সমকামিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমকামিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৬

রূপবান!

আজকে একটা দরকারে ডাক্তারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তার কাছে কিছু বিষয় জানার দরকার ছিল। অপেক্ষাগৃহে বসে নামধাম পূরণ করার কিছুক্ষণ পরে ডাক এলো। হাসিমুখে ডাক্তার এসে কথা বললেন। শান্তভাবে সমস্যার কথা জানানোর সময় কম্পিউটারে লিখে নিচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে কিছু প্রশ্নও করছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে সমাধান আর করণীয় ব্যাখ্যা করলেন। কী কী করতে হবে বলার সময় পাশে রাখা একটা নোটপ্যাড নিয়ে লিখে দিচ্ছিলেন। খেয়াল করলাম, ডাক্তার বাঁহাতি। সামনে বসে বাঁহাতি কারো লেখালেখি দেখতে বেশ মজা লাগে, কারণ বেশিরভাগ মানুষই (প্রায় ৮৭-৯২%) ডানহাতি। সচরাচর দেখা যায় না বলে হাতের আঙুলের নড়াচড়াগুলো অদ্ভুত সুন্দর লাগে। যখন ক্যাডেট কলেজে পড়তাম, তখন আমার আগের ক্যাডেট নম্বরের বন্ধু বাঁহাতি ছিল। ভর্তি হবার পরে আমাদেরকে ক্যাডেট নম্বর অনুযায়ী থাকতে হতো। পরে এলোমেলো হলেও ছয় বছরের তিন বছরই এই বন্ধুর পাশের জায়গাতেই থেকেছি। প্রথম দিকে ওর লেখার সময় হাতের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, স্রেফ কৌতূহল থেকেই। ও কেমন করে অক্ষরগুলো লিখছে, দেখতে মজা লাগতো।

বাংলাদেশের সমাজে অজস্র কুসংস্কারের মধ্যে একটা হলো যে বামহাত = খারাপহাত, আর ডানহাত = ভাল হাত। কে কবে কীভাবে এই ফালতু নিয়ম আবিষ্কার করেছে, কে জানে! (আমার আজকাল ধারণা হয় বাঙালিদের কুসংস্কারগুলো পায়খানাঘরে গেলে তৈরি হয়। হাগু করতে করতে অলস সময়ে এসব 'হাগু-ক্যাটাগরি'র আইডিয়া মাথায় আসে।) মানুষ একটা চমৎকার প্রাণী, যার দুইহাতই সমান কর্মক্ষম। আজ আমরা জানি যে বামহাত ডানহাতের কোন ভাল-খারাপ নেই। যে যে হাতে দক্ষ, সে সেই হাতে কাজ করতে পারে। বামহাতকে 'খারাপ' বলার মূল কারণ বাঁহাতিদের স্বল্পতা হতে পারে। সাধারণত বাঁহাতির সংখ্যা ১০%-এর মতো, অর্থাৎ গড়ে প্রতি নয়জনে একজন বাঁহাতি হবে। যেহেতু এটা সচরাচর দেখা যায় না, তাই ওই নয়জনের ডানহাতি হওয়াটাই 'স্বাভাবিক' আর একজনের বাঁহাতি হওয়াটা 'অস্বাভাবিক' বলে মিথ্যা নিয়ম বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। এই নিয়মের চক্করে পড়ে আমাদের দেশের অনেক বাঁহাতিকেই ছোটবেলায় লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হতে হয়। বাঁহাতে লেখা বা ধরার সময় মেরে-পিটিয়ে তাকে ডান হাত ব্যবহার করতে শেখানো হয় (আমার নিজের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেই এমন ঘটনা আছে)। আজ আমরা জানি যে শিশুকে তার দক্ষ হাত ও পা ব্যবহার করতে না দিলে সেটা  তার মস্তিষ্কের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সে যতটা চটপটে হতে পারতো, ততটা হতে পারে না। চিন্তা করুন এভাবে কত মানুষকে কষ্ট করে নিজের কম দক্ষ হাতে লিখতে, খেতে, ধরতে শিখতে হয়েছে!

মানুষ হবার একটা সীমাবদ্ধতা হলো আমরা অন্যের অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারি না। এজন্য অনেকসময়ই তাদের অভিজ্ঞতাকে তুচ্ছ মনে করি। এই হাতের সক্ষমতা তার একটা ভাল উদাহরণ - সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানুষ হবার পরেও পরিসংখ্যানে কম পাওয়া যায় এমন বৈশিষ্ট্য থাকায় একজন মানুষের ওপরে নানাভাবে আমরা অন্যায় বোঝা চাপিয়ে দেই। কখনো বুঝেশুনে দেই, কখনো অজান্তেই দেই। এরকম আরও অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই কালো বা বাদামি বর্ণের। এই রঙের কোন ভাল-খারাপ দিক নেই। তারপরেও যারা অতিরিক্ত কালো বা অতিরিক্ত সাদা, তাদেরকে নানাভাবে হেয় করা হয় না? বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই গড়ে সাড়ে পাঁচ থেকে পৌনে ছয় ফুট (পুরুষ) আর পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ফুট (নারী) হয়ে থাকেন। এই সীমার বাইরে যারা অতিরিক্ত লম্বা বা অতিরিক্ত বেঁটে, তাদেরকে কি হেয় করা হয় না? বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ মুসলমান। এর বাইরে যে যে ধর্মের মানুষ আছেন, তাদেরকে কি নানাভাবে হেয় করা হয় না? এই বৈশিষ্ট্যগুলো কিন্তু কেউ বুঝেশুনে বেছে নেয় না, বা খেটেখুটে অর্জনও করে না। জন্মের আগেই আমাদের ডিএনএ'র সংকেতের মধ্যে লেখা হয়ে যায় আমরা পুরুষ-নারী, লম্বা-বেঁটে, ফর্সা-কালো, ডানহাতি-বামহাতির মধ্যে কোনটা হবো। আমাদের বাবা আর মায়ের জিনের বৈশিষ্ট্যকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই! আর জন্মের পরপরই ঠিক হয়ে যায় আমরা কোন ধর্মের মানুষ হবো। এরকম random, arbitrary, coincidental, accidental বৈশিষ্ট্য দেখে আমরা কত সহজেই মানুষকে অপমান করি, তুচ্ছ করি। 

কী অদ্ভুত পরিহাস! যেটা আমরা নিজেরা বেছে নেই না, যাতে আমাদের নিজেদের কোন হাত নেই, তার কারণে সারাজীবন কষ্ট পেতে হয়। এটাই সমাজের নিয়ম! অথচ যে বিষয়গুলো আমরা নিজেরা ভেবেচিন্তে বেছে নেই, সেগুলোর কারণে আমাদের এতোটা জ্বালা-যন্ত্রণা পোহাতে হয় না।

নিজের ইচ্ছায় বেছে না নেয়া আরেকটা বৈশিষ্ট্য আছে, আমাদের লিঙ্গ (sex) আর যৌন-পছন্দ (sexual preference)।  মনে করার চেষ্টা করুন তো, বয়ঃসন্ধিতে যে মানুষটিকে ভাল লাগতো, সেটা কি আপনি নিজের ইচ্ছায় বেছে নিতেন? নাকি ব্যাখ্যার অতীত এমন এক অনুভূতি এসে আপনাকে টালমাটাল করে দিতো? আপনি ছেলে বা মেয়ে বা বৃহন্নলা, যাই হন না কেন, কাউকে ভাল লাগার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। আপনি বড়োজোর বলতে পারেন পছন্দের মানুষটির কোন কোন দিক আপনার ভাল লাগে। আমাদের যৌন-পছন্দ প্রধানত শারীরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। আমরা অন্য মানুষের শারীরিক কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হই। কিন্তু এটাই একমাত্র নিয়ম না। আমাদের মধ্যেই কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাদের যৌন-পছন্দ মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। শারীরিকভাবে আপনি যতই আকর্ষণীয় হন না কেন, যদি তারা মানসিক আকর্ষণ বোধ না করে, তাহলে আপনাকে ততটা পছন্দ করতে পারবে না। যদি আপনি প্রথম গ্রুপের  হয়ে থাকেন, তারপরেও মানসিক আকর্ষণের প্রভাব কিছু পরিমাণে আপনার মধ্যেও আছে। অনলাইনে বা ফোনে যখন কারো সাথে পরিচিত হয়ে আকর্ষণ বোধ করেন, কাউকে সামনাসামনি না দেখেই, সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? শুধুমাত্র গলার স্বর বা টাইপকরা অক্ষর দেখেই কি আকৃষ্ট হন না? পরে হয়তো শরীরের টান ছাপিয়ে যায়। অন্য গ্রুপের ক্ষেত্রে উল্টোভাবে ঘটে - সামনাসামনি দেখে ভাল লাগা হতে পারে, কিন্তু প্রচণ্ড আকর্ষণ তৈরি হয় মানসিক স্টিমুলেশনে, যা শুধু অন্যজনের কথা বা চিন্তাতেই সম্ভব। এই দুই ভাগ ছাড়াও আরও বিচিত্র ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভাগ আছে।

এখন বলুন, এদের মধ্যে কোনটা খারাপ? আর কোনটা ভাল?

নিয়মটা কি আপনি ভেবেচিন্তে তৈরি করেছেন? নাকি অন্য কেউ আপনার জন্য তৈরি করে রেখেছে? যে তৈরি করেছে, সে যে সবকিছু জানে বা বোঝে  - এমন তো নাও হতে পারে। আগেই দেখলাম যে আমরা অন্যের অভিজ্ঞতা বুঝতে অক্ষম, তাই জেনে না-জেনে অপরকে অপমান করি। ওটা যদি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে এটাও ভুল। অন্যের অভিজ্ঞতা যেহেতু আপনি জানেন না, সেহেতু আপনার কোন অধিকার নেই তাকে হেয় করার। খেয়াল করে দেখবেন, অন্যরা কিন্তু আজ এসে আপনাকে বলছে না যে আপনি নিজের পছন্দমতো কাউকে ভালবাসতে পারবেন না (আজকাল বাবামায়েরাও অনেক সময় বলতে পারে না)। যারা বলে, যারা জোর করে চাপিয়ে দেয়, তখন আপনার কেমন লাগে? খুব খারাপ লাগে না? ভালোবাসার মানুষকে না পেলে সবারই খারাপ লাগে।

আমরা যেসব পুরানো ক্লাসিক গল্পতে মজা পাই, তার প্রায় সবগুলোই প্রেম-ভালবাসার। আর সেসবের অধিকাংশই কোন না কোন কারণে বাধা পেয়েছিল। কখনো পরিবার, কখনো সমাজ, কখনো বয়স, কখনো যুদ্ধ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভালোবাসার মাঝে। মুনীর চৌধুরীর "রক্তাক্ত প্রান্তর" মনে আছে? ইব্রাহিম কার্দি আর জোহরার প্রেম? কিংবা লাইলী-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট, দেবদাস-পার্বতী, অমিত-লাবণ্য, কুবের-কপিলা? এরকম অসংখ্য দুর্দান্ত গল্পের মিল কোথায় বলুন তো? এগুলো সবি মানুষের বিচিত্র, অব্যাখ্যাত, বর্ণনাদুঃসাধ্য ভালোবাসার জয়ের গল্প। পাত্রপাত্রী মোরে গেলেও যেখানে ভালোবাসা জিতে যায়। এগুলোকে আপনি accept করে নিতে পারছেন কীভাবে? পারছেন কারণ এদের প্রেমে আপনার কিছু যায় আসে না। এরা বিয়ে করলে আপনি টাকা পাবেন না, এরা মরে গেলেও আপনার চাকরি চলে যাবে না। সুতরাং কোন দুজন রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষের প্রেমের মাঝখানে বাগড়া দিয়েন না। তারা যদি সরাসরি আপনার কোন ক্ষতি না করে, তাহলে তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দিন। কড়াভাষায় যাকে বলে, "নিজের চরকায় তেল দিন"।

আর তারপরেও হয়তো আপনি ভাবছেন, "আমার কিছু যায় আসে না, কিন্তু তবু এটায় সমাজের ক্ষতি, মূল্যবোধ অবক্ষয়, সংস্কৃতির অপমান" ইত্যাদি। তাই আমি এই বিষয়ের বিরোধিতা করবোই", তাহলে বলতেই হয়, যে আপনি আসলে একজন *** ভাই। আপনার জীবনে কাজের এতোই অভাব যে আপনি অন্যের ভাল থাকা দেখতে পারেন না। পায়খানায় বসে বসে ফন্দি আঁটেন কীভাবে অন্যের ভাল থাকায় বাগড়া দেয়া যায়। সমাজে আপনার ইনপুট অতোটুকুই! আপনি মরে গেলে মাটির তলে পঁচবেন বা আগুনে ভস্ম হবে। দুইক্ষেত্রেই আপনাকে কয়েকদিন পরে সবাই ভুলে যাবে। আর যাদের ক্ষতি করেছেন, বা যাদের কুৎসা গেয়েছেন, তারা উঠতে বসতে গালি দিবে, "শালা একটা *** ভাই আছিলো। মরছে ভাল হইছে!"

রবিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৪

লজিকন ডায়রি

আজকে আমাদের ক্যাম্পাসের "লজিকন" (LogiCon) ছিল। এটা অনেকটা কমিকন-এর মতো উৎসব, মূলত ছাত্র সংগঠনের উদ্যোগে বিজ্ঞান, সংশয়বাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন বক্তা এসেছিল। আমি আগ্রহ নিয়ে গেলাম কারণ কার্ল স্যাগানের ছেলে ডোরিওন স্যাগান আসবেন key-note speaker হিসেবে কথা বলতে। কিন্তু তার চাইতেও ভাল লাগলো আরেকজনের কথা।

সারাদিনের অনুষ্ঠান, কিন্তু ছুটির দিনে সকালে আলস্য নিয়ে উঠতে উঠতেই দুপুর। লাঞ্চের পর গেলাম, দেড়টার দিকে ড্যারেল রে মঞ্চে উঠলেন। বিষয়টা ছিল যৌনতা ও লিঙ্গের বিবর্তন। খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার-স্যাপার। অভিজিৎ রায় একটা ব্লগ সিরিজ (পরে যেটা বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে) লিখেছিলেন, "সখী ভালোবাসা কারে কয়"। সে সিরিজটা পড়ে কিছু কিছু বিষয়ে জানা ছিল, তবে আজকে ড্যারেলের স্পিচ থেকে আরো নতুন নতুন বিষয়ে জানলাম। বিবর্তনের ধাপে আমাদের মাসতুতো ভাই জানতাম গরিলা আর শিম্পাঞ্জিকে। বোনোবো নামে আরেক মাসতুতো ভাই আছে যার কথা প্রথম শুনলাম। এবং বোনোবোর সাথে আমাদের মিলই বেশি!

ড্যারেল লোকটা খুবই মজা করে কথা বলেন। আরকানসাস একটা গোঁড়া রিপাবলিকান স্টেট। তিনি নিজেও ক্যানসাস স্টেটের মানুষ, আশির দশক পর্যন্ত চার্চের সাইকোলজিস্ট ছিলেন। আর এখন ধর্মত্যাগী মানুষদের কাউন্সেলিং করেন। এই অঞ্চলের মানুষ ধর্মের ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষের মতই আচরণ করে। সমাজে ধর্মের প্রভাব, কুসংস্কার, বর্ণবাদ, এগুলো অনেক তীব্র। চার্চের সামাজিক ক্ষমতাও প্রবল। এখানে সমকামিতা পাপ, গর্ভপাত অবৈধ। এরকম বদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা যে কারো জন্যই ধর্মত্যাগের জন্য যথেষ্ট মোটিভেশন লাগার কথা। ড্যারেলের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ছেড়ে দেয়ার পেছনে তার পেশার অভিজ্ঞতা একটা বড় প্রভাবক ছিল বলে মনে হলো।

পেশার কারণে বিভিন্ন মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব নিয়ে সরাসরি কাজ করেছেন তিনি, আর নিজের ভেতরেও এমন ধর্মের দমন-পীড়ন অনুভব করেছেন নিশ্চয়ই। যেমন, যৌনতার সাথে ধর্মের সাপে-নেউলে সম্পর্ক। এজন্য ধর্মের ভেতরে থাকা মানুষ যৌনতা নিয়ে কথা বলতে অসম্ভব লজ্জা, অস্বস্তি এবং বাধা বোধ করেন। ধর্ম যৌনতাকে ধামাচাপা দিতে চায়, যা আসলে প্রকৃতিবিরুদ্ধ ব্যাপার। এই পীড়ন এতোটাই প্রবল যে নিজের জীবনসাথীর সাথে যৌনতার ব্যাপারগুলো নিয়ে আলাপ করেন না অনেকে। এই দমনের কারণে শিশু ও কিশোর-বয়সীরা সঠিক যৌনশিক্ষা পায় না। বেশিরভাগই এতটাই অজ্ঞ থাকে যে কোন পারভার্ট যদি সেক্সুয়াল এবিউজ করে, সেটা ঠেকানো তো দূরের কথা, বুঝতেও পারে না। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে যেমন, যৌনতার এই অবদমনের কারণে যৌনবিকারগুলোর ছড়াছড়ি দেখা যায় বেশি। দেখা গেছে, যে স্টেটে এই দমনমূলক আচরণ কম, সেখানে বিকারগুলো কম। যেখানে স্কুলে-কলেজে সঠিক যৌনতা শেখানো হয়, সেখানে ধর্ষণ কম, ইন্টারনেটে পর্ন খোঁজার পরিমাণও কম। এসব ডেটা নির্দেশ করে যে যৌনতার আলাপকে ডাল-ভাত খাওয়ার মতো ব্যাপার না বানালে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।

যারা এরই মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ে যৌনতার ট্যাবু কাটাতে পেরেছেন, তাদের মাঝেও অনেক সময় ছোটবেলার শেখা আচরণের কিছু কিছু থেকে যায়। যেমন নিজের শরীর নিয়ে লজ্জা বা অস্বস্তি। অন্য একজন মানুষকে ভালোবাসার আগে নিজেকে ভালোবাসা জরুরি। আমি এই পৃথিবীতে একবারই জন্মাবো, আর এই জন্মে আমার শরীর একটাই। সেই শরীর বোঝা হয়ে গেলে বেঁচে থাকাই তো দুস্কর, তাই না? তাই নিজের শরীরটাকে সবার আগে ভালোবাসা লাগে। এটা আমাদের ধর্মে নিষেধ করে। প্রায় সব ধর্মেই করে। নিজের শরীরকে আরাম দেয়া এক গর্হিত অপরাধ! অথচ কোন যুক্তি হয় না। ধার্মিক হলেও এটা চিন্তা করা উচিত, যে আপনাকে যা মানতে বলা হচ্ছে, তা মেনে আদৌ কোন উপকার হচ্ছে, নাকি ক্ষতি হচ্ছে।

আরেকটা বড়ো ট্যাবু হলো নারীর যৌনতা। এইটা যেন একটা রূপকথার ইউনিকর্ন! যেন নারীর কোন যৌনতা থাকতেই পারে না। সে হবে পুরুষের যৌনতা মেটানোর মাধ্যম মাত্র। অথচ নারী, পুরুষের মতোই যৌনতাবোধ করে। এটা পুরুষকে যেমন জেনে ও মেনে নিতে হবে, তেমনি নারীকেও বুঝতে হবে। নারী বা পুরুষ, সর্বোপরি মানুষ হলে তাকে অপর একজন মানুষের যৌনতার ব্যাপারে নন-জাজমেন্টাল অবস্থান আমাদের প্রজাতি হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষ তো সুবিধাবাদী আর ক্ষমতাবান বলে নারীর ব্যাপারটা বুঝতে চায় না। সেটা তবু আমি বুঝতে পারি। ধনী কখনো গরীবের কষ্ট বুঝে না। দুঃখের ব্যাপার হলো, নারীও বুঝতে চায় না। নারী হয়েও আরেক নারীর যৌনতার প্রকাশকে পুরুষের মতো করেই নিন্দা করে। বেশি দূর যেতে হবে না, আমাদের আশেপাশেই এরকম উদাহরণ পাবেন। নারীর পোশাক ও জীবনধারণ নিয়ে কথা বলার সবচেয়ে বড় ঠিকাদারিটা অন্য নারীরাই নেন। এই ভণ্ডামি আর কতোদিন!  

এই আলাপটা বেশ গুরুগম্ভীর বিষয়, কিন্তু পুরো টক-টা এরকম ছিল না মোটেও। এগুলো ফাঁকে ফাঁকে এসেছে। মূল ফোকাস ছিল এই যে জীবদেহের সবচেয়ে দ্রুত বিবর্তিত জিনগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্য এবং বিভিন্নতায় যৌন-জিনগুলোই সবচেয়ে এগিয়ে। অর্থাৎ, প্রাণী ও উদ্ভিদে যৌন-জিন সবচেয়ে তাড়াতাড়ি বিবর্তিত হয়। এই জিনের প্রভাব বাহ্যিক হতে পারে (যৌন-অঙ্গের আকার ইত্যাদি), কিংবা হতে পারে আভ্যন্তরীন (যৌন-আচরণের বিচিত্রতা)। বংশগতি বা heredity এর কারণে নিজের সবচেয়ে সফল জিনকে যেমন আমরা পরের প্রজন্মে দিয়ে দিতে চাই। এই চেষ্টাটা মাধ্যম যৌন-অঙ্গ এবং যৌন -আচরণের ওপর নির্ভর করে বলেই এরা আশেপাশের পরিবর্তনের সাথে দ্রুত বদলে যায়।

একটা মজার জিনিস দেখলাম, আগেও জানতাম, কিন্তু এভাবে খেয়াল করি নি। ফুল আসলে উদ্ভিদের যৌন-অঙ্গ। আমরা যখন কোন গোলাপ নাকে ঠেকিয়ে গন্ধ নিচ্ছি, তখন আসলে ঐ গাছের যৌনাঙ্গে নাক ঠেকাচ্ছি। (এর পরে ফুলের গন্ধ নিতে গিয়ে কারো 'eww' লাগলে আমি দায়ী না!)। আরেকটা "পোয়েটিক" ব্যাপার হলো মানুষ প্রেমের সময় একে অপরকে এই ফুল দিয়ে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায়। খুবই ইন্টারেস্টিং না?

গাছের ফুলের মতো প্রাণীর যৌন-অঙ্গ ও আচরণও বিচিত্র রঙ-ঢঙে ভরা। শুধু স্তন্যপায়ী এবং আদি-বানরের উত্তরসূরী চারটা প্রজাতির মাঝেও বিচিত্র সব আচরণ দেখা যায়। এগুলোর প্রায় সবই অভিজিৎ ভাইয়ের ব্লগে চলে এসেছে, আমি আর বিস্তারিত বললাম না। আগ্রহীরা লিংকের সিরিজটা দেখে নিয়েন।

এরকম উৎসবে গেলে অনেক কিছু জানার পাশাপাশি পুরা চিন্তার জগতে একটা ওয়াশিং মেশিন ইফেক্ট হয়। মাঝে মাঝে নিজেকে চেক-অ্যান্ড-ব্যালেন্স করার জন্য তাই এগুলোর দরকার আছে। ডরিওন স্যাগান সেই জায়গায় একটা টোকা দিয়েছেন। সেটা নিয়ে সামনে লিখবো!

শনিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

আসেন সমকামিতা নিয়ে মতামতগুলো ভাঙি তো!

ভূমিকাঃ
প্রতিটা জিনিসের পিছনে নির্দিষ্ট ও ব্যাখ্যাকৃত কারণ আছে। কার্যকারণ ছাড়া কোনকিছু ঘটে না। আমরা ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাই সেই কারণগুলো বের করার। কারণ না পেলে সাধারণ প্রবণতা হলো সেটাকে 'অলৌকিক', 'অতিপ্রাকৃতিক', 'অশরীরী', 'কুদরত' ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করে মূল প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়া। এই প্রবণতা বুদ্ধিনষ্টকারী, চিন্তাহানিকারক। তাই সর্বদা পরিত্যাজ্য। সম্প্রতি সমকামিতা নিয়ে চতুর্মাত্রিকের একটা পোস্টে ও কমেন্টে উঠে এলো নানা দিক। নানা প্রচলিত ধারণা যা হয়তো ভুল, কিংবা অমীমাংসিত, সেগুলো বিস্তারিত বলার জন্য এই পোস্ট। এই লেখার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব অভিজিৎ রায়ের লেখা 'সমকামিতা' গ্রন্থটির (প্রকাশক - শুদ্ধস্বর, ২০১০)। বইমেলায় আগ্রহীরা পাবেন, মুক্ত-মনা ব্লগেও সম্ভবত অনলাইনে আছে, খুঁজে দেখুন। আমি চেষ্টা করছি যথাসম্ভব সরল ভাষায় বৈজ্ঞানিক গবেষণাপ্রাপ্ত বিষয়গুলো উপস্থাপন করার। আমার আলোচনার কেন্দ্রে জেনেটিকস। পাশাপাশি আসবে পরিবেশ, কারণ জিন একা কাজ করে না, পরিবেশের প্রভাবে তার অন-অফ ঘটে থাকে।
যারা একটু বড়ো পোস্ট পড়তে চান না, তাদের জন্য সারসংক্ষেপ শুরুতেইঃ

ক. সমকামিতা মানসিক বা শারীরিক রোগ না।
খ. সমকামিতা এক ধরণের যৌনপ্রবৃত্তি, যা প্রতিটি মানব জনগোষ্ঠীতে দশ জনে এক জনের মাঝে থাকে (প্রকাশ্য বা গোপন)। এই প্রবণতা কম বেশি আমাদের সবার মাঝেও আছে, বিষমকামীদের প্রকট প্রবণতা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ, কিন্তু কেউই ১০০ভাগ বিষমকামী বা ১০০ভাগ সমকামী নয়।
গ. সমকামিতা একটা জেনেটিক বৈশিষ্ট্য (প্রকরণ বা ভ্যারিয়েশন) বলে মীমাংসিত হয় নি। গবেষণা চলছে। এটি জেনেটিক রোগও না।
এবারে বিস্তারিত আলাপঃ
মানুষ মস্তিষ্ক দিয়ে চলে। আমাদের সকল অনুভূতি এই মগজ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। সমকামিতা নিয়ে যে চিন্তা সেটাও আমরা মগজ দিয়ে করি। তো, সমকামিতা নিয়ে আমাদের মগজে আসা মতামতগুলোর ক্যাটাগরি করি -
১। ইহা জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, বিবর্তনের ফলাফল।
২। ইহা জেনেটিক সমস্যা/রোগ, বিবর্তনের ফলাফল (মিউটেশন) তবে নিরাময় সম্ভব।
৩। ইহা জেনেটিক কিছু না। সমাজ বা পরিবেশের প্রভাবে ঘটে।
৪। ইহা জেনেটিকও না, সমাজের প্রভাবেও ঘটে না। সম্পূর্ণ নিজস্ব চয়েসে যে কেউ সমকামী হতে পারে।
শেষেরটির ব্যাপারে কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা সম্ভব না। কারণ যদি সমকামিতা একটি ব্যক্তিগত চয়েস হয়ে থাকে, তাহলে হাজার উপাত্ত বিশ্লেষণ করেও একজন মানুষের ওরিয়েন্টেশন নির্ধারণ সম্ভব নয়। এবং কোন সিদ্ধান্তে আসাও সম্ভব নয়, বিধায় এটা আলোচনার বাইরে থাকবে।
১. ইহা জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, বিবর্তনের ফলাফলঃ
১.১ সমকামী মানুষের মগজ বিপরীত লিঙ্গের মত কাজ করে, তাই তারা সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হয়ঃ
এই গবেষণায় মগজের যে জায়গাটা আলোচনায় আসে, সেটার নাম হাইপোথ্যালামাস। এই অঞ্চলটা মানুষের যৌনপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে। হাইপোথ্যালামাস বিশাল এলাকা, সেই এলাকাতেও নির্দিষ্ট করে খুঁজলে পাওয়া যায় INAH নামের এলাকা, ইন্টারস্টিশিয়াল নিউক্লিই অফ দ্যা অ্যান্টেরিওর হাইপোথ্যালামাস। আশির দশকে পাওয়া গেল - এই INAH এলাকার নিউক্লিয়াসের মধ্যে ৩ নম্বরটা (INAH3) ছেলেদের মধ্যে মেয়েদের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বড়। দেখা গেল, সমকামী পুরুষদের INAH3 বিষমকামী মেয়েদের সমান।
এটা পেয়ে একটা প্রচলিত স্টেরিওটাইপিং বেশ বাতাস পেয়ে গেল। সেটা হলো 'সমকামী পুরুষদের মধ্যে মেয়েলিভাব বেশি' 'A female spirit in a male body'। কিন্তু পুরো বাতাস পাওয়ার আগে আরেকটা পর্যবেক্ষণ এসে সেই ধারণাকে ভণ্ডুল করে দিল। হাইপোথ্যালামাসের সুপ্রাকিয়াস্ম্যাটিক নিউক্লিয়াস (SCN Nucleus) এলাকাটা ছেলেদের ক্ষেত্রে মেয়েদের চেয়ে আকারে বড়ো থাকে। উপরের হিসাব অনুযায়ী সমকামী ছেলেদের এই এলাকা মেয়েদের সমান হওয়ার কথা, কিন্তু দেখা গেল তাদের মগজে এটার আকার বিষমকামী ছেলে, মেয়ে সবার চাইতেই আকারে অনেক বড়।
এই পুরো গবেষণায়, মেয়ে সমকামীদের মগজে কোন প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যায় নাই। সুতরাং এই ধারণাটা আর ধোপে টিকলো না।
১.২ সমকামীদের এক বিশেষ জিনের কারণে তারা সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হয়ঃ
সোজা বাংলায় গে জিন। গে জিন থাকলে মানুষ গে হয়, লেসবিয়ান হয়। গে জিন না থাকলে হয় না। এই ধারণাটি পরখ করতে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। এখনো হচ্ছে। মূলত দুইটা ফিল্ডে কাজ হচ্ছে। একটা হলো পারিবারিক ইতিহাস দেখা, লিনিয়েজে সমকামী থাকা/না-থাকা'র কারণে উত্তরবংশে সমকামী হওয়া/না-হওয়ার পরিসংখ্যান। দেখা হচ্ছে জমজদের মধ্যে (আইডেন্টিকাল ও ফ্র্যাটার্নাল) একজন সমকামী হলে অন্যজনের সমকামী হবার সম্ভাবনা কত। এই গবেষণায় যেটা বেরিয়ে এসেছে, সেটা হলো মায়ের দিক থেকে এই প্রবণতা প্রবাহিত হয়। সেক্স ক্রোমোজোম (ছেলেদের বেলায় X ও Y, এক্স দেয় মা, ওয়াই দেয় বাবা; মেয়েদের বেলায় X ও X, এক্স দেয় মা, অন্য এক্স দেয় বাবা) দুটার মধ্যে এক্স ক্রমোজোমের মাধ্যমে এটি আসে। যেহেতু মেয়েদের বেলায় দুটাই এক্স, সেহেতু বুঝাই যায় যে ওয়াই ক্রোমোজোম এটাকে বহন করলে দুনিয়াতে কোন মেয়ে সমকামী থাকতো না। এখন খুঁজতে হবে যে এক্স ক্রোমোজোমের কোন জিন বা জিনগুলো এই বৈশিষ্ট্য ঠিক করে দেয়।
১৯৯৩ সালে ডিন হ্যামার এই গবেষণা করেছিলেন, তার উপাত্ত ছিল ৪০ জন সমকামী, যাদের ৩৩ জনের এক্স ক্রোমোজোমের প্রান্তসীমায় Xq28 নামক জায়গা পাওয়া গেল। এই মার্কারটা বিষমকামীদের মধ্যে নাই। বাকি ৭ জন সমকামীর মধ্যেও নাই। তাই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো না। তবে এটা একটা সিগনিফিক্যান্ট ডাটা। বলা যেতে পারে যে সমকামিতার প্রবণতায় Xq28 অত্যাবশ্যকীয় জিন না, তবে এর প্রভাবে সমকামিতা ত্বরান্বিত হয়, প্রভাবিত হয়। ডিন হ্যামারের বয়ানে-
এই অংশটির দৈর্ঘ্যে চার মিলিয়ন বেইজপেয়ারের সমান, যা সমগ্র জিনোমের শতকরা ০.২ ভাগের চাইতেও ছোট। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই অংশে অবলীলায় কয়েকশ জিন এঁটে যেতে পারে। এই এলাকায় সমকামিতার নিয়ামক জিন খুঁজে বের করা অনেকটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই। হয় আরো বেশি স্যাম্পল নিয়ে কাজ করতে হবে, নয়তো সম্ভাব্য সকল এলাকার ডিএনএ'র অনুক্রমের সম্পূর্ণ তথ্য চাই।
ডিন হ্যামারের পরে ১৯৯৫ সালে একইরকম ফলাফল পেয়েছেন এস হু, এ এম পাত্তাউচি, সি প্যাটারসনরা। আবার ১৯৯৯ সালে কানাডার জর্জ রাইস উপাত্তের সংখ্যা বাড়িয়ে পরীক্ষা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তর্কাতর্কিও শুরু হয়ে গেছে কারণ এমন বলা হচ্ছে যে রাইসের পরীক্ষার শুরুতেই তিনি গে জিনের ব্যাপারে নেগেটিভ মতামত দিয়েছিলেন। এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এতকিছুর পরে, গে জিনের ব্যাপারটি বিজ্ঞানীমহলে 'অমীমাংসিত মামলা'। এখনো গবেষণা চলছে, দেখা যাক সেই গবেষণায় কী বেরিয়ে আসে। গবেষণা চলছে এপিজেনেটিক্সের পথেও। যে পথে উপরের সমস্যা বা বিভ্রান্তির একটা ইন্টারেস্টিং সমাধান দেয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে কোন জিন একা একা কাজ করতে পারে না। এরা কাজ করে পরিবেশ থেকে পাওয়া সংকেতের মিথস্ক্রিয়ায়। অনেকটা লাইটবাল্বের মত। পরিবেশের সংকেত জিনকে অ্যাক্টিভ করে বা ডিঅ্যাক্টিভ করে। এ প্রক্রিয়ার নাম মিথাইলেশন। যার কারণে আইডেন্টিকাল টুইনদের জেনেটিক কোড এক হওয়া সত্ত্বেও তারা একই মন মানসিকতার হয়ে ওঠে না। তাই একই জেনেটিক কোড থাকা সত্ত্বেও কোন মানুষ সমকামীও হতে পারে, বিষমকামীও হতে পারে সেই জিনের অ্যাক্টিভেশন বা ডিঅ্যাক্টিভেশনের কারণে। এই ধারণার সপক্ষে কিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে। সমকামী সন্তানের জন্ম দেয়া মায়েদের এক্স ক্রোমোজোমের সক্রিয়তা অন্যদের চেয়ে বেশি। এই বেশি হওয়াটাও নির্ভর করছে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসোল। এই হরমোনের আধিক্য সমকামী সন্তানের জন্মদাত্রী মায়েদের এক্স ক্রোমোজোমের সক্রিয়তাকে প্রভাবিত করেছে।
খুব খিয়াল কৈরাঃ
এই জেনেটিক গবেষণা এখনো অসম্পূর্ণ। এর সিদ্ধান্তগুলো তত্ত্বের মর্যাদা পায় নি। তাই সরল অঙ্কের মত ইহা=উহা ধরে নিবেন না। কারণ সে যুক্তি ধোপে টিকবে না। আমাদের করণীয় হলো নিজেদের ভুল ধারণাকে প্রাপ্ত জ্ঞানের সাপেক্ষে শুধরে নেয়া। এবং অপরকেও অবহিত করা।
সমকামিতা নিয়ে ৩নং ধারণা ("ইহা জেনেটিক কিছু না, সমাজ বা পরিবেশের প্রভাবে ঘটে।") নিয়ে অলরেডি বলে ফেলেছিঃ অমীমাংসিত ব্যাপার, গবেষণা চলছে। এবারে বলব সবচেয়ে বিতর্কিত ধারণাটি (২নং) নিয়ে।
২. ইহা জেনেটিক সমস্যা/রোগ, বিবর্তনের ফলাফল (মিউটেশন) তবে নিরাময় সম্ভবঃ
শুরুতেই বলি, এটাকে বিতর্কিত বলার কারণে এই ধারণার ভিত্তিতে অসংখ্য মানুষকে সিস্টেমেটিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। অনেকের অঙ্গহানি হয়েছে, অনেকে মারাও গেছেন। উগ্র ধর্মবাদীরা তো আব্রাহামিক ধর্মের শুরু থেকেই ছিলেন, সেইসাথে জুড়েছিলো মনোবিজ্ঞানী নামক চিজেরা। রিচার্ড ফ্রেইহার ইবিং-এর সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস (১৮৮৬) বইটা সমকামীদের মানসিক রোগী বানিয়ে দিয়েছে, সেই ধারণা এতকিছু আবিষ্কারের পরেও দূর হয় নি। সিগমান্ড ফ্রয়েড এই ধারণাকে সমর্থন দেন নি। তিনি সমকামিতাকে যৌন প্রকরণ (sexual variation) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যদিও তার মত জনপ্রিয়তা পায় নি। বহু কনভার্শনের চেষ্টা হয়েছে, বহু ট্রিটমেন্ট হয়েছে, বহু নারকীয় পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে (ইলেকট্রিক শক, অ্যাভারশন থেরাপি, পুরুষাঙ্গে শক দেয়া, মরদেহ থেকে পুরুষাঙ্গ কেটে সমকামীর দেহের ভেতর স্থাপন করা হতো টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর জন্য ইত্যাদি)। এই ঘটনাগুলো জানলে তীব্র বিবমিষাই জেগে উঠবে।

কম্পিউটার সায়েন্সের বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ অ্যালান ট্যুরিংকে সমকামিতার অপরাধে ১৯৫২ সালে শাস্তি দেয়া হয়। তাকে জেল কিংবা "চিকিৎসা" বেছে নিতে বলা হয়। সেই চিকিৎসা হলো তাকে এস্ট্রোজেনসহ বিভিন্ন হরমোনাল ড্রাগ ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে দেয়া হতো। প্রায় দুই বছর ধরে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে এই ড্রাগ নিতে হয়েছে। এর প্রভাবে তার শরীরে ইম্পোটেন্সি ঘটে, তিনি যে পর্যায়ের গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন, তা ব্যাহত হয়, এবং তার শরীরে গাইনোকোম্যাস্টিয়া নামের অসুখ দেখা দেয়। অসুখটা কী, তা লিখতে রুচি হচ্ছে না, আগ্রহীরা গুগল করে দেখতে পারেন। এই "চিকিৎসা" সহ্য করতে না পেরেও ট্যুরিং ১৯৫৪ সালে সায়ানাইড বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। এছাড়াও ১৯৬২ সালে এই অ্যাভারশন থেরাপির শিকার হয়ে ক্যাপ্টেন বিলি ক্লেগ হিল নামের এক রোগী কোমায় চলে যান এবং মৃত্যুবরণ করেন। অবশেষে ১৯৭৩ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন স্বীকার করে নিয়েছে যে,সমকামিতা কোন রোগ নয়, এটা যৌনতার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। [ বিস্তারিত ]
যাক গে সে কথা। বহু চিল্লাফাল্লা করে মনোবিজ্ঞানীরা তো থামলো। কিন্তু আরেকদল দাঁড়িয়ে গেল সমকামিতাকে জেনেটিক ডিফেক্ট হিসেবে দেখানোর জন্য। কিন্তু এই যে আপনি, পাঠক, পোস্ট পড়ছেন, আপনার কি এখনো মনে হচ্ছে জেনেটিক কারণে সমকামিতা ঘটে এটাই প্রমাণিত? প্রমাণিত না। সমকামিতার সাথে জিনের সম্পর্কই তো ঠিকমত প্রমাণ হয় নি। গে জিন বলে কোনোকিছু এখনো আবিষ্কৃত হয় নি। এর সাথে হিসাবে আনতে হবে পরিবেশ, এপিজেনেটিক্স। তাই এখনই সমকামিতাকে পুরোপুরি জেনেটিক দাবি করা যায় না। আর জেনেটিক রোগ বলা তো দূরের কথা!
সমকামিতা একটা জেনেটিক প্রকরণ, বা ভ্যারিয়েশন। যেমন নীল চোখ, বা সোনালি চুল একেকটা ভ্যারিয়েশন। বাংলাদেশে কটা চোখের কাউকে রোগাক্রান্ত বলা যা, সমকামীদের রোগাক্রান্ত বলাও তা। এটা আপনাকে, আমাকে বুঝতে হবে আগে।
এটা একটা জেনেটিক মিউটেশন বটে। এখন ভাবি, এটা কি ভাল মিউটেশন নাকি খারাপ? সিদ্ধান্ত নেয়া যায় প্রাকৃতিক নির্বাচনের উপর ভরসা রেখে। যে সকল মিউটেশন অনুপযুক্ত বা ক্ষতিকর, সেটা আপনা আপনিই বাতিল হয়ে যায়। কারণ ক্ষতিকর মিউটেশনবাহী জীব বংশবৃদ্ধি করার আগেই মৃত্যুবরণ করে, ফলে উত্তরাধিকার থাকে না। কিন্তু যে মিউটেশন আমাদের বাড়তি সুবিধা দেয় (যেমন দুই পায়ে দাঁড়ানোবা মগজের বড় আকার ইত্যাদি) কিংবা নিরপেক্ষ (যেমন নীল চোখ বা সাদা হাড়) সেগুলো নির্বাচনে টিকে যায়। সমকামিতা যদি সত্যিই জেনেটিক ডিফেক্ট হত, তাহলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছাঁকনিতে আটকে বহু আগেই বিলুপ্ত হত। কিন্তু এটা লক্ষ লক্ষ বছর টিকে আছে, খালি মানুষেই না, প্রাণিজগতের আরো হাজার হাজার প্রাণীর মধ্যে।
সমকামিতা যে রোগ না, তার আরেকটি যুক্তি হলো সংখ্যাধিক্য। আলবার্ট কিনসে'র রিপোর্ট অনুযায়ী যে কোন জনগোষ্ঠীর দশ ভাগ সমকামী। বিজ্ঞানীরা বলেন, জেনেটিক রোগের ডিগ্রি অফ রেয়ারিটি ঠিক করা হয় দুইটা ঝামেলাযুক্ত ফ্যাক্টরকে হিসাবে এনে। একটা হলো মিউটেশনের মাধ্যমে ফর্মেশন, আরেকটা হলো ন্যাচারাল সিলেকশনের দ্বারা বর্জন। এই দুইটা মারামারি করে যে হিসাব পাওয়া যায় তাকে বলে "মিউটেশন-সিলেকশন সাম্যাবস্থা"। এই ফিটনেস টেস্ট অনুযায়ী যদি কোন বৈশিষ্ট্য ক্ষতিকর হয়, তাহলে সেটা ১ মিলিয়নে ১বার ঘটে। এটা হলো (১০০%ফিটনেস) জেনেটিক রোগ। রোগের তালিকায় পড়ে এমন বৈশিষ্ট্যের বেলায় (৫% ফিটনেস) হিসাব হলো ৫০ হাজার জনে ১। সেখানে সমকামিতার হিসাব ১০ জনে ১। সুতরাং এই হিসাবে এটাকে রোগ বলা যায় না।