জর্নাল '১০ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জর্নাল '১০ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

কাঁড়া আর আকাঁড়া

ছেলেবেলা ম্যাজিকের মতো ছিল। কতোকিছু জানতাম না। কতোকিছুর কার্যকারণ আর কলকব্জা বুঝতাম না। তাই অজানা ব্যাপারগুলোকে ভেলকিবাজি মনে হতো। স্কুল ছুটি হলে এক আইসক্রিমের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতো, দু’টাকা দিলেই কমলা কমলা পলিথিনে মোড়ানো। একপাশের পলিথিন দাঁতে টেনে ছিঁড়ে ফেলতাম, তারপরে মুখের মধ্যে গলে গলে যেতো কমলার স্বাদ। ঠোঁট আর জিব একদম টকটকে কমলা হয়ে উঠতো। সেই আইসক্রিম বানানোর বিদ্যা অজানা ছিলো, খুব আশ্চর্য হতাম, রোজ এতো এতো আইসক্রিম কোথায় বানায়? কে বানায়? যে বানায়, সে কী জানে আমি এই আইসক্রিম কতো পছন্দ করি? জানলে কতোই না ভালো হতো!
 

তারপর একদিন বছর পাঁচেকের স্কুল-পেরুনো তাগড়া বড়ো ভাই বললো, এগুলো লম্বা লম্বা বরফ বানিয়ে তার ওপর চিনি আর রঙ মিশিয়ে পলিথিনে ভরে বিক্রি করে আর পানি নেয়া হয় মিউনিসিপ্যালিটির কল থেকে ফ্রি ফ্রি – - – শুনে আইসক্রিমগুলো আমার জিবের ওপর থেকে বাষ্প হয়ে চলে গেলো।
 


স্কুল বাসে করে বাসায় ফেরার সময় রোজ একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে স্পিডব্রেকার পড়তো। বাসটা একটু ঝাঁকুনি দিয়ে আবার চলতে শুরু করতো। আমি জানালা দিয়ে বাইরে ফুটপাতের পাশে দোকানপাট দেখতাম। স্পিডব্রেকারের কারণে ওই জায়গার দোকানগুলো নড়ে চড়ে উঠতো আমার চোখে। খুব অবাক হতাম, কোনোদিন পাশের কোন দোকান নড়ে না কেন, এই ভেবে। রাস্তার ওপরে স্পিডব্রেকারকে মনে হতো একটা অচল আঁচিল। কখনই সারবে না এমন দুশ্চিহ্ন। মাঝে মাঝে অনেক স্পিডব্রেকার পেলে মনে হতো হ্যাঞ্চব্যাক অফ নট্‌রড্যামের পিঠে চড়েছি। এবড়ো খেবড়ো কুঁজের ভারে নুয়ে থেবড়ে যাওয়া রাস্তার জন্য মায়া হতো।



একদিন বাস ড্রাইভার মামা বললেন, রাস্তা বানানের সময় কনট্রাকটর ট্যাকা খাইসে, তাই রাস্তাখান বচ্ছর যাইতে না যাইতে এই অবস্তা। ঠিকঠাক বানাইলে মাক্‌খনের লাগান একটা রাস্তা হইতো – - -
আমার ঘোর তখনো ভাঙে নি, তাই ভুল করে জিজ্ঞেস করলাম, স্পিডব্রেকারও কি তাহলে টাকা খাওয়ার কারণে জন্মায়?
 

পানের রসে রক্তজবার মতো কুচি কুচি দাঁত ঝিকিয়ে তিনি বললেন, ‘না গো মামা, ইসপিড বের্কার তো বানাই থোয় আমগো লিগা। আমরা য্যান ইসপিড বাড়াইতে না পারি। রাস্তা বানানের পর ইটা দিয়ে উচা কৈরা দেয় – - -
কুজের মতো, আঁচিলের মতো রাস্তার গা থেকে ধীরে ধীরে সব পচে গলে খসে পড়তে থাকে।
 


এভাবে ক্রমাগত আমার জাদুবিদ্যার ভ্রম ভেঙে যেতে থাকে। আমি এইসব ভাঙনে কষ্ট পাই। নিদারুণ বেদনায় দুঃস্বপ্ন দেখি। তারপর ঘামতে ঘামতে চেঁচিয়ে ঘুম ভেঙে হাতড়ে হাতড়ে জাদুগুলো খুঁজতে থাকি। বিছানার তলে গিয়ে ওগুলো হারিয়ে যায় চুপচাপ। টের পাই না। সদ্য ঘুম ভাঙা কষ্ট নিয়ে ভোর হওয়া দেখি। ভান করতে শুরু করি। ভ্রম ভেঙে গেলেও আমি অনেক কিছু শিখছি। শিখতে শিখতে আমি বেড়ে উঠছি। বুড়ো হয়ে পড়ছি। উঠতে উঠতে আর পড়তে পড়তে আমার ভালো লাগতে থাকে। আমার খারাপ লাগতে থাকে। ভালো লাগা আর খারাপ লাগা নিয়ে আমি একরকম আনকোরা সুখে ডুবে যেতে থাকি।

মঙ্গলবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

সমাবর্তন, বন্ধুর বিয়ে ও অন্যান্য

ডায়েরি লেখার ঝক্কি হলো কিছুদিন পর একটু ঢিলেমিতে পেয়ে বসে আমাকে। সাথে দুই চিমটি একঘেঁয়েমি। আমি যেমন জীবন কাটাই, সেটা খুব একটা ঘটনাবহুল না। তাই বলার মতো ঘটনা কম থাকে। যা করতে পারি, চিন্তাগুলো লিখে রাখা যায়। কিন্তু এই অপগণ্ডের চিন্তা পড়তেও অনেকের কিম্ভুত লাগবে ভেবে সেখানেও বাধ দেই। তাই সেই পুরানো আলাপ, আটপৌরে বয়ান। এই একঘেঁয়েমি কাটানোর সোজা উপায় হলো ঘুরতে বেরিয়ে পড়া। সঙ্গীসাথী ভালুক-বিলাই। কিন্তু এই ভালুক আর বিলাইয়েরাও কাছে পিঠে নাই। চারপাশ আটকে গেছি আটকে গেছি লাগে। ভাবনাগুলো কম্বলের তলে চাপা দিয়ে রাখি। 

এখন ডায়েরি বা জর্নালে তাই পিছু ফিরে দেখা। নিজের ভেতরে আয়না দিয়ে তাকানো। যাকে দেখি, সে অতীতের আমি। আয়না দিয়ে তাকালেও একটু পরের ছবিই দেখি আমরা। মুহূর্তের মাঝে পুরানো হয়ে যাচ্ছি। সেই সাথে শার্ট-প্যান্ট আর চামড়াটাও বদলে যাচ্ছে, কুঁচকে যাচ্ছে। চুলে ঝিলিক লাগছে রুপালি, দেখতে ভালোই লাগে, আবার মাঝে মাঝে বেমক্কা মধ্যবিত্তীয় মৃত্যু চিন্তা পেয়ে বসে বটে!

আগামীকাল সমাবর্তনের মহড়া হবে। সকাল সকাল সেই বুয়েটের মাঠে বোরকার মতো গাউন আর ব্রিটিশ চরিত্রের মতো টুপি পরা লাগবে। পরশু আসল ঘটনা ঘটবে। পাশ করার আড়াই বছর পরে সমাবর্তন পাচ্ছি। একদম অভিনব ব্যাপার। এতো এতো টাকা পায় বুয়েট, অথচ প্রতি বছর কেন এই সমাবর্তন ঘটে না সেটা জাতীয় রহস্য! গাউন আনতে গিয়েও গ্র্যাজুয়েশনের সময়ের মতো ডিফল্টার হলাম। দেখা গেলো, সব এনেছি কিন্তু টুপি আনি নাই। আজকে টের পেলাম, খোঁজ নিয়ে শুনি ওটা আলাদা বিক্রি হচ্ছিলো সামনের গেইটে। আমি তো পিছন দিয়ে গিয়ে কিনে পিছন দিয়েই চলে এসেছি তাই দেখতে পাই নাই। হলের রুমমেটকে বললাম, কিনে রাখো আমার জন্য, মহড়ার আগে নিয়ে নিবো। সকালে জানিয়েছি, বলে গেইটে কেউ নাই, টুপিও নাই। ক্রিকেট ম্যাচের ক্যাপ পরে সমাবর্তন করেন, ইউনিক হবে। আমি ঝাড়ি দিয়ে বললাম লাঞ্চের পরে আসবে মনে হয়, কিনে রাখো মিঞা! অবশেষে বিকালের দিকে পাওয়া গেলো। 

একটু আগে আমার প্রিয় বন্ধুটার বৌভাত খেয়ে আসলাম। অল্পকিছু পুরানো বন্ধুর সাথে দেখা হলো। আলাপ হচ্ছিলো। যথারীতি উষ্ণতর্ক শুরু হলো ডিনারের পর। ভালো খারাপ এথিকস, ধর্মের নৈতিকতা ও সমাজের নৈতিকতা নিয়ে খোঁচাখুঁচি। মজাই লাগছিলো। প্রায় আট-দশ বছর আগে কলেজে থাকতে এগুলো নিয়ে ঘাড় শক্ত করে তর্ক করতাম। তর্ক সরাসরি ঝগড়া ও উত্যপ্ত আলাপে পরিণত হতো। এখন করি না। হাসি হাসি মুখে শুনি, দুয়েকটা কথা বলি। যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করি, উদাহরণ দিলে সেই সীমাবদ্ধ উদাহরণ নিয়েও কথা গড়িয়ে খালে-বিলে চলে যায়। সব শেষে বাসায় ফিরে আসি, যে যার জায়গায়। বন্ধুটা সুখী হোক বিবাহিত জীবনে, এই কামনা করি। নিজের কবে বিয়ে হবে আর তর্কাতর্কি না তুলে ফটাফট ছবি তুলতে পারবো সেটা ভেবে আফসুস খাই। 

কম বয়সে মাথা গরম করলে বড়োরা যেমন স্মিত হাসতো, সেই হাসিটা আজকাল নিজেই দিয়ে ফেললে বুঝি, বড়ো হয়ে গেছি বোধহয়। আবার মাঝে মাঝে ভাঙতে ইচ্ছা করে। চারপাশের সমাজের নোংরামি*, ইতরামি* আর নষ্টামি* দেখি। সবাই খুব কনজারভেটিভ বলে বাংলাদেশের সমাজকে, আমি সেটা খুঁজেই পাই না। সমানে মেলামেশা, অবাধে জীবন, দেখে আশ্বাস পাই যে মানুষ এই দারিদ্র্য আর নিপীড়ন* সহ্য করেও নিজের মতো* থাকতে পারছে। আগের প্রজন্ম যেটা লুকিয়ে করতো, চুরি চুরি করে পালন করতো আর ক্রমাগত পাপবোধে ভুগতো। সমাজ-আরোপিত সেই পাপের ছাপ মুখে পড়ে মুখটাকে বুড়িয়ে দিতো। আমাদের দেশের চল্লিশের গোড়াতেই তাই সবাইকে বুড়োটে লাগতো। এখন তা লাগে না, সবাই কতো ঝকঝকে তকতকে। উপভোগ্যতা মনে হয় মানুষকে সুন্দর করে দেয়। 


***
*সমাজের প্রচলিত অর্থ এগুলো। আমি বা অন্য কেউ এটাকে নিজের মতো করে পাঠ করেন। নিজের চোখে, নিজের জিভে খান।

শনিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১১

ঘোলাপানি...

ফ্যাঁৎ!
  শীত চলে যেতে যেতে আবার ফিরে এলো। দরজা খোলা, আরেকটু অপেক্ষা করলেই বেরিয়ে চলে যেতো, টা-টা দিচ্ছিলো। কিন্তু কী মনে করে আবার ফিরে এলো। এবং একটু অপ্রস্তুত ছিলাম, তাই আবারও ঠাণ্ডা আঁকড়ে ধরলো আমায়। এই ঋতুতে তিন তিন বার সর্দি-কাশিতে জেরবার হলাম। বুঝতেছি না আমার রোগ-প্রতিরোধ কমেছে নাকি নিত্যনতুন ভাইরাসের প্রাচুর্য বেড়েছে। তবে হাঁচতেকাশতেফ্যাঁৎফ্যাঁতাতে আমার কাহিল দশা।

***

ভবিষ্যত!

এরই মাঝে বছর শেষ হয়ে গেলো। এই গত দশক খুব সজাগ কাটিয়েছি। মানে এই দশ বছরে দিন দুনিয়া চিনলাম। দশকের শুরুতে কৈশোর শেষ হচ্ছিলো, আর এখন সামনে তিরিশ হাতছানি দিয়ে হা করে আছে। তিরিশ ছুঁয়ে ফেললে মনে হয় আরো একটু বুড়ো হয়ে যাবার আশঙ্কা আছে। ধীরে ধীরে নখদন্তশ্বাপদ থেকে ভোঁতা হতে শুরু করবো। পুঁচকেদের হিংসা করতে শুরু করবো। খিটখিটে হয়ে যাবো জীবন-যাপনের থাবড়া খেয়ে খেয়ে। আজ যা কিছু আমার নতুন, আমার পরাণ, সেগুলো অতিব্যবহৃত ছোবড়ায় পরিণত হবে। তিরিশ তাই মনে ত্রাসের সৃষ্টি করছে। ভাবছি তিরিশের পর বয়েস গোনা উল্টে দিবো। পরের বছর উনত্রিশ হবো, তার পরের বছর আটাশ, ফের ঘুরপাক মধ্যগগণে! সবাই মানবে না, তাতে কী, আমি কি কাউরে ব'লে ক'য়ে পৃথিবীতে আসছি, না কারো কথায় গুডবাই জানাবো?

***
 
সেলসমাচার!

খালি বিদায়ের কথা বলতেছি। এখন একটু আগমনীবাতচিত করি। গত পরশু নতুন সেলফোন কিনতে গেলাম। বাজারে সবসময় থরে থরে সেট সাজানো দেখি, ঠাটবাট দেখে ভেতো বাঙালি, তাহাদিগকে সম্মান করি। শীতল ধাতব শরীরে চকমকে সেটগুলো আমার কুর্নিশে হালকা মাথা নাড়াতো। সেদিন কিনতে যাবার আগে ভাবলাম খালি বাইরের রূপে ভুলিবো না, ভিতরে কি আছে জেনে যাই। মানুষের ভরসা নাই, তাই ইন্টারনেটে বসে ঘাঁটলাম। আমার ছোটবোন বয়সে ছোট আর মননে বড়ো হওয়ার কারণে এই ব্যাপারে মোটামুটি ডিগ্রিধারী। সেলফোন নিয়ে কয়েকটা সাইট ঘুরে-টুরে বুঝলাম কোনো সেট হাতে নিয়ে "এই ফোনে কী কী আছে?" জিজ্ঞাসা করার চাইতে "এই ফোনে কোন ফিচারটা নাই?" প্রশ্নটা সহজ। দোকানির বলতে কম সময় লাগবে। আমার ভোঁতা-হতে-চলা মগজে যা বুঝ আসলো, এখন সেলফোন সেট একটা ছোটখাটো কম্পিউটার। ওএস আছে - সিম্বিয়ান, উইন্ডোজ, অ্যান্ড্রয়েড। এগুলোর মাঝে শেষেরটা সবচে ভালু মনে হয়। তারপরে আছে লুক-এর ব্যাপার, এখন টাচস্ক্রিনের যুগ। ওএস কতো র‍্যামে চলছে এটাও জরুরি। এটা দিয়ে টাচস্ক্রিনের দ্রুততাও হিসাব-যাচাই করে নিতে হবে। তারপরে আসে ওয়াই-ফাই এর হিসাব। ওয়াইফ হইলো না এখনু তাই ওয়াই-ফাই-ই সই। এটা না হলে চলছে না। এখন এই ওএস আর ওয়াই-ফাই আসলেই সেটের দাম আমার বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে!
এতোসব ঘোরাঘুরির মধ্যে মনে হচ্ছিলো নতুন যারা এখন বিশের কোঠা পেরুচ্ছে, তারা এই নতুন প্রযুক্তিগুলোতে বেশ মানিয়ে নিচ্ছে। এগুলো ব্যবহার করতে করতেই তারা হয়তো নতুন কিছু তৈরি করবে। কেউ কেউ মাথাপাগল জিনিয়াস নতুন ওএস বানিয়ে ফেলবে। আশাবাদী হইলে দিন ভালো কাটে আমার।

***

বইমেলা যাও!

বইমেলা আসতেছে সামনেই, আর দিন আটেক বাকি। প্রতি বইমেলার মাসটা আমার কাছে খুব আনন্দের। কতো কতো নতুন-পুরাতন বই, সেই বাংলা একাডেমীর মাঠ, বিল্ডিংয়ের দোতলার বারান্দা, স্টলের সামনে মানুষের ভীড়! আর পরিচিত আধাপরিচিত মানুষদের সাথে আড্ডা আর সাথে চা। আহ! সারা বছরের সব ঝুটঝামেলা আর কলুষ এক মাসে ধুয়ে যায়। আর বছর দুই ধরে ব্লগারদের সাথে আড্ডা বাড়ছে বইমেলাতে। এক কোণ ফাঁকা পেলেই তিন চার জন মিলে দিকবিদিক ভুলে সন্ধ্যা-রাত অবধি খোশগল্প চলে। রাত জমাট হইলে শেষ চা খেয়ে বাসায় ফিরি। আর শেষ দশ দিনে বেশি বই কিনি, লিস্ট করা শুরু করছি মনে মনে। গতবারের কেনা কিছু কিছু বই এখনো পড়া শেষ হয় নি, সেগুলোও তাক থেকে নামালাম পরশু। এই ধুমে পড়ে ফেলতে হবে!

***

তারপর!

মাঝে মাঝে কারো কারো কথায় হার্ট হই। ভার্চুয়াল জগতে কতো মানুষকে দেখলাম, কতো নটীর নাটক। এইসব দেখে এবং ঠেকে শিখেছি যে টেক্সটকে বেশি ভ্যালু দিতে নাই। ছোটবেলায় শিখেছিলাম ছাপার অক্ষরে ভুল থাকে না। পাঠ্যবইয়ে অঙ্কের ভুল উত্তর লেখা থাকলে সেটা মিলাতে গিয়ে মাথার চুলও ছিঁড়েছি কম না। সেই বেদবাক্যতুল্য অক্ষরকে ভালোবাসতেবাসতে আর সম্মান করতে করতে মজ্জাগত হয়ে গেছিলো। এখন ব্লগে যোগাযোগের অক্ষরগুলোকে তাই আলাদা মূল্যায়ন করা শিখলাম। বুঝে নিয়েছি যে মানুষ সামনাসামনি যেমন সামাজিক ভড়ং, ভণ্ডামি ও দ্বিমুখিতা দেখায়, ঠিক সেরকমই এই ভার্চুয়াল-পীঠ। ভালো খারাপ তকমা দেই না, এগুলো ঠিক যেমন, সেভাবে নেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করি। তারপরেও ভুলভাল হয়। মনের কাজ প্রজেকশন, নিজে নিজে ধইরা নেয় অনেক কিছু। স্টেরিওটাইপিং করে, গোষ্ঠিবাদ করে, ভুল বুইঝা চুপ যায়, ঠিক বুঝলে তেড়ে যায়। এইসব ভ্রান্ত-আচরণের চিপায় পড়ে (পড়ুন, পড়তে) ভালো লাগে না। তারপর মানায় নিতে হয়।
আজকে হঠাৎ মনে হলো, আকাশ ভাইয়ের সিনেস্থেশিয়া নিয়ে দুর্দান্ত পোস্টটা পড়তে পড়তে, যদি আমাদের মুখের অভিব্যক্তিগুলো টেক্সটের মধ্যে দিয়ে বুঝা যাইতো, তাইলে যেমন অনেকের গোমর ফাঁস হয়ে যেতো, তেমনি অনেকের কথার অবমূল্যায়নও বন্ধ হইতো। আমি বুড়োটে হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু হয়তো সদ্য-বিশে পা রাখা কেউ এরকম একটা কিছু আবিষ্কার করেই ফেলবে। তখন এই ব্লগ যারা পড়বে তারা কেমন মজা পাবে ভেবে একটু মুচকি মুচকি হাসলাম!

***

রবিবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১১

হঠাৎই দুইটা লেখা...

(একদিন সবকিছু গল্প হয়ে যায় বলেই আমার চারপাশে গল্প জমে থাকে। চারপাশে গল্পের চরিত্রেরা ঘুরে বেড়ায়, খেলে বেড়ায়। তাদের অনুনয় বিনয়ের ভার আমার বড়ো ভারি লাগে!)


***
দৃশ্যের আগে পরে
 
সন্ধ্যা ধীরে ধীরে নেমে আসে না, অন্ধকার দ্রুত জমাট বাঁধে। সেই জটাজাল কাটাতে গাড়ির হেডলাইট জ্বলে ওঠে নিঃশব্দে। আলো চিরে দেয় ভরাট আঁধারের পেট আর ফুটপাতের পাশে দোকানগুলোতেও জোরে জোরে জ্বলে ওঠে তারাবাতি। অধুনা তারাবাতিতেও তীব্র ঝলক। ঝল্‌কে ঝল্‌কে ওঠে আলো, লাল। নীল। হলুদ। ভেসে যেতে থাকে ছিন্নমূল হকারের বসাতি। হকার এড়িয়ে হনহনিয়ে চলা টবের মতো মানুষ। টবগুলো থপথপিয়ে চলে ফুটপাতে - ফুটপাত থকথক করে। সেখানে সন্ধ্যার পর অনেকটা রাত নেমে এলে একটা মেয়ে এলোমেলো হাঁটে। চুল কাঁধ ছাপিয়ে একটু দূর নেমে এলোমেলো, হাঁটার কারণে আরো এলোমেলো হতে থাকে। পরনের পোশাকে খেয়াল নেই তার, দৃষ্টি উদভ্রান্ত, উন্মুখ। ফুটপাতের খোপ খোপ ট্রাপিজিয়াম পাথরে সে একটু হড়কে হড়কে হাঁটে। 
 
আমরা কেবল দৃশ্য দেখি, আর দৃশ্যের আগে পরে জুড়ে দেই অন্যান্য দৃশ্য। ভেবে নেই আপাত অনুমান। অনুবাদ করি পরিচলনের ইতিহাস। মেয়েটির হেঁটে চলে যাওয়ার দৃশ্যে আমরা তার সঙ্গী খুঁজি, একা এতো রাতে মানুষের ভীড়ে কেন নেমেছে মেয়েটি? কোথায় যাচ্ছে সে? উত্তর কার কার জানা আছে? আমার তো লিখে দেওয়ার কথা, মেয়েটির যাত্রা ও গন্তব্যের ইতিহাস। আমি জানি সে কোনো এক বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। আবার কোনো এক বাড়িতে পৌঁছাতে চাইছে। এই তথ্যে আমাদের কোনো লাভ হলো না। জানা গেলো না মেয়েটি ঠিক কেমন, কী ঘটছে তার জীবনে।

ঠিক তবে, তার চোখের মাঝে দোকানের ওই আলোগুলো পিছলে যাচ্ছে। পিছলে যাচ্ছে শরীরেও। চারপাশে ভীড় করা টবের মতো মানুষ। টবের সাথে ধাক্কা, হেলে যাওয়া টব, পড়ো পড়ো টব, সচকিত টব, বেখেয়াল টব, বেলেল্লা টব। টবগুলোকে হঠাৎই মেয়েটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলতে চায়। একটা টব এসে তাকে চেপে ধরে।

তখন পাশে তীব্র পেটচেরা আলো মুখে গাড়িটা এসে থাকে। টায়ার চমকে ওঠে, সেই সাথে টবগুলোও। সরে ছিটকে যায় এদিক-সেদিক। গাড়ির সামনের দরজা খটাশ খুলে দিয়ে ভেতর থেকে মেয়েটাকে ডাকে একজন। ছেলেটার খোঁচা খোঁচা চুল - হাত কাঁপছে তিরতির, স্টিয়ারিঙে। খসখসে গলায় সে মেয়েটাকে ডাকে, "উঠে আসো", মেয়েটা আরো দু'পা এগিয়ে মুখ ফিরিয়ে থাকে।

এই দৃশ্যের পরে দুই যুগ কেটে গেলে, চারপাশের আলো একটু একটু কমে আসবে। তারপর মেয়েটি গাড়িতে উঠে বসবে। এবং দরজা বন্ধ করে দেবে। তারপর তারা সাঁ করে চলে যাবে। সেই বাতাসে মেয়েটার অবিন্যস্ত কাঁধ ছাপানো চুল আর এলোমেলো হবে না। ছেলেটারও তিরতির হাতে স্টিয়ারিং কাঁপবে না। স্থির ভ্রমণের পর তারা নিশ্চয়ই সুখীই হবে। নাকি?

***


যা ঘটে গেছে
 
মাঝে মাঝে এই শহরে আমি বন্ধুহীন হয়ে পড়ি
দু'কোটি মানুষ আর সাথে তেরো হাজার সিএনজি
এর মাঝে আমার কোন বন্ধু নাই, নাই। নাই এফেনেফ
কম রেটে কথা বলার সাগ্রহ আবেদনময়ী অপারেটর
আমার বন্ধুহীনতায় ক্রমেই দেউলিয়া হয়, আর দেখা
যায় সে'সব মানুষ ও সিএনজির সাথে বেশ ঢলাঢলি করে।
***

শুক্রবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১১

অ্যালেন গিনসবার্গের Howl...

====================
howl [হাউ্‌ল্‌] n. বিশেষত নেকড়ের একটানা হুঙ্কার; (মানুষের) আর্তনাদ; (অবজ্ঞা, কৌতুক ইত্যাদির) চিৎকার।
====================
কিছু কিছু ছবি গুগলের কাছে নিয়ে যায়। ছবি দেখা শেষ হলে, ইচ্ছা করে একটু পিছনের গল্পটা জেনে নেই। কতোটুকু সত্যিই ছিল, কতোটুকু পরিচালকের সিনেম্যাটিক বাস্তবতা, কতোটুকু দর্শক হিসেবে আমার অনুমান। গুগল করে অনেককিছু জানা যায়। অনেকে অজানা খবর ঠিক ঠাক বুঝা যায়। তারপর আবার কিছু কিছু ছবি থাকে, দেখার পরে গুগল করার ইচ্ছা হলেও করি না, তাতে সিনেমার মজাটা হারিয়ে যেতে পারে। অতিবিশ্লেষণ মাঝে মাঝে রসভঙ্গ দেয়। ভাং খাওয়ার পরে কেউ ভাঙের রাসায়নিক কম্পোজিশন কানের কাছে ভ্যান ভ্যান করলে যেমন লাগে, তেমন। Howl দেখার পরে আমি এই দুইদিকের টানাটানিতে পড়ে গেলাম। সিনেমা খুব ভালো লেগে গেছে। ভীতিকর স্বপ্নের মতো ভালো লেগেছে। যেমন স্বপ্ন ঠিক ঠিক দুঃস্বপ্ন না, কারণ দেখার সময় পানিতে পড়ি নাই, স্বপ্নে কোন দুর্ঘটনাও ঘটে নাই। কিন্তু ঘুম ভেঙে সেই স্বপ্নের কথা ভাবলে একটু একটু ভয় হচ্ছে। সেই ভয়ের সাথে আবার অজানা আনন্দও মিশে আছে। আবার সেই ভয়ের অনুভবের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে। 
ছবিটা বিস্ময়কর। একটি কবিতাকে সিনেমায় তুলে আনা দুরূহ কাজ। বেশিরভাগ উপন্যাসকে সিনেমায় আনতে গিয়েই অনেকে হিমশিম খায়, সেখানে গল্প বা উপন্যাস নয়, একেবারে কবিতা! পরিচালকের কি মাথা খারাপ হয়েছিলো? তাও এমন কবিতা যা পঞ্চাশের দশকে পুরো একটা জাতির একটা প্রজন্মকে মোটামুটি তুলে আনতে পারে? কবিতা ছাড়েন, কবির নামটাও আমাদের অজপাড়াদেশের বেশিরভাগ মানুষ জানেন। সেই সুবিখ্যাত কবি, সেই (কু)খ্যাত আন্দোলনের ভেতর দিয়ে সিনেমার দৃশ্য বয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিনতম কাজের একটা। তাই পরিচালক অতিবাস্তব কল্পনার কাছে আশ্রয় নিলেন। সিনেমার অর্ধেক অংশ হলো কবি অ্যালেন গিনসবার্গের সাক্ষাতকার এবং কবিতার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার মামলার শুনানি। বাকি অর্ধেক অংশ কবির কবিতা পাঠ এবং কবিতার পাশাপাশি কবিতাদৃশ্য। এই দৃশ্যগুলো অ্যানিমেটেড। এছাড়া উপায়ও নেই, বরং এটাই সর্বোত্তম উপায়। কবিতার দৃশ্যকে সেলুলয়েডে বাস্তব চিত্র দিয়ে তুলে আনা যায় না। সেখানে কম্পিউটার গ্রাফিক্সের ভরসায় না থেকে পরিচালকেরা সরাসরি অ্যানিমেশনে চলে গেছেন। মাঝে মাঝে বাস্তব জগতের ভেতর থেকে ফুঁড়ে বেরুচ্ছে অ্যানিমেশন, মাঝে মাঝে অ্যানিমেশন মিশে যাচ্ছে সাদাকালো আলোর অ্যালেনের পাঠরত অবয়বের সাথে। চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে আবার পাঠ শুরু করছেন অ্যালেন, একটু দম নিয়ে নিচ্ছেন দুই স্তবকের মাঝে। উদ্দাম কণ্ঠ ছাড়া ছোট হোটেলের পাটাতনে সবাই নিশ্চুপ। সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে, নীরবতার মাঝে শোনা যাচ্ছে টুং টাং গেলাসের আওয়াজ। সব কিছু ছাপিয়ে এক টানা নেকড়ের আর্তনাদ, Howl!! 
পরিচালক দু'জনের নাম রবার্ট এপস্টিন এবং জেফ্রি ফ্রিডম্যান। দু'জনেই এর আগে বেশ কিছু ডকুমেন্টারি বানিয়েছেন। এই ছবিটা ঠিক ডকুমেন্টারি নয়, একটু পুরোদস্তুর মোশন পিকচার। তবে বৈশিষ্ট্য হলো, এই ছবির সকল সংলাপ, বাস্তব। কেউ না কেউ, কখনো না কখনো, কোথাও না কোথাও বলেছেন। যেমন সাক্ষাতকার নেয়ার দৃশ্যে অ্যালেনের বলা সকল কথাই বাস্তবে বলেছেন তিনি। যেমন কোর্টরুমে শুনানির সময় বলা সব কথাই সত্যি। সেইদিক থেকে সিনেমার ভেতরে সংলাপগুলো কল্পনার নয়। তবে তার বাইরে মূল অংশ যে কবিতা, যে কবিতার আলাপ, সেগুলো কল্পনার রঙ ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছে বার বার। এবং দর্শকের চোখে, মনে, মগজে ছাপ ফেলে দেয়ার মতো দৃশ্য। এই দৃশ্য তৈরির জন্য এরিক ড্রুকারকে ধন্যবাদ দিতেই হচ্ছে!
কবিতার শরীরের ভেতর দিয়ে অ্যালেনের জীবন-ছবি ফুটে উঠতে থাকে। ছোটোবেলা, কিশোরবেলা, আবেগ। কিশোরবেলা-যুবকবেলা, প্রেম। অ্যালেন সমকামী ছিলেন, যাদের ভালোবাসতেন, তাদের জন্য তাঁর আকুতির মাঝে আমি কোনো ভেদাভেদ পাই না। অনুভবের কোন লিঙ্গ নাই, তাই একজন বিষমকামী যেভাবে প্রেয়সীকে কামনা করে, যেভাবে কাতর হয়, যেভাবে তার বিনিদ্র রাত জুড়ে থাকে একজনের চুলের সুবাস, ঠোঁটের বাঁকানো হাসি, তেমনভাবেই অ্যালেন তাড়িত হন। সেই উন্মাতাল সময়, মাদক-ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া বাস্তবতা, আর পরাবাস্তব কবিতার সময়ের মধ্যে অ্যালেন জন্মেছিলেন আরেক জন্ম। সেই সময় আমেরিকায় একটা পুরো প্রজন্ম বেড়ে উঠছিলো, অবয়ব পাচ্ছিলো, যাদের নাম বিট জেনারেশন। অ্যালেন সেই জেনারেশনের পুরোধা কবি। 
Howl And Other Poems বইটা অ্যালেনের প্রথম বই। এই কবিতার দায়ে বইটা অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়। মার্কিন আদালতে মামলা চলে প্রকাশক এবং সরকারি পক্ষের মধ্যে। সেন্সরশীপ, অশ্লীলতা নিয়ে সীমারেখার আলাপ উঠে আসে সেই মামলায়। বিভিন্ন অধ্যাপককে জবানি দিতে হয় এই বইয়ের সাহিত্যমূল্য বা সাহিত্যিক গুরুত্ব নিয়ে। এই অংশটুকু মজাদার। বেশ কিছু বুড়োটে প্রতিক্রিয়াশীল হামবড়া বুড়ো-জোয়ান প্রফেসর দেখতে পাই। তারা প্রথাগত কোটরে বন্দি, চোখের সামনে প্রথাগত ঠুলি। ঠুলি চোখে Howl তাদের কাছে অশ্লীল, নোংরা, অশ্রাব্য, হোমোসেক্সুয়াল, ট্যাবু। তাই এই কবিতার নানা অংশ নিয়েই তাদের প্রশ্ন উঠে গেছে। শব্দের শুদ্ধবাদিতা নিয়ে এঁড়োতর্কও জুড়ে দিয়েছেন তারা। এই অংশটা দেখে মজা লাগলো কারণ এখনও চারপাশে এই এঁড়ো ষাঁড় প্রচুর পয়দা হয়ে আছে। এই যুগে এসেও যারা ভাষার গায়ে পোশাক ও অলঙ্কার নিয়ে চিন্তিত। একটা শব্দেই তাদের শুচিতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। 

ভাগ্যিস সেই অত্যাচার বেশিক্ষণ সইতে হয় নি। কালো ফ্রেমের চশমা পরা অ্যালেন এসে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। জেমস ফ্র্যাঙ্কোকে চিনেছি সেই স্পাইডারম্যান (২০০২) থেকে। তবে এই বছরে তার ছবিগুলো প্রশংসার দাবিদার। "127 Days", "Howl", "Eat Pray Love" সবগুলোতেই ফ্র্যাঙ্কো ধীরে ধীরে নিজের জাত চিনিয়ে দিচ্ছেন। যেমন ২০০৮-এ Milk ছবিটা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। হোমোসেক্সুয়াল চরিত্রের জন্যে ফ্র্যাঙ্কো বাঁধা পছন্দ হয়ে যাবেন মনে হয় পরিচালকদের। 
সবকিছু ছাপিয়েও, শেষমেশ ছবি জুড়ে একটা কবিতাই জ্বলজ্বল করছে। অ্যালেন গিনসবার্গকে আমরা সবাই 'যশোর রোড' দিয়ে চিনতাম, এবার আমি 'হাওল' দিয়ে চিনলাম। এবং এই পরিচয় আরো গভীর, প্রোথিত আবেগের, মানবিক, প্রেমাকুল। এক নেকড়ের দীর্ঘ আর্তনাদের মতোই এক টানা জান্তব, অথচ তীব্র কামনাময়!

====================

সম্পূর্ণ কবিতাঃ এখানে
সম্পূর্ণ সিনেমাঃ এখানে

====================






বুধবার, ৫ জানুয়ারি, ২০১১

এপিক্যুরাস ভনে...

আজকাল খুব স্পিরিচুয়াল মানুষজন দেখি চারপাশে। মহাত্মা মহাত্মা লাগে তাদেরকে। খুশি হই যে আমি খুব ভাগ্যবান, আমার চারদিকে প্রতুল বিশ্বাসী মানুষ। বিশ্বাসের চাকাটায় নানা অপবিশ্বাস ও অপবিজ্ঞান এসে জুড়ে যাচ্ছে। এগুলো ভালো-খারাপ আপেক্ষিক। (মানে আমার কাছে খারাপ, আর অনেকের কাছে ভালো) তবে জরুরি হলো এগুলোকে কেউ যাচাই বাছাইও করছে না। ব্যধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয় - তাই ভাবছি একটু স্বাস্থ্যবটিকা ছড়াই। যুক্তিবিদ্যা আর দর্শন আমাদের সিলেবাসেই নাই। কেউ পড়ি নাই। আর পড়ি নাই বলে জানি না আমরা কুয়োর তলদেশের শ্যাওলামাখা ব্যাঙ! 
 
এপিক্যুরাসকে মনে পড়ছে। দুই হাজার দুইশ' সাত বছর আগে হেজে মজে গেছে। গ্রিক। এরিস্ততল, প্লেতো, দেমোক্রিতাসের পরে জন্মাইছেন। কাউরে সেভাবে পাত্তা দেন নাই। আর পাত্তা দেন নাই বলেই নতুন কিছু দিয়ে গেছেন জগতে মানবের জন্য। যুগে যুগে যতো মণীষী, আগের মানুষজনরে পাত্তা দেয় নাই বেশিরভাগই। ভাগ্যিস!

একটা সোজা কথা দিয়ে শুরু করিঃ
প্রজ্ঞাবান, নীতিবান আর ভালো হয়ে বেঁচে থাকা ছাড়া কেউ সুখের জীবন কাটাতে পারবে না, এবং সুখের জীবন না কাটিয়ে কেউ প্রজ্ঞাবান, নীতিবান আর ভালো হয়ে বাঁচতে পারবে না। যখনই কোনো একটার অভাব ঘটবে, যেমন কেউ যদি প্রজ্ঞাবান না হয়, তাহলে যতোই সম্মান আর নীতির সাথেই চলুক না কেন, সে কখনই সুখী হবে না।
চেনা চেনা লাগে? এইটাই গোল্ডেন রুল অফ এথিকস। অন্যরে এমনভাবে ট্রিট করো যেমনে তুমি নিজে ট্রিটেড হইবার চাও।
এপিক্যুরাস এইটা বললেন। বলেই থামেন নাই। টুকটাক যুক্তি দিয়ে বুঝায় দিছেন যে এইটা সত্য। (সত্য মানে ব্যক্তিগত সত্য না, সার্বিক সত্য, সকল যুগে, সকল কালে, জাত-পাত নির্বিশেষে)

আরেকদিকে যাই চলেন। এপিক্যুরাস লোকটি দেমোক্রিতাসের মতো বিশ্বাস করতেন পরমাণুর চাইতে ছোট কণা নাই। atomos, অবিভাজ্য। তবে তিনি দেমোক্রিতাস থেকে একটু ভিন্ন মতের ছিলেন। তিনি বলেছেন যে পরমাণু সবসময় সরল পথে চলে, তবে মাঝে মাঝে তারা পথ বিচ্যুত হয়, মাঝে মাঝে তারা swerve করে। এই খানে কেন তিনি এভাবে মত পাল্টালেন? কারণ নিয়ে একটু ভাবি, আসুন। "পরমাণু অবিভাজ্য আর সর্বদা সরলপথেই চলে" - এই বক্তব্যটা কেমন আদেশ আদেশ লাগে না? এই লাইনেই চলবি, এর বাইরে যাবি না। ব্যস। এইটা মানুষের ক্ষেত্রে - সমাজের ক্ষেত্রে খাটাই চলুন। গোষ্ঠি থেকে বড়ো হতে হতে রাষ্ট্র বানালো গ্রিকরা। সেই খানে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো determinism, কীভাবে চলতে হবে, কীভাবে বাঁচতে হবে - বলে দিলো দার্শনিক - নেতা - রাজনীতিবিদ - সিনেটর - প্রিফেক্ট এরা। বেশ। তবে মানুষের freewill কোথায় যাবে? গ্রিকরা মোটামুটি নিয়তি-বিশ্বাসী ছিলেন। মনে আছে, ইলিয়াড আর অডিসির নায়কদের কথা? বিশ্ববীর - অদম্য তারা, তারপরেও শেষ নিয়তি করুণ, দুঃসহ। সিসিফাসের কথাও মনে পড়ে। এই সবের মাঝে মানুষের কোন ক্ষমতা নাই নিজের নিয়তি বেছে নেয়ার। নাকি আছে? এপিক্যুরাস লোকটা সেই প্রশ্ন উস্কে দিলেন। অবিশ্বাসী ছিলেন তিনি। কোনকিছু 'আছে' আর 'সবাই মানে' বলে আমাকেও মানতে হবে? না। যাচাই করে দেখি। দেখা গেলো, মানুষেরও ফ্রি-উইল আছে। যেমন আছে পরমাণুর মাঝে মাঝে বেঁকে যাবার অধিকার!

বলে কী পাগল (কেউ কেউ ছাগলও বলেছিলো তাঁকে!)! জানেন, দুই হাজার মোটে বছর গেলো। আর ম্যাক্স প্লাঙ্ক নামক এক 'জর্মন' বিজ্ঞানী বের করে ফেললেন, পরমাণু আসলেই বেঁকে যায়।

এই রে, এখন ভাবছেন, এই ব্যাটা এপিক্যুরাস তো অবিশ্বাসী বুঝলাম, হু হু, তার মানেই ব্যাটা পাঁড় নাস্তিক। (হারেরেরে! ধর ব্যাটারে। করবো কতল!)

শুনুন শুনুন। একটু শান্ত হোন। ভয় নাই, এপিক্যুরাস 'নাস্তিক' ছিলেন না। নঞ+আস্তিক = স্রষ্টার অস্তিত্বে না তিনি বলেননি। তাহলে কেমন গুব্লেট খেয়ে গেলো। দেখি চতুর-এপিক্যুরাস কী বললেন -
The gods are immortal and blessed and men who ascribe any additional qualities that are alien to immortality and blessedness are, according to Epicurus, impious.
আমরা সবাই ভাবি, ভালো কাজে পুরষ্কার আর খারাপ কাজে শাস্তি দিবেন স্রষ্টা(রা)। সব হিসেব রাখা হচ্ছে ডান কাঁধে, বাম কাঁধে। মরলেই বিচার অনিবার্য। এপিক্যুরাসের মতে, "স্রষ্টারা মর্ত্যের মানুষের কাজকর্ম খেয়াল রাখেন না। যে মানুষ সকলের জনমতে মেনে চলা স্রষ্টাকে অমান্য করে, সে অধার্মিক নয়। বরং সবাই মিলে স্রষ্টার যে গুণাগুণ চাপিয়ে দেয় সেগুলো যে মানুষ মানে, সে-ই অধার্মিক।"

হুমম, ভাবনায় পড়ে গেলেন। ভজে গেছে মন ভজন গানে, তারে কেমনে বুঝাবেন খোদার রূপ? আসুন একটু অবসর করে ভাবি। ভাবলে তো কেউ দোষ দিবে না। মারতেও আসবে না। এপিক্যুরাস খালি এমনি এমনি বললে কেউ মানবে কেন। তাই তিনি একটা যুক্তি দিলেন। নির্জলা যুক্তি। তাঁকে যদি খুব বেশি খারাপ না লাগে, তাহলে আরেকটা কথা বলছিলেন সেইটা বলতে পারি।
একটি পবিত্রতম ও অক্ষয় সত্ত্বার কোন ঝুটঝামেলা নাই, সেই সত্ত্বা অন্য কারো জন্য ঝামেলা তৈরি করে না; সুতরাং সে সকল ক্রোধ ও পক্ষপাত থেকে মুক্ত, কারণ ক্রোধ ও পক্ষপাত, দুর্বলতা।
আরেকটা যুক্তিও দিলেন ধাঁধার আড়ালে। ধাঁধাটার সরল সমাধান এখনও কেউ দিতে পারে নাই। আফসোস!
Is God willing to prevent evil, but not able?
Then he is not omnipotent.
Is he able, but not willing?
Then he is malevolent.
Is he both able and willing?
Then whence cometh evil?
Is he neither able nor willing?
Then why call him God?


বড়ো মুশকিল! বড়ো মুশকিল! যুক্তিতে চুকে যাচ্ছে চুক্তি! মর্ত্যের মানবের তরে এ কী আজব শর্ত!


এপিক্যুরাসের দর্শনের সবচেয়ে সুন্দর অবদান কী জানেন? তাঁর দর্শনের প্রবল প্রভাব আমাদের চিকিৎসাশাস্ত্রে রয়ে গেছে। এপিক্যুরাসের মতে, সকল হিত ও অহিতের উৎস হলো সুখ ও যাতনার উদ্দীপনা (sensation)। আমরা যা কিছুতে সুখ পাই, সেগুলো ভালো, আর যা কিছুতে কষ্ট পাই, যা কিছু যন্ত্রণাময়, তা খারাপ।* ভালো খারাপের এই নীতিগত পার্থক্যের ব্যাপারে এপিক্যুরাস প্রথম বললেন। যদি কখনও কেউ সেধে যাতনা বেছে নেয়, তাহলে বুঝতে হবে সেই যাতনার ফলশ্রুতিতে রয়েছে প্রচণ্ড সুখের সম্ভাবনা। এখানে অনেকে ভুল বুঝতে পারেন, এপিক্যুরাস হয়তো সুখের তাড়নায় যাচ্ছেতাই করার কথা বলেছেন। আসলে ঘটনা ভিন্ন। তিনি মূলত মানুষের যাতনাহীনতার তত্ত্ব-তালাশের কথা বলেছেন। জন্মের পর থেকে আমরা মূলত যাতনার লাঘব চাই। এই জন্ম এক নিরন্তর তাড়না, আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় যাতনাহীন সুখের দিকে। সুখ আসলে যাতনার অ্যাবসেন্স। কষ্ট যতো কমে আসবে, ততো সুখের পরিমাণ বাড়বে। সদ্যজাত সন্তানের মুখ দেখে মা হেসে ফেলেন কেন? নাড়ী ছেঁড়া ব্যথাও তার কিচ্ছুটি মনে হয় না, কেন? ভাবুন তো!

এপিক্যুরাসের এই যাতনালাঘবের দর্শন জেনেছিলেন বিথাইনিয়া শহরের ডাক্তার অ্যাসক্লেপ্যেদিস। তিনি রোমে গিয়ে চালু করলেন সৌহার্দ্যপূর্ণ, সহানুভূতিশীল চিকিৎসার নতুন পদ্ধতি। এর আগে মানসিক রোগীদের আটকে রাখা হতো, সামাজিকভাবে 'পতিত' করে রাখা হতো। অ্যাসক্লেপ্যেদিস এর অবসান ঘটালেন। তাদেরকে অন্যান্য রোগীদের মতো সেবা দেয়া শুরু করলেন। মানবিক থেরাপির গুণে কেউ কেউ অনেকটাই প্রকৃতস্থ হয়ে উঠলো! এই যে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, যার কারনে এখনও ডাক্তারের হাসি দেখে আমরা ভরসা পাই, মারাত্মক অসুখেও সাহস হারাই না, তার কারণ এই অ্যাসক্লেপ্যেদিসের পদ্ধতি। তাঁকে সাইকোথেরাপি আর ফিজিকাল থেরাপির ডাক্তাররা কী সম্মান করেন, কাউকে পেলে জিগাইয়েন!
সেদিন থার্টি ফার্স্টের পরে গালগল্পে শুনলাম, বন্ধুদের পার্টির কথা। তরলের তোড়ে কয়েকজন ভেসে গেছে। অনভ্যাস বলি, বা অতি-পান, তাতে পরের দিন আর কারো গা-নড়ানোর উপায় নাই। হ্যাংওভার। কেন হলো? অতিরিক্ত পান। এখন ভাবুন তো, এমন ধারা হ্যাংওভার আর কখন কখন ঘটে। যখন আমরা অতিরিক্ত ঝাল খাই, অতিরিক্ত মিষ্টি খাই, (আর বাদ দেই কেন, যখন অতিরিক্ত পেট ঠেসে খাই), যখন শরীরকে অতিরিক্ত খাটাই, যথেচ্ছাচারে মাতি, তখন কেমন লাগে! যখন কাউকে ভালোবাসতে বাসতে আমাদের অবসেশন তৈরি হয়, কান্নাকাটি, অবসাদ, বিষণ্ণতা, আত্মহত্যা পর্যন্তও গড়ায়। সবই এক ধরনের হ্যাংওভার - মানসিক - শারীরিক।

এই অমিত-সুখ ভালো নয়। এপিক্যুরাস খুব জোরেশোরেই এইটার প্রতিবাদ করেছিলেন।
No pleasure is a bad thing in itself, but the things which produce certain pleasures entail disturbances many times greater than the pleasures themselves.
তাহলে কোথায় সীমানা, কোথায় গিয়ে থামবো আমরা? কীভাবে বুঝবো এই সুখের খোঁজ এর পরে আমাদের যাতনার দিকেই নিয়ে যাবে? ইঙ্গিত আছে ওই এপিক্যুরাসেই।
Bodily pleasure does not increase when the pain of want has been removed; after that it only admits of variation. The limit of mental pleasure, however, is reached when we reflect on these bodily pleasures and their related emotions, which used to cause the mind the greatest alarms.
কামনার যাতনা চলে গেলেই শারীরিক সুখ বাড়ে না; বরং তা বিচিত্র দিকে যায়। তবে, যখন আমরা শারীরিক সুখ আর তার সাথে জড়ানো আবেগগুলোকে পুনরায় তুলে আনি, তখন আমরা মানসিক সুখের সীমানায় পৌঁছে যাই, এই আবেগগুলো আমাদের মনে এর আগে খুব সতর্কতা তৈরি করে দিতো।
শেষ করি মৃত্যু দিয়ে। হায় আমার প্রিয় টপিক। তোমাকে ছাড়া আমার সব কাজ অর্থহীন কারণ তুমি নিজেও অর্থহীন!

আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দ মৃত্যুকে বালিশ কাঁথা বানিয়ে ফেলেছিলেন, মাঝে মাঝে উটের গ্রীবা। আমি সে'রকম ভাবতাম, মৃত্যুকে আটপৌরে বানাইলে আর ভয় লাগে না তেমন একটা। অভ্যস্ত ভয় খুব একটা চমকেও দেয় না! ধারণা বদলে গেলো কয়দিন পরে এপিক্যুরাসের দেখা পেয়ে।

মৃত্যু আমাদের কাছে কিচ্ছু না এমন একটা ধারণার সাথে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠো, কারণ সব ভালো-খারাপ মূলত উদ্দীপনার মাঝে নিহিত। এবং মৃত্যু মানে সকল উদ্দীপনার নিরসন। সুতরাং সঠিকভাবে বুঝে নেয়া যে মৃত্যু আসলে আমাদের কাছে কিছুই না, এই বোধ আমাদের মরণশীল জীবনকে উপভোগ্য করে তোলে, অসীম আয়ু যোগের মাধ্যমে না, বরঞ্চ অমরত্বের প্রতি কাঙ্ক্ষা দূর করার মাধ্যমে। সেই মানবের কাছে জীবনের কোনকিছুই দুঃসহ না, যে বুঝে গেছে যে বেঁচে না থাকার মাঝে কোন ভয়ঙ্কর কিছু নেই। একারণেই, যে মানব বলে যে, মৃত্যুর যাতনার জন্য নয় বরং মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা যাতনাময় বলে সে মৃত্যুকে ভয় পায়, সে বোকা। যা এসে পৌঁছুলে আমাদের কোন সমস্যা হবে না, তার জন্য অপেক্ষা করা এক ধরনের অলস অপচিন্তা। তাই, মৃত্যু - ভয়ঙ্করতম ভয়ঙ্কর - আদতে আমাদের কাছে অর্থহীন, কারণ আমাদের অস্তিত্ব যতোক্ষণ, ততোক্ষণ মৃত্যু অনুপস্থিত, আর যখনই মৃত্যু আসবে, তখন আমরা থাকবো না। এই মৃত্যু জীবিত কিংবা মৃত সকলের কাছেই মূল্যহীন, কারণ জীবিতের জন্য এটা অবাস্তব, আর মৃতের নিজেরই কোন অস্তিত্ব নাই।
ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি। এপিক্যুরাস " বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি"র উদ্ভাবক। তিনি না বললে, আমাদের বিজ্ঞানের অগ্রগতির হয়তো আরো অনেক বছর লাগতো ঠিকঠাক কাঠামো দাঁড় করাতে! তাঁর জন্য অবিমিশ্র শ্রদ্ধা!


=0=


*এখানে এই তত্ত্বটি বিশদে বলা গেলো না। আগ্রহী যে কেউ এখানে কিছু আলোচনা পাবেন। আর নেট জুড়ে আরো অসংখ্য আলোচনা আছে, আমি যেগুলো ঠিকঠাক বর্ণনাও করতে পারবো না!

বুধবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১০

অব্যাখ্যাত কলাম...

লুই আর্মস্ট্রঙের একটা গান আছে। হোয়াট আ ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড। মানুষ হিসেবে আমরা তো নগণ্য, ক্ষণিক জীবন আর তার যাতনাতেই ব্যস্তসমস্ত হয়ে থাকি। তাই চোখ মেলে অনেক সময় চারপাশের সৌন্দর্য দেখা হয় না। এ পার্থিব জগত কতো সুন্দর! কতো নৈর্ব্যক্তিকভাবে সুন্দর! অর্থহীন এ প্রবল আবেগ, এ নদীর স্রোতের মতো দৃশ্য। কুলকুল করে বয়ে চলছে চোখের সামনে। চোখ মেলে দেখতে দেখতে একটা সময় দৃশ্যগুলো সব কিছু নিস্পৃহ করে দেয়। মুগ্ধতার পারদ সীমা ছাড়িয়ে গেলে বোধহীন জড়ের মতো চোখ মেলে রাখি। সেখানে কোনো রূপ-রস আর তাড়না জন্মাতে পারে না। তখন একটু চোখ ঝাপটানো লাগে। মানুষের চোখের পলক ফেলার গতি শুনছি খুব বেশি। দ্রুততায় চোখের পলক ঝাপটানো - তারপর আবার দৃশ্যরাজি।

আমি মনে করি দৃশ্যের কোন ভালো খারাপ নাই। সৌন্দর্য ও রূপের কোনো সংজ্ঞা নাই। অপার্থিব বলেও কোনো কিছু ব্যাখ্যাত নাই। আমরা যা দেখি, যা বুঝি, যা অনুভব করি, সবই পার্থিব। অপার্থিব, ইন্দ্রিয়-অগ্রাহ্য কোনো জায়গা নাই। তবে অব্যাখ্যাত অনুভব আছে আমাদের। কারণ আমাদের ভাষা শক্তিশালি না। এই ভাষার দৌর্বল্যে আমরা দুর্বল অনুভবের মানুষ হয়ে বেঁচে থাকি। একটা কিছু 'ফীল' করলে, সেইটারে সংজ্ঞায়নের মধ্যে ফেলি, দেখি খাপে খাপে মিলে কি না। কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই এটা ফিট করে না। কোনো সংজ্ঞাতেই মিলে না। তখন নিজেরে বুঝ দেই যে এইটা 'অপার্থিব'। যে জগত আমরা দেখি নাই, জানি নাই, সেইটার নাম দিয়ে দিলাম অনায়াসে। ভাবলামও না, এ যেন ওই চোখের পলক ফেলার মতো একটা রিফ্লেক্স। কিন্তু এইটা ঠিক না। পার্থিব অনুভবকে নাম দিতে না পেরে, আমরা সেটা অপার্থিব কোয়াড্রেন্টে পাঠায় দিতেছি!

তাই আমি এখন অব্যাখ্যাত নামে একটা কলাম বানাইলাম। এই কলামে রাখবো ভাষিক সীমানার বাইরের সব কিছু।


একদিন রাস্তায় পা হড়কে পড়ে যাবার সময় যে পতনের অনুভব হলো - সেটাকে এখানে রাখলাম। এলোমেলো হেঁটে যাবার সময় আজকাল মাঝে মাঝে অমন করে পড়ে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু যদি প্ল্যান-প্রোগ্রাম ঠিক করে পড়ে যাই, তাইলে তো আর সেটার মতো হইলো না। তাই অপেক্ষা করি, কোনো একদিন তো আবার বেখেয়ালে পড়ে যাবো। ফুটপাতে ব্যস্ত পায়ের খটাখট চলে যাবার মধ্যিখানে আমি স্থানুর মতো পড়ে থাকবো। দ্রুত পায়ে দৃশ্যগুলা সরে সরে যাবে। আমার অস্থির লাগবে, মনে হবে তাড়াহুড়া, কোথাও যাওয়ার ছিলো, ভুলে গ্যাছি। মগজের রুমে রুমে আঁতিপাতি করে খুঁজবো, "কোথাও যাওনের কথা ভুইলা গেলাম!"

