নগর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নগর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৭ মে, ২০১৯

চিরকুট

কোন কোন দিন ভাঙা মার্বেলের মতো - মসৃণ মাটিতে বাঁকা হয়ে পড়ে থাকে আর একটু ঢালু পেলে গড়াতে শুরু করে। কিন্তু সব দিক সুষম গোলকের মতো গোল গোল থাকে না বলে তার চলন হয় বড়ই বেখাপ্পা। যেন কেউ বলে নি গড়িয়ে যাও, সেই দিনটা তবু প্রাণপণে যেতে চাইছে। গরমে, ঘামে, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে পড়তেও পড়ছে না।
এরকম দিনে সকালে উঠে মনে হয় কেউ সদ্য লাল আটার রুটি ভেজে দিলো, সাথে একটা ডিম পোচ। পাশে এক কাপ ধূমায়িত চা। চুমুক দিতে দিতে রোদ এসে পড়বে পায়ের পাতায়, চড়াক করে একটা চড় কষাবে। এরকম দিনে অনেক কাজ থাকে - জোড়াতালি দিয়ে রিপু করে কাজের শরীরে ধানক্ষেতের মতো চৌকো চৌকো খোপ খোপ তালি বসে, মাঝের আইলে আইলে সেলাইয়ের ফোঁড়। কাজ দাঁড়িয়ে যায়। 

এমন দিনে দুপুরের থমথমে বাতাসে শহরের বাসগুলো রাস্তা দখল করে থাকে, আর গগনবিদারী আহ্বানে ক্ষুধার্ত স্নান করা পরিপাটি বেশভূষা নিয়ে সকলে ভিড় করে উপাসনালয়ে। সেখানে কেউ বলে না কীভাবে মাত্র পৌনে দুই সপ্তাহে ধর্ষণ হয়েছে দুই কুড়ি। তিন লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার শিশু ঘরে ও বাইরে কাজ করতে গিয়ে ঠাশ ঠাশ চড় থাপ্পড় কিল ঘুষি লাথি খেয়েছে। স্বচ্ছ কাচের মত নিষ্প্রাণ চোখে পাশ ফিরে উপুড় হয়ে মুখ ফিরিয়ে নীরবে ব্যবহৃত হয়েছে আড়াই কোটি নারী - যাদের ফার্স্ট নেম মিসেস লাস্ট নেম আহমেদ কিংবা ইসলাম কিংবা রহমান কিংবা চৌধুরি। গত অগ্রহায়ণে মরে যাওয়া কিশোরকে কেউ মনে রাখে না, তার অর্ধভগ্ন মা ছাড়া। কোনো কোনো দিন হুট করে তাদের কথা মনে পড়ে বিকেল গড়িয়ে যাওয়ার আগে। 

সেসব দিনে ভাঙা মার্বেলটির মতো গড়িয়ে কোন্‌ অতলে পড়ে যাচ্ছিলাম আমি? সমতল ব্যস্ততা পেলে ভালো হতো। হয়ও। শ'য়ে শ'য়ে ব্যস্ততা ঘিরে ধরে ধারালো ছনের মতো, ঘাসের মতো। পড়ে থাকি তথৈবচ। পড়ে থেকে দেখি শোরগোল, হইচই। ভুলে যাই আমি ভাঙা মার্বেল, সকালের চড়চড়ে রোদ। সন্ধ্যে নামার আগে দেখি কেউ বরফশীতল পানির বোতল কিনে পাঁচিলের নিচে বসে অপেক্ষা করছে। আমার একইসাথে তৃষ্ণা পায় আর চামড়া জ্বলতে থাকে। আপুকে মনে পড়ে। শ্মশানের মতো ধু ধু প্রান্তরে একটা কাকতাড়ুয়া লাগাই। এখন আপুকে আসতে দেয়া যাবে না। একটা ফোন এসে বাঁচিয়ে দেয়। কংক্রিটে গড়াচ্ছি ভাঙা মার্বেলের মতো ঘড়্‌ঘড়্‌ ঘড়্‌ঘড়্‌, যন্ত্রের মতো জরুরি মাপা মাপা কথা বলি। গ্রীবা উঁচিয়ে লোকটা পানি খায়। ওর বাড়ি নেই। আমি বাড়ি ফিরে চলি। রাতে খুব ঝড় আসে। 

আর কোনোদিন খুঁজে না পাওয়ার নিশ্চয়তায় ভাঙা মার্বেল হারিয়ে যায়।

শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

শাহবাগ ভাবনা

ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ভেবেছিলাম বইমেলায় যেতে পারবো না এটা এই মাসে সবচেয়ে বড়ো আফসোস হয়ে থাকবে। ৫ তারিখের পর থেকে সব উল্টেপাল্টে গেল! শাহবাগে সশরীরে থাকতে না পারা, এমনকি মাঝে মাঝে কাজের চাপে ভার্চুয়ালিও থাকতে না পারা আমার জন্য প্রবল আফসোস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমি পেশা হিসেবে শিক্ষকতা করবো বলে ঠিক করেছি প্রায় বছর দুয়েক আগে। দেশের একটা প্রায়-অখ্যাত, থার্ড টিয়ার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ কৌশল পড়াতাম। পড়াতে পড়াতে টের পেলাম যে এই বিষয়ে আমার জ্ঞান খুবই কম। ছাত্রদের হয়তো কোচিং সেন্টারের মত বই আউড়ে দিতে পারি, কিন্তু সত্যিকার অর্থেই বিষয়টা তাকে বুঝানো লাগবে, তত্ত্বের সাথে বাস্তব দুনিয়ার সংযোগটা দেখিয়ে দিতে হবে; সে বিদ্যা আমার নেই। কেবল সূত্র মুখস্ত করে আর অঙ্ক করে তারা হয়তো ভাল গ্রেড পেতে পারে, কিন্তু চাকরিক্ষেত্রে গিয়ে সামান্য অ্যাপ্লিকেশনগুলোতেই আটকে যাবে। আরো একটা ব্যাপারে আমার প্রশিক্ষণ দরকার আছে - সেটা হলো ছাত্রদের মাঝে দায়িত্ববোধের জন্ম দেয়া এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য গড়ে তোলা। এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো সাধারণত মানুষ বাবা-মা কিংবা বড় ভাই-বোন ও আত্মীয়দের কাছ থেকে শিখে নেয়। কিন্তু বাঙলাদেশে জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত বাবা-মায়ের পক্ষে সন্তানদের ভরণ-পোষণের পর এত সূক্ষ্ণ অথচ জরুরি বিষয়গুলো শেখানোর অবকাশ থাকে না। আর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও এই বিষয়গুলোতে নজর দিতে পারে না। এই শিক্ষাটি কেবল ভাগ্যবান ছাত্রদের কপালে জোটে, যারা সেই প্রজ্ঞাবান শিক্ষকদের সংস্পর্শ পায়। আমি কলেজে পড়ার সময় তেমন শিক্ষকদের পেয়েছিলাম, যারা পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের জগতকে বুঝার দৃষ্টি খুলে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন আমার ভেতর।
ভালোকে খারাপ থেকে আলাদা করতে পারার বিবেচনা, ঝাঁকের কইয়ের মতো জনপ্রিয় মতের তরফে চিন্তাভাবনা ছাড়াই না দাঁড়িয়ে প্রয়োজনে বিরুদ্ধমতকে সোচ্চার করার সাহস থাকা প্রয়োজন। এগুলো একজন দায়িত্ববান মানুষ তথা সুনাগরিক গড়ে তোলে। যে ব্যক্তি নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন এবং সেই মতকে সমুন্নত রাখতে এবং মানুষের হিতার্থে প্রয়োগ করতে যে কোন শক্তির মোকাবিলা করার সাহস রাখেন, তিনিই মহোত্তম। তবে এখানে উল্লেখ্য যে, এই সাহস কখনই মুখে বলে দেখানোর সাহস নয়। সামাজিক যোগাযোগে এমন মানুষই বেশি যারা মুখে মুখে অনেক হাতি-ঘোড়া মেরে বসেন, কিন্তু স্থির পরিকল্পনা ও একগুঁয়ের মত একাগ্রতা নিয়ে নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন না। আমরাও এমন চটক আর জেল্লা দেখে ভুল করে তাকেই 'নায়ক' মনে করি। যদিও মূলত তিনি বাক্যসর্বস্ব মানুষ, দায়িত্ব নিতে জানেন না। উচ্চারিত প্রতিটি বাক্যের জন্য যদি দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার চর্চা নাগরিক জীবনে থাকতো, তাহলে আমরা দেখতাম এই মুখে মুখে হাতি-ঘোড়া মারা মানুষগুলো চুপ মেরে গেছেন!
আমি মনে করি একজন ছাত্রের সম্ভাবনা অসীম। অতিক্ষুদ্র শিক্ষকতাজীবনে এমন দুরন্ত ছাত্র দেখেছি, যে নিতান্ত সাধারণ পড়াশোনার মান পেয়েও তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে। আমি নিজেই তাদের শেখার ক্ষমতা ও শিক্ষাকে কাজে লাগানোর দক্ষতা দেখে আশাবাদী হয়েছি। গর্বও হয়েছে যে প্রায় কাছাকাছি বয়সের এমন কাউকে শেখানোর সুযোগ পেয়েছি, যদিও আমি তার থেকে অনেক কম জানি। আবার বেদনার্ত হয়ে দেখেছি কিছু কিছু ছাত্র নিজের অমিত সম্ভাবনাকে অনেকটা না বুঝেই অপচয় করছে। তারা বিদ্যার্জন করছে, কিন্তু তা কেবল নিজের ক্যারিয়ারের স্বার্থে। অস্বীকার করবার উপায় নেই যে অনেকের বাস্তবতা সুখের নয়, হয়তো পারিবারিক দায়বদ্ধতা তাদের ওপর চেপে বসেছে। তাদের দোষ দেখি না। তবে খারাপ লাগে যে এমন সম্ভাবনাময় একজন মানুষকে বেড়ে ওঠার, নিজের পছন্দের ক্ষেত্রে বিকশিত হবার সুযোগ সমাজ দিচ্ছে না দেখে। আমি ভেবেছিলাম যে এই কঠোর বাস্তবতা মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই।
তবে এই শাহবাগ গণজাগরণ আমার সেই ধারণাকে বদলে দিচ্ছে ক্রমশ। আমি এখন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি যে একজন মানুষ তার বাস্তবতাকে বদলে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের চাপিয়ে দেয়া নিয়মকে অবলীলায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার অমিত শক্তি তার ভেতর সঞ্চিত ও সুপ্ত রয়েছে। দরকার কেবল একটু স্ফূলিঙ্গের, আর একটু যূথবদ্ধতার। আদালতের রায় মেনে না নিয়ে যে গুটিকয় মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন, তারা আমাদের সবার মতোই সাধারণ মানুষ। জামাত-শিবির ছাড়া ওইদিন রায়ের সংবাদে কম-বেশি সবাই আমরা ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলাম। চিন্তা করে দেখুন, ওই কয়েকজন এগিয়ে এসে না বসলে, দায়িত্ব নিয়ে ঘোষণা না দিলে হয়ত এই আন্দোলনের জন্মই হতো না! গুটিকয় মানুষ রাজপথে বসে পড়লেন, একদিন পরেই সেই গুটিকয় মানুষ হয়ে গেল জনসমুদ্র। এখানে উল্লেখ্য যে জনসমুদ্রের সকলেরই দায়িত্ববোধ প্রথমে জড়ো হওয়া মানুষগুলোর দায়িত্ববোধের সমান। আমরা নেতাপ্রবণ জাতি, কিন্তু এটা ভুললে চলবে না যে কোন নেতা জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে আমাদের যুদ্ধগুলো করে দেন নি। মানুষ নিজের যুদ্ধ নিজেই করেছে। তেমনি শাহবাগের প্রতিদিনের অসংখ্য মানুষের বিন্দু বিন্দু স্বতন্ত্র চেতনাই এই গণজাগরণের জ্বালানি। আমার আফসোস, এই স্ফূরিত আগুন আমি নিজ চোখে দেখতে পেলাম না, কেবল মনিটরেই দেখলাম।
এই যুদ্ধে আমাদের শত্রু সংখ্যায় দুর্বল। কিন্তু তারা সঙ্ঘবদ্ধ। আমরা সংখ্যায় বহুগুণ। কিন্তু একতাবদ্ধ নই। মাত্র সতেরো দিনের আন্দোলনে আমাদের মাঝে কিছু কিছু মতবিরোধ, চাপাক্ষোভ, মনমালিন্য তৈরি হয়েছে। মাথা গরম না করে চিন্তা করে দেখুন তো, এর পেছনে যাকে দায়ী করছেন, তার মতো আপনি নিজেও কি সমানভাবে দায়ী নন? আন্দোলনের প্রথম দিনের আপনি কি ভেবেছিলেন যে সতেরো দিন পরে এরকম কিছু হতে পারে? কিংবা চিন্তা করুন, যে তিল তিল ত্যাগের মাধ্যমে এই গণজাগরণের অনল ছড়িয়ে গেছে, সেখানে আপনার বা আমার ব্যক্তিগত চাওয়াপাওয়ার গুরুত্ব কতটুকু? নেই বললেই চলে। এর পরেও যদি মনে করেন যে আপনার রাগ বা হতাশা যৌক্তিক, তাহলে একাত্তরে ফিরে যাই, চলুন। ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট হলো। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা। তার সতেরো দিন পরের তারিখ হলো ১২ এপ্রিল। মাত্র দুইদিন হলো বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়েছে! জানেন তো, সেই সরকার গঠনের সময় নিজের স্বার্থ নিয়ে নিচুমনের কাইজ্যা কে লাগিয়েছিল? লোকটার নাম খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ইতিহাস তাকে তার জায়গা দেখিয়ে দিয়েছে।
তাই বলি, ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে ওঠার ক্ষমতা আপনার আছে, জাতি খন্দকার মোশতাক চায় না, বরং স্থিতধী তাজউদ্দিন আহমদ চায়। শত্রু আমাদের চাইতে সঙ্ঘবদ্ধ, কারণ তাদের লক্ষ্য স্থিরকৃত। আমাদের লক্ষ্য স্থির করা হলে সেটা নিয়ে সংশয় প্রকাশ না করে একাত্ম হোন। এটা অমন হলে ভাল হতো, ওটা তেমন হলে ঠিক হতো - এরকম সমালোচনার উদ্রেক হচ্ছে কারণ যখন এটা এবং ওটা ঠিক করা হয়েছে তখন আপনি সক্রিয় ছিলেন না। দায়িত্ব নেন নি। তাই এখন আপনার দায়িত্ব হলো যারা দায়িত্ব নিয়েছে তাদেরকে সমর্থন দেয়া। এই নির্দেশনার কোনকিছু আপনার অপছন্দ হতেই পারে। সেক্ষেত্রে সক্রিয় হয়ে পরের ধাপগুলোকে বাস্তবায়নে অংশ নিন, দেখবেন তখন আপনার নির্দেশনা ও পরামর্শ গৃহীত হচ্ছে। আমাদের শত্রুরা চায় আমাদের মাঝে এই মতবিরোধ লেগে থাকুক, ক্রমেই বেড়ে উঠুক। কারণ একমাত্র এই স্ট্র্যাটেজিতেই তারা জিততে পারবে। আমাদের জনবল প্রচুর, কেবল দরকার মতামত নির্বিশেষে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে দৃষ্টিনিবদ্ধ রাখা।
জয় বাংলা!

সোমবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৩

রাজাকারের ফাঁসি ও প্রাসঙ্গিক চিন্তা

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী বাচ্চু রাজাকার ওরফে আবুল কালাম আজাদকে বাংলাদেশের সংবিধানের সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একাত্তরে ফরিদপুর এলাকায় খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ সহ অসংখ্য কুকীর্তির জন্য দায়ী এই বাচ্চু রাজাকার। পাকিস্তানি আর্মির সাথে মিলে যুদ্ধের সময় নিরীহ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে এই কুখ্যাত অপরাধী। তার শাস্তির রায় শুনে মনে যে অভূতপূর্ব আনন্দ হলো তা প্রকাশের ভাষা আমার নেই। এক ঘুম দিয়ে উঠলাম, এখন মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা মাথায় আরো কিছু ব্যাপার চিন্তা করার সময় এসেছে।
১। বাচ্চু রাজাকার পলাতক। রাজাকারদের দোসর-রাষ্ট্র পাকিস্তানে। তাকে ধরা হবে এই খবর পেয়ে সে পালিয়েছে। এখন তাকে ধরে আনা হউক। পাশাপাশি এটাও চিহ্নিত করা হউক যে কে বা কারা তাকে পালাতে সাহায্য করেছিল। রাজাকার ও রাজাকার-সমর্থক কারো ঠাঁই এই দেশে থাকা উচিত না।
২। এই রায়ের বিপরীতে আপিল করবে আসামিপক্ষ। সেই আপিলের সময় ৩০ দিন। তারপরে সেইটাকে আবার খণ্ডন করা হবে। আমার চাওয়া এই আপিল সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক। কোন জামাত-শিবির বা তাদের ভাবসমর্থক যেন বলতে না পারে যে তারা সুযোগ পায় নাই।
৩। এই রায়ে ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য দলীয়ভাবে জামাতকে দায়ী ঘোষণা করেছে ট্রাইব্যুনাল। সুতরাং জামাতের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে মামলা করে বিচার করার সময় এসেছে। উল্লেখ্য ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালেও বেশ কয়েকটি দলের বিচার হয়েছিল। (তথ্যটি পেলাম একরামুল হক শামীমের কাছ থেকে। তাকে ধন্যবাদ।)
৪। বাচ্চু রাজাকার টিভিতে ধর্মীয় উপদেশের অনুষ্ঠান করতো। তাকে এই সুযোগ করে দিয়েছিল এটিএন বাংলার মালিক মাহফুজুর রহমান, এবং পরে এনটিভির মালিক মোসাদ্দেক আলী ফালু। মাহফুজের দুর্নীতি ও পীড়ন নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। ফালুও কী চিজ, কত টাকা দুর্নীতি করেছে, সবাই জানে। এখন সময় এসেছে শক্ত হাতে এদের বিরুদ্ধে আইনী প্রচারণা শুরু করার। রাজাকারের পৃষ্ঠপোষকদের একে একে ধরা উচিত।
৫। জামাতের বর্তমান অবস্থা হলো তারা বিএনপির সাথে মিশে রাজনীতিতে টিকে থাকতে চেষ্টা করছে। অতীতে আওয়ামী লীগের সাথে মিশেছিল। এই অ্যামিবাসদৃশ বর্ণচোরার দল ভবিষ্যতেও আওয়ামী লীগের সাথে মিশতে পারে। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নাই। এখনই সময় এদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। যুদ্ধাপরাধী বিচারের পাশাপাশি জামাতের ধর্মভিত্তিক বদমায়েশি থামানো দরকার। এটা সহজেই অনুমেয় যে তারা ধর্মানুভূতির দোহাই তুলে পাব্লিক সিমপ্যাথি পেতে চাইবে। কিন্তু এই খুনী ও ভ্রষ্ট দলটির ব্যাপারে এখন সতর্ক না হলে পরে সমূহ বিপদ হতে পারে। এমনিতেই এরা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে।
৬। জামাতের পাশাপাশি কিছু বুদ্ধিবেচা বুদ্ধিজীবীদেরকেও ধরার সময় এসেছে। একজন হলো আসিফ নজরুল, ওরফে নজরুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক, যে মতিউর রহমান নিজামী যুদ্ধাপরাধী নন এমন বক্তব্য দিয়েছিল। এছাড়াও নানা সময়ে ট্রাইব্যুনাল নিয়ে তার মহা আপত্তি। এটা ঠিক না, ওটা ঠিক না, এহেন নাকিকান্না সে প্রায়ই টক-শোগুলোতে কেঁদে বেড়ায়। আদালত নিয়ে এমন অপমানজনক কথা বলায় তাকেও বিচারের সম্মুখীন করা উচিত।
৭। আরেকজন অপরাধী আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। ট্রাইব্যুনালের বিচারকের প্রাইভেসি লঙ্ঘনের দায়ে তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়া উচিত। বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে সেও।
৮। সবশেষের পয়েন্টটা সংরক্ষিত তাদের জন্য, সেইসব ভবিষ্যত-দেখে-ফেলা জাতির কর্ণধারদের জন্য, সেইসব হাস্যকর জ্ঞানীর জন্য, সেইসব ডাইকোটামি-কপচানো রিকনসিলিয়েশন-থিওরির প্রবক্তাদের জন্য, সেইসব 'আসল যুদ্ধাপরাধী' খোঁজা গরুচোরগুলোর জন্য, সেইসব কাব্যচর্চা-উপন্যাসচর্চা-সাংবাদিকতাচর্চা করা পাকিস্তানপন্থীদের জন্য। তাদের দেখে আজ হাসছি। অনলাইনে তাদের তুবড়ি ছোটানো পূরীষগুচ্ছ আজ থেকে এতিম হলো। এইসব কুবুদ্ধিপনার জঞ্জাল একদিন শেষ হবে, ধুয়ে মুছে সাফ হবে। আমি সেইদিন এদেরকে নিয়ে আর মাথা ঘামাবো না।

রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১২

যাকে আমি ভাল পাই না তাকে আমার সিটিএনঃ একটি রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারী ভাবনা

আদি আরম্ভ ছিল মা, জননী, জনয়িত্রী, প্রসূতি। নাড়ির বন্ধন পেঁচিয়ে কোঁকড়ানো চামড়ার সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিল। আরম্ভের সেই মুহূর্তটিতে আসলে অস্তিত্বের স্বকীয়তা সৃষ্টি হয়। জ্ঞানতঃ ওটাই ব্যক্তির প্রথম পরিচয়। পরিচয়ের আদিবিন্দু। ওই বিন্দুর চলার পথকে রেখা বলা হবে, সেই রেখাটি তার ব্যক্তি পরিচয়ের রূপরেখা নির্মাণ করে। ব্যক্তি তার লিঙ্গনির্বিশেষে এই বিন্দুটিকে চেনার চেষ্টা করে নিজের অজান্তেই! যে কোন ব্যক্তির অস্তিত্বের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো জন্মমুহূর্তের কোনো স্মৃতি তার কাছে নেই। এখানে বলে রাখি যে স্মৃতি কিন্তু হুবহু তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে না। যে কোন ঘটনার একটি বড় অংশ আমাদের স্মৃতিতে থাকে না। আমাদের মস্তিষ্কের অভিনব সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার কারণে হারিয়ে যাওয়া অংশটিকে সে জুড়ে নিতে থাকে আশেপাশের তথ্য থেকে। এজন্য আমাদের সকল স্মৃতির একটি অংশ বানানো, সরাসরি ঘটনাটি নয়। যাক, সে অন্য আলাপ। যা বলছিলাম, ব্যক্তির মস্তিষ্কে তার জন্মমুহূর্তের তথ্য জমা করা নেই। থাকলেও সচেতন মস্তিষ্ক সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। তাই সে ধরে নেয় একটি কল্পনার মুহূর্ত ঘটেছিল তার জন্মের সময়। এই শেকড়ের স্মৃতিটি নেই বলেই তার বিপন্নতা। অস্থিরভাবে সে খুঁজে বেড়াতে থাকে কোথায় শুরু, কোথায় আরম্ভ। এই খোঁজের বিপন্নতা থেকে নানাবিধ অবলম্বন দরকার হয় ব্যক্তির।
আচ্ছা, চলুন তো, এই ব্যক্তিকে ভুলে আমরা একটু নৈর্ব্যক্তিক দিকে যাই। বেশ কয়েকবছর আগে, আমি বান্দরবানের বগা লেক থেকে হেঁটে রুমা বাজার চলে এসেছিলাম বন্ধুদের সাথে। প্রায় ছয় ঘণ্টার পাহাড়ি পথ পিঠে একটি ব্যাকপ্যাক নিয়ে হাঁটতে হয়েছিল। প্রথমে আমরা বগা লেকের পাহাড় থেকে সরু পথ ধরে নেমে এসেছিলাম। আগের রাতে শিশির পড়ে পথটি বেশ পিচ্ছিল হয়ে ছিল মনে আছে, ট্যুর গাইড পাহাড়ি লোকটি বেশ অবলীলায় নেমে যাচ্ছে দেখেও আমরা নামতে পারছিলাম না অনভ্যস্ততায়। সেই পথ থেকে নেমে এসে আমরা প্রায় দুই ঘণ্টা একটি ঝরণার পথ পাড়ি দিয়েছিলাম। ঝরণাটি আসন্ন শীতের কারণে শীর্ণদেহ, ঝিরঝিরি পানি বয়ে চলেছে। চারপাশে বৃহদাকার ধূসর পাথর থম ধরে আছে। পাথরগুলো খুলে খুলে এসেছে দুই পাশের পাহাড় থেকে। পাহাড়ের গায়ে গুল্মের চাদর বিস্তীর্ণ সবুজ হয়ে আছে। পকেটের মোবাইল ফোনটি বের করে দেখলাম কোন নেটওয়ার্ক নেই সেখানে। দুয়েকটা পাখির পাখনার ঝাপ্টানো শোনা যায় কি যায় না। জনবিহীন সেই ঝিরিপথে হেঁটে যেতে যেতে সহসাই আমার মনে হল এই বিপুল প্রকৃতির মাঝে আমি অসহায় ও একাকী হতে পারতাম। এখানে আমি আদিম ও নিরক্ত হতে পারি। এই প্রকৃতি শত শত বছর ধরে এমনই আছে। ঋতুর বদলে তার চেহারা বদলায় বটে, কিন্তু সেটাও পর্যায়বৃত্তিক। আমি ক্ষুদ্র একটা প্রাণী, এখানে এসেছি, এবং আবার চলেও যাচ্ছি। আমার পদচ্ছাপও এখানে থাকবে না। এই প্রকৃতির ত্বক স্পর্শ করে চলে যাওয়া অসংখ্য মনুষ্য প্রাণীর কারো কথাই সে মনে রাখবে না। আমরা তার কাছে সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক। যদি এটাই সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে এই প্রকৃতির স্থায়িত্বের ব্যাপারটিই ধ্রুব, আমাদের চলমানতা আসলে জরুরি না। অসীম ঘটনার অসীম সমুদ্রে একজন ব্যক্তির জীবনের সকল ঘটনা খুব ছোট্ট একটি চলক। তাই এর প্রভাব মূল সমীকরণে উপেক্ষণীয়।
আমরা যে বিষয় ও ঘটনাগুলো আমাদের চারপাশে ঘটতে দেখে সেগুলোর মূল্য ও গুরুত্ব পরিমাপ করি, সেগুলোকে জরুরি বা ফালতু দুইটি প্রান্ত ধরে নানাভাবে মাপি, সেগুলো আসলে লম্বা সময়ের বিচারে কোন আঁচড়ই ফেলতে পারে না। তাহলে এই মুহূর্তেই একটি প্রবোধ দিন নিজেকে। আপনার কাছে জরুরি একটি ঘটনা আসলে জরুরি না। কিছু যায় আসে না সেটাকে নিয়ে মাথা না ঘামালে। ফেলে দিতে পারেন, জাস্ট ফর কিউরিসিটিস সেইক, ফালতু মনে করে ফেলে দিয়ে দেখুন আদৌ কোনো পরিবর্তন হয় কি?
ফুটনোটঃ এই লেখাটি যে মুহূর্তে লিখছি, সে মুহূর্তে প্রায় চৌদ্দ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে একটি মহাসাগর ও দুটি মহাদেশ পাড়ি দিয়ে যদি বাংলাদেশে তাকানো যেতো, তাহলে দেখতে পেতাম কিছু তুচ্ছ ইসলামী দল সেখানে হরতাল করছে। ইস্যুঃ (তাদের দাবিতে) ইসলামের মহানবী মুহাম্মদের চরিত্র হনন করা হয়েছে। তাই জ্বালাও পোড়াও। আবার এটাও শুনেছি যে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদার সফর উপলক্ষে তিনটি জেলায় হরতাল হবে না। সুতরাং, (তারা ছাড়া বাকি সবাই যা বুঝছে) এটি মূলত নাশকতামূলক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠান সরকারি শক্তিগুলো (পুলিশ, র‍্যাব) দমন করছে না, কারণ তাহলে ওই বাকি সবার বুঝটা উল্টে যাবে।
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুনার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
(অদ্ভুত আঁধার এক / জীবনানন্দ দাশ)

বুধবার, ১৮ আগস্ট, ২০১০

যৌনকর্মীঃ একজন পেশাজীবীর স্বীকৃতি ও তদসংলগ্ন ছেঁড়া চিন্তা

গত পরশু (১৮/৮/২০১০) বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন একটু খবরের শিরোনামে এসেছেন। ধর্মনিরপেক্ষতা বলবৎ করার ব্যাপারে মূল আলোচনা বা বিতর্কের জায়গায় ছিলো সুপ্রীম কোর্ট। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভের একটাকে পুনর্বহাল করেছিলো তারা। আর এখন নির্বাচন কমিশন ভোটার আইডি'তে যোগ করেছেন বেশ কিছু পেশা। তাদের বক্তব্য, নতুন যোগ করা পেশাগুলোকে আগে চিহ্নিত করা হতো না। সেই পেশাজীবী মানুষদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতেই এই উদ্যোগ।

লিস্টিটা দেখলাম- যৌনকর্মী, ইমাম/পুরোহিত/যাজক(clerics), সেবিকা, হেয়ার-ড্রেসার, ধোপী, কাজের লোক (মেইড), মালী, ক্লিনার, বাবুর্চি, দর্জি, ড্রাইভার। তবে এই পেশাগুলোকে নিয়ে তেমন আলোচনা তৈরি হয় নি। বাঙালি মধ্যবিত্তের মননে 'তোলপাড়' তুলে ফেলেছে কেবল যৌনকর্মী পেশাটি। এই নিয়ে এরই মাঝে কিছু ব্লগে কয়েকটা লেখা দেখলাম, মূলত খবরটার প্রতিক্রিয়া নিয়ে। আশা করেছিলাম যেমন, ঠিক তেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে সকলেই আমার ধারণাটিকে বদ্ধমূল করেছেন যে বাংলাদেশের সামাজিক চালচিত্র মোটেই এই পদক্ষেপের জন্যে অনুকূল নয়।

যৌনকর্মী সংক্রান্ত প্রাথমিক 'বুকিশ' আলোচনার দিকে যাবো না, সেদিকে আমি আপনার চাইতে বেশি কিছু জানি না। তাই চলুন একটু অন্যদিকে চোখ ফেরাই। ঐ যে বলছিলাম, নির্বাচন কমিশন এবং সুপ্রীম কোর্ট নিয়মিতই কিছু পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের মাঝে ঘুরে ফিরে উঠে আসছে। এই উঠে আসার কারণ হয়তো তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের সাথে আমাদের মনন, সামাজিক প্রথাবদ্ধতার অমিল মূলাংশে দায়ী। ধর্মপ্রবণ এবং মোটামুটি অশিক্ষিত এই জনপদে গিজ গিজ করছে মাথা, সেই মাথায় চুল গজায় আবার ঝরে পড়ে টাক বিস্তৃত হয় কিন্তু খুলির ভেতরে ধূসর-বস্তুতে খুব বেশি আলোড়ন ওঠে না। যে খুলিগুলোতে কিছুটা রসদ থাকে, সেগুলো ড্রেন দিয়ে বা প্লেনে চড়ে পাচার হয়ে যায় ফর্সা-চামড়ার দেশে। তার এখানকার কালো, কুৎসিত, কুশিক্ষিত মানুষের মনন একটা আধা-ধর্মান্ধ-আধা-সুশীল অবস্থানে আটকে থাকে (আছে)। এই অবস্থায় আমাদের রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা পরপর দুটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। "যুগের অন্ত" আক্ষরিকার্থেই! কারণ, জন্মাবধি কাগজে কলমেও বাংলাদেশ সাড়ে চার বছরের বেশি সময় ধর্মনিরপেক্ষতা ধরে রাখতে পারে নি।

পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির সময়ে যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছিলো যে এই ইসলামিক রাষ্ট্রটি ১০০ বছর বাঁচবে, যুগে যুগে এইখান থেকে তৈরি হবে নব্য-মুসলিম স্কলার, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথে ও সভ্যতার উৎকর্ষে তারা অবদান রাখবেন; সেই সুখ কল্পনা ছেঁড়া কাথার ফুট দিয়ে পালিয়েছে। পেছনে ছিলো সামরিক লাঠির বাড়ি। আধামূর্খ-আধামুসলিম বাঙালিত্বের লুঙ্গি খুলে খুলে যখন পাক-পবিত্র পাকিস্তানিরা চেক করেছে, তখনই বোঝা গেছে পলিমাটিতে মরু-রুক্ষ ইসলাম জমবে না। এখানে পীর-আউলিয়াদের হাত ধরে আগত ইসলাম কেবল আচারে, প্রথায় রাখা যেতে পারে, তার বেশি মানুষ তা মানবে না।

বাঙালি তখন লুঙ্গি ছেড়ে সবে রাস্তাঘাট বানাচ্ছে আর শার্ট-প্যান্টের সাথে জুলপি রাখতে শিখেছে। তাদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতার গ্রহণযোগ্যতা একটা সামাজিক-রাজনৈতিক উল্লম্ফন ছিলো। কিন্তু পুরো শরীর এক সাথে না লাফালে যেমন গোত্তা খেয়ে পড়তে হয়, তেমনি সাড়ে চার বছরেই ধর্মনিরপেক্ষতার ঝুমঝুমি হাত ফস্কে গেছে, একেবারে নিচতলায়, বেইসমেন্টে ধুলো মেখে। আমরা শনৈ শনৈ সামরিক উন্নয়নে ডুবে গেছি, বন্যায় ডুবেও রাস্তাঘাট আর খাল কেটে স্বস্তি পেয়েছি। ব্রিটিশ জুতো, পাকিস্তানি জুতোর পরে বাংলাদেশী জুতোর পাড়া খেতে আমাদের কালো দেহে মন্দ লাগে নি। পরিবারতন্ত্রের রাশান রুলেৎ খেলা "রহমান ডাইনেস্টি" দুটোর ভগিজগিও গত বিশ বছরে সামরিক শাসনের 'সমসাময়িক' হয়ে উঠছে। তো, এবারে নতুন শতকের এক দশক পেরিয়ে গেলে কোন দৈববলে আবার সেই মানিকরতন ফিরে এলো, তাকে নিয়ে আমরা কী করবো; কোলে রাখবো নাকি ছুঁড়ে ফেলবো, এটাই এখনো ঠিকঠাক ঠাহর হচ্ছে না।

তার ওপরে নির্বাচন কমিশন চাপিয়ে দিলেন পেশা-স্বীকৃতির এই 'অভাবনীয়' বিজ্ঞপ্তি! এবারে আমাদের পুরুষালী রোম খাড়া হয়ে গেছে। এই উত্তেজনায় বাকি সবগুলো পেশাজীবীকে বাদ দিয়ে আমরা যৌনকর্মীদের নিয়ে পড়েছি। এমনিতেই তাদের ব্যাপারে ট্যাবু, চাপা-আগ্রহের কোনই কমতি নাই, তার ওপর নিঃকঃ এসে পেশা হিসেবে উন্মুক্ত করে দিলো যেন। এখন হিসেব উঠে আসছে, ঢাকায় ঠিক কতোজন যৌনকর্মী আছেন, ঠিক কোন কোন জায়গায় তাদের ডেরা, বাংলাদেশেই বা কতোগুলো 'নিষিদ্ধপল্লী' আছে ইত্যাদি।

খেয়াল করলাম, যে পেশাগুলোকে নতুনভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই নারীর পেশা। ইমাম/পুরোহিত/যাজক, মালী এবং ড্রাইভারের পেশাতে এখনও পুরুষের একচ্ছত্রতা। সেবিকা, যৌনকর্মী, কাজের লোক এগুলো পেশায় নারীর একচ্ছত্রতাও উল্লেখ করি। বাদ বাকি পেশাগুলোতে ধীরে ধীরে নারীকে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। এই সবগুলো পেশার মধ্যে মিল হলো সচরাচর এগুলোকে সমাজ ও রাষ্ট্র 'চিনতে' চায় না। কাজের লোককে নামমাত্র বেতনে রাখা হয়। ইংরেজি খবরে "ক্লিনার" বলে সম্ভবত মেথর ও জমাদার বুঝিয়েছে, তাদেরকেই বা কতোটা দ্রষ্টব্য ভাবা হয়? সেবিকাদের নামের আশে পাশে 'মহামতি ফ্লোরেন্সে'র নাম নিয়ে তাদেরকেও শ্রমের ন্যায্যমূল্য দেয়া হয় না। হয়তো শুভ্র পোশাকের সেবিকাদেরকে ততোটা 'খেটে খাওয়া' বলে মনে করতে আমাদের 'সুশীল' চোখ অভ্যস্ত নয়। আর সেই সুশীল চোখের কাছে যৌনকর্মীর নাম দূরে থাক, উল্লেখমাত্রই একেবারে অচ্ছুৎ।

তবু নিষিদ্ধের কৌতূহল আর বিকৃত আগ্রহ আমরা নিশ্চিত লালন করি। তাদের জীবন ও জীবিকার খবর জানতে, পরিসংখ্যানের ভেতরে আরো খতিয়ে জানতে অনেকেই উৎসুক। এই ঔৎসুক্য জন্মেছে পারিবারিকভাবে শেখানো ঠুঁটো নিষিদ্ধতার কারণে। যৌনতা এ অঞ্চলে ট্যাবু হলেও অন্তরীণ নয়। সকলেই চর্চা করেন, এখন তথ্যপ্রবাহের ঢেউয়ে তার অনেকটাই জানা যায়। নারী বা পুরুষ কেউই এই চর্চার বাইরে নেই। হয়তো অংশগ্রহণের স্বাভাবিকতায় নারী যুগযুগ জিইয়ে রাখা জড়তা এখনও কাটাতে পারে নাই, তবু প্রায় সমানে সমানেই (আড়ালে বা প্রকাশ্যে) যৌনতার লালন ঘটছে।

সুতরাং এখানে কোন উন্নাসিকতার উপায় নেই, সুযোগ নেই উপেক্ষার। স্বীকার করেই নিতে হয় যে এই আদিমতম পেশাটি বঙ্গ-জনপদে প্রাচীনকাল থেকেই আছে, আছে এর "ভোক্তা" (পুরুষ) ও "কর্মী" (নারী)। সমাজে পুরুষ নিজের সামাজিক প্রতিপত্তি আর পরিচয়ের জন্যে রেখেছে স্ত্রী, আর ভোগ ও লালসার জন্যে রেখেছে যৌনকর্মী। এবং নিজেদের 'সম্মান' ধরে রাখতে এই কর্মীদের নাম দিয়েছে 'পতিতা', 'বেশ্যা' ইত্যাদি। নামগুলো দেখুন, নিছক শব্দ হিসেবেই প্রথম শুনেছিলেনঃ কিশোর বয়সের কথা মনে করুন। তারপরে শিখে গেছেন, এগুলো কতোটা নিকৃষ্ট শব্দ, অশ্লীল, অসভ্য, কুৎসিত। তারপরে পরিচিত হয়েছেন এই শব্দগুলো যাদের সাথে ব্যবহার করা হয়, তাদের সাথে - সেই নারীদের সাথে যারা পতিত, অস্পৃশ্য, নিষিদ্ধ ইত্যাদি। অথচ তারা কোথায় থাকে, কি করে, কারা তাদের কাছে যায় এটা জিজ্ঞেস করলে নিশ্চিত বড়ো একটা ধমক খেতেন। 'চুপ' বলে চেঁচিয়ে উঠতো আপনাকে আদর্শলিপির পাঠ দেয়া 'পুরুষ' চরিত্রটি।
এই চর্চা, আবহমান সংস্কৃতির মতো চলে আসছে। পুরুষ কখনই যৌনকর্মীর কাছে যাওয়া থামায় নি, এবং নিয়মিত খদ্দেরকেই দেখা গেছে তাদের বিপরীতে উচ্চকণ্ঠে। এই দ্বিমুখী আচরণ আসে কুশিক্ষা থেকে, প্রথাবদ্ধতা থেকে, অন্ধের মতো ক্ষমতা দখলের লিপ্সা থেকে। এখানে কেন ক্ষমতার কথা আনলাম? একটু ভেবে দেখলে আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন।

সমাজের ক্ষমতার পিরামিডে এই নারীদের অবস্থান কতোটা নিচে! হয়তো সবার নিচে। এমনিতেই অনগ্রসর ও দরিদ্র জনপদে গড়পড়তা নারীরা ২য় শ্রেণীর নাগরিক, তার ওপরে তাদের মধ্যে যারা দেহব্যবসার সাথে জড়িত, তারা না পান পরিচয়, না পান মূল্য - সামাজিক অবস্থান তো দূরাস্ত। এ অবস্থায় তাদেরকে আলাদাভাবে কেন 'পতিত' বলে চিহ্নিত করা হলো? কারণটা কি খুব স্পষ্ট না? কারণ সমাজের পুরুষের দুশ্চরিত্রের অনেকটা চেহারাই তাদের কাছে উন্মুক্ত। ভ্রষ্ট প্রথা মেনে সমাজে প্রতিপত্তি গড়ে তোলা উপরতলার বেশির ভাগ পুরুষ এই সকল নারীর ভোক্তা। কাঁচা বাজারে গেলে তারা যেমন প্যান্ট উঁচু করে চলেন, কাদা মাড়ালে যেমন তাদের নাক কুঁচকে যায়, সেই সকল উন্নাসিকের গতায়াত এই অঞ্চলে অহরহ। আর সেজন্যেই, যৌনকর্মীদেরকে সমাজের নিচু থেকে নিচুতলায় ঠেলে দিলে এই সব পুরুষদের স্বস্তি হবে। এতোটা নিচুতলা থেকে তারা আর কিইবা বলবে, আর সেটা কে-ইবা শুনবে?

বিষয়টা প্রবলভাবে রাজনৈতিক - ক্ষমতার বন্টনের মতো। কিন্তু সে দিকে না তাকাই। আমরা বরং 'আম' জনতা সেজে থাকি। অন্ধকারে আমাদের মাঝে কে কে এই পল্লীতে এগুবেন সেটা একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার। আমরা সেখানে কোন জাজমেন্টাল অবস্থান নিতে চাই না।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন যৌনকর্মীদের স্বীকৃতি দিচ্ছেন। যুগের পর যুগ ধরে তাদের প্রতি জমে ওঠা অবহেলা, নাক সিঁটকানোর স্বভাবটাকে বদলাতে তারা সমাজের আরো পাঁচজন পেশাজীবীর কাতারে উঠিয়ে নিয়ে আসছেন। এই পদক্ষেপটি যাদের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তারা স্বভাবতই উপরে উল্লিখিত মানুষদের মতো মন-মানসিকতা ধারণ করেন। যতোক্ষণ তাদের সেই কূপমণ্ডুক, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব তারা নিজেদের ভেতর রাখছেন, ততোক্ষণ সেটা নিয়ে মনে হয় না কারো মাথাব্যথা আছে। কিন্তু যখনই তারা গলাবাজি করে সমাজের নৈতিকতা, এবং অনুশাসনের বুলি আওড়াতে যাবেন, তখন মনে করিয়ে দেয়া জরুরি যে এই নারীদের পেশাবৃত্তির ভোক্তাশ্রেণীটি কারা।

যৌনকর্মীদের পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াটা মূলত পুরুষ ভোক্তাদেরকে ভোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সমতূল্য। এই বিষয়টিই হয়তো কাঁটার মতো গলায় বিঁধছে অনেকেরই। তাদের জন্যে প্রেসক্রিপশন, দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার পুরুষতান্ত্রিকতার গলায়, মানবতার ফোরসেপ দিয়ে কাঁটাটি না তুললে অচিরেই সেপটিক হয়ে যাবে। তখন না গোটা গলাটাকেই কেটে ফেলতে হয়!


***
[*নির্বাচন কমিশনে এবং সরকারি কর্তাব্যক্তিদের মাঝে কোটি কোটি দোষত্রুটি আছে। এই সরকার ইতোমধ্যেই বিভিন্ন খাতে ব্যর্থতার পরিচয় 'সগৌরবে' রেখেছে। তারপরেও এরকম কিছু দুরন্ত উদ্যোগের জন্যে তারা সাধুবাদ দাবি করেন। বাংলাদেশে সামরিক ও ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়াশীলতার পিঠে এরকম প্রগতিশীল পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই!]

রবিবার, ২৪ মে, ২০০৯

বেশ্যানগর

বেশ্যানগরে রাত দশটার পরে বিকটাকার ট্রাক প্রবেশ করে। বলা উচিত ঘোঁত ঘোঁত করতে করতে ঢোকে। দুর্দান্ত বেগে, সজোরে, এবং নির্ভুল লক্ষ্যে। তার আগে, বিকেল থেকে সন্ধ্যা গড়িয়ে গড়িয়ে, ধীরে ধীরে পড়তে থাকে এই গ্রীষ্মে। দমফাটা গরমে ছয়টার কাঁটা ঘড়ি ছেড়ে পারলে বেরিয়ে আসতে চায়। সাড়ে ছয় পেরিয়েও গরম বাতাসের আঁকুপাকু শ্বাস থামে না। তারপরে কালশিটে পড়লে, রাস্তার বুকের ওপরে, কোমল শিথিল সিএনজি বা গাড়ি চলাচল করে। তাদের ধুকপুক গরম ইঞ্জিনের দাগ লেগে থাকে ফ্লাইওভার কিংবা বিলবোর্ডের গায়ে। ক্লান্তচলন ছেড়ে একসময় তারা গৃহস্থের ঘরে ফেরে, গ্যারেজে, গোডাউনে, ছাদের তলায়। তারপরে ক্রমশ শান্ত হবে রাজপথ, ভেবে সকলেই ঘরে ফিরতে চায়। সেসময়ে, এই বেশ্যা নগরে ঠিক কয়েক মুহূর্তের জন্যে হলেও একটা নিঃস্তব্ধতা নেমে আসে।


