মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৬

রূপবান!

আজকে একটা দরকারে ডাক্তারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তার কাছে কিছু বিষয় জানার দরকার ছিল। অপেক্ষাগৃহে বসে নামধাম পূরণ করার কিছুক্ষণ পরে ডাক এলো। হাসিমুখে ডাক্তার এসে কথা বললেন। শান্তভাবে সমস্যার কথা জানানোর সময় কম্পিউটারে লিখে নিচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে কিছু প্রশ্নও করছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে সমাধান আর করণীয় ব্যাখ্যা করলেন। কী কী করতে হবে বলার সময় পাশে রাখা একটা নোটপ্যাড নিয়ে লিখে দিচ্ছিলেন। খেয়াল করলাম, ডাক্তার বাঁহাতি। সামনে বসে বাঁহাতি কারো লেখালেখি দেখতে বেশ মজা লাগে, কারণ বেশিরভাগ মানুষই (প্রায় ৮৭-৯২%) ডানহাতি। সচরাচর দেখা যায় না বলে হাতের আঙুলের নড়াচড়াগুলো অদ্ভুত সুন্দর লাগে। যখন ক্যাডেট কলেজে পড়তাম, তখন আমার আগের ক্যাডেট নম্বরের বন্ধু বাঁহাতি ছিল। ভর্তি হবার পরে আমাদেরকে ক্যাডেট নম্বর অনুযায়ী থাকতে হতো। পরে এলোমেলো হলেও ছয় বছরের তিন বছরই এই বন্ধুর পাশের জায়গাতেই থেকেছি। প্রথম দিকে ওর লেখার সময় হাতের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, স্রেফ কৌতূহল থেকেই। ও কেমন করে অক্ষরগুলো লিখছে, দেখতে মজা লাগতো।

বাংলাদেশের সমাজে অজস্র কুসংস্কারের মধ্যে একটা হলো যে বামহাত = খারাপহাত, আর ডানহাত = ভাল হাত। কে কবে কীভাবে এই ফালতু নিয়ম আবিষ্কার করেছে, কে জানে! (আমার আজকাল ধারণা হয় বাঙালিদের কুসংস্কারগুলো পায়খানাঘরে গেলে তৈরি হয়। হাগু করতে করতে অলস সময়ে এসব 'হাগু-ক্যাটাগরি'র আইডিয়া মাথায় আসে।) মানুষ একটা চমৎকার প্রাণী, যার দুইহাতই সমান কর্মক্ষম। আজ আমরা জানি যে বামহাত ডানহাতের কোন ভাল-খারাপ নেই। যে যে হাতে দক্ষ, সে সেই হাতে কাজ করতে পারে। বামহাতকে 'খারাপ' বলার মূল কারণ বাঁহাতিদের স্বল্পতা হতে পারে। সাধারণত বাঁহাতির সংখ্যা ১০%-এর মতো, অর্থাৎ গড়ে প্রতি নয়জনে একজন বাঁহাতি হবে। যেহেতু এটা সচরাচর দেখা যায় না, তাই ওই নয়জনের ডানহাতি হওয়াটাই 'স্বাভাবিক' আর একজনের বাঁহাতি হওয়াটা 'অস্বাভাবিক' বলে মিথ্যা নিয়ম বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। এই নিয়মের চক্করে পড়ে আমাদের দেশের অনেক বাঁহাতিকেই ছোটবেলায় লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হতে হয়। বাঁহাতে লেখা বা ধরার সময় মেরে-পিটিয়ে তাকে ডান হাত ব্যবহার করতে শেখানো হয় (আমার নিজের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেই এমন ঘটনা আছে)। আজ আমরা জানি যে শিশুকে তার দক্ষ হাত ও পা ব্যবহার করতে না দিলে সেটা  তার মস্তিষ্কের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সে যতটা চটপটে হতে পারতো, ততটা হতে পারে না। চিন্তা করুন এভাবে কত মানুষকে কষ্ট করে নিজের কম দক্ষ হাতে লিখতে, খেতে, ধরতে শিখতে হয়েছে!

