সিনেমাখোর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সিনেমাখোর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১২

পাইয়ের জীবন - রূপকজাদু!


আজকে দেখে এলাম লাইফ অফ পাই। ইয়ান মার্টেলের বিখ্যাত বইয়ের চলচ্চিত্ররূপ। অ্যাং লিয়ের কাজ আমার খুব পছন্দের, তার বেশ কয়েকটি ছবি দেখা হয়েছে - যেমন "সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি", "ব্রোকব্যাক মাউন্টেইন", "ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্র্যাগন" ইত্যাদি। ছবিগুলো দেখে তার ব্যাপারে আমার একটা প্রত্যাশার মাত্রা তৈরি হয়েছিল। সব পরিচালককে নিয়েই হয়। আমার কাছে সিনেমার এক এবং একমাত্র শিল্পী হলেন পরিচালক। অভিনেতা, ক্যামেরাম্যান, স্ক্রিপ্টরাইটার - এরা হলেন কেবল সেই শিল্পীর আঁকার ভিন্ন ভিন্ন তুলি, এর বেশি কিছু না। অ্যাং লিয়ের ব্যাপারেও একটা নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছিল আমার, কিন্তু আজকে সেই ধারণা ভেঙে গেল। অ্যাং লি তার পূর্বের সব সীমানা ও সীমাবদ্ধতাকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলেছেন। তার এই ছবিটা সম্ভবত তার কর্মজীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হতে যাচ্ছে। টেরেন্স ম্যালিকের যেমন "ট্রি অফ লাইফ", অ্যাং লিয়ের তেমন "লাইফ অফ পাই"...
ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে হলো Piscine Patel বা সংক্ষেপে Pi, অভিনয় করেছেন ইরফান খান। চরিত্রটির নাম নিয়ে অংশটুকু বারবার ইরফানের আরেক ছবি "দ্যা নেইমসেক"-এর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। সেখানে গোগোলের নিজের নাম নিয়ে যে টানাপোড়েন, হীনম্মন্যতা - তার কাছাকাছি হীনম্মন্যতাও পাইয়ের জীবনে ছিল। ছোটবেলা থেকে পাইয়ের মাঝে যে গভীর আত্মজিজ্ঞাসা, ধর্ম ও জীবনকে বোঝার নিষ্কলুষ চেষ্টা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ছোট ছোট জিজ্ঞাসা তার মাঝে - আমরা কে - স্রষ্টা কে - স্রষ্টা কেমন - ধর্ম কী, এগুলো তো আমাদেরও মনে কখনো না কখনো আসে। সেই ছোট্ট কিশোর পাই-এর আকুতি তাই বড়ো চেনা মনে হয়। পাইয়ের মায়ের চরিত্র করেছেন টাবু, এবং বরাবরের মতই অনবদ্য তার অভিনয়। মুম্বাইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আসলে বুঝলো না টাবু কত বড়ো অভিনেতা, বিদেশি পরিচালক আর মিডিয়া বুঝলো। বলিউডে তাকে সারাজীবন অফট্র্যাক আর বাণিজ্য-অসফল কিছু মুভি করতে হলো। (ব্যাপক আফসোসের ইমো)
তবে এদের দুইজনকেও ছাপিয়ে গেছে সুরজ শর্মা। অভিনয়ে অভিষেক হলো তার এই ছবির মাধ্যমে - এবং এক মুহূর্তের জন্যেও মনে হয় নি কোন অভিনয় দেখছি। তার উৎকণ্ঠা, তার মরণের ভয়, তার বেঁচে থাকার প্রবল চেষ্টা- এই সবকিছুর মধ্যে কতটা বাস্তব আর কতটা অভিনয় ফারাক করা মুশকিল।
ছবিটার গল্প তেমন কিছু বলবো না। আপাতদৃষ্টিতে বেশ সাধারণ গল্প (উপরের লিংকে দেখলেই বুঝবেন)। কিন্তু যেটা নিয়ে বলো সেটা হলো ছবিতে রূপকের অভিনবত্ব নিয়ে। ছবিটি দেখার সময় অবশ্যই হাতে দু'ঘণ্টা সময় নিয়ে বসবেন। যারা দেশে দেখবেন, ভালো প্রিন্টের জন্য অপেক্ষা করুন। এই ছবি বাজে প্রিন্টে দেখলে রীতিমত হতাশ ও ক্ষুব্ধ হবেন। মেজাজ খারাপও হতে পারে। কিন্তু ভাল প্রিন্ট দেখে অনুভূতি হবে ঠিক উল্টোটা! সিনেমাটোগ্রাফি আর ফটোগ্রাফি দেখে হতবাক হয়ে গেছি। আমি ঠিক জানি না এর চেয়ে নয়নাভিরাম ছবি আর দেখেছি কী না। পুনরুক্তি হলেও বলি - ট্রি অফ লাইফ-এ মহাজাগতিক সৃষ্টির যে অসহ্য সুন্দর চিত্রায়ন দেখেছিলাম, তার থেকে সুন্দর লেগেছে লাইফ অফ পাই-এর সমুদ্র-সকাল-ঝড়-বিদ্যুচ্চমক! এমন সৌন্দর্য হতবাক করে দেয়, ইন্দ্রিয় দখল করে নেয়। কিন্তু ছবিটায় কি এগুলোই সব? এত ঠাট-ঠমকের বাইরেও চোখে পড়লো জীবন দর্শন নিয়ে টুকরো টুকরো কথা। রূপকগুলো আমি নিজেও সব ধরতে পারি নি, এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে অপারগতা স্বাভাবিক। এজন্য ছবিটা আরো কয়েকবার দেখবো। বইটাও পড়বার ব্যাকুল আগ্রহ হচ্ছে। যে জীবন দোয়েলের, ফড়িংয়ের - তাকে একবার ছুঁয়ে দেখবার সাধ হচ্ছে।
ছবিটা শেষ করার পর অনেকক্ষণ আমার মাথায় কিছু ঢুকছিল না। কী দেখলাম, কেন দেখলাম। এই দু'চোখে যা দেখি, তার সবই কি সত্যি? তার বাইরে কি আর কোন সত্যি নাই? এমন কি হতে পারে না যে একই জীবনের একাধিক রূপ পাশাপাশি সমান্তরালে চলছে! হতে পারে না যে কোন রূপই আসলে সত্যি না, কিংবা সবগুলোই সত্যি। বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পাইয়ের বাবার একটা উক্তিঃ You can believe whatever you want, but believing everything does not mean anything. It only means you don't believe in anything. (স্মৃতি থেকে লিখছি, মূল উদ্ধৃতিটা পেলাম না)
এ'বছর বেশ কিছু ভাল ছবি বের হয়েছে। আমার প্রিয় কিছু ছবিও আছে। তবে এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারি যে লাইফ অফ পাই এই বছরের সেরা ছবি। শুধু তাই না, এটি সম্ভবত এই দশকের সেরা ছবির লিস্টে প্রথম পাঁচে থাকার দাবি করে।
এর বেশি বললে আসলে ছবিটা দেখার মজা নষ্ট করা হবে। তাই এটুকুই থাক...
আর সব কথা বলা হয়ে গেলে নীরবতার কণ্ঠস্বর শুনবেন কীভাবে?

শনিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১১

গেরিলা দেখতে গিয়ে

নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত ছবি ‘গেরিলা’ মুক্তি পেলো ১৪ এপ্রিল, নববর্ষের দিন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর বানানো ছবি। গল্প নেয়া হয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবান’ থেকে। চিত্রনাট্যে উপন্যাসের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা পরিচালকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকেও গল্প নেয়া হয়েছে। মুক্তি পাওয়ার পরে আমার ছবিটা দেখতে যেতে একটু দেরি হলো। প্রথম সপ্তাহে পারলাম না, দ্বিতীয় সপ্তাহের মাঝামাঝিতে একদিন স্টার সিনেপ্লেক্সে গিয়ে টিকেট কাটলাম। এক সপ্তাহ আগেই ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ দেখেছি। পরপর অল্প ব্যবধানে দু’টা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি দেখা আমার জন্য আনন্দের ব্যাপার। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে খুব বেশি ভালো মানের ছবি বানানো হয় নি। কারিগরি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা একটা বড়ো কারণ। বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপ্তি আরেকটি বড়ো কারণ। এছাড়াও ছোটখাটো কিছু কারণ আছে। অন্যতম প্রধান কারণ আমার মতে মুক্তিযুদ্ধকে পরিবেশন করার ভঙ্গি। ছোটবেলা থেকে আমাদেরকে যে মুক্তিযুদ্ধ শেখানো হয়, যা আমরা বইপুস্তক থেকে শিখি, মিডিয়া দেখে জানি, এটা চরম বিরক্তিকর পরিবেশনা। ভাঙা রেকর্ডের মতো কিছু বুলি আওড়ে মুক্তিযুদ্ধকে বর্ণনা করা হয়। দিন-তারিখ, মৃতের সংখ্যা, পক্ষ-বিপক্ষ এগুলো নিরসভাবে বলে দেয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধের স্থিরচিত্রগুলো সে তুলনায় অনেক বাঙ্ময়। ছবিগুলো কেবল কথা বলে না, যেন চিৎকার করে। স্থিরচিত্রের একটা বড়ো অংশ নির্যাতিত বাঙালির ছবি। ২৫ মার্চের কালরাতের গণহত্যা থেকে শুরু করে ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যার ছবিগুলো বহুল প্রচারিত। বন্দুক কাঁধে মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি গুটিকতক দেখতে পাই, মিছিল-আন্দোলনের কিছু স্ন্যাপশট দেখতে পাই। কিন্তু সম্মুখ যুদ্ধের ছবি তোলার উপায় ছিলো না, কিংবা পাকিস্তানিদের ছবি, তাদের সরাসরি অত্যাচার করার ছবি বাস্তব কারণেই নেই। সরাসরি না দেখে, কেবল আফটার-ম্যাথ দেখে আমরা মুক্তিযুদ্ধকে জেনেছি। এবং শূন্যস্থানগুলোতে নিজ নিজ কল্পনার আশ্রয়ে বসিয়ে দিয়েছি পাকিস্তানি খুনী বা রাজাকার ধর্ষণকারীদের চেহারা। কর্মকাণ্ডগুলো হয়তো ভিনদেশি মুভি দেখে বসিয়েও নিতে পারি আমরা কেউ কেউ। কিন্তু মূল চিত্রের ধারে-কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা তাতে কম।