ফটকের এপাশে ওপাশে পথের চিহ্ন প্রকৃতি আলাদা। ওপাশে কাঁচা ইট, এপাশে ঘন কংক্রীট। তারপরে ধীরে পথ হয়ে ওঠে পিচগলা আলকাতরা-গোলা। ট্রাকের শরীরের ভীড়ে, হেডলাইটের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ে সেই নরোম নালীতে-উপনালীতে-গলিতে-উপগলিতে। পাড়া সজাগ হয়ে যায়। ঘরের বাতি নিভিয়েও ঘামভেজা মিশ্রিত শরীরে উল্কি এঁকে দেয় ট্রাকের শিস। শীৎকারের শব্দ ছাপিয়ে সবাই শুনতে থাকে, সারি সারি ট্রাক নেমে আসছে, জড়ো হচ্ছে! তাদের জমায়েতে অশ্লীল চালক সমবায় সমিতির হলুদ-দেঁতো নেতা হাত তুলে রাখেন। সবাই নীরবে তাঁকে অনুসরণ করে। পথের মাঝে তখনও বিচ্ছিন্ন কয়েকটা সিএনজি ঘুরছে। মালিকের জমা টাকার পরে, নিজের ঘরের জন্য কিছু উপার্জনের আশায়। এখনও বউয়ের কাছে ফিরতে পারেনি, রাতের বাজার সেরে, এমন ঘষটানো চাকুরে বলদগণের বাহন হওয়ার ধান্দায়।


মিরপুর দশের মোড়েই রাত জমে থাকে দশটার পরে। সেখান থেকে কাকলি রেলগেইট, খালি দশ খালি দশ খালি দশ। সিএনজিওলা হাঁকে। সওয়ার চারজন হলেই দে-ছুট। ছুটে ট্রাকের পিছনে পিছনে, ওভারটেকের সাহস নাই। একটু পরে সেটা সামনে থেকে সরে যায়। আরেকটা ট্রাক দেখা যায় রাস্তার মোড়ে আড়াআড়ি খুব শিথিল পড়ে আছে। একবারে সে উল্টো ঘুরতে পারে না, বেশ্যানগরের নালীগুলো অনেক সরু। দু'পাশে প্রচুর ফুটপাত ছাপানো হকারের টং। নীল নিরোধক পলিথিনে মোড়ানো ছাপড়া। সেগুলোকে বাঁচিয়ে শক্ত ট্রাকের উল্টো ঘুরতে দু'বার আগুপিছু হওয়া লাগে। আস্তে আস্তে তার প্রগমণ দ্যাখে নীরব সিএনজি। তারপরে একটু ফাঁকা পেয়েই সেই দানবের পেছনের চিপা আইল্যাণ্ড উপড়ে সে ছুটে। যাত্রীগুলো একটু ঝাকুনিতে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে সামলায়। কম্পাঙ্ক বাড়লে আমরা হয়তো অপরিচিতকেও আপন ভাবি।


দশটার পরে মাইয়্যা, মাগীরাও নামে। ঘোমটা দেয়া সারি সারি মেয়েরা সূর্যের সাথে ওঠে, চাঁদের সাথে ডোবে। সোডিয়াম আলোর উজ্জ্বলতায় তারা ঘরে ফিরে। ভোরে আবার সেই আলোর ম্রিয়মাণ চোখের ওপর দিয়েই তারা কাজে বেরুবে। এই মাইয়্যাগুলার দু'পায়ের ঘন ওঠানামা, হাতের পর্যাবৃত্ত মন্থনের ওপর নির্ভর করছে এই বেশ্যানগর। স্থূলাঙ্গী, শীর্ণাঙ্গী, শাদা, শ্যামলা হাজারো নারীকে সাজিয়ে রাখতে খুপরি খুপরি ঘরে তীব্র আলোতেই তারা সেলাই হয়ে যায়। সেই নীরব ঘটাং ঘটাং সূঁচ তাদের শরীরে কোন দিক দিয়ে ঢোকে আর বের হয় কে জানে? এমন সেলাই, দাগও থাকে না শালার! এই মাইয়্যাগুলা ট্রাকের পথের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে ফিরে। তাদের মাঝ থেকে কেউ কেউ ট্রাকের সাথে মিশে হারিয়ে যায়, পরের দিন সেলাই হওয়ার আগেই।


আরো কেউ কেউ এই শুনশান নগরে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। দুগ্ধফেননিভ শয্যায়। শুভ্রকুসুমিত ব্রীড়া শতফুটো চাদরে মাখা থাকে। মলিন লুঙ্গি তুলে তাদের স্বামীরা পাশে শোয়। সারি সারি শরীর, সারি সারি ঘাম, থাম, আলো, চিৎকার, ঘুম, মরণ। এভাবে শহরের রাত বাড়তেই থাকে। চাঁদের কলার সাথে তুলনাবাজির দিন শেষ। এখন ঋতুস্রাবের দিনের সাথে তুলনা খুবই মোক্ষম মিলে যায়। এক মাসে সেটা মিস হলেই সকলে সজাগ হয়। এমআর এমআর বলে কিশোরী-যুবতী ছুটে ছুটে আসে আরো হাজারো সাজানো বিগলিত শুভ্র বিছানায়। সেখানেই তাদের শরীর থেকে মুক্তো বেছে নেয়া হয়। এই শহরের ঝলমলে আলোকসজ্জায় খুব দরকারি সেসব মুক্তো। ঐ মাইয়্যা-মাগীরা কী করে জানবে সেই কথা?


ট্রাকের চালকেরাও একদিন ক্লান্ত হয়। বেশ্যানগরের ফটক বার বার পার হতে হতে, পার হয়ে যেতে যেতে তারা যখন শুনতে পায় খোপ খোপ খোঁয়াড় থেকে গৃহস্থরা বেরিয়ে আসছে। ফুটপাত থেকে উঠে আসতে থাকে মাইয়্যারা, খুপরি থেকে হকারের স্যান্ডলের শব্দও পাওয়া যায়! এভাবে দলে দলে কোটি কোটি মুখ, কোটি কোটি ঘামকণা। তরল আগুনচাষী সূর্যের আলো বেরুনোর আগেই তারা জমায়েত হয়। তাদের জমায়েতের উদ্যান এই বেশ্যানগরে একটাও নাই। তারা ঘরের ব্যালকনিতে জমা হয়। ওভারব্রীজের ওপরে জমা হয়। মরাধ্বজা লেকের পাড়ে জমা হয়। কনস্ট্রাকশন সাইটের বালুতে তাদের বিষণ্ণ ছায়া পড়ে। ছায়া কেঁপে কেঁপে ওঠে। এই বেশ্যানগরে তাদের অনবদ্য ইতিহাস হা, হা করে শ্বাস নিতে নিতে একদিন গুমখুন হয়ে যায়।