বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০১৫

ইশতেহার

মাঝে মাঝে এমন একেকটা দিন আসে সব রিক্ততা এক সাথে জড়ো হয়। যারা মানসিকভাবে দুর্বল, কিংবা কোন নেশার খপ্পরে আটক হয়ে আছেন, তাদের জন্য এমন একটা স্লোগান আছে বলে শুনেছি - "ওয়ান ডে অ্যাট এ টাইম"। জীবনের ভার যাদের জন্য দুর্বিষহ, তাদের জন্য এই স্লোগান একটা টনিকের মতো কাজ করে। অনুপ্রেরণার মতো সাহস জোগায়। তাদের দুর্বল কাঁধে জোর আসে। হয়তো তোমার দিনটা সকাল থেকেই খারাপ যাচ্ছে, মন উচাটন, বিক্ষিপ্ত, যাই করছো ভজঘট পেকে যাচ্ছে, মনের ভেতর ফিরে ফিরে আসছে ব্যর্থতার দুঃখ... ঝেড়ে ফেলে দাও এসব চিন্তা। ভাবো, "ওয়ান ডে অ্যাট এ টাইম"। ভাবো, আজকের দিনটা খারাপ, কিন্তু সেটা কেবল আজকের দিনের জন্যই। কালকে আবার নতুন দিন। নতুন সম্ভাবনা। ঘটে যেতে পারে অসম্ভব সুখের ঘটনা। ঘটতেই পারে। তাই আজকের খারাপ দিনটা কোনমতে পার করে দাও। "ওয়ান ডে অ্যাট এ টাইম"...

আজ সকাল থেকে বরফ বৃষ্টি হচ্ছে। পানির বিন্দু শীতের বাতাসের চোটে মাটিতে পড়তে পড়তেই বরফ হয়ে যাচ্ছে। এমন বরফ যা দেখা যায় না। পিচ্ছিল সর্পিল মরণফাঁদ। পা ফস্কে হাড় ভাঙতে পারে, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটাতেও পারে। তাই দুপুর পেরুনোর আগেই ভার্সিটি বন্ধ। ক্লাস ক্যানসেল। রাস্তা ঘাট শুনশান। অযাচিত ছুটি।
এমন হুট করে ছুটি হলে বিপাকে পড়ে যাই। প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না, তাই মগজের কোষে কোষে তোলপাড়। বাইরে থমথমে ছাই মেঘ, ধীরে ধীরে কুয়াশার মতো রঙহীন বরফ কালো রাস্তায় শীতল আততায়ীর মতো জমে উঠছে। দেখতে দেখতে মনে হলো, এটা আসলে আমাদের দিনকালের খবর। ছুটির ভাল খবর আসে খুনের পিঠে। ঘাতকের ছুরি সরিয়ে নিলে আসে তুচ্ছ খেলার ক্ষণিক আনন্দ।

"ওয়ান ডে অ্যাট এ টাইম"...

এসব হায়-হুতাশ একটা সময় পরে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে সবার জন্যেই। কারো শরীরে একটা জায়গায় বারবার গুঁতো দিতে থাকলে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ মানুষটাও একসময় খিটখিট করে ওঠে। তাই একদম মুডকিলার হিসেবে বদনাম হয়ে যায় কারো কারো। "হি ইজ সাচ এ ডাউনার! সারাক্ষণ সেই একই প্যাচাল?" শোকের তীব্রতা হয়ে যায় বেহুদা কাসুন্দি।

স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবসের মতো কোন এক বিশেষ জাতীয় দিনে বিটিভি'র প্রোগ্রাম দেখছিলাম। এটা সে'সময়ের কথা যখন গণ্ডায় গণ্ডায় চ্যানেল ছিল না। না দেশি, না বিদেশি। বিটিভি সরকারি প্রোপাগান্ডা অতোটা চালু হাতে দেখাতো না। দেশে নতুন নতুন গণতন্ত্র এসেছে। জাতীয় দিবসের বক্তৃতা/বক্তব্য কিছু একটা দেখাচ্ছে। আমার কাছে বড়ই একঘেঁয়ে লাগছিলো সেটা। স্পষ্ট মনে আছে, আমি সেই বিরক্তি খুব তীব্রভাবেই প্রকাশ করেছিলাম। "কী সব সেই একই প্যাচাল? প্রত্যেক বছর এই একই কথা। কোন নতুন কিছু নাই?" আমার নানু খুব শান্ত স্বরে বলেছিলেন, "এগুলো প্যাচাল না। এরা অনেক কষ্ট করেছে। ওরা নাই বলেই তুই আছিস, তোরা আছিস।" আমি এতোটাই অ্যারোগেন্ট ছিলাম যে নানুর কথা বুঝতে পারি নাই। ফোঁস করে একটা শব্দ করে অন্য ঘরে চলে গিয়েছিলাম। নানুর সেই শান্ত স্বরের কথাগুলো আজ কোন্‌ অন্ধ কুঠুরি হতে ফিরে এলো? "ওরা নাই বলেই তুই আছিস", আসলেই তো! এতো প্রিভিলেজড জীবন যাপন করেছি, করছি, অথচ বিন্দুমাত্র মনে করি না অসামান্য পূর্বপুরুষ কী নির্দ্বিধায় সব কিছু দিয়ে দিয়েছিলেন!

দুপুরে "House of Cards" দেখছিলাম। দৃশ্যটা ছিল একজন অ্যাক্টিভিস্ট আর আমেরিকার ফার্স্ট লেডির মধ্যে। রাশিয়ার জেলে আটক আমেরিকান অ্যাক্টিভিস্টকে বুঝানোর চেষ্টা করছেন ফার্স্ট লেডি। সামান্য কিছু কথা মিডিয়ার সামনে বললেই রাশান সরকার তাকে ছেড়ে দিবে। দেশে গিয়ে সে আবারও তার সংগ্রাম শুরু করতে পারবে। কিন্তু সে কিছুতেই মানছে না। এক পর্যায়ে দুর্বিনীত অ্যাক্টিভিস্টটা বলেই বসলো, "আপনি কি কখনো কোন আদর্শকে এতোটা সত্য বলে মেনেছেন, যার জন্য আপনি জীবন দিতে পারেন?" ফার্স্ট লেডির মুখে কথা সরলো না।
আসলে ফারাকটা হয়তো এটুকুই। আমরা মানুষ হিসেবে, সামাজিক জীব হিসেবে, কমপ্রোমাইজ করার নিয়ম শিখি। সবচেয়ে কম ছাড় দিয়ে সবচেয়ে বেশি লাভ করার হিসেব কষা শিখি। আমাদের ঝুঁকিগুলো হয় মাপা। বিপদগুলোও হয় ছক কাটা। সেই বিপদ থেকে উত্তরণের রাস্তাও সামনে বিছানো থাকে। আমাদের জন্য এমন নির্ভেজাল আবেগ মোটেই ভাল নয়। আদর্শের জন্য নিজের সবচেয়ে মূল্যবাদ সম্পদ, এই জীবনটাকে হাসতে হাসতে বিলিয়ে দেয়াকে তাই আমরা বোকামি বলি।

গত বৃহস্পতিবার হতে এই অবস্থান থেকে সরে এসেছি।
এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল