স্মৃতিচারণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
স্মৃতিচারণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০১৯

অরোরা

শনিবার বিকেলে একরাশ উৎকণ্ঠা আর ক্লান্তি ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠলো অরোরার হার্টবিট। হাতের তালুতে রাখা যায় এমন মাউসের মতো একটা যন্ত্র ছিল আমাদের, ওটা দিয়ে হার্টবিটের আওয়াজ শোনা যেতো। বিছানায় শুনে দীর্ঘ দুই মিনিট ধরে এক, দুই, তিন করে বারবার মাপলাম। সব ঠিক আছে তো? বিকেলের আলো ঢলে পড়তে পড়তে নিশ্চিন্তির বাতাস বইতে শুরু করলো। তখনও আমরা জানতাম না সামনে কী নাটকীয় সব ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।

দিন চারেক আগে শেষ চেক-আপের সময় ডাক্তার বলেছিল রবিবারে ব্যাগ বেঁধে ক্লিনিকেই চলে আসতে। রবীন্দ্রনাথকে কাঁচকলা দেখিয়ে কন্যার মা আর সবুর করিতে পারিতেছে না। কন্যার বাপ তো আগে থেকেই রাজি, যেহেতু গর্ভবহনের কায়ক্লেশে তাকে পড়তে হয় নি তাই তার মতামত এই ব্যাপারে নগণ্য। কন্যা ওদিকে ভেতরে বসে জাতীয় খেলা হাডুডু আর বিজাতীয় খেলা ফুটবল ও সাঁতারে দিন দিন অলিম্পিকের সোনা-জয়ী হয়ে উঠছে। তার হুটোপুটিতে আমরা যারপরনাই উচ্ছ্বসিত, ব্রীড়া ও জড়তার মাথা খেয়ে জনে জনে বলে বেড়াচ্ছি আর আগ্রহী অনাগ্রহী নির্বিশেষে সবার হাত ধরে পেটের ওপর রেখে 'কিক' খাওয়াচ্ছি। রবিবারের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে দিনগুলো চুইংগামের মতো লম্বা হয়ে গেল। সেই রাতে আবারও হার্টবিট এলোমেলো হয়ে গেল। কেমন একটা শিরশিরে ভয় হচ্ছিলো। আধুনিক মানুষ কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলতে পারি, কিন্তু মারফির সূত্রকে অস্বীকার করি কেমন করে? তাই নিশিরাতে অন্ধকার রাস্তায় নামলাম দুইজনে। বাসা থেকে ক্লিনিক দশ-পনের মিনিটের পথ কিন্তু রাতের অন্ধকারে শুধু দু'টা শাদা হেডলাইটের আলোয় হাইওয়ে দিয়ে যেতে যেতে মনে হচ্ছিলো অনন্তকালের পথে যাত্রা করছি আমরা। সামনে নিকষ কালো অন্ধকার আর অনিশ্চয়তায় ভালো করে বেশি দূরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। গাড়ির ভেতরে নিস্তব্ধতায় অনিয়মিতভাবে ধুকপুক করছে তিন-তিনটে হৃদপিণ্ড!

রাত তখন সাড়ে দশটা। এতো রাতে সারা ক্লিনিকে কোথাও তেমন শোরগোল নেই, ডাক্তার নার্স বহিরাগতদের আনাগোনা নেই, শুধু শেষমাথায় লাইটবোর্ডে লাল কালিতে এমার্জেন্সি লেখাটা জ্বলজ্বল করছে। আমাদের চোখে-মুখের উদ্বিগ্নতা দেখে নার্সদের বেশি কিছু বোঝার বাকি নেই। নাম-ধাম লিখে দিতেই যা দেরি, দেখলাম তিনজন নার্স মিলে স্বর্ণাকে একটা বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে। মনিটরে শোনা যাচ্ছিলো অরোরার ধুকপুক ধুকপুক হৃদস্পন্দন। ১৩০। ১৩৫। ১৪০। ১৫০। ১২৫। ১২০। একেকটা মিনিট যায় আর আমার মনে হতে থাকে সমুদ্রতীরে বসে অবিরাম স্রোত আছড়ে পড়ার শব্দ শুনছি। শাদা পর্দা দুলে ওঠে। হাসিমুখে স্ক্রাব পরা ডাক্তার এসে বসেন, আমরা তো অনেকক্ষণ ধরে দেখছি, কোন চিন্তা করো না, সবকিছু স্বাভাবিক আছে। পাশে নার্সও স্মিত হাসে, ফার্স্ট টাইম, রাইট?

ফেরার চিরচেনা পথটাও অদ্ভুত অচেনা মনে হচ্ছিল। মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে ততোক্ষণে, রবিবার শুরু হয়ে গেছে। আহ, বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই রবিবার! পুরো রাস্তায় গাড়ির নামগন্ধ নেই। পরদিন সবারই অফিস বলে আমাদের পাড়া-গাঁয়ের সবাই তখন নিশ্চিন্তে ঘুমের কোলে বিশ্রাম নিচ্ছে। শুধু আমরা দুইজন তৃতীয়জনের অপেক্ষায় দম আটকে বসে আছি। সিগন্যালের সবুজ-হলুদ-লাল লাইটগুলো জ্বলে নেভে, একেকটা সিগন্যাল পেরিয়ে অলিগলি ঘুরে বাসায় পৌঁছে যাই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতো। শরীর অবসন্ন দু'জনেরই, তাই শুয়ে পড়ার পরও ঘুম আসে না অনেকক্ষণ। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে হাজারটা চিন্তা চলতে থাকে ঝড়ের গতিতে।
২

ক্লিনিকটার নাম উইলো ক্রিক। চারপাশে সবুজ টিলার পাদদেশে একটু নিচু সমতলে দো-তলা বিল্ডিং। চারপাশে আরো কয়েকটা ছোটখাটো বিল্ডিংয়ে ফার্মেসি, এডমিন ইত্যাদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। গত নয় মাসে বারবার এখানে চেক-আপের জন্য আসতে আসতে দরজা-জানালাগুলোও পরিচিত লাগে এখন। হাইওয়ে থেকে নেমে সোজা রাস্তায় সামনের দরজা দিয়ে ঢুকে একদম পেছনের দিকে লেবার অ্যান্ড ডেলিভারি। রবিবার বিকেলে বড় একটা ড্যাফেল ব্যাগে তল্পিতল্পা তুলে এনে উঠলাম আমরা। অতি-চিন্তিত মুখে কাগজে সই-সাবুদের কাজ সেরে সব গুছিয়ে বসতে বসতে বিকেল সাড়ে পাঁচটা বেজে গেলো।

আধো-ঘুমে আধো-জাগরণে ভোর হয়েছিল আমাদের, সকাল জেগে উঠে আড়মোড়া ভাঙার সময় স্বর্ণার কনট্র্যাকশন শুরু হয়ে গেলো। শুরুটা শান্ত পুকুরে ঢিল ছোঁড়া ঢেউয়ের মতো, দুপুর গড়াতেই তা হয়ে গেল প্রমত্তা পদ্মা। সন্ধ্যার দিকে ডাক্তার এসে বলে গেলো এখন থেকে আর কোনো শক্ত খাবার দেয়া যাবে না, শুধু বরফকুচি। ততক্ষণে ব্যথার মাত্রা বেড়ে গেছে।

দুপুরে আপু এসেছিল একগাদা খাবার-দাবার নিয়ে। সেগুলো বাসায় ফ্রিজে পড়ে রইলো। কেবিনে থিতু হয়ে বসে খুচরো গল্পগুলো খোলামকুচির মতো উড়ে উড়ে সঙ্গ দিচ্ছিলো আপু চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। তারপর শুধু আমরা দু'জন এই হলুদাভ আলোয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি মনিটরে প্রেশার মেশিনে ক্যানুলায় জড়িয়ে বসে রইলাম। ঘরজুড়ে সশব্দে হৃদস্পন্দন বাজছে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো তবুও অনেক ভয় পাচ্ছে। বাম হাতের আঙুলগুলো জড়িয়ে ধরে বসে থাকলাম। কিছু কিছু সময় হয়তো নীরবতাই সোচ্চারে কথা বলে। গত রাতের সেই অন্ধকার হাইওয়েটা আমার কাছে আবার ফিরে এলো নিকষ অন্ধকারের কালি ছড়াতে ছড়াতে। হাতের ভাঁজে সুঁই গাঁথা, সেটা দিয়ে বিন্দু বিন্দু করে আসছে মহৌষধি। ভারিক্কি চেহারার অন-কল ডাক্তার এসেছিলেন একটু আগে, ওর তো প্রি-এক্লামশিয়া হয়ে গেছে। ব্লাড প্রেশার অনেক বেশি ওঠানামা করছে। একটা লাইনে ম্যাগনেশিয়াম স্টার্ট করে দেন, ডাক্তার নার্সের দিকে তাকিয়ে বললেন। তার গলার স্বরে একটু দুশ্চিন্তা ঠাহর করলাম কিনা তা বুঝে ওঠার আগেই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই ম্যাগনেশিয়াম সরাসরি শিরায় দেয়া হবে। বাচ্চার শরীরেও চলে যাবে। বাচ্চা হওয়ার পর যদি দেখেন সে ঘুমে ঢলে পড়ছে তাহলে সেটা এই ওষুধের প্রভাবে। শুনে মনে হলো খারাপ সংবাদকেও কীভাবে মধুমাখা বাক্যে বলা যায় তা এদের কাছ থেকে শেখা দরকার। এ এক অদ্ভুত প্রতিভা। দুরুদুরু বুকে ওর দিকে তাকিয়ে দেখি মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে। বললাম, বরফকুচি খাবে? দিবো? ডাক্তার চলে যাওয়ার পরে ও বললো, একটু চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকি, খুব ক্লান্ত লাগছে। আমি ওর হাত ধরে বসে থাকলাম।

উইং জুড়ে নতুন জীবনের অপেক্ষা আর সদ্য বাচ্চাদের খুচরো আওয়াজ কানে আসে। কেবিনের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বসে বসে আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকি। তার চোখ বোঁজা মুখের দিকে দেখি, ডান হাতে লাগানো প্রেশার মেশিনে অসম্ভব সব সংখ্যা দেখায়, বাম হাতে চলা সরল পর্যায়বৃত্ত ড্রিপ - টপটপ করে রক্তে মিশে যাচ্ছে। সন্তর্পণে দরজা খুলে আসে মারিয়া, মধ্যবয়স্ক মেক্সিকান নার্স, পেছনে চুল টেনে শক্ত করে বাঁধা। মারিয়াকে দেখলেই ভরসা লাগে, কী সুন্দর শান্ত গলায় কথা বলে, ঝটপট কাজ করে, এক হাতে টান দিয়ে বিছানা সোজা করে ফেলে শুয়ে থাকা রোগীকে না জাগিয়েই। আমাকে বসে থাকতে দেখে বলে, চিন্তা করো না, সব ঠিকঠাক হবে। কিছু খেয়েছো? আমি হুঁ ঠিক আছে বলে পাশ কাটাই। স্বর্ণা চোখ খুলে বলে, ব্যথা বেড়ে গেছে। তখন মধ্যরাত। ডাকাডাকির পর ডাক্তার বললো, এপিড্যুরাল নিয়ে নাও, কষ্ট কমে যাবে। শোয়া থেকে উঠিয়ে সোজা করে বসিয়ে মেরুদণ্ডদের হাড়ের ফাঁকে একটা ধাতব সুঁই ঢুকে গেলো, মাংস ফুঁড়ে দুই কশেরুকার মাঝের ফাঁক দিয়ে গিয়ে নরম মেরুরজ্জুতে ঢেলে দিলো স্নায়ুবশের ওষুধ। ডাক্তার দেখলেন না, পাশ থেকে আমি দেখলাম ব্যথার তীব্রতায় ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। এক হাতে আমাকে আর অন্য হাতে মারিয়াকে শক্ত করে ধরে আছে, অথচ একটা টুঁ শব্দ না করে নিঃশব্দে কাঁদছে। ঝিনুক নীরবে সহে যাও, ভিতরে বালির বিষ, মুখ বুঁজে মুক্তো ফলাও।

আধ ঘণ্টা পরে এপিড্যুরালের সুতোর মতো নলটা পিঠের ঠিক মাঝখানে নিয়ে আবার শুয়ে পড়লো স্বর্ণা। আমি বললাম, ২৫ তারিখ কিন্তু শুরু হয়ে গেছে, এখন সোমবার রাত দুইটা। স্বর্ণা বললো, দেশে কয়টা বাজে? আহা দেশ। পরানের গহীন ভেতরের সবাই যেখানে, অর্ধেক পৃথিবীর ঘুরে জুলাইয়ের উষ্ণ দুপুরের রোদ যেখানে হয়তো সবকিছু তাতিয়ে দিচ্ছে - সেই দেশ চোখ বুঁজলে দেখতে পাই। সে কল্পনা কতটুকু সত্য, কতটুকু আমার উইশফুল থিঙ্কিং - তা কে জানে! একটু কল দাও তো, খুব মন কেমন করছে। উপগ্রহে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে মুহূর্তেই সেই নীরব নিস্তব্ধ দ্বিপ্রহর রাতের কেবিনে উৎকণ্ঠিত দেশ বেজে উঠলো, স্বর্ণা, কেমন আছো? কেমন লাগছে? অনীক, ওর কী অবস্থা? ডাক্তার কী বলেছে? অরোরা কেমন আছে? সবকিছু ঠিক আছে তো! পরিস্থিতি সামলাতে হয়, বাস্তবতায় রঙ চড়িয়ে বলতে হয়। এ যেন এক দুর্ভেদ্য মায়ার ঝিল্লি, যার এপাশ থেকে ওপাশে সব ছবি সব কথা বদলে যেতে থাকে।

এমনকি সবচেয়ে গাঢ় তিমির রাত্রিও একদিন শেষ হয়, তাই আধো ঘুম আধো জাগরণের সেই প্রতীক্ষার রাত শেষ হয়। জানালার পাশে কিছুক্ষণের জন্য পিঠ সোজা করে শুয়েছিলাম। ব্লাইন্ডের ফাঁক গলে নরম নীল আলো এসে জানান দেয় সকাল হয়ে গেছে। মারিয়া এসে কপালে দুশ্চিন্তার রেখা ঝুলিয়ে বলে, বাচ্চা ঘুরে গেছে, ওকে ধীরে ধীরে সোজা করতে হবে, নইলে নরমাল ডেলিভারি হবে না। স্বর্ণাকে এক কাত করে শুইয়ে কাধ ধরে রাখলাম আমি। অন্যদিকে মারিয়া স্থির হাত বুলিয়ে আশ্চর্য ম্যাজিক শুরু করলো। নিমগ্ন ধ্যানী চোখ প্রায় নিমীলিত, গ্লাভস পরা দশ আঙুলে ছুঁয়ে ধরে আছে আমার অপত্যকে। খেলার ছলে যে ঘুরে গেছে অনেকটাই, এদিকে ওর যে জেগে ওঠার সময় হয়েছে তা খেয়ালই নেই হয়তো। দমবন্ধ দুই মিনিট পর ধীরে ধীরে সরতে শুরু করলো সে, ঘুমের ঘোরে। জাদুমন্ত্রের মতো ভেলকিতে ঘুরে যেতে থাকলো সূর্যঘড়ির ছায়ার মতো, পৃথিবীর ঘূর্ণনের মতো। সে এক নিবিড় সাঁতার জাগরণের দিকে।

ঘড়িতে তখন মধ্যদুপুর ছুঁই-ছুঁই। ডাক্তার ডিউক এসে পড়লেন, লেটস গো। স্বর্ণাকে দেখে মনে হলো যেন ট্র্যাপিজের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আর নিচ থেকে ওকে সঙ্কেত দিলো কেউ। জগত-সংসারের সকল শক্তি তার ভেতরে জড়ো হলো।

লেটস পুশ!

ওয়ান!

টু!

থ্রি!

ফোর!

ফাইভ!

সিক্স!

সেভেন!

এইট!

নাইন!

টেন!

...

নাউ ব্রিদ!

... ...

এগেইন!


৩

আমার মনে হচ্ছিল উত্তাল ঝড়ের মধ্যে একটা ছোট ডিঙি নৌকায় চড়েছি আমরা। চারিদিকে থই থই পানি - সে পানির রঙ কালচে সবুজ। জন্মনালিকা বেয়ে নেমে এসেছে প্রবল খরস্রোতা সে নদী। সেই নদীর ওপর দুলছি আমরা, ডুবছি, ভেসে উঠছি, ফের ডুবছি। ওর হাত প্রচণ্ড জোরে ধরে রাখি। এই ঝড়ের মুখে এক মুহূর্ত ঢিল দিলে ওকে হারিয়ে ফেলবো। মাঝে দুয়েকবার বরফকুচি দেই ওর শুষ্ক-তপ্ত ঠোঁটে। পুশ এগেইন! আবার নিঃশ্বাস বন্ধ করে ডুব দেই দু'জনে। দশ সেকেন্ড পর ভেসে উঠি। ওর সারা শরীরে ঢেউয়ের মতো অ্যাড্রিনালিন বইতে থাকে। চোখমুখ থেকে হাতে, হাত থেকে পেটে, পেট থেকে পায়ে, আবার উজানে। রক্তের নদীতে জোয়ার ওঠে যেন আর সেই সুউচ্চ পর্বতসম ঢেউয়ের চূড়ায় দেখি চিকচিক করছে কালো চুল। মারিয়া বলে, শি হ্যাজ এ লট অফ হেয়ার! আমার ঘোর লাগে দু'চোখে। দেখি চূড়া থেকে দুর্দান্ত গতিতে নেমে আসছে সে। পুশ! ওয়ান! টু! থ্রি! ফোর! ফাইভ!!! ডাক্তার বলে, শি ইজ হিয়ার!



তীব্র চিৎকারে সেই কেবিনের বাতাস পাতলা কাগজের মতো চিরে যায়। আমার শক্ত করে ধরে রাখা হাতে টান পড়ে। স্বর্ণা আমাকে ডাকে। আমার কোলে রক্ত-মাতৃকাজলে মাখা একজন হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি করছে, হয়তো মায়ের কাছে যাওয়ার জন্যেই। আমি ওর নরম তুলতুলে শরীরটা আস্তে করে স্বর্ণার বুকে তুলে দেই। ডাক্তার হাসিমুখে বলে, কাঁদছো কেন? আজকে তো খুশির দিন! মারিয়া গত রাতে আমাদের কাছে বাংলা শিখেছিল, সে আধো আধো বাংলায় বলে, সোন্দর বেবি!

বৃহস্পতিবার, ৬ মে, ২০১০

রবীন্দ্রনাথ!


