ছিন্নপত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছিন্নপত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৭ মে, ২০১৯

চিরকুট

কোন কোন দিন ভাঙা মার্বেলের মতো - মসৃণ মাটিতে বাঁকা হয়ে পড়ে থাকে আর একটু ঢালু পেলে গড়াতে শুরু করে। কিন্তু সব দিক সুষম গোলকের মতো গোল গোল থাকে না বলে তার চলন হয় বড়ই বেখাপ্পা। যেন কেউ বলে নি গড়িয়ে যাও, সেই দিনটা তবু প্রাণপণে যেতে চাইছে। গরমে, ঘামে, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে পড়তেও পড়ছে না।
এরকম দিনে সকালে উঠে মনে হয় কেউ সদ্য লাল আটার রুটি ভেজে দিলো, সাথে একটা ডিম পোচ। পাশে এক কাপ ধূমায়িত চা। চুমুক দিতে দিতে রোদ এসে পড়বে পায়ের পাতায়, চড়াক করে একটা চড় কষাবে। এরকম দিনে অনেক কাজ থাকে - জোড়াতালি দিয়ে রিপু করে কাজের শরীরে ধানক্ষেতের মতো চৌকো চৌকো খোপ খোপ তালি বসে, মাঝের আইলে আইলে সেলাইয়ের ফোঁড়। কাজ দাঁড়িয়ে যায়। 

এমন দিনে দুপুরের থমথমে বাতাসে শহরের বাসগুলো রাস্তা দখল করে থাকে, আর গগনবিদারী আহ্বানে ক্ষুধার্ত স্নান করা পরিপাটি বেশভূষা নিয়ে সকলে ভিড় করে উপাসনালয়ে। সেখানে কেউ বলে না কীভাবে মাত্র পৌনে দুই সপ্তাহে ধর্ষণ হয়েছে দুই কুড়ি। তিন লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার শিশু ঘরে ও বাইরে কাজ করতে গিয়ে ঠাশ ঠাশ চড় থাপ্পড় কিল ঘুষি লাথি খেয়েছে। স্বচ্ছ কাচের মত নিষ্প্রাণ চোখে পাশ ফিরে উপুড় হয়ে মুখ ফিরিয়ে নীরবে ব্যবহৃত হয়েছে আড়াই কোটি নারী - যাদের ফার্স্ট নেম মিসেস লাস্ট নেম আহমেদ কিংবা ইসলাম কিংবা রহমান কিংবা চৌধুরি। গত অগ্রহায়ণে মরে যাওয়া কিশোরকে কেউ মনে রাখে না, তার অর্ধভগ্ন মা ছাড়া। কোনো কোনো দিন হুট করে তাদের কথা মনে পড়ে বিকেল গড়িয়ে যাওয়ার আগে। 

সেসব দিনে ভাঙা মার্বেলটির মতো গড়িয়ে কোন্‌ অতলে পড়ে যাচ্ছিলাম আমি? সমতল ব্যস্ততা পেলে ভালো হতো। হয়ও। শ'য়ে শ'য়ে ব্যস্ততা ঘিরে ধরে ধারালো ছনের মতো, ঘাসের মতো। পড়ে থাকি তথৈবচ। পড়ে থেকে দেখি শোরগোল, হইচই। ভুলে যাই আমি ভাঙা মার্বেল, সকালের চড়চড়ে রোদ। সন্ধ্যে নামার আগে দেখি কেউ বরফশীতল পানির বোতল কিনে পাঁচিলের নিচে বসে অপেক্ষা করছে। আমার একইসাথে তৃষ্ণা পায় আর চামড়া জ্বলতে থাকে। আপুকে মনে পড়ে। শ্মশানের মতো ধু ধু প্রান্তরে একটা কাকতাড়ুয়া লাগাই। এখন আপুকে আসতে দেয়া যাবে না। একটা ফোন এসে বাঁচিয়ে দেয়। কংক্রিটে গড়াচ্ছি ভাঙা মার্বেলের মতো ঘড়্‌ঘড়্‌ ঘড়্‌ঘড়্‌, যন্ত্রের মতো জরুরি মাপা মাপা কথা বলি। গ্রীবা উঁচিয়ে লোকটা পানি খায়। ওর বাড়ি নেই। আমি বাড়ি ফিরে চলি। রাতে খুব ঝড় আসে। 

আর কোনোদিন খুঁজে না পাওয়ার নিশ্চয়তায় ভাঙা মার্বেল হারিয়ে যায়।

মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৩

দ্বিধাস্বত্তা


ধরা যাক, একটি নিকষ কালো গুহার ভেতর আটকে আছি। যেখানে বাইরের কোন আলো আসার পথ নেই। আমার সামনে একটি নিভু নিভু সলতে জ্বলছে। সলতের শেষ মাথায় একটা তেজস্ক্রিয় বিস্ফোরক লাগানো, আগুনের ছোঁয়া পেলে যা বিস্ফারিত হবে। ধরা যাক, সেই প্রায়ান্ধকার গুহায় আর কেউ নেই। শুধু সমগ্র জীবনের স্মৃতিগুলো ফটোগ্রাফের মতো সাজানো আছে। বিস্ফোরণের সাথে সাথে যে এসব ধ্বংস হয়ে যাবে, আমার মনে তখন সেটাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। 

সলতেটা নিভিয়ে দেয়া যেতে পারে। তাতে বিস্ফোরণ ঠেকানো যাবে, স্মৃতিগুলো রক্ষা পাবে। কিন্তু অন্যদিকে আলোর অভাবে গুহামুক্তির সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যাবে। তারপর ক্ষুধা তৃষ্ণায় ধুঁকে ধুঁকে অজ্ঞাতমরণ। বাইরে কেউ জানতেও পারবে না, যে আমি আর নেই। 

ধরা যাক, সলতে নিভিয়ে দেয়ার আগ মুহূর্তে আমি একটা ফটোগ্রাফ আলতো করে তুলবো। সেখানে স্থির হয়ে আছে কিছু মানুষ, একটি অদ্ভুত অলৌকিক মুহূর্ত। কচু পাতার পানি। 

দমকা ফুঁয়ে নিভে গেলো সলতে, অন্ধ হলো দৃষ্টি, আর মুছে গেল স্মৃতি।

সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

ডিলেমা

আত্মা বলে কিছু নেই, যা সচলসক্রিয়, তা আমাদের মস্তিষ্ক
হৃদয় বলে কিছু নেই, হৃৎপিণ্ড কেবল রক্তসঞ্চালনে আগ্রহী
হৃদয় বললে বুঝি ওই মস্তিষ্কই!
দ্বিমুহূর্ত পরের মুহূর্তে -
এ সত্য শুরুতে কদর্য লেগেছে।
এ সত্য এক লহমায় সকল উপমা, দৃশ্যকল্প, চিত্রকল্প ও রূপককে
ফাটা বেলুনের মতো ছিন্নভিন্ন করে দিল।
মাধ্যাকর্ষণের টানে ওগুলো ধ্রুব ত্বরণে পড়ে গেল, সুউচ্চ কল্পনার চূড়া হতে।
সত্য উদঘাটিত হলে কদর্যই লাগে। ডিনায়্যাল। অস্বীকৃতির ক্রোধ জাগে। তারপর বার্গেইন করি, মুলামুলি, টানাটানি। ফিরিয়ে দে অলীক রূপকগুলো, আমার বিভ্রান্তিকর মিথ্যা সুখ। ফিরিয়ে দেয় না কেউ। তাই কদর্য সত্যগুলোর দিকে ভ্রূকূটি করে তাকাই। ধীরে ধীরে তারা অবয়ব নিতে থাকে। অ্যামিবার মতো নড়ে চড়ে। পর্দা সরে যায়, ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে রূপ। তখনই দেখি বিস্ময়কর দেহের ভেতর কারুকার্য।
সত্যের মতো সুন্দর এই মস্তিষ্কের ভাঁজ, যেন বয়ামে রেখে দেয়া কিছু। জান্তব। সচলসক্রিয়। নিউরনে বিদ্যুতের বেগে খবর ছড়িয়ে পড়ে। মস্তিষ্ককে চিনে নেয়ার তথ্যটাও জমা পড়ে মস্তিষ্কেই। মস্তিষ্ক ভাবে মস্তিষ্ককে নিয়ে এবং সেই ভাবনা জমা রাখে নিজের ভেতর। আবার মস্তিষ্কের ভাবনার ভেতরেও থাকে মস্তিষ্কই। ইনসেপশন। ঘুলঘুলি।
একটি কথোপকথন -
: জানার কোন শেষ নেই। জানতে কেউ নিষেধ করে নি। জানতে চাওয়া ভুল না। কোরানে কোথাও বলে নি জানতে পারবা না। আল্লাহ বলেন নি যে প্রশ্ন করতে পারবা না।
: কিন্তু সীমানা তো নির্দিষ্ট করে দেয়া। প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্র ঠিক করে দেয়া। সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। নিষেধ করা হয়েছে, তাই না?
: কোথায়? বলো। কোথায় নিষেধ করা হয়েছে?
: উমম, যদি বলি - নিষেধ করা হয়েছে আল্লাহকে নিয়ে প্রশ্ন করতে? যদি বলি তার অস্তিত্বকে মেনে নেয়ার একচ্ছত্র অধিকারকে অস্বীকার করা নিষেধ?
: হ্যাঁ, তা বটে। ইসলাম মানে আত্মসমর্পণ। আল্লাহর অস্তিত্বে নিঃশর্তে বিশ্বাস করতে হবে। প্রমাণ খুঁজলে পাবে না। পেলেও দেখবে, সংশয় দূর হবে না, সারাজীবন এই সংশয়েই কাটাতে হবে। তাই সংশয় দূর করো। বিশ্বাস স্থাপন করো।
: কিন্তু আমি তো এই প্রশ্নের উত্তর চাই। নিরেট, নির্ভেজাল সত্য।
: উত্তর আছে তো! বলা আছে - এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ, সর্বশক্তিমান, অসীম দয়াময়, পরম করুণাময়।
: কিন্তু এটা চাপিয়ে দেয়া উত্তর। সিদ্ধান্ত। এটার প্রমাণ নেই। উপাত্ত নেই।
: (নিশ্চুপ)
ডিলেমা কাটলো না। বিভ্রান্তি দূর হলো না। সংশয় আরো গাঢ় হয়ে উঠলো। ঈশান কোণের মেঘের মতো ঘন থরথরে মেঘ জমে উঠলো। এই সংশয় আমার কাছে কদর্য লাগে, মাঝে মাঝে। যদি সৎবাক্য বলি - হ্যাঁ, মাঝে মাঝে লাগে। কৃষ্ণমেঘ পুষি মনের কোণে। না, না, ভুল হলো - মস্তিষ্কের কোষে। সেখানে লালন-পালন করি সংশয়ী মেঘ। প্রশ্ন আছে - উত্তর নেই। উত্তরহীনতার মাতৃকা মেখে প্রশ্নগুলো হাসে। সে হাসি নিরাবেগ। আমার সে হাসি ভাল লাগে। থাকুক প্রশ্নগুলো, বৃথা রহস্যময়তা আর অত্যাশ্চর্য মিরাকলের আবর্জনায় না মেখেই প্রশ্নগুলো থাকুক। একদিন এদের উত্তর বের হবে - মীমাংসিত সত্য সুন্দর উত্তর। সেই উত্তরের জন্য এক জীবন অপেক্ষা করা যায়। সেই উত্তরের অপেক্ষায় এক জীবনও তুচ্ছাতিতুচ্ছ!

শনিবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১২

কর্ণোপকর্ণিকা

শীত শীত বিকেলে গলিতে হাঁটছি। গলিগুলো এখন আর আগের মতো সুকুমার নেই, এখন সেগুলো পাকা রাস্তা, পিচের কালো পরতের 'পর পরত জুড়েছে, আর গলিগুলো ক্রমশ হয়ে উঠেছে দাম্ভিক রাজপথ। পথের দু'পাশে অনেকগুলো বিল্ডিং উঠে গেছে। বিল্ডিংকে বাংলায় বলে ইমারত। কিন্তু আগে'কালের যে ইমারত গড়ে উঠেছিল, এই বিল্ডিংগুলো তেমন না। এরা বিদেশি, আরোপিত পর্দার মতো অশ্লীল, কাচের মসৃণ শরীর, যে কাচের ভেতরে দেখা যায় না। কোনো জানালা নেই, বারান্দা নেই এ'গুলোতে। কেবল সরাসরি জ্যামিতিক লম্বের মতো সুউচ্চে উঠে গেছে নির্বিকার। রাজপথ নয় তবু এই বিল্ডিংয়ের সারি দু' পাশে জমে উঠেছে বলেই এই রাস্তাকে ভীতিকর লাগে। আমি তাই এই রাস্তায় ভয়ে ভয়ে হাঁটি। মনে ভয় হয়, যদি এই বিল্ডিংগুলো একদিন কাত হয়ে পড়তে শুরু করে, তাহলে!

এমন ভাবতে ভাবতে আমি হাঁটতে থাকি। দ্রুত। মাথা নিচু করে। এই গলিতে খালি অফিস আর অফিস। নানারকমের বাহারি অফিসে অনেকে সেজেগুজে চাকরি করে। আমি তাদের অনেককেই চিনি। কিন্তু পরিচয়ের গণ্ডিতে তাদের না রাখতে পারলেই হয়তো আমার ভাল লাগতো। তাই আমি সম্ভাব্য সামাজিকতা এড়াতে মাথা নিচু করে হাঁটি। হনহনিয়ে। দু'পাশের অনেক উঁচু বিল্ডিংয়ের কারণে এই গলিতে একটা চ্যানেল ইফেক্ট হয়েছে, সারাক্ষণ হু হু করে বাতাস বয়। এমন বাতাস ধানক্ষেতের কথা মনে করিয়ে দেয়। আউশ ধানের গন্ধ পাই। চমকে উঠি। এখানে আউশ কোথায়? স্মৃতি থেকে ঘাই মেরে ওঠে গন্ধ। চোখেও কি ভুল দেখি? আইল চোখে পড়লো কি? নাহ, ও কেবল ভ্রান্তিবিলাস। আমি আবার মাথা নিচু করে হাঁটি। এখানে কোনো প্রাগৈতিহাসিক জীবন লুকিয়ে নেই। সব হারিয়ে গেছে এই রাস্তা, এই কালো-পিচ, এই বিল্ডিং ওঠার সাথে সাথেই...


এখানে বিল্ডিং একটা রূপক, রাস্তাটাও রূপক। আগে যে গলি ছিল, আর এখন যে হু হু বাতাস, সেটাও মনে হয় রূপক।

মাঝে মাঝে ভাবি, এই যে দু'চোখের দৃশ্যগুলো কি আসলে সত্যি? যা দেখছি, যা অবলোকন করছি, আবছা দেখার look আর গভীর দর্শনের observe, এত রকমারি দেখার মাঝে কোনটা ঠিক? কোনোটাও কি ঠিক?

প্রশ্নটির উত্তর খুঁজছিলাম। কালো পিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাঁটছি, চোখের সামনে অপরিচিত অপরিবর্তনীয় দৃশ্য। চারপাশে পরিচিত মানুষ আমাকে দেখে কিন্তু এক মনে হাঁটছি বলে কেউ আমাকে হয়ত জ্বালাতে চায় না। বিরক্ত হব বা চমকে উঠব ভেবে চকিতে ডাক দেয় না। বড়ো হয়ে গেলে আমাদের দ্বিধা বাড়ে, সাবলীলতা কমে। চোখের দৃষ্টি ঘোলা হয়ে ওঠে মানুষের মুখ দেখার সময়। কারো মুখের রেখা পড়া যায় না, খালি অবয়ব বোঝা যায়... সব একই মানুষ, একই পুনরাবৃত্তিতে জন্মায়... মরে...


পৃথিবীর বিস্ময়কর দুর্ঘটনা যে এই গ্রহে মানুষ নামের কিম্ভুত এক জীব জন্মেছিল। জন্মেই তার বিশেষত্ব বোঝা যায় নি। ধীরে ধীরে দেখা গেল সে আলাদা হয়ে উঠছে মানুষ হয়ে উঠছে ক্রমশ দাম্ভিক হয়ে উঠছে আরোপিত হয়ে উঠছে বিষাক্ত ও কৃত্রিম হয়ে উঠছে ভাবালু ও বিষণ্ণ হয়ে উঠছে। এমন বিচিত্র হয়ে ওঠার স্বতঃস্ফূর্ততায় তাকে সবাই ভয় পেতে শুরু করল। ভয় পেয়ে দূরে সরে গেল পশু। ডানা ঝাপ্টে দূরে সরে গেল পাখি। চুপচাপ দূরে সরে গেল প্রকৃতি। মানুষ একা হয়ে গেল একাএকাই।


কতোগুলো ছেলে খেলাচ্ছলে একটা বাচ্চা কুকুরের মুখে কতগুলো পটকাবাজি পুরে দিয়েছিল। কুকুর তো, প্রভুভক্ত, নির্বোধ, অবলা। সে ভেবেছে এটা হাড়। দাঁতে চেপে ছেলেগুলোর পিছু। একটা ছেলের কাছে দেয়াশলাই ছিল। একটা কাঠি ফস করে ধরিয়ে পটকার মুখে ধরিয়ে দিয়ে তারা সবাই চলে গেল। কুকুরের বাচ্চাটা একটু এদিক একটু ওদিক তাকিয়ে কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। এখন কেবল ও সুতোটুকু জ্বলে ফুরিয়ে যাবার অপেক্ষা...



[এলোমেলো শীতল সময়ের ক্ষমাপ্রবণ কিছু লাইন]

বুধবার, ২৩ মার্চ, ২০১১

ইনসমনিয়া-

ইদানিং ইনসমনিয়া ফিরে আসছে।
ইনসমনিয়ার বাংলা অনিদ্রা। দুটো একই শব্দ, অথচ শব্দ দুটোর চরিত্র কী আলাদা! ইনসমনিয়া শুনলে মনে হয় জ্যাজ শুনছি। নিদেনে কোনো পুরানো ব্লুজ, পঞ্চাশের দশকের পিয়ানোর সুর। সাথে নিশ্চুপ রাত, রাতের পিঠে অন্ধকার সরীসৃপের মতো জানালার বাইরে শুয়ে আছে। শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। হয়তো একটু পরে আমার ঘরে ঢুকে পড়বে। বাইরে সতর্ক পাহারা দিচ্ছে গলির আলোর শীর্ষক। ঘরে মিয়ানো আলো জ্বালিয়ে রেখেছি। রাত গভীর তাই উজ্জ্বল আলোয় চোখ পুড়ে যেতে পারে!
অনিদ্রা শুনলে এরকম কিছু মনে হয় না। বরং কেমন পাঁশুটে বুড়োর মতো লাগে নিজেকে। মনে হয় রোগা জিরজিরে হয়ে গেছি, খুকখুক কাশি জমেছে, মাঝে মাঝে থক করে গলা পরিষ্কার করে আসছি বেসিনে গিয়ে। ঘুম আসছে না, হাসফাঁস গরম কিংবা জলতেষ্টা। বাইরে কে আছে না আছে খবর নেই। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে আছি।
তাই এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা বোঝাতে শব্দ দুটোকেই ব্যবহার করি। এই এখন আমি ইনসমনিয়ায় ভুগছি - আজ রাত কেবলই ইনসমনিয়ার। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ হিউ লরির গাওয়া একটা গান পেলাম। সামনে সলো ব্লুজ অ্যালবাম বের করছেন। একটা গান ফ্রি বিলাচ্ছে। ফেসবুকে ‘লাইক’ দিলেই মেইলে গান চলে আসে! অভিনব প্রচারণা এবং বিনামূল্যে গান ছড়ানো দেখে ভালো লাগলো।
গানের কথাগুলো বেদনা-বিধুর। প্রেয়সী চলে গেছে। অনেক ভালোবাসার কথা, অনেক মায়াময় স্মৃতি ফেলে রেখে নিষ্ঠুরের মতো চলে গেছে। এখন তার কিছুই করার নেই। প্রেমের সময়ে সে টের পায় নি, এরকম কিছু হবে, ভাবতেও পারে নি যে প্রেমিকা এভাবে ছেড়ে চলে যাবে। এই বিরহে, এই যাতনার চোখ কাঁদছে। মন কাঁদছে। এরকম সরাসরি বেদনার কথা এখন আর আমরা বলি না। হয়তো মনে করি কথাগুলো ক্লিশে হয়ে গেছে। সবাই বলে বলে এমন করেছে, যে এই কথা এই অনুভব সত্য হলেও কেউ বিশ্বাস করবে না। চলে যাওয়া প্রেমিকাও বিশ্বাস করবে না! তাই আমরা ভণিতা করি, ভানে ভানে জড়িয়ে, উপমায় ডুবিয়ে বোঝাতে চাই সরল কথাটিকে। হয়তো সেই উপমা আর ভানের ভারে আসল কথা ঠিকঠাক ঠাহরও করা যায় না। বিগত-প্রেমিকা বুঝে কি না ছাই তা কে জানে!
====
You told me you were leaving
After all we’ve been through
Guess I’m a fool
Falling in love with you
There ain’t no use in cryin’
Do what you have to do
Guess I’m a fool
Falling in love with you
You told me that the kind of love we had
Will last for a million years
I believe everything you say
You filled my heart with tears
So long, pretty baby
Go break some other heart and two
Guess I’m a fool
Falling in love with you
=====

এইসব উচ্চকিত, শিল্পিত, চর্চিত অনুভবের প্রকাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ করে সরল-প্রকাশ পেলাম। ভালো লেগে গেলো। ইনসমনিয়ার সময় খুশি হলো। এখন এই ব্লুজে চেপে তোমার কথা ভাববো। মাঝে মাঝে এমন বিশেষ অবকাশ দরকার হয়ে পড়ে! 

মঙ্গলবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

চট্‌-মুহূর্ত

খুব অসামান্য মনে হচ্ছিলো - মুহূর্তটিকে। আমি যে মুহূর্তে তাকে, অর্থাৎ সেই মুহূর্তটিকে যাপন করছি, কিংবা পেরিয়ে যাচ্ছি, ঠিক সে সময়ই বুঝতে পারছি, এই মুহূর্তটি অভাবিত, তুলনাহীন! তাই মুহূর্তটির দিকে আমি তাকিয়ে থাকি। নিষ্পলক, নিনির্মেখ, নিশ্চল। অবশ্য মুহূর্তেরও সময় নেই এক মুহূর্ত। তাই চটজলদি সটকে পড়ে সে চোখের আড়ালে, হারিয়ে যেতে থাকে নিরেট দূরত্বে। মুহূর্তেই বুঝতে পারি আমি পিছিয়ে পড়েছি তার সাথে দৌড়ের রেসে। টগবগিয়ে এগিয়ে গেছে সে - আমি স্থানু।

আগে জানলে খুব সতর্ক থাকতাম, হুট করে এরকম বেখেয়ালে হারাতাম না। একটা ফোরসেপ হাতে, আপনি নিশ্চয়ই দেখতে পেতেন, আমি ঠিক ফার্মগেট কিংবা বাংলামোটর কিংবা নয়াপল্টন কিংবা স্টেডিয়ামের মোড়ে, খুব সতর্ক দাঁড়িয়ে আছি। মুহূর্তটি এসে গেলেই তাকে খপ করে তুলে আনবো সাঁড়াশি-ক্ষিপ্রতায়। তারপর সযতনে রেখে দেয়া যাবে, অনায়াসেই, অবসরকালীন শেলফটিতে। সেখানে অপরাপর স্মৃতি ও ক্রোধের সাথে রোজ ইশকুলে যাবে সে, আর ক্রমাগত আমার অন্যান্য মুহূর্তের সাথে ক্রূর রসিকতা করতে থাকবে...

শুক্রবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

কাঁড়া আর আকাঁড়া

ছেলেবেলা ম্যাজিকের মতো ছিল। কতোকিছু জানতাম না। কতোকিছুর কার্যকারণ আর কলকব্জা বুঝতাম না। তাই অজানা ব্যাপারগুলোকে ভেলকিবাজি মনে হতো। স্কুল ছুটি হলে এক আইসক্রিমের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতো, দু’টাকা দিলেই কমলা কমলা পলিথিনে মোড়ানো। একপাশের পলিথিন দাঁতে টেনে ছিঁড়ে ফেলতাম, তারপরে মুখের মধ্যে গলে গলে যেতো কমলার স্বাদ। ঠোঁট আর জিব একদম টকটকে কমলা হয়ে উঠতো। সেই আইসক্রিম বানানোর বিদ্যা অজানা ছিলো, খুব আশ্চর্য হতাম, রোজ এতো এতো আইসক্রিম কোথায় বানায়? কে বানায়? যে বানায়, সে কী জানে আমি এই আইসক্রিম কতো পছন্দ করি? জানলে কতোই না ভালো হতো!
 

তারপর একদিন বছর পাঁচেকের স্কুল-পেরুনো তাগড়া বড়ো ভাই বললো, এগুলো লম্বা লম্বা বরফ বানিয়ে তার ওপর চিনি আর রঙ মিশিয়ে পলিথিনে ভরে বিক্রি করে আর পানি নেয়া হয় মিউনিসিপ্যালিটির কল থেকে ফ্রি ফ্রি – - – শুনে আইসক্রিমগুলো আমার জিবের ওপর থেকে বাষ্প হয়ে চলে গেলো।
 


স্কুল বাসে করে বাসায় ফেরার সময় রোজ একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে স্পিডব্রেকার পড়তো। বাসটা একটু ঝাঁকুনি দিয়ে আবার চলতে শুরু করতো। আমি জানালা দিয়ে বাইরে ফুটপাতের পাশে দোকানপাট দেখতাম। স্পিডব্রেকারের কারণে ওই জায়গার দোকানগুলো নড়ে চড়ে উঠতো আমার চোখে। খুব অবাক হতাম, কোনোদিন পাশের কোন দোকান নড়ে না কেন, এই ভেবে। রাস্তার ওপরে স্পিডব্রেকারকে মনে হতো একটা অচল আঁচিল। কখনই সারবে না এমন দুশ্চিহ্ন। মাঝে মাঝে অনেক স্পিডব্রেকার পেলে মনে হতো হ্যাঞ্চব্যাক অফ নট্‌রড্যামের পিঠে চড়েছি। এবড়ো খেবড়ো কুঁজের ভারে নুয়ে থেবড়ে যাওয়া রাস্তার জন্য মায়া হতো।



একদিন বাস ড্রাইভার মামা বললেন, রাস্তা বানানের সময় কনট্রাকটর ট্যাকা খাইসে, তাই রাস্তাখান বচ্ছর যাইতে না যাইতে এই অবস্তা। ঠিকঠাক বানাইলে মাক্‌খনের লাগান একটা রাস্তা হইতো – - -
আমার ঘোর তখনো ভাঙে নি, তাই ভুল করে জিজ্ঞেস করলাম, স্পিডব্রেকারও কি তাহলে টাকা খাওয়ার কারণে জন্মায়?
 

পানের রসে রক্তজবার মতো কুচি কুচি দাঁত ঝিকিয়ে তিনি বললেন, ‘না গো মামা, ইসপিড বের্কার তো বানাই থোয় আমগো লিগা। আমরা য্যান ইসপিড বাড়াইতে না পারি। রাস্তা বানানের পর ইটা দিয়ে উচা কৈরা দেয় – - -
কুজের মতো, আঁচিলের মতো রাস্তার গা থেকে ধীরে ধীরে সব পচে গলে খসে পড়তে থাকে।
 


এভাবে ক্রমাগত আমার জাদুবিদ্যার ভ্রম ভেঙে যেতে থাকে। আমি এইসব ভাঙনে কষ্ট পাই। নিদারুণ বেদনায় দুঃস্বপ্ন দেখি। তারপর ঘামতে ঘামতে চেঁচিয়ে ঘুম ভেঙে হাতড়ে হাতড়ে জাদুগুলো খুঁজতে থাকি। বিছানার তলে গিয়ে ওগুলো হারিয়ে যায় চুপচাপ। টের পাই না। সদ্য ঘুম ভাঙা কষ্ট নিয়ে ভোর হওয়া দেখি। ভান করতে শুরু করি। ভ্রম ভেঙে গেলেও আমি অনেক কিছু শিখছি। শিখতে শিখতে আমি বেড়ে উঠছি। বুড়ো হয়ে পড়ছি। উঠতে উঠতে আর পড়তে পড়তে আমার ভালো লাগতে থাকে। আমার খারাপ লাগতে থাকে। ভালো লাগা আর খারাপ লাগা নিয়ে আমি একরকম আনকোরা সুখে ডুবে যেতে থাকি।

শনিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১১

ঘোলাপানি...

ফ্যাঁৎ!
  শীত চলে যেতে যেতে আবার ফিরে এলো। দরজা খোলা, আরেকটু অপেক্ষা করলেই বেরিয়ে চলে যেতো, টা-টা দিচ্ছিলো। কিন্তু কী মনে করে আবার ফিরে এলো। এবং একটু অপ্রস্তুত ছিলাম, তাই আবারও ঠাণ্ডা আঁকড়ে ধরলো আমায়। এই ঋতুতে তিন তিন বার সর্দি-কাশিতে জেরবার হলাম। বুঝতেছি না আমার রোগ-প্রতিরোধ কমেছে নাকি নিত্যনতুন ভাইরাসের প্রাচুর্য বেড়েছে। তবে হাঁচতেকাশতেফ্যাঁৎফ্যাঁতাতে আমার কাহিল দশা।

***

ভবিষ্যত!

এরই মাঝে বছর শেষ হয়ে গেলো। এই গত দশক খুব সজাগ কাটিয়েছি। মানে এই দশ বছরে দিন দুনিয়া চিনলাম। দশকের শুরুতে কৈশোর শেষ হচ্ছিলো, আর এখন সামনে তিরিশ হাতছানি দিয়ে হা করে আছে। তিরিশ ছুঁয়ে ফেললে মনে হয় আরো একটু বুড়ো হয়ে যাবার আশঙ্কা আছে। ধীরে ধীরে নখদন্তশ্বাপদ থেকে ভোঁতা হতে শুরু করবো। পুঁচকেদের হিংসা করতে শুরু করবো। খিটখিটে হয়ে যাবো জীবন-যাপনের থাবড়া খেয়ে খেয়ে। আজ যা কিছু আমার নতুন, আমার পরাণ, সেগুলো অতিব্যবহৃত ছোবড়ায় পরিণত হবে। তিরিশ তাই মনে ত্রাসের সৃষ্টি করছে। ভাবছি তিরিশের পর বয়েস গোনা উল্টে দিবো। পরের বছর উনত্রিশ হবো, তার পরের বছর আটাশ, ফের ঘুরপাক মধ্যগগণে! সবাই মানবে না, তাতে কী, আমি কি কাউরে ব'লে ক'য়ে পৃথিবীতে আসছি, না কারো কথায় গুডবাই জানাবো?

***
 
সেলসমাচার!

খালি বিদায়ের কথা বলতেছি। এখন একটু আগমনীবাতচিত করি। গত পরশু নতুন সেলফোন কিনতে গেলাম। বাজারে সবসময় থরে থরে সেট সাজানো দেখি, ঠাটবাট দেখে ভেতো বাঙালি, তাহাদিগকে সম্মান করি। শীতল ধাতব শরীরে চকমকে সেটগুলো আমার কুর্নিশে হালকা মাথা নাড়াতো। সেদিন কিনতে যাবার আগে ভাবলাম খালি বাইরের রূপে ভুলিবো না, ভিতরে কি আছে জেনে যাই। মানুষের ভরসা নাই, তাই ইন্টারনেটে বসে ঘাঁটলাম। আমার ছোটবোন বয়সে ছোট আর মননে বড়ো হওয়ার কারণে এই ব্যাপারে মোটামুটি ডিগ্রিধারী। সেলফোন নিয়ে কয়েকটা সাইট ঘুরে-টুরে বুঝলাম কোনো সেট হাতে নিয়ে "এই ফোনে কী কী আছে?" জিজ্ঞাসা করার চাইতে "এই ফোনে কোন ফিচারটা নাই?" প্রশ্নটা সহজ। দোকানির বলতে কম সময় লাগবে। আমার ভোঁতা-হতে-চলা মগজে যা বুঝ আসলো, এখন সেলফোন সেট একটা ছোটখাটো কম্পিউটার। ওএস আছে - সিম্বিয়ান, উইন্ডোজ, অ্যান্ড্রয়েড। এগুলোর মাঝে শেষেরটা সবচে ভালু মনে হয়। তারপরে আছে লুক-এর ব্যাপার, এখন টাচস্ক্রিনের যুগ। ওএস কতো র‍্যামে চলছে এটাও জরুরি। এটা দিয়ে টাচস্ক্রিনের দ্রুততাও হিসাব-যাচাই করে নিতে হবে। তারপরে আসে ওয়াই-ফাই এর হিসাব। ওয়াইফ হইলো না এখনু তাই ওয়াই-ফাই-ই সই। এটা না হলে চলছে না। এখন এই ওএস আর ওয়াই-ফাই আসলেই সেটের দাম আমার বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে!
এতোসব ঘোরাঘুরির মধ্যে মনে হচ্ছিলো নতুন যারা এখন বিশের কোঠা পেরুচ্ছে, তারা এই নতুন প্রযুক্তিগুলোতে বেশ মানিয়ে নিচ্ছে। এগুলো ব্যবহার করতে করতেই তারা হয়তো নতুন কিছু তৈরি করবে। কেউ কেউ মাথাপাগল জিনিয়াস নতুন ওএস বানিয়ে ফেলবে। আশাবাদী হইলে দিন ভালো কাটে আমার।

***

বইমেলা যাও!

বইমেলা আসতেছে সামনেই, আর দিন আটেক বাকি। প্রতি বইমেলার মাসটা আমার কাছে খুব আনন্দের। কতো কতো নতুন-পুরাতন বই, সেই বাংলা একাডেমীর মাঠ, বিল্ডিংয়ের দোতলার বারান্দা, স্টলের সামনে মানুষের ভীড়! আর পরিচিত আধাপরিচিত মানুষদের সাথে আড্ডা আর সাথে চা। আহ! সারা বছরের সব ঝুটঝামেলা আর কলুষ এক মাসে ধুয়ে যায়। আর বছর দুই ধরে ব্লগারদের সাথে আড্ডা বাড়ছে বইমেলাতে। এক কোণ ফাঁকা পেলেই তিন চার জন মিলে দিকবিদিক ভুলে সন্ধ্যা-রাত অবধি খোশগল্প চলে। রাত জমাট হইলে শেষ চা খেয়ে বাসায় ফিরি। আর শেষ দশ দিনে বেশি বই কিনি, লিস্ট করা শুরু করছি মনে মনে। গতবারের কেনা কিছু কিছু বই এখনো পড়া শেষ হয় নি, সেগুলোও তাক থেকে নামালাম পরশু। এই ধুমে পড়ে ফেলতে হবে!

***

তারপর!

মাঝে মাঝে কারো কারো কথায় হার্ট হই। ভার্চুয়াল জগতে কতো মানুষকে দেখলাম, কতো নটীর নাটক। এইসব দেখে এবং ঠেকে শিখেছি যে টেক্সটকে বেশি ভ্যালু দিতে নাই। ছোটবেলায় শিখেছিলাম ছাপার অক্ষরে ভুল থাকে না। পাঠ্যবইয়ে অঙ্কের ভুল উত্তর লেখা থাকলে সেটা মিলাতে গিয়ে মাথার চুলও ছিঁড়েছি কম না। সেই বেদবাক্যতুল্য অক্ষরকে ভালোবাসতেবাসতে আর সম্মান করতে করতে মজ্জাগত হয়ে গেছিলো। এখন ব্লগে যোগাযোগের অক্ষরগুলোকে তাই আলাদা মূল্যায়ন করা শিখলাম। বুঝে নিয়েছি যে মানুষ সামনাসামনি যেমন সামাজিক ভড়ং, ভণ্ডামি ও দ্বিমুখিতা দেখায়, ঠিক সেরকমই এই ভার্চুয়াল-পীঠ। ভালো খারাপ তকমা দেই না, এগুলো ঠিক যেমন, সেভাবে নেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করি। তারপরেও ভুলভাল হয়। মনের কাজ প্রজেকশন, নিজে নিজে ধইরা নেয় অনেক কিছু। স্টেরিওটাইপিং করে, গোষ্ঠিবাদ করে, ভুল বুইঝা চুপ যায়, ঠিক বুঝলে তেড়ে যায়। এইসব ভ্রান্ত-আচরণের চিপায় পড়ে (পড়ুন, পড়তে) ভালো লাগে না। তারপর মানায় নিতে হয়।
আজকে হঠাৎ মনে হলো, আকাশ ভাইয়ের সিনেস্থেশিয়া নিয়ে দুর্দান্ত পোস্টটা পড়তে পড়তে, যদি আমাদের মুখের অভিব্যক্তিগুলো টেক্সটের মধ্যে দিয়ে বুঝা যাইতো, তাইলে যেমন অনেকের গোমর ফাঁস হয়ে যেতো, তেমনি অনেকের কথার অবমূল্যায়নও বন্ধ হইতো। আমি বুড়োটে হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু হয়তো সদ্য-বিশে পা রাখা কেউ এরকম একটা কিছু আবিষ্কার করেই ফেলবে। তখন এই ব্লগ যারা পড়বে তারা কেমন মজা পাবে ভেবে একটু মুচকি মুচকি হাসলাম!

***

মঙ্গলবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১০

এলোমেলো ...

বনানী থেকে ফার্মগেইট হয়ে কাঁটাবনে মাত্র বিশ মিনিটে পৌঁছে গেলে সন্দেহ হয়ঃ ঘড়ি বিকল হয়েছে, অথবা এ শহরে মৃতদের বসবাস। অযুত মাল্টিভার্সের কোনো একটায় হয়তো এটা সম্ভব হতেও পারে। কিন্তু আমি যে শহরে থাকি, সেখানে পথেই আনন্দ!


টুকরো জিনিসগুলোর জন্যে মায়া হয়। অনেক বছর ধরে ওরা আমার সাথে আছে। দিনে দিনে ক্ষয়ে গেছে, সময় খুবলে খুবলে নিয়ে গেছে শরীর-মহার্ঘ্য। আমি কেবল খোলনলচে আগলে রেখেছি - পুরাতন স্মৃতির মতো। টুকরো জিনিসগুলোর ফিডেলিটির কোনো দাম দেয় না কেউ।


চাঁদ পৃথিবীর একটি উপগ্রহ। কোন্‌ কালে পৃথিবীর উদর থেকে ছিটকে গিয়ে জন্মেছে, নাড়ী কেটেছে ভ্যাকুয়াম। তারপরে মায়ের নাড়ীর টানে ঘুরছে। মাঝে মাঝে লুকিয়ে পড়ে, তবে মায়ের চোখ ফাঁকি দিতে পারে না।


মানুষ স্বভাবতই স্ক্র্যুড-আপ। আমি, তুমি, সে, তারা, আমরা, ও, ওরা, তারা, উনি, আপনি, উনারা, আপনারা। সব সর্বনাম বিশিষ্টজন নামসর্বস্ব হলেও, তারা সবাই মূলত স্ক্র্যুড-আপ। আমরা খালি ভড়ঙ আর ভান ধরি, মুখোশ পরি, পরিহাস্যের যাপনকাল।


সেদিন কম্পুখানা মারা গেলো। পাঁচশো গিগাবাইটের স্মৃতি মুছে গেলো এক মুহূর্তেই। জমে থাকা কথাগুলো, চিঠিগুলো, ছবি ও তোমার হাতে ধরে তিরতিরে প্রদীপ - মুছে গেলো। হারিয়ে গেলো খুনসুটির বছর, কান্নার দুইশ বিনিদ্র রাত। তার সাথে চলে গেলো জমিয়ে তোলা সবকিছুই।


সুঁইয়ের ছ্যাদায় সুতো ভরার মতো জীবনের এক ফুটো দিয়ে সব ঘটনা-রটনা পুরে দেয়ার চেষ্টা করছি। ঘটনাগুলোর বেখাপ্পা গড়নের কারণে বারবার হড়কে যাচ্ছে, ঠিকঠাক ঢুকছে না। মাঝে মাঝে করুণ রস জিবে করে ওগুলোকে ভিজিয়ে দিচ্ছি, নরম করে দিচ্ছি। তারপর ক্রুদ্ধ উৎকণ্ঠা, এবারে নিশ্চয়ই জীবন গুছিয়ে যাবে, মৃত্যুর আগেই জিতে যাবো শ্বাসরুদ্ধ।


এভাবে হয় না জেনেও ছেলেটা চেষ্টা করছে। চারপাশে অনেকে হা হা হা হা করে হাসছে তার ব্যর্থতায়। কিন্তু তারা খেয়াল করছে না এই সব ব্যর্থতা এক বিশালকায় স্তুপ তৈরি করে ফেলছে। দূর থেকে দেখলে সেটা পাহাড় বলে বিভ্রম হয়।

শনিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১০

বোদলেয়ার ও মানিকের সাথে টুকরো আলাপ...

যতো প্রযুক্তিই আসুক আর বাংলাদেশে বাস করে যতোই ডিজিটাল হয়ে উঠি না কেন, সেই ছাপার অক্ষরের বইয়ের কাছে ফিরতেই হয়। সেদিন খোলামকুচির মতো বিনা পয়সায় পাওয়া এক বিকালে বেশ মোটা আর গরম মানিব্যাগ নিয়ে বইয়ের দোকানে ঢুকেছি। যে নেশায় ডিভিডি কিনি, তার চেয়েও অবাধে বই কিনতে ইচ্ছা হলো। দুই হাতে বইলে টনটন করে য়্যাতো গাদা বই কিনে আনলাম।

তাদের সাথে উল্টেপাল্টে কথা হয়। এক টানা কোনোটাই বেশি সময় পড়তে পারি না, অন্যজন বেশ লাস্যময়ী 'লুক' দেয়, 'হিন্ট' দেয়। তাই বই থেকে বইয়ে ভাসি। ছাপার অক্ষরগুলো বালিশের সাথে লেপ্টে যায়, আমার সাথেই রাত ফুরোলে ঘুমায়।

বোদলেয়ারের "ক্লেদজ কুসুম" পড়েছিলাম যৌবনের শুরুতে, টগবগে রক্তে আগুন আর মদ ঢুকে গিয়েছিলো কবিতার ছদ্মবেশে। আর এতোদিন পরে হাতে পড়লো "প্যারিস স্‌প্লীন"। বিষণ্ণ কবির মুক্তগদ্য, তথা গদ্য কবিতা। উপমা আর দৃশ্যকল্পে ঠাসা, ছাড়া ছাড়া বুনোটের বাক্য দিয়ে এক একটা লেখা। অনুবাদ পশ্চিম বঙ্গীয়, এবং বঙ্গদেশের বাজে অনুবাদের গৌরব বজায় রেখে এক্কেবারে যাচ্ছে তাই। পড়তে পড়তে ফরাসি ভাষা না জানার আফসোস কামড়ে কামড়ে ধরলো, শেষে ইংরেজি অনুবাদগুলো পড়লাম। বাংলা অনুবাদকারীকে শাপশাপান্ত করতে করতে অগত্যা রস খেলাম অন্যের হাতে, ভিন ভাষায়! তবে বোদলেয়ার-পাঠের আনন্দে এই ভাষা-পথের দূরত্বটাকে পাত্তা দিলাম না।

বোদলেয়্যারের সাথে বাতচিতে মজে আছি, এমন সময় ওপাশে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পর্দার আড়াল থেকে ডাক দিলেন। "অপ্রকাশিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়" বইটা কিনেছি। ডায়েরি - চিঠির যে জঞ্জাল মানিক ফেলে রেখে গেছেন, তার মাঝে নাক ডুবিয়ে দিলাম। বিয়িং জন ম্যালকোভিচের মতো মনে হলো নিজেকে। ডায়েরি পড়তে পড়তে হোঁচট খেতে হয়, দিন পরম্পরা নেই, বিষয় পরম্পরা নেই, গল্পের প্লটের পরেই বাজারের ফর্দ, তার পরেই ডাক্তারের কাছ থেকে 'কিনতে হবে' ওষুধের লিস্টি, পরের পাতাতেই তিন বছর পরের ঘটনা লিখে রাখা (সেদিন বোধহয় ধর্মঘট হয়েছিলো)! মানিকের লেখার সাথে পরিচয় প্রায় দশ বছর, কিন্তু এখন যেন আরেক মানুষকে চিনলাম। রক্তমাংসে গড়া, জ্বল জ্বল করছেন, কষ্ট পাচ্ছেন, রোগে ভুগছেন, খকখক করে কাশছেন, ধুতির খুটে চশমা মুছছেন। আবার এসবের মধ্যেই দুর্দান্ত কোনো গল্পের প্লট লিখে রাখছেন তিন চার বাক্যে!! সুপারম্যান-ক্লার্ক কেন্ট, একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ!!

বোদলেয়ার ততোক্ষণে রুষ্ট কিছুটা। ডেকে নিয়ে এক চোট বকলেন। তারপরে নিচের লেখাটা পড়লাম। থমকে গেলাম মানুষের বর্ণনায় - - - -

Le Chien et le Flacon
"— আমার সুন্দর সারমেয়, আমার কোমল কুকুর, আমার প্রিয় কুতুয়া, এগিয়ে এসে শোঁকো তো, শহরের শ্রেষ্ঠ আতরও'লার কাছ থেকে কেনা এই অপূর্ব আতর!"
কুকুরটা খুব লেজ নাচিয়ে এগিয়ে এলো, মনে হয় আদতে এটা এই অবলা প্রাণীদের স্মিত হাসি আর বক্রোষ্ঠীর প্রকাশ, কৌতূহলভরে এগিয়ে এসে ওর ভেজা নাকটা ডুবিয়ে দিল আতরদানির খোলা মুখে, তারপর হঠাৎই ভয় পেয়ে পিছিয়ে গিয়ে আমার দিকে চেয়ে ঘেউঘেউ করে উঠলো, যেনো নিন্দা করছে।
"— ওরে ও হতভাগা কুত্তা! তোকে যদি আমি একদলা বিষ্ঠা দিতাম তবে তো তুই মহানন্দে শুঁকতি, হয়তো গিলেও নিতি, তুই এমনই আমার বিষণ্ণ জীবনের অযোগ্য সঙ্গী। তুই ঠিক ভিড়ের মানুষগুলোর মতোন, যাদের কোন সুগন্ধি দিতে নেই, তাতে ওরা অতিষ্ঠ হয়, ওদের দিতে হয় বাছাই করা গু।"

মূল লেখা


আমি নিজেও ভিড়ের মানুষ। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে কুকুরের মতো আমরা একে অপরের বগলে-ঘাড়ে ঘামের গন্ধ নিই। ওটাই আমাদের সয়। ফরাসি সৌরভে নাক জ্বালাপোড়া করে।

বোদলেয়ারের কথা শুনে মানিকও তার চশমা ঠিক ঠাক করে গলা খাকারি দিলেন। হাট করে খুলে গেলো নববর্ষের পাতা, ১৯৪৯ সালের, আজ থেকে ৬১ বছর আগের পহেলা জানুয়ারি...


১ জানুয়ারি, ১৯৪৯, শনিবার

এবারও কি সুরুতেই শেষ হবে? দেখা যাক। ডায়েরি রাখতে পারি না কেন? বোধ হয় এই ধারণা থেকে গেছে বলে যে ডায়েরি মানেই নিছক ব্যক্তিগত কথা! কয়েকদিন লেখার পর আর উৎসাহ পাই না।
ট্রামের প্রথম শ্রেণীর ভাড়া এক পয়সা বাড়লো! যাত্রীরা চটেছে মনে হলো না। বেশ খানিকটা হাল্‌কা ভাবেই বৃদ্ধিটা গ্রহণ করেছে। বরং যাত্রীদের এই উদাসীন ভাবে কণ্ডাক্টররা ক্ষুব্ধ — অশ্রদ্ধার সুরে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য শুনলাম দু'একটা, ভাবটা এইঃ কিছু হবে না এদের দ্বারা! মর তোমরা — আমাদের কি! ট্রাম ধর্মঘট ফেঁসে যাবার পর যাত্রীদের এভাবে ভাড়া বৃদ্ধি মেনে নেয়ার ফলে সংগ্রামী ট্রাম কর্মীদের এইরকম মনোভাবই স্বাভাবিক।
আসলে, বাবু যাত্রীদের তলিয়ে হিসার করা নেই — একবার টিকিট কাটতে মোটে এক পয়সা — আজকাল একটা পয়সা সামান্য! এই এক একটা পয়সা থেকে কোম্পানী যে গলা কেটে কতো মোটা লাভ করবে সেটা খেয়ালে আসে না। মনে পড়লেও গ্রাহ্য নেই — ভদ্রলোক তো — নিজের কথাই বড়োঃ আমাকে তো মোটে একটা করে পয়সা দিতে হচ্ছে — মরুক গে যাক! নীতিটা বড়ো নয় — অন্যায় করে একটা পয়সা কেউ আদায় করলে সেটা সহ্য করাও যে কতো বড়ো অন্যায় সে ধারণা নেই। ট্রামে ভীষণ ভীড়!

---০---


মানিক ঠিক ধরেছেন। ধ্বজভঙ্গ মধ্যবিত্তের নীতিবোধ দিনে দিনে আরো সুচারু এবং চালাক হয়ে গেছে। এখন আমরা নীতি নামক বস্তুটিকে জাদুঘরে তুলে রেখে দিয়েছি। ওটাতে তেল দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়, মাঝে মাঝে সপ্তা-এন্ডে জাদুঘরে ঘুরতে গেলে ওটা শিশুদের দেখিয়ে বিস্মিত করে দিই আমরা বয়োজ্যেষ্ঠ মধ্যবিত্তেরা।




মানুষে মানুষে মিল বা অমিল নিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ও চিন্তা বরাবরই ভিন্ন। সেরকম একটা গল্পের প্লট লিখে রেখেছেন, সময়াভাবে হয়তো লিখে শেষ করেন নি, বা করতে পারেন নি। প্লটঃ


গল্পের প্লটঃ বিশ্বাসী নির্ব্বিকার পূজারী — কিছুতেই বিচলিত নন — সন্তানের মৃত্যুতেও নয় — ঈশ্বর অবিশ্বাসী অন্যজন ধর্ম্মের কোন ব্যাপারে বিচলিত নয় — বিগ্রহ চুরি যাওয়ায় প্রথম জনের শোক — সন্তানের মরণে দ্বিতীয় জনের শোক — দুজনের শোক একরকম —


---০---


ডটডটঃ ভাবছি, বোদলেয়ার আর মানিক এই যুগে ব্লগ লিখলে কেমন বেসামাল অবস্থা হইতো?!

শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১০

রাতচারণ


দুপুর নিয়ে আমার প্রবল উন্মাদনা আছে। উন্মাদনা, অর্থাৎ সাধারণ্যের সমাজ ও প্রথানিয়ন্ত্রিত আচরণের বাইরে আচরণ। আমি এমন করি, জেনেশুনেই বুক-পকেটে উন্মাদনাসমূহ লালন করি বিবিধ বিষয়ে। জাগতিক তাড়না দিয়ে যেগুলো ইস্যু আমার হিস্যা নিয়ে নেয়- অর্থ, চাকরি, খাওন-দাওন এগুলো আমাকে উন্মাদ করে না। আমি হিসেবি ও খেয়াল করে দেখি এটিএম বুথের ভেতরে ছক ছক নম্বরের জোরে আমার প্রাপ্য খটাখট আমার করতলে চলে আসে। পাতলা হয়ে থাকা ওয়ালেটের ভেতরে শৌখিন রোলার স্কেটিং করে নোটগুলো জমা পড়ে।




অথচ আমি দুপুরের আলোতে উন্মাদ হই। জ্ঞান হবার পর থেকে আমি এই উন্মাদনাকে সহজাতভাবেই পেলেপুষে বড়ো করেছি। কখনো বেখাপ্পা লাগেনি নিজের কাছে, মনে হয়নি ভদ্রসমাজে এমন আচরণের কথা ভাবাও অভব্যতা। দুপুর অর্থাৎ দ্বিপ্রহর; সেই সময়টুকু পাহাড়ের চূড়ায় পত্‌পত্‌ করে উড়তে থাকা নিশানের মতোই কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকে। তারপরে হঠাতই গড়িয়ে পড়ে হারিয়ে যায়। হারানোর আগে আগে, স্পষ্ট দেখি দুপুরের ঝিম ধরা আলোর ভেতর থেকে একটা মুচকি হাসি আমার দিকে ফ্যালফ্যালিয়ে তাকাচ্ছে। তাকে পুরোপুরি পড়ে নেয়ার আগেই বিকেল চলে আসে। বিকেলের প্রতি আমার কোন মমত্ব নেই। বিকেলে মরা বিড়াল আবিষ্কার হয়।




আরেক দ্বিপ্রহরও আমাকে উন্মত্ত করে, সে নিকষ, সে তিমির, সে শুনশান। আর আমি সেই অনুভবের স্বরূপ চিনতে পারি নীরবতার মাঝেও, নিঃসন্দেহে বুঝি যে এটা অস্বাভাবিক। এমন স্তব্ধসময়ের প্রতি আমার উন্মাদনা মানায় না। এখন দরকার ধ্যানজ স্থিরতার, পানির উপরিতলের নিস্তরঙ্গতার। মনকে শান্ত করো, ইন্দ্রিয়গুলোর মুখ বুঁজে দাও। মোমের প্রলেপ দিয়ে দাও চোখে, তুলো দিয়ে মুছে দাও ত্বকের প্রদাহ। তারপরে নিঝুম ঘুম! কিন্তু আমি বড়ো বেখেয়ালি হয়ে পড়ি এ'সময়ে। বুঝতে পারি আমার ভেতরের ভাঙন রাত দ্বিপ্রহরকে ছুরির ধারে কাটছে। দেয়ালের ছবি আর মুখগুলো ধীরে ধীরে ধুয়ে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তাদের বিবর্ণতায় আমারও কেমন মরাটে লাগে। বিভ্রম হয়, মনে হতে থাকে এখন বেলা দুপুর। তীব্র ঝমঝমে রোদে পুড়ে যাচ্ছে রঙ। মরা পাতা খটখটে পাঁপড়ের মতো হয়ে উঠছে।




দেয়ালও একটা সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে। যেভাবে দুপুর আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলো, যেভাবে বিকেল এসে আমাকে তীব্র ঠাট্টাভরা অবহেলা করে চলে গিয়েছিলো, যেভাবে সন্ধ্যা খুব সন্দেহজনক হয়ে উঠেছিলো আর আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার সবকিছু ছিনতাই করে চলে গিয়েছিলো, পুলিশবেশী রাত অনেক দেরি করে এসেছিলো- ঠিক সেভাবেই রাত দ্বিপ্রহর আমাকে ফেলে চলে যায়। রাত বাড়তে থাকে তন্বী-কিশোরীর বেণীর মতোন। তার ভঙ্গিমা আমার কাছে অপরিচিত লাগে, দূর্বোধ্য লাগে। আমি আবারও চেষ্টা করি চোখ-কান বুঁজে সমাধির ভেতরে ডুবে যেতে। কিন্তু পারি না। সাঁড়াশির মতো দুটো কঙ্কাল হাত আমার হা-কোটরের ভেতরে আঙুলের হাড় ঢুকিয়ে সেটা খুলে রাখে। চোখবিহীন চোখে আমি চরাচরে রাতের লীলা দেখি। নিশিক্লান্ত অনেক অনেক মরদেহ মাটি ফুঁড়ে উঠে আসে, খেলা করে। তাদের ক্লান্তি কমে না। তারা শ্রান্তিতে টুকরো টুকরো হয়ে একসময় আবার নিজেদের শয়ানে শিশির হয়ে যায়।


হে আমার দেয়ালের মুখ, হে বিবিধ উন্মাদনা, আমাকে ঘুমুতে দাও!




***

বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১০

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক


সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ১:৫১

নিয়ন্তি,

মেইল করতে বলেছিলেন। মাঝে কী মেইল করবো বুঝে উঠি নাই বলে, করা হয় নাই।

খবর কি আপনার? রাতে ঝিমাচ্ছিলাম পিসি’র সামনে বসে।

হঠাৎ ডিং করে একটা মেইল আসলোঃ পিচ্চিদের নোট!

অথচ দেখি অফলাইন, তাই বুঝলাম না কি হইলো (?)

যাক ভালো থেকেন।

রাইন


-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-

সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ১:৫৯

রাইন,

আপনি কেমন আছেন? ঝিমান কেনো?

আমি জিমেইলে নাই। এটা আমার অফিসের ইমেইল অ্যাড্রেস। ঐ জন্যেই অফলাইন।

ভালোই আছি, কালকে অবশ্য অনেক জ্বর ছিল, অফিসেই আসি নাই। জ্বর হলে মন টন খারাপ হয়ে যায়। তাই অনেক গজল শুনলাম। :-)

বিলাই ভালো আছে। আসার সময় দেখে আসলাম আরামসে ঘুমাচ্ছে। মাঝে মাঝে আমার বিলাই হতে ইচ্ছা করে… কী ভালো হতো! সবচেয়ে ভালো হতো- ইফ আই ওয়্যার এ ক্যাট ইউথ এ হিউম্যান মাইন্ড….

কী করেন আপনি?

নিয়ন্তি


-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-

সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ২:১০

নিয়ন্তি,

ঝিমাই কারণ রাত দুইটা। ঢাকার মানুষ নিশাচর, এতো রাতেও নেটের স্পিড খারাপ। আজকালকার যুগে যদি “বেসিক এইচটিএমএল ভিউ” খুলে মেইল করতে হয় তাইলে মেজাজ খিঁচড়ে যায়। অবশ্য নেগেটিভ ঘটনার লাভ থাকে। আজকের লাভ, এখন ঘুম একটু কম!

পরে খেয়াল করলাম (আগে ঝিমুনির কারণে খেয়াল করি নাই) যে আপনি অফিসে। এখন নয়টা বাজে এবং শুক্রবারে বিদেশে লোকজন কাজ করে!

সবারই জ্বর হচ্ছে। আমাদের এখানেও। আমার প্রিয় মানুষটারও জ্বর! আজকে সারাদিন আমিও ব্যস্ত ছিলাম, সে আমাকে অনেক মিস করে, কিন্তু কথা বলারও সময় করতে পারি নাই। রাতে বাসায় ফিরে কথা হলো, খারাপ লাগলো তখন। সে ঘুমিয়ে পড়েছে এখন। আর আমি মন খারাপের ঠেলায় ঘুমাতে পারছি না!

সীজনটা খুব বাজে। বাতাসে মনে হয় ফ্লু-এর রেণু/জীবাণু ঘুরে বেড়াচ্ছে!! আমি মন খারাপ হলে, জ্বরে পড়লে পিঙ্ক ফ্লয়েড শুনি! ওরা আমার মন আরো বিষণ্ণ করে দেয়!! হা হা :-))

আমার মাঝে মাঝে চেয়ার টেবিল হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। জড়বস্তু হতে ইচ্ছা করাটা মনে হয় মাথা খারাপের লক্ষণ!

বকবকাচ্ছিলাম। অফিসে কাজ ফাঁকি দিয়ে পড়বেন! টাইপ করতে কষ্ট হইসে! ;-)

রাইন


-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-

সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ২:২০

রাইন,

বাহ! আপনার চিঠি কতো সুন্দর!

আমি কখনো এইরকম ফ্লুইড কথা লিখতে পারি না। আমার সব কিছু কেমন ছাড়া ছাড়া থাকে। আজকে জানেন, একদম মেঘলা বাইরে। আর আমার অফিসে চারপাশে কাচ। আর কাচের বাইরে টানা বারান্দা। চার তলার উপরে। আমার কেমন সুররিয়্যেল মতো লাগছে। মনে হচ্ছে আমি আছি কিন্তু নাই। এটা একটা ওপেন প্ল্যান অফিস, চারপাশে সবাইকে দেখা যায়, কথা শোনা যায়… সবার কথা মিলে মিশে আসলে কোনো কথা হয় না, শুধু একটা ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজের মতোন… একটা গুঞ্জন… অনেক সময় ঢাকার দুপুরের কথা মনে পড়ে।

আসলে আমার যে সময়কার কথা মনে পড়ে, ঐ সময়টা তো নাই এখন। এখনকার দুপুর নিশ্চয়ই অনেক আলাদা। তো, আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আম্মা আর বাড়ির সবাই দুপুরে ঘুমাতো। আমি কোনোদিন ঘুমাতাম না। আমাদের বাসা ছিলো ফুলার রোডের সামনে, ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টার্সে। বারান্দা থেকে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল দেখা যেতো আর ঠিক দেয়ালের পাশে একটা বিশাল গাছ ছিলো। তো, ঐ দুপুরগুলা অনেক স্লো আর ঝিম ধরা থাকতো, আর একটা কেমন… ধূলার গন্ধ… সাথে ঐ রকম ঝাঁ ঝাঁ ধরনের একটা শব্দ… এখন প্রায় ঐ রকম এখানে। যদিও এখন দুপুর না, যদিও এখন রোদ নাই… আর যদিও সময়টাও অন্য।

আপনার প্রিয়মানুষের নাম জানা হয় নাই। কেনো মন খারাপ আপনার? তার সাথে কথা হয় নাই, তাই? তার জ্বর আর আপনি ছিলেন না, এই জন্য?

জড়বস্তু আমারো হতে ইচ্ছা করে। অবশ্য আমার তো মাথা খারাপই! আমার আসলে অনেক কিছুই হতে ইচ্ছা করে… মাঝে মাঝে… আমার আমি হতে ইচ্ছা করে…

আরো অনেক লিখেন, আমার কাজ করতে ভালো লাগে না…

নিয়ন্তি


-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-

সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ২:৩৬

নিয়ন্তি,

ভালো লিখেন না, ছাড়া ছাড়া, এসব বলে যা লিখলেন তাতে আমি আবার তিন বছর আগের সময়টায় চলে গেলাম!

আমি তো হলে থাকতাম, ফুলার রোডের কাছেই, দুইটা রাস্তা পেরোলেই। আমিও ঐ গাছটা চিনেছি। এখন অবশ্য আরো গাছ হইসে ওখানে। হয়তো কোলাহলও আরো অনেক বেড়ে গেছে, যাওয়া হয় না আমারও অনেকদিন।

কী তাজ্জব! আপনি যেভাবে বললেন, আমি একটা টাইমে যশোরে থাকতে ওরকম অনুভব করতাম। স্তব্ধ দুপুর, মা ঘুমে। আমি ঘুমাইতাম না। বই পড়তাম। সুকুমার, শিবরাম, নয়তো বাংলা হাসির গল্প! পড়তাম, আর কল্পনা করতাম। চারপাশের পরিবেশটা আমাকে আরো মগ্ন করে দিতো। কখন আঁধার হয়ে যেতো! আম্মা এসে ঝাড়ি লাগাইতো, আন্ধারের মধ্যে বইসা পড়তেছিস, চোখের মাথা খাবি!! আমি পরের দিনও ওভাবেই পড়তাম। চোখের মাথা খেয়ে চশমা নেয়ার শখ ছিলো।

শখ অবশ্য মিটে নাই, কারণ চোখ খারাপ করতেই পারলাম না!

প্রিয় মানুষটা আজকে একটু আক্ষেপ করে বলেছে যে তার আমাকে অনেক মনে পড়তেছিলো। কিন্তু ভাবসে যে আমি ব্যস্ত, অফিসে,তাই ফোন করে নাই। আমি ভাবসি সে অসুস্থ, রেস্ট নিচ্ছে, তাই ফোন দেই নাই। সব মিলায়ে প্রায়ই ডিসকানেক্টেড!

পরে ‘আফসুস’ করলাম একটু। হা হা! সন্ধ্যায় তার জ্বর ঠিক হইসিলো, ভালো লাগতেসিলো শুনে। পরে রাতে আবার জ্বর আসলো! আমারও মন খারাপ হলো! ও কিছুদিন ধরে ভুগতেসে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ খুবই খারাপ। পারলে বকাঝকা করে যত্ন নিতাম, কিন্তু সেই অধিকারটা এখনও জন্মায় নাই। কিন্তু অধিকারবোধটা জন্মায় গেসে। আমার সঙ্গী এখন খালি দুশ্চিন্তা আর উৎকণ্ঠা!

আপনার অফিসরুম নিয়ে একটা কল্পনা মাথায় চলে আসছে। আপনি একটা বাব্‌লে বসে আছেন, কাচের বাব্‌ল- এজন্য গোলাকার না হয়ে চৌকোনা, এটা করা হইসে শুধুই আপনাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য। বাব্‌লে আটকে সবাইকে বসিয়ে রাখছে, আমার অফিসটাও চারিদিকে কাচ। পিছনে দেয়াল, তার মাঝেও একটা বড় জানালা! বাইরে আমি দিন শেষ হওয়া দেখি রোজ। বিকাল ভাঙা দেখি। আগে কতো বাইরে বাইরে ঘুরতাম ঐ সময়টা, বাসায় ফিরে আসতে ইচ্ছা করতো, বিপন্ন লাগতো, সবাই দুদ্দাড় করে বাড়ি ফিরছে আর আমি পথ খুঁজে বেড়াচ্ছি এমন বোধ হতো! আর এখন, একটা কিউবিক্‌লে বসে মাথা গুঁজে কাটায়ে দেই বিপন্নতা। আসলেই চেয়ার টেবিল হয়ে গেছি… বাসায় ফিরতে ফিরতে যখন রাত হয়, তখন টের পাই, আমি বহুদিন বিকাল দেখি না!!

রাইন

-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-


সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ৩:০৩

রাইন!

ইশ! কতো কিছু মনে করায় দিচ্ছেন!

আরেকটা গাছ ছিলো। ফুলার রোডের ঐ পাড়া। ভিসির বাড়ি আর ইউনিভার্সিটির মাঝখানে একটা আইল্যান্ড ছিলো, তিনকোনা। সেই আইল্যান্ডের মাঝখান... মাঝখানেই তো।
একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। আমি ল্যাবরেটরি স্কুলের যেতাম আর উইক-এন্ডে ঐ খানেই ছায়ানট, নাচ শিখতাম। কখন ফোটে কৃষ্ণচূড়া? গ্রীষ্মকালে?
পুরা রাস্তায় পাঁপড়ি ছড়িয়ে থাকতো আর আমি মাঝে মাঝে তুলতাম। ডায়েরিতে রাখতাম।

আমার একটা বান্ধবী ছিলো। নাম হলো দিয়া। ও পুরনো উদয়ন স্কুল যেখানে ছিলো, তার পাশের পাড়ায় থাকতো। একদিন এমন বৃষ্টি আসলো, ওর কোনো ছাতা নাই আর আমার কাছে একটা ছাতা। আমরা দুই জন এক ছাতার তলায় আসলাম দৌড়াতে দৌড়াতে। কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজলাম ঠিকই। পরে, আমার পাড়ার গেইট পর্যন্ত এসে ওকে দিয়ে দিলাম ছাতাটা। আর আমি আরো ভিজতে ভিজতে বাসায় ফিরলাম। বৃষ্টিটা অনেক ভালো ছিলো। অনেক!

চশমা নেয়ার আমারও শখ ছিলো জানেন? আমাদের বাসায় একটা ফ্যামিলি আসলো বেড়াতে। উনাদের তিন ছেলেমেয়ে। সবগুলার চশমা পড়তো! আমার শখ অবশ্য মিটেছে। এখন ড্রাইভ করতে হলে চশমা পড়তে হয়। কিন্তু এখন আর ভালো লাগে না। স্পেশালি বৃষ্টির মধ্যে মহা যন্ত্রণা। তখন মনে হয় চশমায় যদি ওয়াইপার থাকতো, গাড়ির মতোন!

কী দারুণ বলেন? যেই গাছটা আমি দেখতাম ঐ গাছটা আপনিও দেখেছেন। এটা একটা যোগাযোগ। আপনার সাথে আমার, না? এই রকম আমার ভালো লাগে। মনে হয় যে আপনাকে আরো কত্তো আগে থেকেই চিনি... যখন চিনতাম না...

সুন্দর করে বলসেন, অধিকারের কথা। অধিকারবোধ আর অধিকার এক জিনিস না, তাই না? বোধহয় একটা অনুরণনের মতোন... মাঝে মাঝে অধিকার জন্মাবার আগে থেকেই অনুভূতিটা থাকে... আবার শেষ হওয়ার পরও বাজতে থাকে।

নিয়ন্তি

-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-


সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ৩:৪৬

নিয়ন্তি,

আমি এমনিতে এখন মরবিড হয়ে আছি। মৃত্যুচিন্তা করি না, এটা আসলে আমার অস্তিত্ব নিয়ে আজীবন ধরে চলমান ভয়, শঙ্কা। আমি নিজের অস্তিত্ব হারাতে খুব ভয় পাই। এজন্য কখনই মৃত্যু নিয়ে ভাবি না।

বৃষ্টি নিয়ে আমার কলেজের একটা স্মৃতি মনে পড়লো। আমি তখন একটা কোচিংয়ে পড়তাম। এক স্যারের কাছে অঙ্ক, আরেকজনের কাছে কেমিস্ট্রি। একই গলিতে দু’জন স্যার, পড়ার টাইমটাও ছিলো পরপর। পড়া শেষ হলে হেঁটে হেঁটে বাসায় আসতাম।
ওটা পুরো ছেলেদের ব্যাচ ছিলো। তারপরে মেয়েদের ব্যাচে জায়গা হয়নি বলে দু’টা মেয়ে পড়তে এলো! আর সব ছেলেগুলা অতিরিক্ত এটেনশন দেয়া শুরু করলো, বুঝেনই সতের বছর বয়েস।

আমার কেনো জানি সতের বছরের তরুণীদের তখন থেকেই দূর্বোধ্য লাগতো। কথা, চাহনি, সবকিছু। তাই এড়িয়ে চলতাম। একজনের তাতে কৃপা হলো, আমার প্রতি নজর পড়লো। অন্য সব শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে সে আমার সাথে যেচে কথা বলতো। আমি তাতে বিরাট বিব্রত হতাম, বিব্রত হলে আমার কান লাল হয়ে যায়। যারা জানতো ব্যাপারটা সেই বন্ধুরা বিরাট ক্ষেপানো শুরু করলো! আর ক্রমেই আমার মেয়েটার উপরে রাগ বাড়তো।

অগাস্ট সেপ্টেম্বরের দিকে, বৃষ্টি মৌসুমে একদিন এরকম ঝুম নামলো। আমি হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি ফুটপাত দিয়ে, খেয়াল করলাম মেয়েটা বড়ো কষ্ট করে ছাতা সামলে যাচ্ছে। প্রচণ্ড বাতাস! ছাতা শেষমেশ ভেঙেই গেলো উল্টা হয়ে। আই দৌড়ে ওটা কুড়িয়ে দিলাম আর কী বেকুবের মতো বললাম, ‘স্যরি’, যেনো আমি ওটা ভেঙে ফেলেছি!
মেয়েটা ঐ বৃষ্টির তোপের মধ্যেও হেসে ফেলেছিলো। তারপরে ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে দ্রুত-হাঁটা। আমি আমার প্রায় খালি ব্যাগ (ওটার ভেতরে দুয়েকটা খাতা ছিলো) ওর মাথায় ধরলাম। মেয়েটা এমনভাবে তাকালো!!... ...

বাসায় ফিরে জ্বর, ঠাণ্ডা। কোচিং বন্ধ। তারপরে পরীক্ষা চলে এলো আর কোচিংটা বন্ধ করে দিলাম। পরীক্ষার পরে, মাঝে তিনমাস চলে গেছে, স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম একদিন দেখা করতে। মেয়েটা হতো অন্য কোনো কোচিংয়ে চলে গেছে। দেখা হয়নি আর কোনোদিন!

তখন বুঝিনাই, এখন বুঝি। এ ধরনের স্মৃতিগুলো মনে হয় মানুষকে অনেক বড়ো করে দেয়, পরিপক্ক করে দেয়। তখন যে ভাবালুতা কাজ করতো, মেয়েটার জন্য একটা করুণ কান্না পেতো মাঝে মাঝে। মনে হতো, ওকে একবার দেখতে পেলে বেশ হয়। জীবন নীরবেই শিখিয়ে দিচ্ছে, দেখা পেলে বেশ হতো না! তাতে আমার শেখা হতো না, যে মানুষের জীবনটাই এমন। ফ্রেম ফ্রেম সারি সারি মুখ, কিন্তু কেউই কারো আপন নয়!!

অনেক বাজে এখন। আপনার অফিস টাইমের বারোটা বাজাচ্ছি। স্মৃতিকাতরতা মার্জনা হউক!


রাইন

-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-


সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ৪:১০

ওয়াও রাইন!

আপনার বর্ণনা এত্তো ভিভিড। আমি মনে হলো দেখলাম আমার সামনে, আপনাকে, মেয়েটাকে… বৃষ্টি!
কী সুন্দর সব।

অনেক আগে আমি একটা গল্প লেখা শুরু করেছিলাম। ঐখানে বৃষ্টিতে একজনের সাথে প্রথম দেখা হওয়ার বর্ণনা ছিলো। আপনার কথা শুনে মনে পড়ে গেলো। ঐটাও ছাতা বিষয়ক... দেখি মনে হয় পুরানো ডায়েরিতে আছে এখনও, আজকে বাসায় যাওয়ার পরে পাঠাবো আপনাকে।

আরেকটা স্মৃতি এখন আমার মনে পড়লো। আমার একটা বন্ধু ছিলো, প্রদীপ। মানে বন্ধু আছে এখনও, কিন্তু যোগাযোগ নাই। সে মেলবোর্ন থেকে বেশ ভালো একটা ডিগ্রি নিয়ে এখন বাংলাদেশে কোন গ্রামে একটা স্কুলের হেডমাস্টার যেন। ওর বোন থাকে মেলবোর্নে, আমাকে বললো যে প্রদীপ নাকি গ্রামের রাস্তায় লুঙ্গি পড়ে মোটর-সাইকেল চালায়! এবং হাজার হলেও বিদেশে আসবে না...

প্রদীপ খুব সুন্দর গান করতো। একদিন, আমাদের বাসায় বসে গান করছে আর এই রকম সব কথা বলছে আমাকে... প্রথম প্রেমের স্মৃতি। তারপরে একটা মেয়ের সাথে অনেক ফোনে কথা বলতো, এই সব... কিছুক্ষণ পর ভাবলাম বীচ থেকে ঘুরে আসা যায়। তো, গেলাম। মেলবোর্নের ওয়েদার খুব বিখ্যাত হঠাৎ করে বদলে যাওয়ার জন্য। আমরা যখন বাড়ি থেকে বের হলাম, তখন বেশ সুন্দর রোদ। বীচে কিছুক্ষণ পরেই দুই এক ফোটা বৃষ্টি শুরু হলো। প্রদীপ বললো, “চলো ফিরি...”

তার মধ্যেই এমন ঝড় শুরু হয়ে গেলো। আর চারপাশ থেকে ধুলা উড়ে এসে একদম লাফ ঝাপ দিয়ে আমাদের গায়ে... এত্তো বাতাস, আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম! ও আমাকে হাত ধরে একটা দৌড় লাগালো, প্রায় ১০ মিনিটের মতো, একবারও হাত ছাড়ে নাই!

কী রকম অন্যরকম লাগলো তখন... কিন্তু জানেন, এর পরে আমরা কোনদিন ঐ দিনটা নিয়ে কথা বলি নাই... যেন কখনো ঘটেই নাই এটা... বা যেন আমরা ছিলাম না আসলে... অদ্ভুত না? আপনাকে হঠাৎ বলে দিলাম... এর আগে কাউকে বলিও নাই!

আমি আসলে কখনই খুব নিয়মিত কিছু করতে পারি না। বললাম না আমার সব ছাড়া ছাড়া? আমার মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছা করে আমি আগে কেমন ছিলাম... আসলে ভুলে গেছি। বা আমি কি আমিই নাকি, সেই সন্দেহও হয় মাঝে মাঝে।

আপনি মরবিড হয়ে আছেন? জানেন মৃত্যুচিন্তা আমার সাথে থাকে সবসময়... ... আর মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠলে আরো বেশি... কেমন খালি খালি একটা ব্যাপার হয় তখন। সন্ধ্যার সময় আগে বাসায় ফেরার সময় এরকম লাগতো... অথবা যদি কখনও দিনের বেলায় ঘুমিয়ে ঠিক সন্ধ্যার আগে আগে উঠি, তখনকার মতোন...

আপনি মোটেও খারাপ না... অনেএএএএক ভালো... অনেক লিখেন আরো, আজ কাজ-টাজ মাথায় থাক।


নিয়ন্তি

-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-





সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ৪:২৮

নিয়ন্তি,

আগের মেইলে বলবো ভাবছিলাম। কিন্তু নিজের কথা বলতে গিয়ে ভুলে গেছি। আপনি বলেছিলেন দেশে চলে আসবেন। সেই কথাটা কি এখনও মাথায় আছে? থাকলে মাথা থেকে নামায়ে কাজে রূপান্তর করেন তো ! এটা আমার জন্যে না, আপনার জন্যেই সাধাসাধি করতেছি।

আমার প্ল্যান ছিলো, পাশ করার পরপরই বাইরে চলে যাবো। ইউএস, নয়তো কানাডা, পড়াশোনা করতে নয়তো নেহাৎ চাকরি করতেই! তারপরে আমার যাওয়া হলো না। পাশ করার পরে চাকরিতে ঢুকে গেলাম। যে কয়দিন বেকার ছিলাম, খুব বাজে লাগতো। ভাবলাম, সময় আছে, এখনই বাইরে চলে যাই। যে সময়টায় সব প্রস্তুতি নিবো সেই সময়েই হুট করে চাকরি হয়ে গেলো। বেতনের জন্যে না শুধু, কীভাবে কীভাবে জানি চাকরির লোকগুলোকেও ভালো লেগে গেলো। আমি যা চার-পাঁচ বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ায় শিখি নাই, সেই ব্যাপারগুলো ছয় মাসেই শিখে ফেললাম। আমাদের চারপাশের অতিসাধারণ মানুষগুলোর কোন একটা ডাকিনীবিদ্যার মন্ত্র শেখা আছে। দেশ তো কোনো সত্ত্বা না, মানুষগুলোই দেশ গড়ে। আর একটা কথা চুপিচুপি বলি, এই সব দূর্নীতি আর গরীবিয়ানা আমাদের দেশের ভুল পোশাক। ভেতরের কাহিনী অনেক হৃদয়-নিঙড়ানো, অনেক গভীর জীবনবোধের। মানুষের জীবনটা আসলে এতোই ছোট যে সবকিছু ঠিকমতো বুঝতে না বুঝতেই পেরিয়ে যায়। বিদেশ বিভূঁইয়ে বসে সেটা যেদিন বুঝে যাবেন, হা-হুতাশ করা ছাড়া আর কোনো উপায়ই থাকবে না!

এখন আর আমার বাইরে যেতে ইচ্ছা করে না। সব বাদ।

আমার মা’কে ছাড়া থাকতে ভালো লাগে না। ছোটবেলা থেকেই মায়ের কোলঘেঁষা আমি। মা অনেক কষ্ট করেছে, আর্থিক কষ্টের চেয়েও বেশি, মানসিক কষ্ট। আমাকে অনেক সংগ্রাম করেই বড়ো করেছে। এগুলো সংগ্রাম দেখাও যায় না, শুধু যুদ্ধ করতে করতে তাঁর শরীর ভেঙেছে, মন দূর্বল হয়ে গেছে। হঠাৎ করে কেউ দেখলে চমকে উঠবে, এই মানুষটা এমন ভেঙে পড়েছে কেনো! কিন্তু উনি কাউকে বলবেন না এগুলো, মহীয়সী সেজে বসে থাকবেন!

আমি যতদিনে বুঝেছি ততদিকে অনেক অন্যায় করে ফেলেছি মায়ের সাথে। এখন মনে হচ্ছে মা ক্ষমা করেই দিয়েছে, কিন্তু আমার নিজের কাছে তো ক্ষমা হয় না। এজন্যেই বাকিটা সময়, তাদের কাছেই থাকবো।

আপনি চলে আসেন। দেশের বাইরে যাই নাই কখনো, চিন্তাও করতে পারি না কতোটা একাকিত্ব! আমি বন্ধুস্বজন হারায়ে কতো একা একা ফীল করি, তারা কিন্তু আশেপাশেই আছে। যোগাযোগ নাই খালি, তাতেই আমি শেষ। ছাইয়ের মতো রুক্ষ হালকা হয়ে গেছি!! আর আপনার মতো যারা বিদেশে আছেন, তাদের অবস্থা কেমন তা আমার “বিখ্যাত” কল্পনাতেও আসবে না। না হয় দেশে এসে লুঙ্গি না পড়লেন, মোটর-বাইক না চালাইলেন! ;-)

রাইন
(পুনশ্চঃ অফিসের কাজের মৃত্যু ঘটায়ে দিলাম বোধহয়?)



-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-


সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ৪:৪৫

রাইন,

হা হা! আপনার শেষ কথাগুলো পড়ে এমন জোরে হেসে উঠসি, আমার দিকে আমার কলিগ তাকাচ্ছে। বলে যে... “শেয়ার দ্যা জোক”। এখন এইটা কেমনে শেয়ার করি?
এই জিনিশগুলা খারাপ লাগে বিদেশে, সব তো বুঝানো যায় না। অবশ্য সেটা আর বিদেশ কেন... সব তো কোথাওই বোঝানো যায় না!

তবে হ্যাঁ। দেশে ফেরার চিন্তা মাথায় আছে আসলেই। কী করবো ওটাই হলো ব্যাপার। আমি আসলে বাংলাদেশের জন্য একদমই আনাড়ি। এখন গেলেও কেমন একটা হারিয়ে যাওয়া রকম লাগে। কিছুই চিনি না, নিয়ম বুঝি না... শুধু ভাষা বুঝি... আর চারপাশের মানুষগুলা দেখতে আমার মতোন... ... এই সব চিন্তা করে ভয় লাগে একটু। আবার নতুন সব কিছু!

তারপরেও ফিরবো। এই রকম ফ্র্যাগমেন্টেস থাকতে আমার ভালো লাগে না আর। ঐ যে বললেন... “সারি সারি ফ্রেম... মুখ...” ঐ রকম!

আমার মনে হয় দেশে ফিরলে এই... ছাড়া ছাড়া ভাবটা কমবে একটু। কারণ ছোটবেলার স্মৃতি তো আছেই ঢাকাতেই... তাই কিছুটা হলেও আমার মতোন লাগবে...

মাঝখান থেকে একটু একটু হাওয়া যদিও... তা সেই রকম তো হয়ই... পাজলের সব পিস এক সাথে বেশিদিন থাকে নাকি? আমার এরকম অনেক হারায়... তারপরে হঠাৎ কখনো ঘর পরিষ্কার করতে করতে সোফার পেছন থেকে, বা কার্পেটের তল থেকে, বা ম্যাট্রেসের নিচে আবিষ্কার করি! তখন মনে হয়, আরে, এ যে ছিলো আমি তো ভুলেই গেসিলাম, কী আজব! ঐ রকম হয়তো লাগবে আমার ঢাকায় গেলে, কে জানে...

আপনার আম্মার গল্প বলেন। কীভাবে কষ্ট দিলেন? বলেনননন...

আর হ্যাঁ, কাজের মৃত্যু ঘটসে আপাতত। বলেন ইন্নালিল্লাহ! :-)

নিয়ন্তি



-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-


সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ৫:১৪

নিয়ন্তি,

আপনার “ইন্নালিল্লাহ” পড়ে তো আমারো হাসি পাইলো! তবে ঘর ফাটায়ে হাসলেও কেউ শুনবে না!

ছোটবেলায় আমি সবসময় ১ম-২য়-৩য় হতাম সবকিছুতে। পড়াশোনা, খেলা, আবৃত্তি, গান, নাটক...
তারপরে বড় হতে হতে টের পেলাম এগুলো করে, পজিশন পেয়ে কোনো লাভ নাই। উল্টা পজিশন হারানোর ভয় মনে ঢুকে গেলো। পরের কম্পিটিশনে পজিশন করার প্রেশার তৈরি হলো। তাই ঠিক করলাম যে এখন থেকে স্বীকৃতি দেয়া স্থানগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।
লাস্ট বেঞ্চ। লাস্ট রুম।
লিস্টের মাঝামাঝি কোনো একটা ইররেলেভেন্ট পজিশন।

পাজল নিয়ে যা বললেন, সেটা খুবই মনে ধরলো! আপনার এক্সাম্পল গুলা এতো গুছানো, বুঝে নেয়া তো সাধারণ কথাতেই হয়, কিন্তু আপনি একেবারে বুঝে ওঠার আনন্দটাও দিয়ে দেন! আমার কি মনে হয় জানেন? এই যে কিছু মিসিং পিসেস, বা মাঝে মাঝে কিছু খুঁজে পাওয়া পিসেস যাদেরকে বাকিদের সাথে মিলানো যায় না, এগুলোও কিন্তু আপনার লাইফের পিকচারের অংশ! কে বললো যে সব এক রকম প্রগ্রেশনে কালার্‌ড হবে? ফুলার রোডের ঝিম ধরা দুপুর যেমন থাকবে, তেমনি নিউমার্কেটের ভীড়-ভাট্টা, হট্টগোল থাকবে, মেলবোর্নের যে কোনো একটা সী-বীচও থাকবে! তারপরে বুড়ি হবেন, ফোকলা দাঁতে নিজের অথবা প্রতিবেশির নাতনিদের এই সব পাজল পিসের গল্প বলবেন। আপনার পাজল ততোদিনে প্রায় মিলানো শেষ হবে, তাই না?? সেই তৃপ্তিটাও চোখে মুখে থাকবে।

এখন দেশে না ফিরলে আপনার পরে মনে হতে পারে যে সেই ম্যাট্রেসটা উঠায়ে দেখা হলো না তলায় কোনো পাজল আছে কি না! বা বিদেশে না গেলে যেমন জানতেন না জীবনের অনেক অনেক রূপ! (আমি কিন্তু বিনা খরচে উপদেশ বিলাচ্ছি। আমি জীবনের কোনো রূপই দেখি নাই, তায় আবার বিদেশ! ;-) )

তবে আমি জানি যে আপনি দেশে ফিরবেন। আপনার মা বেঁচে আছেন?? তার কথা জানাবেন আমাকে সামনে। আমার মা’কে আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি। আদরের সন্তান, এজন্যে মা আমার ব্যাপারে অনেক দূর্বল। তার উপরে ঝামেলা করতাম না, দুষ্টামি করলেও তা খুবই শিশুতোষ, ভাবুক টাইপ ছিলাম, ভাবুক সন্তানকে বাবা-মায়েরা কোনো এক অজানা কারণে অনেক জিনিয়াস ভাবে! হয়তো ঠিকমতো “ফিগার-আউট” করতে পারে না। চাপা স্বভাবের ছিলাম বলে আলগা খাতিরও পেতাম! আমি বড় হয়ে সেই সুযোগটাই নিয়েছিলাম...

জীবনের এই অংশটা আমি এক্সপ্লোর করতে চাই না। আমার নীরবতাটুকু মার্জনা করবেন!

আমি ভাবতেছি এখন আর ঘুমাবো না। একেবারে বাবা-মায়ের সাথে নাশতা করেই... হা হা হা!

রাইন


-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-


সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ৫:৩৪

রাইন,

হ্যাঁ, এখন তো আপনার ভোর হয়ে গেছে। আযান দিচ্ছে এখনও? আপনার বাড়ি থেকে আযান শোনা যায়?
আমাদের বাসা থেকে যেতো... একদম অন্যরকম লাগে শুনতে... বিশেষ করে ফজর আর মাগরিব...
আপনি কি সুন্দর করে পাজল নিয়ে বললেন... ইউ রিয়েলি হ্যাভ এ ওয়ে উইথ ওয়ার্ডস! শুনতে কখনই লেকচার লাগে না...

আমার আব্বাও এই রকম জানেন? ঢাকা ইউনিতে ইকোনোমিক্স পড়াতো আগে... এখন তো একটা করে সেমিস্টার পড়ায় এআইইউবি’তে। ঐ স্টুডেন্টদের কথা একদিন বলছিলো। বললো যে ওদেরকে পড়ায় নাকি ততো আরাম পেতো না প্রথম প্রথম, কারণ কেউ মনোযোগী ছিলো না। তারপরে একদিন ঝাড়ি লাগাইসে, একদম পুরানো স্টাইলের টিচারদের মতোন... আব্বা আব্বা ভাবে! তারপর থেকে নাকি অনেক ভক্ত হয়ে গেসিলো। তো একবার আব্বা আমাকে এক্সাম্পল দিচ্ছিলো ক্লাসে একটা থিওরি কীভাবে এক্সপ্লেইন করসে, ঐটা শুনে আমি তো মুগ্ধ হয়ে গেসি! থিওরিটা ইকোনোমিক্সের... একটা টার্ম আছে “প্রিজনার’স ডিলেমা”।

এটাকে... গেইম থিওরি বলে। ব্যাপারটা হলো এরকম। ধরেন দুই জন প্রিজনার, তাদের কাছে আলাদা আলাদা করে বললেন রাজসাক্ষী হতে। এখন একজন যদি রাজসাক্ষী হয়, তাহলে অন্যজনের লাইফ ইমপ্রিজনমেন্ট হবে আর সে হেল্প করার জন্যে মুক্তি পাবে। দুইজনই যদি বলে দেয়, দুইজনই শাস্তি পাবে... কেউই যদি না বলে... তাহলে চান্স আছে যে অপরাধ প্রমাণ হবে না... এবং কেউই শাস্তি পাবে না... ... এই থিওরি দিয়ে অনেক বিজনেসের মতিগতি বোঝানো হয়।

তো, আব্বা এইটা বুঝাতে গিয়ে ইন্ডিয়ানা জোনসের কথা বলসে ক্লাসে। মানে দুইটা জিনিশ বুঝাইসে একসাথে। একটা হলো যদিও ইকোনোমিক্সে ধরে নেয়া হয় যে হিউম্যান বিয়িংস আর র্যাসশনাল থিংকারস, সব সময়ই এরকম না। আমরা মাঝে মাঝে ইরর্যা শনাল কাজ করি... আরেকটা হলো প্রিজনার’স ডিলেমা... একটা সীন আছে যেখানে বাবা আর ছেলে থাকে... এবং তাদের সামনে দুইটা ড্রিঙ্ক... একটায় বিষ আরেকটা অমৃত। কোনটা যে কি কেউ জানে না। একজন একটা খেয়ে যদি মারা যায়, তাইলে অন্যটা অমৃত... আর বেঁচে থাকলে অন্যটা বিষ... যদিও র‌্যাশনালি স্পিকিং, বাবাকে দিয়ে টেস্ট করানো উচিত ছিল, যেহেতু তার বয়স বেশি এবং শক্তি কম... কিন্তু মুভিতে ইন্ডিয়ানা জোনসই প্রথম ট্রাই করলো ড্রিঙ্কটা (দেখেন, আব্বা আম্মার কথা বলতে গিয়ে আপনাকে ইকোনোমিক্স শিখাইতেসি!! আর আপনি বলেন আপনি লেকচার ঝাড়সেন?)

হ্যাঁ, আম্মা বেঁচে আছে ভালোমতোই... সে এখন পঞ্চান্নের মতোন। আম্মা আমার আব্বার চেয়ে অনেক ছোট, দশ বছরের ডিফারেন্স। এবং আমাদের সাথে বাচ্চাদের মতো ভাব তার। আসলে বিয়ের সময়... শী অয়াজ অনলি ফিফটীন। আর মনে হয় ঐ বয়সটাতেই আছে। যেমন সেইদিন কথা বলছি তার সাথে... কথার মাঝখানে হঠাৎ আব্বাকে বলে যে... “এই, তোমার পায়ে পোকা কামড়ায়!”

আমি বললাম... “পোকা আছে নাকি?”

বলে যে... “বাংলাদেশে অনেক পোকা... বড়ো, মেঝো, খাটো!” তারপরে ছড়া বলে... “তোর আব্বার তাড়া খাইয়া, আমার দিকে আসছে ধাইয়া, দিসি পড়া, গেসে মইরা!” এইটা নিয়ে হাসলাম অনেক... আমার একবার ইচ্ছা ছিলো তিন গোয়েন্দার মতোন একটা সিরিজ লিখবো। সেইখানে তিন বোন থাকবে তিন গোয়েন্দা আর তাদের মা থাকবে প্রবলেম সলভার। পরে আর লেখা হয় নাই...

কতো কিছু যে ইচ্ছা করে!

ওহ! আপনি কানাডা যাবেন কেনো? নিউজিল্যাণ্ডে চলে আসেন বরং... আমি এখানে থাকি... তাই সার্টিফিকেট দিচ্ছি... অনেক সুন্দর দেশ... মানুষজন ভালো অনেক... আর এই দেশের maori name হলো aotearoa মানে...দ্যা ল্যান্ড অফ লং হোয়াইট ক্লাউডস........



নিয়ন্তি




-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-



সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ৬:১৬

নিয়ন্তি,

বাহ! কতো মিল পাই। আমি তো নিউজিল্যান্ডে আসবোই না তাহলে। লর্ড অফ দ্যা রিংস দেখে নিউজিল্যান্ডের প্রেমে পড়েছি। ওখানে নিউজিল্যান্ড কতো সুন্দর দেশ সেটা বুঝা যায়!

আমি সুন্দর কোনো দেশে যাবো না। গেলে শেষে দেশের প্রেমে পরে যেতে হবে। তারপরে যখন বাংলাদেশে ফিরবো, আমার কাছে মনে হবে এখানে জ্যাম, ধুলা, ধোঁয়া, গ্যাঞ্জাম, ট্র্যাফিক, মানুষ খারাপ। বাসাগুলা তখন শ্যাবি লাগবে, টয়লেট ময়লা লাগবে, বিদেশের সিস্টেমে ফরম্যাট হয়ে গেলে সেই ভার্সন দেশে অচল!! বাইরে থাকা আত্মীয়দের দেখেই বুঝি এই ফারাকটা। তাদের দোষ নাই, আমাদেরও উপায় নাই। যার যার সিস্টেম তার তার কাছে। এজন্যে আমি বেঁচে থাকা কঠিন এমন দেশে যাবো, যেখানে সৌন্দর্য উপভোগের সময় পাবো, কিন্তু আরাম পাবো না। দেশের বৃষ্টি, মাটি, কাদা, ধুলার জন্য মন কাঁদবে। তারপরে কাজ (পড়া) শেষ হলেই ফিরে আসবো! :-)

আপনার বাবার পড়ানো আমার পছন্দ হইসে। যে টিচার ক্লাসে মুভির উদাহরণ থেকে গল্প করতে পারেন, তিনি বস!! ওনার মতো কয়েকজন টিচার ক্লাসে পাইলে আমাদের অনেক উপকার হইতো। শুধু শুধু ক্লাসগুলা বাংক করে রেজাল্টের বারোটা বাজানো লাগতো না!

আমার মা কেমন শুনবেন? অনেক নরম সরম আর ভালোমানুষ ধরনের। আমার এলোমেলো জীবন-যাপনের পেছনে সে নিজে দায়ী কি না এটা অনেকদিন ধরে চিন্তা করেছে। তার ধারণা, আমি যা করেছিলাম, এমন জীবন কাটাচ্ছি, এটা তার কোনো একটা ভুলে হয়েছে। তার এই ধারণা ভাঙাতে আমার অনেকদিন লেগেছে।

গত উইকএন্ডে গিয়েছিলো বসুন্ধরা হাউজিংয়ে। আমার আব্বা অনেক আগে একটা জমি কিনেছিলো ওখানে, সেটা তদারকি করতে। পাঁচিল দিবে, হিসাব-নিকাশ ইত্যাদি। আমি বললাম, “কেনো?”
বলে, “টাকা জমাইসি, এই জমিটা তো আমার নামে, এখানে একটা দুইতলা বাড়ি করবো, তারপরে আমরা থাকবো। তুই উপরের তলা নিবি না নিচের তলা?”
আমার কী হইলো, ঐ দুপুরে গরম রোদের মধ্যে দাঁড়িয়েই গলার মধ্যে দলা পাকিয়ে গেলো তাল তাল কান্না! বললাম, “আমার কিছু লাগবে না, আমি যা কামাই, তা দিয়ে অনায়াসে চলে যাবে।”
তখন বলে যে, “তা তো যাবেই। কিন্তু তুই কাছে থাকলি, আমার টেনশন করতে হবে না। বুড়া বয়সে দূরে দূরে থাকবি আমার দিন কাটবে টেনশন করে করে।”

বলেন! এইসব ব্ল্যাকমেইলিং কেমন লাগে!

মায়ের গল্প বলতে থাকলে এই মেইল আর শেষ হবে না। আপনিও পুরোটা না পড়েই ডিলিট করে দিবেন! আমি বরং থামি।


ইতি

রাইন

(আমি একটু শুবো। মাথা ঘুরতেছে। অনেকদিন পরে এমন সারা রাত জাগলাম। এই মেইলের রিপ্লাই দিতেও পারেন, নাও দিতে পারেন। পরে আবার কথা হবে...
শুভ দুপুর-ভোর!)



-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-



সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ৭:২২

রাইন,

হ্যাঁ, ঘুমান। (বাবা-মায়ের সাথে নাশতা খাওয়ার প্ল্যান বাতিল?)

আপনাকে সারা রাত জাগিয়ে রাখলাম আজকে। অবশ্য এজন্য আমার একটুও দুঃখ লাগছে না... অপরাধবোধও না! কারণ আমি জানি আমার কাছে লিখতে আপনার ভালোই লাগলো, আমারও যেমন। না? :-)

লর্ড অফ দ্যা রিংস আমারও খুব প্রিয় একটা মুভি। আমরা প্রত্যেকটা হলে গিয়ে দেখসি। কয়েকটা দৃশ্য আছে এতো সুন্দর। ঐ দৃশ্যটা মনে আছে আপনার? একটা বনের মধ্যে দিয়ে এল্‌ভ্‌সদের একটা দল হেঁটে যাচ্ছে। সবাই খুব সুন্দর... পারিপার্শ্বিক সুন্দর... সবাই নীরব... ঐটা দেখলেই আমার স্বপ্নদৃশ্য মনে হয়।

আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র হলো... স্যাম। আর খুব সুন্দর একটা দৃশ্য একদম শেষ অংশতে... যখন ফ্রোডো ফিরেছে জয়ী হয়ে আর সবাই ওকে ঘিরে আছে, পরদিন সকালে আস্তে চোখ খুললো চারপাশে অনেক মুখ... সবাই খুশি, সবাই গর্বিত... সবার এক্সপ্রেশনে মায়া... ভালোবাসা... ফ্রোডো সারাঘর খুঁজতে থাকে... আর হঠাৎ করে স্যামের মুখ উঁকি দেয় দরজার আড়াল থেকে। আর খুব স্মিত হাসে। আর কেউ দেখে না ওকে, শুধু ফ্রোডো ছাড়া... কী সুন্দর না?

আমি যতোবার ঐ অংশটা দেখি আমার কান্না চলে আসে... আমি অবশ্য সবসময় মুভি দেখলে অনেক কান্নাকাটি করি!

আমার কী মনে হয় জানেন? যতোই সুন্দর হোক দেশ... যে কোনো কিছু... বেহেস্তের মতোন হোক, তবু মানুষের মধ্যে তার বড়ো হওয়ার জায়গাটার প্রতি আলাদা একটা টান থাকে... আর কোনোকিছুই “হোম” না... তাই... আপনার বিদেশী আত্মীয়রা যেমনই হোক, আপনি কখনোই ঐ রকম ফীল করবেন না আমি জানি। যে দেশেই যান... শেষমেশ ঐ ধূলা, কাদা, ভীড়, ট্রাফিক এই গুলাই মিস করবেন। আমি মাঝে মাঝে আমার বন্ধুদের ফোন করি, ওরা যখন রাস্তায় থাকে। চারপাশের এতো শব্দ! গাড়ির হর্ন... মানুষের কথা! আমার অনেক অনেক ভালো লাগে... মনে হয় আমিও ঢাকার রাস্তায়। কিছু ভালো লাগা থাকে, যা ভিতরের... বাইরের আপাতত সৌন্দর্য বা আগলিনেসের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নাই। কি যেন একটা কবিতার লাইন আছে না? “নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা!” ... অথবা নজরুল গীতি মনে পড়ছে এখন... “যত ফুল ততো ভুল কণ্টক জাগে, মাটির পৃথিবীটাই এতো ভালো লাগে... স্বর্গের প্রেমে নাই বিরহ অনল, সুন্দরও আঁখি আছে, নাই আঁখি জল...”

চোখের পানি বলেন, অনুভূতি অথবা স্মৃতি... এই গুলা মিসিং লিঙ্ক। যখন আমি ঢাকার কথা ভাবি, তখন একটা মায়ার প্রলেপ থাকে ভাবনার ওপরে... তাই কোনকিছু খারাপ লাগে না... সব ভাল...

আপনার আম্মার কথা শুনে আমার অনেক ভালো লাগছিলো... সব বইলেন... একদম মহাকাব্য লিখলেও আমি খুশি!

আপনার জীবন-যাপন এখন কেমন? আমার তো এম্নিতেই আপনার সাথে কথা বলে যে ধারণা হয়, তাতে মনে হয় অনেক অগোছালো... বাবা-মা আসলেই আজব জিনিশ। মাঝে মাঝে ওরা কতো কিছু কল্পনা করে কষ্ট পায়, অপরাধবোধে ভোগে, অথচ আমাদের হয়তো ঐসবকিছু মনেই থাকে না। আমরা তিন বোন, আমি সবচেয়ে বড়ো এবং আমার বাবা মায়ের মতে, সবচেয়ে বোকা... ওদের বেশিরভাগ চিন্তা আমাকে নিয়ে থাকে, কারণ আমি নাকি অনেক ভালনারেবল্‌ , একা একা কিছুই পারি না! অথচ ওদের ধারণার চেয়ে আমি অনেকই অন্যরকম। শেষ বার যখন ওরা আমার এখানে বেড়াতে আসছিলো, তখন একবার আব্বা নোটিস করেছে যে আমি রাবিশ বিন নিয়ে রেখে আসছি ড্রাইভ ওয়েতে, যেখান থেকে উইকলি কালেক্ট করে... ঐটা দেখেই আব্বা একদম ইমপ্রেস্‌ড! ‘আমার মেয়েটা কী রেসপন্সিব্‌ল হইসে, কত্তো কাজ করে!’...

আমার এই রকম ভালো লাগে... আর আপনার মতোনই হঠাৎ করে কান্না চলে আসে, একটা পৃথিবী থাকবে, যেখানে একদিন আমার বাবা মা থাকবে না, অথচ আমি থাকবো, আমি এখনও এমন ভাবতে পারি না... বা বিশ্বাস করতে... আস্তে আস্তে মানুষের যাওয়ার জায়গা কমতে থাকে, না?

আপনি এতোক্ষণে নিশ্চয়ই খুব ঘুমাচ্ছেন! আমি তো মাঝখানে লাঞ্চ-ব্রেক নিয়ে আবার আসলাম। এই চিঠির উত্তর যদি দেন, তাহলে আমার অন্য একাউন্টেও cc করে দিয়েন, নয়তো সোমবারের আগে দেখা হবে না।

অনেক ভালো থাকেন আর সুখে নিদ্রা যান!


ইতি

নিয়ন্তি




-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-


ডিসেম্বর ৮, ২০০৯ রাত ১:৩৪


নিয়ন্তি,

আজকে সারাদিন খুব ব্যস্ত গেলো। খুবই ব্যস্ত। আমার ভিসা হয়ে গেছে। বিদেশ চলে যাচ্ছি। আমার যাওয়ার পুরোপুরি ইচ্ছা ছিলো না, কিন্তু অবস্থা এমন হয়েছে! আমার চারপাশের সবকিছু ভেঙে পড়ছে। আমি ঠিক জানিও না আমি এখন এখানে কী করছি, কেনো করছি। নিঃশ্বাস নেয়াটাই যদি জীবন হয় তাহলে সেটাই এখন কাটছে।

আপনার সেদিনের ভোরে পাওয়া মেইলটা সারা সকাল ঘুমিয়ে দেখতে দেখতে দুপুর। পরের কিছুদিন ভর্তির দৌড়ে কাটলো। তারপরে আমার ভর্তিটা হয়ে গেলো। এর পরে ভিসাটাও। মনে হলো আজকে আপনাকে একটা মেইল করা যায়।

আপনার অফিসের মেইলে এর মাঝে দুয়েকটা মেইল করেছি। আপনি কি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছেন? মেইলার-ডিমোন আমাকে অশুভ শয়তানের মতোই বড়ো বড়ো নোটিশ পাঠিয়েছে যে আপনার ঠিকানা ইনভ্যালিড। ভেবে দেখলাম চাকরি না ছাড়লে মেইল একাউন্ট ডিলিট করার কথা না।

আমাকে জানাতে পারতেন। তিন মাস কেটে গেলো, জানাননি। যাক, জানাননি যখন…

এই মেইলটা একই নামের জিমেইলে পাঠাচ্ছি। শিওর না যে আপনি পাবেন। শিওর না যে আপনি পড়বেন আর জবাব দিবেন। সেই রাতের সবগুলো মেইল আমি মাঝে মাঝে পড়ি। পুর্নেন্দু পত্রী কেন কথোপকথন লিখলেন?

আমি গতকাল ফুলার রোডে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে এখন শীত, রোদ পড়ে আসলে হাড়ে কাঁপন লাগে। আমি সেই বড়ো গাছটার নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। সেই মেয়েটাকে কল্পনা করার চেষ্টা করলাম, যে অনেকদিন আগে এখান দিয়ে ঝুম বৃষ্টিতে হেঁটে গিয়েছিলো। মেয়েটা এখানে নাই। তার স্মৃতিটা আমার কাছে দিয়ে গেছে।

এই মেইলটা যদি না পান, তাহলে বেশ অদ্ভুত ব্যাপার হবে, মেইলার-ডিমোন বেটা আমাকে দুইবার করে ওয়ার্নিং দিবে যে আমি বোকার মতো মাথা খুঁড়ে মরছি। ভার্চুয়ালি আমি আরো একবার সেকেলে প্রমাণিত হবো।

পুরোপুরি হইনি যদিও, কারণ আমি বিদেশ চলে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি, কোথায় থিতু হবো এগুলো বলবো না এখন। যোগাযোগের সেতু তৈরি হলে... হয়তো... হয়তো না।

মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের মেইল করার আয়ু আমরা এক রাতের সব মেইলেই শেষ করে ফেলেছি। সেজন্যেই আর কথা হলো না, সেজন্যেই আর যোগাযোগ হলো না। মাঝে মাঝে আমার কাছে সবকিছু অবাস্তব মনে হয়, স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হয়...

মেইল পেলে শুভেচ্ছা নিবেন। আর না পেলে বাতাসে সেই আন্তরিক শুভেচ্ছাটা পাঠিয়ে দিলাম। মেসেজ ইন আ বটল!






রাইন


-০-০-০- -০-০-০- -০-০-০-
.
.
.
.
.
ডিসেম্বর ১০, ২০০৯ রাত ১:৩৪


Mail Delivery Subsystem

To: rayeen.****@gmail.com

This is an automatically generated Delivery Status Notification

Delivery to the following recipient failed permanently:

niyontee.****@gmail.com

Technical details of permanent failure:
DNS Error: Domain name not found

- Show quoted text –







***

(সমাপ্ত)


২২/১/১০~২৮/১/১০

শনিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০১০

তুমি জানবেও না যে এই লেখাটা তোমায় নিয়ে...

আ,


ছোটবেলায় আমি একবার দৌড়ের রেসে নেমেছিলাম। অনেক প্রাণপণ দৌড়ে নিঃশ্বাসের শেষবিন্দুতে পৌঁছে দেখি আমি হেরে গেছি আরেকটা ঢ্যাঙা ছেলের কাছে। সেদিন ফিনিশিং লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে আমার অনেক কান্না পাচ্ছিলো, ছোট ছিলাম। আবেগী ছিলাম। এখনও হতচ্ছাড়া আবেগ আমায় ছাড়ে না। সেদিন থেকে হারতে বড়ো কষ্ট হয় সবসময়।


 ২
বছরের বিশেষ দিনগুলোতে আমাদের কখনোই দেখা হয় না! এটা খুব অদ্ভুতভাবে তুমি একদিন বললে, কী নিয়ে যেনো আমাদের মধ্যে খুটখাট লেগে গেলো আর তুমি বললে, খুব ক্লান্ত স্বরে, যেন এই কথাগুলো বলতে তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে! বললে, “তুমি কি খেয়াল করেছো যে আমরা কোন উৎসবের দিনে, আয়োজনের দিনে, দিবসগুলোতে দেখা করতেই পারি না!” আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম হয়তো, তাই ভেবে দেখলাম যে আসলেই পারি না। কিন্তু এটা নিয়ে বলার কিছুই ছিলো না। দেখা না করার কারণ আমরা হইনি কখনো। পরিপার্শ্ব আমাদের কতোভাবে বেঁকেচুরে দেয়। সহস্র আকাঙ্ক্ষার গলা পরিস্থিতির চাপে বুজে আসে অনায়াসে, যেনো কোনো বাগানের মালি গাছে পানি দেয়ার নলটা অনায়াসে বুজে দিলো!


এক একটা বছর যায় আর আমি অবাক হই, কীভাবে বিস্তর বিস্তর স্মৃতি জমা হয়। আমি জন্মের পর থেকে এক একটা স্মৃতির ঘর বুনছি। কত হর্ষ, বেদনা আর বিরহ জমা হয়ে আছে, অমলিন আর্কাইভের মতো। কিন্তু তুমি এলে আর এসব ঘরের চাবি হারিয়েই ফেললাম আমি। টেরও পাই না যে সেই দুঃস্মৃতির ঘর আমার বুকের ভেতরে এখনও আছে!


দুর! আজকের দিনে কেনো আমি এসব বলছি। কিন্তু জানো তো, আমি কেমন মেলাঙ্কলিক-অ্যালকোহলিকের মতোন। মাঝে মাঝে রেট্রোস্পেক্টে নিজেকে দেখি, আর ভাবি আমি কীভাবে খাদের একটু পাশ দিয়ে সাঁ করে বেরিয়ে এলাম। তুমি সামনে ছিলে নিয়ত ঘূর্ণির বছরটা জুড়ে ছায়ার মতো একই গতিতে ঘুরেছি দু’জনেই। এতো দ্রুত দিনগুলো পেরিয়েছে যে মাঝে মাঝে টের পাই নিঃ আমি অনলাইনে একজনের সাথেই কথা বলছি, রোজ রোজ। প্রতিদিন। তুমিও খেয়াল করেছিলে? আমি কতটা অপেক্ষা করতাম, অপেক্ষার মুহূর্তে কী ভাবতাম এখনও সব জানি।


ঝকঝকে দোকানটার চেয়ারগুলো ঠাণ্ডা ছিলো, সেটা শীতের জানুয়ারি ছিলো। আমি কাঠ হয়ে বসে ছিলাম আর তোমার অপেক্ষা করছিলাম। তুমি একটা নীলচে বেগুনি জামা পরে আসলে, জামায় শাদা শাদা ফুল। এসে সামনের চেয়ারটা টেনে বসলে আর আমি জমে গেলাম। আমার হাতে একটা প্যাকেট ছিলো, প্যাকেটের ভেতরে পোকা ছিল। পোকা না, একটা ঝিনুক ছিলো। ছোট প্যাট্রিফায়েড ঝিনুক। ঝিনুকটা একটা চাবির রিঙের ভেতরে সারাজীবনের জন্যে আটকা পড়ে গেছে! আমি সেই প্যাকেটটা তোমার দিকে ঠেলে দেয়ার সময়ে একটু একটু কাঁপছিলাম মনে হয়। সেদিন তো বুঝি নি, সেই প্যাকেটের ভেতরের চাবির রিঙে আমার সবটুকু বাঁধা পড়ে গেছে…


তোমার সাথে এর পরে আমার যতোদিনই দেখা হয়েছে, আমি সেই কম্পনটা টের পেয়েছি। এটা কোনো বলার মতো বিষয় না, বরং হয়তো দুশ্চিন্তার বিষয়। আমি নিশ্চয়ই উদভ্রান্ত অসুস্থ কেউ! নাহলে কেনো আমি এমন সম্মোহিত হবো, কেনো একজনের চোখের দিকে তাকালে আমার আর কোনোকিছুই ভালো লাগবে না– তাকে ছাড়া। কেনো কারো খিল খিল হাসি শুনলে আমি মোবাইল কোম্পানিকে ধন্যবাদ দিবো আর সারাজীবনের জন্যে চার্লি চ্যাপলিনের চেয়ে বড়ো কমেডিয়ান হয়ে যাবো! কেনো সে ব্যস্ত আর পাঁচ মিনিটের বেশি দেখা করতে পারবে না জেনেও আমি ঠা ঠা রোদ্দুর অনায়াসে মাথায় মেখে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবো! এতোসব কেনো বড়ো অস্থির করে আমাকে!


আমি জানি তুমিও আমার মতোই কাঁপো। আমি নিশ্চিতভাবেই জানি এই খেলাঘরে তুমি আমার চেয়ে বেশি আমাকে ভালোবাসো। নিজের ওপর দাবি ছেড়ে দিয়েছি সেদিনই, চাবির রিঙের সাথে তোমাকে দিয়ে দিয়েছিলাম স-ও-ব!
এই প্রথম আমি হেরে গিয়ে অনেক খুশি হয়ে গেছি। এই প্রথম আমি জেনেছি সব দৌড়ে জিততে নেই। মাঝে মাঝে ফিনিশিং লাইনে সবচে কাঙ্ক্ষিত মানুষটি দাঁড়িয়ে থাকে শুধুই আমার জন্যে…