কবিগদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবিগদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২ এপ্রিল, ২০১২

দ্বিঃ১


আমার যে বন্ধুটির নাম অনীক, সে বেশ হিলহিলে ছিল এই তো কয়েক বছর আগেও। পাতলা ফতুয়া পরলে তার উঁচু হাড় বেরিয়ে থাকা কাঁধ দুটোকে হ্যাঙ্গারের মতো দেখাতো। গলার হাড় বেরিয়ে আছে, চোয়াল বসে আছে। দুই গাল যেন কোন অখ্যাত হোমিওপ্যাথের চেম্বারের বসবার সোফা, তোবড়ানো ঢ্যাপ খাওয়া। ওকে যতোটা শুকনা ও অপুষ্টিক্লিষ্ট লাগতো, সেটা দেখে কয়েক বছর আগে আমি যথেষ্ট সহানুভূতি ও সমপরিমাণ করুণা অনুভব করতাম। সেই অনীক কয়েক বছরে খাওয়া দাওয়া করেছে অনেক, বিশ্রামও নিয়েছে প্রচুর। হোমিওপ্যাথের চেম্বারের সোফা বদলে গেছে কর্পোরেট সোফার মত হৃষ্টপুষ্টতায়। পুষ্টিও জুটেছে তার শরীরে, মনে। তাই সে বেশ হাস্যোজ্জ্বল, সুখী মানুষের মতো নির্লিপ্তি ল্যালপ্যাল করে ওর চোখে। আমার অফিসে এসেছে আজ অনেকদিন পর। আমরা একটা সময় একসাথে ঘুরে বেড়িয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো - সেইসব চোয়াড়ে ডিমভাজি খেয়ে দিন পার করা দিনগুলোয় আমি আর অনীক বিষম বন্ধু ছিলাম। আমাদের মতে মিলতো না প্রায়শই, আমাকে অনীক সম্ভবত উন্নাসিক কেউকেটা ধরে নিয়েছিল। আমিও সম্ভবত অপুষ্টিকাতর অনীককে ফালতু শ্যালো ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু এই ধরে নেয়ানেয়ি টপকে আমাদের দহরম-মহরম বন্ধুত্ব ঘটে গেল। জগতের আর সকল র‍্যান্ডমনেসের মতই সুন্দর বন্ধুত্ব। ঘুরে বেড়াতাম, রাজ্যের বিষয় নিয়ে তর্ক আর আড্ডা হতো। বেশি হতো ঝগড়াই, তবে একে অপরের ঘাড়ের ওপর কোপ মারতে চাওয়ার আগেই সেটা মিটমাট হয়েও যেত। হয়তো মিটমাট হতো কারণ আমাকে অনীক উন্নাসিক ভাবতো আর আমি তাকে ভাবতাম ফালতু। ঝগড়া জিইয়ে রাখার জন্য সেয়ানে সেয়ানে টক্করটা জরুরি।

সেই পুরানো অনীক আমার সামনে বসে আছে। দুঃখিত, ভুল বললাম পুরানো অনীক না, নতুন অনীক। আগের বোতলে নতুন মদ। হৃষ্টপুষ্ট তেলতেলে অনীক বসে হাসছে। গলায় বেশ চৌকস একটা টাই ঝুলছে। আমি ওকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি - চুল দেখি, নিপাট, আঁচড়ানো। জুলফির কাছে সূক্ষ্ণ রেজরের টান চোখে পড়ে। শার্টটা চকচকে ইস্ত্রি করা, মনে হচ্ছে ব্র্যান্ডের শার্ট। হাতের কব্জিতে ঝিকিয়ে উঠছে রুপালি ঘড়ি। এগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে আমার ঘাড় শিরশির করে। এসির বাতাস হিমশীতল লাগতে থাকে। অনীক কি খেয়াল করে আমার এই নার্ভাসনেস? মনে হয়। ঠোঁট চেপে মিটিমিটি হাসছে! আমিও মিটিমিটি হাসছি। আমাদের বসার ভঙ্গি এক। হুবহু হাত- হুবহু পা- হুবহু চুলের বিন্যাস। আমি অনীকের দিকে তাকিয়ে ভ্রূ নাচাই, চোখ টিপ দেই। অনীকও আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রূ নাচায়, চোখ টিপ দেয়। আমি জিজ্ঞাসা করি, কেমন আছিস? অনীকও আমাকে জিজ্ঞাসা করে, কেমন আছিস? আমি উত্তর দেই না। অনীক উত্তর দেয় না। আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়েই থাকি। তাকিয়েই থাকি। অনীক আমাকে আর উন্নাসিক ভাবে না। আমি অনীককে আর ফালতু ভাবি না।

শুক্রবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১১

একটি বিশেষ সংবিধিবদ্ধ দ্রষ্টব্য

এই গ্রহতে আমাদের অস্তিত্ব যেন অযুত নক্ষত্রচূর্ণের নিরুদ্দেশ উড়ে বেড়ানোর মতো, যেন অযথা অহেতুক। আমাদের ধারণা আমাদের জন্ম, মৃত্যু, ভালোবাসা, প্রেম, যৌনতা, হিংসা, দ্বেষ, বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোনো না কোনো মানে আছে। আছে গূঢ়তর অর্থ, নিজের এবং অপরাপর মানুষের জীবনে। অথচ এ সবই দীর্ঘশ্বাসের টুকরোর সাথে হারিয়ে যাবে মহাশূন্যে। পৃথিবীর ঘূর্ণনের মত, নভোবিশ্বের ধূলিঝড়ের মত এক লহমায় নিশ্চিহ্ন হবে সকল আয়োজন, পরমুহূর্তে খোঁজ করলে কেউই বুঝতেই পারবে না কোনো রঙের হাট কিংবা কোনো মনের মেলা কোথাও বর্তমান ছিল। অনিবার্য হলেও এমন হারানোর নিয়ম নেই - নেই উদার-আগ্রহ কারো। আমাদের হঠাৎ ইচ্ছা করতে পারে সব ছেড়েছুড়ে চলে যাই। ইচ্ছা করতে পারে এই অনিশ্চিত অর্থহীন ক্ষণিক জীবনের কষ্ট মিটিয়ে ফেলি। যা কিছু সঞ্চয়, যা কিছু অপচয় এগুলো ঝেড়ে ফেলি, হিসাব চুকিয়ে দেই।

আমরা জানি যে স্থাবর সম্পত্তির অভিমান নেই। এভাবে সব ত্যাগ করলে শুধু জমানো স্মৃতিই দিশেহারা হবে, ধীরে ধীরে মৃয়মাণ রোদ ঘুমিয়ে যাবে অক্ষিকোটরে। নিশ্চুপ নির্বাক হয়ে যাবে শোরগোল। হয়তো পাততাড়ি গুটিয়ে নেবে প্রকৃতিও; প্রাণ যেখানে নেই, সেখানে কীসের বসত, কীসের মায়া? তখন সেই নিরাক নিস্তব্ধ এলাকায় কোন অনুভব সৃষ্টি হতে পারে? নৈঃশব্দের জন্ম হয় শব্দ ফুরোলে, অন্ধকার জমে জমে থিতু হয় আলোর অভাবে। তেমনই কি অপ্রাকৃতিক কোন অনুভব সৃষ্টি হয় প্রাণহীন ভূমিতে? সেই অভাবনীয় সৃষ্টি কতোটা সুন্দর, কতোটা কুৎসিত, তা আমাদের চিন্তাতেও আসে না। কিন্তু নৈঃশব্দ যেমন সত্য, অন্ধকার যেমন অলঙ্ঘনীয়, তেমনি এই অপ্রকৃতিও প্রাকৃতিক। এই অনুভবের অস্তিত্ব জানান দেয় সন্তর্পণে, খুব সচেতন খেয়াল না থাকলে তা টের পাওয়া দুষ্কর!

নিভু নিভু হয়ে আসছে মোমবাতির আলো। শাদা হলুদাভ একাকী মোমবাতিটার দিকে থির চোখে তাকিয়ে আছে সে। তার চোখের তারায় আগুনের প্রকম্প শিখাটি প্রতিফলিত হচ্ছে। স্ফটিকের মত স্বচ্ছ টলটলে চোখ, উত্তল ভূমিতে পিছলে যাচ্ছে রশ্মিকণা। মোমবাতিটি জানে না, তার আলোর কণায় খুব অল্প জায়গাই আলোকিত হচ্ছে। আর ক্রমশ রশ্মির তেজ কমে আসছে, তার শরীরে আর জমাট মোম বেশি বাকি নেই। সলতের প্রান্তে যে নীলাভ-হলুদ শিখা, সহসাই তা ঝলসে উঠলো যেন। অন্তত তাকিয়ে থাকা চোখ দুটোয় আমরা স্পষ্ট দেখতে পেলাম - নিষ্পলক একাগ্রতায় কোনো কাঁপন নেই, ওই মোমের শিখা আর ওই স্ফটিকস্বচ্ছ দৃষ্টির মাঝে যেন এক টানটান লড়াই! যেহেতু তার দৃষ্টি কাঁপছে না, তাই মোম-শিখাটাই যে হেরে যাচ্ছে, এ সিদ্ধান্তে সহজেই পৌঁছানো যায়। কিন্তু হেরে যাবার আগেও যোদ্ধার শিরায় রক্ত নাচে, খরস্রোতার তোড়ে যে শক্তি, তেমনই তোড়ে জেগে ওঠে বীরক্রম। জেগে ওঠে শেষ আঘাতের সঘন শ্লেষ, মনে এসে ভর করে অসুরিক জিঘাংসা। তাই সে ঝলসে ওঠে, ক্ষেপে ওঠে। মনে হয় সে এক ঝটকায় উড়িয়ে দিতে চাইছে প্রতিপক্ষকে। প্রতিপক্ষ সে, যার চোখ স্ফটিকের মত স্বচ্ছ, তার চোখের তারায় ঝিলমিল করছে মোমালো, সে প্রায় জিতে যাচ্ছিল। অথচ খুব অবহেলায় সে চোখ সরিয়ে নিল। মোমের আলোটুকু নিভে যাবার আগেই আলতো পলক ফেলে সে অন্যদিকে তাকালো। যেন এই যুদ্ধে তার কোনো মন নেই, যেন এ কেবল মিছে খেলা, নিরর্থক ভ্রান্তি! তার এই নিস্পৃহতায় মোমের আলোটুকু বিস্মিত হয়, কিছুটা আহতও হয় এমন অনাগ্রহে। যে প্রাণপণ সংগ্রামে তার শরীর ক্ষয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে, সেটা প্রতিপক্ষের কাছে কিছুই না? এতোটাই তুচ্ছ তার লড়াই, এতোটাই অনর্থক তার অস্তিত্ব?

চোখের ফিরিয়ে নেয়া দৃষ্টির রেখা এখন মোমালোর বলয় থেকে অনেক দূরে, সুদূরতম ঘরের দিকে ফিরে আছে। চোখটি অদ্ভুত, অপ্রাকৃতিক তার আচরণ। প্রায়ই সে নিষ্পলক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সাধারণত চোখগুলো যেমন হয়, যেভাবে তারা যোগাযোগ করে, যেভাবে বার্তাবহন করে, অনুভুতিলাভ করে, কাঁদে, কিংবা রাগে, এই চোখ দুটো তেমন নয়। এর চরিত্রে কোন অস্থিরতা নেই। আদিম ও অকৃত্রিম স্থৈর্যে সে তাকিয়ে থাকছে। এখন যেমন মোমের আলোর প্রতি তার আর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, এক অবিচলতায় তার দৃষ্টি চলে গেছে একটি ঘরের দিকে। ঘরটি দক্ষিণে, পানির ওপর ভাসছে। স্রোতের টানে ঘরের খড়ের চাল কেঁপে কেঁপে ওঠে। যে ঢেউগুলোর ওপর ঘরটি ভাসছে, সেগুলো অপত্যস্নেহে দুই হাতে যেন তাকে ধরে আছে। ছোট্ট শিশুকে যেমন কোলে তুলে আলতো দোলায় দোল দেয় মা, ঠিক তেমনি করে লহরের শীর্ষে দুলছে ঘর। ঘরের মেঝে কাদা মাটি পানিস্পর্শে আঠালো প্যাচপ্যাচে। গলে গলে মিশে যাচ্ছে নোনা পানিতে। মোমের মতই এই ঘরের জীবন স্বল্পায়ু। প্রবল পরাক্রমী নোনাজল তাকে খেয়ে ফেলবে। চোখ দুটো যেদিকে তাকায়, খালি ক্ষয়ে যাওয়া জীবন ও জড়ের প্রাচীর দেখে। এই প্রাচীর তার চারপাশে বৃত্তাকারে ঘিরে থাকে। গোল অক্ষিগোলক ঘুরিয়ে এটুকুই দেখা যায়, উর্ধ্ব-অধঃ-ঈশান-নৈঋত দশ দশ দিকে সন্তর্পণে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে চোখ। পাপড়ি খুলে আসে এমন মূলভেদী ঘূর্ণির টানে। ছেঁড়া পরিত্যক্ত ইলাস্টিকের মত পড়ে থাকে নিচে।

এতোটা নিচে চোখের দৃষ্টি সরে না, তাই সে বিচ্ছিন্ন পাঁপড়ির শোক ভুলে যায়। যে অংশ গত হবার চেতনা নেই, সে অংশ কখনো ছিল না। সে অংশের বিভিন্ন বিকৃতি ও আকৃতি পাওয়া যায়, কারণ তার সঠিক আকার সে জানেই না। অধুনাবিস্মৃত এই পাঁপড়ির অনৈস্তিত্বে বিশ্বাস করতে করতে চোখ ক্রমাগত ঘুরতেই থাকে। তার ত্বরণে মোমের শরীরের লুপ্তি চকিতেই বর্তমান; তার ঘূর্ণিবেগের ঝটকায় অতিকায় ঘরটি পানিমধ্যে লীন। পারিপার্শ্ব-ক্ষয়ে অবিচল নিস্পৃহতায় চোখ ঘুরছে। এই গতির উদ্দেশ্য নেই। এই গতির কারণ নেই। এই গতি ধীরে ধীরে ক্রমশ বেড়েছে, নিষ্কারণ তার প্রসার। তাই অগোচরে অক্ষিগতির রোধ করে নি সে কিংবা অন্য কেউ! বিশ্ব চরাচরের সকল বস্তু ও পরমশূন্যতা একদিন বিলুপ্ত হয়। চরাচর নামক কোন কিছুর অস্তিত্বই আর থাকে না। চোখের তারায় তখন এক অপ্রাকৃতিক নৃত্য স্থাপিত হয় নৃশংসসুন্দর ছন্দে!

মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ, ২০১১

একটি প্রস্তাবনা -

Epigraph
ঝিনুক নীরবে সহো ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভিতরে বিষের বালি মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও

Prologue
কবিতার সঙ্গে সম্পর্ক প্রাক্তন-মোহের মতো হয়ে গ্যাছে। ক্রমাগত জীবন যাপনের ক্লেদ ও ক্লেশ কবিতাশূন্য করে দিয়েছে। শুনেছি উদ্দীপনা উপকারী, কিন্তু যদি সকল সময় উদ্দীপ্ত থাকতে হয়, তাহলে সে বড়ো ক্লান্তিকর। স্নায়ু-বৈকলন অবশ্যম্ভাবী। যতোটা বুঝি, আশেপাশের ক্রমাগত পীড়নে সেদিকে স্নোবলের মতো এগিয়ে যাচ্ছি।

গতি ক্রমশ বাড়ছে,
পথের বাধা দেয়ার মতো গাছ-পাতা-বন খড়কুটোসম উড়ে যাচ্ছে,
আমি ক্রমশ স্নায়ু-শক্তিতে প্রকাণ্ড হচ্ছি,
অতি নিচে,
অতি-নিম্ন-নিচে দেখতে পাই খাঁড়ির জল মেলে ধরে হা করে আছে সমুদ্র,
আমাকে গিলে খাওয়ার আনন্দে সে চকচক করছে,
ফেনায়িত করে তুলছে গালের কষ!

এটাও বুঝতে পারছি পতনের সাথে সাথে গলন শুরু হবে আমার। স্নায়ু ও মস্তিষ্ক এই পতন বা গলন ঠেকাতে পারবে না। ন্যূনতম ফাঁক-ফোকর খুঁজছি। পথ বেঁকে অন্য কোথাও আশ্রয় খুঁজছি। শব্দহীন হয়ে ওঠার অভিশপ্ত আবশ্যিক পতন ও গলন ভয়ঙ্কর!

হঠাৎ একটি ঢাল। এক টুকরো চড়াই। উতরাতে গিয়ে মনে হলো আশা পেলাম... মনের বদভ্যাসে আশায় বুক বাঁধি...
Manifesto
মোমালোর শরীর কোমলে কঠিন,
তবুও স্ফূটিত কম্পনে অবয়ব কায়াহীন
লঘুচালে অতীব্র-আবেশে ক্রমকম্প শরীর নরোম
নিভে গেছে সকল ক্ষুধা; অস্থিরতা, নির্ব্যাপী শোক


গলিত জমাট মোমের মতোই জমাট হয়েছে
ধমনীজ নদী, ভরাট হয়ে গেছে কাপুরুষ মেরু
কশেরুকা অনিশ্চিত, ভেঙে যেতে দেখেছি
অস্থিগত আগুনে-লাল অপ্রিয়তম ঋজুতা


শঙ্কাহীনের চোখে দেখি গাঢ় বিদায়ের ঘোর
এ গহ্বর তোমার - আমাদের যাবতীয় জীবন, গহ্বর
অভেদ দেখি না এখানে, প্রতিদিন ঘাসের মতোই
অবিকল্যে বদলে যাচ্ছে পুরোনো কথার পাতা।



Epilogue
নেমেছি অজান্তে অতল অকূলে অনিঃশেষ ঘৃণা শুধু তোমার জন্যে, হে অচল অকাট্য নিস্পৃহতা!

বুধবার, ৯ মার্চ, ২০১১

পদার্থের ভান

প্রচণ্ড শব্দের গতি, তারচেয়েও প্রচণ্ড আলোকের বেগ। পদার্থবিদ্যায় পড়েছিলাম, শব্দ ও আলোক শক্তির দুই রূপ। মানব পদার্থ কেবল, ভেতরে অণুপরমাণু তিলে তিলে রক্ত-মাংস গড়ে তুলেছে। শক্তির কাছে পদার্থের হার নিশ্চিত, তাই শব্দে আমাদের ধাক্কা লাগে, আলোকে আমরা পুড়ে পুড়ে যাই!

দুপুর রৌদ্রের রশ্মিগুলো তীব্রতায় একে অপরের সাথে মিশে যায়, খালি চোখে তাকালে গতি-দ্রুততায় আমার ধাঁধা লাগে, বুঝতে পারি না ঠিক কী দেখছি, কেমন দেখছি। রশ্মিগুলো ঠিকরে ঠিকরে চোখের ভেতর সেঁধিয়ে যেতে থাকে আর অনূদিত হতে থাকে যাবতীয় দৃশ্য, পাখি ও বৃক্ষ, রাজপথ ও রাজন্যের শাসন। প্রাচীন শহরে বাস করি, শহর নিজস্ব সময়ে প্রাচীনতার ওপর চাকচিক্যময় প্রলেপ দিয়েছে, সেসব আমাকে প্রতিমুহূর্তে বোকা বানায়। আমি বেকুব থেকে বেকুবতর হই। আপাত-নবীন প্রাণে-প্রাচীন শহরে প্রাগৈতিহাসিক যানে চলাচল করি। যানচালকের লুঙ্গি ও গেঞ্জি কালো শরীরে কালো ঘামে সেঁটে আছে। শরীরের ভেতরে সাপের মতো কিলবিলে পেশী ও ক্ষুধা, আমার সাথে তার লেনদেন রফা হয়েছে দশ টাকা। দশমুদ্রার বিনিময়ে তার কয়েকশো বিন্দু ঘাম ও কয়েক হাজার কিলোক্যালোরি এটিপি কিনে নিয়েছি। রিকশা টানছিলো সে, প্রবল ক্লেশে, দশ মুদ্রার উজান-টানে। ঝাঁঝালো রৌদ্রের তীর পিঠে বিঁধতে বিঁধতে সে ও আমি এগুতে থাকি। আমাদের মাঝে উলম্ব ঝুলছে কতোগুলো প্রথাগত শ্রেণীর সিঁড়ি। সিঁড়িটি তার পিছনদিকে, সেদিকে তার খেয়াল নেই। সিঁড়িটি আমার সামনে, তবে আগ্রহ নেই পেরুনোর।

এই একঘেঁয়ে দৃশ্যটি কেন বর্ণনা করছি? কেন খোল-নলচে খুলে ফেলছি এই দায়সারা যাপনের? কেন চেষ্টা করছি মুহূর্তের ভাঁজের ভেতরের মুক্তোকে তুলে আনার? এরকম আটপৌরে বর্ণন কে শুনেছে কবে? আমারও তো জানা ছিলো না, এই মুহূর্তের পিঠে এক অভূতঘটন ঘটে যাবে। যে ঘটনার সাথে আমি বা সে জুড়ে যাবো না; আবার ভেবে দেখি যে আমি ও সে জুড়ে গেছি নিরুপায়! আমরা উত্তরদিকে যাচ্ছিলাম, ডান গালে হেলে পড়া সূর্যরশ্মির তোড়ে ভাসতে ভাসতে। আমাদের উল্টোদিকের রাস্তাটি ফাঁকা ছিলো, সেখানে কেউ ছিলো না কেবল শব্দহীনতা ও আলোক প্রাচুর্য। আলোর বেগেই এক দ্রুতযান ছুটে এলো। গতিময় দ্বিচক্রযান। মোটা মোটা টায়ারের মোটর বাইক গোঁ গোঁ করে ছুটে যাচ্ছিলো চোখের পলকে। তবু তা একঘেঁয়ে, তবু তার মধ্যে কোন উদ্দীপনা নেই। আমি বা সে কেউই তাকাই নি সে'দিকে। আমাদের পথ ছিলো উত্তরমুখী।

বিকট শব্দের চুম্বক আমাদের টেনে নিলো। প্রকাণ্ড বাজ পড়েছে খালি রাস্তায়। বাতাসের পর্দা ফ্যাড়ফ্যাড় করে চিরে ফেলেছে কেউ। ল্যাতপ্যাত করছে ভাঙা মোটর বাইক। সামনে ছিটকে চলে গেছে অশ্বারোহীর হেলমেটটি। অশ্বারোহী মোটরবাইক থেকে কিছুটা পিছনে। রাস্তার গায়ে এক জ্বালামুখ, আগ্নেয়গিরিসম ফুলকি দেখলাম সেখানে গনগনে ফুটছে। অশ্বারোহীর ছিন্নমুখ, খিন্নচোয়াল, সেখানে কটকট করে তড়পাচ্ছে। আমার ও চালকের প্রবল বমিতে উত্তরমুখী রাস্তাটি ভেসে ভেসে যেতে থাকলো। পদার্থের ভেতর থেকে দুইমুখা রাস্তায় গলগল করে বেরিয়ে আসছে শব্দ ও আলোকরশ্মিময় শক্তি... শক্তি!...

বৃহস্পতিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

মন্তাজ

মাঝে মাঝে এক দুই লাইন কবিতার মতো ভালোবাসার মতো শব্দের পুঞ্জ শান্ত পুকুরে ঘাই মেরে ওঠে, নিস্তরঙ্গে ওঠে ঢেউয়ের স্রোত, ছায়া ছায়া পাড়ে বসে নিজের ভেতরে সেই ঢেউগুলো একটু একটু করে তীরে ভিড়তে থাকে, চুপচাপ দেখি।

এই কবিতার মতো ভালোবাসার মতো পংক্তি কেনই বা জন্মায়, কেনই বা জ্বালায়। সবটুকু গুছিয়েও রাখতে পারি না, আমি বড়োই নিরুপায় অগোছালো। মেঘের মতো সঞ্চয়িতা হতে পারবো না, জেনে গেছি অনেক আগেই, স্কুল পালানোর বেলায় ভয়ে ভয়ে কুড়িয়ে নিয়েছি দুয়েক পশলা বৃষ্টি।

---

নতুন গল্প লিখছি রোজ, রোজ ক্লান্তিহীন নতুন প্রেমে পড়ছি, প্রেমে পড়তে পড়তেই আরো গভীরে ডুবছি। কিছু কিছু ঘটনা ছুঁয়ে যাচ্ছে, কিছু কিছু কথা মনেও থাকছে না। যেন ভেলায় ভেসেছি, নিরন্তর অকূল জলের কোলাহল চারপাশে। যেন তুমুল ব্যস্ত ট্রাফিকে দাঁড়িয়ে আছে, চারপাশ থেকে ছুটে আসছে টেরিফিক ট্রাক, বিবমিষা বাস। ছুটে পালাতে ইচ্ছা করে, অথচ স্থানুর মতোই নিশ্চল হয়ে গতিময়ের প্রেমে মজে গেছি।

এখানে হঠাৎ করেই কিছু বদলে যাবে না। পৃথিবীর সকল আহ্নিক গতির কোন মূল্য এখানে নেই। সবই শান্ত সমাহিত ও ধীর প্রক্রিয়ায় চলবে আরো অনন্তকাল, ঘুরে ফিরে একই সুর গাঁথবে সকলে, একই প্রেমে একে একে মারা যাবো তুমি আমি আমরা। অকস্মাতের অনুপস্থিতিতে আমাদের মাঝে ঘন হয়ে থাকবে ধ্রুবক, নক্ষত্রের আলো, সদ্যই কেউ হারিয়ে যাবে না। বরং অনেক অনেক মায়ায় জড়িয়ে থাকবে আশে পাশে আঁশে পাঁশে

---

ছেলেটি মেয়েটির কথা আর কতো বলবো। তোমরা সবাই জেনে গেছো নানাভাবে। ছেলেটির কোন সহায় ছিলো না, যে বড়ো ছেলেমানুষের মতো ভালোবাসতো। বাস্তবতার ধাক্কা তার গায়েই লাগতো না। সে একদম বোকা বোকা ছিলো। কতো কিছু হতে পারতো সে, বড়ো গায়ক, বড়ো নায়ক, বড়ো ডাক্তার কিংবা ব্যবসায়ী। মেয়েটা তো তেমন ছিলো না, বরং অনেকটাই বিপরীত। মেয়েটা খুব কর্মঠ আর অমিশুক ছিলো। অনেক কাজ করতো, নিজেকে প্রমাণের জন্য, জগতের সাথে যুদ্ধ করতো। ছোট ছোট দুইহাতে শক্ত করে জোয়াল ঠেলে বেড়ে উঠছিলো।

ছেলেটির সাথে মেয়েটির কিছুই মিলছে না। তারপরও তাদের মিলে গেলো। ছেলেটাও বদলে গেলো, মেয়েটাও বদলে গেলো। তারা হুট করে প্রেমে মজে গেলো। কী দেখেছিলো মেয়েটির চোখের তারায়, কী গন্ধ পেয়েছিলো ঘন অবিন্যস্ত চুলের গভীরে, ছেলেটা কাঙালের মতো দু'হাত বাড়িয়ে দিলো। মেয়েটিও কী জাদু দেখেছিলো ছেলেটির হাসিতে, কোথায় দুয়েকটা তারা-খসা আলো চলকে গেছে আকাশের পেয়ালা থেকে। তারা বুঝতেও পারলো না।

সেই বোকা বোকা ছেলেটি, সেই ছোটোখাটো মেয়েটি কোনোদিন এক হবে না। তাদের ভেতরে কোন শিশু জন্মাবে না। তাদের ভেতরের ভালোবাসাটুকু থির জমে থাকবে পদ্মপাতার জল হয়ে। তারপর, অনেক অনেক দিন পর, একদিন পৃথিবীর ঘূর্ণনে তারা ছিটকে ছিটকে হারিয়ে যাবে। তাদের সাথে ঘূর্ণিতে হারাবে চোখের জল, মনের হাহাকার। খালি করে দেয়া কফির টেবিল, গ্লাসের গায়ে দুয়েক ফোঁটা শিশিরও মুছে যাবে। তাদের জন্য আমার মন হু হু করবে, চোখে টলটলে দুয়েক ফোঁটা কুয়াশা জমা হবে। শাদা ক্যানভাস ফেলে আমি একলা হয়ে উঠে যাবো।

রবিবার, ১৮ জুলাই, ২০১০

আলো অন্ধকারে যাই...

না হয় আমি তুচ্ছ আর তুমি গুরুত্বপূর্ণ, তা বলে কি আমার হৃদয় নেই? হৃদয় কোথায় থাকে তা তো তুমিও জানো না। যদি বলো আমার হৃদয় নেই, তাহলে তোমারও হৃদয় নেই। তোমার কেবল একটা হৃৎপিণ্ড আছে যা খালি ধুকপুক ধুকপুক করে রক্ত পাম্প করছে; বিরতিহীন। সে জানেও না তোমার হাতের একটু ছোঁয়ার জন্যে আমি কতোটা কাতর।

সেই স্পর্শ হঠাৎ অঘটনে পেয়ে গেলে আমার ভেতরে কী তোলপাড় হয়! মনে হয় টেবিল চেয়ার বাবদ এই বাস্তব চরাচর দুমড়ে মুচড়ে উঠছে কাগজের মতো। কেউ নির্বিকার আমার জগতটা কুড়ানো কাগজের মতো ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে। তুমি যখন না বুঝেই হেসে ফেলো আমাকে দেখে, যখন আমি তোমার হুটহাট তীব্র কথার জবাব দিতে পারি না, থতমত খাবি খেতে থাকি- তখন তোমার ঐ শাদা দাঁতের হাসি দেখা যায়।

তুমি অবিরাম হাসো আর দাঁতের কামড়ে খুঁড়ে ফেলো আমার শরীর। উড়িয়ে দিতে পারো, কিন্তু আমি সত্যিই টের পাই এই বেদনাবোধ। আমি টের পাই তুমি কীভাবে আমার ভেতরে ভাঙচুর করছো আর আমি হাসিমুখে তোমার দিকে চেয়ে আছি। একটা পলকের জন্যেও বুঝতে দিচ্ছি না আমি কতোটা ফুরিয়ে গেছি। তুমি একটু পরে বিরক্ত হয়ে গেলে, আমার চাহনি আর তোমার ভালো লাগছে না। তোমার দমবন্ধ লাগছে তাই তুমি জানালা খুলে দিলে। তিনতলার জানলা হাট করে খুলতেই দমকা বাতাস উড়ে এলো।

নিচের রাস্তায় দুয়েকটা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো- যাদের দেখে তুমি স্মিত হাসলে।

তুমি কি জানো তোমার ঐ এক চিলতে স্মিত হাসির কতোটা কাঙাল আমি? আমি একটু পেছন থেকে দেখলাম তোমার চোখের রঙ বদলে যাচ্ছে। মেয়েদের ওড়নার রঙে ঘোলা হয়ে উঠছে মণি। তুমি বারকয়েক পলক ফেলতেই দেখলাম তুমি নেই! উদামখোল জানালা গলে চলে গেছে ওড়নার ভাঁজে। তোমার ঐ খিলখিলে মেয়েগুলোকে ভালো লাগে। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে দেখি দুটো মেয়ে হাঁটছে আর তুমি তাদের দিকে মুগ্ধনয়নে তাকিয়ে চলে যাচ্ছো।

আমার সামনে জানালা খোলা। আমার সামনে তুমি নেই।

আমার সামনে ঘোলাটে চোখ নেই। হাসির ছুরি নেই। ঝকঝকে শাদা দাঁতগুলো আমাকে আর কাটছে না। তোমার মাথায় যে এলোমেলো মেঘ ভেসে বেড়াতো, সেটাও এখন অনেক দূরে ঐ আকাশে উড়ে যাচ্ছে। আমার হঠাৎ খুব সাধ হলো, জানো? আমি তো ঐ মেয়েগুলোর ওড়নাকে ভালোবাসি না, কখনো বাসি নাই। আমি খালি তোমার কাঙাল হয়ে গেছি বহুদিন ধরে। আমি খালি তোমাকেই দেখি, তুমি মাঝে মাঝে আমাকে ছুঁয়ে দিলে আমি বারবার মারা যাই। আজ হঠাৎ কী যে হলো? আমার খুব মরতে ইচ্ছা হলো। আমি বারবার তোমার হাতে মরতে চাই না আর। আমার ক্লান্ত লাগে।

আমার তো আর কেউ নাই। আমার মতো আর কেউ নাই। তুমিও আমার নও, আমার মতো নও।

আমি কেবলই আমার মতো, আর আমি জানি এই কথাটা তুমি জানো না। তাই আমি আজকে অনেক ক্লান্ত হয়ে গেলাম। জানালাটা হাট করে খোলা, আমি সেটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। জানালা বললো, "তুমি কেমন আছো ছেলে?" আমি বললাম, "আমি ভালো আছি, জানালামনি।" তোমার মাথার চুলের মতো মেঘগুলো ভাসতে ভাসতে লাফাতে লাফাতে হঠাৎ থমকে গেলো আমার এই মিথ্যা শুনে। তারা ভীষণ অবাক! বললো, "তুমি তো ভালো নেই ছেলে। তুমি বার বার মরে যাচ্ছো। তোমার শরীরে ঐ ছেলেটার দাঁতের দাগ দেখতে পাচ্ছি আমরা।" আমি হঠাৎ হেসে ফেলি, এতো দুখেও ফিক করে বলি, "বোকা মেঘ, তোমরা জানো না শরীরে কেন দাগ পড়ে। তোমাদের শরীরে কেউ দাগ ফেলে না। এই দাগগুলো আমি ভালোবাসি। বুঝলে?" মেঘগুলো মাথা নেড়ে চলে গেলো। আর জানালাটাও চুপ করে কী কী যেন ভাবছিলো। আমি হেসে বললাম, "আমাকে নিয়ে এতো ভেবো না জানালামনি।" ফিসফিস করে বললাম, "আমি ভালো আছি। আমি ভালো আছি।"

আমি খুব তুচ্ছ আর আমার একটা হৃদয় আছে। সেটা কিচ্ছু শেখে নি, সেটা কেবল তোমাকে চায়। তুমি তা জানো না। তুমি জানলেও আমাকে চাইতে না। আমি খুব তুচ্ছ।

রবিবার, ২৮ মার্চ, ২০১০

অ-প্রাকৃতিক

[যা ভাবি, যা দেখি, তারে নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছা করে। এর সাথে বালক বয়সের খেলনা নিয়ে অবিমৃশ্যতার মিল আছে। খেলনা ভেঙে গেলে কান্না পেতো, কিছু করার থাকতো না। এখনও মাঝে মাঝে নাড়াচাড়ার ইচ্ছাবশে চারপাশের দৃশ্য ও ঘটনা ভেঙে যায়। দেখি কিছুই নির্মিত হয় না। আবার বাতাসের মতো অবয়বহীনতার এই জগতে কোনটা নির্মাণ কোনটা বিনির্মাণ সে ধন্দও ব্যাপক!]




মাঝে মাঝে জোনাকদের আলোচনায় হুটহাট কবিতা উঠে আসে। এই ঘটনা আপেলপতনের মতো কুটিল হতে পারে, তবুও সেটা ঘটে যায় অনিবার্যতায়।


তো, জোনাকদের আলোচনায় চা-সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে কবিতা উঠে আসে।
এমন না যে কবিতা কোন অবয়বহীন ধারণা, জোনাকদের কাছে তা পুরোপুরি মিশ্ররূপীঃ নারীর মদির নাভির মতোই আকর্ষণীয়, (এবং ক্ষমাহীন সেই মেদাঞ্চল এতো অযুত যোজন দূরে বলে) অদ্ভুত কষ্টকর। যুগপৎ আকর্ষণ ও যাতনা আদায়ের কবিতা জায়গা করে নেয়- তুচ্ছ জোনাকেরা সেই কৃষকের মতো শক্তিশালীও নয় আর সর্বগ্রাসী নদীভাঙনে কৃষকের কিছুই করার থাকে না।


মাঝে মাঝে হুট করে আসা কবিতা আবার হুট করেই চলে যায়, তখন মিটমিটে আলোর সলতে আর কয়েলের লাল চোখ মিশে যেতে থাকে।


দেখা যাক, ঠিক সেই সময় আমরা একটি মুহূর্তকে বাছাই করি দৈবচয়ন পদ্ধতিতে। তারপরে বিশ্ব-চরাচর থামিয়ে দিয়ে সেই মুহূর্তের ভেতরে ঢুকে যাই। আসুন, মুহূর্তটিকে ভালোবাসার চেষ্টা করি, নিদেনপক্ষে তার সাথে কিছুটা যোগাযোগ, কিছুটা ছল- অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের ঢং করি।


মুহূর্তের মাঝখানে কয়েকটি মশা উড়ছে। এই এক মুহূর্তেই তারা কয়েকশ’ বার পাখা ঝাপটে ফেলছে, ঠোঁট চাটছে, পুঞ্জাক্ষি জুড়ে আলোকস্বল্পতা মাপছে।


মুহূর্তেই চায়ের কাপ থেকে দুই জুল তাপ উড়ে গেলো জোনাকদের মাথার ওপর দিয়ে, যাবার সময় কারো কারো চুলে হালকা ছোঁয়াচ…


মুহূর্তের মধ্যেই চায়ের দোকানের লোকটির ঘুম ঘুম চোখ প্রায় মুদে এলো শ্রান্তিতে, “আজকের উৎকট খদ্দেরগুলো সাপ্তাহিক নিয়মে ফিরে ফিরে আসছে, মাত্র একশ তিরিশ টাকায় দুটো বেঞ্চ আর কয়েকশ একর জমি আটকে রাখছে পুরা একবিংশ শতক” -এমন টুকরো টুকরো মৌলিকচিন্তা তার নিউরনে খেলছে বিদ্যুচ্চমকের মতোন।
মুহূর্তের মধ্যেই রাস্তার ঘোলা আলোর উৎসটি জোনাকদের পেরিয়ে গেলো। আলোটি আসার আগে বা পরে তারা কেউ খেয়াল করে নি। তবু অনেক ওপর থেকে কিছু অয়ন বায়ু গুমোট গ্রীষ্মকে পাত্তা না দিয়ে দেখলো তার শরীরে কয়েল ও চা-সিগারেটের তকমা মাখা কিছু ধোঁয়া এসে সাঁটিয়ে চুমু খাচ্ছে!

সোমবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০০৯

টেবিলিক

ভাঁজ করা কাগজের ভেতরে একটা বিয়ের নেমন্তন্ন লুকিয়ে আছে, চারভাঁজি কাগজে ভাঁজে ভাঁজে বর, কনে, ও তাদের পিতামাতাগণ গা মিশিয়ে শুয়ে আছেন চিড়েচ্যাপ্টা। তাদের পাশেই, কাগজের গায়ে জমছে ধুলো, গত বছরের নেমন্তন্নের চিঠিটা ফেলা হয়নি! একটু দূরে রঙহীন তরল বিষ নিয়ে অ্যারোসলের ধাতবে ঢুকে যাচ্ছি আমি। বিন্দু বিন্দু বিষ, বাতাসে! ঝুম ঝুম ঝুমকার মত ঝুলছে, বাজছে। মুখোমুখি পড়ে আছে রুপালি ঘড়ির শরীর, জড়াজড়ি করছে তার সাথে আমার চাবির গোছা। গোছায় চারটা চাবি- পুরনো হতে হতে কালচে কালচে রঙ তাদের… একটা তোমার চাবি, তোমার ভেতরের গলিঘুপচিতে যাতে না হারাই সেই সংকেত লেখা আছে মোহন রূপেই। আরেকটা চাবিতে খোলে কালোগহ্বর যতো, আমাদের শরীরের মাঝে।


দূরে দেখি মোলায়েম মানিব্যাগখানা পেটমোটা হয়েছে অনেক! পেটের ভেতরে তোমাদের খসখসে ঠিকানাসকল। খাজাঞ্চিখানার নোটগুলোও চকচকে আজকাল, ইদানিং আমি শক্ত একটা কার্ড ঢুকিয়ে দেই তার পেটের ভেতরে আর কড়কড়ে নোটগুলো বেরিয়ে আসে। আজব যন্ত্র এক- শরীরে ধারণ করছে অর্থবিষ, শুনেছি মুদ্রাও তরলিত ক্রমশ!…
আরো আছে মুখ উঁচিয়ে থাকা গোলমুখো ওয়েবক্যাম-জালচোখ! গোলাপি মন্থর আলো জ্বেলে আমাকে দেখছে নিনির্মেখ। আমিও তাকে দেখি, রূপসী গোল চোখের মাঝে তার কোনো তাড়না নেই। ঘোর আছে, নিস্পৃহ ক্লান্তিহীন ঘোরে ফেলা চোখ তার তোমার চোখের চেয়ে অল্প একটু অসুন্দর…


ঝনঝনিয়ে বাজছে সেলফোন, কোষে কোষে তীব্র শিহরণ উঠে গেছে দুদ্দাড় তোড়ে জেগে উঠছে চরাচর। আমি ভাঙছি বাতাস ও নিদ্রার জোট। আলো! ওহ! আহ! চুরমার!

মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ২০০৯

এসিড

অবিশ্রাম, অবিরাম কোলাহল সমূহ খুব কোমল ফুলের মতো রন্ধ্রবাসী হয়েছে আমার, তারপরে আমি ভুলে গেছি কবে যেনো সেই ফুলগুলো গজিয়ে গেছে শরীরে, ত্বকের বদলে আমি কিছু কোলাহল-ফুল নিয়ে ঘুরি। আমি পথে বেরুলেই সকলে এসে হাসিমুখে ফুলগুলো তুলে নিয়ে যায়, সেসব ফুলের সৌরভ, কোলাহল-সুর, চিৎকার ও তীক্ষ্ণ ক্রন্দন আমার চারপাশে ঘুরতে থাকে, নাচতে থাকে। আমাকে ছেড়ে যেতে তাদের অনেক কষ্ট হয় বোধহয়। আমি খালি আমাকে নিয়েই ভাবি, এই ফুলগুলোর কষ্ট বুঝে ওঠার কোনো চেষ্টা করি না। মাঝে মাঝে, যখন রাত হয়ে আসে চরাচরে, সেখানে আলো থাকে না, ছায়ার মাঝে অজানা মানুষেরা লুকিয়ে থাকে-- পাগল ও উদভ্রান্ত মানুষের সারি সারি স্রোত দেখা যায়, সেইসব রূপকথা-কালে, আমি বাইরে বেরুলে সেই ফুলগুলো হারিয়ে ফেলি। পথের ঠিকানা জানি না সেই পথের। তাই ফিরে গিয়ে প্রিয় সরব ফুলের মৃতশরীর কবর দেয়া হয় না আমার। তারা অনেক দূরের সেই গুপ্তপথে একা একা শুয়ে থাকে; আমি জানি।


তারপরে আবারও অসময়ে নতুন ত্বকে জন্মায় অজস্র কাঁটাহীন পুষ্প, অপরূপ বিষধর আপেল। হলুদ আপেলে লেখা থাকে প্রণয় ও পাপের ইতিহাস, সেখানে আমার নামও দেখি, চোখে পড়ে। দীর্ঘতালিকায় এই নামটিই জ্বলজ্বলে! তারপরে তালিকা থেকে সারি সারি অক্ষরগুলো গড়িয়ে পড়ে... ভারি বিউটেন! খবরে দেখায়, ভূগর্ভের যোনি থেকে তেল ওঠাতে লকলক করছে তাদের জিব। জোরালো জিবে তারা ক্রমাগত খুঁড়ছে, পুলক হবেই জানি আমরা, নিস্পৃহচোখে দেখছি প্রকাণ্ড ব্লো-জব। ভূখণ্ড জুড়ে অজস্র বেতার শীৎকার ভালো লাগে আমার। এই ঐতিহাসিক সময়ে আমি আর তুমি আর বাকি তোমরা সকলে বেঁচে আছি -- এই অস্বাভাবিক চিন্তা আমারকে সেই আকাঙ্ক্ষিত পুলকটি পাইয়ে দেয়!


তারপরেও গল্প চলে, সূর্যহীন দুপুর যেমন মেঘমাখা ঘুম নিয়ে আসে, অন্ধকার নিভৃত নিদ্রায় ঢলে পড়ার আগে পুরনো স্মৃতি ফিরে আসে। ক্যাওস ও এনার্কি হাত ধরাধরি করে চলুক, আমাদের কাঁথার বুননের বাইরে ফুটে থাক কোলাহল-ফুলের দুরন্ত বিস্তৃত বাগান। সেখানে রূপকথা-পুরুষেরা নিষ্কাম জড়িয়ে ধরেছে সাপের শরীর, প্যাঁচানো সাপের মতো শরীর নিয়ে সুকন্যারা রূপকথার পৃষ্ঠায় ছাপা হয়ে গেছে। তারপরে অক্ষরের গ্রীবায় তাদের কাহিনী পড়ে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি, এমনি এমনি। এই সকল কোলাহল ধ্রুবক জেনে আমরা জেগে উঠি- ঠুঁটো জগন্নাথের মতোন!

বুধবার, ২৪ জুন, ২০০৯

স্নানক্লান্তি


পানির ফোয়ারা মুখ থেকে অনর্গল সাপের মতো ফোটায় ফোটায় পানি ছুটে আসছে। প্রথমে তারা উচ্ছ্বাসে ঝাপটা দিল আমার কপালে, ঈষৎ নিচু করে রাখা মুখে দ্রুত গড়িয়ে নামল তারা, সদলবলে, সোল্লাসে। চোখের পাতা কেঁপে উঠলো কিছুটা, পানিবিন্দুর ভারে আবেশে বুঁজে এলো। পানির রথের সেদিকে খেয়াল নেই, দুর্দান্ত দাপটে সে গাল, চিবুক, ঠোঁট, থুতনি পেরিয়ে গেল অনায়াসেই। তারপরে কেউ কেউ ঝরে গেল সুদূর টাইল্‌সে। মহাপতন! কেউ কেউ সেই ঊর্ধ্বমুখী চলনে গড়িয়ে গেল গলায়, গোপনে-


গোপন সুখের মত আমি চোখ বুঁজেই থাকি। পানির অবিশ্রাম ধারা ঝরছে, অঝোরে, নিভৃতে। গলারভাঁজ থেকে গ্রীবার সমতলে তারা ছুটে চলে। নীরব, কিন্তু নিরলস। আমি খেয়াল করি পিঠের ওপরেও আছড়ে পড়ছে ক্ষুদেকণা, বিম্বিসার পথের মত, সেখানে পথ তৈরি হয় অচিরে। গহনপথের ঠিকানায় ঘোলা ঘামের দাগ বিস্মৃত হয়, যেভাবে আমি আমার শৈশব ভুলে গ্যাছি, যেভাবে গতকালের জীবন হারিয়ে ফেলেছি। সেভাবে জরুরি প্রত্যাদেশের মত নোটিশ ঝুলে উঠল পিঠে, জলের দাগ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু প্লাবনেরও অধিক শোক মুছে দিতে পারে।


পানির ঢেউ আরো নিচে নেমে যেতেই থাকে আমাকে শিউরে দিয়ে। চোখ খুলে আমি পানির রঙ দেখি, উন্মনা দেহের সৌরভের মত রঙ পাঁপড়ির সামনে খেলা করে। চারপাশে পানির দোলায়মান দেয়াল, দুলছে, নাচছে, সরে যাচ্ছে, কাছে আসছে। আমিও অজান্তেই মাথা দুলাই। ঘুরতে থাকে পৃথিবী আমার চারপাশে, মানুষেরা বিম্বের মত বশংবদ হয়ে সঙ্গী হতে থাকে, কাতার কাতার মানুষ, অজস্র অসংখ্য অচেনা অবয়ব ঘিরে ধরে আমাকে। আমি টের পাই জলের পর্দার বাইরে সকলে হা হা করে আমার দিকে হাত বাড়িয়েছে। ডাকছে, আয়! আয়!


কিন্তু আমি নড়তেও পারি না। অচল পাথরের মত নিস্তব্ধ হয়ে আমি আমার শরীরে ক্রমাগত ঝাঁপিয়ে পড়া পানি, আর ঝরে পড়া বিন্দু গুনি। তার বাইরের পৃথিবী ঝাপসা, ক্রমশ দূরাগত, অভিমানী! সামনে ও পেছনে পানিপথে প্রবল স্রোত, আমি ভেসে যাই খড়কুটোর মত। নিঃশ্বাসেও জলজ অক্সিজেন আমার ফুসফুসে নৃত্য শুরু করে দেয়। আমি আরাম পাই, ধীরে ধীরে আমার পেশি শিথিল হয়ে আসে, চোখ বুঁজে ফেলি আবার, এবং এবারে আমি আর সেটা খুলতে চাই না। শুধুই অবিরাম বর্ষণ। শুধুই ঝরোসুর। শুধুই নীরবতায় পানির গান। আঁধারের পর্দা নেমে এলে আমার কোষ জেগে ওঠে পলিদ্বীপের মত, বাইশখালি চরের মত। চরের ধবল বালুর মত আমার শরীরে ভিন্‌রূপী ত্বক হেসে ওঠে। আমি চোখ না খুলেই অবাক হয়ে তার খিল খিল হাসি শুনি।


একটা সময়ে নেমে আসা পানির স্রোত থেমে যায়, স্রোতের ভেতরে বিন্দুর রথ স্থবির হয়ে আসে, উড়তে থাকা বাষ্প কণাও ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে আমার খুলির ভেতরে সেঁধিয়ে যেতে থাকে। আমি চোখ খুলি না তখনও, শিথিল শরীরে পড়ে থাকে শাদাটে হাড়ের মত সিক্ত মেঝেতে। শরীরে লেগে থাকা পানির বিন্দুগুলো সহোদর-মায়ায় মাটিতে নেমে আসতে থাকে, আমার আতিথেয়তা বুঝি তাদের আর ভালই লাগে না! দূরের পর্দার ওপাশে মূর্তির মত স্থির মানুষের মুখ, শতসহস্র মানুষের নির্বাক চোখ আমার বন্ধ চোখের ভিতর দিয়েও আমাকে বিঁধতে থাকে।

শুক্রবার, ১ মে, ২০০৯

ভূতবাজি

এইসব রাতে চোখের উপরে ভূত ভর করে। আর ভূতের লিকলিকে পা দিয়ে আমার চুল-গলা জাপটে ধরে। তার পেট ঠেসে থাকে আমার মুখে এবং নাকে। বুঝলেন তো? কী বেমক্কা পজিশন! ধড়ের উপরে সাঁটা জলজ্যান্ত দশাসই ভূত! টেনে ছুটাতে পারি না, হাঁচড়ে-পাচড়ে সেই বাবাজি আঁকড়েই থাকে। খো খো করে হাসে, আমার নড়াচড়ায়, নাকি সে কিঞ্চিৎ সুড়সুড়ি পায়, পেটের চামড়ায়। এদিকে আমার দম বের হয়, হায়! চোখ ফেটে পানি চলে আসে (কিন্তু চোখের উপরেই সাঁটা মর্তমান ভূত, তাই সেই পানি বেরুনোর পথ পায় না)। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়, কারণ ভূতটা নিজেও শ্বাসপ্রশ্বাস চালায়। সেই শ্বাসের দমকে আমার নাক বুঁজে যায় ভূতের পেট ওঠানামায়। ও হ্যাঁ, ভূতেরাও আমাদের মতো পেটের মধ্যে বাতাস ভরে হরদম! নাকি আমরা বুকের মাঝে বাতাস নেই? উঁহ! আমার লজিক এলোমেলো হচ্ছে। "এটা মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাবজনিত উপসর্গ, আর কিছু নয়"- নিজেকে অবোধ দেই।