তারপর একদিন ক্লাসে অমনোযোগি। দেখা গেলো সেইদিন স্যারের চোখ আমার উপরেই পড়লো। দাঁড়া করায়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "এতোক্ষণ কী বলসিলাম?" মুখ ফসকে বেরুচ্ছিলো, "তা আমি কী জানি?", সামলে নিয়ে বলে দিলাম কিছু একটা। তারপরে অপমান হয়ে গেলাম অনায়াসে, স্লোমোশনে স্যার শিকে বিঁধায়ে রোস্ট করলেন। ক্লাস জুড়ে হাসির কল্লোল। উল্টোদিকের করিডোর থেকে দুয়েকটা মাথা ঘুরে তাকালো, ভেতরে ঠাট্টারসে ভিজে ভিজে আমি দাঁড়ায়ে থাকলাম। সেদিন সারাদিন ধরে সেই ঠাট্টারস গায়ে চ্যাটচ্যাটে লেগে রইলো। মোছার চেষ্টা করলাম, কিছুতেই গ্যালো না। ক্ষণে ক্ষণে আমাকে দেখে চত্বরের গাছগুলাও পরিহাসের হাসি হেসে উঠছিলো!

অথবা যেদিন শীতের মধ্যেও হেঁটে হেঁটে শহর পাড়ি দিলাম। অনেকগুলো সিএনজি, রিকশা আর বাস আমাকে ডাকাডাকি করছিলো। মাফলার জড়ানো, কোট চাপানো মানুষগুলো হেলে দুলে ধাক্কাধাক্কি করে উঠে পড়ছিলো সেগুলায়। আমি পিছায়ে রইলাম। আমার হুড়োহুড়ি করতে ভালো লাগছিলো না। আমার কোথাও পৌঁছানোর তাড়া ছিলো না। অস্থির এই দৃশ্যটা আমার ভালো লাগছিলো, তাই আমি দেখছিলাম। দেখতে দেখতে অনেকগুলা বাসহাতিঘোড়া চলে গেলো। তারপর আমি হুড তুলে হাঁটতে শুরু করলাম। আমার আগেপিছে কিছু মানুষও হাঁটছিলো হনহন করে। আমি অতোটা জোরে আগাই নাই। ধীরে বহে যমুনা। রাস্তা পেরুলাম বিনা সিগন্যালে, শরীর বাঁচায়ে। গাড়িগুলোর কৃপা আমারে ধাক্কা দ্যায় নাই। চারপাশে শা শা করে অনেকগুলা গাড়ির ভীড়। শীতের রাত এই সন্ধ্যা নামতেই! মৃদু কনকনে, তাই জবুথবু বাঁকা হয়ে আমি এগোতে থাকি। ফুটপাতগুলো এখানে ফাঁকা, হকারদের তাড়ায় দিছে কেউ। হাঁটতে গিয়ে এলোমেলো লাগে। নানা কিছু ভাবি। একদম একা বলে কেউ ভাবনায় ভাগ বসায় না। চারপাশে বড়ো বড়ো দোকানের আলো জ্বলে উঠছে। জ্বলজ্বলে শহর ক্যামন কাতর চোখে তাকায়। আমারে ডাকে, আমি আজ তার ভোক্তা হইলে, রাতের কামাইটা পুরা হয়। আমি এই সম্ভাষণে ভুলি না, বুঝতে পারি এইটা মেকি। আমারে সে চেনেও না। গত পঁচিশ বছরেও চেনে নাই, আর চিনবেও না। এই শহর কাউরেই চিনতে পারে না।


এই সব অব্যাখ্যাত অনুভবগুলারে সাজাইতে সাজাইতে কলাম ভরে ওঠে। উপচায়া পড়ে। তার অনেক পরে একটা সময় আমি বাড়ি পৌঁছায় যাই। নিজের ঘরে ঢুকতেই অনেকগুলো কোলাহল জাপটায় ধরে। আমার একটুও ভালো লাগে না!

মঙ্গলবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১০

এখানে একটা শিরোনাম বসিয়ে নেন

এখানে 'নতুন ব্লগ লিখুন' লিংকটা একদম মুখের 'পরে, প্রথম পাতায় যাবার পাশেই। তাই মাঝে মাঝে মাউসের ভুলে এদিক ওদিক হয়ে যায়। প্রথম পাতার বদলে আমি খেরো কাগজে চলে আসি। মাউসের মন খুশি হয় একটু। সে এখন রেহাই পাবে কিছুক্ষণের জন্য। খটখট খটখট আঙুল পড়বে কিবোর্ডের ওপর। এই অবসরে মাউসটির মন আরো একটু খুশি হয়। খুশিতে তার লেজ নড়ে। এদিক ওদিক নড়তে থাকে সে। তলায় মাউসপ্যাডটা পুরনো হয়েছে। ঠিকমতো মাউসের পা বসতে চায় না, পিছলে পিছলে যায়। তাই লেজ নড়ে। আমি লেজ নড়া থেকে চোখ সরাই। মাউসটার মুচকি হাসি দেখে কিছু বলি না। কিবোর্ড একটু হতাশ হয়, দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

মাঝখানের ইংরেজি হরফগুলো দেখলেও আমার বাংলা হরফ মনে পড়ে। হরফগুলোর সাথে অনেকদিনের সখ্যতা। আমি ব্লাইন্ড টাইপিং পারি না, মানে মনিটরে তাকিয়ে খটাখট লিখতে পারি না। তবে এখন বাংলায় মনে হয় কিছুটা পারি। আমার মগজের কোন এক লোব বা কোন এক গুহায় পুরো হরফের ছবিগুলো ছাপা হয়ে গেছে। আঙুলগুলো একটু উঁচু করে রেখে কোন স্পর্শ ছাড়াই এগুলো নড়াতে পারি। ক খ গ ঙ (ঘ কাজ করে নাই, বেয়াদ্দপ!)

এর পরে অনেকটা লেখা হয়। লেখাগুলো কেন হয় জানি। আমি লিখতে চাই বলে। আমার ক্ষুধা লেগে যায় লিখতে লিখতে। লিখে পেট ভরানো গেলে আমার ক্ষুধা লাগতো না কখনোই। আমি অনেক লিখি। লিখতে লিখতে যখন হাঁপিয়ে যাই তখন একটু অবসর নেই, সেই অবসরেও লিখি। এক লাইন লিখে শেষ করতে করতে মাথার ভেতরের কোনো এক গুহায় তিন চারটা লাইন হারিয়ে গেলো। ধুৎ। এভাবে হয় না। যদি বলে বলে টেইপ রেকর্ডারে সব পুরে ফেলা যেতো, তবে মনে হয় আরো একটু লেখা বাঁচাতে পারতাম। কিন্তু সেটাও তো সমস্যাজনক। দেখা যায় যে বলতে বলতেই মাথায় আরো কয়েকটা লাইন পুড়ে যায়। সেই পোড়া লাইনগুলো উদ্ধার করতে পারি না। মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করে। কিন্তু ছিঁড়বো না। বেশি নাই। টাক পড়ে যাবে শেষে বিয়েশাদি নিয়ে টানাটানি। টানাটানিতে আরো চুলহ্রাস, শেয়ার বাজারের মতো দাম পড়ে গেলে মুশকিল!

লেখাগুলো জমিয়ে রাখি। মাঝে মাঝে জমানো লেখা একা একাই মরে যায়। চুপচাপ। তাদের ফিউন্যারেল দেয়া হয় না। একা একা কেমন করে ফিউন্যারেল দেই? কেউ তো দরকার, শোকবার্তা নিয়ে আসবে। একটু কালো পোশাকে কাঁদবে। চোখের কোণ মুছবে শার্টের খুঁট দিয়ে। আমি সেই দৃশ্য দেখে শান্তি পাবো - আমার মৃত লেখার জন্য কারো কান্না পাচ্ছে ভেবে। আমার গর্ব হবে। আমার খুশি লাগবে। গর্ব খুশি মিলে ঝালমুড়ি হয়ে সব দুঃখ ভুলিয়ে দিবে। আপাতভাবে দেখলে লেখাটার কিছু যায় আসে না। সে মরে গেছে বলে সে জানেও না আমি কেমন কেমন করছি তার জন্য। সব যায় আসে খালি আমার। লেখা মৃত্যুতে কষ্টও আমার, অন্যের কান্না দেখে প্রশান্তিও আমার।

এরপর সময় গড়ায়। ধীরে ধীরে নতুন লেখার জমে ওঠে। সেগুলো এডিটর বক্স ভরিয়ে দিতে থাকে। ভরাতে ভরাতে আর জায়গা কুলায় না। পাশে একটা স্ক্রলার জন্ম নেন। তিনি নীলচে রঙের, নতুন এলেন এডিটর বক্সের পাশে, বক্স তাকে জায়গা করে দিয়েছে। একটু একটু করে এই স্ক্রলারটির আকার ছোট হবে। আর তিনি নিচে নামবেন। অধঃপতন! হা হতোস্মি। নামতে নামতে আর ছোট হতে হতে তিনি অভিশাপ দেবেন - আঃ মরা! এতো ল্যাখে ক্যান শালা!!
কিবোর্ড অভিশাপ শুনে ভয় পাচ্ছে, একটু একটু ধীর হয়ে আসছে। ব্রাউজারটাও ভীতু, বেটা এমনিতে খাইতে খাইতে ভারী হইছে, অথচ সাহস জন্মায় নি একরত্তি। ধরে চটকানা লাগাতে ইচ্ছা করতেছে।

ব্রাউজার এগুলো শুনতে পেয়ে আরো ভড়কে গেলো। ধীরে ধীরে চলছে সে। দেখে শুনে, কখন ঠাশ করে একটা চটকানা মেরে দিবো, এই ভয়ে কাঁচুমাচু হয়ে গেলো। আমারও রাগ টঙ হয়ে উঠে বসে থাকে, সহজে নামবে না। রাগের মাথায় কতোগুলো গালিগালাজ করি। সেগুলো টাইপ করে বেচারা কিবোর্ডও গলাখাকারি দেয়, য়্যাহেম। ওর অভ্যাস নাই তেমন। গালি নিয়ে ট্যাবু আছে কিছুটা। নিজে যখন শাপশাপান্ত করে, তখন কিছু যায় আসে না। কিন্তু আমি জোর করে টাইপ করলেই তার টনটনে টনক টিকটিক করতে থাকে। ব্যাটা টিকটিকি!

থাক, মুছে দিলাম। ব্যাকস্পেইস চেপে ধরে রাখলাম যতোদূর পর্যন্ত শাদা না হলে স্বস্তি হয় না ততোদূর। মুছে গেলে সব ফাঁকা হয়ে গেলো। ধবধব করছে ঘরটুকু। ঘরে আসবাব নেই। কার্পেট নেই। ঝাড়বাতি দূরে থাক, টিমটিমে ফিলিপসের বাত্তিও নেই। একটা কালো "ক" ঝুলছিলো বক্সের নিচে, এক কোণে, একা। হাতের চেটোয় ঘাম মুছে ফেলার মতো ওটাকেও মুছে ফেললাম। যাঃ



গতস্য শোচনা নাস্তি। গতস্য শোচনা নাস্তি। যা চলে গেছে, তার জন্য সন্তাপ করো না। কে বলে? কোন উন্মাদের মাথায় এই শ্লোক এসেছিলো? সে কি য়্যাল্‌ঝেইমারের রোগী? সে কি বুঝেই না গতস্যদের জ্বালা। সবচাইতে কড়া মদের চাইতেও বেশি পোড়াচ্ছে সেইসব গতস্য। শোচনা। শোচনা। অনুশোচনা। গ্লানি। "একবার শেষ দেখা যদি পাইতাম"। নাস্তি। নাস্তি। তুই নাচতি? শোচনার পিঠে চড়ে তুই নাচবি নাকি? নাচ, গড়াগড়া দিয়ে নাচাবে তোকে এই ভুরভুরে ভ্রূকূটিল শোচনা। তোর মুক্তি নেই, পায়ে মলমল।

মাঝে মাঝে আমরা ইচ্ছা করে শোচনা তৈরি করি। নিজ হাতে গলা টিপে গ্লানি বাড়াই। হাতের আঙুলের চাপে কতোগুলো নিরীহ অক্ষর মারা পড়ে। অক্ষরের সাথে আমার কিছু স্মৃতি ধুয়ে মুছে যায়। ওগুলো আর ফিরে পাবো না। তাই এক্সপোনেনশিয়ালি আমি শোচনায় ডুবতে থাকবো। কেউ কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে না। চুল এলোমেলো করে দিবে না। বলবে না, 'ব্যাপার না'। আসলে তো ব্যাপার। খুব জরুরি ব্যাপার না হলে হয়তো এভাবে মুছতাম না, এভাবে ভুলে থাকতাম না। ভুলে থাকার গুণ রপ্ত করতে কয়টা জন্ম লাগবে? কয়যুগ ঘুমালে মাথার ভেতরের এই শোচনাকুল দিনরাত্রির শ্লোক মুছে যাবে?
- ভোরে ঘুমিয়েছি - দুপুর তাই সকাল - বিকেল তাই আমেজ - - রাত মজে হলো সন্ধ্যা - নিশুতি হয়েছে জেগে থাকা প্যাঁচা -
- ভোর থেকে নিশ্চুপ নীরবতা - এভাবে মুহূর্তের গুণ সময় -
- আর সময়ের গুণ ঘন্টা - মিনিট - অহ্ন -
- এভাবে তার ছিঁড়ে রেখেছে কেউ -
- টাওয়ার বানায় নি তাই দুঃখিত হয় মেয়েটি -
-এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে নাহ -
- যাআহ ফোট্‌ !!! -



******
দ্র - শিরোনাম কৃতজ্ঞতা - কবি আন্দালীব

অচেনা ইলিয়াস...

কেউ যে চরিত্রে বা আচরণে স্বচ্ছন্দ নয়, সেখানে তাকে দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। নতুন নতুন মনে হয় তাকে। এবং অস্বাচ্ছন্দ্য বলে, খুব সজাগ হয়ে আছে সে। বুঝতে পারি সে অপরিচিতের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাত বাড়িয়ে চারপাশের সাথে যোগাযোগ তৈরির চেষ্টা করছে। এভাবে তাকে বিপাকে পড়তে দেখে আমার ভালো লাগে। তাকেও ভুলভ্রান্ত মানুষ মনে হয়। যে কাজগুলো সে অনায়াসে করতে পারে, সেগুলো দেখে দেখে মনে ঈর্ষা জন্মেছিলো, সমীহ করার, মাথা ও মন অচিরেই নুয়ে পড়ার অনুভব তৈরি হয়েছিলো। সেটা ধীরে ধীরে কেটে যায়। তাকে আর ওভাবে শ্রদ্ধা ও সমীহ করতে হবে না জেনে আমি হাঁফ ছাড়ি। এখন থেকে তাকে আমার আরো একটু আপন মনে হবে। ফর্মালিটি কারই বা ভালো লাগে, তাই না?