মাঝে মাঝে তুমি খুব নিবিড়ে ছুরি গাঁথো
মাঝে মাঝে আমি চোখ দিয়ে তোমাকে চিরে ফেলতে পারি
মাঝে মাঝে আমাদের দিনগুলো ঘোলাটে কাচ হয়ে ওঠে
১
কোন কোন মানুষকে 'কোয়ান্টিফাই' করা যায় না (কোয়ান্টিফাইয়ের ভালো বাংলা পাচ্ছি না, তুল্যমূল্য ধরনের কিছু নাকি?)। আর কাউকে বুঝে ওঠার জন্যে অনেকরকমের বিষয়-আশয় মাথায় রাখা লাগে। এটাও ঝঞ্ঝাটের ব্যাপার। যেমন ধরুন, ছোটবেলায় কোন একটা গান শুনেছিলেন। ছোট মানে ততোটা ছোট, যখন গান শুনে কথাগুলো বুঝতে বা মনে রাখতে পারবেন। তারপরে মাঝের বিশ বছরে সেটা শোনাই হয় নি। এরপর হুট করে একদিন কোন এক কুঠুরি থেকে ক্যাসেট বের হলো, ধুলো ঝেড়ে চালানোর পরে ঘাই মেরে সব স্মৃতি জেগে উঠবেই। গানের সুর, কথা মাতাল করে দিবেই। গানটার কারিগরি উপাদানের ভালো লাগার চেয়ে আপনার ব্যক্তিগত স্মৃতি বেশি জরুরি হয়ে যাবে। তখন কেউ আগ বাড়িয়ে চশমা নাড়িয়ে সুরজ্ঞান দিতে আসলে আপনার রাগ হওয়া বিচিত্র নয়।
ভাবতে বসেছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে। চতুর্মাত্রিকে ঢুকেই লালচে-আগুন আর শ্যামল-সবুজ দু'টো ব্যানার পেলাম। আমাদের যাপিত জীবনে রবীন্দ্রনাথ মোটেই জয়ন্তীতে পালন করার মতো বিষয় নন। আমি নিজে অনেক বেশিই নির্ভর করি তাঁর উপরে। তবুও উদ্দেশ্য পেলে বিধেয় খুশি হয়, তাই রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে তাঁকে একটু বিশেষভাবে মনে করতে চাইলাম। আমি তেমন হোমরাচোমরা কেউ নই, রবীন্দ্রনাথের ওপরে অভিসন্দর্ভও লিখি নাই, সেমিনার-আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তৃতাও দেই নাই। তাঁর উপস্থিতি বা গুরুত্ব আমার কাছে একান্তই আমার বিচারে, আমার চিন্তনে। তাই এই বেলা অন্যসব গুরুবিদ্যা দূরে থাক!
বাংলা পাঠ্যবইয়ের একটা ভালো দিক হলো রবীন্দ্রনাথের সাথে আমাদেরকে ছোটবেলা থেকে পরিচয় করিয়ে দেয়া, খারাপ দিক হলো সেই পরিচয়টা বেশিরভাগ সময়েই অনেকটাই ভ্রান্ত হওয়া। পাঠ্যবইয়ে কবিতা, ছড়া আর ছোটগল্পগুলোকে কেটে ছিঁড়ে মোটামুটি ফালি ফালি করা হয়। শব্দার্থ, সারমর্ম, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, শব্দ আর বাক্য ধরে আলোচনা করে করে রবীন্দ্রনাথের পিণ্ডিও চটকে দেয়া হয় ভালোমতোন। রবীন্দ্রনাথ হয়ে পড়ে ফররুখ আহমদের সমমানের রচয়িতা, দু'জনের প্রশ্নের উত্তরেই নম্বর সমান। সবার ক্ষেত্রেই প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডির বাইরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে আসল পরিচয় ঘটে! সেই পরিচয় বড়ো রহস্যময়, প্রেম-ভক্তি-জাদু মিশ্রিত রঁদেভু'র মতোন।
প্রতি শুক্রবারের ছুটির দিন সকালে দেবব্রত আর কণিকা গান গাইতেন আমার বাসায়। ঘুম ঘুম চোখ মেলতেই 'শীতের হাওয়ায় লাগতো নাচন', হোক না তখন প্রখর গ্রীষ্ম। মাঝে মাঝে সকালের খাবারের টেবিলে 'বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বাণী' হয়ে আসতো গরম খিচুড়ির ঘ্রাণ, এই সবেই মিশে থাকতো তাঁর উপস্থিতি। যদিও তাঁকে ঠিকমতো চিনি নি তখনও, তাই মনে হতো 'আমার বেলা যে যায়' গানটা কেউ একজন সারাদিন নিরুপায় বসে থেকে লিখেছেন। এই শিশুতোষ কল্পনা লাগাম ছাড়া হলো যখন 'বীরপুরুষ' আর অন্যান্য কিশোর লেখার সংকলন পেলাম উপহারে। বইটার নাম ছিলো "কৈশোরক"। রবীন্দ্র-রচনাবলির কিশোর উপযোগি লেখাগুলো নিয়ে সংকলন এটা। ছড়া, কবিতা, ছোটগল্প, নাটক, কী নাই? সেইখানেই আমার প্রথম কল্পনার জাল ছড়ানো চিন্তার শুরু। ছোটবেলাতেই মুগ্ধ হলাম, বিস্মিতও কিছুটা।
ফটিক বলাইদের সাথে পরিচয় ঘটলো, দেখা হলো অমলের সাথে, কাবুলিওয়ালার মিনি'কেও পছন্দ হলো খুব!
সেখানে আরো পেলাম কেষ্টা বেটাকে, তাকে কেন সবাই চোর ঠাউরাচ্ছে, ভাবতেই খারাপ লাগলো। মন খারাপ হলো উপেনের জন্যেও, বাবু তার দুইবিঘা নিবেই নিবে যে!
কালো কৃষ্ণকলির প্রেমে পড়লাম আরো একটু বড়ো হয়ে, লোকে কি বলে সেটার কেয়ার তো আমি নিজেও করি না!
এইট পাশের পরে কে যেন খোঁজ দিলো গল্পগুচ্ছের। আমাকে বললো, এই ছোটখাটো লেখা পড়ে কী করবি? রবীন্দ্রনাথের আসল ঐশ্বর্য গল্পে, সেগুলো পড়। আমি ঝাঁপ দিলাম, অতলে। ভেসে উঠলাম কয়েকদিন পরে, যখন গোগ্রাসে পড়ে ফেলেছি 'ইচ্ছাপূরণ', পেটের ব্যথার ভান করে আমিও তো অনেকসময় ইশকুলে যেতে চাইতাম না। সেটা মনে হয় রবীন্দ্রনাথ টের পেয়ে গিয়েছিলেন। 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন' পড়ে মনে হলো রাইচরণের মতো আমারও যদি কেউ থাকতো! 'গুপ্তধন' গল্পে পেলাম ধাঁধা:
রা নাহি দেয় রাধা
পায়ে ধরে সাধা
শেষে দিলো রা
পাগোল ছাড়ো পা
হৈমন্তী, অতিথি আর সমাপ্তি গল্প তিনটির ব্যাপারে কিছু বলাটাই বলে হয় বাতুলতা হবে।
২
রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে অনুভূতিগুলো ছাড়াছাড়া হয়ে যায়, তাঁর রচনার মতোই ব্যাপ্ত হয়ে পড়ি। বাংলা কবিতায় রোমান্টিসিজমের পুরোধা তিনিই। সাধারণত রচনার ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক লেখকই কোন নতুন ধারার সূচনা করলে সেটাতে দক্ষতা দেখাতে পারেন না, পরের কেউ এসে সেখানে অসম্ভব সব কাজ করেন। রবীন্দ্রনাথের বেলায় সেই সূত্র খাটে না। তিনি একাই যে রোমান্টিসিজমের চর্চা শুরু করেছিলেন, বাঙালির অন্তরের 'আমিত্ব'কে যেভাবে প্রকাশ করেছিলেন তেমন সৌরভ আর কারো পক্ষেই ছড়ানো সম্ভব হয় নি। মনের রুক্ষতম রাগ, হিংসা থেকে শুরু করে গাঢ়তম আবেগ পর্যন্ত, কোমলশ্যামল রূপ থেকে রুদ্রতার বয়ান সবখানেই রবীন্দ্রনাথের ছোঁয়া। এবং বহুমুখিতার রূপায়ন এতোটাই বৈচিত্রময় যে, সবার মনেই লেখাগুলো নিয়ে অনুভবের একটা সাধারণ মন্তব্য হলো, "আরে! আমি নিজেই তো এভাবে চিন্তা করি। আমার মনের এই কথাটা রবিবাবু জানলেন কেমন করে?!"
সম্ভবত এখানেই রবীন্দ্রনাথের মুন্সিয়ানা। দেড়শ' বছর আগে জন্মেও যে কোন যুগে, যে কোন মানুষের মনের গহীনে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন তিনি। তাঁর এই ঈর্ষণীয় ব্যাপনক্ষমতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, তার দেড়শতম জন্মদিনে!
শুভ জন্মদিন রবিবাবু, শুভ জন্মদিন বুড়োবাবু!!
***

শনিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১০

একটি অগল্প-জনিত প্রয়াস বা বিভ্রম

বাইরে যদি খুব তীব্র আলো থাকে, তাহলে ঘরের ভেতর থেকেও সেই আঁচ টের পাওয়া যায়। জানালাটায় পর্দা দেয়া, তারপরেও সূর্যের আলোর তেজ পর্দার ঘেরাটোপ পেরিয়ে চলে আসে। আমি এরকম দিনে খুব ঘরকাতুরে হয়ে পড়ি, এ'ঘর-ওঘর করি। তারপরেও নিতান্ত দরকার না পড়লে বাইরে বের হই না। এখন কোনো কোনো দিন ছুটি থাকে, কোনো কোনো দিন সারাদিন কাজ। যেদিন কাজে থাকি, নিঃশ্বাস ফেলার সময়ও পাই না, সেসব দিনে আমি ভালো থাকি। আর নিজের ঘরে স্বেচ্ছাবন্দিত্বের দিনে আমার কেবলই তাদের কথা মনে পড়ে।

