মুক্তগদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মুক্তগদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৯

রাজভোগ

মিষ্টি বিলানো হচ্ছে।

সচরাচর এমন দৃশ্য দেখা যায় না। উপলক্ষ্য জরুরি না। কেউ কিছুতে পাশ করেছে কিংবা উতরে গেছে, নয়তো চাকরি বা পদোন্নতি পেয়েছে। এক হাতে প্রাপ্তি ছাড়া কেউ তো অন্য হাত খুলে মিষ্টি বিলায় নি কোনোকালেও। রাস্তার পাশে ফুটপাত আর দোকানের মাঝে কিছুটা জায়গা ছিল। সেখানেই একজন টেবিলে মিষ্টি রেখে ডাকছে, ওরে! আয় মিষ্টি খেয়ে যা! তার পাশে ছুঁচো চেহারার এক চ্যালাবিশেষ মাছি তাড়াচ্ছে। চারপাশে ভনভন ভনভন। অতি-উৎসাহী কয়েকজন গিয়েই খাবলা মেরে দুই হাতে মিষ্টি তুলে মুখে সেঁধিয়ে দিলো। সাথে সাথে বিলানেওয়ালার হুঙ্কার, বুঝেশুনে খা! নইলে সরে যা! সরে যা!

হুঙ্কারে কাজ হলো না। সেই কয়েকজনের দেখাদেখি বাকিরাও এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো রসগোল্লা, কাঁচাগোল্লা, গুড়ের সন্দেশ, ছানার সন্দেশ, পান্তুয়া, আমৃতি, গোলাপজাম, কালোজাম, লাড্ডু, জিলাপি, ছানামুখী, চমচম, মণ্ডা, মোহনভোগ, রাজভোগ, রসমালাই - যে যেটা পাচ্ছে হাতে নিয়ে মুখে দ্রুত চালান করে দিচ্ছে। একটা কোনোমতে কোঁৎ করে গিলেই পরেরটা ঢুকছে। হাতাহাতির চোটে সব মিষ্টির রস মিশে টেবিল জামা হাত মুখ সব একাকার।

বেশিক্ষণ লাগলো না এই লুটতরাজে। ফুটপাতে ভিড় করে বাকিরা দেখলো। কেউ কেউ তালি দিলো, অন্যের ভোগেও বুঝি নিজের কিছুমিছু আনন্দ হয়। মুখ হা করে ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি খেলো কেউ কেউ, অন্যদের মুখে ঝোল ঝোল মিষ্টি ঢোকার দৃশ্য বুঝি স্লো-মোশনে দেখছিলো তারা। শ্যাডো-অ্যাক্টিংয়ের মহড়া। কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে হনহন করে হেঁটে পার হলেন। এবারে অবাক হলাম। এ যুগে এখনও কেউ কেউ আছে, যারা এসবে বিরক্ত হন! প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসরকে চরে বেড়াতে দেখলাম যেন! তীব্র ভ্রূকূটি। হিলহিলে শরীর। পরিমিত খাওয়া-দাওয়া আর নো ফাস্ট ফুড। শরীর দেখলেই বোঝা যায়। হাতে খড়খড়ে ব্যাগ ধরা, ভার নিশ্চয়ই, কব্জির নিচে তালুর উল্টোপিঠের রগগুলো ফুলে ফুলে আছে। মহিলাকে দেখে মায়া লাগলো। ভুল যুগে চলে এসেছেন ম্যাডাম।

এখানে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে এভাবে লুঠ হয়ে যায় মিষ্টান্ন। কয়েকজন খায়, বাকিরা দেখে। দুয়েকজন ছবিটবি তুলে বাকিদের জানায়, কী দেখলাম রে বাবা আজকে! সেই খাওনদাওন! ওয়াও! আমার মতো দুয়েকজন উদাস হয়ে দেখে, নিরাসক্ত। লোভও হচ্ছে না, ভিড়ে ভিড়তে ইচ্ছেও করছে না, আবার আপনার মতো বিরক্তও হতে পারছি না খুব একটা। দেখতে দেখতে সয়ে গেছে ম্যাডাম। আপনিও একদিন এমন হবেন, আমাদের কাতারে এসে দাঁড়াবেন। এ'যুগের আধুনিক ডাইনোসরকেও অভিযোজিত হতে হয়, কারণ ইতিহাসে পড়া আছে পাল্টে না গেলে বিলুপ্তি নিশ্চিত।

মঙ্গলবার, ২৭ এপ্রিল, ২০১০

স্পনটেনিয়াস ইরাপশন


দুনিয়া জুইড়া বিয়াপক গিয়াঞ্জামের খবর মাঝেমাঝেই আমরা রাষ্ট্র করি। আমাগে রাষ্ট্র জুইড়াও বিয়াপক গিয়াঞ্জাম দুনিয়ার মানুষ জানে। এই তো সেইদিন বিজাতীয় টিভিতে দেখতেছিলাম ওয়েলস রাজ্যে সাগরের মধ্য টিলা টিলা দ্বীপ, হেলিকপ্টারে ঘুরে ঘুরে ফোকাস করতেছে। দ্বীপের গায়ে খালি একখান ধবল বকের মতোন বাতিঘর বানায়া রাখছে, দ্বীপে যাওনের ব্যবস্থা অনুপম। খালি একখান সেতু তৈয়ার করছে, যেটা ডাইনে বামে ঝুলে। দেখোনের পরে মনে হইলো একটুসখানি দ্বীপ সেইটারেও আমরা ছাড়ি নাই! কোমল স্তনে কামড়ের মতোন বাতিঘর বানাইতে হইবো মানুষের। দুনিয়া জুইড়া গিয়াঞ্জামগুলান এনট্রপির লাহান বাড়তেছে কেনু কেনু কেনু?...

 
অদ্য খবর পাইলাম একটা চ্যানেল মৃত্যুবরণ করিয়াছে। মৃত্যুকালে তার বয়স হইয়াছিলো ব্লা ব্লা ব্লা। আগামি কিছুদিন তার মৃত্যু নিয়ে সরগরম থাকিবে তাবৎ মিডিয়াপাড়া, কারওয়ান বাজারের ভ্রান্তিময় নাম কাওরান বাজার। তারপরে আবার বসুন্ধরা সিটি পুড়িয়া গেলে মৃত আত্মার চেহলাম অনুষ্ঠিত হইবে। বিগত মৃতেরা যেমন ১/১১-এর পরে ফিরিয়া আসিয়াছিলো, তেমনি উল্লিখিত মৃতও ফিরিয়া আসিবে। পঞ্চবৎসরাধিক কাল সে টিঁকিয়া থাকিতে পারিবে বলিয়া আশা করি।


ব্লগিংয়ের সবচেয়ে মজার দিকগুলো হলো প্রতিমতের সাথে শান্তি(!)পূর্ণ সহাবস্থানের চেষ্টা। একটা বন্ধ বাক্সে নানা ধরনের গ্যাস ভরে খুব তাপ দিতে থাকলে অণুগুলো যেমন ছুটোছুটি লাগিয়ে দেয়, মাঝে মাঝে ব্লগীয় মিথস্ক্রিয়াকে আমার সেরকমই মনে হয়। টুশ করে একটু গুঁতো খেলাম তোমার সাথে, তারপরে মাথা ডলতে ডলতে পিছিয়ে আসতে গিয়েই তার সাথে ঢ্যাপ করে ধাক্কা। দু'জনেই মুখে 'মানুম না' আর মনে 'স্যুরি' বলে দুইদিকে হাঁটা দিতেই দেখি বিরাট গোলচক্করে আঠালো ঝগড়া। লুঙ্গি কাছা মেরে, ধুতি মালকোচা মেরে আর শার্টের হাতা গুটিয়ে ধর্মাধর্মের নেতাপোঁতারা হেই হেই করে তেড়ে আসছে! আমরা দুজনে শত্রুতা ভুলে প্রথম পাতা ছেড়ে দৌড় দিলাম!


অনেক মৃত্যু ইদানিং জমা হচ্ছে হালখাতায়। নতুন বছরে পরিচিতের বৃদ্ধ ও আপাতবৃদ্ধ আত্মীয়েরা মারা যাচ্ছেন। সামাজিক বৈশিষ্ট্যে আমরা শোকপালন করছি, এবং কুলখানিতে দেখছি বিলানো হয় বিরিয়ানি, মিষ্টি প্রভৃতি রসনাবিলাস। মৃতের জন্যে আমার খালি লাগে অযথাই!


আজকাল অনেকেই টাকা ধার চায় আমার কাছে। ধার চাইলে আমি 'না' করতে পারি না। নেতিবাচকতা এবং সেই 'না' শুনে তাদের হতাশা আমারে বল্লমের মতোন গেঁথে ফেলে। একবার এমন হওয়ার পর থেকে আমি পিঠে সেই বল্লমের দাগ নিয়ে প্রতিজ্ঞা করছি আর নয়! এখন থেকে চাহিবামাত্র বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবো। টাকা ধার চাহনেওয়ালারা বুঝে গেছে মনে হয়, আমার পকেট থেকে সুতাকৃমির মতোন টাকা টেনে টেনে নেয় তারা। যেন শর্মাহাউজে গিয়ে স্প্যাগেট্টি খাচ্ছেন খুউব, মৌজে!


মজার ব্যাপার হলো, আমার ভেতরে অবিমৃশ্যতার পরিমাণ পর্বতের গায়ের গুল্মের সংখ্যার সমান। হুট করেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা, এবং সেই সুবাদে ঝঞ্ঝাট বা ঝামেলার তোড় সামলানোর অভ্যাস আমি রীতিমত চর্চা করি। বেশিরভাগ সময়েই একগুঁয়েমির মাত্রা ছাড়ানো কারণ দেখে আশেপাশের সকলেই আমাকে কাছিম ডাকে। কেউ কেউ ভুল উচ্চারণে কাসিম ডেকে বসে। আমি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সেই অমিতশক্তির ভাতিজা হতে ইচ্ছুক! তিনি এই বঙ্গে না এলে আমি হয়তো নমশুদ্রই হয়ে রইতাম! 


এটেনশন সীকিং ডিজওর্ডার ব্লগারদের মাঝে প্রবল। নাটুকেপনায় ভরা এক একজন ভার্চুয়াল ড্রামাকুইনদের মাঝে আমিও অন্যতম। এই ড্রামা কতো এপিসোড ধরে চলছে, মাঝে মাঝেই যবনিকাপাতের দশা হয় হয়, আবার হেলতে হেলতে টলটলায়মানতা থেকে আবার দাঁড়িয়ে যাই আমরা! এই যেমন ধরুন অতিঅধুনা অভ্র-বিজয় দ্বৈরথে কেউ কেউ বিজয়ের পাশেও দাঁড়াচ্ছেন। কারণ প্রবল স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ালে তোড়ের অংশ গায়ে লাগে, কী বিষম পুলক উৎপন্ন হয়। শরীরের নরম জায়গাগুলো তাদের উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে, ইয়ে, জানেনই তো, কেমন লাগে? 


কী অদ্ভুত বিকেল। আমাদের শহরের ধুলো আর মানুষগুলো দিন দিন যেভাবে বিবর্ণ হয়ে উঠছে, তাতে এমন বিকেল চোখে পড়ে না। হারিয়েই গিয়েছিলো তারা। আজকে কী ঘোর চেপেছে, কে জানে? প্যালেটে ঘন রঙ গুলে কেউ একজন দামাল তানে মেতেছে খুব। ছোপ ছোপ রঙিন দৃশ্য ফুটে উঠছে। সবুজাভ হলুদে ভেসে যাচ্ছে আকাশ, মেঘের গায়ে ধূসরতা। মেঘগুলো ইশকুল ভুলে এদিকে যলে এসেছে যেন, আনমনে হাঁটতে হাঁটতে। তারপরে বিষম তাড়া করেছে কালো কালো মেঘ- যারা আমার কাছে ইশকুলের দারোয়ান। "অ্যাই অ্যাই ছোকরার দল! ফিরে আয়! ফিরে আয়!" বলে ভাগিয়ে নিয়ে গেলো সাদা তুলো-মেঘদের। তারপর কয়েকটা বেভুলো মেঘ ভয় পেয়ে কেঁদে ফেললো। মাঠের ছেলেগুলো দৌড়ে ছাউনির তলে, খেলা তোলপাড় ভজঘট। দারোয়ানের দাবড়ের চোটে ঠিকমত কাঁদার আগেই উড়ে গেলো বৃষ্টি। হলুদ রঙা সেই বৃষ্টির কিছুটা মাখার জন্যে আমি বাইরে এসে দাঁড়ালাম। ওমা, কী বাউণ্ডুলে দ্যাখো? আমাকে ঝুম করে ভিজিয়েই পালালো। এখন হু হু বাতাসে আমি স্থবির স্থানু......!

(সমাপ্ত)
......
## নতুন ধরনের একটা চিন্তা মাথায় আইলো। একটা ব্লগ লিখুম, যেইটা একটু পর পর আপডেট করতে থাকুম। 

রবিবার, ২৮ মার্চ, ২০১০

অ-প্রাকৃতিক

[যা ভাবি, যা দেখি, তারে নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছা করে। এর সাথে বালক বয়সের খেলনা নিয়ে অবিমৃশ্যতার মিল আছে। খেলনা ভেঙে গেলে কান্না পেতো, কিছু করার থাকতো না। এখনও মাঝে মাঝে নাড়াচাড়ার ইচ্ছাবশে চারপাশের দৃশ্য ও ঘটনা ভেঙে যায়। দেখি কিছুই নির্মিত হয় না। আবার বাতাসের মতো অবয়বহীনতার এই জগতে কোনটা নির্মাণ কোনটা বিনির্মাণ সে ধন্দও ব্যাপক!]




মাঝে মাঝে জোনাকদের আলোচনায় হুটহাট কবিতা উঠে আসে। এই ঘটনা আপেলপতনের মতো কুটিল হতে পারে, তবুও সেটা ঘটে যায় অনিবার্যতায়।


তো, জোনাকদের আলোচনায় চা-সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে কবিতা উঠে আসে।
এমন না যে কবিতা কোন অবয়বহীন ধারণা, জোনাকদের কাছে তা পুরোপুরি মিশ্ররূপীঃ নারীর মদির নাভির মতোই আকর্ষণীয়, (এবং ক্ষমাহীন সেই মেদাঞ্চল এতো অযুত যোজন দূরে বলে) অদ্ভুত কষ্টকর। যুগপৎ আকর্ষণ ও যাতনা আদায়ের কবিতা জায়গা করে নেয়- তুচ্ছ জোনাকেরা সেই কৃষকের মতো শক্তিশালীও নয় আর সর্বগ্রাসী নদীভাঙনে কৃষকের কিছুই করার থাকে না।


মাঝে মাঝে হুট করে আসা কবিতা আবার হুট করেই চলে যায়, তখন মিটমিটে আলোর সলতে আর কয়েলের লাল চোখ মিশে যেতে থাকে।


দেখা যাক, ঠিক সেই সময় আমরা একটি মুহূর্তকে বাছাই করি দৈবচয়ন পদ্ধতিতে। তারপরে বিশ্ব-চরাচর থামিয়ে দিয়ে সেই মুহূর্তের ভেতরে ঢুকে যাই। আসুন, মুহূর্তটিকে ভালোবাসার চেষ্টা করি, নিদেনপক্ষে তার সাথে কিছুটা যোগাযোগ, কিছুটা ছল- অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের ঢং করি।


মুহূর্তের মাঝখানে কয়েকটি মশা উড়ছে। এই এক মুহূর্তেই তারা কয়েকশ’ বার পাখা ঝাপটে ফেলছে, ঠোঁট চাটছে, পুঞ্জাক্ষি জুড়ে আলোকস্বল্পতা মাপছে।


মুহূর্তেই চায়ের কাপ থেকে দুই জুল তাপ উড়ে গেলো জোনাকদের মাথার ওপর দিয়ে, যাবার সময় কারো কারো চুলে হালকা ছোঁয়াচ…


মুহূর্তের মধ্যেই চায়ের দোকানের লোকটির ঘুম ঘুম চোখ প্রায় মুদে এলো শ্রান্তিতে, “আজকের উৎকট খদ্দেরগুলো সাপ্তাহিক নিয়মে ফিরে ফিরে আসছে, মাত্র একশ তিরিশ টাকায় দুটো বেঞ্চ আর কয়েকশ একর জমি আটকে রাখছে পুরা একবিংশ শতক” -এমন টুকরো টুকরো মৌলিকচিন্তা তার নিউরনে খেলছে বিদ্যুচ্চমকের মতোন।
মুহূর্তের মধ্যেই রাস্তার ঘোলা আলোর উৎসটি জোনাকদের পেরিয়ে গেলো। আলোটি আসার আগে বা পরে তারা কেউ খেয়াল করে নি। তবু অনেক ওপর থেকে কিছু অয়ন বায়ু গুমোট গ্রীষ্মকে পাত্তা না দিয়ে দেখলো তার শরীরে কয়েল ও চা-সিগারেটের তকমা মাখা কিছু ধোঁয়া এসে সাঁটিয়ে চুমু খাচ্ছে!

শুক্রবার, ৮ জানুয়ারি, ২০১০

স্পর্শবিজ্ঞান

তোমাদের যেখানে মন চায় চলে যাও, আজ আমি কোথাও যাবো না। আজকের দিন হোক কেবলই আমার নিজেকে নিয়ে। আমি নিজের ভেতরে খুঁড়ে দেখবো কতোটুকু তোমরা ছুঁতেও পারো নি। আমি এতোদিন আগলে রাখতে পেরেছি! এতো এতো সংগ্রাম অর্থবোধক ভীষণ, আমি কাউকে ছুঁতেও দিবো না সেই কয়েকটুকরো হৃদয়ের জমিন।


কাউকে স্পর্শ করার কামনা কতোটা তীব্র হতে পারে? এই প্রশ্নটা নিয়ে আমি কখনই ভাবি নি। আর ভাবি নি বলেই আমার জানা নেই স্পর্শ করার আকুতিতে মনের ভেতর পুড়ে ছাই হয়ে যেতে বেশিক্ষণ লাগে না। বেশি না। শুধু হাতের আঙুলের আলতো ছোঁয়ার ইচ্ছার শক্তি এতোটাই! আমার বুকের ‘পরে পাথরের মতো চেপে বসতে পারে। মনে হতে থাকে চারপাশে কোথাও কোনো বাতাস নেই। আদিগন্ত ভ্যাকুয়াম। জ্যাজ!


তাই সেদিন থেকে আমি জানার চেষ্টা করি স্পর্শকামনা কেমন। ঠিক কতোটা বিচিত্রভাবে কাউকে স্পর্শ করা যায়! আমি কি শুধু হাসি দিয়ে কাউকে ছুঁয়ে দেয়ার দুরূহ কাজটা করতে পারবো? মুখের হাসি, চোখের হাসি, এগুলো শুনেছি প্রবল সংক্রামক। এক চিলতে হাসি অনেক সময় তলোয়ারের মতো ঝিকিয়ে উঠতে পারে। এই সত্য সম্ভাবনা, কারণ আমি এমন অসংখ্য হাসির কোপে কাটা পড়েছি অনেকবার। বহুবার! তারপর, অবাক হয়ে দেখেছি আমার ভেতরে বিন্দু বিন্দু মুক্তোর কণার মতো ক্ল্যামেন্টাইনের হাসিমুখ। অথবা সুনয়নার, অথবা রাত্রির, হয়তো তোমার!


আমিও হয়তো ওর মতো, ওদের মতো হাসিতে স্পর্শ করতে পারবো যেমন আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে! তাই সেদিন থেকে আমার দিন রাত অবিরাম হাসিহুল্লোড়ে ভরে উঠলো। খলখল-ট্রেনে চেপে বসলো হাসির অমেয়কণিকা আমার… আমি বিস্ময়ে দেখি তারা কী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। তুমি দেখো না? তোমরা দেখো না? আমি আজ ঘরের ভেতরে গুটিশুঁটি খুব হাসছি অবিকল সেই শিশুটির মতো।
শিশুদের কথা আর না বলি? শিশুরা মোটেই ভালো নয়, তারা আমাকে ভুলে যাবে আর কিছু দিন পরেই। আমি জানি। সবাই তাদের বড়ো হয়ে ওঠার গল্প করবে আর এক ফাঁকে টুপ করে ঝরে পড়বে আমার একলা ঘরে বসে থাকার গল্পটা। ধুলোয় মিশে মিশে ওটার চেহারা আর চেনাই যাবে না। তারপরে একদিন জমাদারের ঠেলাগাড়িতে করে আমি হারিয়েই যাবো নির্ঘাত! উহ!


ওই ক্লিষ্ট খিন্ন মুখের দল। হা করে না থেকে আমার কথা শোনো। কান পেতে শোনো আমি হাসছি গ্রামারবিহীন। তোমরা বিরক্ত না হয়ে খেয়াল করলেই দেখবে আমার হাসির শব্দ আর গমক তোমাদের কোষে কোষে ঢুকে গেছে। অমল শিশুগুলো হাসছে, তাদের ওপরে আমার ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ নেই কিন্তু!


কিন্তু আমি আদতে চাইছিলাম কাউকে স্পর্শ করতে, এমনভাবে ছুঁয়ে দিতে যেন সে একটুকরো রুমালের মতো আমার ছোঁয়াটুকু নিয়ে চলে যেতে পারে। সে আমাকে ভুলে গেলেও তার ভেতরে, বাইরে আমার দেয়া আঙুলের ছাপ থাকবে। ছাপ মুছে গেলে উত্তাপ থাকবে। উত্তাপও যেদিন চলে যাবে সেদিন হয়তো আমিই থাকবো না, তাই না?


কলমে আর পেন্সিলে লিখছিলাম। কাগজ আর শীষের শীর্ষের কত গভীর ছিনিমিনি প্রেম। আঠারো আর একুশের প্রেম যেমন! ষোলো আর বিশের প্রেম যেমন। চকিত আর ক্ষণিকেই বুকে গেঁথে ফেলে একশ’ গোলাপ। সুবাসটুক বুক পকেটে নিয়ে অযথাই একুশ আর বিশ ঘুরে বেড়ায়। আঠারো আর ষোলোর কামিজপ্রান্তে তাদের গুমখুনের খবর কেউ জানতে পারবে না। কোথাও কোনো মামলা দায়ের হবে না। খালি বাদী-বিবাদীরা নিরন্তর ক্ষয়াটে এই গ্লোবে আরেকটু সবুজ হয়ে উঠবে। আরেকটু নীল করে তুলবে আমাদের আকাশ। কলম-পেন্সিল আরও কতো কী করে কাগজের বুকে। আমার অক্ষমতা যে আমি তা পুরো বুঝে উঠতে পারি না কখনোই!…

সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০০৯

এলোমেলো বসে থাকা

এলোমেলো বসে থাকা- এরকম একটা উপমা শুনেছিলাম, বা পড়েছিলাম কোন এক গল্পে বা কবিতায় বা উপন্যাসে। অথবা আমাকে কেউ শুনিয়েছিলো শব্দ তিনটা কয়েক বছর নাকি কয়েক মাস আগে। শব্দ তিনটা অনেক সময় বলে সবাই, কিন্তু এভাবে একসাথে বলে না। এলোমেলো হয়ে যায় সবাই, এলোমেলো জীবন কাটায় অনেকেই, এলোমেলো দিনরাত পাড়ি দেয় কেউ কেউ। আবার চুপচাপ বসে থাকে, স্থির হয়ে বসে থাকে, নয়তো হয়তো কেবল বসেই থাকে সবাই বা কেউ কেউ। কিন্তু এলোমেলো বসে থাকে বিশেষ কোন মানুষ। এলোমেলো বসে থাকা কেমন সেটা আমি জানতাম না। আমাকে কেউ শিখিয়ে দেয়নি। শ্লেটের ওপরে খড়িমাটির চক দিয়ে যেভাবে মাতামহী "স্বরে-অ" লেখা শিখাতেন, -এর গোল পেট টেনে টেনে আঁকতে হতো, কারণ তা প্রায়ই ভুল হতো আমার, মিশে যেতে চাইতো -এর কালো মাথার সাথে। তাই আমি ঈষৎ কাঁপাকাঁপা হাতে চক টেনে টেনে "অ" লিখতাম। এভাবেই শিখতে হয় অপরিচিত প্রণালী, নিয়মে, অধ্যবসায়ে, একাগ্রতায়। কিন্তু আমি কখনো এলোমেলো বসে থাকতে শিখি নি। এমনকি শব্দগুচ্ছটাও আমার অপরিচিত ছিল অনেকদিন। তবু শব্দজোড়া শুনেই আমার মাথায় একটা ছবি তৈরি হয়ে গেল।


আমি তারপর থেকে সেই ছবিটির মতো এলোমেলো বসে থাকার চেষ্টা করতাম। এখনও অবসরে করি। কেউ যদি আমাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে, তাহলে কি সে অবাক হবে? তার কি মনে হবে এটাকে এলোমেলো বসে থাকা বলে? নাকি তার মনে হবে আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই বসে আছি, আমার বসে থাকায় কোন নতুনত্ব নেই, নেই অগোছালো বিন্যাস। তাই আমি একা একাই নিবিড়ভাবে চেষ্টা করতে থাকি কতটা নিখুঁত করে এলোমেলো বসে থাকা যায়।


এভাবে বসে থাকলে আমার মাথায় বিচ্ছিন্ন চিন্তাগুলো আসতে থাকে। একেবারে গোছানো-চিন্তা কোন কাজের নয়, সেটা আমাকে পাগল করে দেয় না। পড়ার সময়ে, পরীক্ষায় আগে আমি গোছানো-চিন্তা করি। তাতে করে আমার লক্ষ্য স্পষ্ট থাকে। কিন্তু এলোমেলো বসে থাকার কোন উদ্দেশ্য তো নেই, কারো উদ্দেশেও এই বসে থাকা নয়। এ' শুধু আমার জন্যেই, একান্ত আপন। সেজন্যে আমি এভাবে বসে থেকে রাজ্যের কথা ভাবি। ফড়িঙয়ের মতো দুরন্ত হয়ে ওঠে মগজের কোষ, সিন্যাপ্স- যাবতীয় জৈব-রসায়ন। আমি তখন জুলফি বেয়ে ঘাম কেমন ধীরে ধীরে নেমে আসে সেই কথা ভাবি। আরও ভাবি, বুড়ো আঙুলে চটকে দিলে ঘামের কণার স্রোতটা থেমে যাবে। খোঁচা খোঁচা দাড়িতে অবশিষ্ট-ঘাম লেপ্টে থাকবে। আর হাতের বুড়ো আঙুলেও কিছু কিছু চলে আসবে নির্ঘাত; আমি সেই হাত জামায় মুছে ফেলবো। ঘামের চলন কতো বিবিধ, বহুবিধ!


তারপরে আমি আরো কত কথা ভাবি এভাবেই বসে বসে। নিয়মবিহীন ভাবনার সুবিধা হলো কাঠবিড়ালির মতো ডালে ডালে লাফিয়ে চলে যাওয়া যায়। মাথা ব্যথা করছে, মাথার ভেতরে রক্তের নাড়ির মতো দপ্‌ দপ্‌ করে উঠছে এক একটা ধাক্কা। ব্যথাগুলো কি চিন্তার কারণে জন্ম নেয়? এই যে দুর্গম এলোমেলো ঘুরছি মগজের কোষে কোষে, তারা হয়তো নিউরনে খবর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। দৈনন্দিন পরিচিত চিন্তার বাইরে তারা বেশি যেতে চায় না। মানুষের মতোই তারা হয়তো অভ্যস্ততা ভালোবাসে! তাই আজ আমার অলস অত্যাচারে তারা বিরক্ত, নাজেহাল, ব্যথিত। এজন্যে এখন সেই ব্যথা ছড়িয়ে পড়ছে স্নায়ুর রাজপথ দিয়ে, ব্যাপন একটা সুচারু প্রক্রিয়া। এলোমেলো বসে থেকে পায়েও ঝিঁঝিঁ ধরে গেলো। অসাড় হয়ে আসছে পায়ের আঙুল, আঙুলের ডগায় একটা কালো পিঁপড়া পিলপিল করে ঘুরছে- অস্থির! আমার চিন্তার মতোই এলোমেলো তার চলন। পিঁপড়াচলনের পথরেখা কেমন হবে? অমিত সম্ভাবনাময় সঞ্চারপথ। আগে থেকে তো বোঝার উপায় নেই পিঁপড়াটা ঠিক কোন দিকে যেতে পারে। আর বোঝা যায় না বলেই যে কোন দিকে চলাচলের এই বিপুল আশ্বাস নিয়ে নিশ্চয়ই পিঁপড়াটি ভাবনায় জর্জর। আবার নাও হতে পারে। হয়তো এমন কষ্টকর চিন্তা যাতে করতে না হয় এজন্যে পিঁপড়ার মগজ খুব কম। একদিকে কম পেলে আরেকদিনে বেশি থাকে। পিঁপড়ার পা অনেকগুলো, ছয়টা পায়ে তরতরিয়ে অসীম সম্ভাবনাময় পথে সে হাঁটছে, চারণভূমি আমার পায়ের নিঃসাড় বুড়ো আঙুল।


অনুভূতিশূন্য হতে পারাও একধরনের সক্ষমতা। এই গুণ সহজাত নয়, অনুশীলনজাত, অভিজ্ঞতাসঞ্জাত। আমি সেটার অনুশীলন করি না, অনেকে করে, আমি তাদের মুখের রেখার সরলীকরণ দেখে মুগ্ধ হই। দুঃখ-তাপে অবিচলতা দেখে আমার সমীহ জন্মায়। প্রচণ্ড বিপদে বা দূর্যোগে তাদের ইস্পাত-কঠিন স্নায়ু দেখে ভক্তিতে আমি প্রায় মাটিতে মিশে যাই। মাটিতে মিশে যেতে যেতেই আমি দেখি আমার শরীর কালো হয়ে উঠছে। রক্ত শুকিয়ে গেলে কালো হয়ে যায়? বোধহয়। শীতলপাটির মতো কালো মাটি সম্ভবত শুষে নিয়েছে রক্তকণা, শ্বেত, লোহিত ইত্যাদি। নিয়ে গেলেও ক্ষতি নেই, আমি ব্যবসা করতে চাই না তাই লাভের বা লোকসানের চিন্তা নেই। এই সকল নেই নেইয়ের মাঝেও মাথার ভেতরে সূক্ষ্ণ চিল-চিৎকার ব্যথা এখনও সরব! মাটিতে শুয়েই ঘাড় এদিক-ওদিক হেলিয়ে আমি ব্যথাপাচার করে দেয়ার চেষ্টা করি। মাটি সব নিলো, রক্ত-ঘাম-শ্লেষ্মা-ত্বক। খালি আমার এলোমেলো বসে থাকার ভঙ্গিটা নিলো না! আমার ক্রমচলনের মগজকীট নিলো না! আমার পায়ের ওপর ঘুরে বেড়ানো পিঁপড়া নিলো না!

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০০৯

নাগরিক সনদপত্র এবং-

সকাল
ভোর নিয়ে আমার ভেতরে প্রবল কাঙ্ক্ষা সচল!
সকাল নিয়ে ততটা নয়। সকালে ঘুম কেটে যায়, চোখের কোণে জমে ওঠা পিঁচুটির মত ক্লান্তি ঝরে যায়। মুখের ওপরে বালিশের দাগ আর ঘুম ঘুম ওম মুছে যায়। সকালে আমরা ব্যস্ত, সকালে আমরা দ্রুত হয়ে উঠি। তাই সকাল অনেক সময়েই আমার প্রিয় সময় না। তবে মাঝে মাঝে সকাল খুব কামনার হয়। চুলের গন্ধ মাখা বালিশে মুখ ডুবিয়ে সকাল আসে। এলোমেলো পায়ে এসে বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরে। সকালের আগমনে জানালা চৌকাঠ ভেসে যায়।
ভোর তখন অভিমানী শরৎ, মেঘের মত চলনশীল। স্মৃতিহীন স্রোতের মত ভেসে চলে গেছে সে'সময় একটু আগেই। সকালের দাপটে।
সকালে বেণীগুলো থরে থরে সেজে ওঠে। ফ্রকের কুঁচিগুলো ফুলে ওঠে। শাদা জুতোর আঁকিবুকি ফিতে গোল গোল পাঁকে ফুলের মত হাসতে থাকে, দুলতে থাকে। গাঢ় নীল হাফ-প্যান্টেও ঝলমলে রোদ্দুর জমা হতে থাকে। কালরাতে খুব বৃষ্টি হয়েছে। কারা যানো দরজার বাইরে পানির ছোট একটা হ্রদ জমিয়েছে রাতের ঘুমে। সবাই অচেতন ছিলো যখন, তখন তারা এসে রেখে গেছে হ্রদ আর রোদ। পানির আয়না ভেঙে যায় দাপুটে জুতোর লাফানোয়। ছিটে ছিটে ওঠে হাসিমুখো বিন্দু রোদের শরীরে ঝিকিয়ে ওঠা ছুরির ফলার মতো। আমাদের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে যায়।


দুপুর
দুপুর খুব সাধারণ। আটপৌরে হয়েছে তখন সকালের রোদ। থরে থরে জমে ওঠা বেণী আর হাফ-প্যান্ট ফিরে গেছে বাসায়। দুপুরের বুড়োটে ঝিমে তারা বাইরে ঘোরে না। বাউণ্ডুলে রোদ হা হা করে দৌড়ে বেড়ায় খালি ফুটপাতে, ময়লাটে বারান্দায়। শুকাতে দেয়া কাপড় থেকে চুমুর চুমুকে বাষ্প শুষে নেয় চকিতেই। গ্রীলের লোহায় মাঝে মাঝে কিছু রেখেও যায়- দুপুরের রোদ বড়ো খেয়ালি!
এই রোদে চকচকে ত্বকও পুড়ে তামাটে হতে থাকে, তামাটে থেকে কালো হতে থাকে। আমাদের সবার চামড়ায় রোদের পরশ খুব ছাপ রেখে গেছে গ্রীষ্মে। এখন শরতের রোদ, পুরোনো স্বভাব পুরোপুরি ছাড়েনি বলে আমরা পুড়ি, ধীরে ধীরে বার-বি-কিউ হয়ে উঠি নধর কুক্কুটের মাংসের মতো। আমাদের মেরিনেশন ঘটেছে নোনা-ঘামে। লবণে ঝলসে গেছে শার্টের ভাঁজ, নিভৃত আস্তিন। সেখানে শাদা শাদা নোনাদাগ পড়ে গেছে অনেকের, যারা বেশি ঘামে। শরীর শীতলের কত রকমারি উপায়...


এখন দুপুরগুলো দীর্ঘ। অচল পাথরের মত চেপে বসে, শ্লথগতিতে গড়িয়ে চলে, স্বল্পঢাল রাস্তায় যেভাবে ভারি-চাকা গড়ায়...


বিকেল
বিকেল এলেও উষ্ণতা কমে না। রোদের ঝাঁজ কমে আসে, রাগের তীব্রতা। আমাদের মনে তবু স্বস্তি নেই। আর কত বাকি দিনের, রাত এলো না কেন এখনও? এমন প্রশ্নে আমরা পেঁচিয়ে যেতে থাকি। সাপের মত কুণ্ডলি-পাকানো গরম বাতাস আমাদের জামায়, হাতে, মুখে জড়িয়ে থাকে। বিকেল অস্থির। সবার তাড়াহুড়োয় আমরা সবাই কোনো না কোনো জরুরি কথা ভুলে যাই। আজকে হয়তো কারো সাথে দেখা করার কথা, কাউকে কোনো জরুরি কিছু ফেরত দেবার কথা। কারো কাছে আমরা আজই টাকা পেতাম অনেকগুলো। এরকম টুকিটাকি চিন্তাগুলো গলে পড়ে যায় ফুটো পকেট দিয়ে। মাঝে মাঝে হঠাৎ মনে পড়ে যাবার দুরন্ত-ভুলে আমরা মনেও করে ফেলতে পারি, আজকে বাসার গ্যাসের বিলটা দেয়া হয়নি! এরকম অস্থির বিকেল দৌড়ে চলে যায়। যাবার সময়টাতে আমরা অস্থিরতায় তাকে বিদায় জানাতেও ভুলে যাই। খেয়ালও করি না, বিকেলের রোদ মরে যাবার সময় কী করুণ চোখে তাকিয়ে ছিল। সেই চাহনির কোলে, চোখের পাঁপড়ির ভেতর আমাদের ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরা কৈশোরের গল্পটা ছিল।


যেদিন খেলতে গিয়ে আমরা মারামারি করেছিলাম।


যেদিন জুতো ছিঁড়ে গেলো বলে বাসায় ফিরে বকা খাওয়ার ভয় ছিলো।


যেদিন গোলাপি ফ্রকের মেয়েটার সামনে সাইকেল নিয়ে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষেছিলাম আমরা।


যেদিন মহল্লার বড়োভাই ধাম ধাম করে আমাদের পিঠে কিল ঘুষি দিয়েছিলো হাতাহাতির সময়ে।


সেই সময়টা গোল, নিষ্পলক চোখ মেলে বিকেলের কোলে শুয়েই থাকে। আমাদের অস্থিরতায় খুব দ্রুতই হারিয়ে যায়।


সন্ধ্যা
সন্ধ্যা বড়ো রূপসী। নীলের ভেতর হলুদ আর কমলা, লাল আর গোলাপি গুলে সন্ধ্যা আসে। আর চলে যায়। সন্ধ্যায় বাতাসে যে পোকাগুলো ওড়ে, তাদের নাম আমাদের জানা নেই। ঠিক কখন ট্র্যাফিকের লাইটগুলো জ্বলে ওঠে তাও আমাদের খেয়াল করা হয় না। আমাদের ঘামে ভেজা শরীরগুলো শুকিয়ে উঠতে থাকলে আমরা স্থবির হই। বিকেলের সেই বিজাতীয় অস্থিরতা কমে আসতে থাকে। রক্তের ভেতর ঘাম শুকিয়ে আসে। টান জাগে চাঁদের। টান পড়ে বাড়ির। কেউ কেউ এসময়ে গোপনেই বেরিয়ে পড়ে। কেউবা এ'সময়ে খুব অসময়ের অনিয়ম-ঘুম থেকে উঠে বিপন্ন হয়ে যেতে থাকে অযথাই! কালো হয়ে আসতে থাকা আকাশে আরও বেশি কালো পাখিরা জোরে জোরে উড়তে থাকে। সশব্দে। আমরা নাগরিক মাথা হেলিয়ে এক পলকের জন্যে তাদের দিকে তাকিয়ে বিরক্তই হই হয়তো। 'এত চেঁচামেচির কী আছে?'- এই ভাবনা বাসের হর্নের মতো আমাদের মনের মাঝে ছুটে বেড়ায়। সন্ধ্যা নেমে চুল এলিয়ে ঢলে পড়ে রাতে। আমাদের নিশাচর চোখ জ্বলে, নিভে- গাড়ির অবিশ্রাম হেডলাইটের মতো


রাত
রাতের কোনো গল্প নেই। বাইরের রাত আর ভেতরের রাত আলাদা। ভেতরে প্রথাগত জীবন, মানবিক সম্পর্ক। সকালে ছেড়ে যাওয়া আধবোনা উলের সোয়েটার আমরা হাতে তুলে নেই। সুতোর এক মাথায় মা ছিলেন, আরেকপাশে বাবা, নিচের দিকে এক কোণে বোনেরা, ভাইয়েরা। তাদের সুতোগুলো গুটিয়ে আবার বুনতে শুরু করি। ফেলে রাখা সুতোতে কথা জমে আছে। আমরা কথা বলি।


ওদের কথা আমরা সারাদিন ভাবি নাই। আরো ভাবি নাই চারপাশে অচল, নিথর গাছগুলোর কথা। তারাও সারাদিন আমাদের মতোই আলো মেখেছে, আঁধার মেখেছে। থোক থোক রঙ তাদের শরীরেও জমেছিলো, আমরা দেখিনি বোধহয়। ওরা রাতে কী করে? ঘুমায়? নাকি জেগে জেগে কথা বলে আমাদের মতোই! এখানেই ভেতর বাহির ফেড়ে ফেলা তরমুজের ফালি ফালি হয়ে যায়। আমরা ভেতরে বসে সুতো বোনার ফাঁকে টের পাই না, গাছেরা ফিসফিস করে। তাদের পাতা আর ডালের মাঝে নিঃশব্দ আগুন ধরে যায়। আগুনে অদৃশ্যে পুড়তে থাকে ছাল, বাকল, কাঠ। কাঠের গভীরে কান্না জমানো ছিলো যে! সেই কান্না আগুনের ভেতরে হু হু করে কাঁদতে থাকে। গাছেদের পুরোনো স্বপ্ন আর চিন্তাগুলোও চলাচল করতে করতে পুড়ে যেতে থাকে। আমরা বাইরে তাকালে এগুলো দেখি না। দেখার চোখ আমাদের বুজে গেছে, যেদিন আমরা ভেতরে চলে গেছি সেদিনই।


সেইদিনের স্মৃতিও আমরা ভুলে গেছি। বৃক্ষের সাথে মানবের বিদায়ের ক্ষণে কী কথা হয়েছিলো কে জানে! কে বলতে পারে! সে'সময়ে তারা কেঁদেছিলো, নাকি হাসিমুখে একে অপরকে বিদায় জানিয়েছিলো, তা আমাদের পুরোপুরি অজ্ঞাত। আমরা কেবল এখন ভেতরে বসে নিথর, দোদুল্যমান ছায়াটে গাছ দেখতে পাই। আগুনের ঘ্রাণ এলেও, তা আমাদের কাছে অচেনা লাগে।


তবে কেউ কেউ সে গন্ধ পায়। উন্মাতাল মানুষের জাত, বেজাতের পশুদের মতো শুঁকে শুঁকে তারা এই প্রবল দহনের খোঁজ পেয়ে যায়। ভালোবাসার মতো আগুনে তারাও পুরে যেতে চায়, এই আকাঙ্ক্ষার কোনো দাম নেই মানবের কাছে আর! তাই তারা, গুটিকয় মানুষ, জনপদ ছেড়ে চলে যায়। চুক্তি-মোতাবেক, আমরা তাদেরকে ভুলে গেছি, এই জগতের প্রয়োজন বা উপযোগ নেই। বেখাপ্পাদের জায়গা পেছনে, গুদামঘরে।


রাত ফুরিয়ে গেলে আমাদের জনপদে, ভোর এসে সব দৃশ্য ও আগুন নিভিয়ে দেয়। একারণেই ঘুম পায় আমার। আগুনের ভালোবাসা হারিয়ে কোমল ঘুম কামড়ে ধরে আমাদের। আমাদের কাছে তাই ভোর প্রিয়!