তো, যার কথা বলছিলাম, 'তুমি' সম্বোধন করলেও সে অনেক বড়ো লেখক। গুণী তো বটেই, তারচে'ও বেশি প্রচণ্ড তার প্রকাশ। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। বাংলা উপন্যাস আর গল্পকে অনেকাংশে ট্যাবুহীন করেছেন তিনি। পুতুপুতু যে ভালোমানুষি গদ্য, সেখানে বাবুমশাই ব্রিটিশ আমলে ধুতি পড়তেন আর পাকিস্তান আমলে পড়তেন পাজামা-পাঞ্জাবি। সেইখানে প্যান্ট-হাফশার্ট অথবা লুঙ্গি পরা লোকগুলোকে চিৎকার করার জায়গা করে দিয়েছেন ইলিয়াস। এবং সে ভাবেই তিনি পরিচিত হন, সবাই তাকে সেভাবেই চেনে।

আজকে বই নাড়তে নাড়তে তাঁর কবিতা খুঁজে পেলাম। অবাক অবাক কৌতূহল জেগে উঠলো। খুব বেশি কবিতা লেখেন নি তিনি। হাতে গোনা কয়েক পাতা। বেশিরভাগই সম্ভবত তার সন্তানের জন্য, শিশুতোষ ছড়ার মতো কবিতা। শুধু দু'তিনটে কবিতা নজর কাড়লো, ইলিয়াসীয় ঢঙ, ঝাঁজ আর ভাষার ব্যবহারের কারণে। সেই উপন্যাসে পাওয়া কথাগুলোই অন্যচেহারায় ফিরে এলো।


স্বপ্নে আমার জন্ম
ঘুম
শুধু ঘুম
আমরা ছিলুম
সাত বিলিয়ন সাতাশশো ভাই;
শান্ত প্রবল তীক্ষ্ণ হাওয়া এলোমেলো
শিশির শরম, পূর্ব থেকে নরম আলো,
আমার বাবার মোমবাতিকে সবুজ কাঁপাই।
লবণ-লালে বলকানো পাপ আব্বা দিলো শান্ত সাঁতার
কাঁপা কাঁপা, অল্প তবু কি উদ্‌ভ্রান্তি গভীর ব্যথার
হাজারটা ভাই আকাশ উপুড় ওম্বে গাইছে তারার ফোঁটা,
জ্যোৎস্না রাতে ভাসছি সবাই এশার আজান হাওয়ায় লোটা।
গোলাপ থেকে, আপেল আমের আদর থেকে আগুন থেকে মায়ের ফেনা
নিষিদ্ধ সব গলি বেয়ে দিন রাত্রি বয়ে আনে, জীবন নামক জানাজাটা
'তারচে চলো শেষ হয়ে যাই।' ক্রেজি কণ্ঠ কাতর হলুম, 'ভাল্লাগেনা ভাল্লাগেনা'
বলতে বলতে ওয়েনিঙ স্বর তারার মতোন আত্মহত্যা করলো ওরা,
সাধও হলো, বিলীন হলো, দ্যাখো দ্যাখো নেই মানুষের নীরব ঝরা।
'আমিই একা, কী-যে করবো, হায় হায় এই চোপসানো ও লুপ্ত বুকে
ক্লান্ত ক্লাউন, আঁকাবাকা আঁধার ওম্বে একাই মরি ধুঁকে।
আম্মা তখোন বিবমিষায় উপুড় হলো দন্তবিহীন মুখে।
সাগর-শোষা, আগুন আওয়াজ, কোরান-কালো আলোর গ্রহে
ল্যাজ গুটানো, নেই নেই লোম, ছিন্ন শিশ্ন, কুঁজো হয়ে
এদিক ওদিক করুণ তাকাই, গলিয়ে পড়ি,
সে উনিশশো তেতাল্লিশের ফেব্রুয়ারি।
বমির টুকরো মোহিত মগ্ন
ঘুমের মধ্যে ঘামি
লোনলি লগ্ন
আমি।


====================


এলেমজির জন্য শোক
আমার এলএমজি, এলএমজি, এলেমজি আজ
কোথায় গিয়েছ তুমি? কতোদূর, বলো কোন লোকে
নিরুদ্দেশ যাত্রা করো? শীতল শরীরে রক্ত শিখা
জ্বেলে দাও অন্ধকারে, ব্রাশ করো কোন সেক্টরে?
তোমার ট্রিগারে কার কিশোর তর্জনী টানে গান,
পূর্বজন্ম, মৃত্যু, সাধ? সুপ্তশিশ্ন ব্যারেলের কাম
এ্যামবুশ করে কার রক্তে? তুমি কার অধিকারে?
এলেমজি, তুমি ছিলে হাত জোড়া, বুক জুড়ে, বুক ভরে ছিলে।
তুমি ছিলে, ক্রোধ ছিলো; প্রতিহিংসা ছিলো; হৃৎপিণ্ডে
ঘৃণা; বাঁচবার নির্লজ্জ স্পৃহা। যাবার বেলায়
মহারাজ, ঠাণ্ডা ঠোঁটে শুষে নিলে সব, তুমিই তো
একদিন দিয়েছিলে। তুমি নাই, প্রতিহিংসা নাই;
ঘৃণা নাইল তুমি নাই, ক্রোধশূন্য বুক আজ ফাঁকা।
হৃৎপিণ্ড নিদারুণ খালি, বুক নাই, চাঁদে চাঁদ
নাই। স্পৃহাশূন্য হাতে কেউ এসে গুঁজে দেবে - নাই।


====================
মাঝে মাঝে মনে হয়, বাংলাদেশের মানুষেরা অস্ত্রগুলো হাতে না পেলে হয়তো একাত্তরে এতোটা আত্মত্যাগী হইতে পারতো না। অস্ত্র হাতে আসার আগে আমরা ভীরু, পলায়নপর, ম্রিয়মাণ জাতি হিসেবে বেড়ে উঠেছি, অস্ত্র সরে যাবার পরে আবারও সেই রকম হয়ে গিয়েছি ধীরে ধীরে। (দীর্ঘশ্বাসের ইমো) ...

বৃহস্পতিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১০

ভালো কাজ

বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে গিয়ে "মনের মানুষ" ছবিটা দেখে আসছি। গৌতম ঘোষ পরিচালক, দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনার ছবি। অনেক আগে গৌতম ঘোষ পদ্মা নদীর মাঝি বানিয়েছিলেন। দেখে হতাশ হয়েছিলাম। কোন উপন্যাসের লাইন বাই লাইন দৃশ্য রচনা করে জুড়ে দিলেই সেটা চলচ্চিত্র হয়ে যায় না। এইটা গৌতম ঘোষ জানলেও, মানেন না। এদিকে "মনের মানুষ" বইটা পড়া হয় নাই (সুনীল গাঙ্গুলির লেখা), তাই ভাবলাম ছবিটাই দেখে ফেলি। কুষ্টিয়ার ফকির লালন সাঁইয়ের জীবন নিয়ে বানানো ছবি।

লালনের ভূমিকায় প্রসেনজিৎ, লালনের গুরুর ভূমিকায় রাইসুল ইসলাম আসাদ। এখানে গিয়েই বিপত্তি বাঁধলো। এরই মধ্যে লালন হিসেবে আসাদের চেহারা ও অভিনয় মাথায় গেঁথে গিয়েছিলো। সেখানে প্রসেনজিৎকে বসানো খুব কঠিন। আর যেহেতু ওপারের পরিচালক (এবং লেখক) সেহেতু গল্প শুরু হলো লালনের পোর্ট্রেট করছেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর - এই দৃশ্য থেকে। সেখান থেকে ফ্ল্যাশব্যাক। লালনের তরুণ জীবন। বিবাহিত ও সুখী লালন, সরলসোজা, গান গায়, বৈষয়িক তাড়না নাই, গাঁয়ের মোড়ল বা কর্তার ঘোড়ার দেখভালের দায়িত্ব পেলো। দৃশ্যধারণের এই খাপছাড়াভাব দেখে সুনীলের বইটা পড়ার শখ হলো। এখানে কেন এরকম? 'সেইসময়' উপন্যাসে যেমন সুনীল জাম্প-কাট করতেন, সেরকম ভাবে এই বইটাও কি লিখেছেন নাকি? গৌতম ঘোষ কেন এভাবে শুরু করলেন।

ভাবতে ভাবতেই লালনের অসুখ। জলবসন্ত, চিকিৎসাহীন ও নিরাময়হীন। তাই সবাই মিলে গঙ্গায় (পদ্মায়) ভাসিয়ে দিলো। বাঁশের ভেলার ওপর মশারি, শাদা চাদর গায়ে মুমূর্ষু লালনের দেহখানা ভেসে চলছে। ঢেউ ছাড়া চরাচরে কোন শব্দ নাই। এইখানে দৃশ্যের সাথে শব্দের যে মিল, সেটা চমকে দিলো। এখানেই বলে রাখি কারিগরি দিক থেকে ছবিটি দারুণ লেগেছে। লালনের ছবিতে যদি শব্দধারণ ভালো না হতো, তাহলে ভালো লাগতো না। চিত্রগ্রহণের ব্যাপারেও একই কথা, ভোরের কুয়াশামাখা নদীর পাড়, অথবা রাতের চন্দ্রালোকিত কুটির - সবই অদ্ভুত আলো-ছায়া-রহস্যমাখা মনে হয়েছে! লালনের নাম ও জীবনের সাথে যে রহস্যময়তা, সেটা এখানেই ফুটে উঠেছে!

ইন্টারভ্যাল পর্যন্ত জমজমাট ছবি। গান, সুর, অভিনয়। আসাদ-চঞ্চল-পাওলী দাম, তিনজনের চরিত্র খুব চমৎকার লেগেছে। লালনের স্ত্রীর চরিত্রের অভিনেত্রী এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরিত্রও টেনে নিয়ে গেছেন। ডুবিয়ে দিয়েছেন লালনের মায়ের চরিত্রে চম্পা (তার একটা খুব ক্রুশিয়াল দৃশ্যের অতি-অভিনয়ে হলের ভেতরেই লোকজন হাসতে শুরু করলো, অথচ দৃশ্যটা খুবই সিরিয়াস ছিলো), এবং পরে লালনের সেবাদাসী হিসেবে এক অভিনেত্রী। বিশেষ করে পরের জনকে কেন কাস্ট করা হয়েছে তা বুঝলাম না। একেবারেই অভিব্যক্তি নাই!

গৌতম ঘোষের মূল দূর্বলতার জায়গা দেখলাম ক্লাইম্যাক্স এবং ফিনিশিংয়ে। ছবির আমেজ অনেকটাই কেটে গেলো শেষে এসে। তবু কিছু ছবি দেখে এসে যেমন সেই ছবির ভেতরের জীবনধারা নিয়ে আগ্রহ লাগে, একটু গুগল করতে ইচ্ছা করে, একটু জানতে আর পড়তে ইচ্ছা করে, এই ছবিটাও সে'রকমই। গানের মাঝে সবগুলোই ভালো লেগেছে। দুয়েকটা গান শেষে গিয়ে একই থিমের কারণে একটু ধরে আসলেও অসুবিধা নাই। উপরি পাওনা, চঞ্চলের কমেডি। ধীরে ধীরে বাংলা সিনেমার এই ধরনের রোলগুলো তিনি কব্জা করে নিচ্ছেন!

এখন লালনের গানগুলো শুনছি। কিছু কিছু জিনিস অনেকদিন পর শুনলে মন ধুয়ে মুছে যায়। মাঝে হয়তো মনে অনেক শ্রান্তি আর ক্লেশ জমে গেছিলো। সব কেটে যাচ্ছে!

বুধবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১০

এ বিট অফ...

আজকে সারাদিন ভ্যানভ্যানে বৃষ্টি হইছে। আমি সকাল সকাল উঠছি। তারপর থেকে মুড ঠিক করার চেষ্টা করছি। মাঝে মাঝে ঠিক হৈছে, তারপরে আবার বিগড়ায় গেছে। কী করবো, ফুয়েল নাই।
শেষে আমার শেষ সম্বল ইউটিউবে ঢুকলাম। এখানে ভালো ভালো জিনিস পাওয়া যায়। চার্লি বিট মাই ফিঙ্গার, আর ফ্রিকের মতো হাসে এমন দুইটা পিচ্চিকে তো আগেই সবাই দেখছেন। সেগুলোর মতো চিজদের পাইলেই আমি দেখে শুনে রাখি। এরা বেশি স্পেশাল।
এরা ছাড়াও আরো কিছু লোকজন আমার খুব ভালো লাগে। একজন জর্জ কারলিন, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান। এরকম আরেকজন আছে, রাসেল পিটার্স । জর্জ কারলিন অনেক পলিটিক্যাল, সোশ্যাল ট্যাবু আর ইস্যু নিয়ে পঁচায়। রাসেল তার বহুসাংস্কৃতিক ও বহুজাতিক বাস্তবতা নিয়ে পঁচায়। এই সুযোগে আরো কিছু কমেডিয়ানের স্ট্যান্ডআপ দেখা হয়ে গেলো।
তবে এদের সব কিছুর চেয়েও ক্লাসিক হলো ব্রিটিশ কমেডি। হলিউড যতোই স্পেশাল ইফেক্ট দিক আর চেষ্টা করুক না কেন, ব্রিটিশ কমেডির মতো দম ফাটানো এবং পেটে খিল ধরিয়ে দেয়ার মতো কমেডি বানাতে পারবে না। ব্রিটিশ কমেডিগুলোর তেমন চাকচিক্য নাই, প্রিন্টও খারাপ। কিন্তু সংলাপ বা ম্যাটেরিয়ালের দিক থেকে এতো দুর্দান্ত কিছু নাই!