এইসব রাতে আমার নিজেকে কাঙাল মনে হয়।


আজকের রোদ খুব হুটোপুটি খেলেছে শরীরে। তাদের দুর্দান্ত দৌড়ে আমি বারবার হেরে গ্যাছি, রোদের ট্রুপ আমাকে অনায়াসে টপকে গেছে ট্র্যাকের ওপরে নিঃশব্দ-ঘাম জমা করে। হতাশ। হতমুখ। আমি। শ্বাসাভাবে ভুগি তখন সহসাই। দৌড়ের শেষে ট্রফিল্যাণ্ডে রোদের প্রথম পুরষ্কার নেয়া দেখে হাততালি দেই। আহা! ও তো অনেক ভাল অ্যাথলেট! তাই না? আমি কুলকুল করে ঘামি। চিকন ঘাম গড়িয়ে পড়ে আমার চিবুক বেয়ে। চিবুকের পাশেই একটা বিচ্ছিন্ন পানিবন্দী গ্রামের নাম লেখা হয়। গ্রামের নাম ভূতপাখি। (এই রে! আবার ভূতের কথা চলে এলো। এ দেখি নাছোড়বান্দা।)


ঐ গ্রামে আমার প্রেমিকা বাস করে। প্রেমিকার মুখ মনে ভাসে, ডোবে, আবার ভুস্‌ করে ভেসে ওঠে। প্রেমিকার কথা আমার এই গরমে কেন মনে পড়ে? গ্রীষ্মকালে ভালোবাসা বড্ড বেহিসেবি। রোদপোড়া, তাপস্পর্শী, ধুলোমেশা প্রেম আমার! ভূতপাখি গ্রামে একটা ছনের ঘর বান্ধি আমি। ঘরের মধ্যে রাখি পুরোনো শীতলপাটি। চারপাশে 'যতনে' বান্ধি বেড়া, খয়েরি শুকনো কলাপাতায় ঢাকা পড়ে নিভৃতকোণের ছায়া। সেই ছায়ার ওপর দিয়ে টিপে টিপে পা ফেলে কালোবন্যার পানির মতো ঢেউ আসে। আমি ভিজে যাই। আমাকে উদ্বাস্তু করে পাটির ওপরে ফেলে দেয় শাড়ির ঘন আঁচল। আঁচলের ভিতরেই রোদের জিতে নেয়া ট্রফিটা! আমার চোখ জুলজুল করে ওঠে। লোভ হয়। মনে পড়ে মহাগ্রন্থের নিষেধঃ লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।


আমার পাপী হয়ে ওঠার বয়স কয়েক শতাব্দী হবে হয়তো। আমি গত কয়েক শতবর্ষ ধরেই পাপধারণ করছি। যাবতীয় অমানবিক, অসামাজিক, অনৈতিক পাপ একটা একটা করে মনোযোগ দিয়ে পালন করছি। তার মাঝে নিকৃষ্টতম পাপগুলোও রয়েছে। আমি অবলীলায়, নিঃসন্দেহ ক্রূরতায়, অপরাধ ও অন্যায় কাজ করেছি। এবং যতোই সময় গ্যাছে, আমি নির্দয় হয়ে উঠেছি। শাবলের মত নিরীহদর্শন হয়েছি। তো, লোভ নিয়ে বলছিলাম। আঁচলের গোপনে, বুকের নিস্পন্দ ওঠানামার কাঁপনের ভাঁজে আমি ট্রফিটা দেখতে পাই। আমার অজেয় পুরষ্কার, ব্যাটা আজকের বিরক্তিকর রোদ যেটা জিতে নিয়েছিল। ওটার প্রতি আমার খুব লোভ হলো। সেই লোভের একটা শিরা জন্ম নিলো আমার শরীরে। হাত বাড়িয়ে সেই ট্রফিটা একটু স্পর্শ করি, আমার শিহরণ লাগে। প্রেমিকার শরীরের চেয়েও ঐ ট্রফিটা আমার কাছে দামি মনে হয়। চোখ উঠিয়ে দেখি...




ধুরো! কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না। সেই কখন থেকে ভূতের শাদা পেটটাই চোখের সামনে থেবড়ে আছে!




**---***

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০০৯

অশিরোনাম গ্রন্থনা

...তাকিয়ে থাকার মাঝে এক নিপুণ শিল্প অনেকটাই বিমূর্ত হয়ে লুকিয়ে থাকে। শুধুমাত্র দু'চোখ মেলে তোমার দিকে চেয়ে থাকা যায়। সেই নিস্তরঙ্গ চোখে জল-কাদা-রোদ লেগে ঝাঁঝরা রাতের ঝাঁঝ জমে, আর সেভাবেই তাকিয়ে থাকায় ক্লান্ত না হয়ে খুশি হই আমি।...


...সকালে চোখ মেলতেই বুকের ওপর থেকে জোড়া পায়রা উড়ে গেল! ধবল জোড়া কবুতরে থাকে অদ্ভুত শিহরণ, পায়রার বুকে এমন শুভ্রতা বিকিরিত হয়; এবং আমি বুঝে উঠি এই সকল প্রেম, ভালোবাসা, হাসি, কান্না, ঝগড়ার রীদম। পায়রার ডানায় শিশির জমে নতুন ভোরের, বিগত স্মৃতির।...


...হেসে ফেলা রাগী চোখে আমি সরাসরি তাকিয়ে ডানা ধুকপুক পায়রা ধরে আনি। এভাবে একে একে কয়েক অমূল্য মুহূর্ত কাটে, সেখানেও আমি এক দুই তিন চার করে গুনতে থাকি সেকেন্ডের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা। ত্রিমাত্রিক পরিমাপ শেষ হলে বিশুদ্ধ জ্যামিতিক খাঁচা আবিষ্কার করি।...


...অতঃপর আটকা পড়ে কতিপয় বিচ্ছিন্ন ভাবালুতামাখা মুহূর্ত। শেকলে বাঁধা সেকেন্ডের সারিবদ্ধ বন্দীরা একে একে মাথা নিচু করে খাঁচায় ঢুকে পড়ে। নিষ্পলকে খুব ক্রূর ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি, যেহেতু আমি জানি সেখানে কতো বিচিত্র অপরাধী সেকেন্ড আটকা পড়েছে।...


...তোমার চোখেও কেন ভালোবাসার মাঝে এমন বিষাদ, এমন গ্লানি আর এতসব অনুশোচনা জন্ম নিচ্ছে আজ? একটু আগেই শেষরাতের বিচারক রায় জানিয়েছেন। ফাঁসির আদেশে বিমর্ষ হয়েছে আসামীপক্ষ।...


...তাদের জন্যে আমার সমবেদনা তৈরি হতে থাকে। আমি ধীরে ধীরে অবিশেষ কাতরতা, সাধারণ উদ্বিগ্নতা বোধ করি। আমাদের স্মৃতিতে অনেক ভাল সময় জমে ছিল।...


...এইসকল একরকম মোহন প্যারাডক্স! কীভাবে এক মুহূর্তের মাঝে আদ্যন্ত সেঁধিয়ে যায় হা হা করে তাবৎ অতীতকাল? পাশাপাশি কাটিয়ে দেয়া সময়ে আমরা ভাবিনি যে ভালোবাসা জমেছিল ঘাড়ের ওপর, চুলের জড়োমেঘের ভেতর, বাহুযুগল-যুগলের বেষ্টনীর ভেতর, কোমর বুক নাভি জঙ্ঘা কনিষ্ঠায়। জমাট রিক্ততাতেও আমরা অপেক্ষা করিনি। সেই পলেক স্মৃতি কোষান্তর চলাচলে ক্ষয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে, ফুরিয়ে গেছে। জীবন পেরিয়ে যাওয়ার আগে হিসেব মেলেনা, আর যখন তা মেলে, আমাদের জীবনের বাকি থাকে না কিছুই।...