গান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৭ জুলাই, ২০১২

মোনাম্যো'

ভালোবাসায় জোর জবরদস্তি চলে না, এ এমনই এক সর্বগ্রাসী অদ্ভুত অনল
যা হাজার চেষ্টায়ও জ্বলে না, আবার একবার জ্বলে উঠলে ঝড়ঝাপ্টাতেও নেভে না।

Ishq par zor nahin, hai yeh woh aatish Ghalib
Jo lagaye na lage, aur bujhaye na bane

[Love can't be tamed, it's like a fire that overpowers everything else
At times, it doesn't start even after repeated tries; but once started, it's impossible to extinguish.]

পলিমাটির ওপর যে সবুজ ঘাস জন্মেই বেড়ে ওঠে দুরন্ত বাতাসে,
সেই ঘাসের মনের কথা শুনলে হয়ত দেখতে পেতাম এক উড্ডীন শখ তার মনে।
সে ভেবেছে সে একদিন এই পলিমাটি ছেড়ে উড়ে যাবে,
শেকড়ের মায়া তার কাছে বন্ধন, এই অর্গল ভেঙে যাবে
বাতাসের মৃদু হাসি তার শীর্ষ ছুঁয়ে যায়, আলোর রশ্মি তার ত্বকে মোলায়েম পরশ বুলায়
সে অপেক্ষা করে...

পলিমাটির মনের কথা জানতে পেলে দেখবো, অণু অণু মৃত্তিকা কণায় বেঁধেছে সে চিরহরিৎ জাল
তার গোপন প্রেম এই তরুণ ঘাসের সাথে, সে কোন কথা বলে না, শরমে মরমে মরে
তার নিঃশব্দ হাসিই বলে দেয়, প্রেমে পড়েছে সে, তাই নিঃশব্দেই জাল বোনে সে ঘাসের শেকড়ে
কালো নিকষ শেকড়টুকু ঘাস লুকিয়ে রেখেছিল পলিমাটির বুকে, সেই কালোকেই বুকে টেনে নেয় মাটি - বিনা আপত্তি

I hope you don't mind that I put down in words
How wonderful life is while you're in the world

কালো পলিমাটি অবাক হয়ে দুরন্ত ঘাসের সৌন্দর্য দেখে - উজ্জ্বল কান্তি যার, বিশীর্ণ হরিদাভা! ঈষৎ বাতাসে দুলছে সে! কী অপার্থিব কোমল তার শরীর! পলিমাটির বিস্ময় ঘোচে না। সে অপলক তাকিয়ে থাকে...

রাত নামে চরাচরে-

এই চন্দ্র-কাতর রাতের সৌন্দর্য দেখ, তোমার আরক্তিম কুন্তলের 'পরে সে যেন ঝিকিমিকি-মুকুট
তোমার লাল রঙ মেখে সে লজ্জাবনত মিশে যাচ্ছে তোমার আটপৌরে পোশাকের প্রান্তে
তোমার জীবন-ক্লান্ত চোখের কোণে শুভ্রাভা মিশিয়ে দিচ্ছে সে
পথবালিকা, রাজরাণী, আমার অভিবাদন নাও, ভগ্নহৃদয়ের কান্না নাও

La lune trop bleme pose un diademe sur tes cheveux roux
La lune trop rousse de gloire eclabousse ton jupon plein d'trous
La lune trop pale caresse l'opale de tes yeux blases
Princesse de la rue soit la bienvenue dans mon coeur brise

[The moon, all too fair, in your russet-red hair sets a sparkling crown
The moon, all too red with glory, is spread on your poor, tattered gown
The moon, all too white, caresses the light in your world-weary eyes
Princess of the street, do allow me to greet you, my broken heart cries]

তুমি চিরঞ্জীবী-সুধা, তুমিই সৌরভ প্রাণময়
নিশ্চুপ ফিসফাসে আমায় স্পর্শ কর, চাহনিতে ছুঁয়ে যাও
জাগরণে-অজাগরণে তোমায় প্রণমি

Chhooti hai mujhe sargoshi se, aankhon mein ghuli khamoshi se
Main farsh pe sajde karta hoon, kuchh hosh mein kuchh behoshi se

[You are like the fragrance of life itself,
You're the desire that touches me with a whisper and with the silence in your eyes
I bow to you, only partly conscious of myself]

পলিমাটি আর ঘাসের এই গল্পটা অসমাপ্ত থাকুক। কিছু কিছু গল্প চিরন্তন। অনন্তকালব্যাপী সেই গল্পগুলোর অনুরণন হতে থাকে। ক্ষুদ্র আমি সেই গল্পের কতটুকুই বা জানি, আর কতটুকুই বা বলতে পারি?...



*****
[মোনাম্যো' - Mon Amour - My Love]
[কৃতজ্ঞ‌তাঃ জাঁ রেনোয়াঁ, গুলজার, মির্জা গালিব, বাজ ল্যুরম্যান]

বুধবার, ২৩ মার্চ, ২০১১

ইনসমনিয়া-

ইদানিং ইনসমনিয়া ফিরে আসছে।
ইনসমনিয়ার বাংলা অনিদ্রা। দুটো একই শব্দ, অথচ শব্দ দুটোর চরিত্র কী আলাদা! ইনসমনিয়া শুনলে মনে হয় জ্যাজ শুনছি। নিদেনে কোনো পুরানো ব্লুজ, পঞ্চাশের দশকের পিয়ানোর সুর। সাথে নিশ্চুপ রাত, রাতের পিঠে অন্ধকার সরীসৃপের মতো জানালার বাইরে শুয়ে আছে। শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। হয়তো একটু পরে আমার ঘরে ঢুকে পড়বে। বাইরে সতর্ক পাহারা দিচ্ছে গলির আলোর শীর্ষক। ঘরে মিয়ানো আলো জ্বালিয়ে রেখেছি। রাত গভীর তাই উজ্জ্বল আলোয় চোখ পুড়ে যেতে পারে!
অনিদ্রা শুনলে এরকম কিছু মনে হয় না। বরং কেমন পাঁশুটে বুড়োর মতো লাগে নিজেকে। মনে হয় রোগা জিরজিরে হয়ে গেছি, খুকখুক কাশি জমেছে, মাঝে মাঝে থক করে গলা পরিষ্কার করে আসছি বেসিনে গিয়ে। ঘুম আসছে না, হাসফাঁস গরম কিংবা জলতেষ্টা। বাইরে কে আছে না আছে খবর নেই। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে আছি।
তাই এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা বোঝাতে শব্দ দুটোকেই ব্যবহার করি। এই এখন আমি ইনসমনিয়ায় ভুগছি - আজ রাত কেবলই ইনসমনিয়ার। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ হিউ লরির গাওয়া একটা গান পেলাম। সামনে সলো ব্লুজ অ্যালবাম বের করছেন। একটা গান ফ্রি বিলাচ্ছে। ফেসবুকে ‘লাইক’ দিলেই মেইলে গান চলে আসে! অভিনব প্রচারণা এবং বিনামূল্যে গান ছড়ানো দেখে ভালো লাগলো।
গানের কথাগুলো বেদনা-বিধুর। প্রেয়সী চলে গেছে। অনেক ভালোবাসার কথা, অনেক মায়াময় স্মৃতি ফেলে রেখে নিষ্ঠুরের মতো চলে গেছে। এখন তার কিছুই করার নেই। প্রেমের সময়ে সে টের পায় নি, এরকম কিছু হবে, ভাবতেও পারে নি যে প্রেমিকা এভাবে ছেড়ে চলে যাবে। এই বিরহে, এই যাতনার চোখ কাঁদছে। মন কাঁদছে। এরকম সরাসরি বেদনার কথা এখন আর আমরা বলি না। হয়তো মনে করি কথাগুলো ক্লিশে হয়ে গেছে। সবাই বলে বলে এমন করেছে, যে এই কথা এই অনুভব সত্য হলেও কেউ বিশ্বাস করবে না। চলে যাওয়া প্রেমিকাও বিশ্বাস করবে না! তাই আমরা ভণিতা করি, ভানে ভানে জড়িয়ে, উপমায় ডুবিয়ে বোঝাতে চাই সরল কথাটিকে। হয়তো সেই উপমা আর ভানের ভারে আসল কথা ঠিকঠাক ঠাহরও করা যায় না। বিগত-প্রেমিকা বুঝে কি না ছাই তা কে জানে!
====
You told me you were leaving
After all we’ve been through
Guess I’m a fool
Falling in love with you
There ain’t no use in cryin’
Do what you have to do
Guess I’m a fool
Falling in love with you
You told me that the kind of love we had
Will last for a million years
I believe everything you say
You filled my heart with tears
So long, pretty baby
Go break some other heart and two
Guess I’m a fool
Falling in love with you
=====

এইসব উচ্চকিত, শিল্পিত, চর্চিত অনুভবের প্রকাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ করে সরল-প্রকাশ পেলাম। ভালো লেগে গেলো। ইনসমনিয়ার সময় খুশি হলো। এখন এই ব্লুজে চেপে তোমার কথা ভাববো। মাঝে মাঝে এমন বিশেষ অবকাশ দরকার হয়ে পড়ে! 

শনিবার, ৯ অক্টোবর, ২০১০

জগাখিচুড়ি দুই নম্বর!

 ক্রেজ অর্থাৎ উন্মাদনা টের পেলাম ফেইসবুক থেকে। আমার খোমাখাতা-বন্ধুমহলে অনেকেই তার ভক্ত বলে দেখলাম নতুন গানের খবরাখবর জানতে সবাই ইচ্ছুক। প্রায় দুই বছর হয়ে গেলো তাই সবাই জানতে চাইছে কবে নতুন গান - নতুন অ্যালবাম আসবে। আমিও ইতস্তত ঘুরঘুর করলাম অর্ণবের ফেইসবুক পাতায়। কিছুদিন পরে জানলাম, 'রোদ বলেছে হবে' অ্যালবামের নাম। রিলিজ পেলো এই গত সপ্তাহে। আমি কিনলাম গতকাল।

অর্ণবের গান নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়ে গেছে। গত চার-ছয় বছরে একটা নির্দিষ্ট শ্রোতাগোষ্ঠী দাঁড়িয়ে গেছে তার। 'বাংলা' ব্যান্ডের গীটারিস্ট আর ভোকাল অর্ণব যখন 'সোনা দিয়া বান্ধাইয়াছে ঘর' অথবা 'তুই গান গা' গেয়েছেন, তখন থেকেই তিনি পরিচিত। এরপরে 'সে যে বসে আছে' থেকে যে তুঙ্গ খ্যাতি সেটুকু সরিয়ে তার সাথে নিবিড় পরিচয় হলো "চাই না ভাবিস" অ্যালবামে। অ্যালবামটিকে আমি একশব্দে বলি, 'ভিন্ন', আরেক শব্দে বললে 'অগতানুগতিক'। সেটা অর্ণবের গলা, বা গায়কী ঢঙকে বাদ দিলেও গানের কথা আর সুরের কারণেও অনেকটা, বেশিরভাগটা। সম্ভবত ভার্চুয়াল জগতে আমার দেখা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত গানের কলি "হারিয়ে গিয়েছি" গানটি থেকে নেয়া।

সে যাকগে। অসংখ্য তারিখ-না-জানা রাতের নিঃস্তব্ধতায় যেসব গান সঙ্গ দিয়েছে, সেগুলো না হয় নিজের জন্যেই তোলা থাক। তবে অর্ণব খুব ধুমধাড়াক্কা নন। রক-মেটাল রক জঁরার বাংলা গানগুলো যেমন ব্যান্ডভিত্তিক চর্চিত হয়, সেভাবে দেখলে নতুন বা ভিন্ন ঘরানায় আধুনিক গান ছাড়া কিছু ছিলো না। সেই ক্লিশে গানের কথা, তুমিয়ামির জলো বাতচিত ফেলে দেয়ার সময় অনেক আগেই হয়ে গেছে। ফিউশন থেকে ভাটিয়ালি বা পল্লীগানকে তুলে এনে রিমিক্স করা হচ্ছে নানাভাবে, সেখানেও মৌলিকত্ব হারায় অতিরিক্ত যন্ত্রের মন্ত্রণায়। তাই চুপচাপ অনেকেরই অর্ণব প্রিয়।

"চাই না ভাবিস" -এর পরে "হোক কলরব" আর "ডুব" একদিকে যেমন অনেক রকম খেয়াল খুশিতে গানবাজনা তুলে আনছে, সেখানে অর্ণবের কাছে প্রত্যাশা বেড়েছে দিনে দিনে। 'ডুব'-এর বেশ কিছু গান শুনে মনে হয়েছে কিছুটা কি জনপ্রিয়তার ভূতে ধরলো? কিছুটা কি তরুণ চাপল্যে পেলো তাকে? যে সুরগুলো জমে জমে শ্রোতার ভেতরে জায়গা করে নেয়, তারা এবারে হয়তো একটু লঘু হয়ে উঠেছে। "ডুবে"র পরে তাই আশা করছিলাম পরের অ্যালবামে অর্ণব আরেকটু সচেতন হবেন। সঙ্গীতের এতো এতো দিক, বিচিত্র গলিঘুপচি যেখানে খুঁজলে দারুণ দারুণ সব মণিমুক্তা পাওয়া যায়। তিনি না হয় সেই পথেই হাটুক। প্রথাগত চটুল জনপ্রিয়তা গানবাজনার বারোটা না বাজাক।


তাই "রোদ বলেছে হবে" নিয়ে বেশ আগ্রহ জন্মালো। খাপের ভেতরটা একটু আলাদা। একটা ছোট লিফলেটের মতো বই, লিরিক ভেবেছি। কিন্তু শেষ চারপাতায় পেলাম গানের লিরিক, তার আগের পাতাগুলো অদ্ভুত সুন্দর একটা গল্পে সেজে আছে। অর্ণবের লেখা, ছবিগুলোও তার আঁকা। অর্ণবের আঁকাআঁকি আগে দেখার সুযোগ হয় নি, তাই রীতিমত মুগ্ধই হলাম। ডিজিটাল পেইন্ট নিয়ে দেখাশোনা কম, গ্রাফিক্সের কাজ দেখে তাই আসলেই ভাবছিলাম মানুষের কল্পনা কতো বিচিত্রই না হয়! অনেকটা অর্ণবের মাথার ভেতরে ঢুকে পড়েছি মনে হচ্ছিলো। (Being John Malcovich!) আর যে গল্পটা অর্ণব বললেন, একটা সোনার হরিণ, সেই স্বপ্নপোকা, মায়াঘাত মাখা তীর, দুটো তীব্র আঁধার চোখের আক্রমণের, সেই গল্পটা আমি বলতে চাই না এখানে। কোন অ্যালবামের মাঝে এমন কিছু পাওয়ার জন্যে শ্রোতামন প্রস্তুত ছিলো না!

শেষ কথাগুলো বারবার ভাবছি...


সব সবুজ...
লাল হয়ে উঠছে ...
রোজ
আমার চারপাশে
বাক্স বাক্স ...
আহাম্মক বাক্সের দল!

CD তে মোট বারোটা গান। প্রতিধ্বনি, চিঠি পাঠাও, রোদ বলেছে হবে, মাথা নীচু, ইনিয়ে বিনিয়ে, বিড়ি, কে আমি, আমি যদি, মন খারাপ, একটা মেয়ে, মেঘ ফেটে গেছে, তোমরা যা বলো।

তুলনামূলকতা চলে আসে, প্রিয় গান শুনতে গেলে। তাই প্রতিধ্বনি শুনতে শুনতে হোক কলরব অ্যালবামের ঢঙ মনে পড়লো। গীটারের টোনের দিক থেকে খুব সজীব একটা আমেজ তৈরি হতে থাকে। অবশ্যই তো। তুমি একটা গানের যাত্রা শুরু করছো, সেটা কেন বিষণ্ণভাবে শুরু করবে? আসো, পথে নামি, রওনা দেই।

ঘাসফড়িং ও পাখির বুকে স্বপ্ন যতো
প্রাচীন কিছু সংগ্রহের গান হয় নিহত
সঙ্গীবিহীন সব হারানোর দুঃখ জেনে
রূপকথা তার সময় মতো নিয়ম মেনে।
(কথাঃ রাজীব আশরাফ)

অ্যালবামের সেরা গান সম্ভবত "চিঠি পাঠাও"। বিক্রম সিংয়ের লেখা গানটা আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগে গেছে। গানের মেজাজ সেই পুরনো 'চাইনা ভাবিস'-এর মতো মনকাড়া। প্রতিধ্বনি গানের রেশ কাটতে না কাটতেই অর্ণব হুট করে টেনে নিয়ে গেলেন রাতের বিস্রস্ত একাকীত্বের মধ্যে। সেখানে আমার সাথে কেবল আমি। চারপাশে নিশ্চুপ হয়ে আসা স্ট্রীটলাইটের ক্ষীণ আলো। এই সময়ে আর কিছু দরকার নেই, কিছুই না!

"শীতলপাটি চিনেছে রাত চিরকাঙাল
চির কাঙাল স্নেহের মতো একটু দিন
ভেঙেছে কতো নষ্ট ঢেউ উন্মাদের
কতো না মেঘ মেঘের কাছে বেড়েছে ঋণ।
মেঘের নীচে চাদোয়া নীল মফঃস্বল
মেঘের নীচে হেসেল ঠেলে বিষণ্ণতা।।"
এমন নিবিড় কথা, কবিতাই তো। একই সাথে গোপন আর সৎ, একই সাথে অভিমানি আর নিস্পৃহ। আমি এই গানটিই বারবার ঘুরে ফিরে শুনছি।

এর পরে শিরোনামের গান ''রোদ বলেছে হবে", এবং এই গান হতাশ করেছে 'ডুবের' গানগুলোর মতো। হয়তো ভিন্ন মুডের সাথে এই গানের অন্য চরিত্র ধরা পড়তে পারে, তবে আমার কাছে তেমন একটা আহামরি মনে হয় নি। এটার কথা রাজীব আশরাফের লেখা। তবে 'প্রতিধ্বনি'র কারণে তাকে আর দোষ দিলাম না।

এর পরের গান (মাথা নীচু)-এর কথা সাহানা বাজপেয়ীর। 'স্বপ্ন দেবে ডুব' যেমন ভাবিয়েছিলো, উস্কে দিয়েছিলো অনেক অনেক চিন্তার উনুন, তেমনি এই গানটিও ভাবাচ্ছে। সুরের দিক থেকে একটা থমথমে আবহের সাথে গানের কথাগুলো মিলেমিশে একটা অস্বস্তিকর অনুভব দেয়, যে অনুভব আমাদের বাস্তবতার একটা নিয়মিত অনুষঙ্গ। যেমন প্রতিক্রিয়াহীনভাবে আমরা খানিকটা বিযুক্ত হয়ে আছি আমাদের বাস্তবতায়, সেটারই ছবি এই গানে।
কথার বেড়া গেঁথে দিয়ে গেছে, কবেকার কোন কবি
বলবার কিছু বাকি নেই আর, নিথর নীরব এ ছবি

"ইনিয়ে বিনিয়ে" চমৎকার গান। তাল লয় মিলিয়ে সেই খাপছাড়া অর্ণব। মজা লাগে, এমন বেখাপ্পা তালের গানে মিশ খেতে খেতেও যেমন বেলাইন হয়ে যাওয়া, পাগলামি ঘরানার এই সুরটুকু জমতে জমতে আইসক্রিমের মতো গলে যেতে থাকা। পাহাড় থেকে বরফখণ্ডের গড়িয়ে পড়া বা উঠে উঠে আসা ধোঁয়ার মতো গান। জোহাদের সাহায্যভোকালটাই খালি বাজে লেগেছে। অর্ণবের গলার সাথে মিশেও নাই, পরিপূরকও হতে পারে নাই।

এই সুযোগে অর্ণবের গলা নিয়ে কিছু কথা বলে রাখি। এই অ্যালবাম শুনে মনে হচ্ছে হয়তো তিনি গলার যত্ন কম নিচ্ছেন। ফলস নোটে এতো বেশিবার চলে যাওয়া, লিরিক বেশিরভাগ জায়গাতেই অস্পষ্ট হয়ে ওঠা পীড়া দিয়েছে। হুট করে লিরিক হাতে না নিয়ে গান শুনতে বসে শব্দ বুঝতে না পারা শ্রোতার কাছে বিরক্তিকর, গায়কের জন্যে বিব্রতকর। তার এই দিকে আরো সচেতন হওয়া দরকার। আর ভুল উচ্চারণও পীড়াদায়ক ভীষণ। বানান ভুল যেমন একটা সুন্দর লেখার বারোটা বাজায়, তেমনি ভুল উচ্চারণের গানের আমেজের ক্ষতি করে। বিদেশে দেখি বুড়ো বুড়ো গায়কেরাও কী চমৎকার গলা ধরে রেখেছেন, আমাদের দেশের গায়কেরা কেন গলার বারোটা বাজান? সেটাকে ঠিকঠাক না রাখলে যতোই ভালো সুর আর কথা হোক না কেন, গান শুনতে ভালো লাগে না।

"বিড়ি" গানটার শিরোনাম যতোটা চমক দেয়, গানটি ততোটা মুগ্ধ করেনি। বিড়ি খেলে হয়তো আরো একটু রিলেট করতে পারতাম, তবে সে ব্যাপারেও সন্দিহান। প্রথম লাইন (হাত থেকে বিড়ি পড়ে যায়) ছাড়া বিড়ির গুরুত্ব বুঝলাম না। তাই এটাকে দ্রুত পেরিয়ে যাই।

অ্যালবামের সবচেয়ে শ্রুতিমধুর গান সম্ভবত "কে আমি"। এমনকি লিরিকের হিসেবেও প্রাণবন্ত (রাজীব আশরাফ আবারও)। এই গানে বিশেষ করে যেটা কানে বেজেছে সেটা হলো গীটারের নির্দিষ্ট একটা প্রগ্রেশন। অর্ণবের অ্যালবামে এমন দুয়েকটা গান থাকেই, সেগুলো বাজনার বৈচিত্র্যকে ধারণ করে। 'কে আমি' সেই কানের ক্ষিধেটা খুব ভালোভাবেই মিটিয়ে দিয়েছে। আর এই গানটা শুনে মনে হয়েছে লংড্রাইভে দারুণ মানাবে!

"রোদ বলেছে হবে"তে অর্ণব নিজে দুটো গান লিখেছেন। তার প্রথমটা "ইনিয়ে বিনিয়ে", আর পরেরটা "আমি যদি"। কিছুটা ফোক ঘরানার লিরিক, তেমন নজর কাড়ে নি, তবে এই গানটা অর্ণবের গাওয়ার গুণে একেবারে খারাপ লাগছে না!

বৃষ্টিমুখর দিনে শুনছিলাম, সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো বলে করার কিছু ছিলো না। তাই রাজীব আশরাফের তৃতীয় গানটা খুব ভালো লেগে গেলো। "মনখারাপের একটা সকাল, শূন্য আকাশ সফেদ নীলে, ক্লান্ত কোন চিলের প্রতি, তুমি কি আজ দিয়েছিলে? একটা অচীন ছায়াও তখন তোমার পাশে গোপনে, দাঁড়িয়ে ছিলো একান্তে ঠিক খুঁজতে তোমায় অনুরণে।" মন খারাপ সময়গুলোতে যেসব গান বালিশে ওয়াড়ে মিশে থাকে, আদর করে, সেগুলোকে তো ফেলে দিতে পারি না। সেগুলো মনের ভেতরে, ত্বকের গভীরে সেঁধিয়ে যায় খুউব!

ভালো লাগার দিক থেকে তিন চার নম্বরে যে গানটা, সেটা এর পরেই, শিরোনাম "একটা মেয়ে"। এই গানটার লিরিক এক কথায় অসামান্য লেভেলে ভালো লেগেছে। মেয়েটা হয়তো জানে না, তাকে নিয়ে কি অদ্ভুত গান গাইছে আরেকটা ছেলে। এই অনুভূতিপ্রবণতা, এই অন্যকে বুঝে ওঠার নিরন্তর চেষ্টা মানুষ এখন অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে মনে হয়। ভার্চুয়ালি কতো কতো দূরত্ব পাড়ি দিয়েছি আমরা, তাই তো পৌঁছুতে চাই মনের গহীনে। কী আছে তোমার মনে, মেয়ে? এক এক শব্দে উঠে আসছে টুকরো টুকরো মেয়েটা।
একটা মেয়ে/ কাক ভেজা রোদ/ রোদ পোড়া ঘাস/ কাশফুল/ দীর্ঘশ্বাস/ পথের পাশ/ মনের ভুলে/ রঙিন ফুল

তবে কাব্যিকতায় সবগুলো গানকে ছাড়িয়ে গেছে - মেঘ ফেটে গেছে। এবং আমি খুশি হয়েছি যে এই গানের কথা সাহানা বাজপেয়ীর লেখা দেখে। হুট হুট করে এমন কিছু লেখেন, মুগ্ধ হয়ে যাই!
"কোপাই'র মেটে জল থেকে, বুনো গন্ধে ভিজে
বকের ওই দলটা উড়ে এলো আমার দিকে
গত বিকেলের বার্তাসহ, ডানায় নিয়ে কাশফুলের রোঁয়া।
এই বেশ ভালো
মেঘ ফেটে গিয়ে চুঁইয়ে পড়া একটুখানি আলো"
একু্য়স্টিক গীটারে একেবারে খালি গলায় গান! আহা! চোখ বন্ধ করে ভাবছিলাম, কোন বৃষ্টিশেষের বিকেলে বন্ধুরা মিলে গোল হয়ে এলোমেলো বসে আছে। আর পুরো দলের মাঝে একজনের হাতে গীটার, সে মেঘধোয়া আকাশের দিকে চেয়ে আনমনেই এই গানখানি গাইছে। বাকিরাও হয়তো তার সাথে মিলে মেঘফাটা সেই একটুখানি আলোর দিকে তাকিয়ে আছে!

আর শেষ গানখানা রবিবাবুর। আর অর্ণবের সেই পাগলা অ্যারেঞ্জমেন্ট। সেই বেখেয়াল উদাম গলা, যে গলায় সাধারণত অন্য গানগুলো সে গায় না। ভালোও লাগছে, আবার মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে আসল অ্যারেঞ্জমেন্টটাই ভালো ছিলো। যতোগুলো রবীন্দ্রসঙ্গীত এখন পর্যন্ত অর্ণব গেয়েছেন, সেগুলোর সবগুলোতেই আমার এই রকম মনে হয়েছে। তবু, এই প্রচেষ্টাটুকু 'রক ইউদ রবীন্দ্রনাথ' টাইপের আবালামির চাইতে অনেক ভালো!


(*পুরো অ্যালবামের কৃতজ্ঞতা স্বীকার অংশটা বাংলায় দেয়ার জন্যে অর্ণবকে ধন্যবাদ। সবাই কেন যে এটা ইংরেজি দেয় আমি বুঝি না। বাংলার মানুষ, বাংলায় গান গেয়ে যদি ইংরেজিতে ধন্যবাদ জানায়, তবে কেমন উটকো আচরণ বলে মনে হতে থাকে। সেটা এখানে ঘটে নি।)

রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০০৯

টেবিলের চারপাশে

টেবিলে বসে ছিলো একাকী চায়ের কাপ
পাশের পিরিচে ছাইয়ের দাগ, অথবা পিঁপড়ের লাশ
টেবিলের চারপাশে এলোমেলো চেয়ার নির্ঘুম-
যারা চলে গেছে তাদের জন্যে নীরবতা সেখানে আজ।(১)


(কোরাস)
আমাদের যেদিন গিয়েছে চলে, যাবার আগে যায়নি তো বলে
সেদিন কি একেবারে গেছে হারিয়ে, হৃদয়ের সীমানা বহুদূর ছাড়ায়ে||


আমরা জেনেছি পৃথিবীর দিনরাত মানুষের জন্য নয়
পিরিচের ঘূর্ণিতে ছিটকে যাবে জলবিন্দুর স্রোত
মিছে প্রেম, মিছে কথা, শুধু অযথা আলাপে মশগুল
যারা ছিলো টেবিলের পাশে, তারাও জানেনি "সবই ফুরাবে"।


(কোরাস)


সেখানে যেসব একা একা রাত ভরে ওঠে রোদ হাসিতে
বন্ধু-খেলায় মেতেছে যারা, তাদের চোখে হর্ষ জল
তোমরাও রেখে যাবে চিহ্ন অসীম, চায়ের পিরিচে
টেবিলের চারপাশে এলোমেলো চেয়ারে নির্ঘুম।


(পুনঃ১)
(কোরাস)





***
উৎসর্গঃ হেম, তোকে।

সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০০৯

মঙ্গলালোকের ডাক

নাহ্‌, বুড়োটার বুড়ো হাড়ে কোন মায়া-দয়া নাই। সারাজীবন গাদা গাদা কী সব লিখেছে! মাথা মন হৃদয় সব উল্টে পাল্টে দেয়া ব্যাপার-স্যাপার। আজকে যেমন। আমার এভাবে কিছু করার প্ল্যান ছিল না, এমনকি আমার এই গানটা শোনার কথাও ছিল না। আমি এমনিতেই তাঁর গান কম শুনি। অনেক বেশি মনোযোগ দাবি করে বলে আমি তাকে এড়িয়ে চলি। শুনলে মুগ্ধ হই বলে, ভাবালুতায় পেয়ে বসে বলেও এড়িয়ে চলি। এরকম আরো নানাবিধ আবেগজনিত বিপ্লব ঠেকাতে আমি বুড়োর গান শুনি না।


আজকে একটা গান শুনেছি। পিয়ানোতে টুঙটাঙ করছে আর একটা মেয়ে গাইছে। একটু পরে আরেকটা ছেলেও যোগ দিল। শুনতে শুনতে কী মোহে পেয়ে বসলো, কী কান্না গলায় মাছের কাঁটার মতো আমাকে আজকে গেঁথে দিল! দুর ছাই, এরকম আবেগে বুক ভাঙার কোন মানে নাই, কোনই মানে নাই।






আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর | |


মহিমা তব উদ্ভাসিত মহাগগনমাঝে,
বিশ্বজগত মণিভূষণ বেষ্টিত চরণে | |


বহে জীবন রজনীদিন চিরনূতনধারা,
করুণা তব অবিশ্রাম জনমে মরণে | |


স্নেহ প্রেম দয়া ভক্তি কোমল করে প্রাণ,
কত সান্ত্বন করো বর্ষণ সন্তাপহরণে | |

শুনতে হলে এখানে ক্লিক করুন!