 অনেকে House, M.D. সিরিজের অভিনেতা Hugh Laurie - কে চিনতে পারেন। বেরসিক, কাঠখোট্টা, ড্রাগঅ্যাডিক্ট এরকম ডাক্তার রিয়েল লাইফে থাকলে তাকে সবাই ধরে মাইর দিতো। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানে না যে হিউ লরির অভিনয় জীবনের সেরা কাজ এই হাউসে না। হিউ লরি তার নিজের সেরা অভিনয় দেখিয়েছে ব্রিটিশ কমেডিগুলোতে। ব্ল্যাক অ্যাডার-এর তৃতীয় সীজন থেকে শুরু। আর পুরোদমে হিউ লরির ক্যারিশমা দেখলাম A Bit of Fry & Laurie সিরিজে।


মাত্র দুইজন অভিনেতা - Stephen Fry আর Hugh Laurie। "ইত্যাদি" অনুষ্ঠানে যেমন ছোট ছোট স্কিট দেখায়, ছোট ছোট ঘটনা বা জোকস, এই পুরো অনুষ্ঠানটাই সেরকম নানা অংশে ভরা। একেকবার তারা দুইজন একেক সাজে আসে। সাজের সাথে সাথে মুখের ভাষা আর অ্যাকসেন্ট বদলে যায়। আর বেশিরভাগ অনুষ্ঠান শেষ হয় হিউ লরির একটা করে গান দিয়ে। খুব পপুলার একটা পাঞ্চ লাইন ছিলো - ফ্রাই বলতেন, "Please Mr. Music, will you play?" তখন দেখা যেত এক এক রকম সাজে পিয়ানোর সামনে হিউ, বাজাচ্ছেন তার নিজেরই লেখা কোন গান, অথবা কোন বিখ্যাত গানের রিমেক করে বারোটা বাজাচ্ছেন! আজকে অসংখ্য ছোট ছোট স্কিট না দিয়ে খালি গানগুলো দিলাম। পুরাই বিনোদন!!
America: 
=====================================
Mystery:

 =====================================
Little Girl:

 

মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১০

নতুন বাজার

মোড়ের কোমরের কাছে বেঁকে গেছে। গাড়ির হর্ন আর রিকশাওলাদের ক্যাচাল। শীত শীত আরাম বাতাস। একটু আগেই রোদ ছিলো, এখন মেঘ ঢেকে আছে। আমি বেশ ভেঙে ভেঙে এখানে পৌঁছেছি। পকেটে ভাংতি ছিলো না বেশি। রিকশাভাড়া হিসেব করে করে এলাম। মাঝের রাস্তায় মোড়ের এক পার থেকে রিকশা নিলে এক রেট, আরেক পারে গেলে পাঁচ টাকা কম। তাই হেঁটে পার হইলাম ওই মোড়টা।

তো, মোড়ের পরে মোড়, কোমরের বাঁকগুলোকে অবহেলায় এড়িয়ে এসে, আমি নতুন বাজারে বসে রইলাম। সকাল দশটা বাজে। অনেকটা ঘুরে ঘুরে এসেছি। পথে শীতের বাতাস শার্টের বোতামে আটকে গেছে। তারপর সেগুলোর জট ছাড়াতে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম মোড়টায়। এখানে রিকশা, সিএনজি আর মিশুকের খ্যাপ-স্টেশন। জন প্রতি দশ টাকা গুলশান দুইয়ের মোড়। সব পক্ষ খুশি থাকে এরকম বন্দোবস্তে। একসাথে গিজগিজ করে সিএনজি-মিশুকে উঠে যাচ্ছে মোটা-শুকনা লোকগুলো। ভাড়া করা সিএনজি দেখে দেখে অভ্যস্ত চোখে একটু খটকা লাগে। এখানেও এক সিএনজি নানাজনকে টেনে নিচ্ছে পেটের ভেতর। কোনো একজন যদি একা একা যেতে চায় বনানী, কিংবা মহাখালি, এরা যাবে না। পলিগ্যামি!! টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না!

আমি একটু হেঁটে শীত আমেজটা কাটিয়ে দিতে চেষ্টা করলাম। কাজ হলো না। এখনও একটু পরপর বাতাস দিচ্ছে। মোড়ের ওপর চায়ের দোকানে ব্যানার দিয়ে আড়াল করা। বাতাস ঠেকাচ্ছে। দেখে পদ্মার নৌকার কথা মনে পড়লো, আরিচা ঘাট থেকে নগরবাড়ি ঘাট। পালতোলা নৌকার মতো ফুলে উঠছে এই ব্যানারটা। ব্যানারে ছাত্রলীগের দেয়া কুরবানির হাটের খবর লেখা। আমি কুরবানির হাটকে পিঠে রেখে বসলাম, "মামা, একটা চা করেন", চায়ের দোকানদারের হাতের চামচ নড়তে থাকে। দোকানদারের নাম কেরামত। গালে থুতনিতে অল্প দু'গাছা দাড়ি। গলায় মাফলার, পরনের কাপড় পুরনো এবং শীত মানবে না আর কয়দিন পরেই। "নতুন লিকার বসাইসি, একটু ধাগ কম হইবো", বললেন তিনি, "এখনই খাবেন নাকি আরেকটু পরে দিমু?" আমি বললাম, "ঠিকাছে মামা, পরেই দেন। দশ মিনিট।"

দশ মিনিট পরে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে সামনের ওভারব্রিজটাকে দেখি। দুপাশ দিয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ি, রাস্তার ওপারেও একই রকমের সিঁড়ি। দেখে হঠাৎ মনে হয় এই নতুন বাজারে একটা শীর্ণ লোক বুকডন দিচ্ছে। দুই পাশের ফুটপাতে দুই হাত ছড়িয়ে দিয়েছে, আর পিঠ উঁচু করে রেখেছে, যাতে তলা দিয়ে সারসার বাস-ট্রাক-গাড়ি-রিকশা চলে যেতে পারে! নিজের চিন্তায় নিজেই হেসে উঠলাম। পাশে একজন বিড়ি ফুঁকতেছিলাম। হাসতে হাসতে তার বিড়ির দমবন্ধ গন্ধটাও ভালো লাগলো!

চা শেষ হইলো। পাঁচ টাকা হইছে, মামা। এই নেন রাখেন। আমার পকেটে শেষ পাঁচ টাকার কয়েনটাও দিয়ে দিলাম। এখন হালকা লাগছে। কড়কড়ে দুইটা এক হাজার টাকার নোট আছে। এটা এখন আর কেউ ভাঙিয়ে দিবে না। এক হাজার টাকার নোটের মেরুদণ্ড বাংলাদেশের সব চাইতে শক্ত শিশ্নের চাইতেও শক্ত। [অ্যাঅ্যাই! কেউ আমাকে খারাপ ভাববেন না, প্লিজ। আমি বাংলাদেশির মেরুদণ্ডের সাথে তুলনা করছি না বলে দোষ ধইরেন না। ওটা স্পঞ্জের মতো নরম, মুরগির কচি হাড়ের চাইতেও তুলতুলে। ওর সাথে কি 'অভাঙনযোগ্য' হাজার টাকার নোটের তুলনা করা যায়?]

পৌনে বারোটা বাজে। সূর্য বেশ চড়া। এখন আর শীত লাগছে না। ওম ওম উষ্ণতা। কেরামত ভালো থাকুক। ওভারব্রিজটাও ভালো থাকুক। আমি ফিরে চললাম!

সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১০

দুঃস্বপ্ন

খুব বাজে দুঃস্বপ্ন দেখাটা একটা অভিশাপের মতো। দুঃস্বপ্ন সন্তর্পণে এসেছে। ঘুমিয়ে ছিলাম, আর ঘুমটাও এমন যে টের পাচ্ছিলাম অনেকক্ষণ ধরে অনেক আরামের ঘুম হচ্ছে। ঘরে এই পড়ো পড়ো শীতে হালকা করে ফ্যান ঘুরছে। গায়ে পাতলা কম্বল গায়ে দিয়েছি। বাতাস টের পাচ্ছি, কিন্তু শীত লাগছে না। এই ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ দুঃস্বপ্নটা আক্রমণ করে বসলো। মনে হলো, কেউ বুকের বাঁ পাশে গনগনে লোহার বর্শা গেঁথে দিয়েছে। ফুসফুসের কুঠুরিতে সেই গরম বর্শার ফলা বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিষে জরজর হয়ে আমি দুঃস্বপ্নটা দেখতে থাকি। সেলুলয়েডের মতো একটানা চোখের যামনে বয়ে চলছে। এ খুব অবাক ব্যাপার, সুখস্বপ্নগুলো এতো ভিভিড হয় না। ছেঁড়া ছেঁড়া, খণ্ডদৃশ্যের মতো হয়। ঘুম ভেঙে সেগুলো ঠিক ঠাক জোড়া দেয়া যায় না। মাঝে মিসিং লিংক থাকে অনেক। কিন্তু দুঃস্বপ্নগুলো একদম ডিটেইল। আমার বুকে জমে থাকা বাতাস ফুরিয়ে যেতে থাকে। আমি ঘুমের মধ্যেই ছটফট করি। নিঃশ্বাস নেয়ার চেষ্টা করি। আর আমার শরীর থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাবার জন্য আঁকুপাকু করে। জগদ্দল শরীর। অযথা বেহুদা ক্লেশ। শেষ হয়ে গেলে আমি হালকা হয়ে যেতাম, শালিকের মতো। এই অচকিত ভাবনাটাও গরম তাপে মোমের মতো গলে যায়। দুঃস্বপ্নকে এখন আর স্বপ্ন মনে হচ্ছে না। মনে হতে থাকে এটা বাস্তব। আমার যাপিত জীবন!

আমার চোখ ফেটে জল আসে। আমি বুকের শেষ শ্বাসটুকু ছুঁড়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠি। আমার হাত মুঠো হয়ে ওঠে। আমার গলা ভেঙে যেতে থাকে। আমি চিৎকার করতেই থাকি। কে যেন থাইয়ের কাছে করাত দিয়ে পা কেটে ফেলছে। চিৎকারের শব্দ হারিয়ে যায়। আমার শরীর বেঁকে চুরে যাচ্ছে। চিৎকার দিতে দিতেই আমার ঘুম ভেঙে যায়।

ঘর অন্ধকার।

ফ্যান সরসর সাপের মতো ঘুরছে।

আমার গায়ে পাতলা কম্বল।

আমি খুব জোরে চিৎকার করছিলাম, গলা ভেঙে গেছে।


আমি বেঁচে আছি, কিন্তু আমি মরে গেলেই বেঁচে যেতাম।



এখন এই অবশ্যম্ভাবী দুঃস্বপ্নটা সত্যি হওয়া পর্যন্ত আমি সেটা যাপন করবো।

রবিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১০

পুরোনো ত্রয়ী

সংকট

হাতের উল্টোপিঠে তারাদের ছাপ তৈরির বিষয়টা অস্বস্তিকর; বড়ো বিস্ময়েরও বটে। আমি যদ্দুর জানতাম, ওরা আজকাল এখানে বাসা বাঁধে না। জমি বিক্রি বন্ধ সেই আদ্যিকাল থেকে, যুদ্ধেরও কয়েক বছর আগে হইতে! তখন খোলা প্রান্তরেও তামাবর্ণ মানুষের হাতে উল্কির মতো, কুষ্ঠের মতো, শ্বেতীর মতো তারাবাজি খেলা করতো। তারপর বহুদিন আগে কোন্‌ দুর্ঘটনায় আদিম তারার নির্দেশে মানুষের করতল থেকে মুছে গেলো উল্কিময় কারুকার্য। তারাদের কাছে আমরা হলাম অপাংক্তেয়।

অথচ আমার হাতের পিঠে সেদিন পুড়ে গেলো চামড়ার তল, অপতলে ফুটে উঠলো বিম্বিত নক্ষত্র! যখন কাঠ, খড়, তুষের সম্বল নিয়ে তারকা-নেতা এলেন, পেছনে সারি বেঁধে এলো তারাসকল, আমি খুবই অবাক বিব্রত ঘাম মুছে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। উদোম হাতের পিঠে ছাই হয়ে গেলো সুন্দরবনের মতো মানচিত্র...


***

ভালোবাসা

শীৎকারগুলো দেয়ালে গেঁথে আছে চিত্রশিল্পের মতো
আর তাদের দুজনের মাথা দুটো, দুভাগ করা লেবুর মতো
দুদিকে এলিয়ে পড়ে আছে। তবুও তাদের রমণ বেগ
অমন্দন গতিশীল নিরাবেগ। যান্ত্রিকও কিছুটা, তাদের
ঘুমের ভেতর বিনিময় হয়ে যায় হাত ও পায়ের আঙুল
নিদ্রাতটের জলদস্যুতায়, তারা চুরি করে
একে অপরের মস্তিষ্ক চিরতরে

আর সকালের রোদে দেখা গেলো তাদের মুখের চামড়া খুলে
ঝুলছে অপরজনের চেহারায়।

টেড হিউজের একটি কবিতা অবলম্বনে

***

একটি নিছক আটপৌরে ঘটনা

যারা রাস্তায় থাকে তাদের কাছে আলোবিহীন সড়ক ভূতুড়ে নয়; তেমন একটা। কিন্তু আমরা যারা দালানকোঠায় বাস করি, আমাদের যাপিত জীবনে আঁধার ও বৈকল্য এক সাথে আসে। আজ কয়েকজনকে দাওয়াত করেছিলাম। নিছক অনেকদিন বন্ধুদের সাথে দেখাসাক্ষাত নেই, ফোনে কথা বলে মনের আশ বা প্রাণের সাধ কোনোটাই মিটছে না। নেহাত বাইরের কোন ফাস্টফুড বা হ-য-ব-র-ল রেস্তোরাঁ আমার পছন্দ না বলে সবাইকে বাসায় ডেকেছি। সবাই বলতে ওরা পাঁচজন, এখন যারা আমার ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছে খুব। তারা হাসি ঠাট্টায় জমে উঠতে উঠতেই হুট করে ইলেকট্রিসিটি চলে গেলো। ধুপ করে সব কালো। চোখ সয়ে এলে আবছা একটা আলো চোখে পড়ে। নীলচে-কালচে আলোতে দেখি বিছানা-চেয়ার মিলিয়ে ওরা চারজন অনাহূত অন্ধকারে কথা থামিয়ে দিয়েছে।

