গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৫ এপ্রিল, ২০২২

Spin

 

"সাদাত ভাই, আপনি একটু মীমাংসা কইরা দেন।"
 
"ঘটনা কি?"
 
"আচ্ছা, বিশ্বের সেরা স্পিনার কে বলেন তো? আজিম বলতেছে শেন ওয়ার্ন, সে কারে কারে কতবার আউট করছে - এইসব স্ট্যাট দিচ্ছে। কিন্তু আমার কথা হলো মুরালীধরন সবচেয়ে বেশি উইকেট পাইছে। এখন আপনিই বলেন।"
 
সাদাত ভাই প্রশ্নটা শুনেই মুখে মুচকি মুচকি হাসছিলেন। আমার পাশে আজিম দাঁড়ানো, তার দিকে বারকয়েক তাকালেন। বললেন, "তোরা এই সামান্য বিষয় নিয়ে তর্ক করছিস কেন? এটার উত্তর তো সহজ। এরা কেউই বিশ্বের সেরা স্পিনার না।"
 
আমরা থতমত খেয়ে গেলাম। আজিম বললো, "তাহলে কে ভাই? আশ্বিন?" 
 
এবার সাদাত ভাই জোরে হেসে দিলেন, "আরে ধুর, ও হতে যাবে কোন দুঃখে! সেরা স্পিনার হলো কালাম চাচা।"
 
"মানে? কালাম চাচা ক্রিকেট খেলেন নাকি?" আমরা দু'জনেই তড়বড় করে বলে উঠলাম। 
 
"কালাম চাচা রোজ বিকালে যখন জিলাপি বানাতে থাকে, তখন কখনো পাশে বসে দেখেছিস? এত বড় কড়াইটায় টগবগ করে তেল ফুটছে, নিচের স্টোভ থেকে হলকা হলকা গরম গায়ে এসে লাগছে, চারপাশে এত আওয়াজ শোরগোল, রাস্তায় রিকশা-গাড়ি-জ্যাম, মানুষের ভিড়। সবাই এসে তাড়াহুড়া করে ইফতারি কিনছে। এসব কিছুর মধ্যে বসে নির্বিকারভাবে কালাম ভাই চিকন চিকন জিলাপি বানায়। চারপাশের কোনো অস্থিরতাই তাকে স্পর্শ করে না। আর কী নিখুঁত তার হাতের ঘূর্ণি! ঠিক মাপা আড়াই প্যাঁচের একেকটা জিলাপি, কোনোটা পাশাপাশি লেগে যায় না, সবগুলো একই মাপের হয়, বড়-ছোট হয় না, গোল গোল হাত ঘুরতেই থাকে ঘুরতেই থাকে। এভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা একটানা হাত ঘুরিয়েও তার জিলাপি সব একরকম। পারবে তোদের ওয়ার্ন বা মুরালি?" 
 
সাদাত ভাইয়ের এত কথার পর আমাদের মুখে আর কথা সরলো না। তবে কেন জানি হঠাৎ করেই খুব জিলাপি খেতে ইচ্ছা করছে!
 

শনিবার, ২ এপ্রিল, ২০২২

Relief

"No, you can't use that, you have to buy something first." The droopy-eyed guy replied with a monotone voice. 
 
"ব্যাটা চামার কোথাকার!", I think to myself, "Okay, give me a moment."
 
(কী কেনা যায়? ওয়ালেটটাও ভুলে গাড়িতে ফেলে আসলাম। ফোন দিয়ে পে করা লাগবে। আচ্ছা, কিন্তু কী কিনবো? চিপ্স? না, থাক। এসব খেয়ে গ্যাস হবে একগাদা। তাইলে একটা কোক নেই? কিন্তু ঠাণ্ডাটা কি আরো জেঁকে বসবে না? একটা স্প্রিং ওয়াটার নিয়ে নেই বরং। পানি তো পানিই, খাওয়া হবেই। কিন্তু ওটার দামও তো চার ডলার! ট্যাক্স ধরে-টরে আরো বেশি পড়বে। পানি এত টাকা দিয়ে কিনে খাবো? বিড়ি-সিগারেটের অভ্যাস থাকলে ভাল হইতো। সেটাও নাই!)
"How much are those bananas?" 
 
I point to the fruit basket beside the counter. Some brown-spotted ripe bananas are sitting with a couple of green apples. 
 
"$2.30", the answer came with the same non-chalance.
 
"Okay, I'll take those. Now give me the key. Please." 
 
....
 
I add the extra please before he changes his mind. Then I rush down the aisle to the end. In big black lettering it says, RESTROOM. I say to myself, "ত্যাগেই মুক্তি, ত্যাগেই মোক্ষ!"

শনিবার, ১৭ মার্চ, ২০১২

অপত্যগাঁথা

যে গল্পটি জরায়ু থেকে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে, সে গল্পটি অশ্রুর মতো সুন্দর, বেদনার মতো সত্য। গল্পটির শরীর নরম ও নাজুক, হাড়-মাংস কিছুই তেমনভাবে তার গায়ে লাগে নি। তাই গড়নে হালকা-পাতলা এবং হিলহিলে দেখায় তাকে। আমি বলছি দেখায়, কারণ আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পারছি সে টলমল করছে, দু'পায়ে ভর রাখার চেষ্টা করছে, কোনোমতে তাল সামলে নিচ্ছে। গল্পটির জন্য আমার কেমন এক অপত্য মায়া হতে থাকে। আহারে! পায়ে জোর নেই, সহায় নেই, সম্বল নেই, দিশেহারা একটি গল্প। পিটপিট করে তাকাচ্ছে মনে হলো। কাউকে খুঁজছে, খুব ব্যাকুল চোখে এদিক ওদিক তড়পাচ্ছে গল্পটা। নতুন শরীরে ভিন্নজগতের একটা গন্ধ লেগে আছে ওর। আমার মনে হয় ওকে আরেকটু সময় দেয়া দরকার ছিল। ওর গায়ে এখনো মাতৃকার আঁশটে গন্ধ। মাছের মত সাঁতরে বেড়ানোর বয়স ওর। চোখ বন্ধ করে নিভৃত আদরে ঘুমিয়ে থাকবে জলজ শয্যায়। নিশ্চিন্তে বড় হবে, পুষ্টি পাবে। অথচ এমন নিরাপদ মুহূর্তে সে এতটুকুন স্বস্তিও পাচ্ছে না। আঁশটে-গন্ধা শরীরেই টলমল দাঁড়িয়ে আছে। আরেকটু সময় পেলে ওর শরীর তরতাজা হতো, শক্তপোক্ত হতো। সেই সুস্থ সবল নিয়তি মনে হয় ওর কপালে নেই। এ এক ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা, কোন সন্দেহ নেই!
সোমার দুই ফ্যালফ্যাল চোখের দিকে তাকিয়ে আরিফের মনে হলো দু'চোখে গ্রানাইটের পেরেক পুঁতে দেয়া হয়েছে। সোমা আনান, আরিফ আনানের বউ, তাকিয়ে আছে। ধবধবে শাদা টাইলসের ওপর এক বিন্দু ময়লাও নেই। ওপরে এনার্জি-সেভিং লাইটগুলো প্রখর আলোতে ঝলসে দিচ্ছে চারদিক। সোমার শরীরের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে আরিফ, কিন্তু গ্রানাইটের পেরেক থেকে চোখ সরাতে পারে না। আমরা, যারা গল্পটিকে দেখছিলাম, তারা টাইলসের ওপর দেখতে পাই বিশুদ্ধ রক্তিম নদী। সোমার পাললিক জমিন থেকে দ্রুত পরিণত হচ্ছে খরস্রোতা নাব্যতায়। গন্তব্য আরিফের পায়ের কাছে অবস্থিত ঝাঁঝরি, গহন গভীর।

শুক্রবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১১

একটি বিশেষ সংবিধিবদ্ধ দ্রষ্টব্য

এই গ্রহতে আমাদের অস্তিত্ব যেন অযুত নক্ষত্রচূর্ণের নিরুদ্দেশ উড়ে বেড়ানোর মতো, যেন অযথা অহেতুক। আমাদের ধারণা আমাদের জন্ম, মৃত্যু, ভালোবাসা, প্রেম, যৌনতা, হিংসা, দ্বেষ, বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোনো না কোনো মানে আছে। আছে গূঢ়তর অর্থ, নিজের এবং অপরাপর মানুষের জীবনে। অথচ এ সবই দীর্ঘশ্বাসের টুকরোর সাথে হারিয়ে যাবে মহাশূন্যে। পৃথিবীর ঘূর্ণনের মত, নভোবিশ্বের ধূলিঝড়ের মত এক লহমায় নিশ্চিহ্ন হবে সকল আয়োজন, পরমুহূর্তে খোঁজ করলে কেউই বুঝতেই পারবে না কোনো রঙের হাট কিংবা কোনো মনের মেলা কোথাও বর্তমান ছিল। অনিবার্য হলেও এমন হারানোর নিয়ম নেই - নেই উদার-আগ্রহ কারো। আমাদের হঠাৎ ইচ্ছা করতে পারে সব ছেড়েছুড়ে চলে যাই। ইচ্ছা করতে পারে এই অনিশ্চিত অর্থহীন ক্ষণিক জীবনের কষ্ট মিটিয়ে ফেলি। যা কিছু সঞ্চয়, যা কিছু অপচয় এগুলো ঝেড়ে ফেলি, হিসাব চুকিয়ে দেই।

আমরা জানি যে স্থাবর সম্পত্তির অভিমান নেই। এভাবে সব ত্যাগ করলে শুধু জমানো স্মৃতিই দিশেহারা হবে, ধীরে ধীরে মৃয়মাণ রোদ ঘুমিয়ে যাবে অক্ষিকোটরে। নিশ্চুপ নির্বাক হয়ে যাবে শোরগোল। হয়তো পাততাড়ি গুটিয়ে নেবে প্রকৃতিও; প্রাণ যেখানে নেই, সেখানে কীসের বসত, কীসের মায়া? তখন সেই নিরাক নিস্তব্ধ এলাকায় কোন অনুভব সৃষ্টি হতে পারে? নৈঃশব্দের জন্ম হয় শব্দ ফুরোলে, অন্ধকার জমে জমে থিতু হয় আলোর অভাবে। তেমনই কি অপ্রাকৃতিক কোন অনুভব সৃষ্টি হয় প্রাণহীন ভূমিতে? সেই অভাবনীয় সৃষ্টি কতোটা সুন্দর, কতোটা কুৎসিত, তা আমাদের চিন্তাতেও আসে না। কিন্তু নৈঃশব্দ যেমন সত্য, অন্ধকার যেমন অলঙ্ঘনীয়, তেমনি এই অপ্রকৃতিও প্রাকৃতিক। এই অনুভবের অস্তিত্ব জানান দেয় সন্তর্পণে, খুব সচেতন খেয়াল না থাকলে তা টের পাওয়া দুষ্কর!

নিভু নিভু হয়ে আসছে মোমবাতির আলো। শাদা হলুদাভ একাকী মোমবাতিটার দিকে থির চোখে তাকিয়ে আছে সে। তার চোখের তারায় আগুনের প্রকম্প শিখাটি প্রতিফলিত হচ্ছে। স্ফটিকের মত স্বচ্ছ টলটলে চোখ, উত্তল ভূমিতে পিছলে যাচ্ছে রশ্মিকণা। মোমবাতিটি জানে না, তার আলোর কণায় খুব অল্প জায়গাই আলোকিত হচ্ছে। আর ক্রমশ রশ্মির তেজ কমে আসছে, তার শরীরে আর জমাট মোম বেশি বাকি নেই। সলতের প্রান্তে যে নীলাভ-হলুদ শিখা, সহসাই তা ঝলসে উঠলো যেন। অন্তত তাকিয়ে থাকা চোখ দুটোয় আমরা স্পষ্ট দেখতে পেলাম - নিষ্পলক একাগ্রতায় কোনো কাঁপন নেই, ওই মোমের শিখা আর ওই স্ফটিকস্বচ্ছ দৃষ্টির মাঝে যেন এক টানটান লড়াই! যেহেতু তার দৃষ্টি কাঁপছে না, তাই মোম-শিখাটাই যে হেরে যাচ্ছে, এ সিদ্ধান্তে সহজেই পৌঁছানো যায়। কিন্তু হেরে যাবার আগেও যোদ্ধার শিরায় রক্ত নাচে, খরস্রোতার তোড়ে যে শক্তি, তেমনই তোড়ে জেগে ওঠে বীরক্রম। জেগে ওঠে শেষ আঘাতের সঘন শ্লেষ, মনে এসে ভর করে অসুরিক জিঘাংসা। তাই সে ঝলসে ওঠে, ক্ষেপে ওঠে। মনে হয় সে এক ঝটকায় উড়িয়ে দিতে চাইছে প্রতিপক্ষকে। প্রতিপক্ষ সে, যার চোখ স্ফটিকের মত স্বচ্ছ, তার চোখের তারায় ঝিলমিল করছে মোমালো, সে প্রায় জিতে যাচ্ছিল। অথচ খুব অবহেলায় সে চোখ সরিয়ে নিল। মোমের আলোটুকু নিভে যাবার আগেই আলতো পলক ফেলে সে অন্যদিকে তাকালো। যেন এই যুদ্ধে তার কোনো মন নেই, যেন এ কেবল মিছে খেলা, নিরর্থক ভ্রান্তি! তার এই নিস্পৃহতায় মোমের আলোটুকু বিস্মিত হয়, কিছুটা আহতও হয় এমন অনাগ্রহে। যে প্রাণপণ সংগ্রামে তার শরীর ক্ষয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে, সেটা প্রতিপক্ষের কাছে কিছুই না? এতোটাই তুচ্ছ তার লড়াই, এতোটাই অনর্থক তার অস্তিত্ব?

চোখের ফিরিয়ে নেয়া দৃষ্টির রেখা এখন মোমালোর বলয় থেকে অনেক দূরে, সুদূরতম ঘরের দিকে ফিরে আছে। চোখটি অদ্ভুত, অপ্রাকৃতিক তার আচরণ। প্রায়ই সে নিষ্পলক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সাধারণত চোখগুলো যেমন হয়, যেভাবে তারা যোগাযোগ করে, যেভাবে বার্তাবহন করে, অনুভুতিলাভ করে, কাঁদে, কিংবা রাগে, এই চোখ দুটো তেমন নয়। এর চরিত্রে কোন অস্থিরতা নেই। আদিম ও অকৃত্রিম স্থৈর্যে সে তাকিয়ে থাকছে। এখন যেমন মোমের আলোর প্রতি তার আর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, এক অবিচলতায় তার দৃষ্টি চলে গেছে একটি ঘরের দিকে। ঘরটি দক্ষিণে, পানির ওপর ভাসছে। স্রোতের টানে ঘরের খড়ের চাল কেঁপে কেঁপে ওঠে। যে ঢেউগুলোর ওপর ঘরটি ভাসছে, সেগুলো অপত্যস্নেহে দুই হাতে যেন তাকে ধরে আছে। ছোট্ট শিশুকে যেমন কোলে তুলে আলতো দোলায় দোল দেয় মা, ঠিক তেমনি করে লহরের শীর্ষে দুলছে ঘর। ঘরের মেঝে কাদা মাটি পানিস্পর্শে আঠালো প্যাচপ্যাচে। গলে গলে মিশে যাচ্ছে নোনা পানিতে। মোমের মতই এই ঘরের জীবন স্বল্পায়ু। প্রবল পরাক্রমী নোনাজল তাকে খেয়ে ফেলবে। চোখ দুটো যেদিকে তাকায়, খালি ক্ষয়ে যাওয়া জীবন ও জড়ের প্রাচীর দেখে। এই প্রাচীর তার চারপাশে বৃত্তাকারে ঘিরে থাকে। গোল অক্ষিগোলক ঘুরিয়ে এটুকুই দেখা যায়, উর্ধ্ব-অধঃ-ঈশান-নৈঋত দশ দশ দিকে সন্তর্পণে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে চোখ। পাপড়ি খুলে আসে এমন মূলভেদী ঘূর্ণির টানে। ছেঁড়া পরিত্যক্ত ইলাস্টিকের মত পড়ে থাকে নিচে।

এতোটা নিচে চোখের দৃষ্টি সরে না, তাই সে বিচ্ছিন্ন পাঁপড়ির শোক ভুলে যায়। যে অংশ গত হবার চেতনা নেই, সে অংশ কখনো ছিল না। সে অংশের বিভিন্ন বিকৃতি ও আকৃতি পাওয়া যায়, কারণ তার সঠিক আকার সে জানেই না। অধুনাবিস্মৃত এই পাঁপড়ির অনৈস্তিত্বে বিশ্বাস করতে করতে চোখ ক্রমাগত ঘুরতেই থাকে। তার ত্বরণে মোমের শরীরের লুপ্তি চকিতেই বর্তমান; তার ঘূর্ণিবেগের ঝটকায় অতিকায় ঘরটি পানিমধ্যে লীন। পারিপার্শ্ব-ক্ষয়ে অবিচল নিস্পৃহতায় চোখ ঘুরছে। এই গতির উদ্দেশ্য নেই। এই গতির কারণ নেই। এই গতি ধীরে ধীরে ক্রমশ বেড়েছে, নিষ্কারণ তার প্রসার। তাই অগোচরে অক্ষিগতির রোধ করে নি সে কিংবা অন্য কেউ! বিশ্ব চরাচরের সকল বস্তু ও পরমশূন্যতা একদিন বিলুপ্ত হয়। চরাচর নামক কোন কিছুর অস্তিত্বই আর থাকে না। চোখের তারায় তখন এক অপ্রাকৃতিক নৃত্য স্থাপিত হয় নৃশংসসুন্দর ছন্দে!

রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০১১

ক্ষয়ে যাবার সূত্র

এই শহরে একলা হয়ে যাওয়া খুব সহজ ব্যাপার। নিজের অজান্তেই, একদম হুট করে নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মাঝে দুয়েক মুহূর্তের ফাঁক দিয়ে আমরা দেউলিয়া হয়ে যাই, নিঃসঙ্গ ও নির্বন্ধু হয়ে যাই। ধীর পরিবর্তন যেমন সহসা নজরে পড়ে না, খুব খেয়াল না করলে টের পাওয়া যায় না, সেরকম পরিবর্তন এটা নয়। একলা হয়ে যাবার কোন গাণিতিক সমীকরণ নেই। আর এই বিষয়ে কোন গবেষণা চলছে বলেও খবর পাই না। তবে এই প্রক্রিয়াটি যে একেবারেই আকস্মিক এবং দ্রুত, সে ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই। ভূমিকম্প বা বজ্রপাতের মতোই, আমরা একা হয়ে পড়ি। বরং বলা চলে, একাকীত্ব আমাদের ওপর সনখ ঝাঁপিয়ে পড়ে। ধারালো আঁচড়ে চারপাশের নিরাপদ বলয় ভেদ করে নখ-দাঁত বসিয়ে দেয় নিঃশব্দে। সেই নিঃশব্দ আঁচড় বুকের গভীরে নিয়ে হতবাক হই – একে অপরের সামনে মুখোশের মতো হাসি লটকে রাখি।

চায়ের বাজার জমে ওঠে বনানীর অলিগলিতে। এই অলিগলিগুলো রাশেদের ভালো লাগে। নম্বর দিয়ে রেখেছে মিউনিসিপ্যালিটি, কিন্তু সেগুলো সে মনে রাখতে পারে না। সে বনানীর অলিগলি দোকানপাট দিয়ে চিনে নেয়, মনে রাখে মোড়ের মার্কেটের পসরা দেখে। কোন রাস্তার খোয়া-ওঠা ছাল দেখে তাকে চিনতে পারে, রাস্তাটি তার দিকে ঘেয়ো কুকুরের করুণ চোখে তাকায়। রিকশায় ঝাঁকি খেতে খেতে তার সম্ভাষণে রাশেদ মাথা এমনিতেই ঝাঁকি খেতে থাকে। রিকশায় দেখা গেলো রাশেদকে, যার সঙ্গে এইমাত্র পরিচিত হলাম আমরা, সে তখন একা বসে আছে। রাশেদের সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়বে। ধীরে ধীরে তাকে জানার চেষ্টা করবো আমরা। পেঁয়াজের পরতের মতো মানুষের ভেতর অজস্র পরত। সেই ভাঁজে ভাঁজে রাশেদ কেমন হয়ে উঠছে – খুব পাষণ্ড চণ্ডাল হয়ে উঠছে, নাকি খুব অমায়িক ভদ্র হয়ে উঠছে, সেটা জানতে চাইবো। একজন মানুষকে তো পুরোপুরি জানা যায় না, তারপরেও চারপাশ দেখে তাকে বুঝে ওঠা যায়। সে কেন কীভাবে কোথায় চলে যাচ্ছে, কী করে বেঁচে থাকছে, সেগুলোর দিকে বারবার আমরা অনুসন্ধানী ও লোভীর মতো দৃষ্টি ফেলবো। আর এর ফাঁকে ফাঁকে নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে নেয়ার এক অপ্রকাশিত অন্তর্লীন চেষ্টা চালাতে থাকবো। মিলে গেলে গল্প পড়ার সময়টাই উসুল!

পরত পরত অপ্রকাশ্য অসংখ্য মানুষের মাঝ থেকে আমরা রাশেদকে তুলে আনি। হয়তো সে তেমন জরুরি কেউ নয়, সে খুবই সাধারণ, কিন্তু এইখানে এই গল্পে সে প্রধান হয়ে ওঠে। আর সেজন্যেই তাকে আমরা বনানীতে দেখি। বনানীর কোন এক নম্বরহীন গলিতে রিকশার ওপরে রাশেদকে দেখি। রিকশার চালকটি বুড়ো, নদীমাতৃক বাংলাদেশের মতো শিরা-জেগে-ওঠা জরাগ্রস্ত হাতে রিকশা চালায় সে। বুড়োরা আস্তে ধীরে রিকশা টানে বলে খানা-খন্দগুলো বড়ো বেশি কোমরে লাগে, হাড়গুলো বাজতে থাকে ঝনঝন করে। রাশেদ রিকশার ওপরে বেশ সামলে বসে, কায়দা করে তাল সামলাতে হয় তাকে। রাস্তাটা রাশেদের বেহাল দশায় মজা পায় মনে হয়; যদিও রাস্তার এই অনাবশ্যক রূঢ়তার দিকে নজর দেয়ার সময় নেই ওর। রাশেদের হাতে শক্ত করে ধরা চিঠিগুলো আজকের মধ্যে ডিএইচএল-এ পাঠিয়ে দিতে হবে। সে হলদে-কমলা দোকানের সাইনবোর্ড খোঁজে, মনে মনে ভাবে, ‘এই রাস্তার পরেই বুঝি চোখে পড়বে’। দোকানটা প্রথমদিকে রাশেদ চিনতো না, নিয়ন তাকে চিনিয়ে দিয়েছিল। নিয়নের সাথেই প্রথম এসেছিলো ওখানে, “শোন, এইটা সস্তা কিছুটা। ফেডএক্স অনেক টাকা নিবে। তোর তো বেশ কয়েকটা প্যাকেট পাঠাতে হবে, তাই ডিএইচএল-ই ভালো,” বলতে বলতে নিয়ন ওই কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়েছিলো। রাশেদ সেই দোকানটাই এখন খুঁজছে। রিকশার পাশ দিয়ে শিসের মতো মোটর বাইক বেরিয়ে গেলো। চিন্তা-ভঙ্গ। নিয়নের চিন্তাটুকু রাশেদের মাথায় ক্রমশ জড়াতে থাকা সুতো হয়ে উঠছিলো, সেটা ছিঁড়ে গেলো। তখনই রিকশা ডানে মোড় নিয়ে একটু এগোতেই দোকানটা চোখে পড়লো তার।


২
কাজ সেরে বেরুনোর পরে রাশেদের বেশ খালি খালি লাগতে থাকে। চিঠি পাঠানোর পুরনো উত্তেজনা ফিরে আসে। যদিও এই চিঠিগুলো তেমন ব্যক্তিগত নয়, এগুলো কাগুজে সনদ – তার যাবতীয় পড়াশোনা আর অর্জনের ফিরিস্তি। এগুলো কীভাবে জমেছে, কীভাবে সে পেয়েছে, মাঝে মাঝে নিজেই ঠাহর করতে পারে না। সাদা কাগজে গোটা গোটা করে রাশেদুল হাসানের কৃতিত্ব বা ব্যর্থতার যে ফিরিস্তি সনদগুলো সোচ্চারে ঘোষণা করতে থাকে, সেটা চোখের সামনে রেখেও সে মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে পারে না। তার মনে হয় রাশেদুল হাসান নামের অন্য কোন মানুষের কথা বলছে। আদ্যোপান্ত গাঁজাখুরি বৃত্তান্ত মনে হতে থাকে। কখনো কখনো সে রীতিমত লুকিয়ে রাখে কাগজগুলো। নিজস্ব অর্জন বা ব্যর্থতা অনেক সময় মানুষের কাছে প্রকাণ্ড পাথরের মতো। বুকের ওপর ছোট ছোট মেডেলের ভার কীর্তির পাশাপাশি হয়তো অকৃতকার্যতার অনুভব দেয় হঠাৎ করেই। এই অনুভব খুব বিদঘুটে, মাঝে মাঝে মনে হয় বিচ্ছিন্ন ব্যাপার, নিতান্তই তুচ্ছ, কিংবা ভাবালুতাও বলা চলে। কারো কাছে রাশেদ এগুলোর কথা বলবে, সেই সুযোগ পায় না। এমন বিপন্নতায় তাই একলা লাগার অনুভব তার কাছে ফিরে ফিরে আসে। ডিএইচএল-এর দোকানের বাইরে ধুলোর মধ্যে জুতা ডুবিয়ে কিছুক্ষণ ডানে বামে তাকিয়ে সে তাই রোদ দেখে, বৃক্ষহীন খোলা মাঠের আশেপাশে গুটিকয় কসরত করতে থাকা বড়োলোক দেখে।

বাইরে রোদের তোড় কমে এসেছে, শীত শীত বাতাস। হামা দেয়া বাচ্চার মতো টালমাটাল ভঙ্গিতে পড়ন্ত সেপ্টেম্বরে শীত এগিয়ে আসছে। এবারেও হাড় কাঁপিয়ে দিয়ে যাবে শেষতক, এটা ভাবতে ভাবতে রাশেদ রাস্তার পাশ দিয়ে বাসার দিকে অথবা অন্য কোন দিকে হাঁটতে থাকে। দুঃখিত, আমি ঠিক বুঝতে পারি না, রাশেদের গতিবিধি আমার কাছে কিছুটা অপরিচিত এখনো। আপনার পাশাপাশি আমিও তাকে চিনে ও পড়ে নেয়ার চেষ্টা করছি, আর আপনার চেয়ে একটু এগিয়ে আছি কেবলমাত্র। কিন্তু রাশেদের সেগুলো নিয়ে মাথাব্যথা নেই। অন্তত আমাকে বিভ্রান্ত না করেও সে গন্তব্য স্থির করতে পারতো। রাশেদের মাথায় হয়তো তখনও নিয়নের চেহারা জমাট বেঁধে ছিলো। ছিঁড়ে যাওয়া সুতোটা ল্যাতপ্যাত করছিলো মগজের কোন কুঠুরিতে। নিয়ন দেশ ছেড়ে যাবে যাবে করছিলো গত বছর। যাওয়া নিশ্চিত হবার পরে সময় পেয়েছিলো এক মাস, দৌড়াতে দৌড়াতেই সেটা পার হয়ে গেলো। শেষদিকে খুব বেশি দেখা হতো না তাদের। বিদেশে যাওয়ার এই চক্করের মাস ছয়েক আগে ওরা রুম ছেড়ে দিয়েছিলো। অহোরাত্রির সঙ্গী থেকে ব্যস্ত শহরে চাকরি ঢুঁড়ে ঢুঁড়ে ওরা আলাদা হয়ে পড়ছিলো। এই বিমুক্তি এতোটাই স্বাভাবিক ও সন্তর্পণ, রাশেদ বা নিয়ন কেউই হয়তো অনুভব করে নি। তাই রুম ছেড়ে দেয়ার মাস-ছয়েক পরে নিয়নের বিদেশযাত্রার খবর এলে রাশেদ টের পেয়েছিলো দূরত্ব বেড়েছে অনেক। ঠিক তখন সময়টা এমন যে, ওর চলে যাওয়ার খবরে রাশেদও কেমন কাছিমের মতো গুটিয়ে গেলো, হাত-পা-মুখ সরিয়ে গর্তে ঢুকে পড়লো, ডুব দিলো সেলফোন বন্ধ করে। রাশেদ এটা প্রায়ই করে। কিন্তু ঠিক নিয়নের যাবার আগের দিন সন্ধ্যায় ওদের দেখা হয়ে গেলো। এমনি হঠাৎ করে হয় নি। রাশেদই গিয়েছিলো দেখা করতে, তখন ব্যাগ বাঁধাছাঁদা করছিলো নিয়ন। খুব স্বাভাবিকভাবেই টুকটাক কথা হলো-

-“সব ব্যবস্থা ঠিকঠাক করে ফেলেছিস?”
- “হ্যাঁ, চিঠি এসে গেছে। যাবার পরে আরো ডিটেইলে জানবো।”
- “কোন সমস্যা হয় নাই তো?”
- “নাহ্‌, সমস্যা আর কী হবে? দুনিয়া জুড়েই তো সমস্যা। ওখানে গিয়ে একটা রুমমেট জোগাড় করতে হবে। একা একা ভাড়া দিয়ে কুলাতে পারবো না।”
- “দেখিস, ফিরিঙ্গি দেশে দেখা জায়েজ, তবে ছুঁইলে পুলিশের চাইতে বেশি ঘা খাইতে হবে”, চোখ মটকে বলে রাশেদ।
সাথে সাথে নিয়নও হাজির-জবাব, “ছুঁইলে ঘা’ও হইয়া যাইতে পারে, হে হে হে!”

বিটকেলে হাসি আর তামাশার খড়ের মধ্যে রাশেদ কিছু একটা খুঁজছিলো। সুইয়ের মতো কিছু একটা বিঁধছিলো। এই কথাগুলো, কোন পুরনো নাটকের টুকরো টুকরো সংলাপ যেন, টান টান ছিলায় করে ছুঁড়ে দিচ্ছিলো তারা। কোথায় গিয়ে পৌঁছুবে – সেটা জরুরি না। আবার লুফেও নিচ্ছিলো একজন আরেকজনের কথা। ঠিক যেন আগের মতো। যেন কিছুই হয় নি। যেন তাদের মাঝে কোন ঝগড়া হয় নি, কোন দূরত্ব নেই। ছিলার টানের মতো টান টান করেই যেন সুতোটা কেউ পাকাচ্ছিলো। রাশেদ টের পাচ্ছিলো, আরেকটু টানে সাঁ করে ছিঁড়ে যাবে। তারপরে দুই দিকে ছুটে যাবে সুতোর মুখ, গোল অন্তর্মুখী প্যাঁচে ভুলে যাবে বাকি অংশের কথা।

রাত একটায় ফ্লাইট। তাই রাতের খাবার খেয়ে নিয়ন আর নিয়নের বাবার সাথে রাশেদ একটা ট্যাক্সিতে চড়ে এয়ারপোর্টের দিকে যেতে থাকে। সামনের সিটে রাশেদ, পেছনে ওরা দু’জন। মৃদুস্বরে একটু একটু করে উপদেশ দিচ্ছিলেন নিয়নের বাবা। বুড়ো ছাড়া নিয়নের পরিবারে আর তেমন কেউ নেই। রাশেদের সাথে যতদিন পরিচয় হয়েছে, নিয়নের মা ততদিনে ওপারে চলে গেছেন। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, মামাতো-খালাতো ভাইবোনেরাও দূরে দূরে, অন্য শহরে। এই একা একা নিয়নের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে রাশেদের খাতিরও হয়ে গেছে এক রুমে পড়ে যাবার পর। নিয়নের বাসায় যতবার গিয়েছে, মৃদুভাষী বাবার সাথে নিয়নের সম্পর্কটা উপভোগ করেছে। পিতাপুত্রের মাঝে যেন এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব; আংশিক লুকানো, আংশিক ব্যক্ত, অনেকটাই ভাসাভাসা যা এক বিকেলের দাওয়াতে ধরা পড়ে না। নিয়নের বাসায় আড্ডা দিতে দিতে রাত হয়ে গেলে যখন রাশেদ থেকে যেত, রাতের খাবারের পরে বাইরের কোলাহল থেমে যেত, তখন মন্থর সময়ে বুঝতে পারতো নিয়ন আর তার বাবার মধ্যে বন্ধনের গভীরতাটুকু এরকম শান্ত থির না হলে বোঝা যায় না। এই যেমন এখন, ট্যাক্সির ভেতরে নিয়নের বাবা মৃদুস্বরে নানা উপদেশ দিচ্ছেন। উপদেশের ফাঁকে হঠাৎ নীরব হয়ে যাচ্ছেন কয়েক মুহূর্তের জন্যে। তারপর আবার কী একটা মনে পড়ে গেছে ভঙ্গিতে হয়তো বলছেন, ‘আচ্ছা শোন, গিয়ে রাতে ঘুমানোর আগে ওষুধগুলো খেতে ভুলবি না’, কিংবা ‘রাস্তা ঘাটে সাবধান থাকিস, অপরিচিত কারো কাছ থেকে কিছু খাবি না’। এমন বাক্যগুলো মায়েদের বলার কথা, নিয়নের বাবা কী অবলীলায় বলে বসছেন। সামনের সিটে বসে রাশেদের মজা লাগে। পিছনে না তাকিয়েও সে নিয়নের নিশ্চুপ মাথা নাড়া দেখতে পাচ্ছে। নিয়ন চলে গেলে সবাই একই সাথে একা হয়ে যাবে।

জ্বলজ্বলে এয়ারপোর্ট অসামান্য রাতের আলোয় ঝাঁঝাঁ করছে। নিয়ন ক্লিয়ারেন্সের জন্যে এগিয়ে গেলে রাশেদ আর ওর বাবা বাইরে জায়গা খুঁজে বসে পড়ে। প্লেন ছাড়তে এখনো ঘণ্টা দেড়েক বাকি। রাশেদের উল্টোদিকে জবুথবু নিয়নের বাবাকে বুড়োটে লাগে। এতো জ্বলজ্বলে আলোতে কি আমাদের চামড়ার ওপরের মুখোশটা খসে পড়ে? ভেতরের রূপ আর দুর্বলতা অবধি চোখ পিছলে চলে যায়? এয়ারপোর্টের চকচকে কাচের দেয়ালের ওপাশে ঝাপসা হতে থাকে নিয়ন। এতো সারি সারি কাচ দেয়া চারিদিকে। মানুষের নিঃশ্বাসে সেগুলো হয়তো প্রায়ই ঝাপসা হয়ে ওঠে। এখানে অনেক অশ্রু জমে আছে। নিয়ন যাবার আগে একটা মুচকি হাসি দিয়েছে। তারপর চলে গেছে হনহন করে ক্যারি-অন টানতে টানতে। এখানে তিনজনের মাঝে ওই সবচেয়ে বাস্তববাদী। কাঁদে না। আবেগে ভেসে যায় না। রাশেদ জানে- ও অনেকদূর অবধি যাবে, নিয়নের বাবাও জানেন সেটা। আমরাও হয়তো বুঝতে পারি। দেশ ছেড়ে যারা যায় তারা কেউই অবাস্তব চিন্তায় যায় না। নিয়নের প্লেন ছেড়ে দেয়ার নোটিশ ওপরের বোর্ডে অনেকক্ষণ ঝুলে থাকলো। তারপর আরো কিছুটা সময় নিয়নের বাবা জবুথবু বসে রইলেন। রাশেদ দেখলো ঘড়িতে রাত ক্রমশ ডানে-বামে হেলে পড়ছে নিদ্রায় ঢুলুঢুলু চোখে। ওর বাবাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে রাশেদ চলে এসেছিলো।