ঝিম ঝিম দুপুর গড়িয়ে গেলে আমার ঘুম ভাঙত। একজন তার অনেক আগেই ঘুম ভেঙে উঠে চলে গেছে। কামলাগিরি করে বহুজাতিকে, সেখানে দশটা পাঁচটা বলে আদতে আটটা-আটটা খাটিয়ে নেয়। খাটতে খাটতে তার খাটিয়ায় ওঠার দশা। ভোরে বের হয়ে যায়, বাস ঠেলে অফিসে ঢোকে। বের হতে হতে নিশুতি। আবার ফিরে আসতে আসতে তার খাওয়ার ইচ্ছাটুকুও থাকে না। আমরা বাকি দু'জন যখন কোন মুভি'টা দেখা দরকার, বা আজকে আসলে ইন্টারনেটে নতুন সাইটটার ভেতরে ঘোরাঘুরি করার ফন্দি কষি, সে তখন ভোসভোসিয়ে ঘুমাচ্ছে। আমরা তাকে বিরক্ত করি না, শান্তিতে ঘুমাতে দেই। তারপরে একটু নেট ঘেঁটে বলি, "নাহ, এই ফেসবুক নামের সাইটটা বেশ মজাদার। এতে ঘোরাঘুরি করতেও মজা লাগছে।"

একটু পরে আমরা নাটক দেখতে বসি। ইংরেজি নাটক, যা কিনা মার্কিন মুলুকে সপ্তাহে সপ্তাহে একদিন করে দেখায়, আর আমরা গরীব দেশে সেটা একবছর পরে একবারে সারাবছরের সব পর্ব দেখি। তাতে ক্ষতি নেই, আমাদের মনে হতে থাকে এটা একটা অন্তহীন মুভি। পর্বে পর্বে চমক। আমরা তর্ক করি কেন সুপারম্যান একটা 'গুড-ফর-নাথিং' লানা ল্যাঙের পিছনে ঘুরছে? কেন সে তার পাশেই ক্লোয়ির দিকে একবারও তাকায় না!

তারপর রাত বাড়লে আমাদের ক্ষুধা পায়। আমরা পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে বের হই আর রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ছাউনির নিচে তাওয়ার কাছে গিয়ে বসি। এখানে তেল তেল পরোটা আর আধাকাচা ডিমভাজি পাওয়া যায়। আমরা সেই আগুনেগরম তেল-পরোটা-ডিম-ভাজি দ্রুত মুখে চালান করে দেই। দেরি করলেই আঙুল নয়তো জিব পুড়ে যেতে পারে। একটু খেয়ে আমার সাথে যে ছেলেটা আছে, সে সিগারেট ধরায়। আমি সিগারেট খাই না। খালি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আমার চারপাশের প্রিয় মানুষেরা সিগারেট কেন খায়, এটা নিয়ে ভাবতে বসি। আমরা দেখি ফাঁকা রাস্তা দিয়ে পরাবাস্তব দৃশ্যের মতোন মহিষের পাল যাচ্ছে। কালো রাস্তার পিঠে কালো কালো মহিষগুলোকে আমাদের অন্যজগতের মনে হয়, কেমন নিঃশব্দ চলাচল তাদের। যেন চোখ বেঁধে নিশ্চিন্তে চলে যাচ্ছে তারা! একবারও ভাবছে না যে কালকেই হোটেলে হোটেলে তাদের মাংস কালাভুনা হয়ে আমাদেরই পেটে চলে যাবে। মহিষের পালের রাখালটাকে আমার ভালো লাগে না, তার চেহারা অস্পষ্ট।

ছেলেটার সিগারেট খাওয়া শেষ হয়। এখন চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠিয়ে আমরা ট্রাফিক সিগন্যালে বসে আছি। জনহীন রাস্তায় সবুজ-লাল বাতি একা একাই জ্বলে! আমরা ভাবি, আবোল তাবোল।



তারপর অনেক দিন পার হয়, এভাবেই। তারপরে আমি ভুলে যাই আমি এরকম দিন কাটিয়েছি। সেই ছেলেটাও ভুলে যায় হয়তো। হয়তো আমি ভুলি নাই পুরাপুরি। ঘুমিয়ে থাকা ছেলেটা চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিদেশ চলে যায়। সিগারেট খাওয়া ছেলেটা বিয়ে করে। বউসমেত বিদেশ যাওয়ার সব ঠিকঠাক হয়। তারপরে আমাদের মাঝে পনের মিনিটের রাস্তা রেখে আমরা চাকরি করতে থাকি। ঘানি টানতে থাকি মহিষগুলোর মতোন। তারপরে আমিও হয়তো অনিশ্চিত কোথাও চলে যাই! কোথায় যাই?



তারপর আর কোন গল্প থাকে না। সেই ফেসবুক নামক চমৎকার সাইটে কয়েকশ বছর আগে তুলে রাখা গোপন অ্যালবামটা ঐ সিগারেটখোর ছেলেটা কোনো এক একলা রাতে খুলে বসে। তারপর সেখানে ছবিতে বসে থাকা মুখগুলো দেখে নিজেকে চেনার চেষ্টা করে। একটু পরে অন্য দু'জন একটা করে নোটিফিকেশন পায়। সবকিছুর মাঝে থেকেও বাকি দুইজনে চুপচাপ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।


*****

শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১০

ডু নট ডিসটার্ব মাই সার্কেলস

খ্রিষ্ট জন্মের দুইশ বারো বছর আগে, সাইরাকুস নগরীতে কিছু রোমান সৈন্য ঢুকে পড়তে সক্ষম হয়, তাদের সেনাপতি ছিলেন মার্কাস ক্লডিয়াস মার্সেলাস। প্রায় দুই বছর অবরোধ করে রাখার পরে রোমান পক্ষ জিতে গেছে, ঢুকে পড়েছে সাইরাকুস নগরীর ভেতরে।


এক বৃদ্ধ কিছু গাণিতিক সরঞ্জাম নিয়ে গভীর মনোযোগে কাজ করছিলেন কোন অজ্ঞাত গাণিতিক সমস্যা নিয়ে। তাঁর চারপাশে ছড়ানো ছিলো বেশ কিছু বৃত্তের আকৃতি। রোমান সৈন্যদল সেগুলো তছনছ করে তার দিকে এগিয়ে এলে তিনি অসহিষ্ণু হয়ে বললেন, "Noli turbare circulos meos" ("Do not disturb my circles")। সৈন্যদের নেতা তাঁকে এই দম্ভোক্তি ও অসম্মানের অপরাধে সেনাপতির কাছে ধরে নিয়ে যেতে চাইলেন। বৃদ্ধ তখনও গাণিতিক সমস্যায় মগ্ন, তিনি যেতে রাজি হলেন না। ক্রোধে মত্ত সৈন্যদলের নেতা তার তীক্ষ্ণ তলোয়ারে মুহূর্তেই মেরে ফেললেন পয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধকে!


বৃদ্ধের নাম ছিলো আর্কিমিডিস। প্রবল প্রতাপশালী রোমান সৈন্যদের চাইতেও যাঁর কাছে নীরিহ বৃত্তগুলো জরুরি ছিলো!




খ্রিষ্টের জন্মের দুই হাজার চার বছর পরে ঢাকা নগরীতেও উন্মত্ত চাপাতির কোপে আক্রান্ত হলেন আরেকজন গবেষক, বিদ্যানুরাগী, কবি। সেই বছরেই, মাত্র সাড়ে পাঁচ মাস পর তিনি মারা গেছেন। তাঁর কাছেও ধর্মান্ধ, গোঁড়া, প্রতিক্রিয়াশীল হায়েনাদের চেয়ে জরুরি ছিলো রাড়িখাল, ফুল, কবিতা, বাঙলা ভাষা, বাঙলাদেশ*!


আজ বুদ্ধিবৃত্তির বিরুদ্ধে ধর্মান্ধের এই আক্রমণের দিনেআপনাকে স্মরণ করছি, প্রিয় হুমায়ুন আজাদ। আপনি যে বাংলাদেশ দেখে শিউরে উঠেছিলেন, আমরা সেই বাংলাদেশেই স্মৃতিহীন ও বিকারহীন হয়ে বাস করছি।






***




[*হুমায়ুন আজাদের লেখায় বাঙলাদেশ বানানটি অক্ষত রাখা হয়েছে]

বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০০৯

চুয়ান্নের বাইশে অক্টোবরঃ কবি!

০.
আর কিছুদিন যাক না এমন আরো একটু আশা
এই পৃথিবীর মানুষগুলো বুঝবে আমার ভাষা।



এমন একটা গান আছে।




১.
মাঝে মাঝে কাকতালীয় ঘটনা ঘটে আমাদের জীবনে। কেন ঘটে সেটা আমরা বুঝতে পারি না বলেই হয়তো সেগুলো কাকতালীয়। আমার বিশ্বাস, সবকিছুই একটা বৃহত্তর নকশার অংশ। এখানে 'বিশ্বাস' কথাটা বলার কারণ এই যে এটা আমি প্রমাণ দেখাতে পারবো না। অসংখ্য ঘটনা তুলে আনতে পারি যেগুলো কাকতালীয় ঘটনার পেছনে কারণটাকে ব্যাখ্যা করবে। এবং এটা বুঝিয়ে দিবে যে এগুলো ঘটেছে একটা বৃহত্তর উদ্দেশ্যসাধনে। তবে তাতে পুরোপুরি বিষয়টা প্রমাণ হয় না। কেবল একটা কুযুক্তির উদাহরণ হয়ে ঠা ঠা করে হাসতে থাকে।


আমি প্রায়ই আজে বাজে উপমা ব্যবহার করি। এটা নিয়ে আমাকে অনেক কথা আর প্রশ্ন শুনতে হয়। এরকম উদ্ভট উপমা কেনো খাপ-না-খাওয়া চেহারা নিয়ে ঝুলতে থাকবে। বেশিরভাগ সময়েই আমি নিজের কাজকর্মের ব্যাখ্যা দিতে পারি না, লেখার তো আরও পারি না। তবে উপমার ব্যাপারে আমরা একজন বেখাপ্পা কবিকে চিনি যিনি অনায়াসেই আমাদের কাছে অনুমতি পেয়ে যান বিদঘুটে উপমা যথেচ্ছা বসিয়ে দেবার...


তার সাথে আমার পরিচয়ের শুরুতে আমি তাকে খুব বেশি পছন্দ করি নি। শৈশবের অভ্যাস মানুষ সহজে ছাড়তে পারে না, সেটা পাঠের অভ্যাসের বেলায় আরো বেশি খাটে। ছড়াটে-ছন্দ আর মাপা মাপা মাত্রা মাথায় কাঁথার মত সেলাই হয়ে গেছে। যখন বৃষ্টি পড়তো তখন 'জল পড়ে, পাতা নড়ে' -এভাবেই ভাবতাম আমি। গ্রামে বেড়াতে গেলে নদীর পাড়ে বসে "আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে" ভুস করে শুশুকের মতো ভেসে উঠতো। তারপরে আমি বাংলা মাস হিসেব করে মেলানোর চেষ্টা করতাম-- এখন আসলে বৈশাখ, তাই নদীতে হাঁটু জল। তারপরে আরেক কবি এসে বললেন, সবাই বেশ সমান, নর এবং নারী। আমি ছোট ছোট কিশোর চোখে বোঝার চেষ্টা করি, কেন আমার পাতে বড়ো মুড়োটা পড়ে আর বোনের পাতে লেজ! এভাবে আমি অভিযোজিত হই, আমার সামাজিকীকরণ ঘটে।


এই পর্যায়ে আমার সাথে সেই বেখাপ্পা কবির পরিচয় হয়। তিনি বেশ মৃদুমন্দ, মোটেও সুরেলা নন। আর নিদারুণ দারুণ কাঠখোট্টা। তার নদীটার নাম ধানসিঁড়ি, তার পাখিটি হলো কালো শালিখ! আর বিদঘুটে উপমায় তার জুড়ি নেই- মাঠের ঘাসের মাঝে তার প্রেমিকার চুল আর ঘাম মিশে থাকে, প্যাঁচার ডাকের ভেতরে জীবন (নাকি মরণ) থরে থরে জমে আছে নাকি! এতোটা বিক্ষুব্ধ রচনায় স্বভাবতই মন বসেনি, হাতে পেতে দুয়েকটা কবিতা যা পড়লাম, ছন্দ মেলে না ঠিকঠাক। তারপরে দেখি মাত্রার নাম সনেট (এ কি বিদেশি গোলোযোগ!)। দূরে সরে গেলেন ম্রিয়মাণ কবি চুপিচুপি। দোর্দণ্ড প্রতাপে ফিরে এলেন ছাড়পত্র নিয়ে অভিযাত্রিক কবিগণ। তার সাথে আমার ফের দেখা আরো অনেক বছর পরে। ... কাকতালীয় নিয়ে বলছিলাম, আসলেই সবকিছু একটা নির্দিষ্ট ছকেই ঘটে বুঝি। তিনি যখন আবার ফিরে এলেন, তার সাথে পরিচয়ের উদ্ভাসে আমিই ভেসে গেলাম। চোখের ওপরে যেন রঙিন কাচ আটকে ছিল, যা দেখছিলাম সব সেপিয়া-পয়েন্টে ঈষৎ বাদামি হয়ে ছিলো। তিনি এসে সেই কাচ ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিলেন।


এই কাজটি তিনি খুব সুচারুভাবেই করেছেন, বেশ "সহজ" উপায়ে। আসলেই এটি সোজাসরল-- আমি বুঝলাম।
"আমার এ গান
কোনোদিন শুনবে না তুমি এসে-
আজ রাত্রে আমার আহবান
ভেসে যাবে পথের বাতাসে-
তবুও হৃদয়ে গান আসে!
"

বয়ঃসন্ধি কেটে গেলে যেভাবে ঘুম ভেঙে যায়, দুই বেণি ছেড়ে ক্লাসের শীর্ণ মেয়েটি যখন একটা বেণি করে আসলো প্রথম সেটা আমার নজর এড়ায়নি। চোখ খোলাই ছিল, সেখানে মেয়েটির ওড়নার প্রান্ত হু হু করে মগজে সেঁধিয়ে গেলো। সেসময় কানের পাশে তিনি মৃদুস্বরে বললেন এই মেয়েটি তোমার গান কোনোদিনই শুনবে না। তবু তুমি পৃথিবীর কানে, নক্ষত্রের কানে কানে গান গাইবে। এ যেন এক মহান নিরুপায় শাস্তি-- তোমাকে এই গান গাইতেই হবে। সেদিন রাতে আমার ঘুম হলো না, তিনি বড়ো জ্বালালেন। দু'চোখে মণিমুক্তোর মতো দৃশ্যগুলো ভরে দিতে লাগলেন। দেখলাম পঁচিশ বছর পরে আবার আমাদের দেখা হয়েছে। মেয়েটি মধ্য চল্লিশের ভারি শরীর, পাতলা হয়ে আসা চুল নিয়ে সেদিন সামনে দাঁড়ালো। আমিও বুড়িয়ে গেছি, হাতের উল্টোপিঠের দাগগুলো মুখের ভাঁজে ভাঁজে, চোখের কোনায় কোনায় উঠে এসেছে। আমাদের মাঝে কোনো ভণিতা নেই- কৈশোরের নির্মলতা হারালে মানুষ কেমন অথর্ব আর ক্ষয়াটে হয়ে যায়, সেই চেহারা নিয়ে কবি দাঁড়ালেন সামনে, আমাদের মাঝখানে। হলদে তৃণ আর কুয়াশা ভরা মাঠের মাঝে আমি মেয়েটির মুখোমুখি দাঁড়ালাম। কবির চোখে দিব্যি দেখলাম, ম্রিয়মাণ মুখে কী তীব্র জ্বলজ্বলে আলো!






২.
এই কবির জীবন এবং কবিতা নিয়ে বহু বহু কথা হয়েছে। গত সত্তুর বছরে কবি বুড়িয়ে গেছেন, মরেও গেছেন অন্যমনস্ক হাঁটতে হাঁটতে। তার কবিতাগুলো বার বার বইয়ে বাঁধাই হয়ে সকলের বাসার শেলফে জায়গা করে নিয়েছে। তার কবিতার সবচেয়ে বেশি ব্যবচ্ছেদ হয়েছে, খাতায়, পাতায়, পত্র-পত্রিকায়, আড্ডায়, আলোচনায়, ভাষণে, বক্তৃতায়। কবি বেঁচে থাকলে কী করতেন? অথবা তিনি যখন বেঁচে ছিলেন, তখন কি ভাবতেন তিনি মরে গেলে তাঁকে নিয়ে এমন মেতে উঠবে পুরো একটা জনপদ? তার জন্যে কাতর রাতগুলো নির্ঘুম কাটবে কোনো কিশোরের। মধ্যবয়েসী একজন কেউ প্রবল হতাশ রাতে ঘরের বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাবে, আর সেই গনগনে ফুলকিতে দেখবে একটা প্যাঁচা তীক্ষ্ণ তাকিয়ে আছে! তখন তার মনে পড়বে একজন কবি ছিলেন যার কাছে এই প্যাঁচা কত অবলীলায় মানুষের উপমা হয়ে গেছে! আমার সাথে তার পরিচয়ের পর থেকে বারবারই আমার মনে হয়েছে এই কথাগুলো তিনি ভাবেন নি। এমন অসীম কল্পনাপ্রবণ মানুষটি হয়তো কখনোই ভাবেন নি যে তিনি কতজনের মনের কান্না আর চোখের হাসির ঝিলিকগুলো হুট করেই বাইরে নিয়ে আসতে পারবেন তার লেখা কবিতাগুলো দিয়ে। কবিতাগুলো নিরীহ এবং আড়ম্বরহীন সাজ নিয়ে অনেকদিন কাউকে নাড়া দেয় নি সেভাবে। অনেকেই বোঝেন নি হয়তো, এরকম নিভৃতে বসে এমন কবিতাও লেখা যায়।


মৃত্যু খুব প্রিয় বিষয় ছিলো কবির। ঘুরে ফিরে বারবার তার লেখায় চলে এসেছে গহীন কালো শীতল মৃত্যু। এবং তিনি কাতর হন নি। তিনি কখনই বলেন নি, 'মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভূবনে'। আবার মৃত্যুকে আহ্বানও করেন নি। তারপরেও মৃত্যু তার কাছে প্রিয় ছিলো। এবং প্রিয় জিনিসের ব্যাপারে আমাদের একটা বাই-ডিফল্ট আবেগ কাজ করে। অনেক ভীড়ের মাঝে আমরা যেমন হুট করেই আপনজনের চেহারা খুঁজে পাই, তেমনি তার কবিতায় খুঁজলে তিনি কেবল মৃত্যুর চেহারাই দেখতেন। একটা বিষয় খুব বেশি ঘনঘন আমাদের জীবনে ঘটতে থাকলে সেটার অসাধারণত্ব মিইয়ে যায়। আটপৌরে হয়ে পড়ে বার বার তার আসা-যাওয়া। অতিথিকে আমরা যেভাবে আদর-আপ্যায়ন করি, সে বসার ঘরে খাটিয়া পেতে ঘুমুতে শুরু করলে সেটা অচিরেই ম্যাড়মেড়ে হয়ে যায়। সে কারণেই মৃত্যুর মত বিশাল বিনাশী ব্যাপারটিকে তিনি ভেঙে চুরে কাঁথা-বালিশ বানিয়ে ফেললেন। ঘাস, পাতা, জানালা, দেয়াল, শিশির, জোছনা, এমন হাজারো অসংখ্য উপাদানের মাঝে টুকরো টুকরো করে মৃত্যু মিশিয়ে দিলেন। আমরা পড়ার সময়ে খেয়ালও করি না, সর্‌সরে ময়াল সাপের মতো মৃত্যুছায়া পুরো পঙ্‌ক্তিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।