আড্ডা থিতিয়ে এলে জায়গা বা বিষয়বদল দরকার। আমি সফল হোস্ট হতে চাওয়ার লোভে ভুগছি। ভাবছি আজকের গেট-টুগেদারের গপ্পো যদি আগামি এক সপ্তা না চলে, তাহলে আমার এই উইক-এন্ডটাই মাটি! ফেসবুকে ছবি আর নোটিফিকেশনের ঝড় ওঠা চাই। কমেন্টের ফুলঝুরি আর ওয়াল পোস্ট চাই। কিন্তু ছবি তুলবো কীভাবে, কারেন্টই তো নেই! ভেবেই মেজাজ ফট্টিনাইন হয়ে যাচ্ছিলো। তারপর নিজেকে সামলে নিলাম, হোস্ট হয়ে অন্ধকারের মাঝে ঘোস্ট হওয়ার দরকার নেই। বরং জায়গা বদলে দেই। "অ্যাই, তোরা কি ছাদে যাবি?", বলামাত্রই ওরা শশব্যস্তে উঠে দাঁড়ালো। হুড়হুড়িয়ে সবাই ছাদে উঠে গেলো। তেরো তলার উপরে ছাদ। একদিকে এরকমই লম্বা একটা হাইরাইজ ছাড়া বাকি তিনদিকে খালি, মিষ্টি বাতাস বইছে, বসন্ত-সমীরণ।

আমার বন্ধুরা অবশ্য বাতাস উপভোগ করে না। তারা গুমোট বিকল লোডশেডিং থেকে মুক্ত হয়েই খুশি। সবাই মিলে ছাদের রেলিংয়ের দিকে ছুটে গেলো। নিচে তাকিয়ে একজন গাড়িঘোড়া দেখছে। মানুষগুলো পিঁপড়ের মতো। আমাদের বন্ধুদের মাঝে যে সবচেয়ে বিটলা, সে থুক করে একদলা থুতু ফেললো। আমরা 'ইয়াক', 'ঈঊ' করে উঠলাম, "এ কী ধরনের অসভ্যতা! ম্যানারলেস! ক্রাস!" থুতুর মতোই ওর দিকে কতোগুলো গালি ছুঁড়লাম আমরা। ও নির্বিকার হাসলো। যেন এই গালিগুলো আমাদের দিয়ে বলিয়ে নিতেই সে এমনটা করেছে। ওর কারণেই হোক, অথবা নিচের গাড়িমানুষের লিলিপুট ভার্সন একঘেঁয়ে ওঠার কারণেই হোক, আমরা রেলিং থেকে সরে এলাম। রেলিংয়ে হেলান দিয়ে ছাদের কুসুমগরম মেঝেতে বসে পড়লাম সবাই। একটু আগেই বিকেল মরে জেগে ওঠা সন্ধ্যাটা মরে গেছে। চারদিকে আজান তোলা শেষ। এখন খালি রাস্তার আবছা কোলাহল আর নিঃস্তব্ধতা। আমাদের পাঁচটে দেহবিহীন আত্মা তেরো তলার ওপর চৌদ্দ তলা ছাদ থেকে বার বার লাফিয়ে নিচে পড়ে যাবার কসরত করছে।


***

শুক্রবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১০

ওন্দস্কান

মাথা ভার ভার করছে সারাদিন ধরে। অনেক কাজ করছি সারাদিন ধরে। বেশিরভাগ সময় কম্পিউটারের সামনে যারা কাটান, হঠাৎ করে পুরো একটা দিন বা সারা সপ্তাহ ইন্টারনেট আর কম্পিউটার না ধরলে তাদের কেমন লাগবে? ভাবছিলাম। কিছু কিছু ব্যাপার যেমন কল্পনাতেও আসে না, ফ্যান্টাসির চাইতেও বেশি অসম্ভব বলে মনে হয়, এই ব্যাপারটাও মনে হয় সেরকম! আমি প্রায় দশ বছর ধরে নিজের কম্পিউটার ব্যবহার করছি, হঠাৎ করে এক দিন বা দুই দিন কম্পিউটার সচল না পেলে মাথার সার্কিটে কোন একটা 'গিয়াঞ্জাম' লেগে যায় (আগে গিট্টু লাগতো, গিট্টুর পরের দশা হলো গেরো, আর গিয়াঞ্জাম হলো শেষ অবস্থা!)। মনে হতে থাকে একটা হাত নাই; অথবা পেটের ভেতরে পাকস্থলী নাই - খাবার খাইলে সরাসরি তলপেটে চলে যাচ্ছে। এই ধরনের উদ্ভট শারীরিক অত্যাচার সহ্য করতে করতে মনে হতে থাকে যে আমি বোধহয় আসক্ত। নেশাগ্রস্ত।

অনেক আগে একটা ছবি দেখেছিলাম মনিটরের ভেতরে মাথা ম্যাট্রিক্সের মতো গলে গলে ঢুকে যাচ্ছে আর বাকি শরীরটা টার্মিনেটর টু-এর মতো এলুমিনিয়ামের মতো গলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে তেমন লাগে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এটা যে অস্বাভাবিক বা সমস্যা, তা বুঝতে পারি না। স্বাভাবিক মনে হয়। অভ্যস্ত হলে অপ্রাকৃতিক আচরণও ন্যায্য মনে হয়।



কিছু ছবি দেখার পরে অতীতের কথা মনে পড়ে। আমার স্বল্পায়ু অতীত। সুইডেনের ছবি ওন্দস্কান (Ondskan), মানে হলো Evil, শয়তান। ছবিটা যার কাছ থেকে নিয়েছি, সে বলেছিলো যে ক্যাডেট কলেজের কথা মনে পড়বে, দেখেন, মজা পাবেন (সে নিজেও এক্স-ক্যাডেট)। দেখা শুরু করার ২০ মিনিট পরে একটু থামলাম। একটা দৃশ্য দেখালো, বোর্ডিং হাউজে আসার পরে রুমমেটের সাথে কথোপকথন। রুমমেট বেশ পড়ুয়া, ভালো ছাত্র, তবে খেলাধুলায় ভালো না, একটু পৃথুল শরীরের। যে সিনিয়র প্রিফেক্ট নতুন ছেলেটাকে নিয়ে এসেছে, সে এই ব্যাপারটা নিয়ে একটু হালকা ঝাড়ি দিয়ে গেলো। নতুন ছেলেটাই গল্পের মূল নায়ক, রাগী, বয়ঃসন্ধির রাগ, পেটা শরীর, সাঁতার কাটতে পছন্দ করে। আমি থেমে গেলাম কারণ আমি নিজেও খুব একটা ভালো ছিলাম না খেলাধুলায়। খেলতাম, খুব এনজয় করেই খেলেছি দুই তিন বছর। কিন্তু যতো সিনিয়র হয়ে গেছি ততোই খেলাধুলার দিক থেকে মন সরে গিয়েছে। খুব প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমার কখনই ভালো লাগে না। ওপেন চ্যালেঞ্জ, জিগীষার যে খাপ-খোলা-রূপ খেলার মাঠে ফুটে ওঠে, সেটা আমাকে কিছুটা সন্ত্রস্ত করে।

ছবিটা মূলত এই বোর্ডিংয়ের জীবন-যাপন নিয়ে নয়। বরং আরো অনেক গভীর মনস্তত্ত্বে গিয়ে নাড়া দিয়েছে। আর এখন যদি ব্যাখ্যা করতে যাই, পারবো না। এতোটাই সূক্ষ্ণ-উদ্দীপন, যে ভাষায় প্রকাশের ক্ষমতা নাই। ছবিটার নামে যে শয়তানের কথা বলেছে, সেটা আমাদের ভেতরের পাশবিকতা। হিংস্র জানোয়ারের মতো আমরা মাঝে মাঝে দাঁত দিয়ে, নখ দিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে চাই। সামনে পরা মানুষটাকে আর মানুষ বলে মনে করি না। ভায়োলেন্স আসলে খুবই "সাপেক্ষ" আচরণ। যা কিনা পরিবেশ, মুহূর্ত এবং আরো অনেক প্রভাবকের ওপর নির্ভর করে। গিয়ারের দাঁতের মতো, অনেকগুলো ছোটবড় চাকার দাঁত মিলে গেলে ঘোটঘোট করে ঘুরতে থাকে ভায়োলেন্সের চাকা। এর সাথে যুক্ত হয় মব-ফিয়ার, দলগত-হিংস্রতা। কোন র‍্যাশনাল বা ক্রিটিকাল সমালোচনা এখানে তুচ্ছ।

আরেকটা জিনিস খুব ঘটতে দেখেছি, যে কোন বদ্ধ-আবাসিক ব্যবস্থায়। সেটা হলো ব্যবস্থার নিজস্ব একটা চালু 'সিস্টেম' থাকে। এটা অনেকটাই সপ্রাণ। আর প্রাণের বৈশিষ্ট্যই হলো বিবর্তন। সিস্টেম ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়। অনেক বুঝে শুনে নিয়মকানুন বানালেও নিজে নিজে সিস্টেমটা মানুষগুলোকে দিয়ে আরেকটা আলাদা নিয়মকানুনের ইশতেহার বানিয়ে ফেলে। যেন সে বুঝতে পারছে কোনভাবে চললে, কোন নিয়মে চালালে সবচেয়ে স্থিতিশীল সিস্টেম তৈরি করা যাবে। যতোই 'রেড বুক' বা 'নীতিমালা' বানাই না কেন, শেষতক সেই সিস্টেমের-বানানো-নিয়মটাই টিকে থাকবে। এটা যেন নিজেই নিজের জন্য সীমানা তৈরি করে!

আর মানুষ খুবই ফালতু সৃষ্টি। কারণ অধিকাংশ মানুষ এই সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। যারা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকারে থাকেন, তারাও পারেন না। সিস্টেমের হাতে তারাও এক একটা ঘুঁটি। এখানেও লজিক্যাল কোন ডিডাকশন নাই। মেনে চলো। সুখী হবে। এই যে 'সুখ', এটাও সিস্টেম বুঝিয়ে দিচ্ছে। ঠিক ওই ম্যাট্রিক্সের মতোন!

যাস্‌সালা, ঘুরে ফিরে সেই তো গোড়ায় ফিরে এলুম! এই কী গেরো! ( আশার কথা, গিয়াঞ্জাম কেটে 'গেরো'তে এসেছি, গিট্টুতেও চলে আসতে পারবো নিশ্চিত!)

বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১০

স্মৃতি ও বিস্মৃতি

ডিসেম্বর এলে আস্তে আস্তে শীত বাড়ে। আমার এই শীতকাল খুব মেলাঙ্কলিক লাগে। যে স্মৃতিগুলোকে আগের জন্মের বলে মনে হয়, সেই কৈশোরের সময়টা মনে পড়তে থাকে। সেই সময়ের 'আমি'কে নিজের সত্ত্বা বলতে চিনতে পারি না। অচেনা মানুষের সাথে পরিচয়ে আমি বরাবরই অমিশুক, সন্তর্পণ। তাই সহজ হতে পারি না, চুপচাপ তার কাজকর্ম দেখি। কাজকর্ম দেখি মানে সেই সময়ে 'আমি' কি কি করতাম সেগুলো মনে করার চেষ্টা করি। জীবন যাপন করা তখনও অনেক কঠিন মনে হতো। অথচ তখন যদি জানতাম, এখনের জীবন এমন, এই রূপ, তাহলে হয়তো সেই কষ্টগুলো আর কষ্ট বলে গায়েই লাগতো না!

শীতের সময়ে সম্ভবত আমার প্রথম স্মৃতি তৈরি হয়েছিলো। দুইদিন আগে আমার এক বন্ধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলো, জন্মের পরে প্রথম স্মৃতি কোনটা, কতোদূর পষ্টভাবে মনে করা যায়? বন্ধুটি বেশ শিল্পমনা, রুচিশীল। এমনিতে ফেসবুকে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা কথাবার্তাকে তেমন আমল দেই না। তবে তখন ভাবনা যোগালো, মনে করার চেষ্টা করলাম। প্রথম স্মৃতি। বোনের জন্ম মনে আছে, সেটার বয়স চার। তার আগে? ময়মনসিংহে একতলা বাসায় থাকতাম, বাসার সামনে ইট-বিছানো উঠান ছিলো, পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সেই পাঁচিল ঘেঁষে আকাশছোঁয়া গাছ ছিলো। বাসার সামনের বারান্দা পার হলে বাম কোণে কলতলা ছিলো, টিউবওয়েল ছিলো কিন্তু আমি ওটা চাপতে পারতাম না। নানী ছিলো, ওটাকে চাপকল বলতেন। আমি তাঁর সাদা আঁচল আঁকড়ে ধরে হেঁটে বেড়াতাম।

এগুলো সবই তরতাজা স্মৃতি। ময়মনসিংহের বাসাটায়, আমি যে দেয়াল ভর্তি করে অ আ ক খ লিখতাম, সেটাও চার বছরের স্মৃতি। আরো পিছে যাই। ঝাপসা ঝাপসা লাগে। এর আগে সাভারে ছিলাম, স্মৃতিসৌধে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ঝাপসা খোপ খোপ স্মৃতিসৌধ, ভয় পেয়েছিলাম। মোটেই ছবির মতো সুন্দর বাঁকানো সুউচ্চ মনে হয় নি। আতঙ্কের স্মৃতি খুব সহজে ছাপ ফেলে। আমি বোধহয় স্মৃতিসৌধের ভেতরে ঢুকে কেঁদে ফেলেছিলাম ভয়ে। তারপরে বেরোনোর পরে সামনের ঝিলে শাপলা দেখে একটু থেমেছি, শান্ত হয়েছি। দাদী ছিলেন সাথেই। তবে তার কথা মনে নেই, ছবি দেখে বুঝি এখন।

সাভারের আগে ঢাকায় থাকতাম, সেগুলো ধুয়ে মুছে গেছে। মানুষের এই স্মৃতিগুলো থাকে না কেন? আমার ভাগ্নে আরাভ বড়ো হচ্ছে। বাসায় আমরা মামা-খালা-চাচারা এলেই তাকে নিয়ে নানা আদর-সোহাগ। এগুলোর অমূল্যতা সে কোনোদিন মনে রাখতে পারবে না! আমি জানি আজ থেকে পনেরো বছর পরে তার সাথে আমার এই যোগাযোগ, এই নিবিড়তা থাকবে না। তখন হয়তো এই স্মৃতিগুলো পেলে তার খুব ভালো লাগতো!

জর্নাল জিনিসটা চমৎকার। রোজ রোজ ভাবনার ভার ক্লান্ত করে। আজকের ক্লান্তি একটু কমে গেলো। এখন থেকে লিখবো। অনেক অনেক শব্দ, যেগুলো আদতে একদমই মূল্যহীন!