সারাজীবন অন্ধকুঠুরিতে বন্দী থাকুক, তবুও...)


৭। কৃত প্রতিজ্ঞা সর্বদা রক্ষা করব। (হতে পারে তা দেশ, মা, সন্তান কিংবা পার্টনারের কাছে করা)


৮। যে কোন ধরণের চুরি করব না।


৯। নিজের বা অন্যের ক্ষতি হবে - এমন মিথ্যা বলব না।


১০। খুব বেশি সময় ভবিষ্যতের সুখের আশা করে কাটাবো না। অন্যকে হিংসা করব না। এসবে মাথা নষ্ট হয়।

শনিবার, ৭ জানুয়ারী, ২০১২

কর্ণোপকর্ণিকা

শীত শীত বিকেলে গলিতে হাঁটছি। গলিগুলো এখন আর আগের মতো সুকুমার নেই, এখন সেগুলো পাকা রাস্তা, পিচের কালো পরতের 'পর পরত জুড়েছে, আর গলিগুলো ক্রমশ হয়ে উঠেছে দাম্ভিক রাজপথ। পথের দু'পাশে অনেকগুলো বিল্ডিং উঠে গেছে। বিল্ডিংকে বাংলায় বলে ইমারত। কিন্তু আগে'কালের যে ইমারত গড়ে উঠেছিল, এই বিল্ডিংগুলো তেমন না। এরা বিদেশি, আরোপিত পর্দার মতো অশ্লীল, কাচের মসৃণ শরীর, যে কাচের ভেতরে দেখা যায় না। কোনো জানালা নেই, বারান্দা নেই এ'গুলোতে। কেবল সরাসরি জ্যামিতিক লম্বের মতো সুউচ্চে উঠে গেছে নির্বিকার। রাজপথ নয় তবু এই বিল্ডিংয়ের সারি দু' পাশে জমে উঠেছে বলেই এই রাস্তাকে ভীতিকর লাগে। আমি তাই এই রাস্তায় ভয়ে ভয়ে হাঁটি। মনে ভয় হয়, যদি এই বিল্ডিংগুলো একদিন কাত হয়ে পড়তে শুরু করে, তাহলে!

এমন ভাবতে ভাবতে আমি হাঁটতে থাকি। দ্রুত। মাথা নিচু করে। এই গলিতে খালি অফিস আর অফিস। নানারকমের বাহারি অফিসে অনেকে সেজেগুজে চাকরি করে। আমি তাদের অনেককেই চিনি। কিন্তু পরিচয়ের গণ্ডিতে তাদের না রাখতে পারলেই হয়তো আমার ভাল লাগতো। তাই আমি সম্ভাব্য সামাজিকতা এড়াতে মাথা নিচু করে হাঁটি। হনহনিয়ে। দু'পাশের অনেক উঁচু বিল্ডিংয়ের কারণে এই গলিতে একটা চ্যানেল ইফেক্ট হয়েছে, সারাক্ষণ হু হু করে বাতাস বয়। এমন বাতাস ধানক্ষেতের কথা মনে করিয়ে দেয়। আউশ ধানের গন্ধ পাই। চমকে উঠি। এখানে আউশ কোথায়? স্মৃতি থেকে ঘাই মেরে ওঠে গন্ধ। চোখেও কি ভুল দেখি? আইল চোখে পড়লো কি? নাহ, ও কেবল ভ্রান্তিবিলাস। আমি আবার মাথা নিচু করে হাঁটি। এখানে কোনো প্রাগৈতিহাসিক জীবন লুকিয়ে নেই। সব হারিয়ে গেছে এই রাস্তা, এই কালো-পিচ, এই বিল্ডিং ওঠার সাথে সাথেই...


এখানে বিল্ডিং একটা রূপক, রাস্তাটাও রূপক। আগে যে গলি ছিল, আর এখন যে হু হু বাতাস, সেটাও মনে হয় রূপক।

মাঝে মাঝে ভাবি, এই যে দু'চোখের দৃশ্যগুলো কি আসলে সত্যি? যা দেখছি, যা অবলোকন করছি, আবছা দেখার look আর গভীর দর্শনের observe, এত রকমারি দেখার মাঝে কোনটা ঠিক? কোনোটাও কি ঠিক?

প্রশ্নটির উত্তর খুঁজছিলাম। কালো পিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাঁটছি, চোখের সামনে অপরিচিত অপরিবর্তনীয় দৃশ্য। চারপাশে পরিচিত মানুষ আমাকে দেখে কিন্তু এক মনে হাঁটছি বলে কেউ আমাকে হয়ত জ্বালাতে চায় না। বিরক্ত হব বা চমকে উঠব ভেবে চকিতে ডাক দেয় না। বড়ো হয়ে গেলে আমাদের দ্বিধা বাড়ে, সাবলীলতা কমে। চোখের দৃষ্টি ঘোলা হয়ে ওঠে মানুষের মুখ দেখার সময়। কারো মুখের রেখা পড়া যায় না, খালি অবয়ব বোঝা যায়... সব একই মানুষ, একই পুনরাবৃত্তিতে জন্মায়... মরে...


পৃথিবীর বিস্ময়কর দুর্ঘটনা যে এই গ্রহে মানুষ নামের কিম্ভুত এক জীব জন্মেছিল। জন্মেই তার বিশেষত্ব বোঝা যায় নি। ধীরে ধীরে দেখা গেল সে আলাদা হয়ে উঠছে মানুষ হয়ে উঠছে ক্রমশ দাম্ভিক হয়ে উঠছে আরোপিত হয়ে উঠছে বিষাক্ত ও কৃত্রিম হয়ে উঠছে ভাবালু ও বিষণ্ণ হয়ে উঠছে। এমন বিচিত্র হয়ে ওঠার স্বতঃস্ফূর্ততায় তাকে সবাই ভয় পেতে শুরু করল। ভয় পেয়ে দূরে সরে গেল পশু। ডানা ঝাপ্টে দূরে সরে গেল পাখি। চুপচাপ দূরে সরে গেল প্রকৃতি। মানুষ একা হয়ে গেল একাএকাই।


কতোগুলো ছেলে খেলাচ্ছলে একটা বাচ্চা কুকুরের মুখে কতগুলো পটকাবাজি পুরে দিয়েছিল। কুকুর তো, প্রভুভক্ত, নির্বোধ, অবলা। সে ভেবেছে এটা হাড়। দাঁতে চেপে ছেলেগুলোর পিছু। একটা ছেলের কাছে দেয়াশলাই ছিল। একটা কাঠি ফস করে ধরিয়ে পটকার মুখে ধরিয়ে দিয়ে তারা সবাই চলে গেল। কুকুরের বাচ্চাটা একটু এদিক একটু ওদিক তাকিয়ে কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। এখন কেবল ও সুতোটুকু জ্বলে ফুরিয়ে যাবার অপেক্ষা...



[এলোমেলো শীতল সময়ের ক্ষমাপ্রবণ কিছু লাইন]
এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল