২০১০ সালে হ্যারি ক্রিসলারের 'পলিটিক্যাল অ্যাওয়েকেনিংস: কনভার্সেশন উইথ হিস্ট্রি' বইয়ে নোম চমস্কির এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। পরে এটা চমস্কির 'অন অ্যানার্কিজম' বইতেও সঙ্কলিত হয়। নিচে পুরো সাক্ষাৎকারটির বাংলা অনুবাদ দেয়া হলো। অনুবাদ সংক্রান্ত যে কোনো মতামত সাদরে গৃহীত হবে।
প্রশ্নঃ আপনার কী মনে হয়, আপনার বাবা-মা আপনার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে দিতে কতটা ভূমিকা রেখেছেন?
চমস্কিঃ বেশ কঠিন প্রশ্ন। কারণ আমার মনে হয় দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করলে আমার ওপর তাদের মন-মানসিকতার প্রভাব যেমন আছে, তেমনি তাদের কিছু কিছু দিকের বিরোধিতাও আমার ভেতরে আছে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে। কোনটা তাদের প্রভাবে ঘটেছে আর কোনটা বিরোধিতা করে ভেবেছি তা বোঝা মুশকিল। আমার বাবা-মা অভিবাসী ছিলেন। এদেশে এসে কীভাবে কীভাবে যেন দু'জনেই ফিলাডেলফিয়ায় এসে থিতু হয়েছেন। সে সময় ফিলাডেলফিয়া শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে একটা হিব্রু বা ইহুদি বস্তি (ghetto) গড়ে উঠেছিল, সত্যিকারের বস্তি না, বলতে পারেন সাংস্কৃতিক সংঘের মতো কিছু একটা।
আমার বাবার পরিবার এদেশে এসে প্রথমে বাল্টিমোরের দিকে মাথা গুঁজেছিল। এখানকার আত্মীয়রা ছিল অতি-গোঁড়া। এমনকি বাবা এটাও বলতেন যে ইউক্রেনের শ্তেত্ল্-এ থাকতে তাদের পরিবার এতো গোঁড়া-ধার্মিক ছিলো না। সাধারণত অভিবাসীদের কোন কোন অংশের মধ্যে এই প্রবণতাটা দেখা যায়, ভিন্ন পরিবেশে এসে তারা অনেকেই নিজেদের সংস্কারগুলোকে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। সম্ভবত নিজেদের স্বকীয়তাকে হারিয়ে ফেলার ভয় থেকে এমন ঘটে।
অন্যদিকে আমার মায়ের পরিবার এসেছিল পেল অফ সেট্ল্মেন্টের[১] আরেক অংশ থেকে, তারা ডেরা বেঁধেছিল নিউ ইয়র্কে। তারা ছিল ইহুদি কর্মজীবী শ্রেণীর অংশ - খুবই প্রগতিবাদী। তাদের জীবনধারায় ইহুদি প্রথাগুলো ছিলো না বললেই চলে। সময়টা ছিল তিরিশের দশক, সেসময়ের প্রবল সামাজিক আন্দোলনের অংশ ছিলেন তারা অনেকেই। এই আত্মীয়দের মধ্যে যিনি আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিলেন তিনি সম্পর্কে আমার খালু হতেন। আমি যখন সাত-আট বছর বয়সী তখন তিনি আমার এক খালাকে বিয়ে করেন। তিনি বড় হয়েছিলেন নিউ ইয়র্কের এক গরীব এলাকায়। নিজে স্কুলে চার ক্লাশের বেশি পড়াশোনাও করেন নি। তার তারুণ্যের বছরগুলো বলতে গেলে রাস্তায় রাস্তায় কেটেছে। টুকটাক জেলেও গেছেন। শারীরিকভাবে একটু পঙ্গু ছিলেন তিনি। তিরিশের দশকে শারীরিকভাবে অক্ষম বা পঙ্গুদের সহায়তার এক সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে কিছু সাহায্য পান। সেটা দিয়ে নিজের একটা পত্রপত্রিকার দোকান দেন। নিউ ইয়র্কের ৭২ নম্বর রাস্তায় তার দোকান ছিল, আর কাছেই ছোট এপার্টমেন্টে থাকতেন তারা। ছোটবেলায় অনেকটা সময় আমি সেখানে কাটাতাম।
সেসময়ে ইউরোপ থেকে আসা এমেগ্রে'দের (émigré) বুদ্ধিজীবিতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল তার এই দোকান, যেখানে বহু জার্মান ও অন্যান্য জাতীয়তার অভিবাসীরা আসতেন। আমার ওই খালু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব একটা পান নি, কিন্তু তার মতো শিক্ষিত মানুষ আমি আর দেখি নাই। স্বশিক্ষিত মানুষ ছিলেন তিনি। তার দোকানে গভীর রাত অবধি বিভিন্ন বিষয়ের প্রফেসর আর বিদগ্ধ পণ্ডিতরা তর্কাতর্কি আড্ডাবাজি করতেন। দোকানে কাজ করেও দারুণ আনন্দ পেতাম। দোকানটা ব্যস্ত শহরের মধ্যিখানে জ্ঞানতাপসদের ভিড়ে এক প্রাণবন্ত ছোট জায়গা হয়ে উঠেছিল। মনে আছে, অনেকদিন পর্যন্ত আমি ভাবতাম 'নিউজিন্মিরা' নামের কোনো এক জনপ্রিয় পত্রিকা আছে, খুব কাটতি ছিল সেটার। সকাল সকাল সবাই সাবওয়ে স্টেশন থেকে নেমে দোকানে এসে নিউজিনমিরা কিনতে চাইতো, আর আমি তাদেরকে দুইটা কাগজ একসাথে ভাঁজ করে দিতাম। পরে বুঝতে পারলাম এগুলো হলো 'দ্যা নিউজ' আর 'দ্যা মিরর' পত্রিকা, একসাথে বলতে বলতে নিউজিনমিরা হয়ে গেছে। এটাও মনে আছে যে কাগজদুটো হাতে নিয়েই তারা প্রথমে খেলার পাতাটা খুলতো। আট বছরের কিশোরের দুনিয়া! দোকানটায় খবরের কাগজই মূলত বিক্রি হতো, কিন্তু আমার মনে দাগ কেটে গেছে এই বিক্রিবাটা ঘিরে ঘটে চলা আলাপ-আলোচনাগুলো।
খালু এবং আরো অনেকের মাধ্যমে তিরিশের দশকের প্রগতিশীল আন্দোলন দিয়ে আমি খুব প্রভাবিত হয়েছিলাম। সে জীবন ছিল হিব্রুভিত্তিক, জায়নিস্ট-কেন্দ্রিক, ইজরায়েল হওয়ার আগের প্যালেস্টাইন-কেন্দ্রিক জীবন। আমার জীবনের অন্যতম ভাল সময়। আমার বাবা-মায়ের মতোই আমি বড় হয়ে হিব্রু শিক্ষক হলাম, পাশাপাশি হয়ে উঠলাম জায়নিস্ট তরুণ নেতাকর্মী। ভাষাতত্ত্বের জগতে আসার হাতেখড়ি এসময়েই ঘটেছিল।
প্রশ্নঃ আপনি তো দশ বছর বয়সে প্রথম প্রবন্ধ লিখেছিলেন, স্পেনের গৃহযুদ্ধের ওপরে।
চমস্কিঃ মানে, বুঝতেই পারছেন, দশ বছর বয়সে কেমন প্রবন্ধ লিখেছিলাম। এখন সেটা হাতে পেলেও আমি পড়তে চাই না। কী নিয়ে লিখেছিলাম সেটা মনে আছে কারণ বিষয়টা আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল। সময়টা ছিল ঠিক বার্সেলোনার পতনের পরপর [জানুয়ারি, ১৯৩৯], যখন ফ্যাসিবাদী শক্তিরা বার্সেলোনা দখল করে মূলত গৃহযুদ্ধের যবনিকাপাত ঘটিয়েছিল। আমার প্রবন্ধটি ছিল ইউরোপে ফ্যাসিবাদের বিস্তার নিয়ে। শুরু করেছিলাম মিউনিখ আর বার্সেলোনায় কীভাবে এই ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটলো সেই বিষয় থেকে, আর কীভাবে নাৎসিশক্তি ছড়িয়ে পড়লো তা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছিলাম। এসব আমার জন্য তখন খুবই আতঙ্কের ঘটনা ছিল।
এখানে আরেকটু ব্যক্তিগত ভূমিকা দিতে চাই, ছোটবেলায় আমরা যে এলাকায় থাকতাম সেটা মূলত ছিল আইরিশ আর জার্মান ক্যাথলিক পাড়া। সেখানে আমরাই ছিলাম একমাত্র ইহুদি পরিবার। পাড়াটায় যারা থাকতো তারা মূলত নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর, প্রায় সকলেই ইহুদিবিদ্বেষী এবং বেশ নাৎসি-সমর্থক। এরা কেন এমন ছিল তা সহজেই অনুমেয়, আইরিশরা তীব্রভাবে ব্রিটিশদের ঘৃণা করতো, আর জার্মানরা ঘৃণা করতো ইহুদিদের। যখন ইউরোপে প্যারিসের পতন হলো [জুন, ১৯৪০], তখন আমাদের পাড়ায় এদের ঘরে ঘরে বিয়ার-পার্টি হয়েছিল। পুরো ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বর্ণবাদের এই কালো মেঘ আমাদের ভীষণভাবে শঙ্কিত করেছিল। বিশেষ করে আমার মায়ের আচরণে তা বোঝা যেত স্পষ্টভাবে যে সে তীব্র আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলোও বেশ ভয়ের ছিল। বুঝতে পারতাম রাস্তাঘাটে বা খেলার মাঠে অহরহই বিদ্বেষের শিকার হচ্ছি। আজও ভাবলে অবাক লাগে যে এতকিছুর পরেও আমি বা আমার ছোটভাই এগুলো বাসায় কখনো বলি নি। কেন বলি নি কে জানে! আমার মনে হয় না আমার বাবা-মা টের পেতেন যে পাড়াটা কতোটা ইহুদিবিদ্বেষী ছিল। কিন্তু রাস্তায় ফুটপাত দিয়ে হয়তো হাঁটছি বাস ধরবো বলে, বা মাঠে খেলতে গেছি বিকালে, সারাক্ষণই এক চরম ভীতির মধ্যে থাকতে হতো। ব্যাপারগুলো এমন যে আমি নিজেও বুঝতে পারতাম যে এগুলো তাদেরকে বলা যাবে না। পরেও কখনো কোনোদিন বলি নি। কিন্তু এই ভয়ানক অন্ধকার যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, দিনে দিনে এর প্রকটতাও বাড়ছে - এটা নিয়ে আমার মা সচেতন ছিলেন। সেসময় প্রায়ই তাকে দেখতাম খুব মন খারাপ করতেন - বাবাও দুশ্চিন্তা করতেন অনেক যদিও বেশি প্রকাশ করতেন না আমাদের সামনে। সব মিলিয়ে ঘরে ও বাইরে আমার জন্য খুব খারাপ ছিল সময়টা।
যাই হোক, সেসময়েই আমি স্পেনের অরাজ (anarchist) আন্দোলন এবং গৃহযুদ্ধ নিয়ে আগ্রহী হয়ে পড়ি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু ঠিক আগে আগে সেখানে দেশ জুড়ে এক বৈপ্লবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। দশ-এগারো বছর বয়েস থেকে আমি একা একা সাবওয়েতে চড়ার অনুমতি পেলাম। তখন প্রায় প্রতি সপ্তাহান্তে সাবওয়ে করে নিউ ইয়র্ক গিয়ে খালাখালুর বাসায় থাকতাম। ইউনিয়ন স্কয়ার আর ফোর্থ এভিনিউয়ের অরাজবাদী বইয়ের দোকানগুলোয় গিয়ে সময় কাটাতাম। এসব দোকানে দেখতাম সেইসব ইউরোপ থেকে আসা অভিবাসীদের। খুবই কৌতূহলোদ্দীপক সব মানুষ ছিলেন। কিশোর আমি মনে করতাম এরা বুঝি নব্বুই বছরের বুড়ো, কিন্তু আসলে তাদের বয়স ছিল সম্ভবত চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের ভিতরে। একটা মজার ব্যাপার হলো তারা প্রায় সবাই তরুণদের সাথে আড্ডা দিতে উৎসাহবোধ করতেন, আমার বয়েসীদের চিন্তাচেতনা আর মতামতকে আগ্রহ নিয়ে শুনতেন এবং প্রয়োজনে সেসব নিয়ে বিস্তর আলোচনাও করতেন। এদের সাথে কথা বলেও আমি অনেক কিছু শিখেছি।
প্রশ্নঃ আপনি বলছেন এই অভিজ্ঞতাগুলোই আপনাকে ভাষাতত্ত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, কিন্তু এর পাশাপাশি এগুলোই তো আপনাকে চারপাশের জগত এবং রাজনৈতিক ভাবনার ব্যাপারেও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আপনি একজন উদারনৈতিক অরাজবাদী (libertarian anarchist)। এই মতবাদের নাম শুনলেই এদেশে যে চোখে দেখা হয়, তাতে সবাই আপনার ব্যাপারে ভুল ধারণা পেয়ে থাকে। দয়া করে এটা একটু ব্যাখ্যা করুন।
চমস্কিঃ বাকি বিশ্বে এইসব ধারণা যেভাবে উপলব্ধ হয়, যুক্তরাষ্ট্রে তার সম্পূর্ণ বিপরীত বা ভিন্নভাবে বিষয়গুলো দেখা হয়ে থাকে। যেমন "উদারবাদী" বলতে যুগ যুগ ধরে বিশ্বের সবখানে যা বুঝানো হয়, এই দেশে আমরা তার একেবারে উল্টো অর্থ করি। ইউরোপের আধুনিক কালে উদারবাদী (libertarian) বলতে বোঝায় সমাজতান্ত্রিক অরাজবাদী। সেখানের শ্রমিক আন্দোলন আর সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের যে অংশটা রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতার বিরোধিতা করতো তাদের মতাদর্শ ছিল এটা। যুক্তরাষ্ট্রে এসে এই মতাদর্শ হয়ে গেলো অতি-রক্ষণশীলতার আরেক রূপ, যার প্রবক্তা হয়ে গেলো আয়'ন র্যান্ড আর প্রতিনিধি হলো কেটো ইনস্টিটিউটের মতো সংস্থা। যা শুধুই যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত বিশেষ সংজ্ঞা আর শ্রেণিকরণ। যুক্তরাষ্ট্রের ধীরে ধীরে উন্নত বিশ্বের নেতারাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঘটনাবলী নানাদিক দিয়েই অনন্য, এই বিশেষ সংজ্ঞাও তার অংশ। ইউরোপে এই ধারণাকে সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্রযন্ত্রবিরোধী উপধারা মনে করা হয়, আমিও সেটা মনে করি। উদারনৈতিক অরাজবাদী সমাজ একটা অতি-সুশৃঙ্খল সমাজ, যেখানে বিশৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। পুরো ব্যবস্থাটা আপাদমস্তক গণতন্ত্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ এমন সমাজের প্রতিটি গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, কাজের ক্ষেত্র এবং রাষ্ট্রীয় দপ্তরসমূহ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে চলে। স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা এর ভিত্তি। এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত ব্যাপিত হতে পারে। এটাই চিরায়ত বা আদর্শ অরাজবাদ। এখন যে কেউ নিজের ইচ্ছামতো শব্দটার নেতিবাচক অর্থ ধরে নিতে পারে, বুঝলেন? কিন্তু এই ব্যাখ্যাটাই চিরায়ত অরাজবাদের বহুলপ্রচলিত সংজ্ঞা।
এই ধারণার জন্ম হয়েছিল শ্রমজীবী শ্রেণী-আন্দোলনের ভেতর, যা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনেও একইভাবে এসেছিল। একটু পেছনে ফিরে তাকাই, ধরুন ১৮৫০-এর দশকের দিকে, শিল্প বিপ্লবের একদম সূচনালগ্নে। আমার ছোটবেলার অঞ্চল পূর্ব ম্যাসাচুসেটসে তখন বস্ত্রশিল্পের কারখানার শ্রমিকরা ছিলো মূলত গ্রামের খামারগুলো থেকে উঠে আসা একঝাঁক তরুণী। তাদের বলা হতো 'ফ্যাক্টরি গার্লস'। তারা আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামের খামারবাড়িগুলো থেকে চাষবাসের জীবন ছেড়ে শহরে এসে কারখানায় কাজ নিয়েছিল। এদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলো বোস্টনের আইরিশ অভিবাসী। তাদের খুবই সমৃদ্ধ নিজস্ব সংস্কৃতি ছিল। তারা অনেকটা আমার সেই খালুর মতোই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তেমন একটা শিক্ষিত ছিলো না, কিন্তু হয়তো অনেকেই নিজে নিজে আধুনিক সাহিত্য পড়ে ফেলেছিলো। তারা ইউরোপের প্রগতিশীলতা তত্ত্ব জানতো না। কিন্তু তারপরও এখানকার শিক্ষিত সমাজের অংশ ছিলো তারা। এবং সমাজব্যবস্থা আসলে কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনাও গড়ে উঠেছিল।
এই কারখানার নারীরা নিজেরা পত্রপত্রিকা ও খবরের কাগজ ছাপাতো। আমার মতে সেই ১৮৫০-এর দশকই ছিল যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে স্বাধীনতম সময়। সেই দশকে লোয়েল শহরের এসব পত্রপত্রিকা ও খবরের কাগজের জনপ্রিয়তা নগর ছাড়িয়ে রাষ্ট্রপর্যায়ে সুপরিচিত ছিলো। এই স্বাধীন পত্রিকাগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ছাপাতে শুরু করেছিলো তারা - কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই। এসব পত্রিকার লেখক-সাংবাদিকরা হয়তো মার্ক্স অথবা বাকুনিনের নামই কখনো শোনে নি, কিন্তু তাঁদের ধারণাগুলো ভিন্ন আঙ্গিকে এসব লেখায় উঠে আসতো। কারখানার মালিকের কাছে নিজেকে ভাড়া দেয়াকে তারা নাম দিয়েছিলো "মজুরির দাসত্ব"। যে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে তখন পুরো দেশ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, এই মজুরির দাসত্ব তাদের কাছে সেই দাসপ্রথার সমতুল্যই ছিলো। এই যে মজুরির জন্য চাকরি করা, অর্থাৎ নিজেকে একজন মালিক বা মালিকপক্ষের হাতে বিকিয়ে দেয়াকে তারা অপমানজনক মনে করতো, বলতো এই দাসত্ব ব্যক্তির স্বকীয়তাকে নষ্ট করে দেয়। সেসময় ধীরে ধীরে চারপাশে যে কারখানাভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠছিল তা নিয়ে তীব্র ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা ছিল তাদের মাঝে। এই সমাজ তাদের সংস্কৃতি, তাদের স্বাধীনতা, তাদের স্বাতন্ত্র্য ধ্বংস করে দিচ্ছিল। তাদেরকে ধনী মালিক বা প্রভুর অধীন করে দিচ্ছিল।
আমাদের দেশে প্রজাতন্ত্রবাদের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। মানে, এই রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের সময় থেকেই আমরা স্বাধীন নাগরিক। বলা যায় পৃথিবীর ইতিহাসেই এ ধারণা নতুন ছিল। শিল্পবিপ্লব এই স্বাধীনতা তুচ্ছ ও খর্ব করে দিচ্ছিল - এটাই ছিলো শ্রমিক আন্দোলনের মূল দাবি। শ্রমিকরা এটাও মনে করতো যে এসব কলকারখানায় তারা যা উৎপাদন করছে তার প্রকৃত মালিকানা তাদেরই হওয়া উচিত। শিল্পবিপ্লবের একটা চালু স্লোগান ছিলোঃ "নতুন যুগের প্রেরণাঃ সম্পদ গড়ো, স্বত্তা ছাড়া সব ভুলে যাও" - এই ধারণার বিরুদ্ধে তারা স্লোগানও দিতো। এই যে নতুন প্রেরণা - নিজের চারপাশের সব মানুষের সাথে সম্পর্ককে অবহেলা করে স্বার্থপরের মতো সম্পদ আহরণ করা এবং যেনতেনভাবে সম্পদ কুক্ষিগত করাকে তারা মনুষ্যত্বের লঙ্ঘন বলে মনে করতো।
এই সমৃদ্ধ আমেরিকান সংস্কৃতিটাকে নিষ্ঠুরভাবে শেষ করে দেয়া হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকদের ইতিহাস ইউরোপের চেয়েও বহুগুণে রক্তাক্ত এক অধ্যায়। এক লম্বা সময় ধরে তীব্র আক্রোশের সাথে একটু একটু করে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। এই আন্দোলন যখন আবার ১৯৩০-এর দশকে দানা বাঁধতে শুরু করে, আমি তার শেষদিকটাকে পেয়েছিলাম। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই আন্দোলনকে দমন করা হয়েছে। এখন যা পুরোপুরি বিলুপ্ত ও বিস্মৃত। যদিও আমার ধারণা এটা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি, মানুষ একেবারে ভুলে যায় নি, তাদের যৌথ চেতনায় এটা সুপ্তভাবে এখনো রয়ে গেছে।
প্রশ্নঃ আপনার গবেষণায় এই বিষয়টা এসেছে, কীভাবে মানুষ ইতিহাস ও প্রথা ভুলে যায়। নতুন কোন অবস্থানকে চিহ্নিত করতে কেন পেছনে তাকিয়ে পুরানো প্রথাগুলোকে দেখা জরুরি?
চমস্কিঃ এটাই বলতে চাচ্ছি যে এই বিষয়গুলো বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীদের আলাপ আলোচনা থেকেই শুধুমাত্র বিলুপ্ত হয়েছে। জনমানসে বা সংস্কৃতিতে কিন্তু এগুলো এখনও জাগরুক। আমি দেখেছি যখন কর্মজীবী শ্রেণীর কোন সমাবেশে যখন এসব কথা বলি তখন তারা সাড়া দেয়, তাদের কাছে এগুলো খুব স্বাভাবিক ধারণা বা মতবাদ। এটা সত্যি যে কেউ প্রকাশ্যে এগুলো নিয়ে আলাপ করে না। কিন্তু আপনি যদি এই আদর্শ ও মতবাদের প্রসঙ্গ তোলেন দেখবেন তারা সাড়া দিচ্ছে। তারা জানে যে তারা নিরুপায় হয়ে মালিকের হুকুমের দাস হয়েছে, নিজেদের অন্যায্যমূল্যে বিকিয়ে দিচ্ছে। তারা উৎপাদন করছে অথচ সেটার মালিকানা পাচ্ছে না - এটা তাদের কাছে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক। এজন্য কঠিন কঠিন তত্ত্ব পড়া লাগে না।
প্রশ্নঃ আপনি এই ধারণা ও মতবাদ ছোট থেকেই চর্চা করেছেন, প্রভাবিত হয়েছেন, বিশ্বাসও করেন। তাহলে আপনার মতে এই মতবাদ অনুযায়ী বৈধ ক্ষমতা কাকে বলে? কিংবা কোন পরিস্থিতিতে আপনি কোন ক্ষমতাশালীকে ন্যায়সঙ্গত ভাববেন?
চমস্কিঃ আমি যতটুকু বুঝি, তাতে অরাজবাদের ধারণার মূলমন্ত্রই হলো যে ক্ষমতা সর্বদাই অবৈধ, এবং নিজেকে বৈধ প্রমাণের দায় ক্ষমতাবানের ওপরই বর্তায়। এই ব্যবস্থায় যারাই নিজেদের ক্ষমতাবান বলে দাবি করবে তাদেরকে প্রথমে প্রমাণ করতে হবে যে তারা অন্য সকলের ওপর ছড়ি ঘোরানোর উপযুক্ত কিনা। যদি সেটা করতে না পারে, তাহলে তাদের পদচ্যুত করা হবে।
এখন প্রশ্ন হলো এটা কি আদৌ কেউ প্রমাণ করতে পারবে? হ্যাঁ, এটা প্রমাণ করা খুবই কষ্টসাধ্য এবং দুরূহ ব্যাপার, কিন্তু আমার মনে হয় সদিচ্ছা থাকলে তা করা সম্ভব। যেমন একটা উদাহরণ দেই, ধরুন আমি আমার চার বছরের নাতনিকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছি। হঠাৎ করে সে ফুটপাত থেকে রাস্তায় নেমে দৌড় দিতে গেলো। আমি করলাম কি, তাড়াতাড়ি তার হাত ধরে বসলাম। এটা তার উপরে আমার ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব প্রয়োগের একটা ছোট উদাহরণ হতে পারে। কেন প্রয়োগ করলাম তার একটা সরল যুক্তিও দাঁড় করাতে পারবো। এমনভাবে হয়তো আরো অনেক জায়গায় দেখানো সম্ভব যে কেউ অন্য কারো ওপর যুক্তিযুক্ত ক্ষমতার প্রয়োগ করছে। কিন্তু সম্মিলিতভাবে আমাদের সবসময় যে প্রশ্নকে প্রাধান্য দিতে হবে তা হলো, "এই ক্ষমতাকে আমরা মেনে নেবো কেন?" যারা ক্ষমতা দেখাচ্ছে তাদের দায় হলো সেই ক্ষমতার বৈধতার প্রমাণ দেয়া। তাদের ক্ষমতা যে বৈধ না সেটা প্রমাণ করা জনগণের দায়িত্ব নয়। মানুষের সমাজে যদি ক্ষমতার অসাম্য থাকে, কেউ কারো চেয়ে বেশি ক্ষমতা রাখে তাহলে প্রথমেই সেটাকে অবৈধ ধরে নিতে হবে। তুমি যদি সেটাকে বৈধ হিসেবে প্রমাণ করতে না পারো তাহলেই তুমি গেছো।
আরেকভাবে দেখলে এর সাথে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অস্ত্রের প্রয়োগের যে নিয়ম তার মিল আছে। অমন পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষ যদি আগে আঘাত হানে তবে বাকি বিশ্বের কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হয়, যথাযথ কারণ দেখাতে হয়। কোন কোন সময় তারা হয়তো অমন কারণ দেখাতেও পারে। আমি গোঁড়া শান্তিকামী নই, তাই কিছু পরিস্থিতিতে আমিও মেনে নেই যে, হ্যাঁ, এখানে এক পক্ষের শক্তি প্রয়োগের যথেষ্ট কারণ ছিল। যেমন আমিও ছোটবেলায় সেই প্রবন্ধে লিখেছিলাম যে পশ্চিমা বিশ্বের উচিত ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। এখনোও আমি তা মনে করি। কিন্তু পরে আমি আরো অনেক কিছু জেনেছি বড় হয়ে। আমি জানতে পেরেছি যে শুরুতে পশ্চিমারাই আসলে ফ্যাসিবাদ সমর্থন করেছিল। ফ্র্যাঙ্কো, মুসোলিনিসহ অনেক ফ্যাসিবাদীকে তারা সমর্থন দিয়েছিল। এমনকি হিটলারকেও একটা সময় পর্যন্ত তারা সমর্থন দিয়ে গেছে। তখন এসব জানতাম না। এখনও আমি মনে করি যে ফ্যাসিবাদের মহামারী ঠেকাতে যুদ্ধ শুরু করলে সেটা যুক্তিযুক্ত ও বৈধ হবে। তবে তার আগে অবশ্যই মিত্রপক্ষকে যথাযথভাবে দাবি প্রমাণ করতে হবে।
প্রশ্নঃ আপনি এক লেখায় লিখেছিলেন, "ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসের বিভিন্ন কারণ ও ব্যাখ্যা যে কেউ দাঁড় করাতে পারেন, তা কেবলই তার ধারণা বা মতামত হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু রসায়নের কোন গবেষক আজ একটি ভুল প্রকল্প প্রস্তাব করলে আগামীকালই কেউ না কেউ সেটা ভুল প্রমাণ করে দিতে পারে।" বিজ্ঞানী হিসেবে প্রকৃতিকে বিশ্লেষণের এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আপনার রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে কীভাবে ও কতটুকু প্রভাবিত করেছে?
চমস্কিঃ প্রকৃতি এক নিষ্ঠুর অধ্যক্ষের মতো। এর সাথে মশকরা করা যায় না, ভুলভাল কথা বলে পার পাওয়া যায় না। তাই প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের চর্চায় সৎ হওয়া আবশ্যিক, অন্য জ্ঞানের শাখাগুলোয় এই মান এতটা কড়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। কিছু কিছু মানদণ্ড থাকে কিন্তু সেগুলো খুবই নাজুক। আপনার প্রস্তাব যদি আদর্শিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, অর্থাৎ স্থাপিত ক্ষমতার ব্যবস্থাকে সমর্থন দেয় তাহলে আপনি অনেক আজগুবি প্রস্তাব দিয়েও পার পেয়ে যেতে পারবেন। মূলত ক্ষমতার বিরোধী সমালোচকের মতামতকে যে মানদণ্ডে বিচার করা হয় আর তার সমর্থনকারীর মতামতকে যে মানদণ্ডে যাচাই করা হয় তাদের পার্থক্য আকাশপাতাল হয়ে থাকে।
যেমন, আমি সন্ত্রাসবাদ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করেছি। আমার মতে সন্ত্রাস যে ক্ষমতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত তা খুব সহজেই প্রমাণ করা যায়। ব্যাপারটা বিস্ময়কর কিছু না। যে রাষ্ট্র যত বেশি ক্ষমতাধর, সে সাধারণত তত বেশি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে। এই সংজ্ঞানুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হবার কারণে সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাস করে থাকে। এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আমাকে প্রচুর প্রমাণাদি যোগ করতে হবে। এটা ন্যায্য কথা, তাই আমি মেনে চলি। আমার মতে এই দাবি যারাই করুক তাদের বক্তব্যকে চুলচেরাভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত। তাই আমি বিস্তর প্রমাণ জড়ো করি, আভ্যন্তরীন গোপন নথি থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক ঘটনার তথ্য - সবই তুলে ধরি। এর মধ্যে যদি একটা কমা বা সেমিকোলনও এদিক সেদিক করি তাহলে সেটা খতিয়ে দেখা ভালো। আমার মতে এই মানদণ্ডই ঠিক আছে।
খুবই ভালো কথা। এবার চলুন জনপ্রিয় মতামতের বেলায় কী হয় দেখি। আজ আপনি এমন কিছু বললেন যা ক্ষমতার ব্যবস্থাকে সমর্থন করে, সেটার বেলায় কিন্তু আপনাকে খুব বেশি যুক্তিপ্রমাণ দেয়া লাগবে না। যেমন ধরেন আমি ঘটনাচক্রে একদিন রাতে নাইটলাইন [২] অনুষ্ঠানে গিয়েছি, উপস্থাপক জিজ্ঞেস করলেন আমি গাদ্দাফিকে সন্ত্রাসী মনে করি কিনা। আমি জবাব দিলাম, হ্যাঁ, গাদ্দাফি অবশ্যই একজন সন্ত্রাসী। এটা বলতে আমার কোনো প্রমাণ দেয়ার দরকার নেই। কিন্তু ধরুন আমি বললাম, জর্জ ডব্লিউ বুশ একজন সন্ত্রাসী। এইবার কিন্তু সবাই প্রমাণ চাইবে আমার কাছে। জিজ্ঞেস করবে তাকে কেন আমি সন্ত্রাসী বললাম।
সংবাদ মাধ্যমের অবকাঠামোটা এমনই যে এখানে প্রমাণ দেয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। এটার একটা নাম আছে, নাইটলাইনের একজন প্রযোজক জেফ গ্রিনফিল্ড আমাকে বলেছিলেন - "concision" (সংক্ষেপণ)। তাকে কোনো এক সাক্ষাৎকারে একজন জিজ্ঞেস করেছিল কেন আমাকে নাইটলাইনে আমন্ত্রণ জানায় না। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, "প্রথমত তিনি এক উদ্ভট ভাষায় কথা বলে যার অর্ধেক কথাই আমরা বুঝি না, আর দ্বিতীয়ত তাঁর ভেতরে কাটছাঁটের বালাই নাই।" উনি ভুল কিছু বলেন নাই। নাইটলাইনে ডেকে প্রশ্ন করলে আমি যে উত্তর দিবো, যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো তা এক বাক্যে তো বলা সম্ভব না। কারণ সেসব তাদের জনপ্রিয় ধর্মের বিরুদ্ধে যায়, সেসব কথাই পুনরায় বলতে চাইলে অন্য কাউকে লাগবে, যিনি দুইটা বিজ্ঞাপন বিরতির মাঝের দশ মিনিটে তা বলে সারতে পারবেন। যদি আপনি প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হয় তাহলে আপনাকে বিশদ প্রমাণ দিতে হবে, আর সেটা ওই দশ মিনিটে বলা সম্ভব না।
আমার মনে হয় প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানোর জন্য এইটা এক অবিশ্বাস্য কৌশল। কাটছাঁট করার শর্ত দিয়ে দিলে আপনি মোটামুটি নিশ্চিত করে দিলেন যে সবাই দলমতের ধ্যানধারণাই বারবার বলতে থাকবে। আর কিছু বলার বা শোনার কোনো পথই খোলা থাকবে না।
প্রশ্নঃ যারা আপনার মতোই চিন্তিত, আপনি যে চিন্তাধারা সংস্কৃতিতে বড় হয়েছেন সেটা তারাও ধারণ করে, যারা এই বিরোধিতায় সম্পৃক্ত হতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে আপনার উপদেশ কী?
চমস্কিঃ তাদের সংগঠিত হতে হবে দেড়শ বছর আগের লোয়েল টেক্সটাইল প্ল্যান্টের ওই ফ্যাক্টরি গার্লসদের মতো। একা একা এই বিষয়গুলো করতে যাওয়া অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। বিশেষ করে যদি কেউ তিন বেলা খাবার নিশ্চয়তার জন্যে সপ্তাহে পঞ্চাশ ঘণ্টা চাকরি করে তার পক্ষে এসব অসম্ভব চিন্তা। আপনার মতো আরো অনেকের সাথে যুক্ত হন তাহলে একত্রে অনেক কিছুই করা সম্ভব। এর এক বিশাল গুণক প্রভাব (multiplier effect) আছে, যে কারণে আর্থসামাজিক উন্নয়নের পুরোভাগে ইউনিয়নসমূহ সর্বদাই নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। এরা গরীব ও শ্রমজীবীদের একত্র করে, একে অপরের কাছ থেকে শিখতে সাহায্য করে, নিজ নিজ তথ্যের উৎস হয়, এবং একত্রিতভাবে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সবকিছু একমাত্র এভাবেই বদলেছে সবসময় - যেমন নাগরিক অধিকার আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন, সংহতি এবং শ্রমিক আন্দোলনসমূহ ইত্যাদি। আজকে যে আমরা গুহায় বাস করি না তার কারণ মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে পরিবর্তন এনেছে। তখনও যা উপায় ছিল, এখনও সেই একই উপায় আছে। আমার তো মনে হয় গত চল্লিশ বছরের প্রভূত উন্নতি আর পরিবর্তনের এটাই মূল কারণ।
১৯৬২ সালে এসব কিছুই ছিল না। তখন নারীবাদী আন্দোলন ছিল না, মানবাধিকার আন্দোলনও সবে শুরু হয়েছিলো। পরিবেশবাদী আন্দোলন, যা মূলত আমাদের উত্তরসূরীদের কাছে অধিকারের আন্দোলন, সেটাও তখন ছিল না। এখন আমরা চারপাশে দেখছি সবাই এই অধিকারের দাবিতে একত্রিত হচ্ছে। কৃষ্ণাঙ্গ, এশীয়, লাতিন আমেরিকান ও ফিলিপিনো শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে ওঠে তৃতীয় বিশ্ব সংহতি আন্দোলনও তখন ছিল না। অ্যাপার্থেইড-বিরোধী আন্দোলনের নামও তখন কেউ শোনে নি। সোয়েটশপ-বিরোধী আন্দোলনও এর অনেক পরের ঘটনা। তার মানে এখন আমরা যেসব বিষয় ন্যায্য অধিকার বলি এবং যে বিষয়গুলোকে অন্যায় বলে চিহ্নিত করতে পেরেছি তার অনেকগুলোই মাত্র চল্লিশ বছর আগে ছিলো না। তাহলে অধিকারগুলো কীভাবে এলো? আকাশ থেকে কোনো ফেরেশতা এসে দিয়ে গেছে? অন্য কেউ উপহার দিয়েছে? না, এগুলো আমাদের সংগ্রাম করে অর্জন করতে হয়েছে। জনসাধারণের যৌথ সংগ্রামে হাসিল হয়েছে, যারা প্রত্যেকে অন্যের জন্য নিজের শ্রম ও মেধা বিনা পারিশ্রমিকে বিলিয়ে দিয়েছেন একেকটি দাবি আদায়ে। তাদের সম্মিলিত আত্মত্যাগের কারণেই আমরা এখন এক অধিকতর সভ্য ও উন্নত সমাজে বসবাস করছি। অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে আমরা এখানে এসেছি, সামনে আরো লম্বা পথ পড়ে আছে। এই সংগ্রাম নিরন্তর চলবে।
প্রশ্নঃ আপনি মনে করেন যে কোনো আন্দোলনের বিখ্যাত নায়কদের কেন্দ্রবিন্দু করা আসলে ভুল, কারণ আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হলো নাম না জানা অসংখ্য কর্মীরা। তারাই আন্দোলনকে সফল করেন।
চমস্কিঃ হ্যাঁ। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কথাই ধরি। যখন আপনি এই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলবেন সবার আগে আসবে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নাম। এই আন্দোলনে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু জিজ্ঞেস করলে তিনিই সবার আগে বলতেন যে তিনি স্রেফ ঘটনাক্রমে আন্দোলনের জোয়ারের সামনে চলে এসেছিলেন। আরও বলতেন যে এসএনসিসি'র [৩] কর্মী, 'ফ্রিডম রাইডার'রা, আর অজস্র মানুষ যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, মিছিল করেছিল, পদযাত্রা করেছিল, প্রতিদিন পুলিশের মার খেয়েছিল তারাই আন্দোলনের মূল নায়ক। এদের অনেকে মৃত্যুবরণও করেছিলো আন্দোলনের সময়। এদের সম্মিলিত উদ্যোগেই একটা আবহ তৈরি হয়েছিল আর কিং তার ভেতর থেকেই সম্মুখে চলে এসেছিলেন। এখানে আবারও বলি তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন, আমি তা মোটেই ছোট করে দেখছি না। তিনি যা করেছেন তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু বাকি যাদের নাম আমরা ভুলে গেছি তারা আসলেই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। এটা কিন্তু সব আন্দোলনের বেলাতেই সত্য।
প্রশ্নঃ এতোকিছু দেখার পরে আপনার কি মনে হয় যে মাঝে মাঝে এসব আন্দোলনের সফলতা অতি অল্প হয়, কিন্তু যেটুকু আদায় করা যায় তা খুব গুরুত্বপূর্ণ?
চমস্কিঃ আমার মনে হয় না আমাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে হাল ছেড়ে দেয়া উচিত। ১৮৫০-এর লোয়েলের 'ফ্যাক্টরি গার্লস'দের সাথে আমি একমত। আমিও মনে করি মজুরির দাসত্ব আমাদের মৌলিক মানবাধিকারের ওপর আঘাতস্বরূপ এবং কারখানায় যারা কাজ করে উৎপাদিত পণ্যের মালিকানা তাদেরই হওয়া উচিত। আমি আরও মনে করি সেই "নতুন যুগের প্রেরণাঃ সম্পদ গড়ো, স্বত্তা ছাড়া সব ভুলে যাও" স্লোগানের বিরোধিতা আজও জারি রাখা প্রয়োজন। হ্যাঁ, এগুলো সবই অপমানজনক ও ধ্বংসাত্মক, দীর্ঘমেয়াদে যা একদিন ভুলুণ্ঠিত হবেই। কবে হবে তা জানি না, কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস একদিন হবে। কিন্তু বর্তমানে আমরা ভয়াবহ সব সমস্যার সম্মুখীন, যেমন প্রায় তিন কোটি আমেরিকান তিন বেলা পর্যাপ্ত খাবার খেতে পায় না, কিংবা পৃথিবীর অনেক জায়গায় মানুষ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি খারাপ অবস্থায় আছে এবং আমাদের সামরিক বুটের চাপে পিষ্ঠ হয়ে মাটিতে মিশে যাচ্ছে। এসব স্বল্পমেয়াদী বর্তমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। ছোট ছোট প্রাপ্তি বা অর্জনে ক্ষতি নেই। ষাটের দশক থেকে এখন পর্যন্ত যেমন অনেক ছোট ছোট প্রাপ্তির কথা বলছিলাম এতোক্ষণ। এগুলো সবই মানুষের জীবনে অসীম গুরুত্ব রাখে। এর মানে এই না যে বিরাট লক্ষ্যগুলো জরুরি না, ওগুলোও জরুরি, তবে নাগালের মধ্যের লক্ষ্যগুলোতেও মনোযোগ দেয়া যেতে পারে।
এই একই দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞানেও প্রচলিত আছে। আপনি হয়তো বড়ো প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে চান, যেমন মানুষের সকল ক্রিয়ার পেছনে মূল কারণ কী ইত্যাদি। কিন্তু এখন আপনাকে কাজ করতে হবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের একদম সীমানার কোনো ছোট প্রশ্নের উত্তর নিয়ে। একটা মজার গল্প আছেঃ এক মাতাল একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে কী যেন খোঁজাখুঁজি করছিল। এক লোক এসে জিজ্ঞাসা করলো, "ভাই, কী খোঁজেন?" সে বললো, "হাত থেকে পেন্সিলটা মাটিতে পড়ে গেছে, সেটা খুঁজি।" তখন লোকটাও তাকে খুঁজতে সাহায্য করার জন্য জিজ্ঞেস করলো, "কোথায় পড়েছিল?" মাতাল উত্তর দিলো, "ওহ, পড়ছে রাস্তার ঐ পারে।" লোকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, "তাইলে এখানে খুঁজতেছেন কেন?" মাতাল জবাব দিল, "কারণ আলোটা যে এখানে ভায়া। ওপারে তো ঘুঁটঘুটে অন্ধকার!" বিজ্ঞানের কার্যপ্রণালীও এরকম। হয়তো আপনার প্রশ্নের উত্তর আছে রাস্তার ওপারে, কিন্তু আপনাকে কাজ করতে হবে এপারে আলোর নিচে। আলোটুকু একটু একটু করে বাড়াতে থাকলে একদিন রাস্তার ওপারে পৌঁছে যেতেও পারে।
[সমাপ্ত]
১। Pale of Settlement: রাজতন্ত্র চলাকালীন সময়ে (১৭৯১ - ১৯১৭) রাশিয়ার পশ্চিম প্রান্তে ইহুদিদের বাসস্থান। এই নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে ইহুদিদের বসবাস করা নিষেধ ছিল।
২। Nightline, ABC নেটওয়ার্কের একটা সংবাদ বিশ্লেষণমূলক অনুষ্ঠান।
৩। SNCC: Student Nonviolent Coordinating Committee.
বৃহস্পতিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
অরাজবাদ নিয়ে
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৫
হিজাবের বিমানবিকীকরণ
প্রায় মাসখানেক আগে হিজাব নিয়ে একটা খবর দেখেছিলাম। তেহরানের কোর্টে দুইজন নারীকে হিজাব ঠিকমতো না পরার কারণে নব্বুই লাখ রিয়াল জরিমানা করেছে। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় বিশ হাজার টাকার সমান। ১৯৭৯ সালের মুসলিম বিপ্লবের পর থেকে ইরানের নারীরা বাইরে বের হলে হিজাব করা বাধ্যতামূলক। সম্প্রতি এরকম অনেকগুলো মামলা হয়েছে হিজাব ঠিকমত না করার অভিযোগে, যার প্রায় প্রতিটাই দোষী নারীকে জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তি দেয়া হয়েছে। যেমন পুলিশ যদি গাড়ি চালানোর সময়ও কোন নারীকে ধরে, যার হিজাব খোলা বা ঢিলেঢালা, তাহলে তার গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
এটা তো গেল ইরানের কথা। বাংলাদেশে নারীদের হিজাব করার ব্যাপারে এমন কোন আইন নেই। যদিও সামাজিকভাবে অনেক নারীই স্বেচ্ছায় বা পরিবারের পুরুষদের চাপে পড়ে হিজাব করেন। আবার পশ্চিমা বিশ্বে, ইউরোপ বা আমেরিকায় মুসলমানরা হিজাব করতে গিয়ে সামাজিক নিগ্রহের শিকার হন। ফ্রান্সের মত কিছু কিছু দেশে যেমন জনসমক্ষে হিজাব পরা নিষিদ্ধ। একমাত্র তিউনিশিয়াতে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও জনসমক্ষে হিজাব করা নিষিদ্ধ।
হিজাব নিয়ে নানারকম ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক মতামত আছে। দেশ, জাতি, ও সংস্কৃতিভেদেও নানাবিধ যুক্তি ও পাল্টাযুক্তিও শুনেছি। হিজাব নিয়ে নারীবাদ এবং সেক্যুলার মতধারা থেকে শুরু করে শরিয়া এবং ইসলামিক মতধারা পর্যন্ত বিভিন্ন ‘স্কুল অফ থট’ বিভিন্ন কথা বলে থাকেন। তাই এই বেলা বলে রাখছি এই লেখার উদ্দেশ্য সেই নানা কথার ভেতরে না ঢোকা, বরঞ্চ সমাজে নারী ও পুরুষের মাঝে হিজাবের প্রভাব নিয়ে একটু চিন্তা উস্কে দেয়ার প্রচেষ্টামাত্র।
হিজাবের প্রবক্তাদের প্রধান যুক্তি এই পোশাক নারীর শালীন আব্রু হিসেবে কাজ করে। একই সাথে তা মুসলিম পুরুষকেও পর্দা করতে পরোক্ষভাবে সাহায্য করে। হিজাব নারীর সৌন্দর্যকে আড়াল করে পুরুষের কামনাকে প্রতিহত করে। পুরুষের চোখে নারী জনসমক্ষে হয়ে ওঠে কামনারহিত অবয়ব, নারীর প্রতি তার আচরণ হয় সুসভ্য। কিন্তু আসলেই কি তা ঘটে? ইরানের এক নারীর বয়ানে জানা যায়, “আমাদের শরীরের প্রতিটি অংশকে ঢেকে রেখেও যৌন-লাঞ্ছনা কমে না, ...বরং বাড়ে।” রাস্তায় হিজাব পরে বের হলেও চারপাশ থেকে ভেসে আসে অশ্লীল হিসহিস শব্দ, টিটকারি, ইঙ্গিতপূর্ণ শিসের ধ্বনি।
ব্যাপারটা কি উলটপুরাণ মনে হচ্ছে? অস্বাভাবিক হলেও একটু ভেবে দেখলে এর কারণ বুঝতে পারা যায়। এক মুহূর্তের জন্য হিজাবের ধর্মীয় পটভূমির কথা ভুলে যান। ধরুন, এটি শুধুই একরঙা একটি কাপড়ের অংশ। হিজাব একজন মানুষের শরীরকে ঢেকে দিয়ে প্রকারান্তরে তার মানবিক অবয়বটাকে আড়াল করে। হিজাব-পরিহিতের বিমানবিকীকরণ (dehumanization) ঘটে। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে আমরা সকলেই জানি যে প্রতিটি হিজাবের নিচে রক্তমাংসের একজন মানুষ আছেন। কিন্তু এমনভাবে ঢেকে দেয়ার কারণে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের আড়ালে চলে যায়। ঠিক একই ধরণের বিমানবিকীকরণ ঘটে সামরিক বাহিনীতে, পুলিশ বাহিনীতে, জেলখানায়, কল-কারখানায়। মূলত যে কোন উর্দি-পরিহিত ‘মানুষ’কে আমরা আর “স্বতন্ত্র মানুষ” বলে চিন্তা করি না। তারা হয়ে ওঠে ‘বস্তু’। সামরিক বাহিনী হয় হাঁটু-বাহিনী, পুলিশ হয় ঠোলা। মুখাবয়ব দেখা যাওয়া সত্ত্বেও স্রেফ উর্দির আড়ালটুকুতেই বিমানবিকীকরণ সহজ হয়ে ওঠে। তাহলে হিজাবের মত সর্বাঙ্গ ঢাকা কাপড়ের নিচে মানুষকে কি আর খুঁজে পাওয়া যায়? দর্শকের চোখে তাই হিজাব-পরিহিত নারী হয়ে ওঠে চলমান কাপড়ের ঢিবিবিশেষ। এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা হিজাবের আড়ালের মানুষটির সুখ-দুঃখকে অনুধাবনের সুযোগটুকুও খেয়ে ফেলে। সবচেয়ে ভয়াবহ যে ব্যাপারটি ঘটে, তা হলো হিজাব-পরিহিতাকে লাঞ্ছিত ও নিপীড়ন করার সুযোগ করে দেয়, কারণ ‘ওটা’ তো কাপড়ের ঢিবি, কোন জলজ্ব্যান্ত মানুষ না!
বাংলাদেশে নারীশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের নারীর অংশগ্রহণের কারণে এই প্রতিবন্ধকতাকে কিছুটা হলেও সীমিত করা গেছে। তবে ইরানের মতো দেশে যেখানে নারীর হিজাব বাধ্যতামূলক এবং আইনের চোখে হিজাব না করা অপরাধ, সেখানে পরিস্থিতি একেবারেই অন্যরকম। নারী পুরুষের মাঝে সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে যোজন যোজন দূরত্ব। ছোটবেলায় স্কুলে শিশুরা একসাথে পড়াশোনা করলেও বড় হবার পরে নারী ও পুরুষের গণ্ডি আলাদা হয়ে যায়। কিছুদিন আগেই ইরানি পুলিশ কফিশপ আর রেস্তোরাঁয় নারীদের কাজ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তেহরানের মিউনিসিপ্যালিটিতে কোন পুরুষ কর্মকর্তার সেক্রেটারি নারী হতে পারে না। এর কারণে গুরুতর একটা প্রভাব পড়েছে সমাজে। ইরানের এক নারীর মতে
, নারী ও পুরুষ যেহেতু একেবারেই পাশাপাশি কাজ করে না, সেহেতু হুট করে কোন পরিস্থিতিতে একজন নারী ও একজন পুরুষকে কোন কাজ করতে হলে খুবই জড়সড় এবং বিদ্ঘুটে মিথস্ক্রিয়া ঘটে। যেন প্রতিটা আলাপই কোন না কোনভাবে প্রচ্ছন্ন যৌনতার সাথে জড়িত। স্বাভাবিকভাবে নারী বা পুরুষ কেউই কাউকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না, তাদের চোখে শুধুই বিপরীত লিঙ্গের পরিচয়টা প্রকট ও মুখ্য হয়ে ওঠে।
ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা মিথস্ক্রিয়ার কারণে নারী এবং পুরুষ উভয়ের মানুষ পরিচয়ের লঘুকরণ ঘটে। তারা একে অপরকে লিঙ্গপরিচয়ে সনাক্ত করে, আর হাজার বছর ধরে বয়ে চলা সংস্কৃতির থাবার নিচে বেড়ে চলে প্রেজুডিস। হিজাবের অন্যতম উদ্দেশ্য নারী ও পুরুষের মাঝে লৈঙ্গিক রাজনীতি ও টানাপোড়েন কমানো। কিন্তু প্রকারান্তরে হিজাব, হিজাবের সামাজিক ভূমিকা ও নারী-পুরুষ গণ্ডি আলাদা করার মাধ্যকে লৈঙ্গিক টানাপোড়েন বেড়েই চলে। সমাজে হিজাব ও পর্দাপ্রথার মাধ্যমে নারী ও পুরুষের সম্পর্ককে হিতকর ও গঠনমূলক করে তোলার কথা ছিল। কিন্তু দিনশেষে সেই সম্পর্ক পুরুষ নারীকে কী চোখে দেখছে (না-মানুষ, নাকি মানুষ) তার ওপরেই নির্ভর করে।
বুধবার, ১৮ আগস্ট, ২০১০
যৌনকর্মীঃ একজন পেশাজীবীর স্বীকৃতি ও তদসংলগ্ন ছেঁড়া চিন্তা
লিস্টিটা দেখলাম- যৌনকর্মী, ইমাম/পুরোহিত/যাজক(clerics), সেবিকা, হেয়ার-ড্রেসার, ধোপী, কাজের লোক (মেইড), মালী, ক্লিনার, বাবুর্চি, দর্জি, ড্রাইভার। তবে এই পেশাগুলোকে নিয়ে তেমন আলোচনা তৈরি হয় নি। বাঙালি মধ্যবিত্তের মননে 'তোলপাড়' তুলে ফেলেছে কেবল যৌনকর্মী পেশাটি। এই নিয়ে এরই মাঝে কিছু ব্লগে কয়েকটা লেখা দেখলাম, মূলত খবরটার প্রতিক্রিয়া নিয়ে। আশা করেছিলাম যেমন, ঠিক তেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে সকলেই আমার ধারণাটিকে বদ্ধমূল করেছেন যে বাংলাদেশের সামাজিক চালচিত্র মোটেই এই পদক্ষেপের জন্যে অনুকূল নয়।
যৌনকর্মী সংক্রান্ত প্রাথমিক 'বুকিশ' আলোচনার দিকে যাবো না, সেদিকে আমি আপনার চাইতে বেশি কিছু জানি না। তাই চলুন একটু অন্যদিকে চোখ ফেরাই। ঐ যে বলছিলাম, নির্বাচন কমিশন এবং সুপ্রীম কোর্ট নিয়মিতই কিছু পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের মাঝে ঘুরে ফিরে উঠে আসছে। এই উঠে আসার কারণ হয়তো তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের সাথে আমাদের মনন, সামাজিক প্রথাবদ্ধতার অমিল মূলাংশে দায়ী। ধর্মপ্রবণ এবং মোটামুটি অশিক্ষিত এই জনপদে গিজ গিজ করছে মাথা, সেই মাথায় চুল গজায় আবার ঝরে পড়ে টাক বিস্তৃত হয় কিন্তু খুলির ভেতরে ধূসর-বস্তুতে খুব বেশি আলোড়ন ওঠে না। যে খুলিগুলোতে কিছুটা রসদ থাকে, সেগুলো ড্রেন দিয়ে বা প্লেনে চড়ে পাচার হয়ে যায় ফর্সা-চামড়ার দেশে। তার এখানকার কালো, কুৎসিত, কুশিক্ষিত মানুষের মনন একটা আধা-ধর্মান্ধ-আধা-সুশীল অবস্থানে আটকে থাকে (আছে)। এই অবস্থায় আমাদের রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা পরপর দুটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। "যুগের অন্ত" আক্ষরিকার্থেই! কারণ, জন্মাবধি কাগজে কলমেও বাংলাদেশ সাড়ে চার বছরের বেশি সময় ধর্মনিরপেক্ষতা ধরে রাখতে পারে নি।
পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির সময়ে যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছিলো যে এই ইসলামিক রাষ্ট্রটি ১০০ বছর বাঁচবে, যুগে যুগে এইখান থেকে তৈরি হবে নব্য-মুসলিম স্কলার, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথে ও সভ্যতার উৎকর্ষে তারা অবদান রাখবেন; সেই সুখ কল্পনা ছেঁড়া কাথার ফুট দিয়ে পালিয়েছে। পেছনে ছিলো সামরিক লাঠির বাড়ি। আধামূর্খ-আধামুসলিম বাঙালিত্বের লুঙ্গি খুলে খুলে যখন পাক-পবিত্র পাকিস্তানিরা চেক করেছে, তখনই বোঝা গেছে পলিমাটিতে মরু-রুক্ষ ইসলাম জমবে না। এখানে পীর-আউলিয়াদের হাত ধরে আগত ইসলাম কেবল আচারে, প্রথায় রাখা যেতে পারে, তার বেশি মানুষ তা মানবে না।
বাঙালি তখন লুঙ্গি ছেড়ে সবে রাস্তাঘাট বানাচ্ছে আর শার্ট-প্যান্টের সাথে জুলপি রাখতে শিখেছে। তাদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতার গ্রহণযোগ্যতা একটা সামাজিক-রাজনৈতিক উল্লম্ফন ছিলো। কিন্তু পুরো শরীর এক সাথে না লাফালে যেমন গোত্তা খেয়ে পড়তে হয়, তেমনি সাড়ে চার বছরেই ধর্মনিরপেক্ষতার ঝুমঝুমি হাত ফস্কে গেছে, একেবারে নিচতলায়, বেইসমেন্টে ধুলো মেখে। আমরা শনৈ শনৈ সামরিক উন্নয়নে ডুবে গেছি, বন্যায় ডুবেও রাস্তাঘাট আর খাল কেটে স্বস্তি পেয়েছি। ব্রিটিশ জুতো, পাকিস্তানি জুতোর পরে বাংলাদেশী জুতোর পাড়া খেতে আমাদের কালো দেহে মন্দ লাগে নি। পরিবারতন্ত্রের রাশান রুলেৎ খেলা "রহমান ডাইনেস্টি" দুটোর ভগিজগিও গত বিশ বছরে সামরিক শাসনের 'সমসাময়িক' হয়ে উঠছে। তো, এবারে নতুন শতকের এক দশক পেরিয়ে গেলে কোন দৈববলে আবার সেই মানিকরতন ফিরে এলো, তাকে নিয়ে আমরা কী করবো; কোলে রাখবো নাকি ছুঁড়ে ফেলবো, এটাই এখনো ঠিকঠাক ঠাহর হচ্ছে না।
তার ওপরে নির্বাচন কমিশন চাপিয়ে দিলেন পেশা-স্বীকৃতির এই 'অভাবনীয়' বিজ্ঞপ্তি! এবারে আমাদের পুরুষালী রোম খাড়া হয়ে গেছে। এই উত্তেজনায় বাকি সবগুলো পেশাজীবীকে বাদ দিয়ে আমরা যৌনকর্মীদের নিয়ে পড়েছি। এমনিতেই তাদের ব্যাপারে ট্যাবু, চাপা-আগ্রহের কোনই কমতি নাই, তার ওপর নিঃকঃ এসে পেশা হিসেবে উন্মুক্ত করে দিলো যেন। এখন হিসেব উঠে আসছে, ঢাকায় ঠিক কতোজন যৌনকর্মী আছেন, ঠিক কোন কোন জায়গায় তাদের ডেরা, বাংলাদেশেই বা কতোগুলো 'নিষিদ্ধপল্লী' আছে ইত্যাদি।
খেয়াল করলাম, যে পেশাগুলোকে নতুনভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই নারীর পেশা। ইমাম/পুরোহিত/যাজক, মালী এবং ড্রাইভারের পেশাতে এখনও পুরুষের একচ্ছত্রতা। সেবিকা, যৌনকর্মী, কাজের লোক এগুলো পেশায় নারীর একচ্ছত্রতাও উল্লেখ করি। বাদ বাকি পেশাগুলোতে ধীরে ধীরে নারীকে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। এই সবগুলো পেশার মধ্যে মিল হলো সচরাচর এগুলোকে সমাজ ও রাষ্ট্র 'চিনতে' চায় না। কাজের লোককে নামমাত্র বেতনে রাখা হয়। ইংরেজি খবরে "ক্লিনার" বলে সম্ভবত মেথর ও জমাদার বুঝিয়েছে, তাদেরকেই বা কতোটা দ্রষ্টব্য ভাবা হয়? সেবিকাদের নামের আশে পাশে 'মহামতি ফ্লোরেন্সে'র নাম নিয়ে তাদেরকেও শ্রমের ন্যায্যমূল্য দেয়া হয় না। হয়তো শুভ্র পোশাকের সেবিকাদেরকে ততোটা 'খেটে খাওয়া' বলে মনে করতে আমাদের 'সুশীল' চোখ অভ্যস্ত নয়। আর সেই সুশীল চোখের কাছে যৌনকর্মীর নাম দূরে থাক, উল্লেখমাত্রই একেবারে অচ্ছুৎ।
তবু নিষিদ্ধের কৌতূহল আর বিকৃত আগ্রহ আমরা নিশ্চিত লালন করি। তাদের জীবন ও জীবিকার খবর জানতে, পরিসংখ্যানের ভেতরে আরো খতিয়ে জানতে অনেকেই উৎসুক। এই ঔৎসুক্য জন্মেছে পারিবারিকভাবে শেখানো ঠুঁটো নিষিদ্ধতার কারণে। যৌনতা এ অঞ্চলে ট্যাবু হলেও অন্তরীণ নয়। সকলেই চর্চা করেন, এখন তথ্যপ্রবাহের ঢেউয়ে তার অনেকটাই জানা যায়। নারী বা পুরুষ কেউই এই চর্চার বাইরে নেই। হয়তো অংশগ্রহণের স্বাভাবিকতায় নারী যুগযুগ জিইয়ে রাখা জড়তা এখনও কাটাতে পারে নাই, তবু প্রায় সমানে সমানেই (আড়ালে বা প্রকাশ্যে) যৌনতার লালন ঘটছে।
সুতরাং এখানে কোন উন্নাসিকতার উপায় নেই, সুযোগ নেই উপেক্ষার। স্বীকার করেই নিতে হয় যে এই আদিমতম পেশাটি বঙ্গ-জনপদে প্রাচীনকাল থেকেই আছে, আছে এর "ভোক্তা" (পুরুষ) ও "কর্মী" (নারী)। সমাজে পুরুষ নিজের সামাজিক প্রতিপত্তি আর পরিচয়ের জন্যে রেখেছে স্ত্রী, আর ভোগ ও লালসার জন্যে রেখেছে যৌনকর্মী। এবং নিজেদের 'সম্মান' ধরে রাখতে এই কর্মীদের নাম দিয়েছে 'পতিতা', 'বেশ্যা' ইত্যাদি। নামগুলো দেখুন, নিছক শব্দ হিসেবেই প্রথম শুনেছিলেনঃ কিশোর বয়সের কথা মনে করুন। তারপরে শিখে গেছেন, এগুলো কতোটা নিকৃষ্ট শব্দ, অশ্লীল, অসভ্য, কুৎসিত। তারপরে পরিচিত হয়েছেন এই শব্দগুলো যাদের সাথে ব্যবহার করা হয়, তাদের সাথে - সেই নারীদের সাথে যারা পতিত, অস্পৃশ্য, নিষিদ্ধ ইত্যাদি। অথচ তারা কোথায় থাকে, কি করে, কারা তাদের কাছে যায় এটা জিজ্ঞেস করলে নিশ্চিত বড়ো একটা ধমক খেতেন। 'চুপ' বলে চেঁচিয়ে উঠতো আপনাকে আদর্শলিপির পাঠ দেয়া 'পুরুষ' চরিত্রটি।
এই চর্চা, আবহমান সংস্কৃতির মতো চলে আসছে। পুরুষ কখনই যৌনকর্মীর কাছে যাওয়া থামায় নি, এবং নিয়মিত খদ্দেরকেই দেখা গেছে তাদের বিপরীতে উচ্চকণ্ঠে। এই দ্বিমুখী আচরণ আসে কুশিক্ষা থেকে, প্রথাবদ্ধতা থেকে, অন্ধের মতো ক্ষমতা দখলের লিপ্সা থেকে। এখানে কেন ক্ষমতার কথা আনলাম? একটু ভেবে দেখলে আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন।
সমাজের ক্ষমতার পিরামিডে এই নারীদের অবস্থান কতোটা নিচে! হয়তো সবার নিচে। এমনিতেই অনগ্রসর ও দরিদ্র জনপদে গড়পড়তা নারীরা ২য় শ্রেণীর নাগরিক, তার ওপরে তাদের মধ্যে যারা দেহব্যবসার সাথে জড়িত, তারা না পান পরিচয়, না পান মূল্য - সামাজিক অবস্থান তো দূরাস্ত। এ অবস্থায় তাদেরকে আলাদাভাবে কেন 'পতিত' বলে চিহ্নিত করা হলো? কারণটা কি খুব স্পষ্ট না? কারণ সমাজের পুরুষের দুশ্চরিত্রের অনেকটা চেহারাই তাদের কাছে উন্মুক্ত। ভ্রষ্ট প্রথা মেনে সমাজে প্রতিপত্তি গড়ে তোলা উপরতলার বেশির ভাগ পুরুষ এই সকল নারীর ভোক্তা। কাঁচা বাজারে গেলে তারা যেমন প্যান্ট উঁচু করে চলেন, কাদা মাড়ালে যেমন তাদের নাক কুঁচকে যায়, সেই সকল উন্নাসিকের গতায়াত এই অঞ্চলে অহরহ। আর সেজন্যেই, যৌনকর্মীদেরকে সমাজের নিচু থেকে নিচুতলায় ঠেলে দিলে এই সব পুরুষদের স্বস্তি হবে। এতোটা নিচুতলা থেকে তারা আর কিইবা বলবে, আর সেটা কে-ইবা শুনবে?
বিষয়টা প্রবলভাবে রাজনৈতিক - ক্ষমতার বন্টনের মতো। কিন্তু সে দিকে না তাকাই। আমরা বরং 'আম' জনতা সেজে থাকি। অন্ধকারে আমাদের মাঝে কে কে এই পল্লীতে এগুবেন সেটা একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার। আমরা সেখানে কোন জাজমেন্টাল অবস্থান নিতে চাই না।
কিন্তু নির্বাচন কমিশন যৌনকর্মীদের স্বীকৃতি দিচ্ছেন। যুগের পর যুগ ধরে তাদের প্রতি জমে ওঠা অবহেলা, নাক সিঁটকানোর স্বভাবটাকে বদলাতে তারা সমাজের আরো পাঁচজন পেশাজীবীর কাতারে উঠিয়ে নিয়ে আসছেন। এই পদক্ষেপটি যাদের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তারা স্বভাবতই উপরে উল্লিখিত মানুষদের মতো মন-মানসিকতা ধারণ করেন। যতোক্ষণ তাদের সেই কূপমণ্ডুক, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব তারা নিজেদের ভেতর রাখছেন, ততোক্ষণ সেটা নিয়ে মনে হয় না কারো মাথাব্যথা আছে। কিন্তু যখনই তারা গলাবাজি করে সমাজের নৈতিকতা, এবং অনুশাসনের বুলি আওড়াতে যাবেন, তখন মনে করিয়ে দেয়া জরুরি যে এই নারীদের পেশাবৃত্তির ভোক্তাশ্রেণীটি কারা।
যৌনকর্মীদের পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াটা মূলত পুরুষ ভোক্তাদেরকে ভোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সমতূল্য। এই বিষয়টিই হয়তো কাঁটার মতো গলায় বিঁধছে অনেকেরই। তাদের জন্যে প্রেসক্রিপশন, দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার পুরুষতান্ত্রিকতার গলায়, মানবতার ফোরসেপ দিয়ে কাঁটাটি না তুললে অচিরেই সেপটিক হয়ে যাবে। তখন না গোটা গলাটাকেই কেটে ফেলতে হয়!
***
[*নির্বাচন কমিশনে এবং সরকারি কর্তাব্যক্তিদের মাঝে কোটি কোটি দোষত্রুটি আছে। এই সরকার ইতোমধ্যেই বিভিন্ন খাতে ব্যর্থতার পরিচয় 'সগৌরবে' রেখেছে। তারপরেও এরকম কিছু দুরন্ত উদ্যোগের জন্যে তারা সাধুবাদ দাবি করেন। বাংলাদেশে সামরিক ও ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়াশীলতার পিঠে এরকম প্রগতিশীল পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই!]
সোমবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১০
প্রতিক্রিয়াশীলতার অ আ ক খ
প্রতিক্রিয়াশীলতা আর প্রগতিশীলতা শব্দ দুইটার শব্দার্থ নিয়ে ভাবতেছিলাম। হয় কি, ভাষাবদলের সাথে সাথে শব্দের আক্ষরিক অর্থের গায়ে আঞ্চলিক, জাতিগত আর ঐতিহাসিক তকমা পড়ে। বাংলাদেশে এই শব্দ দুইটা আজকাল অহরহ ব্যবহার হয়, যেন অনেকটা ডালভাত হয়ে গেছে। এই কারণে অনেক সময় না বুঝেই অনেকে ব্যবহার করে ফেলেন। হাস্যকর ব্যাপার হলো, বেশিরভাগ সময়েই ব্যবহারকারী নিজেই ঐ বৈশিষ্ট্য ধারণ করেন। তার আশেপাশে যারা বুঝতে পারেন, তারা মনে মনে ঠা ঠা করে হাসতে থাকেন।
প্রগতিশীলতায় যাবার আগে প্রতিক্রিয়াশীলতা নিয়ে দুইটা কথা বলি। এটার ইংরেজি করলে দুইটা শব্দ পাওয়া যায়- রিয়্যাকশনারি, কনজারভেটিভ। যদিও কনজারভেটিভের আলাদা শব্দবন্ধ বাংলায় ব্যবহার হয় (রক্ষণশীল), তবুও প্রকৃতি-বিচারে দুইখানায় সহোদর ভাই, তাহাদের জুড়ি নাই! রিয়্যাকশনারি অর্থ – "viewpoints that seek to return to a previous state (the status quo ante) in society"। বাংলায়- আগে কী সোন্দর দিন কাটাইতাম, সেটার থেইকে কেন যে বাইরায়া আসলাম। চল চল চল, আবার ফিরে চল। ফলিত অর্থে – এখন যদি কেউ বলেন, পাকিস্তানি শাসনামলই ভালো আছিলো, বা ব্রিটিশযুগেই ভালো ছিলাম – গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ ইত্যাদি চাই, চাই, চাই। বা আরেকটু এগিয়ে কেউ যদি বলেন, এই গণতন্ত্র, আমলাতন্ত্র খুবই খারাপ, বাঙালিকে ডাণ্ডার উপরে রাখতে হয়, এরশাদ্দাদু ভালো ছিলো। এইগুলা খুবই মামুলি উদাহরণ, যারা শব্দটার সাথে একেবারেই পরিচিত নন, তাদের জন্যে দিলাম। কিন্তু বৈচিত্র্য নিয়া আমাদের বসবাস, তাই শব্দার্থে আটকে থাকলে গাড়ি চলবে না। এই প্রতিক্রিয়াশীলতার চর্চা অনেকটা বর্ণবাদের মতোই আমরা অহরহ লালনপালন করতেছি।
কীভাবে?
আচ্ছা, এখনই তেড়ে মেরে এসেন না। আরেকটু গপসপ করি। আগে প্রগতিশীলতার পরিচয়টা বলি, নাহলে তিনি নিজেকে অবহেলিত মনে করতে পারেন। প্রগতিশীলকে ইংরেজিতে বলে প্রগ্রেসিভ, লিবার্যাল। আরেকটু খোসা ছাড়াইলে পাই – "Promoting or favoring progress towards improved conditions or new policies, ideas or methods"। খুবই ভালো কথা। তার মানে, বাংলাতে – নিত্যনতুন মতবাদ শুনলে যার মনে হয় "ভালোই তো", যিনি সহজে সামাজিক আর রাজনৈতিক পটবদলকে আত্মস্থ করতে পারেন। সবচেয়ে বড়ো কথা, 'সভ্যতা ও সংস্কৃতি বদলে যাবেই, রেডিও জায়গায় টিভি, টিভির জায়গায় ইন্টারনেট আসবেই', এরকম বদলগুলো যাকে খুশি করে, স্বস্তি দেয়, তিনি প্রগতিশীল। আরো সহজ করে বললে, বর্তমান সমাজের ত্রুটি বদলাতে পুরনো ধ্যান ধারণার চাইতে নতুন ধ্যানধারণাকে বেছে নেয়ার প্রবণতাকে প্রগতিশীলতা বলা যায়।
সংজ্ঞা শুনে প্রতিক্রিয়াশীলকে পুরোপুরি খারাপ আর প্রগতিশীলকে পুরোপুরি ভালো মনে হচ্ছে, তাই না? তারমানে একটা কালো, আরেকটা আলো। সুতরাং বেছে নেয়া খুউব সোজা। কিন্তু সবকিছু সহজ সরলভাবে হলে তো আমরা সুখে শান্তিতে বাঁচতাম। এই মোটাদাগে বিভাজনের বাইরেও কিছু কিছু এলাকা আছে। আসেন, একটু সেদিকে হাঁটি।
২
একজন ব্যক্তি যে সমাজে বাস করেন, সেই সমাজের ব্যাপারে তিনি কখনই পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেন না। এটা দেশ-জাতি-সময় নির্বিশেষে সকলের জন্যে প্রযোজ্য। নিরানব্বুই ভাগ মানুষ নিজের অবস্থানকে নিয়তি ধরে নিয়ে নীরবে দিনযাপন করেন। তারপর বেলা ফুরালে চুপচাপ মারা যান। ব্যক্তির মৃত্যুর সাথে সাথেই তার সাথে জড়িত সমাজের ধারণা ও উত্তরণের সম্ভাবনার আপাত-সমাপ্তি ঘটে। তারপরে নতুন মানুষ এবং তার সমাজ বদলের নতুন ধ্যানধারণার আগমন। এই চক্র অনাদিকাল ধরেই চলছে। ব্যক্তির হিসাবে এই চক্রাকার পথ কোন ফলাফল দিচ্ছে না, কিন্তু গোষ্ঠীগত বা দলগত হিসাবে চক্রটি ঘোরার সাথে সাথে একটু একটু করে রৈখিক সরণও হচ্ছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা মূলত আমাদেরকে এই ‘big picture’ দেখার মতো করে গড়ে তোলে না। জীবনযাপনের ন্যূনতম কিছু জ্ঞান আর ধারণা দিয়েই ছেড়ে দেয়। কিন্তু মানুষ নিজের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই ‘অবহেলিত’ এই জ্ঞানটুকু সংগ্রহ করে নেয়। তখন সে বুঝতে পারে যে চাকার মতো এই চলনটা কেমন, সেটা সামনে যাচ্ছে না পিছনে, তার নিজের আউটপুট, সেই চাকার মাঝে তার আপেক্ষিক অবস্থানের স্বরূপ। প্রগতি আর প্রতিক্রিয়া, ব্যক্তির মাঝে দুই আচরণের একটি বা উভয়ের চর্চা, এই বুঝে নেয়ার সাথে জড়িত।
সমাজে প্রাধান্যকারী মতবাদ তৈরি করার জন্যে এই ‘বোধসম্পন্ন’ মানুষদের প্রয়োজন। নিজের সমাজের কিসে ভালো হয়, আর কিসে খারাপ হয় সেটা একমাত্র এই অল্প কয়েকজন মানুষই বুঝতে পারে। বাকিরা ব্যস্ত থাকেন নিজেদের জীবনযাপনে আর পরিবর্তনের সময় এলে, নিজ নিজ ধারণাপ্রসূত মতামত কোৎ করে গিলে সেই পরিবর্তনের গড্ডালিকা প্রবাহে তারা গা ভাসান।
তার মানে কোন ভূখণ্ডের সমাজ-বদল, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন এই মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে নির্ভর করে। তারা সেই বদলের চাকাটিকে সামনে বা পিছনে নিয়ে যেতে পারেন। এখন বাংলাদেশে বা এই বদ্বীপের নরম মাটিতে সেই চাকার দাগ কোনদিকে গেছে?
(লিখতে লিখতে ক্লান্ত। বাকিটুক কালকে খতম করবো!)
বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০০৯
প্রকৃত অনুভূতির চরিত্র বিষয়ক
হর্ষকেও আরেকটা চরিত্র দেই। সে বেশ ধুরন্ধর-গোছের। সবটুকু সময়ে আসবে না। মাঝে মাঝে দেখা দিবে। খুব অপ্রত্যাশিত কোন সময়ে একেবারে চমকে দেয়ার মতোন। মাঝেমাঝে তাকে টের পেতে সমস্যা হয়। মজার ব্যাপার, বিষাদকে আমার যতটা ভয় লাগে, যতটা আমি সন্তর্পণ সজাগ হয়ে থাকি কখন কোন চোরাগোপ্তা আক্রমণ করবে সে, ঠিক সেরকম আতিথেয়তায়, আমি হর্ষের জন্য অপেক্ষা করি। কখন সে আমাকে উন্মাতাল আবেশে মাতিয়ে দিবে। দিনের সূর্যরশ্মির মতো অকৃত্রিম প্রবাহে আমার চরাচর ভাসিয়ে দিবে।
আরেক চরিত্র দুঃখ। না, কোন সাদামাটা দুঃখ নয়, যেগুলো আমি রোজ দেখি, পাই, আত্মপীড়নের সুখের মত উপভোগ করি। তারা নয়, সেগুলো নয়। দৈনন্দিন সেসব দুঃখ খর্বাকৃতি বামনের মত অনেকটাই যাপনের অনুষঙ্গ। মাঝে মাঝে একটু'র জন্যে বাস মিস করে আধা ঘণ্টা দেরি হওয়া, অফিসে ঢোকার ঠিক আগেই ঝুপঝুপে বৃষ্টিতে ভিজে একসা হওয়া, অফিস ছুটি একটু আগে একগাদা কাজ এসে হাজির হওয়া, ফেরার পরে বাসার ইলেকট্রিসিটি না থাকা, ঘুমানোর আগে টের পাওয়া যে এমাসের বাড়ি ভাড়া দেয়া হয়নি আর সেটা কালকেই দিয়ে দিতে হবে, আর দিয়ে দিলেই অনেকগুলো টাকা বের হয়ে যাবে- এরকম ছোটখাট দুঃখেরা মশারির মাঝে গুপ্তচর মশার মত বসবাস করে।
আমার মনোযোগ অন্যরকম দুঃখের দিকে। তিনি বড়ো ভয়াবহ খদ্দের, ঝোলাভর্তি ব্রহ্মাস্ত্র নিয়ে আসেন। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই অবিবেচকের মতো একটার পর একটা বাণে আমাকে জর্জরিত করে। অশ্বত্থামা মারা গেছে শুনে দ্রোণাচার্যও এতটা রেগে ছিল না! তাঁর রুদ্ররূপে আমার কেবলই মায়ের মুখ মনে পড়ে! এরকম দুঃখের সাথে মৃত্যুসাধ আর গ্লানি আর বিষণ্ণতা মিশে থাকে। এরকম দুঃখদের তোড়ে আমি ভেঙে যেতে থাকি, দুমড়ে যেতে থাকি, ক্ষয়াটে হয়ে উঠতে থাকি, বিলীন হয়ে নামতে থাকি। আমার চেহারা আর আচরণেও তাদের গভীর ছাপ পড়ে যায়। যে কেউ, চেনা-অচেনা বা রাস্তার পেরিয়ে যাওয়া মানুষ, আমাকে দেখলেই বুঝে ওঠে আমি সেই দুঃখবোধে বুঁদ হয়ে আছি। নেশার মতোই আমার ধমনীতে তারা খোড়ল কাটছে।
আমি জানি না ঠিক কীভাবে মানুষ দুঃখবোধ কাটিয়ে ওঠে। প্রতিনিয়ত আমরা নখের আঁচড়ের মত আক্রান্ত হই, সেই অবস্থা কী করে উপশমিত হয়, এভাবে 'সেরে ওঠা'র প্রক্রিয়াটা কেমন তা বুঝে উঠতে চাই আমি। আশে পাশের অনেক স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াই আমি বুঝি না। কীভাবে একটা গাছ ক্ষুদ্র চারা থেকে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠে, কীভাবে ঋতুরা নিয়মিত বিরতিতে ফিরে ফিরে আসে, কীভাবে পিঁপড়ের সারি টের পায় যে ঝেঁপে বৃষ্টি নামবে, এরকম আরো হাজার প্রাকৃতিক নিয়মের পেছনের কারণ আমার অজানা থাকে। তাতে কিছু যায় আসে না কারণ এসব প্রক্রিয়া আমাকে ছাড়াও সুন্দর চলেছে, আমি চলে যাবার পরেও সুন্দর চলবে। আমার জীবনেও তারা নীরবে প্রচ্ছন্ন-প্রভাব খাটিয়ে যাবে অজান্তেই। তবে দুঃখবোধ কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা আমার বুঝে নেয়া দরকার। খুব জরুরি না হলে আমি এভাবে ভাবতাম না।
বিষাদ বেশ চালাক। আজকাল আমাকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে পর্যুদস্ত হতে দেখে সে ক্রূর হাসে। ঠা ঠা করে খ্যাক খ্যাক করে হো হো করে হাসে। আর মাঝে মাঝে উন্মাদের মত লাফিয়ে আমার ঘাড়ে চড়ে বসে। আমাকে গলাধাক্কা দেয়। নির্মমভাবে লাথি কষায় আমার পাঁজরে। আমি বিষাদের ওপর তীব্র ক্রোধ অনুভব করি। "শালা কুত্তার বাচ্চা! শয়তান! শুয়োরের বাচ্চা!" এরকম গালি ছিটকে ছিটকে প্রস্রাবের মত বের হতে থাকে। অধিক যন্ত্রণায় মানুষ কেমন পশু হয়ে যায়, তাই না? পাশবিক মাংশ ঢেকে রাখা সভ্য-ভব্যতার খোলশটা খসে পড়ে। গোঁ গোঁ করতে করতে আমি উঠে দাঁড়াই।
এক নাগাড়ে দুঃখ আর বিষাদের সাথে যুদ্ধ করি। মাঝে একটু হর্ষ এসে ফিক করে হেসে আমার দিন-রাত-দিগন্ত-দেহ ঝলমলিয়ে যায়। তারপরও অবিশ্রান্ত আঘাতে আমি ক্লান্ত হতে থাকি মনে মনে। এরকম লড়াইয়ের শেষ আমার মৃত্যুতেই, এই বোধটা আমার কোষের মাতৃকায় ঢুকে যায়। পেরেকের ধারে সেই চিন্তাটা আমাকে কষ্ট দিতে থাকে। নিরর্থক মনে হয় তাবৎ লড়াই, সকল ক্রোধ। বেমালুম ফাঁকিবাজি মনে হয় এই নিঃশ্বাস, এই হেসে ওঠা, এই চুমু-দীর্ঘশ্বাস-সঙ্গম-রাত্রিযাপন-দিনপালন। শূন্যতার আসল অর্থ আমরা জানি না বলেই ভ্রান্ত বিশ্বাস নিয়ে বাঁচি। একবার ঝলক দিয়ে দেখা দেয় নিরতিক্রম্য ব্যর্থ সমাপ্তি। তখনই চট করে বুঝে যাই এখানে সুখের নামে, দুঃখের নামে, বিষাদ কিংবা হর্ষের নামে আমাদের জীবনের বেচাকেনা হয়ে যায় চোখের পলকে, আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই।
ছলকে এক ফোঁটা পানি বেয়ে নামে পাপড়িমূল থেকে। এত বিষাদাক্রান্ত যাপিত জীবন আমাকে কাঁদাতে পারেনি, কিন্তু দূর্লঙ্ঘ্য এই অর্থহীনতা আমাকে উন্মূল করে দেয়। জানি, এই জীবনের মাঝে দুঃখ-বিষাদ-হর্ষ চরিত্রেরা আমাকে মনে রাখবে না। তাদের সাথে মিতালির জীবন একরকম কেটে যাচ্ছে। মৃত্যুর পরেও তারা এই নশ্বর পৃথিবীর বুকে অন্য মানুষের হৃদয় খুবলে খুবলে খাওয়ার সময়ে এক পলকের জন্যেও আমার কথা মনে করবে না।
শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর, ২০০৮
কবিতাপাঠের বায়োপ্সি
দীর্ঘ উপক্রমণিকার কারণ বলে নিই, এটা আসলে সততই আমার মধ্যে খেলা করছে। লেখালেখি গুরুত্ব দিয়ে শুরু করেছি অনেকটা সময় পরে এসে। সেখানে গুরুত্বটুকু প্রথমে শুধুই আত্মকেন্দ্রিক শখ বা সুখবিলাসজাত ছিল। কিন্তু যেহেতু ক্রিয়ার অপর পিঠেই প্রতিক্রিয়া জন্মায় ঈস্টের মতোন, সেহেতু আমার লেখাতেও নানান অনুভব তৈরি হয় আর আমার কাছে ফিরে আসে। তখন আসলে একটা আলোচনার প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়। ক্রমশ টের পাই, কবি আমি ছাড়িয়ে ব্যক্তি আমি জায়গা করে নিচ্ছি। সেটা পাঠককেও হয়তো আরো স্বচ্ছতা দিচ্ছে।
তবে এই মিথস্ক্রিয়ার মাঝে আমি এটাও টের পাই একটা ভিন্নসুর জেগে ওঠে। হয়তো মানব বৈচিত্র্যের কারণেই। সেখানে নিজের মতটাই প্রকাশ করার মাধ্যমে অংশ নিতে পারি। কবিতার ভাষা নিয়ে ফরহাদ উিদ্দন স্বপনের একটা পোস্ট দেখলাম। সেখানে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। সে আলোচনায় আমি খেয়াল করিনি আগে বলে অংশ নিতে পারিনি। তবে সেই লেখাটিই কিছু কথা আমার ভেতর থেকে বের করে আনছে। সেগুলো একে একে বলি।
প্রথমেই লেখক-পাঠকের যোগাযোগের ক্ষেত্রটি নিয়ে কিছু কথা বলি। আমি যখন লেখক, তখন একটা কবিতা আমার হাত দিয়ে বেরিয়ে আসার সময়ে অনেক জন্ম-প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে যায়। সেটা এক এক কবির এক এক রকম। সেই প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ, সৃজনশীল লেখালেখির প্রতিটা ক্ষেত্রেই হয়তো তা খাটে। তবে অনেক জাদু দেখে যেমন মনে একটা প্রশ্ন জাগে জাদুর পেছনে রহস্যটা কী, তেমনি কবিতাপাঠের পরেও পাঠক হিসেবে অনেকেরই হয়তো মনে আসে, লেখক এই কবিতা কী ভেবে লিখেছেন? তার চিন্তা আর মস্তিষ্কে কী রসায়ন চলেছে? শব্দ আর পংক্তিগুলো দিয়ে তিনি কী বুঝিয়েছেন? এই স্বভাবিক প্রশ্নগুলোকে আমি একটু ভিন্ন চোখে দেখি।
আমি যেকোনও কবিতাকে মনে করি একটা চশমা-র মতোন। সে চশমার মধ্য দিয়ে কবি কিছু একটা দেখেছেন, লিখেছেন। সেই লেখাটি আমি পাঠক যখন পড়বো, আমি একটা বা ভিন্ন ভিন্ন কিছু দৃশ্য পাবো। আমার মধ্যে একটা অনুভূতির সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেটা কতটুকু কবির সাথে মিললো, তা আমি কখনোই বিচার করতে যাবো না। তার পিছনে কারণ বহুবিধ। কবির চিন্তার পাটাতন আর আমার চিন্তার পাটাতন এক হবার কোন কারণ বা সুযোগ নাই। আবার আমার দেখনভঙ্গি কবির চেয়ে স্বতন্ত্র হোক এটাও আমি চাইবো।
এই দেখাটা জরুরি। বা এই মনোভাবটা কবিতার উদ্দেশ্য পূরণে পাঠকের দৃষ্টিকোণ থেকে জরুরি। পাঠকের উদ্যোগ এক্ষেত্রে লেখকের চাইতেও বেশি।
সমসাময়িক একটা বিষয় চলে আসে। কোন কবিতাকে বিচার করার বা পাঠ করার ক্ষেত্রে আমরা খুব বেশি বিভাগ করে ফেলিঃ ভালো, খারাপ, মন্দ, নতুন, ফালতু, চমৎকার, অপ-, কু- ইত্যাদি নানান বিশেষণ, প্রত্যয় যোগ করে। এটা নিয়ে এখানে একটা মোটামুটি তোলপাড়ও চলেছে কিছুদিন আগে। তবে সেটা অন্য কথা।
এখানে এই বিভাগকরনের বিপক্ষে অনেককিছুই বলা যায়। আবার পক্ষেও অনেক কিছু টেনে আনা যায়। তবে আমি এই স্বতস্ফূর্ত শ্রেণীবিভাগের কারণটি বের করতে একটু তৎপর হই। জিজ্ঞাসার পেছনে উত্তরটা অনেকটাই এসে পড়ে এরকম যে আমরা কোনকিছু, সেটা যে রচনাই হোক না কেন, তাকে বিশেষায়িত করতে পারলে স্বস্তিবোধ করি। একটা ফরম্যাট দাঁড়িয়ে গেছে বা দাঁড় করানো হয়েছেঃ গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, কবিতা, ছড়া এরকমের কিছু প্রধানভাগ; অণু-পরমাণু-বড়-ছোট এরকম শব্দ প্রধানভাগের আগে জুড়ে দিয়ে সেকেন্ডারি ভাগ; তারপরেও আরো নানা রকম ভাগ করা হচ্ছে আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে।
কবিতার জন্যে সেই ভাগ দশকভিত্তিক, শতকভিত্তিক হয়ে থাকে। রোমান্টিক, আধুনিক, উত্তরাধুনিক এরকম হয়ে থাকে। আবার নানা মতবাদ ভিত্তিকও হয়ে থাকে। এতোদূর যারা পড়ে ফেলেছেন, তারা যেমন, তেমনি আমি নিজেও হাঁপিয়ে উঠেছি। সংজ্ঞাভারে মাথা নুয়ে আসছে, কাঁধ ব্যথা করছে, চোখ জ্বলছে এবং কান ভোঁভোঁ করছে। আর সব পাঠকের মতোন আমিও এই সবকিছু জঞ্জাল হিসেবে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাই। কী দরকার অনর্থক বিভক্তির? একটা কবিতা, তা সে যেমনই হোক না কেন, যার দ্বারাই লিখিত হোক না কেন, সেটা শেষপর্যন্ত একটা কবিতাই! সেই কবিতার কোনও বাস্তব উপযোগ নাই, কর্মসম্পাদনে সহায়কও নয় কবিতা। নেহায়েত কোনও গূঢ় "পেছনের কথা" না থাকলে সেটা আদৌ কোন অর্থবোধকও হয় না।
তাহলে আমি একজন পাঠক হিসেবে কি কবিতাপাঠ করতে পারি? যদি পারি, তাহলে তা কতটা দরকারি? বা কবিতা নিজে আমাকে কতটা তার পাঠক হিসেবে গ্রহণ করবে সেটাও আনুষঙ্গিক প্রশ্ন। আমি মনে করি একজন গল্প বা প্রবন্ধপাঠকের চেয়ে কবিতা পাঠককে অনেক বেশি মাত্রাসম্পন্ন হতে হয়। সেখানে তার জন্যে কিছু সংবেদনশীলতা স্বভাবতই কবিতা দাবি করে। সেকারণেই কোনও দ্রুত প্রকরণেও যেতে চাইনা। ঘুরে ফিরে সেই প্রথম কথাটুকুর কার্যকারণ বের করে ফেলতে পারি। শরীরে মননে আসলেই কবিতা বিস্তারী ভালোবাসার মতোন ছড়িয়ে পড়ছে।
***
[ছাড়া ছাড়াভাবে কিছু কথা বেশ অনেকদিন বা কিছুদিন ধরে জমেছে। সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত না করলে অস্বস্তিবোধ... এবং ক্রমান্বয়ে অস্থিরতা। সে অস্থিরতার গলা টিপতেই এই লেখা!]
রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
পাপবোধ সংক্রান্ত টুকিটাকি বা হেনো তেনো
আমার পাপবোধের অনুভূতিটা বেশ টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আসলে চারপাশের মানুষগুলোর সাথে দিন দিন সম্পৃক্ততা কমে যাবার ফলেই মনে হয় এমন চিন্তার মোড় ঘুরে যাওয়ার সূত্রপাত।
পাপবোধ খুব সম্ভব একটা আপাত আরোপিত অনুভূতি। একটা শিশু কখনোই এই চেতনার অধিকারী হয়ে জন্মায় না। ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে ওঠার সময়টাতে, রঙ-রূপ-বর্ণ-শব্দগুলো চিনে চিনে চারপাশকে বোঝার সময়টাতে কোন এক অদৃশ্য প্রক্রিয়ায় এই অনুভূতি তার ত্বকে অভিস্রবণের মতো ঢুকে যেতে থাকে। মনে হয় সে নিজেও টের পায় না সে কখন পাপী হতে শুরু করে- কিংবা বলা যায় নিজেকে কখন পাপী ভাবতে শুরু করে।
একটি শিশু বড়ো হয়ে উঠতে উঠতে নিজেকে একটা সময় দোষী ভাবছে এই চিন্তাটা পীড়াদায়ক। তার স্বাধীনতার পরিপন্থীও বটে। কেননা মূলত শিশুদের দ্বারা আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হই না। নিতান্ত দুরন্ত শিশুও তুচ্ছ বা মূল্যবান তৈজস ভেঙে ফেলা ছাড়া তেমন কোনও গুরুতর অপরাধ করে না। অথচ সেই সময়টায় তাকে বেশ বিরূপতা পেতে হয়, বাবা-মা- বড়োদের কাছ থেকে। শিখে নিতে হয় উচিত-অনুচিতের লিস্টি। মা-বাবা শিখিয়ে দিতে থাকেন, চলা-বসা-কথা-হাঁটা-থামা। অপরাধী সত্ত্বাটির হয়তো তখনই জন্ম ঘটে।
উচ্চারণে যেসব শব্দেরা দূষিত, বা পঙ্কিল সেগুলো আমরা বড়োরা খুব সযত্নে পরিহার করতে চেষ্টা করি একটা শিশুর সামনে। কেননা একটা সময়ে সে আমাদের সামনে কুৎসিত সেই শব্দ বা ভঙ্গিগুলো শিখে ফেলবে এটা জানার পরেও আমরা সেগুলো যতটা সম্ভব আড়াল করতে চাই। কিন্তু এতে করে যখন তারা শব্দগুলো শেষমেশ শিখেই যায়, তখন সেগুলোকে পরিচয়পত্রসহই শিখে নেয়। এমনকি অভিধানেও আমরা তাদের সেভাবেই চিহ্নিত করে রেখেছি।
এত গেল শব্দেরা, আশেপাশের দৃশ্যাবলিও যথেষ্ট কুৎসিত আমাদের এই জনপদে। বিরাট আকাশ-সংস্কৃতি না হয় ছেড়ে দিলাম, সচেতন অভিভাবকেরা হয়তো বেছে বেছে কাদা-ময়লা এড়িয়ে চলেন। কিন্তু রাস্তাঘাটে, বাজারে, দপ্তরে আমরা ক্রমশই অশ্লীল হয়ে উঠছি দিনে দিনে। ইদানীং কিছু পোশাকে নগ্নতা দারুন প্রকাশ পায়। গোপন রতিতে হয়তো তা দারুন কামনাজড়িত সুখের প্রভাবক হবে, হয়তো পুরুষ বা নারীটির সঙ্গীর দ্বারা প্রশংসিতও। কিন্তু প্রকাশ্যে আমরা চোখ দিয়ে চেটে-পুটে খেয়ে নিতে নিতে ভুলে যাই, পাশেই কোমর-উচ্চতার ছেলেটি বা মেয়েটিও দুচোখে গিলছে। তার দুচোখে নেমে নেমে পড়তে থাকা যুবকের প্যান্ট, আর উঠে উঠে যেতে থাকা যুবতীর টপস্ খুব সহজেই জানলা খুলে হাট করে তীব্র রোদ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সাথে করে ব্রীড়াজনিত সঙ্কোচটুকুও ঝরে পড়ছে।
আমরা এগোচ্ছি সামনে, ধীরে ধীরে আমাদের পদক্ষেপের দ্রুততা বাড়ছে। সেক্ষেত্রে বাইরের জগতের আলো প্রবেশ করার সময়ে অতিবেগুনিরশ্মির মতো কিছু রঙ আমাদের বালক-চোখদের খুব দ্রুতই বয়স্ক করে দিচ্ছে। আমি জানি এটা ঠেকানোর কোনও উপায় নেই। ফ্যাশন নামক বিদঘুটে অসংজ্ঞায়িত শব্দটির ফাঁদে পড়ে অশ্লীলতা ক্রমশই শ্লীল হয়ে যায়।
বালক থেকে বড়ো হয়ে উঠলেই অনেকটাই আগল খুলে যায়। অনেক আপাত রহস্যেরা সহজ-কঠিন সত্যরূপে প্রকাশ পায়। শরীর সশব্দ হয়। সেসময়ে ভাঙা-গড়ার খেলা খেলতে খেলতে একেকজনের নিজস্ব পাপবোধ গড়ে উঠে। এখানে ধর্ম হয়ত একটা বিরাট সর্বগ্রাসী ভূমিকা পালন করে। স্কুলের নতুন-বদলি-হয়ে-আসা হেডমাস্টারের মতন খুব সীমা-নির্ধারিত হয় সবকিছুর। ভালো-মন্দকে বার্লিন দেয়াল তুলে আলাদা করে দেয়া হয়। তবে আগের এই একচেটিয়া অধিকারটুকু ধর্ম দিন দিন হারাচ্ছে। সেটা কতটা হতাশার বা কতটা আশার তার তুলনা করা সম্ভব না। তবে তার মসনদে নতুন যে বসবে তাকে ভালভাবে চিনে নেয়াটা জরুরি। আমরা যখন এক স্বৈরশাসককে সরিয়ে আরেক স্বৈরশাসক টেনে আনি- তখন অনেকসময় বেশ দেরিতে টের পাই, আগেরজনই ভালো ছিলো!
ধর্ম খুব প্রয়োজনীয় রূপ ছেড়ে এই ঢাকা শহরের ইট-কাঠের চাপে পড়ে জুম্মাবার আর রোজার মাসে আটকে যাচ্ছে। অন্য ধর্মগুলোর পালন অতো প্রবল নাই। গুরুজনেরা বলেন, আগে সেগুলোর অনেক উচ্ছ্বাস এখন গলাবন্ধ কোটের মতন গরমে আটকে হাঁসফাঁস করছে। আর ইসলাম দারুন জোশে ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যক্তির পালনের মাঝে ধর্মই ঠিক করে দেয় পাপবোধ কেমন হবে। দিনের পর দিন নামাজ ক্বাযা করে আমাদের ত্বকে যে বোধ আঁচড় কাটে না, সেই বোধই সাঁড়াশি আক্রমণ চালায় একদিন রোজা না রাখলেই (যদিও দুটোর মূল্যমান ধর্মমতে সমান)! এখন আমাদের ক্ষয়িষ্ণু প্রজন্ম সেটাও মানছি না। সমস্ত মাল্টিমিডিয়ার তোড়ে নিবিড় ধর্মপালন বইয়ে চাপা-দেয়া ফুলের পাঁপড়ি হয়ে গেছে। সেখানে ধর্মের সামাজিক উচ্চারণ প্রবল উচ্চকিত।
এখানে তখন মনে হয় কোন বোধে তাহলে আজ আমরা নিজকে যাচাই করি? কেউ কেউ হয়ত মধ্যবিত্ত মূল্যবোধগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরছে। বাবা-মায়েরা কুইনাইন-গোলানো গ্লাসে করে তা সন্তানকে গিলিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু তার মধ্যেও এর রূপ পরিবর্তিত হয়। মানুষ থেকে মানুষে যাবার সময়ে বোধেরা বদলে যায়। নজরুল-রবীন্দ্র-গানেদের রিমিক্সের মতোই! বিলাসিতার মাত্রা আর অপচয়ের পরিসীমা নতুন করে নির্ধারিত হয়। টাকার গন্ধ অনেকটা আফিমের মতো রক্তে প্রবেশ করলে আমরা তাতে বিমোহিত আচ্ছন্ন হতে থাকি আর ক্রমশ ভুলে যাইঃ আমাদের প্রপিতামহেরাও দুপুরে খররোদে ঝলসে যেতে যেতে লাঙলে কাঁধ জুড়ে ঠেলে ঠেলে নীরস মাটি খুঁড়ে সোনা ফলাতেন। তার ত্বকের কালোরঙা জিন আমার অসূর্যম্পশ্যা মাতামহী-মাতার শরীর ঘুরে আমার মাঝে আসতে আসতে চাপা পড়ে গেছে। দুধ-সাদা ত্বকে ঘামেরা জমতেও পারেনা। তাই টিনটেড গ্লাসের ওইপাশে দাঁড়ানো বৃদ্ধ হাত বাড়ালে তাকে আমরা চিনতেও পারি না।
এভাবে ভাবনাটা খুবই একপেশে মনে হয়। একটা এক্সট্রিম-কে প্রকাশ করতে মনে হয় আরেকটা এক্সট্রিম-কে টেনে আনতেই হয়। রুপোর টাকার ঝনঝনানিতে কানে তালা লেগে যেতে যেতে আমরা পাপবোধ কাটিয়ে উঠতে থাকি। এই জনপদের অনেক নিচে, অনেক গভীরে আমাদের প্রপিতামহেরা হাড়-গোড়ে শুয়ে থাকতে থাকতে কেবলই ক্ষয়ে যেতে থাকেন!
***
বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
প্রণয় এবং বিচ্ছেদের অবশ্যম্ভাবিতাঃ একটি ময়নাতদন্ত
সম্পর্কের রসায়ন বেশ কুটিল। আমরা মানুষরা একটা নির্দিষ্ট মুখের ভাষায় যে মিথস্ক্রিয়া চালাই, একে অপরের সাথে- তার বাইরেও আরেকটা মানবীয় অস্ফূট ভাষায় ভাব-চলাচল ঘটে। খানিক চাহনি, একটু নীরবতা, শরীরের একটা বাঙ্ময় আলাপ ঘটে চলে অহরহই আমাদের মাঝে। বিশেষ করে নারী-পুরুষের প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে। এই ময়দানে রোজ কত ক্রন্দন-হাস্য আর আনন্দ-বিষাদ মিশে থাকে তা চিন্তা করে বড়ই অবাক হতে হয়! যেন একটা রোলার-কোস্টার রাইডের মতো আমরা দিগ্বিদিক ছুটে শা শা করে চলে যাচ্ছি, গতির তীব্রতায় চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে, পাশের জনের দিকে তাকানোর অবসার নাই, একদণ্ড সুস্থির হয়ে বসে কারো সাথে আলাপন নেই। আমরা কেবলই ছুটছি। এই উন্মাতাল দৌড়ের মাঝে যারা যারা হাতে হাত ধরছি, সেই বন্ধনও টিকছে না। নিজের গতিতেই আবার বাঁধন ছুটে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি।
সম্পর্কগুলোও কেমন অদ্ভুত ভাবে মিলে-মিশে যায়! পথ চলতে কাউকে হয়তো খুব ভালো লেগে যায়। পরিচয়, দেখা-সাক্ষাৎ গাঢ় হয়। হয়তো দুজনেরই ভালো লাগে একে অপরের সাথে সময় কাটাতে। দেখা হলেই মুখটা হাসিতে ভরে ওঠে। কারণে অকারণে খিলখিল হেসে দেয়া হয়। এ যেন একটা মধুর সময় কাটানো। একটা সময় মনে হয় আরো একটু বেশি চাই তাকে। আরো একটু বেশি দেখতে চাই, আরো একটু বেশি তার কথা শুনতে চাই। এই কামনার জন্ম কোথায়? এই আকর্ষণের জন্ম কোথায়? কে বলতে পারে? আমরা খালি যা ঘটে চলে তার স্বরূপ-নির্ধারণেই নাজেহাল, কার্যকারণ কে খুঁজতে যাবে! দুইজনের মধ্যে কেউ একজন একটা সময় বুঝে ফেলে, অন্য মানুষটাকে ছাড়া চলছে না। কোন ভালো ঘটনা ঘটলে প্রথমে তার কথাই মনে পড়ে, ইচ্ছা করে তার সাথে সেটা ভাগাভাগি করি। কখনও খুব বিষন্ন বিকেলে মনে হয় সে পাশে থাকলে অকারণ কথা বলে মনের ভারটুকু হালকা করা যেতো। এই আকুতিই হয়তো টান! এই চাহিদাটাই হয়তো ভালোবাসা!
ধরা যাক দুজনেরই একসময় এই বোধের উদয় হয় আর তারা বুঝে ফেলে যে একজন ছাড়া আরেকজন ঠিক স্বস্তি পাচ্ছে না। তখন একটা ট্যাগের দরকার পড়ে। শুধু বন্ধুত্বে হয়তো চলে না আর, আরো একটু বেশিই হেলে যায় নির্ভরতার ভারকেন্দ্র। একজন আরেকজনকে যেভাবে পড়ে, যেভাবে বুঝে, মনে হয়, এই সেই- যাকে খুঁজেছি, বা যাকে দরকার। মনের ভাব প্রকাশিত হতেও দেরি হয় না। সেই প্রকাশে হয়তো একটা ক্ষণিক টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়। একজন হয়তো একটু দ্বিধায় পড়ে যায়। তবে মনের টান অনেকসময়ই সেই বাধা পেরিয়ে যায়। একটা বোঝাপড়াও হয়তো হয়ে যায় তাহাদের মাঝে। লেখক সেই বিষয়ে পুরোটা না বুঝলেও এটুকু বুঝে নেয়, এরা হয়তো বাকি জীবনের সময়টুকু ভাগাভাগি করে নিতেই পছন্দ করবে।
এই গল্পটা রূপকথা হলে এখানেই আমার প্রচেষ্টা শেষ হয়ে যেতো। "অ্যান্ড দে লিভ্ড হ্যাপিলি এভার আফটার..." বলে আমিও শেষ করে দিতাম। কিন্তু আমরা খুব অভিশপ্ত জীবনযাপনে মানিয়ে নিচ্ছি নিজেদের। একেকটা মানুষ কতো কোণে খণ্ডিত, তার কতো ভাঁজ, নিজেও বুঝে না কখন বুকে পলি জমে, অভিমান জমে, ছোট ছোট কতো স্বর নিরুত্তর থেকে যায়। আবার হয়তো আমার আশঙ্কা অমূলক, মানুষ আসলেই পারে একে অপরকে ভালোবাসতে অবিমিশ্রভাবে, পারে মানিয়ে নিতে। অনেকেই তো একজীবন কাটিয়ে দেয় পাশাপাশি- সুখে, দুখে, সংগ্রামে, শান্তিতে। আবার কেউ কেউ পারে না। পথ আলাদা হয়ে যায়, মত আলাদা হয়ে যায়।
সেই জোড়ভাঙার সুর প্রথম কবে দেখা যায়? কিভাবে দুজনে মিলে দেখা স্বপ্নেরা ঝরে যায়? প্রকৃতির বৈচিত্র্যের মতো এই ভাঙনের সুরও বিচিত্র! অনেক সময় ছোট ছোট কথায়, ঝগড়ায় মনে কালোমেঘ জড়ো হয়, মনে হয় আগের সেই ভালোবাসা আর নেই, "ও" বোধহয় আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসে না! এই অনিশ্চয়তা নিমেষেই উড়ে যায় যদি নির্ভরতা মিলে। এতটুকু স্পর্শ, সহানুভূতি বা ধৈর্যশীল আচরণে হয়তো সাময়িক ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটে। আবার অনেক সময় পাশের মানুষটা হয়তো সেটা বুঝতেও পারে না। তখন শুরু হয় অভিমানের ঢেউ। একটার পর একটা ঢেউ এসে মানুষটাকে বিপর্যস্ত, বিস্রস্ত করে দেয়। একবার মনে হয় কেঁদে কেটে রাগ দেখিয়ে বলে দিই, "তুমি এমন কেন? আমাকে কেন বুঝো না? আমাকে কেন কষ্ট দাও?" তারপরেই আরো বড়ো ঢেউ এসে ঝাপ্টে ভিজিয়ে দেয়, "আমি কেন বলবো? ও কেনো বুঝে নেয় না? আমাকে এতো কম বুঝে কেন ও?"
এখানে অতীতের সাথে তুলনাও শুরু হয়ে যায়। আমরা অবুঝ হয়তো, তাই বুঝি না যে নদীর পাড়ের মতো আমরা বদলে যাচ্ছি প্রতিমুহূর্তে, আমাদেরও মন বদলায়, আমরা বড়ো হয়ে যাই, পরিবর্তিত হই। সেখানে পাশেরজনকেও একই তালে বদলাতে হয় কিংবা বুঝে নিতে হয় এই বদলে যাওয়াটায় কারো হাত নেই- এটাই স্বাভাবিক। হয়তো একটা সময়ে সম্পর্কের টানেই একজন বুঝে যায় অপরজনের অভিমান। পুরোনো সুর ফিরে আসতে চায়, সেই ভালোবাসার টানেই আবার দুজনে হেসে ওঠে, বুঝে নেয়ঃ সকালের রোদ আর দুপুরের রোদে অনেক ফারাক। তবু বেঁচে থাকা যায় পাশাপাশি, একে অপরকে এখনও কামনা করা যায়! হাতের পাতা আবারও নতুন করে মিলিয়ে নেয়া যায়।
যদি সেটা না হয় তাহলে আরো জড়িয়ে যায় তন্তুগুলো। শুরু হয় টানাপোড়েন- একটা চাপা ক্ষোভ! একটু একটু মনে হয় পাশে থাকা মানুষটা অচেনা, তাকে আর পড়া যাচ্ছে না ঠিকমতো। কেমন যেন বিরক্ত লাগে সবকিছুই। ছোটখাটো বিষয় যা আগে গায়েই লাগতো না, হালকা খুনসুটিতে উড়ে যেত পলকা পাতার মতো, সেগুলোই পড়ে পড়ে দানা বাঁধতে থাকে। ক্ষোভেরা দলে দলে, দিনে দিনে জমা হয়ে একটা দ্রোহে রূপ নেয়! যে মানুষটাকে আগে এতো ভালো লাগতো, তাকে আর ভালো লাগে না। আজকাল কথায় কথায় ঝগড়া হয়। কোথা থেকে কোথায় চলে যায় কথা-সব। দুজন দুজনকে এতো ভালো করে চিনে, তাই কথায় পুরোনো অভিমান, রাগ, ঝগড়াগুলো উঠে আসতে থাকে। দুজনেরই "ইগো" দাঁড়িয়ে যায়। যে টুকরো কথায় আগে মিটমাট হয়ে যেত এখন সেই কথায় কিছুই হয় না। আরো অনেক কথা ব্যয় করে, ক্লান্ত হয়েও মনোমালিন্য কাটে না। কালি জমতে থাকে দুজনের মাঝে। যে ভালোবাসায় একদিন দুজনে একসাথে ঘন হয়েছিলো আজ সেই ভালোবাসাই হারিয়ে যেতে থাকে।
এইসময় নিজেদের অজান্তেই একটা দূরত্ব তৈরি হয়। দূরত্বটা মনের, চিন্তার, পাশাপাশি থাকার, সর্বোপরি ভালোবাসার। অনেক সময় কথা হয় না অনেকদিন। হলেও ছাড়া-ছাড়া, আগের মতো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে না মনের সাথে মন! অনেকসময় এখান থেকেও সম্পর্কেরা বেঁচে থাকে। অনেকে মানিয়ে নেয়। একটা সম্পর্ক সবসময়ই একটা বড় লগ্নি। মানুষ সহজে সেই লগ্নি করা বিশ্বাস, সেই পুঁজিটা হারাতে চায় না। ভারি হয়ে ওঠা কথামালাকে কাঁধে নিয়েও অনেকে পাশাপাশি থাকে।
তখন হয়তো আরো গভীর যন্ত্রণার সূত্রপাত ঘটে। অচলায়তন ভাঙতে যে এগিয়ে আসে, স্বভাবতই সে একটু সুবিধা পায়। টেনে নেয়া সম্পর্ককে সে টিকিয়ে রেখেছে এরকম একটা ধারণা তাকে একটা সুযোগ দেয় অপরজনকে করুণা করার। সেখানে তীব্র না হলেও একটা প্রচ্ছন্ন আধিপত্য তৈরি হয়। অপরজন তখন হয়তো অজান্তেই একটা অপরাধবোধে ভুগতে থাকে। "আমি হয়তো ওর মতো অতটা ম্যাচিওর না!" -এরকম সন্দেহের দোলাচলে সে একটু ম্রিয়মান হয়ে পড়ে। এখানে আরো অনেক সম্ভাবনার সত্যি হওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু সবক্ষেত্রেই আগের সেই ভারসাম্যটি আর টিঁকে থাকে না। যদিও আমরা সর্বদা বলি যে পুরোনো কথা ভুলে গিয়ে নতুন করে শুরু করা- কিন্তু বাস্তব বলে মানুষকে এহেন গভীর সম্পর্কের খুঁটিনাটিগুলোও অনেক বেশি তাড়িত করে।
অনেকে এখানে আরো একটু সুখের আশায় ভারি সম্পর্কের জোয়াল কাঁধ থেকে নামিয়ে ফেলে। "হেথা নয় হোথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে" -এরকম আকূতিতে হয়তো কষ্টের বিষে নীল হয়েও তীব্র বিচ্ছেদের মাঝ দিয়ে যায় মানুষ। একটা বিচ্ছেদ- তা যতই দ্রুত বা ধীরেই ঘটুক না কেন, খুবই বেদনা আর হতাশার। অনেকে নিজেকে দোষারোপ করে, অনেকে অপরজনকে দোষারোপ করে। কিন্তু প্রকৃত দোষ কার? একটা মধুর সম্পর্ক কী করে এরকম বিষিয়ে যায়! ভালোবাসায় উন্মাতাল প্রবাহ থেমে কেন বুকে এই ক্ষোভ জন্মায়? কেনই বা কারো সাথে থাকতে কুণ্ঠায় কুঁকড়ে যেতে হয়, যেখানে একটা সময়ে তাকে নিয়ে গর্ব হতো! এই প্রশ্নগুলো স্বাভাবিকভাবেই খেলা করে মনে।
আমরা অসহায় মানুষ হাতড়ে বেড়াই, উত্তর খুঁজি। কিন্তু হায়! উত্তর মেলে না। ভেবে নিই আরেক মানুষের মাঝে হয়তো সুখী হবো, আগের ভুলগুলো শুধরে ভালবাসবো আবার। আবার হয়তো স্বপ্ন দেখা, আবেগে ভেসে যাওয়া। ভবিষ্যতকে সুন্দর করতে, কারো সাথে জীবন উদযাপন করতে চায় মন। মানুষ তো সততই একাকী, এই একাকীত্ব কাটাতেই জীবনকে নানান উপাচারে ভরে দেয়া, সামাজিকতায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখা। চারপাশে প্রিয় মানুষগুলোকে নিবিড় করে ধরে রাখা যাতে তাদের হৃদয়ের ওমে শীতল-স্ব একটু উষ্ণতা পায়!
এখানে শুধুই বিচ্ছেদের সুরের বিশ্লেষণ। তবে আমি ভাবতে চাই না এভাবে। আমাদের সামর্থ্যের মাত্রা আমরাই জানি না। এক ছাদের নিচে সবসময় হাসি-আনন্দে থাকার জিন নিয়ে আমরা জন্মাইনি। এত বেশি সংঘর্ষ আমাদের নিজেদের মধ্যেই সবসময় ঘটে চলে, আরেকজন মানুষের সাথে তো আরো বেশি ঘটবে সেটা! তারপরও মানুষ ভালোবাসে, আপ্লুত হয় অদ্ভুত আবেশে। অযথাই হেসে ওঠে উদ্দাম! কাউকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে ভাবে বাকিজীবনের আলোছায়ায় তার সাথেই পেরোনো হোক পথ। এই অপার আশাবাদী মানুষকে আমার বড়ো ভালো লাগে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়, আমাদের অতি জটিল পারস্পরিক লড়াইয়ে এক সুপ্রভাতে আমরা সবাই-ই জিতে যাবো!
***