নিয়ন চলে যাবার পর ওর বাবার সাথে রাশেদের একদমই দেখা হয় নি। দেখা করার সামাজিকতা কখনো ছিলো না অথবা দেখা করার তাড়না অনুভব করে নি অথবা দেখা করার অস্বস্তি ও কথা বলার বিড়ম্বনা নিতে চায় নি রাশেদ। যেহেতু আমরা রাশেদকে পুরোপুরি চিনতে পারবো না, সেহেতু দেখা না করার কারণও আমরা নিশ্চিত করে জানতে পারবো না। নিয়নের সাথেও তার যোগাযোগের মাত্রা কমে গেছে ধীরে ধীরে। অনুপস্থিতি এরকম ঘটায়, অনলাইনে বসেও তাই রাশেদ ও নিয়ন কথা বলে না। সহসা নক্‌ করে না একে অপরকে। অনেকদিন পরপর হয়তো টুকটাক কথা হয়, সেগুলো খোলামকুচির মতো উড়ে যায় অল্পেই। নিয়ন অনেক ব্যস্ত থাকে বলে বেশিক্ষণ কথাও হয় না। রাশেদ একসময় বুঝতে পারে ওদের জীবন ধীরে ধীরে দূরবর্তী ল্যাম্পপোস্টের মত দূরে সরে গেছে। হয়তো সেজন্যই রাশেদ এখন উতলা হচ্ছে। হয়তো সেজন্যই সে বাইরে চলে যেতে চাইছে। পরিচিত জগতের জীবন পরিচিতদের ছাড়া দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তাই জীবনটাকেই পাল্টে ফেলতে চাইছে সে।


৩
তারপর একদিন খবর এলো, নিয়ন পৃথিবীর উল্টো পিঠে এক দুর্দান্ত শহর থেকে সাঁ সাঁ করে গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। রাতে কোথাও পার্টি ছিল হয়তো, ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসেই। পার্টি থেকে বেরিয়ে হয়তো প্ল্যান হয়েছিলো কোন রোড-ট্রিপে যাবার। হোস্টেলে ফেরার ইচ্ছা কারোই ছিল না। সেই গাড়িতে তার সাথে আরো দুইজন বন্ধুবান্ধব ছিলো। দুয়েকটা মদের বোতলও ছিলো হয়তো; আর গাড়ির বাইরে ছিলো আদিগন্ত বিস্তৃত রাত। রাতের অন্ধকার বুঝি গাড়ির ভিতরেও প্রবেশ করেছিলো কিছুটা। রাশেদ কল্পনা করতে পারে, এমনটাই ঘটে থাকবে, এমনটাই ঘটেছিলো। সেই অন্ধকারের কারণে নিয়নকে নিয়ে সুউচ্চ খাদ থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে গেছে গাড়িটা। এমন বিদঘুটে আর দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিলো নিয়নের লাশ, সনাক্ত করার জন্যে প্যান্টের পকেটে রাখা আইডি কার্ডটাই ভরসা হলো। রাতে তাকে যারা পার্টিতে দেখেছিলো, তারাও পোশাক দেখে সম্মতিই জানিয়েছে। এই সব কথা আর খবর রাশেদ নিজে পেয়েছে আরো তিন-চার দিন পর। নিয়নের বাবার সাথে তার দেখা করার কারণ যে নিয়নের মৃত্যু হয়ে উঠলো, সেই চিন্তায় রাশেদ মাঝেমাঝে ফ্যাক করে হেসে ওঠে।
দ্রষ্টব্যের মতো আমরা আরো জানতে পারি যে নিয়নের দ্রুতগতির গাড়ি যখন গ্লোব ছিটকে খাদে ঢুকে পড়ছিলো, তখন পৃথিবীর এই পিঠে আমাদের আধা-পরিচিত রাশেদ কর্মজ-চিঠিগুলো নিয়ে বনানীতে অলি-গলি খুঁজে মরছিল। এই শহরে ঘনবসতি, এই শহরে কোন খাদ নেই, অনিয়ন্ত্রণ গাড়ি চালানোর ধু ধু সড়কও নেই!

মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১১

জবাই

শান দেয়া ছুরিটা দুই হাতে শক্ত করে ধরতেই সুলতান মিয়ার শরীর একটু কেঁপে ওঠে। হালকা কাঁপুনি, দুই সেকেন্ডেই হারিয়ে যায়। আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করে সুলতান আরো শক্ত করে ধরে লম্বা বাঁকানো ছুরিটার বাট। বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর। নামাজের ওয়াক্ত চলে গেছে। আজকে সারাদিন আকাশ মেঘলা বলে সূর্যের তেজ বুঝতে পারছে না সুলতান। ঘোলা ঘোলা মেঘের সাথে আজকে বেশ বাতাস ছুটেছে। গ্রামের মাঠে বাতাসের তোড়ে লুঙ্গি সামলানো কঠিন। সকালে দশটার দিকে মাঠে গিয়ে লুঙ্গি উড়ে যাচ্ছিলো তার। হঠাৎ দমকা বাতাসে পাছার কাপড় সরে গেলে এক পিচ্চি ফ্যাক করে হেসে দিছিলো। হাসি শুনে কটমট করে তার দিকে তাকায়ে সুলতান একটা চাপা হুঙ্কার ছাড়ে। হুঙ্কারে কাজ হয়, পিচ্চি ভয়ে উল্টা দিকে দৌড় দেয়। সিকনি-পড়া নাক টেনে দৌড়ানোর সময় সুলতান দেখে, পিচ্চিটারও উদোম পাছা।

'যাকগে, গেছে গেছে, আর কেউ খেয়াল করে নাই, মানীর মান আল্লায় রাখে', ভেবে নজর ফেরায় মাঠের এক পাশে গাছগুলোর গোড়ায়। এখানে দুইটা শয়তানের পুত বেজন্মাকে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। চোখ বাঁধা আছে বেজন্মাগুলার, দুইটার মুখে রাইফেলের বাট দিয়ে শক্ত বাড়ি দেয়াতে দাত ভেঙে গেছে, ঠোঁট কেটে গেছে। রক্ত জমে কালসিটে পড়ে ফুলে আছে চেহারা, বোঝার উপায় নাই বেজন্মাগুলা আসলে দেখতে কেমন ছিলো। সুলতান দাঁতে দাঁত ঘষে। নালায়েকের দল। হিন্দু মালাউনদের সাথে হাত মিলানো কুত্তা এইগুলা। আজকে এইগুলারে উচিত শিক্ষা দেয়া হবে। কুরবানি দেয়া হবে সবার সামনে।

বাসায় ফিরে লুঙ্গি বদলে পায়জামা পাঞ্জাবি পড়ে নেয় সুলতান মিয়া। বাতাসের বেগ বিকালে আরো বাড়বে, রিস্ক নেয়া ঠিক না। উঠানে বসে ছুরিতে শান দিচ্ছিলো এক খাদেম। তাকে ডেকে এনে ছুরির শান পরীক্ষা করে সুলতান। বুড়া আঙুল ছোঁয়াতেই বুঝতে পারে, ধার মাশাল্লাহ দারুণ হয়েছে। এইসব কাজে ছুরি ভোঁতা হইলে খুব অসুবিধা। মনে মনে সন্তুষ্ট হলেও সেটা মুখে প্রকাশ করে না সে। খাদেমকে গম্ভীর গলায় আরো ধার দিতে বলে। 'বালু মিশায় নে, ধার তাড়াতাড়ি হইবো'।

শান্তি কমিটির অফিস থেকে বাকিদের নিয়ে দুপুরের পরে মাঠে গিয়ে হাজির হয় সুলতান মিয়া। এতোক্ষণে অনেক মানুষ জমায়েত হয়ে গেছে। এদের সবার উদ্দেশ্য একটাই, সুলতান মিয়াকে দেখা। 'ভেড়ার দলের জন্যে ভালো লিডার লাগে, ভেড়ার দল হাতের মুঠির মধ্যে রাখতে হবে', ভাবে সে। গাছগুলোর সামনে দুইটা ছোট ছোট গর্ত খোঁড়া হয়েছে। এক হাত গভীর এবং এক বর্গহাত আকারের। এই বিষয়ে স্পষ্ট মাপ থাকা জরুরি। রক্ত যেন গড়ায় না পড়ে, রক্ত গড়ানো ভালো লক্ষণ না। খাদেমদের চোখের ইশারা করে সুলতান। প্রথম বেজন্মাটাকে ধরে আনতে বলে সে। পা ছেঁচড়ে নিয়ে আসে চারজন খাদেম। হাত পিছনে মুঠ করে বাঁধা, চোখ বাঁধা, গলা দিয়ে গ্যাঁগ্যাঁ শব্দ করছে শুয়োরের বাচ্চাটা। সুলতান একদলা থুতু ফেলে ওইটার মুখের ওপর। জমায়েতের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। সুলতান জানে এখন এদেরকে ভয় দেখাতে হবে। কুরবানি কোন মশকরা না। এই বেজন্মাগুলার মতো আর কোন বেজন্মা যেন মাথা তুলতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। গলা উচু করে জমায়েতের দিকে স্থির চোখে তাকায় সে; বলে ওঠে, 'ইসলামের শত্রু, পাকিস্তানের শত্রু এই দালালরা। ইন্ডিয়ার ট্যাকা খায়া এখানে ব্রিজে বোমা ফেলছে এরা। পাকিস্তান ভাইঙ্গা দিতে চায় এরা। এগোরে কুরবানি দেয়া হবে এখন। সবাই হুঁশিয়ার!' চার জন খাদেম শক্ত করে চেপে ধরে শুয়োরটাকে। পায়জামাটা টেনে কাছে ঝুঁকে আসে সুলতান, ওইটার গলার চামড়াটা ফর্শা লাগছে। ছুরি শক্ত করে ধরে গলার চামড়ায় ছোঁয়ায়। 'ছুরির গোড়া থেকে আগার দিকে যাইতে হবে', 'এক টানে কাইটা ফেলতে হবে'। "আল্লাহু আকবর" বলে জোরে পোচ বসায় সুলতান মিয়া। গলার চামড়া ফ্যাট করে কেটে ছুরিটা ভিতরে ঢুকে যায়। মুহূর্তেই গরম রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয়ে আসে। সুলতান দুই হাতে উষ্ণবোধ করে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছুরিটা গেঁথে দিতে থাকে গলার ভিতরে। ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়...

চার জনে চার হাত-পা ধরে রাখায় ছুটাতে পারে না বেজন্মাটা। একটু দাপাদাপি করে। শান্ত হয়ে গেলে সুলতান খাদেমদের বলে 'শরীর উল্টায় দে। রক্ত ছিটা না পড়ে।'

'পরেরটারে ধইরা আন', হুকুম তামিল হতে সময় লাগে না। এটার স্বাস্থ্য একটু ভালো। পা ছুঁড়ে ছিটকে ফেলার চেষ্টা করে এইটা। সুলতান ধমক মারে, 'শক্ত কইরা ধর, ভাত খাস নাই নালায়েক!' গালিতে কাজ হয়, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক উৎসাহী খাদেমও এসে হাত লাগায়। পাঁচজনে মিলে ধরে বসে মোটা বেজন্মাটাকে। সুলতান ছুরিটা সরিয়ে বড়ো দা'টা হাতে নেয়। 'এইটারে দাও দিয়া কোরবানি দিতে হইবো', ভেবে একই নিয়মে বলে ওঠে, "আল্লাহু আকবর"। ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়...

দাপাদাপির চোটে একটা পা ছুটে যায়। শুকনো মাটিতে ক্রমাগত বাড়ি দিতে থাকে গোড়ালি দিয়ে। গর্তের চারপাশের ঘাসগুলো দ্রুত কালচে হয়ে ভিজে যেতে থাকে রক্তে। গরম উচ্ছ্বল রক্তে ভেসে যায় সুলতান মিয়া। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে দোয়া আওড়াতে থাকে সে। মিষ্টি বাতাস তার গায়ে প্রশান্তির আবেশ বইয়ে দেয়। কুরবানি সম্পন্ন। পেয়ারা পাকিস্তান জিন্দাবাদ!



*****
- অনীক আন্দালিব
২৬/৪/১১
(দ্রঃ আজ ২৬ এপ্রিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার চল্লিশ বছর এক মাস। এখনও মনে পুষে রাখি। এখনও মনে রাখি। কারও বিচার হয় নি। এক জনেরও না! লেখাটির পিছনে সম্পূর্ণ কৃতজ্ঞতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ, সৈয়দ শামসুল হক ও 'গেরিলা' ছবির সাথে জড়িত সকল মানুষের।)

আপডেটঃ ৯ আগস্ট, ২০১৫
শান দেয়া চাপাতিটা দুই হাতে শক্ত করে ধরতেই সুলতান মিয়ার শরীরে শিহরণ বয়ে যায়। হালকা কাঁপুনি, দুই সেকেন্ড। আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করে সুলতান আরও শক্ত করে ধরে চাপাতির  খাটো বাট। বেলা প্রায় তিনটা। জোহরের নামাজের ওয়াক্ত চলে যাচ্ছে। সারাদিন আকাশ মেঘলা বলে সূর্যের তেজ বুঝতে পারছে না সুলতান। ঘোলা ঘোলা ছাইরঙা মেঘের সাথে আজকে বেশ বাতাসও ছুটেছে। গ্রামের মাঠে বাতাসের তোড়ে লুঙ্গি সামলানো কঠিন। সকালে দশটার দিকে মাঠে গিয়ে লুঙ্গি উড়ে যাচ্ছিলো তার। হঠাৎ দমকা বাতাসে পাছার কাপড় সরে গেলে এক পিচ্চি ফ্যাক করে হেসে দিয়েছিলো। হাসি শুনে কটমট করে তার দিকে তাকিয়ে সুলতান একটা চাপা হুঙ্কার ছেড়েছিল। হুঙ্কারে কাজ হলো, পিচ্চি ভয়ে উল্টা দিকে দৌড়ে পালালো। সিকনি-পড়া নাক টেনে দৌড়ানোর সময় সুলতান দেখে, পিচ্চিটারও উদোম পাছা।

যাকগে গেছে গেছে, আর কেউ খেয়াল করে নাই... মানীর মান আল্লায় রাখে, এই ভেবে সে নজর ফেরায় মাঠের এক পাশে গাছগুলোর গোড়ায়। এখানে দুইটা শয়তানের পুত বেজন্মাকে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। চোখ বাঁধা আছে বেজন্মাগুলার। সুলতান দেখলো দুইটার মুখে রাইফেলের বাট দিয়ে শক্ত বাড়ি দেয়াতে দাঁত ভেঙে গেছে, ঠোঁটও কেটে গেছে। রক্ত জমে জায়গায় জায়গায় কালশিটে পড়ে ফুলে আছে চেহারা, বোঝার উপায় নাই বেজন্মাগুলা আসলে দেখতে কেমন ছিলো। সুলতান দাঁতে দাঁত ঘষে। নালায়েকের দল। হিন্দু মালাউনদের সাথে হাত মিলানো কুত্তা এইগুলা। আজকে এইগুলারে উচিত শিক্ষা দেয়া হবে। জবাই করা হবে সবার সামনে।

বাসায় ফিরে লুঙ্গি বদলে পায়জামা পাঞ্জাবি পড়ে নেয় সুলতান মিয়া। বাতাসের বেগ বিকালে আরও বাড়তে পারে, ঝুঁকি নেয়া ঠিক না। উঠানে বসে চাপাতিটায় শান দিচ্ছিল খাদেম শহীদুল। সুলতান তাকে ডাক দেয়, সময় নিয়ে সাবধানে শান পরীক্ষা করে। বুড়ো আঙুল ছোঁয়াতেই বুঝতে পারে, ধার মাশাল্লা দারুণ হয়েছে। এইসব কাজে চাপাতি ভোঁতা হইলে খুব অসুবিধা। মনে মনে সন্তুষ্ট হলেও সেটা মুখে প্রকাশ করে না সে। শহীদুলকে গম্ভীর গলায় আরও ধার দিতে বলে। 'বালু মিশায় নে, ধার তাড়াতাড়ি হইবো'।

বিকেল আরেকটু গড়িয়ে পড়লে শান্তি কমিটির অফিস থেকে বাকিদের নিয়ে মাঠে গিয়ে হাজির হয় সুলতান মিয়া। এতক্ষণে অনেক মানুষ জমায়েত হয়ে গেছে। সুলতানের মনে হয়, এদের সবার উদ্দেশ্য একটাই - এরা আমাকে দেখতে এখানে এসে হাজির হয়েছে। এরা বিভ্রান্ত। ভীতু। এরা বোকার হদ্দ। সঠিক পথ চেনে না। বিদ্যাবুদ্ধি অর্জন করে নাই। এরা জানে না চারপাশে কী হচ্ছে। কী করা উচিত একজন সাচ্চা মুসলমানের। তাই তারা আমার ভরসায় এখানে এসেছে। ভেড়ার দলের জন্যে ভালো লিডার লাগে, ভেড়ার দল হাতের মুঠির মধ্যে রাখতে হবে - ভাবে সে। গাছগুলোর সামনে দুইটা ছোট ছোট গর্ত খোঁড়া হয়েছে। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে এক হাত করে এক হাত গভীর। এই বিষয়ে স্পষ্ট মাপ থাকা জরুরি। রক্ত যেন গড়ায় না পড়ে, রক্ত গড়ানো ভালো লক্ষণ না। শহীদুলকে চোখের ইশারা করে সুলতান। প্রথম বেজন্মাটাকে ধরে আনতে বলে সে। শহীদুলের সাথে হাত লাগায় সোবহান আর মুরশিদ। দুই হাত আর চুল ধরে বেজন্মাটার পা ছেঁচড়ে নিয়ে আসে তিনজন খাদেম। হাত পিছনে মুঠো করে বাঁধা, চোখ বাঁধা, গলা দিয়ে গাঁগাঁ শব্দ করছে শুয়োরের বাচ্চাটা। সুলতান এক দলা থুতু ফেলে ওইটার মুখের ওপর। জমায়েতের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। সুলতান জানে এখন এদেরকে ভয় দেখাতে হবে। জবাই করা কোন মশকারি না। এই বেজন্মাগুলার মতো আর কোন বেজন্মা যেন মাথা তুলতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। মাথা উঁচু করে জমায়েতের দিকে স্থির চোখে তাকায় সে; গলা তুলে বলে ওঠে, 'ইসলামের শত্রু এই মালাউনের বাচ্চারা। ইন্ডিয়ার ট্যাকা খায়া এখানে ব্রিজে বোমা ফেলছে এরা। পাকিস্তান ভাইঙ্গা দিতে চায় এরা। এগোরে জবাই দেয়া হবে এখন। সবাই হুঁশিয়ার!' শহীদুল, সোবহান, আর মুরশিদ শক্ত করে চেপে ধরে শুয়োরটাকে। পায়জামাটা টেনে কাছে ঝুঁকে আসে সুলতান, সামনে গলার চামড়াটা ফর্শা লাগছে। চাপাতিটা শক্ত করে ধরে গলার চামড়ায় ছোঁয়ায়। 'চাপাতির গোড়া থেকে আগার দিকে যাইতে হবে'। 'এক পোঁচে কাইটা ফেলতে হবে'। "আল্লাহু আকবর" বলে জোরে পোঁচ বসায় সুলতান মিয়া। গলার চামড়া ফ্যাট্‌ করে কেটে চাপাতিটা ভিতরে ঢুকে যায়। মুহূর্তেই গরম রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয়ে আসে। সুলতান দুই হাতে উষ্ণবোধ করে, বুড়ো আঙুল দুটো বাটে চেপে ধরে সে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে গেঁথে দিতে থাকে গলার ভিতরে। ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়...

তিন জনে হাত-পা ধরে রাখায় ছুটাতে পারে না বেজন্মাটা। পা ছোঁড়ার চেষ্টা করে, কাঁধ ঝাঁকিয়ে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করে। বুক পেট উঁচু করে উঠে আসতে চায়। শহীদুল আর সোবহান চেপে ধরে রাখে। এক টানে গলা পুরো কাটে না। কিন্তু দ্বিতীয় টানের সময় ফড়াৎ করে গলার নালীটা ফেটে যায়। দাপাদাপি শান্ত হয়ে গেলে সুলতান খাদেমদের বলে 'শরীর উল্টায় দে। রক্ত ছিটা না পড়ে।'

'পরেরটারে ধইরা আন', হুকুম তামিল হতে সময় লাগে না। এটার স্বাস্থ্য একটু ভালো। পা ছুঁড়ে ছিটকে ফেলার চেষ্টা করে এইটাও। সুলতান ধমক মারে, 'শক্ত কইরা ধর, ভাত খাস নাই নালায়েক!' গালিতে কাজ হয়, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক উৎসাহী দর্শকও এসে হাত লাগায়। চার জনে মিলে ধরে বসে মোটা বেজন্মাটাকে। সুলতান তার রক্তে পিচ্ছিল হাত দুটো খবরের কাগজে মুছে বাটটা আবারও শক্ত করে ধরে। বলে ওঠে, "আল্লাহু আকবর"। ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়ঘড়...


দাপাদাপির চোটে একটা পা ছুটে যায়। শুকনো মাটিতে ক্রমাগত বাড়ি দিতে থাকে গোড়ালি দিয়ে। গর্তের চারপাশের ঘাসগুলো দ্রুত কালচে হয়ে ভিজে যেতে থাকে। গরম স্রোতের মতো উচ্ছল রক্তে ভেসে যায় সুলতান মিয়া। চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে দোয়া আওড়াতে থাকে সে। দমকা বাতাস তার গায়ে প্রশান্তির আবেশ বইয়ে দেয়। জবাই সম্পন্ন।

মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ, ২০১১

একটি প্রস্তাবনা -

Epigraph
ঝিনুক নীরবে সহো ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভিতরে বিষের বালি মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও

Prologue
কবিতার সঙ্গে সম্পর্ক প্রাক্তন-মোহের মতো হয়ে গ্যাছে। ক্রমাগত জীবন যাপনের ক্লেদ ও ক্লেশ কবিতাশূন্য করে দিয়েছে। শুনেছি উদ্দীপনা উপকারী, কিন্তু যদি সকল সময় উদ্দীপ্ত থাকতে হয়, তাহলে সে বড়ো ক্লান্তিকর। স্নায়ু-বৈকলন অবশ্যম্ভাবী। যতোটা বুঝি, আশেপাশের ক্রমাগত পীড়নে সেদিকে স্নোবলের মতো এগিয়ে যাচ্ছি।

গতি ক্রমশ বাড়ছে,
পথের বাধা দেয়ার মতো গাছ-পাতা-বন খড়কুটোসম উড়ে যাচ্ছে,
আমি ক্রমশ স্নায়ু-শক্তিতে প্রকাণ্ড হচ্ছি,
অতি নিচে,
অতি-নিম্ন-নিচে দেখতে পাই খাঁড়ির জল মেলে ধরে হা করে আছে সমুদ্র,
আমাকে গিলে খাওয়ার আনন্দে সে চকচক করছে,
ফেনায়িত করে তুলছে গালের কষ!

এটাও বুঝতে পারছি পতনের সাথে সাথে গলন শুরু হবে আমার। স্নায়ু ও মস্তিষ্ক এই পতন বা গলন ঠেকাতে পারবে না। ন্যূনতম ফাঁক-ফোকর খুঁজছি। পথ বেঁকে অন্য কোথাও আশ্রয় খুঁজছি। শব্দহীন হয়ে ওঠার অভিশপ্ত আবশ্যিক পতন ও গলন ভয়ঙ্কর!

হঠাৎ একটি ঢাল। এক টুকরো চড়াই। উতরাতে গিয়ে মনে হলো আশা পেলাম... মনের বদভ্যাসে আশায় বুক বাঁধি...
Manifesto
মোমালোর শরীর কোমলে কঠিন,
তবুও স্ফূটিত কম্পনে অবয়ব কায়াহীন
লঘুচালে অতীব্র-আবেশে ক্রমকম্প শরীর নরোম
নিভে গেছে সকল ক্ষুধা; অস্থিরতা, নির্ব্যাপী শোক


গলিত জমাট মোমের মতোই জমাট হয়েছে
ধমনীজ নদী, ভরাট হয়ে গেছে কাপুরুষ মেরু
কশেরুকা অনিশ্চিত, ভেঙে যেতে দেখেছি
অস্থিগত আগুনে-লাল অপ্রিয়তম ঋজুতা


শঙ্কাহীনের চোখে দেখি গাঢ় বিদায়ের ঘোর
এ গহ্বর তোমার - আমাদের যাবতীয় জীবন, গহ্বর
অভেদ দেখি না এখানে, প্রতিদিন ঘাসের মতোই
অবিকল্যে বদলে যাচ্ছে পুরোনো কথার পাতা।



Epilogue
নেমেছি অজান্তে অতল অকূলে অনিঃশেষ ঘৃণা শুধু তোমার জন্যে, হে অচল অকাট্য নিস্পৃহতা!

বৃহস্পতিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

মন্তাজ

মাঝে মাঝে এক দুই লাইন কবিতার মতো ভালোবাসার মতো শব্দের পুঞ্জ শান্ত পুকুরে ঘাই মেরে ওঠে, নিস্তরঙ্গে ওঠে ঢেউয়ের স্রোত, ছায়া ছায়া পাড়ে বসে নিজের ভেতরে সেই ঢেউগুলো একটু একটু করে তীরে ভিড়তে থাকে, চুপচাপ দেখি।

এই কবিতার মতো ভালোবাসার মতো পংক্তি কেনই বা জন্মায়, কেনই বা জ্বালায়। সবটুকু গুছিয়েও রাখতে পারি না, আমি বড়োই নিরুপায় অগোছালো। মেঘের মতো সঞ্চয়িতা হতে পারবো না, জেনে গেছি অনেক আগেই, স্কুল পালানোর বেলায় ভয়ে ভয়ে কুড়িয়ে নিয়েছি দুয়েক পশলা বৃষ্টি।

---

নতুন গল্প লিখছি রোজ, রোজ ক্লান্তিহীন নতুন প্রেমে পড়ছি, প্রেমে পড়তে পড়তেই আরো গভীরে ডুবছি। কিছু কিছু ঘটনা ছুঁয়ে যাচ্ছে, কিছু কিছু কথা মনেও থাকছে না। যেন ভেলায় ভেসেছি, নিরন্তর অকূল জলের কোলাহল চারপাশে। যেন তুমুল ব্যস্ত ট্রাফিকে দাঁড়িয়ে আছে, চারপাশ থেকে ছুটে আসছে টেরিফিক ট্রাক, বিবমিষা বাস। ছুটে পালাতে ইচ্ছা করে, অথচ স্থানুর মতোই নিশ্চল হয়ে গতিময়ের প্রেমে মজে গেছি।

এখানে হঠাৎ করেই কিছু বদলে যাবে না। পৃথিবীর সকল আহ্নিক গতির কোন মূল্য এখানে নেই। সবই শান্ত সমাহিত ও ধীর প্রক্রিয়ায় চলবে আরো অনন্তকাল, ঘুরে ফিরে একই সুর গাঁথবে সকলে, একই প্রেমে একে একে মারা যাবো তুমি আমি আমরা। অকস্মাতের অনুপস্থিতিতে আমাদের মাঝে ঘন হয়ে থাকবে ধ্রুবক, নক্ষত্রের আলো, সদ্যই কেউ হারিয়ে যাবে না। বরং অনেক অনেক মায়ায় জড়িয়ে থাকবে আশে পাশে আঁশে পাঁশে

---

ছেলেটি মেয়েটির কথা আর কতো বলবো। তোমরা সবাই জেনে গেছো নানাভাবে। ছেলেটির কোন সহায় ছিলো না, যে বড়ো ছেলেমানুষের মতো ভালোবাসতো। বাস্তবতার ধাক্কা তার গায়েই লাগতো না। সে একদম বোকা বোকা ছিলো। কতো কিছু হতে পারতো সে, বড়ো গায়ক, বড়ো নায়ক, বড়ো ডাক্তার কিংবা ব্যবসায়ী। মেয়েটা তো তেমন ছিলো না, বরং অনেকটাই বিপরীত। মেয়েটা খুব কর্মঠ আর অমিশুক ছিলো। অনেক কাজ করতো, নিজেকে প্রমাণের জন্য, জগতের সাথে যুদ্ধ করতো। ছোট ছোট দুইহাতে শক্ত করে জোয়াল ঠেলে বেড়ে উঠছিলো।

ছেলেটির সাথে মেয়েটির কিছুই মিলছে না। তারপরও তাদের মিলে গেলো। ছেলেটাও বদলে গেলো, মেয়েটাও বদলে গেলো। তারা হুট করে প্রেমে মজে গেলো। কী দেখেছিলো মেয়েটির চোখের তারায়, কী গন্ধ পেয়েছিলো ঘন অবিন্যস্ত চুলের গভীরে, ছেলেটা কাঙালের মতো দু'হাত বাড়িয়ে দিলো। মেয়েটিও কী জাদু দেখেছিলো ছেলেটির হাসিতে, কোথায় দুয়েকটা তারা-খসা আলো চলকে গেছে আকাশের পেয়ালা থেকে। তারা বুঝতেও পারলো না।

সেই বোকা বোকা ছেলেটি, সেই ছোটোখাটো মেয়েটি কোনোদিন এক হবে না। তাদের ভেতরে কোন শিশু জন্মাবে না। তাদের ভেতরের ভালোবাসাটুকু থির জমে থাকবে পদ্মপাতার জল হয়ে। তারপর, অনেক অনেক দিন পর, একদিন পৃথিবীর ঘূর্ণনে তারা ছিটকে ছিটকে হারিয়ে যাবে। তাদের সাথে ঘূর্ণিতে হারাবে চোখের জল, মনের হাহাকার। খালি করে দেয়া কফির টেবিল, গ্লাসের গায়ে দুয়েক ফোঁটা শিশিরও মুছে যাবে। তাদের জন্য আমার মন হু হু করবে, চোখে টলটলে দুয়েক ফোঁটা কুয়াশা জমা হবে। শাদা ক্যানভাস ফেলে আমি একলা হয়ে উঠে যাবো।

বৃহস্পতিবার, ১১ নভেম্বর, ২০১০

নগরাত্মিক


আমি যে শহরে বাস করি, সেখানে ফুটপাতে প্রায়ই পাগল পাওয়া যায়। আপনি যদি ভাবেন এটা উল্লেখযোগ্য কোন বিষয়ই নয়, তবে আপনি ভুল করবেন। পৃথিবীর আর কোথাও এমন বৈচিত্র্যময়, উদ্ভিন্ন পাগল আপনি ফুটপাতে ফুটপাতে বিজ্ঞাপিত হতে দেখবেন না। পৃথিবীর পথেঘাটে এভাবে তাদেরকে ছেড়ে রাখা হয় না। তারা মানব প্রজাতির অমূল্য সম্পদ, তাই তাদেরকে কড়া রক্ষণাবেক্ষণে রাখা হয়। প্রজাতিটির বর্তমান চালু নমুনাগুলো চায় না তাদের এই উন্নত জেনেটিক্স থেকে আরেকটি নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হোক। তাই তারা জননরোধী হয়ে উঠেছে, পাগলের মস্তিষ্কের জিন যেত প্রবাহিত হতে না পারে সকল পাগল-জরায়ু এবং অপাগল-জরায়ুতে, এজন্য তারা পাগলদের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখে।

সে যাক গে, যা বলছিলাম, আমার শহরে এমন কোন সতর্কতা নেয়া হয় নি। ভবিষ্যতেও হবেও না, মেয়রসাহেব সেদিন বললেন। তাই এখানে দেদারসে পাগল ঘুরে বেড়ায় রাস্তাঘাটে। বিভিন্ন আইল্যান্ডগুলোতে তারা ছাপড়া ঘর তুলবে কয়েক বছরের মধ্যেই - এমন চালু গুজব তাই ফুটপাত থেকে ঘোর তপ্ত বাতাসে মিশে পাক খাচ্ছে আজকাল। আমি বেশ পরিপাটি হয়ে রাস্তায় বেরুলে টের পাই বাতাসভর্তি গুজবগুলো আমার গালে ঠাশ ঠাশ করে চড় মারছে। মাঝে মাঝে আমাকে ল্যাঙ মেরে ফেলে দেয়ার চেষ্টাও করে, আমি সতর্ক থাকি। কিন্তু আমার শহরের মানুষগুলো তেমন একটা সতর্ক না, তারা প্রায়ই ল্যাঙ খেয়ে আছাড় খায় ফুটপাতের ওপর। অনেকে হন হন করে হাঁটার সময়ে ভুল করে, উড়ে গিয়ে পড়ে রাস্তার মাঝখানে। তখন কোনো এক পাগল চালক বিনা দ্বিধায় গাড়ির চাকাটা ওই মানুষটার পেটের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেয়। ভগ্ন পেট নিয়ে মানুষটা ল্যালব্যাল করে উঠে দাঁড়ালেও বেশিদিন টিকতে পারে না। আমরা অনেকে এই দৃশ্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলি, আরেকটা জননাঙ্গ কমে গেলো!

এর পরে আছে আরো নানারকমের বিপদ, আর বলবেন না। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় খালি ফুটপাতেই পাগল পাওয়া যায়, কিন্তু আসলে এই সব পাগলের পাগলামি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়েছে। এরা আমাদের দূর্বলতা বুঝে গেছে। বুঝে গেছে যে আমরা বেশ আত্মবিশ্বাসী। স্যুট টাই পরে আমাদের বুক গর্ব ও টাকার গরমে ফুলে ফুলে উঠছে। প্রতিদিন রাতে আমাদের বেশ ভালো জননকার্য এবং ঘুম মিলছে, তাই আমরা পরদিন সকাল সকাল জগিং করতে পারি। শরীরটাকে ফিট রাখতে আমরা কোনো ছাড় দেই না। তারপরে ঘরে ফিরে ফ্রেশ কমলার জ্যুস খাই আমরা। তারপরে সানস্ক্রিন মেখেটেখে ফিটফাট হয়ে বেরিয়ে পড়ি। পাগলের এতোকিছু কপালে জুটে না, তাই তারা তক্কে তক্কে জ্বলতে থাকে। হিংসাও করে আমাদের, ঈর্ষাও করে আমাদের। এই হিংসা, ঈর্ষা, জিঘাংসা মিলেমিশে একটা খিচুড়ি-ক্ষোভ তৈরি হয় তাদের। তারা মাঝে মাঝে আমাদেরকে ওভারব্রিজের ওপর থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। গাড়ি চালানোর সময়ে আমরা একটু বেখেয়াল হলেই এক্সেলেটর চেপে ধরে জোর করে আমাদের গাড়ি-দূর্ঘটনা ঘটায়। এরকম ঘটনা সারাদিন ক্রমশ বেড়েই চলেছে। তাই তো, শহরের বিখ্যাত দৈনিকটির পাতার পর পাতা ভরে থাকে এইসব খবরে। আমরা যারা ধাক্কা খাইনি, বা গাড়ি চালানোর সময়ে দূর্ঘটনায় পড়িনি, তারা আজকাল জগিং করে এসেই খবরের কাগজ ওল্টাই। ভয়ে আমাদের পেটের নাড়িভূঁড়ি সেঁধিয়ে যায়। ওই লোকটা বা সেই লোকটার জায়গায় আমিও থাকতে পারতাম, এটা ভেবে আমরা ভয় পাই।

আমাদের মাঝে আমি সহ অনেকেই এই খবর কাগজ পড়ার কাজটা টয়লেটে সারি। এই শুনুন, নাক সিঁটকাবেন না। প্রাতঃকালীন কর্মটিকে অবহেলা করবেন না। নিষ্কাশ না হলে খাওয়া দাওয়া ভালো হয় না, জানেন? নিয়মিত সেই কর্মটির সুবিধা করতে খবরের কাগজ বেশ উপাদেয় প্রভাবক। এটা আমাদের বৃহদান্ত্রকে ভয় পাইয়ে দেয়, ওই যে বলছিলাম - নাড়িভূঁড়ি সেঁধিয়ে যাওয়া, সেজন্যেই তো আমরা সুস্থ থাকতে পারি। ধাক্কা খেয়ে তিন তলা উঁচু ওভারব্রিজ থেকে পড়ে যাওয়া মানুষ বা রাস্তার ফুটপাতের পাশে দুমড়ে মুচড়ে থাকা টয়োটা গাড়ির চালকের জীবন আমাদের কাছে ইউসুফগুলের ভূষি হয়ে উঠেছে ইদানিং। আমরা খুশি হই, কিন্তু এটা ভুলে যাই যে পাগলেরা ধীরে ধীরে জিতে যাচ্ছে। কে বলেছে, "সহিংসতা নিরুপায়ের শেষ অস্ত্র"? আমি তো দেখছি, পাগলেরা সহিংসতার পিঠে লাগাম দিয়ে দিব্যি আমাদের কোণঠাসা করে ফেলছে।

আর গত কিছুদিন ধরে নতুন পদ্ধতি শুরু করেছে চালাক পাগল-গোষ্ঠী। রক্তারক্তির ঝামেলায় না গিয়ে তারা এখন ঢাকা শহরের আনাচে কানাচে ছিনতাই শুরু করেছে। যাবার সময়ে ওয়ালেটের পাশাপাশি তারা আমাদের সকল জরুরি কাগজ, আর গোপন খবর নিয়ে চলে যাচ্ছে। আমরা এমন দুয়েকটা বিছিন্ন ঘটনায় খুব একটা বিচলিত হই নি। উটকো সন্ত্রাস ভেবে উড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু একদিন হুট করে দেখা গেলো, ছিনতাই হওয়া লোকটা পাগলের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম (এখানে তার পরিচয় প্রকাশ করছি না)। জানতে পারলাম তিনি গত সপ্তাহের রবিবার রাতে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলেন। শহরের খুব দামি এলাকায দিয়ে ফেরার সময় তার ছিনতাই ঘটেছে। কয়েকজন দুরাত্মা তার মানিব্যাগ, ব্রিফকেইস এবং মুখের চামড়া তুলে নিয়ে চলে গেছেন। নাঃ, ভয় পাবেন না, শিউরে উঠবেন না। মানিব্যাগ আর ব্রিফকেইসটাই দুশ্চিন্তার কারণ, চামড়া তো দুয়েকদিন গেলেই আবার গজিয়ে ওঠে। (আশ্চর্য হবার কিছু নেই, এটাই এখানে প্রথা)।

তো, যা বলছিলাম, রবিবার রাতে ছিনতাই হলেন তিনি। বাড়ি ফিরলেন ক্লান্ত বিধ্বস্ত অবস্থায়, তার স্ত্রীটিকে দেখা গেলো বেশ ব্যস্ত হয়ে তার পরিচর্যা শুরু করতে। মানিব্যাগ ও ব্রিফকেইসের শোকে তিনি তখন মৃতপ্রায়। ধীরে ধীরে স্ত্রীর উৎকণ্ঠার সামনে পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন। মানসিক যন্ত্রণার প্রকোপে কেঁদেই ফেললেন প্রায়, স্ত্রীটিও ব্যাকুল হয়ে তাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলেন, "কেঁদো না লক্ষ্মীটি, সব ঠিক হয়ে যাবে"। চামড়াহীন মুখে জর্জেটের শাড়ি ঘষা লাগছিলো, লোকটির আর সহ্য হলো না, "ছাই ঠিক হবে, মুখপুড়ি। চুপ কর্‌! তুই ক্যামনে জানিস আমার কতো ক্ষতি হলো?" স্ত্রীটি বেশ থতোমতো খেয়ে গেলেন, চুপ করে উঠে গেলেন। যাবার আগে লোকটির ঘরের দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে গেলেন। সে রাতটি তারা দুজনেই সঙ্গমহীন কাটালেন। আমিসহ বাকিরা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, আরেকটি বন্ধ্যা রাত কেটে গেলো।

সোমবার পেরিয়ে মঙ্গলবার পর্যন্ত লোকটির চামড়া ঠিক হয়ে এলো, সেই সাথে মনের গভীরের ভয়টুকু কমে আসতে লাগলো। ইনস্যুরেন্স থেকে তার ব্রিফকেইসের কাগজপাতি উদ্ধার করতে পারলেন, ভাগ্যি সবকিছু ব্যাকআপ রাখা ছিলো! মানিব্যাগের শোক সহজে সারার না, তাই সেই শোক মনে চেপেই তিনি শহরের বিখ্যাত বারে রাত একটা পর্যন্ত মদে চুর হয়ে রইলেন। স্ত্রীটির কাজ এই সময়ে বেড়ে গেলো, রাত দুটোর দিকে দেখা গেলো তিনি বার থেকে মদে ঢুলু ঢুলু স্বামীটিকে টেনে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। বাড়ি নিয়ে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছেন। উবু হয়ে জুতো ও মোজা খুলে দিচ্ছেন, টাই খুলছেন ও হাত ঘড়িটিও খুলছেন। এসব খুলতে খুলতে তার থরো থরো হাত ও বুক আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই। আমাদের ভালো লাগে, "আহা, কতোই না পতিব্রতা স্ত্রী! ব্যাটার আসলেই রাজভাগ্যি।"

হঠাৎই শুক্রবার নাগাদ ছিনতাইকারী পাগলদের পুরো চক্রান্ত লোকটি বুঝতে পারলেন। টের পেলেন যে কেবল ছিনতাই করেই তারা ক্ষান্ত হয় নি, আরো বড়ো ক্ষতি ঘটে গেছে তার। সেদিন আর সব শুক্রবারের মতোই তিনি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছিলেন। জগিং সেরে এসে কমলার জ্যুস খেয়েছেন। তারপরে খবরের কাগজখানা বাগিয়ে টয়লেটে ঢুকে গেছেন। পাগলদের হাতে মানুষের হত্যার খবর পড়তে পড়তে চুক চুক শব্দও করে থাকবেন হয়তো! তারপর "আমি একটু বাইরে থেকে আসছি" বলে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছেন। সারাদিন তিনি বেশ কিছু জায়গায় গেছেন, যেগুলোর বিবরণ আমরা জোগাড় করতে পারি নি।

সন্ধ্যার পরে তাকে আমরা দেখতে পেলাম সেই বারে বসে আয়েশ করে মদ গিলছেন। আমরা ভাবলাম, এখন প্রায় ঘন্টা কয়েকের জন্যে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি আর কোথাও যাবেন না, এখানেই রাত একটা পর্যন্ত মদ খাবেন। আমাদের অনুমান ভুল হয় নি, রাত একটার দিকেই দেখা গেলো তার স্ত্রীটি আবার তাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা দেখি ফাঁকা ফাঁকা রাস্তাটা ফটাস করে দুই খণ্ড হয়ে গেলো, যেন নীলনদ। আমরা দেখি মাথার ওপরে জ্বলতে থাকে স্ট্রীট লাইটগুলো আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, সেই আলোতে স্ত্রীটিকে আমরা চিনতে পারি না। আমাদের ভুল হয়, আমরা মনে করি কাঠের স্বামীকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

রাত বিড়ির মতো দ্রুত শেষ হয়ে আসে। আর গিসগিস করতে থাকা শহরে একটু পরে বিড়ির মোথার মতো রাতের শেষ পরশটুকু পড়ে থাকে। শনিবার আরো একটা ছুটির দিন হয়ে খুব কষ্ট করে জেগে উঠতে থাকে, আমি হঠাৎ টের পাই যে পাগলেরা রাতে ঘুমায় নি। আমরা খুব নিশ্চিন্তে দরজায় খিল দিয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম, আর পাগলরা সারা রাত জেগে ছিলো ফুটপাতে ফুটপাতে। তাদের জন্য আমার কেন জানি সেই সকালে একটু মায়া হয়। যুদ্ধে প্রতিপক্ষের প্রতি মায়া দেখানো একেবারেই নিষিদ্ধ, তবু আমি চুরি করে একটু মায়া দেখাই। এক পলকের জন্য ভুলে যাই যে এরা আমাদের শত্রু। হঠাৎ চোখে পড়ে, সেই বিখ্যাত বারের পেছনের দরজার কাছে একটা শরীর দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে। শরীরটি যে বেশ ব্যায়াম করে নিয়মিতই, তা বুঝতে পারি। আরো বুঝতে পারি, সেটি কোন পাগল নয়। পরিপাটি শার্ট, ঢিলে না হওয়া টাইয়ের কোনা দেখা যায়, প্যান্টখানাও নিপাট। দোকানের লোকগুলো ঘুমুচ্ছে হয়তো এখনো। তাই আমার কৌতূহল বাড়তে থাকে। চেহারাটা দেখতে পারছি না, শরীর উল্টে পড়ে আছে অ-পাগল।

আরো প্রায় ঘন্টাখানেক পরে লোকটির ঘুম ভাঙলো। যেন অচৈতন্য থেকে সে একটু একটু করে জেগে উঠছে। হাত পেঁচিয়ে সোজা হয়ে উঠে বসতেই দেখতে পেলাম আমাদের ছিনতাই হয়ে যাওয়া লোকের মুখ। হুবহু একই চোখ, একই চোয়াল, একই এলোমেলো হয়ে থাকা চুল। চমক ভাঙতে না ভাঙতেই বুঝতে পারলাম গত রাতে এই লোকটি বাসায় ফেরে নি। গত রাতে সে এই বারের পেছনের দরজার বাইরে অচেতন হয়ে পড়ে ছিলো। আমিসহ আমাদের ঘাড়ের রোম দাঁড়িয়ে যায়। এটা আমাদের সতর্কতার পূর্বাবস্থা। খুব তাড়াতাড়ি বিষয়টা বুঝে গেলাম বলে আমি বাকিদের সাথে বেশ উত্তেজিত স্বরে কথা বলতে শুরু করি। তাদের বুঝাতে চেষ্টা করি যে এক গভীর ষড়যন্ত্র ঘটে গেছে রাতের আধারে। আমাদের শহরের পাগলেরা একটা বিরাট চাল চেলেছে, একই চালে তারা আমাদের ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। এখনই সময় আমাদের সতর্ক হওয়ার!

মানুষের দলের আমাদের মাঝে অনেকেই আমার কথা মানতে পারলো না। আমি যে অবিশ্বাস্য কথা বলছি, আমি যে উদ্ভট কথা বলছি সে বিষয়ে অনেকেই তখন নিঃসন্দেহ। তাদের চোখে আমার আচরণ কিছুটা অপ্রকৃতস্থ বলে মনে হচ্ছে -- এই কথাও ব্যক্ত করলো কেউ কেউ। আমি অসহায় বোধ করলাম। পাগলদের সাথে যুদ্ধে আমরা হেরে যাবো, এই ভবিষ্যতের আশঙ্কায় আমার বিপন্নতা বেড়ে গেলো। আমি জোরে জোরে চিৎকার করে বলতে লাগলাম কী বিপর্যয় ঘটে গেছে। দিনের আলোর মতো পরিষ্কার ব্যাপারটা, তাও কেউ কেন বুঝতে চাইছে না? আশ্চর্য!

তারা খুব দ্রুত একটা সভা করে নিলো আমার অভিযোগ নিয়ে। বর্তমান পরিস্থিতি যাচাই করে আমাদের নেতারা বললেন প্রমাণবিহীন এই অভিযোগ সত্যি হবার সম্ভাবনা খুবই কম। বলতে গেলে নগণ্য। তাই আমার এই অতি-আশঙ্কা, এই অতিকল্পনার কোন ভিত্তি নেই। আমি যে এমন পাগলের মতো আচরণ করছি, এটাই এক ধরণের অসুখ। পাগল হয়ে যাবার আগে এরকম উপসর্গ দেখা দেয়। এই শহরে এরকম সময়ে কোন চিকিৎসা হয় না বললেই চলে। উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে কতোজনেই তো পাগল হয়ে গেলো এভাবে! তাই সভাসদরা ঠিক করলেন আমাকে অতিসত্ত্বর বিদেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। এই শহরে পঁচে পঁচে পাগল হয়ে যাবার আগেই আমার বিদেশে চলে যাওয়া উচিত। সেখানে চিকিৎসালয় আছে। বিশাল সুরম্য অট্টালিকাগুলোকে চিকিৎসালয় বানিয়ে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে পাগলদের চিকিৎসা করা হয়। তাদের ঘুমের বড়ি খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। এখানে থাকলে আমাকে সারা রাত জেগে থাকতে হবে, আমি আর সুস্থদের মতো রাতে ঘুমুতেই পারবো না। তারপরে একদিন পাগল হয়ে ফুটপাত ঘেঁষে রাত কাটাবো।

আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা আমার ভালো চান। তাই আমি মুখ বুঁজে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। চোখের সামনের দৃশ্যগুলো হঠাৎ আমার কাছে সিনেমার পর্দার মতো মনে হয়, ত্রিমাত্রিক মানুষগুলোকে চ্যাপ্টা লাগে, সামনের টেবিল চেয়ারগুলোকে মনে হয় দেয়ালে এঁকে রেখেছে কেউ। সিনেমার মতোই তারা মাথা নাড়ে, ঘন ঘন হাত উঁচিয়ে ঘড়ি দেখে। তারপরে নিজেরা নিজেরা ফিসফিস করে কী কী যেন বলে, আমাদের দিকে তাকিয়ে পেশাদার হাসি দেয়। কাগজের খসখসাখস শুনতে পাই।

আমার চোখে কোন একটা সমস্যা হয়েছে মনে হয়। ঠিক এই দৃশ্যগুলোর ভেতর দিয়েও আমি লোকটিকে দেখতে পাই। বারের পেছনের দরজার কাছে এলোমেলো পড়ে থাকতে দেখা লোকটিকে না, গতরাতে যে লোকটি স্ত্রীয়ের কাঁধে চেপে চলে গেছে সেই লোকটিকে দেখি। দেখতে পাই গত রাতেও তার স্ত্রীটি তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে, তারপরে জুতো ও মোজা খুলে দিয়েছে। সারা রাত লোকটি ঘুমায় নি যদিও, চোখ বুঝে পড়ে ছিলো (আমি নিশ্চিত)। তারপরে সকালে উঠে ঠিকঠাক অভিনয় শুরু করে দিয়েছে।

আমার সামনের সিনেমার দৃশ্যে আটকে থাকা মানুষেরা বিস্মিত হয়ে দেখলেন যে আমি চেয়ার বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটু একটু মাথা দোলাচ্ছি, আর পাগলের মতো হা হা হা করে হাসছি!

বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১০

পাখি মন্ত্রণা

আর কতোকিছুই তো ভালো লাগে কাঁপনে মিশে থাকে এইসব দিনরাত্রির গান অজস্র কোলাহল আন্তরিক টানটান হলাহল ডুবে থাকে চুলের ভেতর, মৃদু সৌরভ…

আমাকে প্রায়ই অনেকে জিজ্ঞাসা করে, আমি কেমন আছি। আমি খুব সরলমুখে বলে দেই, আমি ভালো আছি; অথবা বলি, এই তো চলতেছে; কিংবা বলে ফেলি, ভালোই আছি। এরকম বেশ কিছু টেমপ্লেট জবাব তৈরি থাকে – বলে ফেলতে এক মুহূর্তও দেরি হয় না। তারপর ভুলে যাই, অন্য বিষয়ে চলে যাই। তাকেও হয়তো পাল্টা জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সেও ভালো থাকার কথা জানিয়ে দেয়। আমরা দুইজনেই তখন ভালো থাকতে থাকতে অন্যান্য জাগতিক বিষয়ে আলাপ করি। আমাদের তুচ্ছ ভালো লাগার চাইতে এইসব মানুষিক ব্যাপার অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

ঠিক সেই মুহূর্তে হয়তো কোথাও বাজ পড়ে। হয়তো কোন একটা গাছের ডাল মড়মড় করে ভেঙে পড়ে, ডালের খাঁজে বাসা বেঁধেছিলো কোন খয়েরি পাখি, বাসার ভেতরে ছিলো তিন চারটে নতুন শিশু পাখি। ডাল ভেঙে যখন মাটিতে নেমে আসে, পাখিগুলো উড়ে চলে যায়… দূরে, অনেক অনেক দূরে…! এই পাখিরাও ভালো থাকে হয়তো, আমার সাথে যদি দেখা হতো, তাহলে আমি তাদের প্রথমেই জিজ্ঞেস করতাম, কেমন আছেন? তারা স্মিতমুখে বলতো, ভালো আছি। আপনার কী খবর? আমি হাতে একটু ভঙ্গি করে বলতাম, ‘এই তো চলতেছে’।

পাখিগুলো মারা গেছেন সবাই। মৃতের সরকারি সংখ্যা ৪, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকটি ডালে বসবাসকারী পাখি জানিয়েছেন, প্রকৃত সংখ্যা ৫। সরকার একটি পাখির মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে নাই। তারা মনে হয় ভুলে গেছে গুনতে। আমি তাদের ভুল ধরিয়ে দেবার জন্যে মৃত-পাখি-হিসাব মন্ত্রণালয়ে ফোন দিলাম। অনেকক্ষণ রিং হচ্ছিলো, কিন্তু কেউ ধরছিলো না। ঘাম-শুকানো দুপুরে আমি চাতালের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে কানে রিসিভার চেপে ধরে রাখলাম। একঘেঁয়ে স্বরে রিং বাজছে, ট্রিং ট্রিং…

এভাবে অনেকক্ষণ, জানি না ঠিক কতোক্ষণ, রিং বাজার পরে একজন ফোন ওঠালেন। আমি চমকে গেলাম, কানের ভেতরে বাজতে থাকা ট্রিং ট্রিং ততোক্ষণে মাথার ভেতর বাজতে শুরু করেছে। সেই বাজনায় চকিত ছন্দপতন। ‘হ্যালো’, খ্যানখ্যানে স্বর শুনে একটু দমে গেলাম। আমি ফোন করেছি সরকারি হিসাবের ভুল ধরতে। যে লোকটি ফোন ধরেছে সে একজন সরকারি কর্মকর্তা। আমি পরিষ্কার দেখছিলাম লোকটা পেটমোটা কুমড়োপটাশের মতো। একটু আগে দুপুরে ভাত খেয়ে এসেছে, সাথে ঝোল ঝোল তরকারি আর সবজি ছিলো। ভাত খেয়ে মোড়ের দোকান থেকে একটা পান কিনেছে। পান চিবাতে চিবাতে এসে আয়েশ করে চেয়ারে বসে ফোন ধরেই গলা খাকারি দিয়েছে, ‘হ্যালো’। মৃত-পাখি-হিসাব মন্ত্রণালয়ে তেমন কাজ নেই বোধহয়! তাই তারা এতো ঢিলাঢালা।

আমি বললাম, ‘আমি আপনাদের ডিপার্টমেন্টের একটা ভুল রিপোর্ট নিয়ে ফোন করেছি’, একটু থেমে আবার বলি, ‘গতকাল খবরে মৃত পাখির সংখ্যা ভুল বলেছেন আপনারা, আসলে মোট ৫টা পাখি মারা গেছেন – আপনারা লিখেছেন ৪টা। একটা পাখির হিসাব দেন নি’। লোকটা বোধহয় একটু অবাক হয়ে গেছে, পান চিবানোর শব্দ পেলাম না, বরং দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে সে বলল, ‘হতে পারে একটা পাখির হিসাব মিলে নাই। তাতে কি হইছে? গাছের ডালে পাখির বাসা, বাজ পড়ে পাখি মরছে, আপনের কি?’


তার তীব্র স্বরে আমি মারা গেলাম। প্রশ্নটা অশ্লীল লাগছে। প্রশ্ন করার ফাঁকে তার দাঁত চিবানো বা পান চিবানো অশ্লীল লাগছে। রিসিভার বেয়ে কানে পৌঁছে যাওয়া তার কণ্ঠস্বর অশ্লীলতায় থকথক করছে। আমি যে হাতে রিসিভার ধরে ছিলাম, সেই হাতটাকে কোনো ঘিনঘিনে কমোডের ভেতরে ডুবিয়ে রেখেছি বলে মনে হচ্ছে। কিছুক্ষণ এই প্রবল অনুভূতিগুলো আমাকে মূক করে রাখলো। টেলিফোন সেটটায় কি কোন সমস্যা আছে? লোকটা ফোন ধরার আগে কানে ট্রিং ট্রিং প্রতিধ্বনি হচ্ছিলো। আর এখন তার শেষ প্রশ্নটা গনগন করছে কানের ভেতর।

‘গাছের ডালে পাখির বাসা, বাজ পড়ে পাখি মরছে, আপনের কি?’

‘বাজ পড়ে পাখি মরছে, আপনের কি?’

‘আপনের কি?’

‘কি?’

আমি একদম নিথর হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। বাইরে স্তব্ধ দুপুর আর ঘোলাটে হলদে আলোটা অনেকটা সময় আমার সাথে স্থির হয়ে থাকলো। তারপরে প্রশ্নটা আমার ফুসফুসে পৌঁছে গেলে আমি রিসিভার আলতো করে নামিয়ে রাখলাম। তারপরে চুপ করে বসে রইলাম। পাখিটি মারা গেছেন। পাখিটি বাজ পড়ে গতকাল মারা গেছেন। আজকে মৃত-পাখি-হিসাব মন্ত্রণালয় তাকে ভুল হিসাব করে গোনায় ধরে নি। পাখিটি ডালের ফাঁকে পাতার গভীরে শুয়ে আছে। তার পেলব বুকে একটা স্পন্দনও আর বাকি নেই। কয়েকটা সবুজ পাতা পুড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। আরো কিছু পাতা এখনও সবুজ হয়ে আছে।

হঠাৎ কেমন বাতাস হলো, মৃদুমন্দ শিহরণ। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম সবুজ পাতা কয়টি পাখির স্পন্দনহীন দেহটিকে ঢেকে দিচ্ছে ধীরে ধীরে।

*****

১৪.১০.১০

রবিবার, ২২ আগস্ট, ২০১০

স্মৃতিবিমুখ, প্রমুখ মুখ

চিলতে রোদে পাখনা ডুবাই, মুচকি হাসে শহরতলি
রোজ সকালে পড়ছে মনে, এই কথাটা কেমনে বলি?


- “বল, জোরে জোরে বল, ক’য়ে আ-কারে কা, ম’য়ে আ-কারে মা, ন — কামান”
ওপাশে খানিক নিশ্চুপ বিরতি, তার চোখের দৃষ্টি ফ্যালফ্যালে। বোবা।
- “কি হলো? চুপ করে আছিস কেন? কি বললাম, পড়্‌!”

ফ্যালফ্যালে চোখের সামনে শক্ত ঝুঁটি ঝলসে ওঠে। সেই সাথে ঝলসে ওঠে বছর দশ বয়েসী কোমল ধবল হাত। হাতের মুঠোয় ধরা বরইয়ের ডাল নেমে আসে ফ্রকের প্রান্তে। ফ্রকটার বয়েসও মাত্র সাত কিংবা আট। আসলে ফ্রকের নয়, ফ্রক-পরিহিতার। আমাদের সামনে চিরন্তন ফ্রেমে আটকে প্রাগৈতিহাসিক হয়ে উঠতে থাকে দৃশ্যটা। ঝুঁটিবাঁধা মেয়েটার হাতে একটু একটু মার খায় সামনে বসা আরেকটা মেয়ে। ওই মার খাওয়া মেয়েটার কোন দোষ নেই। ওর সামনে খোলা প্লাস্টিকের রঙজ্বলা বই, সেই বইয়ের একটা অক্ষরও সে বুঝতে পারে না। ‘কামান’ শব্দটা সে আগেও শুনেছে। এই তো সেদিন রাতে সবাই গোল হয়ে বসে টিভিটার সামনে। সেখানে শিঙার ফুঁকের সুরে নাটক শুরু হয়েছিলো। সেই নাটকে শুনেছে, “কামান দাগো!” তারপরে টিভির পর্দায় খালি ধোঁয়া ধোঁয়া, আর জোরে একটা শব্দ হয়েছে, দুড়ুম! ঐ কালো কালো নল দিয়ে ধোঁয়া বের হয়ে টিভির পর্দা সাদা করে দিয়েছিলো। মেয়েটার মনে হয় এই ধোঁয়া হয়তো বসার ঘরটাকেও ঢেকে ফেলবে।

তাই আজকে দুপুরে শুনশান ব্যালকনিতে ওর আপুর হাতে ধরা বরইয়ের ডাল যখন সপ সপ করে নেমে আসে, মেয়েটা খুবই অবাক হয়ে যায়! আপু তাকে মারছে কেন! সে কি কোন দোষ করেছে? বা কোন ভুল করেছে? নাহ। ও তো ভাবছিলো কামানের নল, ধোঁয়া আর টিভিটার কথা। আপুর মারগুলো ওর হাঁটুর নিচে এসে পড়ছে আর ওর বুকের ভেতরে গুম গুম করে উঠছে। এক হাত দিয়ে অন্য পায়ের আঙুল চেপে ধরে মেয়েটা চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করে। আমার তৈরি করা ফ্রেমটা গলে অতলান্তিক হয়ে যায়!

সেদিন বিকেলে ওদের শহরতলিতে বড়ো বড়ো কামান আসে। বরইয়ের ডালটা এলোমেলো করে দিয়ে খটাখট বুটের শব্দ উঠে আসে। ওদের বাসা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়! মেয়েটা দৌড়ে বাসার পেছনে কুয়োর ভেতরে লুকায়। ওকে দুদ্দাড় করে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো ওর আপুটাই। তারপরে একটা কচুরির ঢিপি মাথায় চাপিয়ে কুয়োর ভেতরে নামিয়ে দিয়েছিলো।


কুয়োর ভেতরে মেয়েটা বসে ছিলো সন্ধ্যা অব্দি। তারপরে কুয়োর বাইরে লাল লাল আগুন জ্বলে উঠলে ও বেরিয়ে দেখে ওদের বাসার জানালার পর্দাগুলো পুড়ছে। সেদিন থেকে মেয়েটা পুড়ে গেছে ভেতরে ভেতরে। আজ সকালে, এতোগুলো বছর পরে সেই মেয়েটি মারা গেছে। গত তিন বছর সে অ্যালঝেইমারে ভুগছিলো। স্মৃতি কুরে কুরে খেয়ে ফেলেছিলো স-ও-ব। মাথার ভেতরে কী এক কীট ছিলো তার, কেউ কি পুরে দিয়েছিলো? তারপরে হঠাৎই আজ সকালে, যখন একটু একটু করে আলো ফুটছে, তখন সে মশারির ভেতরে যেন সব ফিরে পেলো। আমি পাশে বসে ছিলাম। মশারির ভেতর থেকে কাঁপা কাঁপা একটা হাত বেরিয়ে এলো – রুগ্ন, থরথরে। নিঃশ্বাস নিতেও যার কষ্ট হয়, সে হঠাৎ যেন কী অসুরিক জোর পেয়ে গেলো! আমার হাতের আঙুল জোরে আঁকড়ে ধরে এক দমে বলে উঠলো,
- “বাবু, বাবু! বল তো, জোরে জোরে বল, ক’য়ে আ-কারে কা, ম’য়ে আ-কারে মা, ন — কামান”



*****
- অনীক আন্দালিব
২২.৮.১০

সোমবার, ১২ জুলাই, ২০১০

একটি প্রাকৃতিক রাত

নরম শয়ানে শুয়েছি ঘাসের ওপর, একটু আগে বৃষ্টি ঝরেছে অসাধারণ নিয়মে, তারপর সেখানে গুল্মের ভাঁজে জন্মেছে লজ্জাবতী। আমি শুয়েছি সেখানে উড়েছে সূর্যালোকে সবুজ ঘাসেরা, তারা খুশি মনে তোমার কাছে চলে গেছে। যেখানে তুমি আছো সেখানে সকলই আছে অথচ আমি নেই, আমার এখানে তুমি একটু একটু করে নেই হয়ে গেছো অসময়েই...

তারপর অনেকদিন আমাদের কথা হবে না, বুকের ভেতরে যে স্বরগ্রন্থির বাস, তারা ভুলে যাবে জিহ্বার পথ, ঠিকানা ওষ্ঠের। চোখের কিনারে জমে উঠবে প্রগাঢ় প্রয়াত দিন, সূর্যের রঙ। সন্ধ্যার আকাশে ধীরে শুয়ে পড়বে তুমি রৌদ্রহীন, আর আমি সেদিকে তাকিয়ে থাকলেও আমাদের কথা হবে না আরো আরো কয়েক সহস্র রাত

প্রোলগঃ
সেতুগুলো যেদিন সৃষ্টি হলো, সেদিন অনেকগুলো জোনাকি নদীর কিনারে আত্মহুতি দিয়েছিলো অমিত শোকের কাঁথায় চড়ে। আমি ঘটনাক্রমে সেদিনও সেখানে ছিলাম, জোনাকিরা একে একে ডুবে গেলে দেখলাম নদীর শান্ত জলে মৃতদেহ মৃদু ঢেউ তুলে চলে যাচ্ছে অতলে। দু'হাত জুড়ে ঝাঁপ দিলাম ডুবন্ত খড় ও বুদবুদের সাথে। ঘন কালো শ্যাওলার চোখে এমন অদ্ভুত রোদ সে'রাতে দেখেছি, তারপর পুড়ে গেছে আস্তিনের রাগ, বিবিধ প্রবল ক্রোধ। ছিঁড়ে গেছে যোগাযোগের সেতু -- অথচ আমার থেকেও অনেক অনেক উপরে জমে ছিলো ঘনোজল, তারও ওপরে উবু হয়ে জেগে ছিলো সেতুগুলো, চলাচলকারী চাঁদ ও জ্যোৎস্না!

বুধবার, ৭ জুলাই, ২০১০

দূরের নগরে দু'জন

Our life always expresses the result of our dominant thoughts.

- Søren Kierkegaard


সকালে উঠে মনে হয়েছিলো দিন খারাপ যাবে। নির্জলা দুপুরে ঘুঘু যেমন টেনে একঘেঁয়ে স্বরে ডাকতে থাকে সেভাবে মনের ভেতরে কোন্‌ এক পাখি মৃদু অথচ দীর্ঘ সময় ডেকে চললো - কুউউউ কুউউউ। সেই ডাকের তাল কাটাতে রাহাত খুব জোরে জোরে দাত মাজে। ব্রাশটা নতুন, তাই বেশি জোরে ঘষার কারণে মাড়িতে ব্যথা লাগলে থু করে থুতু ফেলে সে, আর দেখে গোলাপি রঙের থুতুতে বেসিন ভরে উঠছে। নিজে নিজে এমন অযথা রক্তপাতে মনের কুউউউ ডাকটা আবার ভুস করে জেগে ওঠে। আজকের দিনটা খারাপ যাবে... হয়তো। কিংবা আজকের দিনটা হয়তো খারাপ যাবে না।


এই ঘনঘোর ঘুমুটে সকালে বৃষ্টি নামলো। আজ এমন ঘটনায় এখন আর কিছুতেই মন লাগছে না। আজ তাই গল্প বুননের দিন। শুকনো রাস্তার ধুলোর জমিনে যখন প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা খুব দ্রুত আছড়ে পড়ে, যেমন দলবল নিয়ে ধুলোদের সাথে অসম যুদ্ধ শুরু হয় তার, তেমনি সেই যুদ্ধের মুগ্ধ মূক দর্শক হয়ে থাকি আমরা। তারপরে তাদের এই খেলার মাঝেই আমাদের মনে পড়ে আমরা বৃষ্টি বা ধুলো নই, তখন আমরা মৃদুশ্বাস ফেলে মুখ ফিরিয়ে নেই বৃষ্টির ঘোলা শরীর থেকে। তখন আমরা গল্প বুনি। রাহাতও আমাদের মতোন।


রাহাতের আজকে অনেকগুলো কাজ সারতে হবে সারাদিনে। শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে সেই লিস্টিটা আরেকবার ঠিক করে নেয়। আর ভাবতে গিয়ে তার বোতাম লাগানোতে ভুল হয়। আয়নায় তাকিয়ে দেখে শার্টটা রাতের মশারি হয়ে গেছে। মাথা ডানে-বামে অল্প ঝাঁকুনি দিয়ে আবার বোতামগুলো খুলতে খুলতে তার মনে পড়ে ছোটবেলায় মা এভাবে বোতাম লাগিয়ে দিতেন। মায়ের কখনো ভুল হতো না। তারপরে মা বাম হাতে তার দু'গাল ধরে চুল আঁচড়ে দিতেন। মায়ের কথা মনে পড়লে রাহাতের হাতদুটো আবার একটু মন্থর হয়। বোতামগুলো যখন একটা একটা করে ঠিক ঠিক ঘাটে বসে যাচ্ছিলো তখন রাহাতের মনে হয় সে মায়ের গায়ের গন্ধ পেলো। তারও খানিক পরে রাহাত যখন রিকশায় করে বাসার গলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তায় পড়লো, তখন দেখা যাবে সে মোবাইলে সারিতার সাথে কথা বলছে।


সারিতার সাথে রাহাতের সম্পর্ক নিয়ে আপনার আপাত-কৌতূহল আর আমার পূর্বানুমান সবই ঠিক। আমি সেখানে কোন ভণিতা করবো না, অভাবনীয় কিছু বলবো না। এই গিজগিজে শহরে যখন আমরা বাসে বা টেম্পোতে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে থাকি তখন আমাদের মাঝে বহুবিধ সম্পর্কের শেকড় গজিয়ে যায়। আবার সেই ভ্রমণ শেষে সুতোর মতো শেকড়গুলো কচ্‌ করে কেটে দেই আমরা। আর নির্বিকারভাবে অন্য কারো সাথে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ফুটপাত দিয়ে চলতে থাকি। অনেক সময় ফুটপাতে এপিটাফের মতো সারি সারি হকারদের পসরা মাড়িয়ে দেই, "সরি" বলি, বা আমাদের ততোটা বিলাসিতার সুযোগ বা ইচ্ছা থাকে না। তাই আমরা এরকম সম্পর্কগুলো নিয়ে ভাবিত নই। সারিতার সাথে রাহাতের সম্পর্কের স্বরূপও তেমনি - জেনে রাখা ভালো, তবে জরুরি নয়; গ্রাহ্য করা দরকারি, তবে অমোচনীয় নয়।


এই জনমুখর নগরে রাহাতের সাথে সারিতার দেখা হয়ে যায়। খুব প্রাকৃতিক নিয়মে তারা এক অফিসে চাকরি করে। রাহাত যেখানে গত বছর দেড়েক ধরে এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, সেখানে সারিতা জয়েন করে এই তো সেদিনই। গল্পের গরু যেহেতু গাছেই উঠতে চাইছে, তাই সারিতা ছয় মাসের প্রোবেশনে চাকরিটা পায়। সেই প্রোবেশন দেখাশোনার ভার পড়ে রাহাতের হাতে। তাই ছয় মাস পরে যখন চাকরির মেয়াদ ও স্থায়ীত্ব পাকা হয়, রাহাতের নিজেকে হালকা লাগে। হাতে ধরে রাখা সারিতার প্রোবেশনের ভার সরে যাওয়াতে হাত খালি লাগে। বুক খালি লাগে। এমনকি মাথাও খালি খালি লাগতে থাকে। রাহাতের শার্টের বোতাম লাগানোর ভুল বেড়ে যায়। সারিতা কোন ডাক্তার নয়, তবুও তার কাছেই রাহাত জানায়, এই ভারহীনতার অসহায়তা। সারিতার পক্ষ থেকে সেই মুহূর্তে যথেষ্ট সাড়া পাওয়া গেলো। জানা গেলো অফিসের এই ছয় মাসে তারও বস হিসেবে রাহাতকে খুব ভালো লেগেছে। ভারসাম্যহীনতার দোলাচলে সেই বসের আসন থেকে ভালো লাগার আসনে রাহাতের বসাটা ঠিক হবে কি না, সেটা তখনও অস্পষ্ট থাকে।


বেলা গড়িয়ে দুপুর হলে ঘুমুটে নগরে আলো জেগে ওঠে। ঠিক সেভাবেই রাহাতের ঘুম কেটে যায়। চোখ খুলে দেখতে পায় সারিতার সাথে সেতুবন্ধ ঠিক সেভাবে গড়ে উঠে নাই।


যদি আমরা আরো একটু ভালোভাবে খেয়াল করি, দেখা যায় গরম কফির ধোঁয়ার মতোই উড়ে বেড়াচ্ছে তাদের ভালো লাগা। জমাট বেঁধে ঠিকমতো 'ভালোবাসা' নামক আইডিয়া হতে পারছে না। প্রায়ই রাহাত বা সারিতা ফুঁ মেরে ধোঁয়ার রেখাগুলো আরো এলোমেলো করে দিচ্ছে! মধ্যে বেশ কিছুদিন এই ফুৎকারের জোরে ধোঁয়াগুলো হারিয়েই যেতে বসেছিলো। তাই আজকে সারিতাই নিজের উদ্যোগে দেখা করবে বলছিলো, "শুনো, কালকে তুমি কখন ফ্রি আছো?"। রাহাত খুব সহজেই দুপুরের সময়টা ফ্রি করে ফেলে, "দুপুরে শাহবাগে আসো। আমি ওর আশেপাশেই থাকবো"। সারাদিনের সব কাজের মাঝে সারিতার সাথে দেখা হবার ব্যাপারটা তার ভালো লাগে। শাহবাগের পেটের ভেতর মাটির নিচে দোকানটা তার এবং সারিতার ভালো লাগে। ভীড়ভাট্টার শহরে এর চাইতে নিবিড় আর একইসঙ্গে সরগরম জায়গা হয় কম, থাকলেও তাদের সামর্থ্যের বাইরে।


দুপুরে গিয়ে সকালের বৃষ্টি মন খারাপ করে ফেলে। সেই মন খারাপের কাটাকাটিতে গুমোট রোদ ওঠে। রোদের সাথে জবজবে গরম যেন পিচের রাস্তা আর বাস-টেম্পোর শরীর থেকে ঠিকরে বেরুতে থাকে। রাহাত যখন শাহবাগের ফুটপাত দ্রুত হেঁটে পেরিয়ে এসে দোকানটায় ঢুকে পড়লো, তখন তার ঘড়িতে দু'টা বাজে। দোকানটাকে তার কাছে সবুজ কোন গুহার মতো মনে হয়। সরু সিঁড়ির দু'পাশে দেয়ালে সবুজ রঙ করা, সিঁড়ির ওপর কার্পেট দেয়া যেটা বহু পায়ের চাপে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে। রাহাত মাথা নিচু করে নেমে আসে, সামনে ঝকঝকে ম্লান সারিতা বসে আছে।


দেখা হলে প্রেমিক প্রেমিকারা কী কী কথা বলে? কেমন করে তাকায়? তারা কি দুই দেশের রাষ্ট্রপতিদের মতো হাসিমুখ আঁকে? শুভেচ্ছা বিনিময় করে প্রথমেই, একে অপরের দেশের নাগরিকদের প্রশস্তি জ্ঞাপন করে। তারপরে নানা বিষয়-আশয় আর চুক্তিতে দস্তখত? এর ফাঁকে কি টুপ করে এক দেশের রাষ্ট্রপতি বলে বসেন, 'গতকাল রাতে ঘুম হয় নি', শুনে সমব্যথী হন অপরজন, 'আহা! বলেন কি! ডায়াজোপাম খান না বুঝি আপনি?' এরকম আলাপের ফাঁকে ফাঁকে রাষ্ট্রীয় আদান-প্রদান ঘটতে থাকে। রাহাতের সাথে সারিতার আলাপের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায় এরকমই কিছু টুকরো টুকরো কথা, মাথা ব্যথার ট্যাবলেট বা বেখেয়াল শাদা ব্রায়ের স্ট্র্যাপ, প্লাস্টিকের মেন্যুতে হলুদ ঝোল এবং টেবিলের কোনায় বেরিয়ে থাকা লোহা। ওয়েটার এসে একটু পরে পরে জিজ্ঞেস করছে, বিরক্ত করছে, 'আর কিছু লাগবে, স্যার?'। রাহাতের এইসব কোলাহল ভালো লাগে না। সারিতা অস্থির হয়।


এরকম যন্ত্রণার শহরের গলি ঘুপচি পেটের ভেতরে বসে বসে রাহাত ও সারিতার দিকে তাকিয়ে আমাদের ভালো লাগে। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে যখন মুচকি হাসতো, সেই খোপ খোপ পোয়াতি অফিসের ভেতর, তখন আমাদের ঠোঁটে মুচকি হাসি আঠালো লেগে থাকতো। মাঝে মাঝে সারিতা খুব সুন্দর করে চোখে কাজল দিতো, আর কমলা বা সবুজ কামিজ পরে আসতো। রাহাত অনেক টাকা জমিয়ে একটা ফরাসি পারফিউম কিনেছিলো, মাঝে মাঝে সৌখিনতা ভালো লাগে, বিশেষ করে যেদিন ব্রিফিং থাকতো সেদিনকে সে ফিটফাট হয়ে যেত খুব। আজকে দু'জনেরই ছুটি। অফিস থেকে। নিজেদের থেকেও হয়তো। আমরা অনেক জ্যাম ও জট ছাড়িয়ে দেখতে পাই সেই দোকানে একই টেবিলের দুই পারে বসে রাহাত ও সারিতার মাঝে দুয়েকটা মহাদেশ ঢুকে পড়ছে। গল গল করে সুনামি কি লাইলা'র বেনে জল ঢুকে পড়ছে। সেই জলে পেপসির আধ-খাওয়া বোতল এবং প্লাস্টিকের মেন্যু ভাসছে। আর অনেক দূরে, অনেক ক্ষীণস্বরে একটা ঘুঘু ডাকছে। আমরা ঠিক মতো শুনতেও পাই না। ওদের দিকে সব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকি আমরা। আর শাহবাগের সেই দোকানের ভেতর নিরন্তর একটা ঘুঘু ডেকেই চলে। ডেকেই চলে।



**** ****
- অনীক আন্দালিব
৭.৭.১০

রবিবার, ৬ জুন, ২০১০

নটে গাছ না মুড়োলে...


খাতার পৃষ্ঠা খুলে আমি অনেককিছু লিখতে চাইতাম, কিন্তু পারতাম না। মাঝে মাঝে শব্দহীনতায় কামড় দিতো। আমি প্রায় ছয় বছর কিছুই লিখি নি, কারণ আমার ভেতরে কোন শব্দ জেগে উঠতো না। আমি শব্দহীন হয়ে গিয়েছিলাম। আমি কথা বলতাম, ভাবনাচিন্তাও করতাম, কিন্তু সেগুলো ফুটিয়ে তুলতে পারতাম না। ওই ছয় বছরের সকল স্মৃতি মগজের ভেতরে আটকে আছে। হয়তো সেগুলো সেখানেই ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। আমি সেই ঘরগুলোতে আর ঢুকতে চাই না। এড়িয়ে যাই। কষে তালা দিয়ে আটকে রেখেছি। ওগুলো নিভৃত- অযতনে থাকুক!

আমার কখনো দলের ভেতরে থাকা হলো না। প্রথাগত হওয়া হলো না। আমি কখনো কারো সাথে আত্মীয়-যোগ করতে পারি নি। আমার চারপাশে হয়তো একটা অদৃশ্য দেয়াল ছিলো সবসময়েই। আমি হয়তো সেই দেয়ালের কারণেই সবার সাথে স্বচ্ছন্দ হতাম। "বি ইয়োরসেল্ফ" বলেছিলেন বড়ো বোন, তারপর থেকে আমি কেবল নিজের মতোই হতে চেয়েছি। এই চাওয়া পূরণ হয়েছে নানা পথে, নানা ভাবে, আমি বদলে বদলে গেছি সময়ের সাথে। এবং আমি কখনই কারো মতো হতে পারি নি। একটি দলের সকলের থেকে আলাদা হয়ে গেছি অচিরেই। দেখেছি তাদের সাথে আমার মিলের পরিমাণ কেবল পোশাকে, বা স্থানিকতায়। আমরা এক জায়গায় আছি, থাকছি বা বসবাস করছি বলেই কেবল যোগাযোগ হচ্ছে, যোজন বিয়োজন হচ্ছে, আদান-প্রদান হচ্ছে। কিন্তু সেটা না হলে আমি ক্রমশ আলাদা, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। তাদের সকলের সাথে আমার যোগাযোগ রক্ষা করা হয় না। তারা বা আমি কেউই কারো অভাব অনুভব করি না।

যদিও মনে হতে পারে এহেন অ-যোগাযোগ আমাকে দুঃখী করে, আসলে তা সত্যি না। আমি দুঃখ পাই না। সম্পর্কের সুতোগুলো ধীরে গুটিয়ে নিতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। এই স্বাচ্ছন্দ্যের কোন ভালো বা খারাপ তকমা নেই, নৈর্ব্যক্তিক পুরোটাই। তাই আমি এভাবেই জুড়ে যাই, এবং বিযুক্ত হয়ে যাই। এবং এই প্রক্রিয়া কোনমতেই আরোপিত নয়। খুব প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটে থাকে। যেমন পৃথিবীর ঘূর্ণন বা পানির চক্রের কোন ব্যত্যয় নেই, ঠিক তেমনি- নিয়মানুগ!

২

প্রবলভাবে জাগতিক বলেই, আমি চারপাশের ঘটনাবলিতে উদ্দীপ্ত হই অনেকটা নিপীড়নের কাছাকাছি। প্রতিক্রিয়ায় বিচারে তাই আমার মননে সেগুলোর ছাপ পড়ে থাকে অনেক বছর। আমার চারপাশে পিরিচ-ঘূর্ণনের মতো মানুষরা জুড়ে যায় একে অপরের সাথে। আমি দেখে তৃপ্তি পাই- এই তৃপ্তিটুকুও, স্বাচ্ছন্দ্যের মতোই- অনেতিবাচক ও অনস্তিবাচক অনুভব। তা, যা বলছিলাম, পিরিচের ঘূর্ণিতে মানুষ জুড়ে যেতে থাকে। এ বড়ো অদ্ভুত সুন্দর প্রক্রিয়া! কেউ যদি দেখে থাকেন, কেউ যদি সেইসময়ে অনুভব করতে পারেন, কী অবলীলায় দু'জনে জুড়ে যাচ্ছে, তাহলে বুঝবেন আমি কিসের কথা বলছি। নিজেকে ভাগ্যবান মনে হতে থাকে। আমার দূর্ভাগ্যবানও মনে হয়, যখন দেখি পিরিচের ঘূর্ণিতেই, সেই মানুষরা আলাদা হয়ে যাচ্ছে দেখে। আমি কষ্ট পাই, আর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠি।

যখন আমি মানুষদের দু'জনকেই চিনি, তখন এই যোগাযোগ ও অ-যোগাযোগের অশরীরী প্রক্রিয়াটা আরো মোহনীয় হয়ে ওঠে। আমি এর রসায়ন বুঝে যাই অনেকটাই। পুরোপুরি বোঝা অসম্ভব। তাদের দু'জনের জন্যেই নির্মল ভবিষ্যত কামনা করতে থাকি। এই সময়েরই আগে পরে, টের পাই কেউ কেউ নিঃশব্দে আর কারো কাছে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "কী হয়েছে তোর?" অচিরেই জবাব এলো, "আমি ধরা পড়ে গেছি নিজের কাছেই। গোপনীয়তার সূত্র ভেঙে অকপটেই দেয়ালটাকে ভাঙলাম। এখন আমার আবরণ নেই।"

ছেলেটার চোখে আমি কেবলই অদৃশ্য অশ্রু খুঁজি। নেই। সেখানে কেবল আবেগী-শূন্যতা। আমি সেই শূন্যতাকে অনেক যুক্তিতে হারাতে চাই, কিন্তু পারি না। আমার মনে হয় এখানে যুক্তি চলে না। আমার খুব ইচ্ছা করে এতোদিন ধরে পরিচিত ছেলেটির এই সময়ে পাশে দাঁড়াতে। তাকে এভাবে বদলে যেতে দেখে আমার আর ততোটা ভালো লাগে না। তাকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখেও ভালো লাগে না। মেয়েটি হয়তো জানতেও পারছে না ও কীভাবে কষ্ট পাচ্ছে! আমাদের যোগাযোগের এতো এতো মাধ্যম, তারপরেও আমরা একে অপরের সাথে সামান্য এই কথাটুকুও বলতে পারি না যে আমাদের ঠিক কেমন লাগছে। হায়!

আমার মনে হয় পুরনো যুগে মানুষ অনেক আরামে ছিলো। অবশ্যই, তাদের অনেক রকমের অসুবিধা ছিলো। তাদের দৈনন্দিন সুবিধাগুলো ছিলো না, তাদের মোবাইল আর এসএমএস ছিলো না, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হলে প্রচুর শ্রম ও সময় দিতে হতো। কিন্তু কী অদ্ভুতভাবেই না আমরা এই সমস্যাগুলো দূরে করে ফেলেছি! এখন হুট করেই সব করা যায়, চট করেই কাজ সেরে ফেলা যায়, উড়ে চলে যাওয়া যায় দেশ-দেশান্তর। তারপরেও আমরা অনেক বেশি কষ্টে আছি। এখন আমি যখন সেই ছেলেটির চোখের দিকে তাকাই, সেখানের সবগুলো অব্যক্ত কথা পড়তে পারি না। হয়তো সে-ও পারে না। যেমন করে সে মেয়েটিকে বলতে পারছে না অকপটে। মেয়েটিও সেটা বুঝতে পারছে না!

ভাবছিলাম আমরা কী এখনও কৈশোরক? আটকে গেছি বয়ঃসন্ধির দোলাচলে? নাহলে কেন এই বয়সে এসেও এভাবে কারো হৃদয় টুকরো টুকরো হতে দেখবো! সেই অস্থির অন্তর্লীন সময় তো আমরা কবেই পেরিয়ে এসেছি, এখন সময় বুঝে চলার বুঝে নেয়ার। সব কিছু দেখে শুনে সিদ্ধান্ত নেয়ার। ছেলেমানুষীর, খামখেয়ালিপনার দিন ঢলে চলে গেছে কবেই! তারপরেও টের পেলাম যে আমরা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। আমাদের বিচারে ভুল হয়ে গেছে। ছেলেটি যেদিন টের পেলো, সেই ভুলের দিন, সেই খামখেয়ালির দিনে মনে হয় আকাশ গাঢ় কালো হয়ে এসেছিলো। ঝরঝর করে বৃষ্টি ঝরেছিলো মধ্যগ্রীষ্মে। তারপরে সে বুঝে গেছে হৃদয় হারালে কতোটা ক্ষরণ!

ভেবেছিলাম তার জন্যে এলিজি লিখবো। আশাবাদ লিখবো। সাথে তার জন্যে স্মৃতিগুলো লিখবো। কিছুই হলো না। কেবল (অ)যথা-বাক্যক্ষয়! পারা না-পারার দোলাচল।

৩

দেখি ঘরে কে এলো, ওমা! তুমি? যাই এ'বেলা। কথা ফুরোবে না, নটে গাছও মুড়বে না!


******** ********** ***********

সোমবার, ৩ মে, ২০১০

দুই বোন


অনেক অনেক দিন আগে, এক দেশে দুই বোন বাস করতো। তারা দুজনে ছিলো যে একই ফুলের দুইটি কুঁড়ি; কিন্তু একজন ছিলো ভালো, আরেকজন খুব রগচটা। তাদের বাবার কোন চাকরি ছিলো না, তাই তারা দুই বোনে ঠিক করলো তারা কাজ করে টাকা উপার্জন করতে যাবে।
“আমি আগে যাই, দেখি কী করতে পারি,” ছোট মেয়েটা খুশি মনে বললো, “তারপরে যদি আমি কিছু পয়সা পাই, তাহলে তুমিও চলে এসো আপু।”
তারপর সে তার জামাকাপড় একটা বোঁচকায় বাঁধলো, সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কাজ খুঁজতে বের হলো। কিন্তু শহরের কেউই তাকে নিতে চাইলো না। কাজের খোঁজে মেয়েটি শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে আসলো। পথে যেতে যেতে যেতে, একদিন তার পথে একটা বিরাট চুলা দেখতে পেলো। চুলাটার উপরে অনেকগুলো রুটি গনগন করে ভাজা হচ্ছিলো। মেয়েটি যখন সেখান দিয়ে যাচ্ছিলো, তখন চুলার ওপর থেকে রুটিগুলো একসাথে চেঁচিয়ে উঠলোঃ
“ছোট্ট খুকি! ছোট্ট খুকি! আমাদের বাঁচাও! প্লিজ আমাদের বাঁচাও! সা-ত বছর ধরে আমাদের ভাজি করছে, কেউই আমাদের চুলা থেকে বের করছে না। আমরা তো পুড়েই গেলাম! তাড়াতাড়ি আমাদের বের করে নাও!”
মেয়েটা খুব দয়ালু ছিলো, তাই রুটিদের চিৎকারে তার খুব মায়া হলো। সে তার বোঁচকা নামিয়ে রেখে রুটিদের বের করে আনলো। তারপরে আবার রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে বললোঃ
“এবারে তোমরা একটু আরাম পাবে।”
আরো কিছুদূর যাবার পরে মেয়েটি দেখলো একটা গরু পাশে খালি বালতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গরুটা কাতরস্বরে মেয়েটিকে বললোঃ
“ছোট্ট খুকি! ছোট্ট খুকি! আমার দুধ দুইয়ে দাও! প্লিজ আমার দুধ দুইয়ে দাও! সা’ত বছর ধরে আমি অপেক্ষা করছি, কিন্তু কেউই আমার দুধ দুইয়ে দিচ্ছে না।”
তো, লক্ষ্মী মেয়েটি সেখানে থামলো, কাঁধ থেকে বোঁচকা নামিয়ে রেখে গরুটার দুধ দুইয়ে পাশের বালতিতে রাখলো, তারপরে যেতে যেতে বললোঃ
“এবারে তুমি একটু আরাম পাবে।”
আরো একটু পথ এগিয়ে মেয়েটার সাথে একটা আপেল গাছের দেখা হলো। গাছের ডালে ডালে থোকা থোকা আপেল ঝুলছে, ফলের ভারে তার ডালগুলো প্রায় ভাঙার উপক্রম! আপেল গাছটি মেয়েটিকে ডেকে বললোঃ
“ছোট্ট খুকি! ছোট্ট খুকি! আমার ডালগুলো ঝাঁকি দাও। ফলের ভারে আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছি না!”
লক্ষ্মী মেয়েটি সেখানে থামলো, কাঁধ থেকে বোঁচকা নামিয়ে আপেল গাছের ডাল ধরে অনেক জোরে ঝাঁকুনি দিলো। সাথে সাথে সব আপেলগুলো ঝরে গেলো আর গাছটাও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলো। মেয়েটি চলে যেতে যেতে বললোঃ
“এবারে তুমি একটু আরাম পাবে।”
তো, মেয়েটা গ্রামের পথ ধরে যাচ্ছে যাচ্ছে, একসময়ে সে এসে হাজির হলো এক বুড়ি ডাইনির বাড়ির সামনে। এই বুড়ি ডাইনির একটা কাজের মেয়ের দরকার ছিলো, বিনিময়ে তাকে বেতন দিবে। তাই মেয়েটি ঐ বাড়িতে থেমে বললো যে সে কাজ করতে চায়। বুড়ি বললো, তাকে ঘর ঝাড়ু দিতে হবে, বাসা পরিষ্কার করতে হবে, শীতের দিনে আগুন জ্বালাতে হবে। তবে ডাইনিটা বার বার নিষেধ করে দিলো যে আগুন জ্বালানোর সময়ে কোনমতেই চিমনির ভেতরে তাকানো যাবে না!
“যদি একবার তাকিয়েছো”, বুড়ি খ্যানখ্যানে গলায় বললো, “তবে তোমার মাথায় একটা জিনিস এসে পড়বে। এর পরিণতি একেবারেই ভালো হবে না!”
বেশ! মেয়েটা ঝাড়ু দেয়, ঘর মোছে, ধুলা ঝাড়ে, আগুন জ্বালায়, কিন্তু বুড়ি তাকে কোনই বেতন দেয় না। অনেকদিন এভাবে কেটে গেলো। এখন, মেয়েটা বাসায় ফিরতে চায়। বুড়ি ডাইনির বাড়িতে কাজ করতে তার একটুও ভালো লাগছিলো না। কারণ এই ডাইনি রাতের খাবারে বাবুদের ধরে ধরে সিদ্ধ করে খেতো, তারপরে তাদের হাড়গুলো বাগানে পাথরের নিচে পুঁতে রাখতো! কিন্তু মেয়েটা খালি হাতে বাসায় ফিরতে চাচ্ছিলো না, তাই সে আরো কিছুদিন ঘরের কাজকর্ম করলো। এরকমই একদিন হঠাৎ হলো কি, আগুনের চুলা পরিষ্কার করার মেয়েটি ময়লার সাথে পা বেঁধে পড়ে গেলো, আর বেখেয়ালে চিমনির ভেতর দিয়ে উপরে তাকালো। আর যায় কোথায়! এক বিরাট বস্তাভর্তি স্বর্ণমুদ্রা ধপ করে তার কোলে এসে পড়লো!
সেইসময়ে ডাইনিটা ছিলো বাড়ির বাইরে কাজে। তাই মেয়েটি ভাবলো, নিজের বাসায় পালিয়ে যাওয়ার এখনই সুযোগ। সে তাড়াতাড়ি জামাকাপড় বেঁধে নিয়ে বস্তা কাঁধে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। কিন্তু একটু এগুতে না এগুতেই সে টের পেলো যে ডাইনিবুড়ি ঝাড়ু নিয়ে তার দিকে তেড়ে আসছে। পড়িমড়ি করে মেয়েটি ছুট লাগালো। এক ছুটে সামনে এগিয়ে দেখে সেই আপেল গাছটা দাঁড়িয়ে আছে। সে দৌড়ে ওটার কাছে গিয়ে বললোঃ
“আপেল গাছ! আপেল গাছ! লুকিয়ে আমায় রাখো
ডাইনি বুড়ি আমায় যেন ধরতে পারে নাকো
আমায় পেলে হাড়গুলো সে আস্ত ভেজে খাবে
বাগানের ঐ পাথর তলে আমায় চাপা দিবে!”
তখন আপেলগাছ বললো, “অবশ্যই! তুমি আমার কতোবড়ো উপকার করেছিলে, আর উপকারীর উপকার করাটাই উচিত কাজ!”
তাই আপেল গাছ তাকে নিজের ডালপালার ফাঁকে লুকিয়ে রাখলো। ডাইনি সেখান দিয়ে যাবার সময়ে বললোঃ
“ওরে আমার আপেল গাছ! ওরে আমার গাছ!
বদমাশ এক পিচ্চি মেয়ে দেখেছিস নাকি আজ?
এদিক দিয়েই গেছে সে যে ঝোলা কাঁধে নিয়ে
ভর্তি ঝোলা আমার যতো স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে!”
আপেল গাছ বললোঃ
“না গো বুড়ি, রয়েছি আমি পথের পানে চেয়ে
সাত বছরে এইদিকেতে যায়নি কোন মেয়ে”
তখন ডাইনি বুড়ি অন্যদিকে ঝাড়ু বাগিয়ে চলে গেলো। আর মেয়েটি গাছ থেকে নেমে আপেল গাছকে অনেকবার ধন্যবাদ দিলো। তারপরে আবার বাসার পথে রওনা হলো। কিন্তু যেই না সে গরুটার কাছে পৌঁছেছে, কোথা থেকে ডাইনির আসার আওয়াজ পাওয়া গেলো। মেয়েটা তাড়াতাড়ি গরুর কাছে গিয়ে বললোঃ
“শুনছো গরু! এই যে গরু! লুকিয়ে আমায় রাখো
ডাইনি বুড়ি আমায় যেন ধরতে পারে নাকো
আমায় পেলে হাড়গুলো সে আস্ত ভেজে খাবে
বাগানের ঐ পাথর তলে আমায় চাপা দিবে!”
তখন গরু বললো, “অবশ্যই! তুমিই না আমার দুধ দুইয়ে কতোবড়ো উপকার করেছিলে? আমার পিছনে লুকিয়ে থাকো, কেউ তোমার কিচ্ছু করতে পারবে না!”
একটু পরেই ডাইনি উড়ে এলো, আর গরুটাকে জিজ্ঞাসা করলোঃ
“ওরে গরু! শোন ফেলে সব কাজ
বদমাশ এক পিচ্চি মেয়ে দেখেছিস নাকি আজ?
এদিক দিয়েই গেছে সে যে ঝোলা কাঁধে নিয়ে
ভর্তি ঝোলা আমার যতো স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে!”
গরুটা খুব নরম স্বরে বললোঃ
“না গো বুড়ি, রয়েছি আমি পথের পানে চেয়ে
সাত বছরে এইদিকেতে যায়নি কোন মেয়ে”
তখন বুড়িটা আবারও ভুল পথে চলে গেলো, আর মেয়েটা আবার নিশ্চিন্ত মনে নিজের বাসার দিকে রওনা হলো। কিন্তু যেই না সে চুলাটার কাছে পৌঁছেছে, আবারও কোথা থেকে বুড়ি এসে হাজির। মেয়েটা তাড়াতাড়ি চুলার কাছে গিয়ে কাতরকণ্ঠে বললোঃ
“শুনছো চুলো! এই যে চুলো! লুকিয়ে আমায় রাখো
ডাইনি বুড়ি আমায় যেন ধরতে পারে নাকো
আমায় পেলে হাড়গুলো সে আস্ত ভেজে খাবে
বাগানের ঐ পাথর তলে আমায় চাপা দিবে!”
তখন চুলাটা গমগমে স্বরে বলো, “হায়! এখন কি করি, আমার ভেতরে তো অনেকগুলো রুটি এখন ভাজা হচ্ছে, তোমাকে রাখার জায়গা নেই। তুমি এক কাজ করো, ঐ যে রুটিওয়ালা বসে আছে, তাকে গিয়ে বলো।”
মেয়েটা তাড়াতাড়ি রুটিওয়ালার কাছে গিয়ে বলতেই রুটিওয়ালা বললো, “অবশ্যই! তুমি না থাকলে আমার আগের সেই রুটিগুলো সবই পুড়ে যেতো। তুমি শিগগিরই আমার ঘরের ভেতর গিয়ে লুকাও। আমি বুড়িকে সামলাচ্ছি।”
মেয়েটা কোনমতে রুটিওয়ালার ঘরের ভেতরে লুকিয়েছে, আর তখনই ডাইনি এসে হাজির। খ্যানখ্যানে বুড়ি রেগেমেগে বললোঃ
“ঐ বেটা! ঐ রুটিওয়ালা ব্যাটা, শোন দেখি
বদমাশ এক পিচ্চি মেয়ে আজ দেখেছিস নাকি?
এদিক দিয়েই গেছে সে যে ঝোলা কাঁধে নিয়ে
ভর্তি ঝোলা আমার যতো স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে!”
রুটিওয়ালা বললো, “বুড়ি, তুমি ঐ চুলার মধ্যে দেখো দিকি। মেয়েটা থাকলেও থাকতে পারে।” তখন বুড়ি ঝাড়ু থেকে নেমে চুলার ভেতর উঁকিঝুঁকি মারছে, দেখে কেউ নেই। রুটিওয়ালা বললো, “আরেকটু ভিতরে ঢুকে দেখো, বুড়ি”, আর যেই না ডাইনি চুলার ভেতরে গেছে, ---
ধড়াম!----
রুটিওয়ালা তার মুখের ওপরে চুলার দরজা দিলো লাগিয়ে। আর বুড়ি চুলার ভেতরে পুড়ে কয়লা হয়ে গেলো। যতোক্ষণে সে চুলা থেকে বের হয়েছে, পুরো মুচমুচে ভাজা খয়েরি হয়ে গেছে। তখন তার বাড়ি ফিরে সারা গায়ে ক্রিম মাখা ছাড়া আর কোন উপায়ই নাই!
আর মেয়েটা? দয়ালু লক্ষ্মী মেয়েটা বস্তাভর্তি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে বাসায় ফিরে আসলো।
এখন তার বদমেজাজী বড়ো বোন সব দেখে হিংসায় জ্বলে পুড়ে ছাই! সেও তখন ঠিক করলো যে এমন এক বস্তা স্বর্ণমুদ্রা না আনলে কিছুতেই চলছে না। তাই সে জামাকাপড় বোঁচকা বেঁধে তার বোনের মতোই পথে বের হলো কাজের খোঁজে। সেই একই রাস্তা ধরে যেতে যেতে বড়ো বোনটিও একই রুটির চুলার কাছে এসে হাজির হলো। চুলার ওপর থাকা রুটিগুলো আগের মতোই বোনটাকে বললো, তাদেরকে নামিয়ে নিতে, তারা সাত বছর ধরে ভাজি হচ্ছে, আরেকটু সময় থাকলেই তারা পুড়ে যাবে। মেয়েটা নাক সিঁটকে বললোঃ
"খুব মজা তাই না? তোমাদের নামাতে গিয়ে আমি আমার আঙুল পুড়াই আর কি! খেয়ে কাজ নেই আমার। হুঁহ!”
এরপর সে আবারও একটু এগিয়ে গরুটার দেখা পেলো। কিন্তু যখন গরুটা বললোঃ
“ছোট্ট খুকি! ছোট্ট খুকি! আমার দুধ দুইয়ে দাও! প্লিজ আমার দুধ দুইয়ে দাও! সা’ত বছর ধরে আমি অপেক্ষা করছি, কিন্তু কেউই আমার দুধ দুইয়ে দিচ্ছে না।”
মেয়েটা অবজ্ঞার হাসি হেসে বললো, “তুমি আরো সাত বছর অপেক্ষা করলেও আমার কিছু যায় আসে না। আমি তোমার কাজ করে দিতে পারবো না।” এটা বলে সে এগিয়ে গেলো। আরো একটু দূর যাবার পরে তার সামনে পড়লো সেই আপেল গাছটা। আবারও তাতে আপেল ধরেছে, এবং সে নুয়ে পড়ে কষ্ট পাচ্ছে। যখন সে মেয়েটাকে অনুরোধ করলো তার ডাল ধরে ঝাঁকি দিতে, তখন মেয়েটা কেবল খিল খিল করে হাসলো। আর একটা পাকা আপেল ছিঁড়ে নিয়ে খেতে খেতে চলে গেলো। যাওয়ার সময় বললোঃ
“ আমার একটা আপেলেই হবে। বাকিগুলো তুমিই রেখে দাও।” এভাবে আপেল খেতে খেতে সে অবশেষে ডাইনি বুড়ির বাসায় এসে হাজির হলো।
এতোদিনে বুড়ির গায়ের পোড়া দাগগুলো ঠিক হয়েছে। কিন্তু মনের ঝাল মেটেনি একটুও। কাজের মেয়েদের উপরে সে ভয়ংকর রেগে থাকে। আর এক মুহূর্তের জন্যেও ঘর ছেড়ে বের হয় না। এজন্যে বদমেজাজি মেয়েটাও আর সুযোগ পাচ্ছে না চিমনির ভেতরে তাকানোর। তাকে বুড়ি খুব খাটাচ্ছে, রোজ ঘর ঝাড়ু দিতে হয়, মুছতে হয়, আগুন জ্বালাতে হয়। কাজ করতে করতে সে একদম শেষ!
কিন্তু একদিন হুট করেই সুযোগ এলো। ডাইনিটা রাতে খাওয়া বাচ্চাদের হাড়গুলো যেই পুঁততে গেছে, সেই সুযোগে মেয়েটা চিমনির ভেতরে তাকালো। আর সাথে সাথেই, এক বস্তা স্বর্ণমুদ্রা!
তো, মেয়েটা খুব তাড়াতাড়িই ডাইনির বাড়ি ছেড়ে পালালো। দৌড়াতে দৌড়াতে আপেল গাছের কাছে এসে শুনতে পেলো ডাইনি তাড়া করে আসছে। তার ছোট বোনের মতো এই মেয়েটাও আপেল গাছকে মিনতি করে বললোঃ
“আপেল গাছ! আপেল গাছ! লুকিয়ে আমায় রাখো
ডাইনি বুড়ি আমায় যেন ধরতে পারে নাকো
আমায় পেলে হাড়গুলো সে আস্ত ভেজে খাবে
বাগানের ঐ পাথর তলে আমায় চাপা দিবে!”
কিন্তু আপেল গাছ উত্তর দিলোঃ
“আমার এখানে কোন জায়গা নাই। আপেলে ঠেসে আছি। তুমি রাস্তা মাপো।”
মেয়েটা নিরুপায় হয়ে আবার দৌড় লাগালো। ডাইনি বুড়ি আপেল গাছের কাছে এসে আগের মতো জিজ্ঞাসা করলোঃ
“ওরে আমার আপেল গাছ! ওরে আমার গাছ!
বদমাশ এক পিচ্চি মেয়ে দেখেছিস নাকি আজ?
এদিক দিয়েই গেছে সে যে ঝোলা কাঁধে নিয়ে
ভর্তি ঝোলা আমার যতো স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে!”
আপেল গাছ উত্তর দিলোঃ
“দেখছি বুড়ি দেখছি মেয়েটারে
এ পথে গেলে পাইবা তুমি তারে”
তারপর ডাইনি বুড়ি সেই পথে তাড়া করে গিয়ে একসময় মেয়েটাকে ধরেই ফেললো। স্বর্ণমুদ্রা কেড়ে নিয়ে খুব মার মারলো। আর দূর দূর করে তাকে তাড়িয়ে দিলো, কোন বেতন, টাকা পয়সা না দিয়েই!
===========
।।আমার গল্পটি ফুরোলো
নটে গাছটি মুড়োলো।।

# মূল গল্প