মানুষ হবার একটা সীমাবদ্ধতা হলো আমরা অন্যের অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারি না। এজন্য অনেকসময়ই তাদের অভিজ্ঞতাকে তুচ্ছ মনে করি। এই হাতের সক্ষমতা তার একটা ভাল উদাহরণ - সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানুষ হবার পরেও পরিসংখ্যানে কম পাওয়া যায় এমন বৈশিষ্ট্য থাকায় একজন মানুষের ওপরে নানাভাবে আমরা অন্যায় বোঝা চাপিয়ে দেই। কখনো বুঝেশুনে দেই, কখনো অজান্তেই দেই। এরকম আরও অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই কালো বা বাদামি বর্ণের। এই রঙের কোন ভাল-খারাপ দিক নেই। তারপরেও যারা অতিরিক্ত কালো বা অতিরিক্ত সাদা, তাদেরকে নানাভাবে হেয় করা হয় না? বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই গড়ে সাড়ে পাঁচ থেকে পৌনে ছয় ফুট (পুরুষ) আর পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ফুট (নারী) হয়ে থাকেন। এই সীমার বাইরে যারা অতিরিক্ত লম্বা বা অতিরিক্ত বেঁটে, তাদেরকে কি হেয় করা হয় না? বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ মুসলমান। এর বাইরে যে যে ধর্মের মানুষ আছেন, তাদেরকে কি নানাভাবে হেয় করা হয় না? এই বৈশিষ্ট্যগুলো কিন্তু কেউ বুঝেশুনে বেছে নেয় না, বা খেটেখুটে অর্জনও করে না। জন্মের আগেই আমাদের ডিএনএ'র সংকেতের মধ্যে লেখা হয়ে যায় আমরা পুরুষ-নারী, লম্বা-বেঁটে, ফর্সা-কালো, ডানহাতি-বামহাতির মধ্যে কোনটা হবো। আমাদের বাবা আর মায়ের জিনের বৈশিষ্ট্যকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই! আর জন্মের পরপরই ঠিক হয়ে যায় আমরা কোন ধর্মের মানুষ হবো। এরকম random, arbitrary, coincidental, accidental বৈশিষ্ট্য দেখে আমরা কত সহজেই মানুষকে অপমান করি, তুচ্ছ করি। 

কী অদ্ভুত পরিহাস! যেটা আমরা নিজেরা বেছে নেই না, যাতে আমাদের নিজেদের কোন হাত নেই, তার কারণে সারাজীবন কষ্ট পেতে হয়। এটাই সমাজের নিয়ম! অথচ যে বিষয়গুলো আমরা নিজেরা ভেবেচিন্তে বেছে নেই, সেগুলোর কারণে আমাদের এতোটা জ্বালা-যন্ত্রণা পোহাতে হয় না।

নিজের ইচ্ছায় বেছে না নেয়া আরেকটা বৈশিষ্ট্য আছে, আমাদের লিঙ্গ (sex) আর যৌন-পছন্দ (sexual preference)।  মনে করার চেষ্টা করুন তো, বয়ঃসন্ধিতে যে মানুষটিকে ভাল লাগতো, সেটা কি আপনি নিজের ইচ্ছায় বেছে নিতেন? নাকি ব্যাখ্যার অতীত এমন এক অনুভূতি এসে আপনাকে টালমাটাল করে দিতো? আপনি ছেলে বা মেয়ে বা বৃহন্নলা, যাই হন না কেন, কাউকে ভাল লাগার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। আপনি বড়োজোর বলতে পারেন পছন্দের মানুষটির কোন কোন দিক আপনার ভাল লাগে। আমাদের যৌন-পছন্দ প্রধানত শারীরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। আমরা অন্য মানুষের শারীরিক কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হই। কিন্তু এটাই একমাত্র নিয়ম না। আমাদের মধ্যেই কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাদের যৌন-পছন্দ মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। শারীরিকভাবে আপনি যতই আকর্ষণীয় হন না কেন, যদি তারা মানসিক আকর্ষণ বোধ না করে, তাহলে আপনাকে ততটা পছন্দ করতে পারবে না। যদি আপনি প্রথম গ্রুপের  হয়ে থাকেন, তারপরেও মানসিক আকর্ষণের প্রভাব কিছু পরিমাণে আপনার মধ্যেও আছে। অনলাইনে বা ফোনে যখন কারো সাথে পরিচিত হয়ে আকর্ষণ বোধ করেন, কাউকে সামনাসামনি না দেখেই, সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? শুধুমাত্র গলার স্বর বা টাইপকরা অক্ষর দেখেই কি আকৃষ্ট হন না? পরে হয়তো শরীরের টান ছাপিয়ে যায়। অন্য গ্রুপের ক্ষেত্রে উল্টোভাবে ঘটে - সামনাসামনি দেখে ভাল লাগা হতে পারে, কিন্তু প্রচণ্ড আকর্ষণ তৈরি হয় মানসিক স্টিমুলেশনে, যা শুধু অন্যজনের কথা বা চিন্তাতেই সম্ভব। এই দুই ভাগ ছাড়াও আরও বিচিত্র ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভাগ আছে।

এখন বলুন, এদের মধ্যে কোনটা খারাপ? আর কোনটা ভাল?

নিয়মটা কি আপনি ভেবেচিন্তে তৈরি করেছেন? নাকি অন্য কেউ আপনার জন্য তৈরি করে রেখেছে? যে তৈরি করেছে, সে যে সবকিছু জানে বা বোঝে  - এমন তো নাও হতে পারে। আগেই দেখলাম যে আমরা অন্যের অভিজ্ঞতা বুঝতে অক্ষম, তাই জেনে না-জেনে অপরকে অপমান করি। ওটা যদি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে এটাও ভুল। অন্যের অভিজ্ঞতা যেহেতু আপনি জানেন না, সেহেতু আপনার কোন অধিকার নেই তাকে হেয় করার। খেয়াল করে দেখবেন, অন্যরা কিন্তু আজ এসে আপনাকে বলছে না যে আপনি নিজের পছন্দমতো কাউকে ভালবাসতে পারবেন না (আজকাল বাবামায়েরাও অনেক সময় বলতে পারে না)। যারা বলে, যারা জোর করে চাপিয়ে দেয়, তখন আপনার কেমন লাগে? খুব খারাপ লাগে না? ভালোবাসার মানুষকে না পেলে সবারই খারাপ লাগে।

আমরা যেসব পুরানো ক্লাসিক গল্পতে মজা পাই, তার প্রায় সবগুলোই প্রেম-ভালবাসার। আর সেসবের অধিকাংশই কোন না কোন কারণে বাধা পেয়েছিল। কখনো পরিবার, কখনো সমাজ, কখনো বয়স, কখনো যুদ্ধ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভালোবাসার মাঝে। মুনীর চৌধুরীর "রক্তাক্ত প্রান্তর" মনে আছে? ইব্রাহিম কার্দি আর জোহরার প্রেম? কিংবা লাইলী-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট, দেবদাস-পার্বতী, অমিত-লাবণ্য, কুবের-কপিলা? এরকম অসংখ্য দুর্দান্ত গল্পের মিল কোথায় বলুন তো? এগুলো সবি মানুষের বিচিত্র, অব্যাখ্যাত, বর্ণনাদুঃসাধ্য ভালোবাসার জয়ের গল্প। পাত্রপাত্রী মোরে গেলেও যেখানে ভালোবাসা জিতে যায়। এগুলোকে আপনি accept করে নিতে পারছেন কীভাবে? পারছেন কারণ এদের প্রেমে আপনার কিছু যায় আসে না। এরা বিয়ে করলে আপনি টাকা পাবেন না, এরা মরে গেলেও আপনার চাকরি চলে যাবে না। সুতরাং কোন দুজন রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষের প্রেমের মাঝখানে বাগড়া দিয়েন না। তারা যদি সরাসরি আপনার কোন ক্ষতি না করে, তাহলে তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দিন। কড়াভাষায় যাকে বলে, "নিজের চরকায় তেল দিন"।

আর তারপরেও হয়তো আপনি ভাবছেন, "আমার কিছু যায় আসে না, কিন্তু তবু এটায় সমাজের ক্ষতি, মূল্যবোধ অবক্ষয়, সংস্কৃতির অপমান" ইত্যাদি। তাই আমি এই বিষয়ের বিরোধিতা করবোই", তাহলে বলতেই হয়, যে আপনি আসলে একজন *** ভাই। আপনার জীবনে কাজের এতোই অভাব যে আপনি অন্যের ভাল থাকা দেখতে পারেন না। পায়খানায় বসে বসে ফন্দি আঁটেন কীভাবে অন্যের ভাল থাকায় বাগড়া দেয়া যায়। সমাজে আপনার ইনপুট অতোটুকুই! আপনি মরে গেলে মাটির তলে পঁচবেন বা আগুনে ভস্ম হবে। দুইক্ষেত্রেই আপনাকে কয়েকদিন পরে সবাই ভুলে যাবে। আর যাদের ক্ষতি করেছেন, বা যাদের কুৎসা গেয়েছেন, তারা উঠতে বসতে গালি দিবে, "শালা একটা *** ভাই আছিলো। মরছে ভাল হইছে!"
এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল