মুক্তিযুদ্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মুক্তিযুদ্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৪ মার্চ, ২০১৪

বাণিজ্য

[এই পোস্টটি অনেকক্ষণ ভেবে দিচ্ছি। একান্তই নিজস্ব ভাবনা। লিপিবদ্ধ করে রাখা দরকার মনে করি, আর অন্যদের এই বিষয়ে ভাবনা জানারও আগ্রহ হচ্ছে কিছুটা।] 

প্রথমেই রায়হান আবীর মনে করিয়ে দিল স্ট্যাটাসে যে, “আমরা যা, তা-ই আমাদের সংস্কৃতি” (তথ্যসূত্র/কপিরাইটঃ সামাজিক বিজ্ঞান বই)। এই সুযোগে ওকে ধন্যবাদ দিয়ে নিতে চাই। ডামাডোলে ভুলে যাই এসব সহজ সংজ্ঞা। ছোটবেলায় কত দ্রুত এসব মুখস্ত করতাম, এখন জীবনের পথ চলতে গিয়ে পদে পদে এসব সংজ্ঞার পুনঃপাঠে উপকৃত হই। ভাবি, ভাগ্যিস ছোটবেলাতেই শিখেছিলাম! নয়তো এখন বিভিন্ন জটিল মতামতের তোড়ে খাবি খেতে হতো।
প্রথমে একটু ভূমিকা দেই। দশক বিচারে বাংলাদেশের তরুণদের চরিত্র নিয়ে ভাবছিলাম। আশির দশকে বিশ্ববেহায়া আর্মির চোরটার কারণে যে দমন পীড়ন নেমে এসেছিল, তার প্রতিবাদে তরুণ সমাজের ভেতর একটা চাপা বিদ্রোহ সূচিত হয়েছিল। মাঝে মাঝে সেই বিদ্রোহ ক্ষোভের মতো বেরিয়েও আসতো। রাজনীতি নিয়ে সচেতনতা কতোটা ছিল জানি না, কিন্তু এটা জানি যে বুদ্ধিজীবী সমাজের পা-চাটা কিংবা ভয়ে ভীত হবার স্বভাব তরুণদের মধ্যে ছিল না। তৎকালীন লীগ কিংবা বিএনপির নেতারা কতোটা সক্রিয় ছিলেন, তার কথা জানি না, তবে তরুণদের সাথে তাদের একটা দূরত্ব হয়তো তখন থেকেই তৈরি হয়েছিল। এ কারণে চোর স্বৈরাচারটার বিরুদ্ধের আন্দোলনে সর্বাগ্রে সক্রিয় ছিল ছাত্রসমাজ, রাজনীতিবিদেরা নন। 

নব্বুইয়ের দশক সে তুলনায় বড়ই হতাশার। স্বৈরাচার গেছে, আমলারা এসেছে। প্রাতিষ্ঠানিক দূর্নীতি আর অরাজকতা চেপে বসেছে। ডানপন্থা ধীরে সামরিক উর্দি খুলে ব্লাডি সিভিলিয়ানের পোশাক পরে ভিড়ে মিশে গেছে। জামাত চলে এসেছে সংসদে। শিবির ছড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে। সম্ভবত এই দশক তরুণদের অবক্ষয়ের দশক। সম্মুখে কোন প্রকাশ্য শত্রু নেই। ঘাড়ে হাত দিয়ে যে ছেলে-মেয়ে বসে আছে, গোপনে সে-ই শত্রুশিবিরে নাম লিখিয়েছে। আশির দশকের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে মূলধারার রাজনীতিবিদেরা। তরুণদের সাথে যেহেতু তাদের দুর্নীতিপরায়ণ চরিত্র মেলে না, তাই তরুণদেরকেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্নীতিতে শেখাতে ছাত্র সংগঠনগুলো বটগাছের মতো শেকড় ছড়িয়ে দিল। পলিটিক্স তাই হয়ে গেল খারাপ, রাজনীতিসচেতনতা চলে গেল ক্রায়োজেনিক চেম্বারে।

শূন্য দশকের শুরুতেই আমরা বাংলাদেশে যে জঙ্গিবাদের উত্থান ও প্রসার দেখেছি, তার পেছনে তরুণদের রাজনীতিমনস্কতার অভাব অন্যতম ভূমিকা পালন করে। এক দশকের অজ্ঞান প্রজন্ম তৈরি করেছে শূন্যস্থান, আর সেই শূন্যস্থানে জায়গা করে নিয়েছে জামাত, জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, শিবির, বাংলা ভাই, আবদুর রহমান শায়খরা। বোমার পর বোমা ফেটেছে বাংলাদেশে। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সিনেমা হল অবধি; প্রতিটি জেলায়। এই পুরো সময়টায় স্বৈরাচারী চোরটার মতোই একটা দানবের জন্ম ও বিকাশ হয়েছে। পার্থক্য হলো, স্বৈরাচার চোরটা সামনে ছিল, আর জঙ্গিরা ছিল আড়ালে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তাই হয়তো তরুণদের এক দশক দেরি হয়েছে। শূন্য দশকের শেষ দিকে এসে যে সামরিক শাসন ফিরে এলো ব্লাডি সিভিলিয়ানের পোশাকে, সেটা দেখেই বোধহয় তাদের টনক নড়েছে। ২০০৮ এর নির্বাচনে তরুণরা তাই চালকের ভূমিকা নিয়েছে আবার। চিন্তা করুন, মাত্র ছয় বছর আগেও যদি কেউ বলতো, বাংলাদেশের মাটিতে জামাতের লিডারকে ফাঁসি দেয়া হবে বিচারের পর, সেটা কি কেউ বিশ্বাস করতো? আপনি নিজেও কি করতেন? আমি অন্তত করতাম না। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়েছে তরুণদের কারণেই। 

গত তিরিশ বছরের সমাজে তরুণদের এই প্রভাবকে তাই উপেক্ষা করার উপায় নেই। গত বছর শাহবাগ দেখে যেমন আমরা বিস্মিত ও অভিভূত হয়েছি সেটাও তো তরুণদেরই আন্দোলন। কিন্তু এখন, প্রায় এক বছর পরে এসে পেছনে ফিরলে মনে হয় এই আন্দোলনও এক দিনের নয়। কোন একটা আদর্শের রূপরেখা আমাদের তরুণ সমাজের ভেতর চলনশীল রয়েছে। এক দশকের তরুণরা মধ্যবিত্ত সংসারী হওয়ার সময় সেই আদর্শটিকে পরের দশকের তরুণদের হাতে তুলে দিয়ে যায়। যে নবতরুণ কৈশোরে দর্শক ছিল, তারাই দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। এই চক্র বাংলাদেশে চলমান।



আমরা প্রথম দশকের প্রায় মাঝামাঝি চলে এসেছি। ‘৮০, ‘৯০, ‘০০ এর চাইতে ‘১০ একটু আলাদা হয়ে উঠেছে। হয়তো শাহবাগের কারণেই। আমরা দেখতে পাচ্ছি ধীরে ধীরে তরুণদের হৃত রাজনৈতিক চেতনা আবার ফিরে আসছে। তারা সচেতন হয়ে উঠছেন একদম তৃণমূলের রাজনীতি নিয়েও। কোথাকার কোন এমপি কোন এক অনুষ্ঠানে সিগারেট খেয়েছেন, সেই ছবিটি কেমন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। ক্ষোভের আঁচে তাকে সর্বসমক্ষে মাফ চাইতে হলো। ঘটনাটি অভূতপূর্ব। আমার জানামতে আমাদের পূর্ববর্তী কোন তরুণ এই পর্যায়ের জবাবদিহিতা আদায় করতে পারে নি। অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইন্টারনেট সবাইকে একটি কণ্ঠ দিয়েছে, এর সুবিধা তরুণরা সবচেয়ে বেশি গ্রহণ এবং কার্যকরভাবে করতে পারছে। রাজনীতিবিদেরাও দ্রুত অনুধাবন করছেন যে তাদের প্রাইভেট লাইফটি আর প্রাইভেট নেই। এটা পাবলিক হয়ে গেছে। এখন আমরা যেমন খালেদা জিয়ার লুপ্ত প্রাসাদের ছবি গুগল করলেই দেখতে পাই, তেমন হাসিনা পোলাও রান্না করছে সেটাও দেখতে পাই। এমন সহজলভ্যতা আসলে রাজনীতিবিদদের মিথ থেকে মানুষে পরিণত করছে। আমার অনুমান আর দশ বছরের মধ্যেই আমরা এখনকার তরুণদের অনেককে সক্রিয়ভাবে দেখতে পাবো। তাদের ফেসবুক ফলোয়াররাই মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করবে! (একটু বেশি বলে ফেললাম নাকি?)

শাহবাগের কারণে আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। সেটা হলো বাংলাদেশি বনাম বাঙালি জাতীয়তাবাদের মেরুকরণের তীব্রতা। “জামাত-বিএনপি” মতবাদের বিশ্বাসীরা ফেব্রুয়ারিতে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। শাহবাগকে বিভ্রান্ত করতে তাদের সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার ছিল ধর্ম। তারা সেটা সফলভাবে কাজে লাগিয়েছে। অশিক্ষিতের মতো শাহবাগের পক্ষ-বিপক্ষ সবাই নিজেদের দাড়ির দৈর্ঘ্য এবং পাজামার গিঁটের টাইটনেস মাপতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি এটাও ঠিক যে আওয়ামী লীগ শাহবাগের নন-পার্টিজান চেহারাকে ভয় পেতো, কিন্তু জামাত-বিএনপির আঘাতের পরে তাদের জন্য এটাকে নিজেদের আন্দোলন বানানো সহজ হয়ে পড়ে। টুপিপরা শাহবাগ তাই হয়ে যায় হাসিনার শাহবাগ। দুর্ভাগ্য যে তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা এখনো ততোটা পোক্ত হতে পারে নি, তাই শাহবাগের নন-পার্টিজান অবয়ব তারা টিকিয়ে রাখতে পারলো না। মাঠে এটা হয়ে দাঁড়ালো লীগ বনাম জামাত-বিএনপির দাবাখেলা। এই খেলাটা বুঝতে পেরে যারা সেই খেলার বিরোধিতা করেছিল, তাদেরকে কল্লা কাটা হলো, জেলে পোরা হলো। যেহেতু এই বুঝদারদের কোন রাজনৈতিক মামা নেই, সেহেতু অসহায়ের মতো এই মৃত্যু আর বন্দিত্ব দেখা ছাড়া আমাদের (হ্যাঁ, আমি নিজেকে নিষ্ক্রিয়ভাবে হলেও, এই অংশের একজন মনে করি।) কিচ্ছু করার ছিল না। ব্লগে ব্লগে প্রতিবাদ হয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু আসলে কোন লাভ হয়েছে বলে আমার নজরে পড়ে না। সরকার বাহাদুরের যেদিন ইচ্ছা হয়েছে, সেদিন ব্লগারদের ছেড়েছে। যেদিন ইচ্ছা হয়েছে, শাহবাগের মঞ্চ ভেঙে দিয়েছে। জামাত-বিএনপি তাদের নিজেদের নেতাদের বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে গেছে… 

কথায় কথায় প্রসঙ্গ থেকে সরে গেছি। বাংলাদেশি বনাম বাঙালি জাতীয়তাবাদের মেরুকরণ নিয়ে বলছিলাম। আমাদের তরুণ সমাজের ভেতরে (অন্তত ইন্টারনেটে সচল অংশে) স্পষ্টতই একটা দূরত্বের জায়গা সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের চিন্তা, আরেকদিকে প্রতিক্রিয়াশীল জামাতি চিন্তা। এবার একটু ভেঙে চুরে দেখি।

মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের চিন্তা মানে আওয়ামী লীগের চিন্তা না। তারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাণিজ্য করে। এই বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে ‘০৮-’১৩ সরকারের আমলে। রীতিমত কর্পোরেট বাণিজ্য কোম্পানিগুলো যেমন ভাষা আন্দোলন, শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখ, ও বিজয় দিবস নিয়ে বাণিজ্য করে, ঠিক তেমনি বাণিজ্য করে আওয়ামী লীগ। যে শেখ মুজিব পুরো জাতির অংশ, সেই মুজিবকে তারা নিজেদের পকেটে পুরে রাখতে চায়। স্পষ্টতই তাদের অন্য কোন অনুকরণীয় নেতা নাই। শেখ মুজিবকে সপরিবারে এবং চার নেতাকে জেলে হত্যা করার মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করেছি যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতা জন্মাতে পারবে না। আওয়ামী লীগে যা আছে, তা হলো রাজনৈতিক বেনিয়া, যাদের কাজ বাণিজ্য করা। আর তাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বাণিজ্যের দোসর হলো ভারত। কারো কারো জন্য চীন। আর এই বাণিজ্যে তরুণদের অধিকাংশেরই কোন ভাগবাটোয়ারা নেই। 

প্রতিক্রিয়াশীল জামাত চিন্তা মানে কেবল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা না। এর সাথেও যুক্ত হয়েছে বাণিজ্য। বাণিজ্যটি ধর্ম ও গোঁড়ামোর। বিএনপি এবং জামাত উভয়েই জানে যে এখনকার স্মার্ট তরুণ “সাইফুর রহমান” (কাল্পনিক) খুব বেশি নীতিবাক্য কিংবা ধর্মীয় নৈতিকতা শুনতে চায় না। প্রতি ওয়াক্তে নামাজ পড়তে বললে বিরক্ত হয়। কিংবা ভোগবিলাস ছেড়ে সমাজ ও দেশের কাজ করতে বললে, বিদেশ না গিয়ে দেশে সরকারি চাকুরি করতে বললে সে উল্টে দৌড় দিবে। এখনকার স্মার্ট তরুণ “সাইফুর” স্মার্টফোন ব্যবহার করে এবং তার আছে ইন্টারনেটে ফেসবুক। তাই জামাত ও বিএনপি তাকে ধর্মীয় রস দিয়ে কাছে টানে। ওড়না পেইজ দিয়ে কাছে টানে। মুসলমানিত্ব দিয়ে কাছে টানে। কোরানের দুইটা আয়াতের পাশাপাশি সে নারীর পর্দা নিয়ে তিনটা ভুয়া হাদিস শেয়ার দেয়। শাহবাগে মদ গাঞ্জা খাওয়া হয় – এই শেয়ারের পাশাপাশি ইন্ডিয়ার বিএসএফ-এর অত্যাচারের ছবিও শেয়ার দেয়। এই ফেসবুক জীবন জামাত-বিএনপির কাজ অত্যন্ত সহজ করে দিয়েছে। 

আমি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের চিন্তা বলতে যে অংশটির চিন্তাকে চিহ্নিত করছি, যারা আওয়ামী লীগের এই বাণিজ্যের খেলার বিরোধিতা করে এবং জামাত-বিএনপির ধর্মের মুলার সাথে বাংলাদেশি মুসলমানিত্বের বাণিজ্যের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয়। মুক্তিযুদ্ধ ‘সময়ের প্রয়োজনে হয়েছিল’, কিংবা ‘পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে হয়েছিল’ এবং জনপ্রিয় মতবাদের সাথে আমি একমত না। আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ গড়ার আকুতি থেকে। প্রত্যক্ষ কারণ ছিল পাকিস্তানের আর্মির গণহত্যা, যুদ্ধের আগে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ। কিন্তু অন্তর্নিহিত আকুতিটি ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার, যেখানে সংখ্যালঘু বলে কোন জাতিগোষ্ঠী বা নাগরিককে নির্যাতিত হতে হবে না। বুঝতেই পারি, সেই রাষ্ট্রের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে, আর বাস্তব হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক হত্যা, অ্যাসাসিনেশন, জেলহত্যা, সামরিক শাসন, আমলাতন্ত্র ও রহমান ডাইনেস্টিদ্বয়ের শাসন। এই ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নকালে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতাকে ফিরে আসতে হবে। আর এজন্যই শাহবাগ জরুরি। শাহবাগ সেই কণ্ঠস্বরটিকে স্থান দিয়েছে। সূচনা হয়েছে জামাত-বিএনপির বাংলাদেশি মুসলমান তত্ত্বের বিপরীতে ধর্মনিরপেক্ষতার তত্ত্বের। জামাত-বিএনপির তত্ত্ব ছড়াতে সময় লেগেছে প্রায় ২৪ বছর বা দুই যুগ। আশা করি, ধর্মনিরপেক্ষতার জয় আর দুই যুগের আগেই হবে!

জয় বাংলা! 

[পরিশিষ্টঃ লিখতে বসেছিলাম এক বাণিজ্য (ক্রিকেট ও সঙ্গীত) নিয়ে, লিখে ফেললাম আরেক বাণিজ্যের (রাজনীতি) কথা। পারপেচুয়াল আউট অফ টপিক অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে মনে হয়!]

শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

শাহবাগ ভাবনা

ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ভেবেছিলাম বইমেলায় যেতে পারবো না এটা এই মাসে সবচেয়ে বড়ো আফসোস হয়ে থাকবে। ৫ তারিখের পর থেকে সব উল্টেপাল্টে গেল! শাহবাগে সশরীরে থাকতে না পারা, এমনকি মাঝে মাঝে কাজের চাপে ভার্চুয়ালিও থাকতে না পারা আমার জন্য প্রবল আফসোস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমি পেশা হিসেবে শিক্ষকতা করবো বলে ঠিক করেছি প্রায় বছর দুয়েক আগে। দেশের একটা প্রায়-অখ্যাত, থার্ড টিয়ার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ কৌশল পড়াতাম। পড়াতে পড়াতে টের পেলাম যে এই বিষয়ে আমার জ্ঞান খুবই কম। ছাত্রদের হয়তো কোচিং সেন্টারের মত বই আউড়ে দিতে পারি, কিন্তু সত্যিকার অর্থেই বিষয়টা তাকে বুঝানো লাগবে, তত্ত্বের সাথে বাস্তব দুনিয়ার সংযোগটা দেখিয়ে দিতে হবে; সে বিদ্যা আমার নেই। কেবল সূত্র মুখস্ত করে আর অঙ্ক করে তারা হয়তো ভাল গ্রেড পেতে পারে, কিন্তু চাকরিক্ষেত্রে গিয়ে সামান্য অ্যাপ্লিকেশনগুলোতেই আটকে যাবে। আরো একটা ব্যাপারে আমার প্রশিক্ষণ দরকার আছে - সেটা হলো ছাত্রদের মাঝে দায়িত্ববোধের জন্ম দেয়া এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য গড়ে তোলা। এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো সাধারণত মানুষ বাবা-মা কিংবা বড় ভাই-বোন ও আত্মীয়দের কাছ থেকে শিখে নেয়। কিন্তু বাঙলাদেশে জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত বাবা-মায়ের পক্ষে সন্তানদের ভরণ-পোষণের পর এত সূক্ষ্ণ অথচ জরুরি বিষয়গুলো শেখানোর অবকাশ থাকে না। আর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও এই বিষয়গুলোতে নজর দিতে পারে না। এই শিক্ষাটি কেবল ভাগ্যবান ছাত্রদের কপালে জোটে, যারা সেই প্রজ্ঞাবান শিক্ষকদের সংস্পর্শ পায়। আমি কলেজে পড়ার সময় তেমন শিক্ষকদের পেয়েছিলাম, যারা পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের জগতকে বুঝার দৃষ্টি খুলে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন আমার ভেতর।
ভালোকে খারাপ থেকে আলাদা করতে পারার বিবেচনা, ঝাঁকের কইয়ের মতো জনপ্রিয় মতের তরফে চিন্তাভাবনা ছাড়াই না দাঁড়িয়ে প্রয়োজনে বিরুদ্ধমতকে সোচ্চার করার সাহস থাকা প্রয়োজন। এগুলো একজন দায়িত্ববান মানুষ তথা সুনাগরিক গড়ে তোলে। যে ব্যক্তি নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন এবং সেই মতকে সমুন্নত রাখতে এবং মানুষের হিতার্থে প্রয়োগ করতে যে কোন শক্তির মোকাবিলা করার সাহস রাখেন, তিনিই মহোত্তম। তবে এখানে উল্লেখ্য যে, এই সাহস কখনই মুখে বলে দেখানোর সাহস নয়। সামাজিক যোগাযোগে এমন মানুষই বেশি যারা মুখে মুখে অনেক হাতি-ঘোড়া মেরে বসেন, কিন্তু স্থির পরিকল্পনা ও একগুঁয়ের মত একাগ্রতা নিয়ে নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন না। আমরাও এমন চটক আর জেল্লা দেখে ভুল করে তাকেই 'নায়ক' মনে করি। যদিও মূলত তিনি বাক্যসর্বস্ব মানুষ, দায়িত্ব নিতে জানেন না। উচ্চারিত প্রতিটি বাক্যের জন্য যদি দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার চর্চা নাগরিক জীবনে থাকতো, তাহলে আমরা দেখতাম এই মুখে মুখে হাতি-ঘোড়া মারা মানুষগুলো চুপ মেরে গেছেন!
আমি মনে করি একজন ছাত্রের সম্ভাবনা অসীম। অতিক্ষুদ্র শিক্ষকতাজীবনে এমন দুরন্ত ছাত্র দেখেছি, যে নিতান্ত সাধারণ পড়াশোনার মান পেয়েও তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে। আমি নিজেই তাদের শেখার ক্ষমতা ও শিক্ষাকে কাজে লাগানোর দক্ষতা দেখে আশাবাদী হয়েছি। গর্বও হয়েছে যে প্রায় কাছাকাছি বয়সের এমন কাউকে শেখানোর সুযোগ পেয়েছি, যদিও আমি তার থেকে অনেক কম জানি। আবার বেদনার্ত হয়ে দেখেছি কিছু কিছু ছাত্র নিজের অমিত সম্ভাবনাকে অনেকটা না বুঝেই অপচয় করছে। তারা বিদ্যার্জন করছে, কিন্তু তা কেবল নিজের ক্যারিয়ারের স্বার্থে। অস্বীকার করবার উপায় নেই যে অনেকের বাস্তবতা সুখের নয়, হয়তো পারিবারিক দায়বদ্ধতা তাদের ওপর চেপে বসেছে। তাদের দোষ দেখি না। তবে খারাপ লাগে যে এমন সম্ভাবনাময় একজন মানুষকে বেড়ে ওঠার, নিজের পছন্দের ক্ষেত্রে বিকশিত হবার সুযোগ সমাজ দিচ্ছে না দেখে। আমি ভেবেছিলাম যে এই কঠোর বাস্তবতা মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই।
তবে এই শাহবাগ গণজাগরণ আমার সেই ধারণাকে বদলে দিচ্ছে ক্রমশ। আমি এখন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি যে একজন মানুষ তার বাস্তবতাকে বদলে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের চাপিয়ে দেয়া নিয়মকে অবলীলায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার অমিত শক্তি তার ভেতর সঞ্চিত ও সুপ্ত রয়েছে। দরকার কেবল একটু স্ফূলিঙ্গের, আর একটু যূথবদ্ধতার। আদালতের রায় মেনে না নিয়ে যে গুটিকয় মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন, তারা আমাদের সবার মতোই সাধারণ মানুষ। জামাত-শিবির ছাড়া ওইদিন রায়ের সংবাদে কম-বেশি সবাই আমরা ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলাম। চিন্তা করে দেখুন, ওই কয়েকজন এগিয়ে এসে না বসলে, দায়িত্ব নিয়ে ঘোষণা না দিলে হয়ত এই আন্দোলনের জন্মই হতো না! গুটিকয় মানুষ রাজপথে বসে পড়লেন, একদিন পরেই সেই গুটিকয় মানুষ হয়ে গেল জনসমুদ্র। এখানে উল্লেখ্য যে জনসমুদ্রের সকলেরই দায়িত্ববোধ প্রথমে জড়ো হওয়া মানুষগুলোর দায়িত্ববোধের সমান। আমরা নেতাপ্রবণ জাতি, কিন্তু এটা ভুললে চলবে না যে কোন নেতা জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে আমাদের যুদ্ধগুলো করে দেন নি। মানুষ নিজের যুদ্ধ নিজেই করেছে। তেমনি শাহবাগের প্রতিদিনের অসংখ্য মানুষের বিন্দু বিন্দু স্বতন্ত্র চেতনাই এই গণজাগরণের জ্বালানি। আমার আফসোস, এই স্ফূরিত আগুন আমি নিজ চোখে দেখতে পেলাম না, কেবল মনিটরেই দেখলাম।
এই যুদ্ধে আমাদের শত্রু সংখ্যায় দুর্বল। কিন্তু তারা সঙ্ঘবদ্ধ। আমরা সংখ্যায় বহুগুণ। কিন্তু একতাবদ্ধ নই। মাত্র সতেরো দিনের আন্দোলনে আমাদের মাঝে কিছু কিছু মতবিরোধ, চাপাক্ষোভ, মনমালিন্য তৈরি হয়েছে। মাথা গরম না করে চিন্তা করে দেখুন তো, এর পেছনে যাকে দায়ী করছেন, তার মতো আপনি নিজেও কি সমানভাবে দায়ী নন? আন্দোলনের প্রথম দিনের আপনি কি ভেবেছিলেন যে সতেরো দিন পরে এরকম কিছু হতে পারে? কিংবা চিন্তা করুন, যে তিল তিল ত্যাগের মাধ্যমে এই গণজাগরণের অনল ছড়িয়ে গেছে, সেখানে আপনার বা আমার ব্যক্তিগত চাওয়াপাওয়ার গুরুত্ব কতটুকু? নেই বললেই চলে। এর পরেও যদি মনে করেন যে আপনার রাগ বা হতাশা যৌক্তিক, তাহলে একাত্তরে ফিরে যাই, চলুন। ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট হলো। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা। তার সতেরো দিন পরের তারিখ হলো ১২ এপ্রিল। মাত্র দুইদিন হলো বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়েছে! জানেন তো, সেই সরকার গঠনের সময় নিজের স্বার্থ নিয়ে নিচুমনের কাইজ্যা কে লাগিয়েছিল? লোকটার নাম খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ইতিহাস তাকে তার জায়গা দেখিয়ে দিয়েছে।
তাই বলি, ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে ওঠার ক্ষমতা আপনার আছে, জাতি খন্দকার মোশতাক চায় না, বরং স্থিতধী তাজউদ্দিন আহমদ চায়। শত্রু আমাদের চাইতে সঙ্ঘবদ্ধ, কারণ তাদের লক্ষ্য স্থিরকৃত। আমাদের লক্ষ্য স্থির করা হলে সেটা নিয়ে সংশয় প্রকাশ না করে একাত্ম হোন। এটা অমন হলে ভাল হতো, ওটা তেমন হলে ঠিক হতো - এরকম সমালোচনার উদ্রেক হচ্ছে কারণ যখন এটা এবং ওটা ঠিক করা হয়েছে তখন আপনি সক্রিয় ছিলেন না। দায়িত্ব নেন নি। তাই এখন আপনার দায়িত্ব হলো যারা দায়িত্ব নিয়েছে তাদেরকে সমর্থন দেয়া। এই নির্দেশনার কোনকিছু আপনার অপছন্দ হতেই পারে। সেক্ষেত্রে সক্রিয় হয়ে পরের ধাপগুলোকে বাস্তবায়নে অংশ নিন, দেখবেন তখন আপনার নির্দেশনা ও পরামর্শ গৃহীত হচ্ছে। আমাদের শত্রুরা চায় আমাদের মাঝে এই মতবিরোধ লেগে থাকুক, ক্রমেই বেড়ে উঠুক। কারণ একমাত্র এই স্ট্র্যাটেজিতেই তারা জিততে পারবে। আমাদের জনবল প্রচুর, কেবল দরকার মতামত নির্বিশেষে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে দৃষ্টিনিবদ্ধ রাখা।
জয় বাংলা!

সোমবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৩

রাজাকারের ফাঁসি ও প্রাসঙ্গিক চিন্তা

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী বাচ্চু রাজাকার ওরফে আবুল কালাম আজাদকে বাংলাদেশের সংবিধানের সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একাত্তরে ফরিদপুর এলাকায় খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ সহ অসংখ্য কুকীর্তির জন্য দায়ী এই বাচ্চু রাজাকার। পাকিস্তানি আর্মির সাথে মিলে যুদ্ধের সময় নিরীহ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে এই কুখ্যাত অপরাধী। তার শাস্তির রায় শুনে মনে যে অভূতপূর্ব আনন্দ হলো তা প্রকাশের ভাষা আমার নেই। এক ঘুম দিয়ে উঠলাম, এখন মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা মাথায় আরো কিছু ব্যাপার চিন্তা করার সময় এসেছে।
১। বাচ্চু রাজাকার পলাতক। রাজাকারদের দোসর-রাষ্ট্র পাকিস্তানে। তাকে ধরা হবে এই খবর পেয়ে সে পালিয়েছে। এখন তাকে ধরে আনা হউক। পাশাপাশি এটাও চিহ্নিত করা হউক যে কে বা কারা তাকে পালাতে সাহায্য করেছিল। রাজাকার ও রাজাকার-সমর্থক কারো ঠাঁই এই দেশে থাকা উচিত না।
২। এই রায়ের বিপরীতে আপিল করবে আসামিপক্ষ। সেই আপিলের সময় ৩০ দিন। তারপরে সেইটাকে আবার খণ্ডন করা হবে। আমার চাওয়া এই আপিল সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক। কোন জামাত-শিবির বা তাদের ভাবসমর্থক যেন বলতে না পারে যে তারা সুযোগ পায় নাই।
৩। এই রায়ে ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য দলীয়ভাবে জামাতকে দায়ী ঘোষণা করেছে ট্রাইব্যুনাল। সুতরাং জামাতের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে মামলা করে বিচার করার সময় এসেছে। উল্লেখ্য ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালেও বেশ কয়েকটি দলের বিচার হয়েছিল। (তথ্যটি পেলাম একরামুল হক শামীমের কাছ থেকে। তাকে ধন্যবাদ।)
৪। বাচ্চু রাজাকার টিভিতে ধর্মীয় উপদেশের অনুষ্ঠান করতো। তাকে এই সুযোগ করে দিয়েছিল এটিএন বাংলার মালিক মাহফুজুর রহমান, এবং পরে এনটিভির মালিক মোসাদ্দেক আলী ফালু। মাহফুজের দুর্নীতি ও পীড়ন নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। ফালুও কী চিজ, কত টাকা দুর্নীতি করেছে, সবাই জানে। এখন সময় এসেছে শক্ত হাতে এদের বিরুদ্ধে আইনী প্রচারণা শুরু করার। রাজাকারের পৃষ্ঠপোষকদের একে একে ধরা উচিত।
৫। জামাতের বর্তমান অবস্থা হলো তারা বিএনপির সাথে মিশে রাজনীতিতে টিকে থাকতে চেষ্টা করছে। অতীতে আওয়ামী লীগের সাথে মিশেছিল। এই অ্যামিবাসদৃশ বর্ণচোরার দল ভবিষ্যতেও আওয়ামী লীগের সাথে মিশতে পারে। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নাই। এখনই সময় এদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। যুদ্ধাপরাধী বিচারের পাশাপাশি জামাতের ধর্মভিত্তিক বদমায়েশি থামানো দরকার। এটা সহজেই অনুমেয় যে তারা ধর্মানুভূতির দোহাই তুলে পাব্লিক সিমপ্যাথি পেতে চাইবে। কিন্তু এই খুনী ও ভ্রষ্ট দলটির ব্যাপারে এখন সতর্ক না হলে পরে সমূহ বিপদ হতে পারে। এমনিতেই এরা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে।
৬। জামাতের পাশাপাশি কিছু বুদ্ধিবেচা বুদ্ধিজীবীদেরকেও ধরার সময় এসেছে। একজন হলো আসিফ নজরুল, ওরফে নজরুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক, যে মতিউর রহমান নিজামী যুদ্ধাপরাধী নন এমন বক্তব্য দিয়েছিল। এছাড়াও নানা সময়ে ট্রাইব্যুনাল নিয়ে তার মহা আপত্তি। এটা ঠিক না, ওটা ঠিক না, এহেন নাকিকান্না সে প্রায়ই টক-শোগুলোতে কেঁদে বেড়ায়। আদালত নিয়ে এমন অপমানজনক কথা বলায় তাকেও বিচারের সম্মুখীন করা উচিত।
৭। আরেকজন অপরাধী আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। ট্রাইব্যুনালের বিচারকের প্রাইভেসি লঙ্ঘনের দায়ে তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়া উচিত। বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে সেও।
৮। সবশেষের পয়েন্টটা সংরক্ষিত তাদের জন্য, সেইসব ভবিষ্যত-দেখে-ফেলা জাতির কর্ণধারদের জন্য, সেইসব হাস্যকর জ্ঞানীর জন্য, সেইসব ডাইকোটামি-কপচানো রিকনসিলিয়েশন-থিওরির প্রবক্তাদের জন্য, সেইসব 'আসল যুদ্ধাপরাধী' খোঁজা গরুচোরগুলোর জন্য, সেইসব কাব্যচর্চা-উপন্যাসচর্চা-সাংবাদিকতাচর্চা করা পাকিস্তানপন্থীদের জন্য। তাদের দেখে আজ হাসছি। অনলাইনে তাদের তুবড়ি ছোটানো পূরীষগুচ্ছ আজ থেকে এতিম হলো। এইসব কুবুদ্ধিপনার জঞ্জাল একদিন শেষ হবে, ধুয়ে মুছে সাফ হবে। আমি সেইদিন এদেরকে নিয়ে আর মাথা ঘামাবো না।

মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১১

আমার সন্তানের সন্তান যেন পাকিস্তান পছন্দ না করে

আমি মূলত রাজনীতি বুঝি না। আমি খুব দ্রুত মানুষকে বিশ্বাস করতে পছন্দ করি। যে পরিবারে আমি জন্মেছি, সেখানে নব্বুইভাগ মানুষ খুব ভাল। তারা একান্ত স্বার্থহানি না হলে কারো ক্ষতি করে না। নিজের লাভ দুই শতাংশ কম নিয়ে হলেও তারা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে। তাদের মাঝে কেউ রাজনীতিতে নাই।
আমি ছোটবেলা থেকে পাকিস্তানকে ঘৃণা করি। যে বয়সে মানুষ ডালিমকুমার আর সুয়োরাণী দুয়োরাণীর গল্প শুনে বড়ো হয়, আমি সে বয়সে পাকিস্তানের গল্প শুনতাম। পাকিস্তানের গল্প শুনতে শুনতে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম। আমার ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে স্বপ্ন আকারে পাকিস্তানিরা আসতো। সেই স্বপ্ন আমার কাছে বিজাতীয় এবং দুঃস্বপ্ন মনে হতো। তখন থেকে আমি পাকিস্তানকে ঘৃণা করি।
পাকিস্তানকে ঘৃণা করতে করতে আমার মাঝে অনেক রিপু কমে এসেছে। আমি নিজের পাশবিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছি। আমি মদ ও মাংস নিয়ে স্বেচ্ছাচারকে ঘৃণা করেছি। আমি শিখেছি যে নারীকে মর্যাদা দিতে হয়, সম্মানের সাথে কথা বলতে হয়। পাকিস্তানে নারীকে মর্যাদা দেয়া হয় না। আমি আরো জেনেছি যে মানুষকে হত্যা করা ঠিক না। অনেক দৈবসংযোগে মানুষ জন্ম নেয়, এবং প্রতিটা মানুষ অমিত সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়। তাই তাকে মারা খারাপ। প্রতিটা মানুষের সাথে আরো কিছু মানুষ জুড়ে থাকে, সে মারা গেলে তারাও কষ্ট পায়। তাই মানুষ মারা খারাপ। পাকিস্তান একটি দুইটি না, তিরিশ লাখ মানুষকে মেরে ফেলেছে। এবং তারা এই হত্যাকে জাস্টিফাই করেছে ধর্ম দিয়ে। তারা মাফ চায় নি। তাদের বিচারও হয় নি।
এগুলো জানার পরে আমি পাকিস্তানকে প্রবল ঘৃণা করতে থাকি। তারপর বড়ো হয়ে আমি মাঝে মাঝে জেনেছি যে পাকিস্তানের সবাই খারাপ না। তাদের মাঝেও ভাল মানুষ আছে। আমি তখন 'ভাল'র নতুন সংজ্ঞা শিখলাম - নির্যাতিত হলেই তাকে ভাল বলা হয়। কিন্তু স্কুলে শিখেছিলাম, "অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে"। স্কুলের শিক্ষা মাথায় গেঁথে গেছে। তাই আমি পাকিস্তানের সেই 'ভাল' মানুষদের তৃণের চাইতেও কয়েকগুণ বেশি ঘৃণা করতে শুরু করলাম!
আজ একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আমার সন্তানকে এই ঘৃণাশিক্ষা দিয়ে যাব। বাংলাদেশ এমনিতেই অনেক পিছিয়ে আছে - ভ্রাতৃপ্রেমের বাণী শিখে আর এগিয়ে না গেলেও চলবে। এবং আমি শিখিয়ে যাব যে আমার পৌত্রকেও যেন সে এই ঘৃণার শিক্ষা দেয়। পাকিস্তানকে ঘৃণা করে যে পূণ্যলাভ হবে, তাতে আমি যে স্বর্গ-বেহেশ্‌ত ও পরপারের সকল পুরষ্কার পাবোই - এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। সুতরাং নিজের লাভের জন্যই আমি এই কাজ করছি। কেউ ভেবে বসেন না যেন, যে দেশপ্রেমের মত বায়বীয় ও সংজ্ঞাহীন মতবাদে আমি আদৌ বিশ্বাস করি!

শনিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১১

গেরিলা দেখতে গিয়ে

নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত ছবি ‘গেরিলা’ মুক্তি পেলো ১৪ এপ্রিল, নববর্ষের দিন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর বানানো ছবি। গল্প নেয়া হয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবান’ থেকে। চিত্রনাট্যে উপন্যাসের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা পরিচালকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকেও গল্প নেয়া হয়েছে। মুক্তি পাওয়ার পরে আমার ছবিটা দেখতে যেতে একটু দেরি হলো। প্রথম সপ্তাহে পারলাম না, দ্বিতীয় সপ্তাহের মাঝামাঝিতে একদিন স্টার সিনেপ্লেক্সে গিয়ে টিকেট কাটলাম। এক সপ্তাহ আগেই ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ দেখেছি। পরপর অল্প ব্যবধানে দু’টা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি দেখা আমার জন্য আনন্দের ব্যাপার। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে খুব বেশি ভালো মানের ছবি বানানো হয় নি। কারিগরি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা একটা বড়ো কারণ। বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপ্তি আরেকটি বড়ো কারণ। এছাড়াও ছোটখাটো কিছু কারণ আছে। অন্যতম প্রধান কারণ আমার মতে মুক্তিযুদ্ধকে পরিবেশন করার ভঙ্গি। ছোটবেলা থেকে আমাদেরকে যে মুক্তিযুদ্ধ শেখানো হয়, যা আমরা বইপুস্তক থেকে শিখি, মিডিয়া দেখে জানি, এটা চরম বিরক্তিকর পরিবেশনা। ভাঙা রেকর্ডের মতো কিছু বুলি আওড়ে মুক্তিযুদ্ধকে বর্ণনা করা হয়। দিন-তারিখ, মৃতের সংখ্যা, পক্ষ-বিপক্ষ এগুলো নিরসভাবে বলে দেয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধের স্থিরচিত্রগুলো সে তুলনায় অনেক বাঙ্ময়। ছবিগুলো কেবল কথা বলে না, যেন চিৎকার করে। স্থিরচিত্রের একটা বড়ো অংশ নির্যাতিত বাঙালির ছবি। ২৫ মার্চের কালরাতের গণহত্যা থেকে শুরু করে ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যার ছবিগুলো বহুল প্রচারিত। বন্দুক কাঁধে মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি গুটিকতক দেখতে পাই, মিছিল-আন্দোলনের কিছু স্ন্যাপশট দেখতে পাই। কিন্তু সম্মুখ যুদ্ধের ছবি তোলার উপায় ছিলো না, কিংবা পাকিস্তানিদের ছবি, তাদের সরাসরি অত্যাচার করার ছবি বাস্তব কারণেই নেই। সরাসরি না দেখে, কেবল আফটার-ম্যাথ দেখে আমরা মুক্তিযুদ্ধকে জেনেছি। এবং শূন্যস্থানগুলোতে নিজ নিজ কল্পনার আশ্রয়ে বসিয়ে দিয়েছি পাকিস্তানি খুনী বা রাজাকার ধর্ষণকারীদের চেহারা। কর্মকাণ্ডগুলো হয়তো ভিনদেশি মুভি দেখে বসিয়েও নিতে পারি আমরা কেউ কেউ। কিন্তু মূল চিত্রের ধারে-কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা তাতে কম।

মনে রাখতে হবে, এটা পৃথিবীর বৃহত্তম গণহত্যা ঘটা যুদ্ধ, গিনেজ বুকের হিসাবে , উনবিংশ শতকের প্রথম পাঁচটি গণহত্যার মধ্যে বাংলাদেশের গণহত্যা একটি। সময়ের হিসাবে মাত্র নয় মাসে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। অংশ নিয়েছে পাকিস্তানের আর্মি, বাঙালি ও বিহারি সিভিলিয়ান রাজাকার। এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের বিচ্ছিন্ন এবং তাৎপর্যহীন চিত্র সিনেমায় দেখেছি। আমাদের মধ্যবিত্তীয় ও গড়পড়তা মননে প্রশ্ন জাগে নি কেন এই হত্যাকাণ্ড। এতো বড়ো গণহত্যা এতো কম সময়ে করার পিছনে নিশ্চয়ই বড়ো কোন উদ্দীপনা ছিল! খুব স্বাভাবিক এই প্রশ্নের কারণ অনুসন্ধান ঘটে না মুক্তিযুদ্ধের গল্প-কবিতা-সিনেমা-তে। সেই কারণ অনুসন্ধান দেখতে পেলাম গেরিলায়। গোলাগুলি, মৃত্যু, রক্ত, সিনেমাটিক দৃশ্যাবলী ও সংলাপ, গান, সব কিছু ছাপিয়ে সিনেমা-শেষের পরে আমার প্রাপ্তি হলো এই প্রশ্নের উত্তর! একটু পরে বলছি এ নিয়ে বিস্তারিত।

মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে রাজনৈতিক পটভূমি জরুরি। একাত্তরের রাজনীতিতে, সমসাময়িক পাকিস্তানি দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সক্রিয় ছিলো জামায়াতে ইসলামী। এই দলের অবস্থান স্বভাবতই মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতে। পাকিস্তান-রক্ষাকল্পে তারা দৃঢ় বলীয়ান। শেখ মুজিব একজন দুষ্কৃতিকারী, দেশে গণ্ডগোল লাগাতে চায়। মুজিবের চ্যালা-চামুণ্ডারা হলো নাশকতাবাদী। পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রকারী। তাই এদের রুখতে দলে দলে জামাতে ইসলামীতে যোগ দিন, রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিন। পাকিস্তান আর্মির হাত সবল করুন। এই সত্য-শ্লোগানগুলো এতোদিন সিনেমায় ঠারেঠুরে দেখানো হতো। যেন ভাশুরের নাম, সরাসরি মুখে নিতে নেই! নাসির উদ্দিন সেই পথে যান নি। ছবির প্রায় পুরোটা জুড়েই এরকম শ্লোগান লেখা ব্যানার চোখে পড়েছে। গলিতে গলিতে, স্টেশনে স্টেশনে,পাকিস্তানি ক্যাম্পে, স্কুল-কলেজের সামনেও এমন ব্যানার ঝুলতো। ঘরে ঘরে গিয়ে দাওয়াত দিতো শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানরা, এলাকার প্রভাবশালীদের কাছে। এরা শান্তি কমিটিতে যোগ দিলে তাদের প্রভূত লাভ, গুপ্তচরবৃত্তিতে সুবিধা, লুঠতরাজেও সুবিধা। রাজাকার চরিত্রগুলো সর্বোচ্চ-সৎ অভিনয় দেখিয়েছেন। পরিচালকসহ এই সকল অভিনেতাকে ধন্যবাদ জানাই! অভিনয়ের দিক থেকে জয়া আহসানের অভিনয় সম্ভবত নিখুঁতের কাছাকাছি। এতোটা প্রাণবন্ত, এতোটা ‘ভিভিড’ অভিনয় আমি অনেকদিন দেখি না। বাংলাদেশের নায়িকাদের মধ্যে তো না-ই। যেখানে মেলোড্রামার অভিনয় আর ছলোছলো নির্যাতিত অবলা নারীর বাইরে বাংলা সিনেমার নায়িকাদের কিছু করার থাকে না এবং এটুকু মোটামুটি পারলেই আমরা বাহবা দিয়ে ভাসিয়ে দেই, সেখানে, সেই চর্চার জায়গায় জয়া আহসান একটা উল্লম্ফিত পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। সিনেমার আড়াই ঘন্টায় তার চরিত্রের যে প্রগ্রেশন, যেভাবে তার অনুভূতিগুলো বদলে বদলে যাচ্ছিলো, সেটা অভিনব। বিশেষ করে, ছবির শেষ আধাঘন্টার অভিনয় দেখার মতো, চমকে যাওয়ার মতো, পুরষ্কার দেয়ার মতো।

সিনেমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরে কিছুদিন সময় লাগে আমার ধাতস্থ হতে। সিনেমার ক্ষমতা সম্বন্ধে আমি সততই খুব আশাবাদী, কারণ এই অডিও-ভিজুয়্যাল মিডিয়া আমাদেরকে এক অদ্ভুত বাস্তবতার জগতে নিয়ে যায়। বেশিরভাগ সময় তা কেবলই নিছক কল্পনা, কিংবা নৈর্ব্যক্তিক শিল্প। মাঝে মাঝে এই সিনেমার জগত কেবল কল্পনার বাস্তবতা বা শিল্পের পট ছেড়ে আমাদের বাস্তব জগতে ছড়িয়ে পড়ে। ফিরে আসি ওই প্রশ্নের কথায়। নাসির উদ্দীনের সিনেমা গেরিলা এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। উত্তরটি সত্য ও সৎ উত্তর, একইসাথে প্রচণ্ড বাস্তব ঘনিষ্ঠও বটে। এতোটাই যে হতভম্ব ও বিস্মিত হয়ে গিয়েছি, ধাতস্থ হতে কিছুদিন সময় লেগেছে। আবছা আবছা ‘চেতনা’র ধারণা থেকে এক টানে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে অনেকগুলো ধোঁয়াশা। সিনেমা কতো শক্তিশালি হতে পারে, কতো গাঢ়ভাবে দার্শনিক হতে পারে, সেটার প্রমাণ পেলাম। প্রশ্নটি ছিলো, এই এতো অল্প সময়ে এতো ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড ঘটার কারণ কী? সাথে সম্পূরক প্রশ্ন হলো মুক্তিযুদ্ধের দার্শনিক, বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্দেশ্য কী ছিলো? এই দুটো প্রশ্নের উত্তরে অনেক মুক্তিযোদ্ধাও একটু থতমত খান। যুদ্ধ করার প্রকট উদ্দেশ্য (অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ইত্যাদি) এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকট কারণ (বাঙালি-পাকিস্তান জাতিগত বিরোধ, লোভ ইত্যাদি) ছাপিয়ে প্রচ্ছন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ কারণটি কারো চোখে পড়ে না। মুখেও সরে না। মুক্তিযুদ্ধে এতো বড়ো হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সময় বারবার বলা হয়েছে এই “দুষ্কৃতিকারী”রা পাকিস্তানের শত্রু, ইসলামের শত্রু। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ইসলামিক রাষ্ট্র ভাঙার পাঁয়তারা করছে। সাহায্য নিচ্ছে পার্শ্ববর্তী ভারত থেকে, হিন্দুদের থেকে। বাঙালি হিন্দুদেরকেও মারা হয়েছে, তা তিনি যতোবড়ো গুণী ব্যক্তিই হন না কেন, মেরে রায়েরবাজারে ফেলে রাখা হয়েছে। ধর্মের পরিচয়ে এতো বড়ো হত্যাযজ্ঞ আর ঘটে নি।

এই উত্তর শুনে অনেকেই মাথা নাড়ছেন। বিরোধিতা করতে চাইছেন। দোষ আপনার নয়। আমাদের পাঠ্যপুস্তক থেকে সামাজিক সকল প্রতিষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে গেলে এই উত্তরটি এড়িয়ে যান। মুসলিম মুসলিম ভাই বলে একটা কথা খুব ফোটে আমাদের মুখে, সেটা একাত্তরের বর্ণনায় গিয়ে উচ্চারিত হয় না। খালি পাকিস্তানের খেলা থাকলে শুনতে পাই শ্লোগানের মতো। বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ধর্ম-রাজনীতির আফিম খেয়ে খেয়ে এখন আমরা এটাই মানি, এটাই জানি। নাসির উদ্দীন ইউসুফ সেই জানা ও মানার তোয়াক্কা করেন নি, সরাসরি দেখিয়েছেন কীভাবে মানুষ কোরবানি দেয়া হয়েছে। গরু কোরবানির সময় যেমন আমরা গর্ত করি, মাঠে নিয়ে সেভাবে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধাদের কোরবানি করা হয়েছে ইসলামের নামে। এই ইসলাম ‘প্রকৃত’ কী ‘স্খলিত’, ‘ঠিক’ কী ‘অন্যায়’ সেটা তখনও জরুরি ছিলো না, এখনও না। জরুরি হলো এই খুনিরা, তাদের খুনের বিচার। আমরা যদি এখনও এপোলোজেটিক হয়ে থাকি, ধর্ম-রাজনীতির ফাঁপা বুলিতে বিশ্বাস করে “ভাইয়ে ভাইয়ে ভুল করে মারামারি হয়ে গেছে” ভেবে “মরেই তো যাবে কয়েকদিন পরে” বলে এদেরকে ছেড়ে দেই, তাহলে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, বাংলাদেশ একদিন আবার পূর্ব পাকিস্তান হয়ে উঠবে। ধর্মরাষ্ট্রের কুটিল ভোজালি এসে মানুষের গলা কাটবে। এগুলো কোন ‘ফিয়ার-পলিটিক্স’ না, এগুলো ‘এক তরফা দৃষ্টিভঙ্গি’ না। এই ভবিষ্যদ্বাণী অঙ্কের হিসাবের মতো সরল, অবশ্যম্ভাবী। যদি মানতে না চায় মন, গত মাসে আমিনীর হরতালের সময় বলা কথাগুলো স্মরণ করুন। “পানিবৎতরলং” হয়ে যাবে। নাসির উদ্দীন ইউসুফকে ধন্যবাদ। সৈয়দ শামসুল হককে ধন্যবাদ। কলাকুশলীদের ধন্যবাদ। গেরিলাকে ধন্যবাদ।

সিনেমা হল-এ আলো ফুটে উঠলে দেখলাম, আমার পাশে দুই বয়স্কা নারী শাড়ির আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছেন। চোখ মুছছেন। আমি তাদের দিকে একবার তাকিয়ে বেরিয়ে এলাম। আমারও চোখ ভেজা। নিঃশব্দে দুয়েকফোঁটা অশ্রু না হয় পড়ুক তাঁদের জন্যে।

মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১১

জবাই

শান দেয়া ছুরিটা দুই হাতে শক্ত করে ধরতেই সুলতান মিয়ার শরীর একটু কেঁপে ওঠে। হালকা কাঁপুনি, দুই সেকেন্ডেই হারিয়ে যায়। আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করে সুলতান আরো শক্ত করে ধরে লম্বা বাঁকানো ছুরিটার বাট। বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর। নামাজের ওয়াক্ত চলে গেছে। আজকে সারাদিন আকাশ মেঘলা বলে সূর্যের তেজ বুঝতে পারছে না সুলতান। ঘোলা ঘোলা মেঘের সাথে আজকে বেশ বাতাস ছুটেছে। গ্রামের মাঠে বাতাসের তোড়ে লুঙ্গি সামলানো কঠিন। সকালে দশটার দিকে মাঠে গিয়ে লুঙ্গি উড়ে যাচ্ছিলো তার। হঠাৎ দমকা বাতাসে পাছার কাপড় সরে গেলে এক পিচ্চি ফ্যাক করে হেসে দিছিলো। হাসি শুনে কটমট করে তার দিকে তাকায়ে সুলতান একটা চাপা হুঙ্কার ছাড়ে। হুঙ্কারে কাজ হয়, পিচ্চি ভয়ে উল্টা দিকে দৌড় দেয়। সিকনি-পড়া নাক টেনে দৌড়ানোর সময় সুলতান দেখে, পিচ্চিটারও উদোম পাছা।

'যাকগে, গেছে গেছে, আর কেউ খেয়াল করে নাই, মানীর মান আল্লায় রাখে', ভেবে নজর ফেরায় মাঠের এক পাশে গাছগুলোর গোড়ায়। এখানে দুইটা শয়তানের পুত বেজন্মাকে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। চোখ বাঁধা আছে বেজন্মাগুলার, দুইটার মুখে রাইফেলের বাট দিয়ে শক্ত বাড়ি দেয়াতে দাত ভেঙে গেছে, ঠোঁট কেটে গেছে। রক্ত জমে কালসিটে পড়ে ফুলে আছে চেহারা, বোঝার উপায় নাই বেজন্মাগুলা আসলে দেখতে কেমন ছিলো। সুলতান দাঁতে দাঁত ঘষে। নালায়েকের দল। হিন্দু মালাউনদের সাথে হাত মিলানো কুত্তা এইগুলা। আজকে এইগুলারে উচিত শিক্ষা দেয়া হবে। কুরবানি দেয়া হবে সবার সামনে।

বাসায় ফিরে লুঙ্গি বদলে পায়জামা পাঞ্জাবি পড়ে নেয় সুলতান মিয়া। বাতাসের বেগ বিকালে আরো বাড়বে, রিস্ক নেয়া ঠিক না। উঠানে বসে ছুরিতে শান দিচ্ছিলো এক খাদেম। তাকে ডেকে এনে ছুরির শান পরীক্ষা করে সুলতান। বুড়া আঙুল ছোঁয়াতেই বুঝতে পারে, ধার মাশাল্লাহ দারুণ হয়েছে। এইসব কাজে ছুরি ভোঁতা হইলে খুব অসুবিধা। মনে মনে সন্তুষ্ট হলেও সেটা মুখে প্রকাশ করে না সে। খাদেমকে গম্ভীর গলায় আরো ধার দিতে বলে। 'বালু মিশায় নে, ধার তাড়াতাড়ি হইবো'।

শান্তি কমিটির অফিস থেকে বাকিদের নিয়ে দুপুরের পরে মাঠে গিয়ে হাজির হয় সুলতান মিয়া। এতোক্ষণে অনেক মানুষ জমায়েত হয়ে গেছে। এদের সবার উদ্দেশ্য একটাই, সুলতান মিয়াকে দেখা। 'ভেড়ার দলের জন্যে ভালো লিডার লাগে, ভেড়ার দল হাতের মুঠির মধ্যে রাখতে হবে', ভাবে সে। গাছগুলোর সামনে দুইটা ছোট ছোট গর্ত খোঁড়া হয়েছে। এক হাত গভীর এবং এক বর্গহাত আকারের। এই বিষয়ে স্পষ্ট মাপ থাকা জরুরি। রক্ত যেন গড়ায় না পড়ে, রক্ত গড়ানো ভালো লক্ষণ না। খাদেমদের চোখের ইশারা করে সুলতান। প্রথম বেজন্মাটাকে ধরে আনতে বলে সে। পা ছেঁচড়ে নিয়ে আসে চারজন খাদেম। হাত পিছনে মুঠ করে বাঁধা, চোখ বাঁধা, গলা দিয়ে গ্যাঁগ্যাঁ শব্দ করছে শুয়োরের বাচ্চাটা। সুলতান একদলা থুতু ফেলে ওইটার মুখের ওপর। জমায়েতের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। সুলতান জানে এখন এদেরকে ভয় দেখাতে হবে। কুরবানি কোন মশকরা না। এই বেজন্মাগুলার মতো আর কোন বেজন্মা যেন মাথা তুলতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। গলা উচু করে জমায়েতের দিকে স্থির চোখে তাকায় সে; বলে ওঠে, 'ইসলামের শত্রু, পাকিস্তানের শত্রু এই দালালরা। ইন্ডিয়ার ট্যাকা খায়া এখানে ব্রিজে বোমা ফেলছে এরা। পাকিস্তান ভাইঙ্গা দিতে চায় এরা। এগোরে কুরবানি দেয়া হবে এখন। সবাই হুঁশিয়ার!' চার জন খাদেম শক্ত করে চেপে ধরে শুয়োরটাকে। পায়জামাটা টেনে কাছে ঝুঁকে আসে সুলতান, ওইটার গলার চামড়াটা ফর্শা লাগছে। ছুরি শক্ত করে ধরে গলার চামড়ায় ছোঁয়ায়। 'ছুরির গোড়া থেকে আগার দিকে যাইতে হবে', 'এক টানে কাইটা ফেলতে হবে'। "আল্লাহু আকবর" বলে জোরে পোচ বসায় সুলতান মিয়া। গলার চামড়া ফ্যাট করে কেটে ছুরিটা ভিতরে ঢুকে যায়। মুহূর্তেই গরম রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয়ে আসে। সুলতান দুই হাতে উষ্ণবোধ করে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছুরিটা গেঁথে দিতে থাকে গলার ভিতরে। ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়...

চার জনে চার হাত-পা ধরে রাখায় ছুটাতে পারে না বেজন্মাটা। একটু দাপাদাপি করে। শান্ত হয়ে গেলে সুলতান খাদেমদের বলে 'শরীর উল্টায় দে। রক্ত ছিটা না পড়ে।'

'পরেরটারে ধইরা আন', হুকুম তামিল হতে সময় লাগে না। এটার স্বাস্থ্য একটু ভালো। পা ছুঁড়ে ছিটকে ফেলার চেষ্টা করে এইটা। সুলতান ধমক মারে, 'শক্ত কইরা ধর, ভাত খাস নাই নালায়েক!' গালিতে কাজ হয়, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক উৎসাহী খাদেমও এসে হাত লাগায়। পাঁচজনে মিলে ধরে বসে মোটা বেজন্মাটাকে। সুলতান ছুরিটা সরিয়ে বড়ো দা'টা হাতে নেয়। 'এইটারে দাও দিয়া কোরবানি দিতে হইবো', ভেবে একই নিয়মে বলে ওঠে, "আল্লাহু আকবর"। ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়...

দাপাদাপির চোটে একটা পা ছুটে যায়। শুকনো মাটিতে ক্রমাগত বাড়ি দিতে থাকে গোড়ালি দিয়ে। গর্তের চারপাশের ঘাসগুলো দ্রুত কালচে হয়ে ভিজে যেতে থাকে রক্তে। গরম উচ্ছ্বল রক্তে ভেসে যায় সুলতান মিয়া। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে দোয়া আওড়াতে থাকে সে। মিষ্টি বাতাস তার গায়ে প্রশান্তির আবেশ বইয়ে দেয়। কুরবানি সম্পন্ন। পেয়ারা পাকিস্তান জিন্দাবাদ!



*****
- অনীক আন্দালিব
২৬/৪/১১
(দ্রঃ আজ ২৬ এপ্রিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার চল্লিশ বছর এক মাস। এখনও মনে পুষে রাখি। এখনও মনে রাখি। কারও বিচার হয় নি। এক জনেরও না! লেখাটির পিছনে সম্পূর্ণ কৃতজ্ঞতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ, সৈয়দ শামসুল হক ও 'গেরিলা' ছবির সাথে জড়িত সকল মানুষের।)

আপডেটঃ ৯ আগস্ট, ২০১৫
শান দেয়া চাপাতিটা দুই হাতে শক্ত করে ধরতেই সুলতান মিয়ার শরীরে শিহরণ বয়ে যায়। হালকা কাঁপুনি, দুই সেকেন্ড। আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করে সুলতান আরও শক্ত করে ধরে চাপাতির  খাটো বাট। বেলা প্রায় তিনটা। জোহরের নামাজের ওয়াক্ত চলে যাচ্ছে। সারাদিন আকাশ মেঘলা বলে সূর্যের তেজ বুঝতে পারছে না সুলতান। ঘোলা ঘোলা ছাইরঙা মেঘের সাথে আজকে বেশ বাতাসও ছুটেছে। গ্রামের মাঠে বাতাসের তোড়ে লুঙ্গি সামলানো কঠিন। সকালে দশটার দিকে মাঠে গিয়ে লুঙ্গি উড়ে যাচ্ছিলো তার। হঠাৎ দমকা বাতাসে পাছার কাপড় সরে গেলে এক পিচ্চি ফ্যাক করে হেসে দিয়েছিলো। হাসি শুনে কটমট করে তার দিকে তাকিয়ে সুলতান একটা চাপা হুঙ্কার ছেড়েছিল। হুঙ্কারে কাজ হলো, পিচ্চি ভয়ে উল্টা দিকে দৌড়ে পালালো। সিকনি-পড়া নাক টেনে দৌড়ানোর সময় সুলতান দেখে, পিচ্চিটারও উদোম পাছা।

যাকগে গেছে গেছে, আর কেউ খেয়াল করে নাই... মানীর মান আল্লায় রাখে, এই ভেবে সে নজর ফেরায় মাঠের এক পাশে গাছগুলোর গোড়ায়। এখানে দুইটা শয়তানের পুত বেজন্মাকে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। চোখ বাঁধা আছে বেজন্মাগুলার। সুলতান দেখলো দুইটার মুখে রাইফেলের বাট দিয়ে শক্ত বাড়ি দেয়াতে দাঁত ভেঙে গেছে, ঠোঁটও কেটে গেছে। রক্ত জমে জায়গায় জায়গায় কালশিটে পড়ে ফুলে আছে চেহারা, বোঝার উপায় নাই বেজন্মাগুলা আসলে দেখতে কেমন ছিলো। সুলতান দাঁতে দাঁত ঘষে। নালায়েকের দল। হিন্দু মালাউনদের সাথে হাত মিলানো কুত্তা এইগুলা। আজকে এইগুলারে উচিত শিক্ষা দেয়া হবে। জবাই করা হবে সবার সামনে।

বাসায় ফিরে লুঙ্গি বদলে পায়জামা পাঞ্জাবি পড়ে নেয় সুলতান মিয়া। বাতাসের বেগ বিকালে আরও বাড়তে পারে, ঝুঁকি নেয়া ঠিক না। উঠানে বসে চাপাতিটায় শান দিচ্ছিল খাদেম শহীদুল। সুলতান তাকে ডাক দেয়, সময় নিয়ে সাবধানে শান পরীক্ষা করে। বুড়ো আঙুল ছোঁয়াতেই বুঝতে পারে, ধার মাশাল্লা দারুণ হয়েছে। এইসব কাজে চাপাতি ভোঁতা হইলে খুব অসুবিধা। মনে মনে সন্তুষ্ট হলেও সেটা মুখে প্রকাশ করে না সে। শহীদুলকে গম্ভীর গলায় আরও ধার দিতে বলে। 'বালু মিশায় নে, ধার তাড়াতাড়ি হইবো'।

বিকেল আরেকটু গড়িয়ে পড়লে শান্তি কমিটির অফিস থেকে বাকিদের নিয়ে মাঠে গিয়ে হাজির হয় সুলতান মিয়া। এতক্ষণে অনেক মানুষ জমায়েত হয়ে গেছে। সুলতানের মনে হয়, এদের সবার উদ্দেশ্য একটাই - এরা আমাকে দেখতে এখানে এসে হাজির হয়েছে। এরা বিভ্রান্ত। ভীতু। এরা বোকার হদ্দ। সঠিক পথ চেনে না। বিদ্যাবুদ্ধি অর্জন করে নাই। এরা জানে না চারপাশে কী হচ্ছে। কী করা উচিত একজন সাচ্চা মুসলমানের। তাই তারা আমার ভরসায় এখানে এসেছে। ভেড়ার দলের জন্যে ভালো লিডার লাগে, ভেড়ার দল হাতের মুঠির মধ্যে রাখতে হবে - ভাবে সে। গাছগুলোর সামনে দুইটা ছোট ছোট গর্ত খোঁড়া হয়েছে। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে এক হাত করে এক হাত গভীর। এই বিষয়ে স্পষ্ট মাপ থাকা জরুরি। রক্ত যেন গড়ায় না পড়ে, রক্ত গড়ানো ভালো লক্ষণ না। শহীদুলকে চোখের ইশারা করে সুলতান। প্রথম বেজন্মাটাকে ধরে আনতে বলে সে। শহীদুলের সাথে হাত লাগায় সোবহান আর মুরশিদ। দুই হাত আর চুল ধরে বেজন্মাটার পা ছেঁচড়ে নিয়ে আসে তিনজন খাদেম। হাত পিছনে মুঠো করে বাঁধা, চোখ বাঁধা, গলা দিয়ে গাঁগাঁ শব্দ করছে শুয়োরের বাচ্চাটা। সুলতান এক দলা থুতু ফেলে ওইটার মুখের ওপর। জমায়েতের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। সুলতান জানে এখন এদেরকে ভয় দেখাতে হবে। জবাই করা কোন মশকারি না। এই বেজন্মাগুলার মতো আর কোন বেজন্মা যেন মাথা তুলতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। মাথা উঁচু করে জমায়েতের দিকে স্থির চোখে তাকায় সে; গলা তুলে বলে ওঠে, 'ইসলামের শত্রু এই মালাউনের বাচ্চারা। ইন্ডিয়ার ট্যাকা খায়া এখানে ব্রিজে বোমা ফেলছে এরা। পাকিস্তান ভাইঙ্গা দিতে চায় এরা। এগোরে জবাই দেয়া হবে এখন। সবাই হুঁশিয়ার!' শহীদুল, সোবহান, আর মুরশিদ শক্ত করে চেপে ধরে শুয়োরটাকে। পায়জামাটা টেনে কাছে ঝুঁকে আসে সুলতান, সামনে গলার চামড়াটা ফর্শা লাগছে। চাপাতিটা শক্ত করে ধরে গলার চামড়ায় ছোঁয়ায়। 'চাপাতির গোড়া থেকে আগার দিকে যাইতে হবে'। 'এক পোঁচে কাইটা ফেলতে হবে'। "আল্লাহু আকবর" বলে জোরে পোঁচ বসায় সুলতান মিয়া। গলার চামড়া ফ্যাট্‌ করে কেটে চাপাতিটা ভিতরে ঢুকে যায়। মুহূর্তেই গরম রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয়ে আসে। সুলতান দুই হাতে উষ্ণবোধ করে, বুড়ো আঙুল দুটো বাটে চেপে ধরে সে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে গেঁথে দিতে থাকে গলার ভিতরে। ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়...

তিন জনে হাত-পা ধরে রাখায় ছুটাতে পারে না বেজন্মাটা। পা ছোঁড়ার চেষ্টা করে, কাঁধ ঝাঁকিয়ে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করে। বুক পেট উঁচু করে উঠে আসতে চায়। শহীদুল আর সোবহান চেপে ধরে রাখে। এক টানে গলা পুরো কাটে না। কিন্তু দ্বিতীয় টানের সময় ফড়াৎ করে গলার নালীটা ফেটে যায়। দাপাদাপি শান্ত হয়ে গেলে সুলতান খাদেমদের বলে 'শরীর উল্টায় দে। রক্ত ছিটা না পড়ে।'

'পরেরটারে ধইরা আন', হুকুম তামিল হতে সময় লাগে না। এটার স্বাস্থ্য একটু ভালো। পা ছুঁড়ে ছিটকে ফেলার চেষ্টা করে এইটাও। সুলতান ধমক মারে, 'শক্ত কইরা ধর, ভাত খাস নাই নালায়েক!' গালিতে কাজ হয়, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক উৎসাহী দর্শকও এসে হাত লাগায়। চার জনে মিলে ধরে বসে মোটা বেজন্মাটাকে। সুলতান তার রক্তে পিচ্ছিল হাত দুটো খবরের কাগজে মুছে বাটটা আবারও শক্ত করে ধরে। বলে ওঠে, "আল্লাহু আকবর"। ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়...


দাপাদাপির চোটে একটা পা ছুটে যায়। শুকনো মাটিতে ক্রমাগত বাড়ি দিতে থাকে গোড়ালি দিয়ে। গর্তের চারপাশের ঘাসগুলো দ্রুত কালচে হয়ে ভিজে যেতে থাকে। গরম স্রোতের মতো উচ্ছল রক্তে ভেসে যায় সুলতান মিয়া। চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে দোয়া আওড়াতে থাকে সে। দমকা বাতাস তার গায়ে প্রশান্তির আবেশ বইয়ে দেয়। জবাই সম্পন্ন।

রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১১

আমার বন্ধু রাশেদ

আমার বন্ধু রাশেদ একটি ভালো ছায়াছবি, মানে ফিল্ম। সিনেমাও বলা যায়। মোরশেদুল ইসলাম একজন ভালো পরিচালক। আমার বন্ধু রাশেদ বইটির লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল একজন ভালো লেখক।

এই তিন লাইনেই আসলে শুক্রবারের সিনেমা-দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ফেলা যায়। কিন্তু তারপর আরো একটু বলতে গেলে আমি কিছুটা মুশকিলে পড়ি। বাক্য-বিন্যাস বা চিন্তা-প্রকাশের মুশকিল। অসুবিধা হয়ে দাঁড়িয়ে যায় কৈশোর ও প্রথম যৌবনের আবেগ। বাস্তবতার ভিতর থেকে অতি সহজেই সিনেমার ভেতরে প্রবেশ করেছি, এখন সেই বাস্তবতার মাঝে ফেরত আসতে ইচ্ছা করে না। সিনেপ্লেক্সের প্রায়ান্ধকার হলরুমটিকেই বাস্তব বলে মনে হতে থাকে। আর সামনে ওয়াইড-স্ক্রিন সিনেমার পর্দাটিকে আয়না বলে ভ্রম হয়। যে রাজশাহী শহরটিকে সেখানে দেখি, শহরতলীর মতো শান্ত, নিবিড়, রিকশার টুংটাং; সেই শহরটিকে সত্য বলে মনে হয়। সত্য বলে মনে হয় শফিক ভাই, অরু আপা কিংবা আজরফ রাজাকারকেও।

সম্ভবত এখানেই সিনেমার মুনশিয়ানা। পরিচালকের একক-দর্শন ছাপিয়ে তা হাজারো দর্শকের মন ছুঁয়ে দিতে পারে, কখনো তাদের হাসায়, কখনো তাদের কাঁদায়, কখনো তারা উল্লাস করে সিনেম্যাটিক বাস্তবতার দৃশ্য দেখে। এই সবকিছুর এক ঝলক পেয়ে গেলাম শুক্রবার বিকেলে।

যখন শহর ছেড়ে চলে গেলো প্রদীপরা, ইবু যখন দেখা করতে গেলো ভোর ভোর বেলায়, প্রদীপ যখন তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, "আজকে থেকে আমরা বাস্তুহারা। আমাদের আর কোনো ভিটামাটি থাকলো না। আর কোনোদিন তোর সাথে দেখা হবে কি না জানি না!", তখন অজান্তেই চোখে পানি এলো। যুদ্ধের দমফাটা আর্তনাদের পিছনেও কতো লক্ষ মানুষের ঘরহারানোর কষ্ট একা একা গুমরে মরেছে! কেউ শোনে নি, কেউ জানতেও পারে নি। ভোর ফোটার আগেই তারা কষ্টগুলো পোটলা বেঁধে রিকশায় করে চলে গেছে সীমান্তের ওপারে। যেতে যেতে পাকিস্তানির গুলিতে মরেছে, বেয়োনেটে মরেছে, ধর্ষণ হয়েও আত্মহত্যা করেছে কতো শতো হিন্দু নারী, কিশোরী। এগুলো দলিলে আসে না। খালি শর্মিলা বসুরা থিসিস করে আর মেহেরজানরা প্রেম করে!

তারপর যখন দেখি, রাশেদ শার্ট খুলে মুখ ঢেকে আজরফ রাজাকারকে ভয় দেখায়। দুই চ্যালা রাজাকার আজরফকে খবর দিতে আসছিলো। রাশেদ আগেই গিয়ে বললো, "মুক্তিযোদ্ধারা এসে গেছে, তোমারে খুঁজতেছে", বলেই দ্রুত পালিয়ে গেলো। তখন আজরফের ভয় খাওয়া, পাতি রাজাকার দেখে মুক্তিযোদ্ধা ভেবে পড়িমড়ি করে দৌড় দেয়া আর রাজাকাররা তাকে ধরে ফেললে হড়বড় করে বলতে থাকা, "আমি বঙ্গবন্ধুর লোক, আমি জয়বাংলার লোক, আমারে মাইরেন না", শুনে হল ভরে তালি বেজে উঠলো। মনে হলো আত্মীয়ের মাঝে আছি, নিরাপদ আছি। এই হলরুমের বাইরেই একটা গোষ্ঠী আছে, যারা বাংলাদেশ চায় নি। তারা এখন বাংলাদেশের মন্ত্রী। দেশের অনেকখানি ক্ষমতা তাদের হাতে। সেই গোষ্ঠী একাত্তরের পরে "বঙ্গবন্ধুর লোক" হয়ে গিয়েছিলো চার বছরের জন্যে। আবার সময় এলে ঘাপটি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। সুবেশি এইসব রাজাকার ও রাজাকারমনা কেউ কি সেদিন হল-এ ছিলো? মনে হয় না।

আমার বন্ধু রাশেদ সিনেমা হিসেবে কেমন? এই বিচার কি আমি করতে পারি? মাঝে মাঝে কিছু সিনেমা নির্মিত হয়, যেগুলোকে সাদা চোখে বিচার করার ক্ষমতা দর্শকদের থাকে না। এর কারণ ছবিটির সাথে অনেক ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক আবেগ জড়িয়ে থাকে। এই আবেগ খারাপ কিছু নয়। আর বাংলাদেশিদের জন্যে এই আবেগ দুর্লভ হয়ে পড়ছে দিন দিন। আমরা এখন রিকনসিলিয়েশনের বাণী শুনি। মিরপুরে পাকিস্তানি পতাকা উড়তে দেখি। এই মিরপুরেই রাশেদের মতো চোখ বেঁধে কতো মানুষকে মেরে ফেলেছিলো আজরফের মতো রাজাকাররা, সেটা ভুলে যাই। অতীতের ভুলচুক!

"You fooled us once, shame on you. You fooled us twice, shame on us." - এই আপ্তবাক্যটি ভুলে যেতে আমাদের বেশি সময় লাগে না। হয়তো রাশেদদের কথাও আমরা ভুলেই গেছি। এখন সেগুলো প্যানপ্যানানি হয়ে গেছে। আমি সিনেমা দেখতে দেখতে খেয়াল করলাম, পিছনে এক ছোট্ট বাবু মায়ের সাথে ছবি দেখতে এসেছে। ক্লাস থ্রি কিংবা ফোর-এ পড়ে। ছবির ফাঁকে ফাঁকে তার প্রশ্নগুলো শুনছিলাম।

কী নির্দোষ, কি সরলমনে সে জিজ্ঞাসা করছে, "ওরা কেন গুলি নিয়ে যাচ্ছে?"
- "যুদ্ধ করার জন্যে, মা।"

"ওদের অনেক সাহস?"
- "হ্যাঁ, মা।"

"রাশেদকে কেন বেঁধে রেখেছে?"
- "মেরে ফেলবে, মা"

"কেন?"
...
...এর পরে আর বাবুটির মা জবাব দেয় না। কেন রাশেদকে মেরে ফেললো, কেনই বা আমরা রাশেদদের কথা বারবার বলি না, সেটা ওই ছোট বাবুটা এখন বুঝবে না। কিন্তু একদিন বুঝবে, সেদিন হয়তো আমাদেরকেই দোষ দিবে। আমরা কেন রাশেদদের কথা মনে রাখি নি, শিখাই নি বলে।

মোরশেদুল ইসলামকে ধন্যবাদ, যে ছবিগুলো নির্মিত হওয়া দরকার, সেগুলোর মাঝে একটি ছবি এত আন্তরিকতা দিয়ে তৈরি করার জন্যে। যে বিষয়গুলো জরুরি, যে কথাগুলো না বললেই না, সেগুলো বলার মানুষ খুব বেশি নেই। এই উপন্যাসটি কিশোর বয়সে কাঁদিয়েছে, ভাবিয়েছে। আর এতো বছর পরে এই ছবিটি আবারও কাঁদালো, ভাবালো। আর কী চাই!
রাশেদ আর ইবুর চরিত্রের অভিনেতা দু'জন চমৎকার অভিনয় করেছেন। হয়তো পেশাদার নয় তারা, কিন্তু যে আন্তরিকতা দিয়ে চেষ্টা করেছে, সেটা খুব ভালো লেগেছে। পাশাপাশি পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় (ইবুর বাবার চরিত্র) -এর গুজব নিয়ে কমিক রিলিফগুলো, কিংবা রাইসুল ইসলাম আসাদের (বড়ো বয়সের ইবু) স্মৃতিচারণের দৃশ্যগুলো মনে দাগ কেটে গেছে।
ছবির নির্মাণ বা কারিগরি দিকের বোদ্ধা আমি নই। কিন্তু এটুকু বলতে পারি যে সিনেমা কতো দ্রুত ও সহজে দর্শকের সাথে জুড়ে যেতে পারে, সেই বিচারে "আমার বন্ধু রাশেদ" অনেক এগিয়ে থাকবে। কিশোরদের জন্যে কিশোরদের অভিনীত ছবি সব-বয়সী দর্শকের চোখে জল আনছে, এই দৃশ্যটি চমৎকার। হল থেকে বেরিয়ে তাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
এখনও সময় যায় নি, এখনও সব ফুরিয়ে যায় নি। টিমটিম করে হলেও আশার প্রদীপ জ্বলছে। বাংলাদেশের সকল কিশোর-কিশোরীর এই ছবিটি দেখা দরকার। তাহলে হয়তো আমরা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারবো, যারা অশ্লীল পাকি-পতাকা নিয়ে অর্ধনগ্ন হয়ে 'খেলার নামে' পাকিস্তান পাকিস্তান জপবে না। যারা রাজাকারদের চিহ্নিত করতে পারবে - দলমত নির্বিশেষে। যারা বাংলাদেশের সঠিক জন্মেতিহাস জানবে। যারা এই দেশের নায়ক ও খলনায়কদের সত্য-পরিচয় জানবে। সেই দিন আসবেই।
রাশেদদের জন্যে রইলো অন্তরতর ভালোবাসা!

বৃহস্পতিবার, ২৭ মে, ২০১০

নতুন যুদ্ধ! স্মৃতিরক্ষার যুদ্ধ!

কাচের বড়ো বড়ো শোকেসগুলোতে থরে থরে সাজানো কতোগুলো কঙ্কাল-- মাথার খুলি, পাঁজরের হাড়, ফিমার, হিউমেরাস, রেডিও-আলনা, টিবিও-ফিবুলাঃ এগুলো সব হাত আর পায়ের হাড়। খুলির কারো কারো দাঁত নেই, কারো কারো দাঁত আছে। কঙ্কালগুলো নতুন না। হাড়ের গায়ে খয়েরি দাগ, বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সেটা রক্তের। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞেরা এই হাড় ও খুলির পরীক্ষা করেছেন, সংরক্ষণের জন্যে ধুয়ে মুছে এখানে পাঠিয়েছেন আর স্মৃতির জাদুঘরে সেগুলো থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। জাদুঘরটি আমাদের। স্মৃতিগুলো আমাদের। হাড়গুলো আমার পূর্বপুরুষের।
আজকে দৈববলে ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে পা পড়লো আমার। মক্কার লোক যেমন হজ্জ পায় না, আমিও তেমনি এতোদিন ঢাকার জল-কাদায় বসবাস করেও এই জাদুঘরে যেতে পারি নি। ব্যর্থতা পুরোপুরি আমার, আর অল্প একটু জাদুঘর বানানো লোকজনের, এমন চিপার মধ্যে, গলির ভেতরে আড়াল করে কেন এটা বানিয়ে রেখেছে আমি তা জানি না। বিস্ময় লাগলো এই অভাবনীয় স্মৃতিগুলোর সংরক্ষণের ব্যবস্থা দেখে! গার্ডগুলো মরা-শুকনো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এই যে মহামূল্যবান সব নিদর্শন, যা দেশের কোনা কোনা থেকে মানুষেরা যুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে আগলে রেখেছিলেন, আর এখানে পাঠিয়েছেন, সেগুলোর কিছু হলে কী হবে ভাবতেই খারাপ লাগছিলো।
তবে এই খারাপ লাগাটা শুরু হয়েছে শেষের দিকে। তার আগে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম জাদুঘরে রাখা প্রাচীন সব রত্নগুলোকে। একটা ব্যাপার খুব চমৎকার লেগেছে, তা হলো দ্রব্যগুলো সাজানোর পন্থা। খুবই যত্ন নিয়ে, সময়কালের বিভেদগুলো পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে সাজানো ছিলো। এক একটা ঘর এক একটা যুগ, এক ঘর থেকে হেঁটে আরেক ঘরে গেলেই প্রজন্ম বদলে যাচ্ছে! অভাবিত রোমাঞ্চ বোধ করছিলাম।
প্রথম ঘরটিতে প্রাগৈতিহাসিক বঙ্গ, বা বাঙ্গালা, বা ভারতবর্ষের কিছু নিদর্শন। গ্রীকরা যখন দাপটে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল কাঁপিয়ে বেড়িয়েছে, সেসময়কালীন দক্ষিণ এশীয় এই জনপদেও আর্য-অনার্য-দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী দাপটের সাথেই বসবাস করতো। পলল মাটিতে তাদের সেই চিহ্ন খুব বেশি নেই, তবুও অল্প একটু আলো দেখেই সেইসময়ের কিছু কিছু ধারণা পেলাম। এদের পরে এলো মৌর্যের শাসন, বৌদ্ধসম্রাট চন্দ্রগুপ্ত, অতীশ দীপঙ্কর-- অহিংসতা। এই জিনগত বৈশিষ্ট্য এখনো হয়তো কিছুটা বাকি রয়ে গেছে আমাদের মাঝে! তারপরে পালবংশ ও সেনবংশের হাত বদলে মুসলিম রাজ- সেখান থেকে ব্রিটিশরাজ। এই সময়কালগুলো ঘর থেকে ঘরে যেতে যেতে পেরিয়ে যাচ্ছিলাম। থমকে গেলাম একটা বদ্ধকুঠুরির সামনে এসে।
একটা কালো দেয়ালের ঘরের মেঝেটা লাল রঙ করা। ভেতরে দুটা ইট, মোমবাতিতে আগুন জ্বলছে। দরজার জায়গায় কাচ দেয়া, সেই কাচের ফাঁক দিয়ে দেখলাম কালো দেয়ালে একটা স্বর্ণতালিকা!
ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবীদের নাম, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেনসহ সকলের নাম মোমবাতির মৃদু আলোতেও জ্বলজ্বল করছে।
মনে হলো আস্তে আস্তে এই পলল মাটির জনপদ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। টের পাচ্ছিলাম আশেপাশে সাপের মতো হিসহিসে কণ্ঠস্বর। সামনেই পড়লো দ্বিজাতিতত্ত্বের পুরোধাদের ছবিঃ এ কে ফজলুল হক, মোঃ আলী জিন্নাহ সহ একটা বড়ো গ্রুপ ফটো। দেখে কিছুটা শরীর রি রি করে উঠলো। এই জনপদের মাঝে সাম্প্রদায়িকতার সবচেয়ে গভীর বিষ খুঁড়ে বের করে আনার রূপকারদের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ধর্ম দিয়েও বিভাজন করা যায়, সেটা এনারাই শিখিয়ে দিয়েছিলেন। সেইসময়ের পর থেকে কোন হিন্দু আর মুসলমান একে অপরকে নির্মল মনে বিশ্বাস করে নাই!
পরের ঘরটিতে পাকিস্তান শাসনকালের সব (কু)কীর্তি। বামে প্রথম দেয়ালে একটা সাদাকালো ছবি দেখতে পেলামঃ একটা মানুষের মৃতদেহ- তাঁর মাথার খুলি ফেটে ঘিলু ছিটকে পড়েছে রাস্তায়। মৃতদেহটি শহীদ রফিকের। এই ছবিটি লুকিয়ে তুলেছিলেন ফটোগ্রাফার (মার্জনাঃ আমি নাম ভুলে গেছি দেখার পরেও)। মগজের মাঝে বিস্ফোরণ ঘটলো একটা। শুয়ো*!!
তারপরেও আমরা তো ঘুরে দাঁড়িয়েছি। চুয়ান্নের পরিষদের ছবি দেখলাম। পাশেই দৈনিক পাকিস্তানের কিছু পেপার কাটিং। আরেকটু এগিয়েই সেই কুলাঙ্গার আইয়ুব খান! সামরিক শাসনের মতো অভিশাপ যিনি আমাদের প্রথম চাখিয়েছিলেন।
তার পাশের ফ্রেমে একটা পেপার কাটিংয়ে লেখা পাকিস্তান বেতারে রবীন্দ্র সঙ্গীত ব্যান হবার খবরটা। বাংলার প্রতি এমন বিদ্বেষ কেন ছিলো পাকিদের মনে? আমি তখন হুট করেই এই প্রশ্নটা নিয়ে ভাবতে বসলামঃ আসলেই তো, আমরা নিরীহ লুঙ্গি পরা চাষা ভুষা লোকজন। দুইবেলা খাইতে পারলেই খুশি থাকতাম। পুরা পাক-আমলের শুরু থেকে এই জনপদের মানুষদের সাথে এরকম নিষ্ঠুর আচরণ কেন করেছিলো তারা? আমি বুঝে পাই না। সব শাসকই শোষক- এটা ধরে নিলেও, "কেন বাপু, খাও যতো হাউশ ততো, তয় আমাগো চাইরডা ভাত দিয়া খাইলে কি অয়?" কী হতো যদি সামরিক শাসন করতে করতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে একটা দুটা উপকার করতো। আমরা তো প্রদেশ ছিলাম, আমাদের সেটুকু অধিকার দিলে কার কী এসে যেতো? কেন্দ্র তো সব লাভের গুড় এমনিতেই পাচ্ছিলো! তবে কি ভবিতব্য?
এর পরে ভাবনার জাল ছিঁড়ে দিলো আসাদ আর কিশোর মতিউরের লাশের ছবি দুইটা। উনসত্তরের শহীদ। পাকিস্তান আমলে ঠিক কতো জন বাঙালিকে বিনা কারণে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিলো? একটা "শান্তিপূর্ণ" দেশে হুটহাট এরকম মানুষ মারা পড়লে সেটা দেশের কর্তাব্যক্তিদের সম্বন্ধে কোন ধরনের ধারণা দেয়? পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র সম্ভবত এখন এটা কেয়ারও করে না। "চল্লিশ বছর ধরে মারছি, মাথা ঠাণ্ডা রেখে আজও মেরে চলছি!"
এর পরের ঘরটি প্রতারণা-হত্যা-রক্তপাত-জল্লাদের ছবিতে ভরপুর। চার দেয়ালে সাজিয়ে রাখা ছবিগুলো দেখে মাথা ঘুরাবে, আপনি একসাথে দেখার চেষ্টা করেই দেখুন! প্রায় গোলাকার গণ্ডি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে, এই ছবিগুলোর কাছাকাছি গিয়ে দেখার শক্তি অনেকেরই নেই। ঢাকা শহরে পঁচিশে মার্চের রাতে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, সেটার বর্ণনা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব না। এই হত্যাকাণ্ডের খবর যারা জানতো, যারা এই হত্যাকাণ্ডের কিছু কিছু নিজেরাই দেখেছে চোখের সামনেই, তাদের মধ্যে থেকেই কোন কোন বেজন্মা রাজাকার দলে নাম লিখিয়েছিলো! হায়রে! এতোকিছুর পরেও এদেরকে এখন কেউ কেউ 'বেনিফিট অফ ডাউট' দিতে চায়, 'অতীত ভুলে' মিলেমিশে চলতে চায়! ধিক্‌
ঘরটার এক কোণে একটা ছোট ফ্রেমে ভারতে চলে যাওয়া মোট শরনার্থীর সংখ্যা লেখা। শেষের তিনটা ডিজিট ভুলে গেছি। তবে তা ছিলো ৯৮,৯৯,০০০ এর বেশি। শূন্যগুলো ভুলে গেছি। সেখানে যে কোন সংখ্যা বসিয়ে নেয়া যায়। আটানব্বই লাখের কাছে কয়েকশত আর এমন কী! তাজ্জব! আমি এইটা কী বলছি? আমার কাছেই এগুলো কেবল সংখ্যা, আমি জানিও না ৯৯৯ আর ১০০০ এর পার্থক্য ১ আর সেই ১-টা মানুষ আমি নিজেও হতে পারতাম! একটা মানুষের দাম ইতিহাসের পাতায় কিছুই না, কিন্তু একাত্তরের যুদ্ধের সময়ে নির্বিশেষে মেরে ফেলাদের আর্তনাদ বলছে, সেগুলো ভুলে যাবার মতো নয়!
এর পরের ঘরগুলো আমি কেবল ছুঁয়ে গেছি। কোন ঘরেই বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর মতো মানসিক জোর ছিলো না। একটা ঘরে একটু বেশি সময় ছিলাম। সেখানে থরে থরে স্টেন গান, এল এমজি, গ্রেনেড, মর্টারশেলগুলো সাজানো। মেশিনগানের খালি খোসা দিয়ে লিখে রাখা হয়েছে বাংলা। দেখলাম ইপিআরের হাতে বানানো বর্শা, এইগুলা দিয়ে যে নরপশুদের মারা হয়েছে, তাদের চেহারাটা দেখতে ইচ্ছা হচ্ছিলো। আর কুর্ণিশ করতে ইচ্ছা করছিলো বন্দুক আর বর্শা আর গ্রেনেড হাতে সেই সাধারণ মানুষগুলোকে! অসামান্য ঋণ শোধের চিন্তা করাও পাপ!
শেষের ঘরগুলোর মাঝে দুটো ঘরে দমবন্ধ অনুভূতি হলো। একটা হলো শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ঘর। সারি সারি খুলিগুলো সেখানেই দেখেছি। ঢাকার বধ্যভূমিগুলো থেকে তুলে আনা হীরকখণ্ডসম মানুষগুলোর দেহাবশেষ। তাঁরা চলে গেছেন এবং আমাদের নিঃস্ব করে গেছেন- মননে, চিন্তায়, আবেগ-অনুভূতিতে আমরা একটা নিঃস্ব জাতি হয়ে গেছি। আলো হাতে যাঁরা ছিলেন, তাদেরকে ঐ আল-বদর, আল-শামসের রাজাকারগুলো মেরে ফেলেছে। এই দলগুলোর পুরোভাগে ছিলো গোআ-মইত্যা-মুজাহিদের মতো পাপিষ্ঠ। (গালিও কম হয় এদের জন্যে)!!
আরেকটা ঘর আমার মায়ের, আমার বোনের। সেই ঘরটা আমি দ্রুত হেঁটে বের হয়ে গেছি, আশেপাশের ছবিগুলো বা নিদর্শনগুলো আমি দেখতে চাই না।
****
ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসলাম জাদুঘর থেকে। একটা মৃদু নিঃশ্বাস ফেললাম। সামনে একটা উঠান, চারপাশে সবুজ গাছপালার মাঝে একটা শান্ত সমাধিস্থ প্রকৃতি। যেন আমাকে আশ্বাস দিচ্ছে,


কোন ভয় নেই, তুমি স্বাধীন। এতোক্ষণ যাঁদের দেখলে, তাদের ধমনীতেও তোমার মতো জীবন দৌড়ে বেড়াচ্ছিলোঃ ঐ রুমী, ঐ বাদল, ঐ আসাদ, ঐ মতিউর, ঐ নামহীন খুলির মানুষটাও এই পলিমাটির জমিনে একদা হাঁটতো। তাঁরা আজ নেই, কারণ তাঁরা কেউ কেউ তোমার কথা ভেবেছিলো- আর সবকিছু ছেড়ে মরে গিয়েছিলো। অখ্যাত এক গ্রামের একটা দা জাদুঘরে দেখেছো না? সেটা দিয়ে কুপিয়ে একজন মহিলা পাঁচটা রাজাকারকে মেরেছিলেন। কুপিয়ে একটা ডাব কাটতে যাও, তাহলে বুঝতে পারবে ঐ মহিলাটি কতো অপূর্ব যোদ্ধা ছিলেন!! তাঁর জন্যে শ্রদ্ধা, সম্মান এগুলো ফাঁপা শব্দের কোন দরকার নেই। খালি ঐ ঘৃণ্য রাজাকারগুলাকে ছেড়ো না। ঐ মহিলাটির শতাংশেরও শতাংশ পরিমাণ জোর যদি তোমার মনে আর হাতে থাকে, তাহলে এই স্বাধীন দেশে বসে ঐ রাজাকার আর অপরাধীগুলোকে সাজা দাও!



***
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অনেক অনেক প্রচার ও উন্নয়ন দরকার। জাদুঘরের ঢোকার পর থেকেই এইটা মাথায় ঘুরছিলো যে কেন এর ব্যবস্থা নেয়া হয় নি এখনও?? বের হওয়ার আগেই মন ভালো হলো এটা দেখে যে আসলে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। একটা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ট্রাস্টি গঠন করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে আগারগাঁওয়ে। ভবনের নকশা দেখে গর্বে বুক ফুলে উঠলো! একেবারে স্থাপত্য সৌন্দর্য্য! ঠিক ওভাবে বানানো হলে আমি প্রতি সপ্তাহে বিকালবেলা হাঁটতে যাবো ওখানে। শপিংমলের চাইতে ঢের ভালো!
তবে কাজ শেষ হয়ে যায় নি। নতুন জাদুঘরের নির্মাণব্যয় ৬০ কোটি টাকা। নেট ঘেঁটে ইত্তেফাকের খবর পেলাম যে গতমাসেই সম্মেলনে জানানো হয়েছে যে অতিসত্ত্বর এই ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হবে! 
আমি যুদ্ধে যেতে পারি নাই। তবে যুদ্ধের স্মৃতি টিকিয়ে রাখার যুদ্ধতে শামিল হতে চাই!