এভাবে মৃত্যুকে টেবিল-চেয়ার বানিয়ে ফেলার আরেকটা সুবিধা আছে। অপার্থিব অনুভূতিগুলো খুব সহজেই এই সব উপাদানের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। মনে হয় সবাই মিলে একটা স্ট্র দিয়ে মিষ্টি জুসের মতো মৃত্যুকে শুষে খেয়ে ফেলছে! কী অদ্ভুত কল্পনা, তাই না? জীবনের সকল উপাদান যখন তুচ্ছ হয়ে যাবে, আমাদের দপ্‌দপিয়ে দৌড়ে চলা কণিকা যখন ক্লান্ত হয়ে গতি থামিয়ে দিবে, ধুকপুকে হৃৎপিণ্ড অতি ধীরে স্তব্ধ হবে আর শৈত্যের প্রবল থাবা এগিয়ে আসবে, তখন হুট করেই আমার কবিকে মনে পড়বে। মৃত্যু খুব কঠিন কিছু তো নয়! জন্মানোর পরমুহূর্তেই হেঁচকি তুলে চিৎকার করে কেঁদে ওঠার চাইতেও সহজ শ্লথগতিতে চোখের তারার আলো ফুরিয়ে যাওয়া। এলোমেলো হাঁটতে গিয়ে হুট করেই ট্রামের সাথে ধাক্কা খাওয়া। এভাবেই মৃত্যু আসে। আমাদের স্তব্ধ করে দিতে, আমাদের জীবনের সবটুকু আলো নিভিয়ে দিতে।




কবির সাথে প্রথম পরিচয়ে মনে হয়েছিলো তিনি বেশ ম্রিয়মাণ। এই চিন্তাটা কতটা অপরিপক্ক ছিলো, তা এখন মনে পড়লে হাসি পায়। আমি একটা নতুন তথ্য জেনেছিঃ অনেক সময় খুব মৃদু স্বরে বলা কথাগুলো সবচেয়ে জোরালো শোনায়, আর উচ্চকিত স্লোগানের চাইতেই তীব্র অনুরণন তৈরি করতে পারে। কবিতায় যতো নিয়ম কানুন বানানোর চেষ্টা হয়েছে, এই কবির লেখার পরে সেগুলো মোটামুটি হাস্যকর প্রস্তাবনা হয়ে গেছে। সবারই মনে হয়েছে এভাবেও কবিতা লেখা যায়। চমক কাটতে সময় লাগেনি, তারপরের সময়টুকু কেবল এই কবির জন্যেই স্তবকে স্তবকে ভরে গেছে। পরে জানলাম এই অনুভূতিটার নাম- আধুনিকতা। প্রথা, সংস্কার এবং জোয়ালের মতো চেপে বসা সমাজে আমরা প্রতিনিয়ত যেভাবে ক্ষয়ে যাই, যেভাবে আমাদের ভেতর থেকে মৃত্যুর চেয়েও নিষ্ঠুরভাবে জীবন চুরি হয়ে যায়, সেখানে এই কবিই পথ দেখালেন। তার কথাগুলো আমার কাছে নতুন সত্যের মতো ধরা দিলো। অন্ধকার প্রবল হলেও আমার মনে হয়, সেখানে তিনি পাশেই আছেন। আমার কানের কাছে মৃদুস্বরে বলছেনঃ
"আবার আকাশের অন্ধকার ঘন হয়ে উঠেছে :
আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার।
যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে
অথচ যার মুখ আমি কোনদিন দেখিনি,
সেই নারীর মতো
ফাল্গুন আকাশে অন্ধকার নিবিড় হয়েছে উঠছে।...

...ময়ূরের পেখমের মতো রঙিন পর্দায় পর্দায়
কক্ষ ও কক্ষান্তর থেকে আরো দূর কক্ষ ও কক্ষান্তরের
ক্ষণিক আভাস -
আয়ুহীন স্তব্ধতা ও বিস্ময়।
পর্দায়, গালিচায় রক্তাভ রৌদ্রের বিচ্ছুরিত স্বেদ,
রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ!
তোমার নগ্ন নির্জন হাত;
তোমার নগ্ন নির্জন হাত।
"







কবি মারা গেলেন চুয়ান্নের বাইশে অক্টোবর। আজকে থেকে ঠিক পঞ্চান্ন বছর আগে। ট্রামের চাকার সাথে যেই চিত্রকল্পগুলো হারিয়ে গেলো, যে পঙ্‌ক্তিগুলো নির্বাসনের নির্দেশ পেলো, সেগুলোর জন্যে আমার অনেক রাতেই মন খারাপ হয়ে যায়। তারপরে অন্ধকারেই কল্পনা করি, কবির হাত মৃদু আমার কাঁধে এসে বন্ধুর মতো ছড়িয়ে আছে। তার মুখ অস্পষ্ট এবং ঘোলা। আমার চোখে অশ্রু। আমার মুখে একচিলতে হাসি। কেউ দেখছে না। কারণ ঘর অন্ধকার।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০০৯

১০১০

নভেম্বরের এক শুকনো বিকেল। বিকেলের রোদ জমাট বেঁধে আছে তখনও, রাস্তায়। আমি গাড়িতে তল্পিতল্পা নিয়ে রওনা দিয়েছি। উদ্দেশ্য ১০১০।


১.
দরজা ঠেলে ঢুকতেই দুটো বিছানা, ডানদিকে লম্বালম্বি, বামদিকে আড়াআড়ি, দরজার পেছনে। চারকোনা ঘর। ঐপ্রান্তে আরও দুখানা বিছানা। ঘরের মাঝখানে দুটো বড়োবড়ো আলমারি দিয়ে মোটামুটি একটা বিভাজন তৈরি করা। আমি যখন ঢুকলাম, তখন কাউকে চোখে পড়লো না, অথচ ঘরে তালা দেয়া নেই। একটু ভিতরে গিয়ে দেখলাম আলমারির আড়ালের বিছানাতে একজন ঘুমাচ্ছেন, তার মাথার কাছে চেয়ারের উপরে রাখা টেবিল ফ্যান মৃদু শব্দে ঘুরছে। আমার হাতে গোল করে বাঁধা তোষক, ওটা মাটিতে রেখে আমি ঘুমন্ত মানুষটাকেই ডাক দিলাম।


সন্ধ্যা নামতে নামতেই সাকিব ভাইয়ের ফেলে যাওয়া আলনা, বাক্স, হ্যাঙার, তোষক, চাদর ইত্যাদি বাইরে বারান্দায় ছুঁড়ে ফেলা হলো। ঝুল এবং ময়লা পরিষ্কার করে আমি গোল করে বাঁধা তোষকটা মেলে দিলাম। টেবিল, বিছানা, চাদর, বালিশ। পায়ের কাছের জানালা দিয়ে বাইরে বাগানে জ্বালিয়ে রাখা টিউবলাইটের আলো এসে পড়ছে। আমি হেলান দিয়ে বসে থাকলাম আপাত অবস্থানে, কিছুটা ক্লান্ত এবং মলিন। ঘরের বাকি দুই বাসিন্দাও ফিরলেন। একজন ফিরেই ঘুম। আরেকজন মশারির ভিতরে উবু হয়ে বসে কী যেন করছেন। সাকিব ভাইয়ের মতো, এরাও কিছুদিন পরে ঘর ছেড়ে চলে যাবেন। বাকি থাকবে আড়ালে থাকা বিছানাধারী। রাত বাড়ে, কোলাহল, হাসি, খুচরো কথা ছিটকে ছিটকে যায় আমার চারপাশে। বুঝতে পারি এখানে মূলত বিযুক্ত এবং আলাদা আমি।


ক্লাসের পরে দুপুরে আড্ডার একটা প্রিয় জায়গা ছিল ক্যাফের সামনের চত্বর। অন্য ডিপার্টমেন্টের বন্ধুরাও জমায়েত হতো। মাঝে মাঝে ফিল্ম সোসাইটির সন্ধ্যার মুভি শো দেখা হবে কী না সেটা নিয়ে কথাবার্তা। কারো কারো আড়াইটায় সেশনাল, তারা বেশিক্ষণ থাকতো না। সোয়া একটা দেড়টার দিকে ক্যাফের ভেতরে ভিড়, শোরগোল, খাওয়া দাওয়া, তেহারি বিশটাকা, ঝালফ্রাই বিশটাকা, খিচুরি তুলনামূলক সস্তা ও বিস্বাদ। তারপরে আড়াইটার পরে নিঝুম হতো সিরামিকের উঠান। চলাচল হলাহল কমে আসতো, আমরা কেউ কেউ বসেই থাকতাম এবং মাপার চেষ্টা করতাম কীভাবে রোদ নেমে যায়, বেলা পড়ে যায়। মাঝে মাঝে দুয়েকজন ছিটকে যেত হেঁটে চলে যাওয়া ওড়নার সাথে। আবার কিছু পরে ফিরেও আসতো, দুপুরের সময় অনেক দীর্ঘ ও ধীর বলে। ১০১০-এর সাথে যেসময়ে আমার সম্পর্ক হলো, সেই নভেম্বরের সময়, সেই আশু শীতের টান বা রোদের দাপটের সময়েই আমি ধীরে ধীরে ক্যাফের সাথে আলাদা হয়ে যাই। টের পাইনি কখন, ক্লাস শেষে বের হয়ে ডানের বদলে বামে যাওয়া শুরু হলো। গেইট পেরিয়ে রাস্তার ওপারের ছোট গেইট দিয়ে ঢুকলেই তিতুমীর। তারপরে পেছনের উইঙয়ে, ডানদিকের শেষের আগের ঘর ১০১০। ঘরে ঢোকার আগে প্রায়ই ১০১১এ উঁকি দিতাম। আদিরসাত্মকদাদা হাঁক ছাড়তেন, কিরে ***! কারো মুখে এমন আদরণীয় অশ্লীল সম্বোধনও সয়ে যেতে পারে, এটা আমার ধারণাই ছিল না। এখানে দুপুরের পরে ডাইনিঙের সমালোচনা জমে, মহিষের মাংস বা ছাইপাশ খেতে হচ্ছে বলে আমরা বড়োই বিরক্ত হই। ম্যানেজার কত টাকা মেরে নোকিয়া কি স্যামসাং কিনে ফেলছে ভেবে যারপরনাই হতাশ হই। বিছানাধারী ছাড়া আমাদের ঘরের বাকি দুই চাকরি পেয়ে চলে গেছেন বলে আমাদের ঘর মোটামুটি ফাঁকাই। আমরা দু'জনে রেক্সিনের ম্যাট বিছাই ঘরে, ঝেড়েপুঁছে ঝুল-টুল পরিষ্কার করি। ঘরে যারা আসেন, তারা বেশ চমৎকৃত হল আমাদের পারিপাট্যে। দু'টা কম্পিউটার, মাঝে মাঝে মুভি শো, সারাউন্ড সাউন্ডে আশেপাশের মুভিখোরেরা জমায়েত হয়, রেক্সিনের মেঝেতে মফস্বলীয় কায়দায় আমরা হাসি, শোরগোল করি। সেখানে আমি আর নিজের উচ্ছ্বাসটুকুকে আলাদা করতে পারি না। কেবলই মনে হতে থাকে, এটাই স্বাভাবিক, সবচেয়ে বাস্তব জীবন।


৩.
শীতের কম্বল থেকে ওম চলে গেলে, গরম বাড়ে। ঘরে একটাই ফ্যান, আমরা দু'জনেই সালমান খানের ফ্যান, এজন্য উদোম গায়েই বসবাস। বিছানাধারীর শেষ টার্ম। পাশ করলেই তিনি যে বিদেশে উড়বেন, সেখানে তার সুপারভাইজার যে একজন মহিলা প্রফেসর এবং তাঁর নাম লিসা। লিসার সাথে তার পত্রালাপের আমি নীরব সাক্ষী, মাঝে মাঝে ভাষাবিড়ম্বনা ঘুচোতেও সমান সহায়তাকারী। শেষপরীক্ষার আগে ১০১০এ আরো দুটো ছানাপোনা আমার মতোই উঠে আসে। দরজার দিকের দুইবিছানায়। তারা অতিশয় চঞ্চল, প্রগলভ। আমাদের ঘরে প্রচুর হৈচৈ জমা হতে থাকে। এভাবে একটা সময়ে দুপুরের ঘুম উবে যায়, শান্ত ঘরেই ডাইনিঙ-ম্যানেজার-মস্তকমুণ্ডন-গর্দভবৈঠন-গ্রামছাড়ন চলতে থাকে। বিছানাধারীর যাবার সময় ঘনিয়ে আসে। আমি বুঝতে পারি, এভাবে চলে যাওয়াটাই আসল সত্য, এবং তারপরে নিজের ব্যাপারেও সচেতন হই। চেষ্টা করি জড়িয়ে পড়া সুতোগুলো আলাদা করতে। নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে। সব যোগাযোগ মানতেই হবে এমন তো কথা নেই- এমনটা ভেবেই আমি আলাদা ও বিচ্ছিন্ন হতে চাই। আমার খেয়ালে একবারও আসে না যে নিজের অজান্তেই আমি ধীরে ধীরে ক্যাফের ভীড় ভুলে গেছি, আর মনে নাই দুপুরের দৌড়, ঘাম, ওড়নাদের সৌন্দর্য।


আমাদের ঘরে বিছানাধারীর জায়গায় উঠে আসে মোটামানুষ। মোটামানুষের বাসা খুব কাছেই, কিন্তু বেচারা সদাব্যস্ত, সদাদৌড়বিদ, মহাকেজো। কেঁচোর মত পড়ে থাকতেও দেখিনি কখনও তাকে। রোল বিচারে আমার থেকে দুই পরে, কিন্তু মানুষ বিচারে সম্ভবত আমি তার ধারে কাছে নেই। মোটামানুষের হৃদয় বড়ো হয় এটা শুনেছিলাম, আফসোস ছিল কাছ থেকে এমন কাউকে দেখিনি বলে। এই মোটামানুষের ঘরে ওঠার পর থেকে আমিও বুঝলাম আপ্তবাক্য এমনি এমনি উক্ত হয় না। (একারণেই হয়তো আমিও মোটা হচ্ছি, হৃদয়ের আয়তন বাড়ানো যায় না, শুধু স্থূলত্ব দিয়ে যদি ধোঁকা দেয়া যায়!) মোটামানুষ একা এলো না, সাথে আরও একজন মোটামানুষ এলো। বোঝার সুবিধার্থে আসুন আমরা পরেরজনকে গীটারিক বলি। তার সাথে আমার পরিচয় ঐ গীটার দিয়েই। মানুষটা পাঁচতলা হল-এর ছাদে বসে নিশুতি রাতে গীটার বাজাতো। আমি শুনতাম, মাঝে মাঝে মোটামানুষের সাথে গলা মিলিয়ে গাইতাম। শিশির পড়লে, আমার ঠাণ্ডা লাগতো এবং মোটামানুষ ও গীটারিক মাথা দুলাতো, "তোরে নিয়ে... যে কী করি!" আমি হেসে ফেলতাম নিরুপায়, কারণ আমি নিজেই জানি না নিজেরে নিয়ে কী করা উচিত!


আমরা তিনজন রিকশায় চড়তাম। আপাতশীর্ণ আমাকে কীভাবে চিপা ও চাপা খেতে হতো সেটা সহজেই অনুমেয়। আমরা রাত জাগতাম। বারান্দায় বা ফুটপাতে হেঁটে বেড়াতাম। সোডিয়ামের আলো আমাদের ভালো লাগতো বলে আমরা চা খেতে বেরুতাম। পলাশীর মোড় ঘুরলেই আদা-চায়ের মামা, আমরা সেখানেই নিরন্তর ফাঁকা রাস্তার পাশে বসে ট্র্যাফিক সিগনালের ওঠানামা দেখতাম। বাহনবিহীন চওড়া রাস্তায় মাঝে মাঝে মহিষের দল চলে যেত, দেখে আমরা অবাকও হতাম কিছুটা। কখনও কখনও আমাদের ক্ষিদে লাগত। ডাইনিঙয়ের ঝোলঝোলকিউবিকমাছ বা আগাছাশাক রুচতো না বলেই আমরা রিকশা চেপে সোহাগে যেতাম। কালাভুনার ঝালে মোটামানুষ খুশি হতো, গীটারিক আরো দুয়েকটা মরিচ নিত আর আমি নাকের জল চোখের জল এক করতাম। খাওয়াশেষে জ্বলন্ত জিহ্বায় আরো তাড়না আনতেই আমরা চা খেতাম। গীটারিক ফস্‌ করে একটা সিগারেট ধরাতো। আমরা ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে খচ্চর স্যার আর ক্লাসের সবচেয়ে বড়ো আবাল ছেলেটাকে নিয়ে হাসাহাসি করতাম।


৪.
১০১০এ আমার জীবনও ফুরিয়ে এলো, এবং আমাদের তিনজনেরই সময় ফুরলো। মোটামানুষের সবার আগে। সে বেরিয়েই চাকরি নিয়ে নিলো (পরে সেটা ছেড়েও দিল)। গীটারিক নিজের আলসেমি ও নবাবি আচরণে কয়েকমাস পরেই চাকরি পেল দিনবদলের ফাঁকিঝুকিতে। আমার তখনও ঘরের মায়া কাটেনি, আমি পড়েই রইলাম আরো কিছুদিন। ছানাপোনা দুইজনের পরে আরো একজন ঘরে জায়গা নিল। তারপরেও আরও কিছুদিন আমি চক্কর কাটলাম। সেসময়ে বুঝিনি, তবে এখহন মনে হয় এটারও দরকার ছিল হয়তো। আমি ১০১০এ সব বাস্তবতাকে বুঝে উঠিনি তখনও। শেষ শিক্ষাটা হয়ে গেল শেষ তিন মাসেই। তারপরে আমি গ্র্যাজুয়েট, আমি ১০১০এর প্রাক্তন। দরজা ঠেলে ভেতরে এলে অচেনা মুখ, দরজা ঠেলে বাইরে গেলেও অচেনামুখ। আমাকে মুখোশ পরতে হয়। সেটা আমার ভাল লাগে না। তাই আমি ১০১০থেকে দরজা ঠেলেই বেরিয়ে আসি। যেভাবে এসেছিলাম, সেভাবেই চলে গেলাম। ভেবেছি যে সব শিখিয়ে দিয়েছে ১০১০ আমাকে, কিন্তু বেরিয়ে আসার সময়েই জানলাম সবচেয়ে বড়ো সত্যটা। এতদিন, প্রায় তিনবছরে যেটা আমি জানতেই পারিনি। টেরও পাইনি কীভাবে ১০১০ আমার কাছ থেকে এটা লুকিয়ে রাখলো, আড়াল করলো!


ফিরে আসার পরেই জানলাম, জুড়ে যাওয়া বা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত মানুষ নিলেও সেখানে কতটা মানসিক ক্ষয় ঘটবে তা আগে থেকে বোঝার কোনই সুযোগ নাই।

রবিবার, ৩ আগস্ট, ২০০৮

এই লেখাটা তোর জন্যে

আমরা দু’জনে বসেছিলাম। রাত অনেক, প্রায় এগারটা বাজে। একটু দুরে স্ট্রীটল্যাম্পেরা ছাড়া আর কেউ নাই। আমরা দুজন বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে বসেছিলাম। চারপাশে বেশ দমকা বাতাস আজকে। আমি আর তুই কংক্রিটের মাঠে পা ছড়িয়ে বসছিলাম চুপচাপ। আমাদের মাঝে খালি অনিশ্চিত নীরবতা।
তোর সাথে আমার বিরাট ঝগড়া চলতেছে। আমি অনেক নাড়া খেয়েছি ভিতরে ভিতরে। তুই আমার সাথে এরকম করতে পারলি?
ঝামেলাটা কী নিয়ে লেগেছিলো ভুলে গেছি। আমার শুধু ঐ রাতের আধঘন্টার কথা মনে আছে। তুই আমার খারাপ দিকগুলোর কথা বলতেছিলি। বলছিলি আমি একগুঁয়ে, ঘাড়ত্যাড়া, বদমেজাজি, কোন কথা বুঝার চেষ্টা করি না। খামাখা গ্যাঞ্জাম লাগাই। আমার কারণেই এই ঝামেলাটা লেগেছে। এখন তোকে দু’দিক সামাল দিতে হবে। এই উটকো কাজটা তুই আমার জন্য করবি। রাগের মাথায় তুই এরকম কতকিছু বলছিলি!!
আমি শুধু মাথা নিচু করে বসে বসে ভাবছিলাম তুই এত বাজে ব্যবহার কেন করছিস আমার সাথে? মনে হচ্ছিল তুই খুব স্বার্থপর হয়ে গেছিস, অযথা রিঅ্যাক্ট করছিস। এমন কিছু হয়নি যে তোকে সামাল দিতে হবে। হ্যাঁ ঝামেলা পাকাইছি, তো কি হইছে? আমার ঝামেলা আমি নিজেই ট্যাক্‌ল করতে পারি, তোর হেল্প কেন লাগবে? এসব টুকরা টুকরা কথা আমার মাথায় পাক খাচ্ছিল।
তোর মনে পড়ে দোস্ত? আমরা কী দুর্দান্ত ছিলাম! কী ডায়নামিক ছিলাম। পুরা ক্লাসে এরকম আর কয়টা দোস্তি ছিল? একটাও কি ছিল? সেই ক্লাস এইটে একবার সিটপ্ল্যানে স্যার তোকে আর আমাকে পাশাপাশি বসিয়ে দিল। তার আগে তেমন কোন খাতিরও ছিল না। আর তারপর থেকে কীভাবে কীভাবে জানি তোর সাথে দারুন একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেল! একসাথে পড়তাম আমরা মনে আছে। আমি তোরে ঠেলতাম, “ঐ বলদ! এইডা পড়, ফোর্টনাইটে আসবে। আজাইরা টাইম লস করিসনা!”
তুই কম পড়াশোনা করতি। কী কী নিয়ে ভাবতি। হাউসের নানা ফালতু ঝামেলায় জড়াইতি। কে কাকে কি বলছে, কেন বলছে এগুলা নিয়ে গুড ফর নাথিং পোলাগুলার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা ঘোঁট পাকাইতি। একটা সময়ে আবার আমার ঝাড়িতে কাজ হত, ওসব বাদ দিয়ে পড়তে বসতি। এভাবে ক্লাস নাইন, টেন, এসএসসি!
মনে আছে তোর, একবার স্যার সিটপ্ল্যানে আমাদের পাশাপাশি সীট না দিয়ে সামনা-সামনি দিয়েছিল। আমরা দুইজন গিয়ে স্যারকে ধরেছিলাম ঠিক করে দেয়ার জন্য! স্যার একটা দাবড়ানি দিয়ে বললেন, “সারাদিন দেখি দুইটা বকর বকর করতেছিস! সামনা-সামনি বস্‌, তাইলে বদমায়েশি একটু কমবে তোদের! হা হা!” …কমেছিল কি দোস্ত?
এসএসসির পুরা তিনমাস ছুটি আমার কী যে বাজে কাটল! এলাকায় একটা ফ্রেন্ড নাই। গল্পের বই শেষ, টিভি দেখতে দেখতে মুখস্ত হলো “কহো না প্যায়ার হ্যায়”-এর গান! তোর সাথে কথা বলবো তার একটা মাধ্যম নাই। কলেজে ফিরলাম ২২শে জুন, মনে আছে? রেজাল্ট নিয়ে কী আনন্দ! আর তার চেয়ে বড় আনন্দ তোর সাথে এতদিন পরে দেখা, কত গল্প! ছুটির মধ্যে ঈদে তোর সেই ফোনালাপী মেয়েটা, সেই ঈদের শুভেচ্ছা দেয়া। কলেজে এসে সেই মেয়েটাকে কী লেখা যায় তাই নিয়ে আমার সাথে তোর কত পরামর্শ!!!
কী সব দিন গেছে! আর সেই তুই আমার সাথে এরকম করলি? আমার না হয় মাথা গরম, পাগলা থাকি। তুই তো শান্ত-শিষ্ট, মাথা ঠাণ্ডা, আমারে বুঝাইলেও পারতি। রাগের চে’ বেশি জন্মাইছিলো অভিমান। তুই আমারে ক্যামনে ভুল বুঝলি? আজকে আমারে ভূতে পাইল যে আমি এইসব ভাবতেছি। কত বছর আগের কথা সেই বাস্কেটের গ্রাউন্ড? মনে হয় আগের জন্মের স্মৃতি বিধাতা কৌতুক করে ভইরা দিছে মাথায়। সেগুলো আজকে বড় কাঁদায়!
কলেজ ছেড়ে আসার আগে দিয়ে তোর উপর দিয়ে ঝড় যাচ্ছিল। প্রিন্সিপ্যাল, অ্যাডজু’ সবাই তোরে বাঁশ দিতেছিল। পড়তে পারতি না, টাইম পাইতি না। সেই তুই মাঝেমাঝে আমাকে এসে বলতি, “একটু পড়ায়ে দে দোস্ত, এইটা বুঝতেসি না”। আজকে মনে হয়, “আর তো কেউ কোনদিন এভাবে বললো না!” কলেজ ছেড়ে বের হয়ে তুই গেলি আর্মিতে, আর আমি গেলাম বুয়েটে। তাও ভর্তির আগে তবু ঢাকায় ছিলি, ডিসেম্বরে চলে গেলি চিটাগাং। কত দুরে! তোর সাথে দেখা হইতো না, কথা হইতো না, কিন্তু তুই ছিলি। এমন কতদিন গেছে তোর কথা মনেও পড়ে নাই! কিন্তু আড্ডার মধ্যে কেউ বেস্ট ফ্রেন্ড নিয়ে কথা তুললে আমার ঝাঁ করে তোকে মনে পড়ত। তারপর আর কিছুই ভাল লাগত না, ঐ আড্ডা, ঐ হৈচৈ। আমি তখন সেখানে অপাংক্তেয়!
তোর পোস্টিং হলো বগুড়ায়। মাঝে মাঝে ঢাকায় আসতি। দুই একদিনের জন্য। আমি কাজ ফেলে যাইতাম বিকালে বা সন্ধ্যায়, তোর সাথে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতাম! কী অদ্ভুত লাগত তখন বাস্তবতা! আমার মাঝে মাঝে মনে হত এ কেমন জীবনে ফেঁসে গেছি তুই আর আমি! একটা দিন দেখা হলেই মনে হত অনেক পেলাম!!
এখন তুই তো আরো দুরে। কোন সুদুরে আইভরি কোস্টে। কবে ফিরবি রে? তোরে দেখিনা বহুদিন, বহুদিন!!
একটা জীবনে মানুষ কয়টা বন্ধু পায়? কয়জন তাকে পুরোপুরি বুঝে? রেগে গেলে শান্ত করে, ক্ষমা চাওয়ার আগেই ক্ষমা করে দেয়? তোকে একদিন বলেছিলাম, (কবে মনে নাই) “আমি তোর উপরে আর কোনদিন রাগ করবো না। চ্যাত দেখাবো না।” তুই বলেছিলি, “ক্যান?” আমি মুখে বলেছিলাম, “কারণ লাভ নাই, তুই একটা টিউবলাইট। বুঝবিও না যে আমি চ্যাতছি। হুদাহুদি আমার রাগ নষ্ট করমু ক্যান। তুই হালায় একটা ফাউল!”
আসল কারণটা হইল আমি তোর উপ্রে ক্যামনে রাগ দ্যাখাই? তুই যে আমার না জন্মানো ভাই! ভাল থাকিস। আমার এলোমেলো জীবনের সবটুকু ভাল জিনিশ দিয়ে তোর জন্য দোয়া করি, তুই ভাল থাকিস, বন্ধু!