মনে রাখতে হবে, এটা পৃথিবীর বৃহত্তম গণহত্যা ঘটা যুদ্ধ, গিনেজ বুকের হিসাবে , উনবিংশ শতকের প্রথম পাঁচটি গণহত্যার মধ্যে বাংলাদেশের গণহত্যা একটি। সময়ের হিসাবে মাত্র নয় মাসে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। অংশ নিয়েছে পাকিস্তানের আর্মি, বাঙালি ও বিহারি সিভিলিয়ান রাজাকার। এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের বিচ্ছিন্ন এবং তাৎপর্যহীন চিত্র সিনেমায় দেখেছি। আমাদের মধ্যবিত্তীয় ও গড়পড়তা মননে প্রশ্ন জাগে নি কেন এই হত্যাকাণ্ড। এতো বড়ো গণহত্যা এতো কম সময়ে করার পিছনে নিশ্চয়ই বড়ো কোন উদ্দীপনা ছিল! খুব স্বাভাবিক এই প্রশ্নের কারণ অনুসন্ধান ঘটে না মুক্তিযুদ্ধের গল্প-কবিতা-সিনেমা-তে। সেই কারণ অনুসন্ধান দেখতে পেলাম গেরিলায়। গোলাগুলি, মৃত্যু, রক্ত, সিনেমাটিক দৃশ্যাবলী ও সংলাপ, গান, সব কিছু ছাপিয়ে সিনেমা-শেষের পরে আমার প্রাপ্তি হলো এই প্রশ্নের উত্তর! একটু পরে বলছি এ নিয়ে বিস্তারিত।

মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে রাজনৈতিক পটভূমি জরুরি। একাত্তরের রাজনীতিতে, সমসাময়িক পাকিস্তানি দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সক্রিয় ছিলো জামায়াতে ইসলামী। এই দলের অবস্থান স্বভাবতই মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতে। পাকিস্তান-রক্ষাকল্পে তারা দৃঢ় বলীয়ান। শেখ মুজিব একজন দুষ্কৃতিকারী, দেশে গণ্ডগোল লাগাতে চায়। মুজিবের চ্যালা-চামুণ্ডারা হলো নাশকতাবাদী। পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রকারী। তাই এদের রুখতে দলে দলে জামাতে ইসলামীতে যোগ দিন, রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিন। পাকিস্তান আর্মির হাত সবল করুন। এই সত্য-শ্লোগানগুলো এতোদিন সিনেমায় ঠারেঠুরে দেখানো হতো। যেন ভাশুরের নাম, সরাসরি মুখে নিতে নেই! নাসির উদ্দিন সেই পথে যান নি। ছবির প্রায় পুরোটা জুড়েই এরকম শ্লোগান লেখা ব্যানার চোখে পড়েছে। গলিতে গলিতে, স্টেশনে স্টেশনে,পাকিস্তানি ক্যাম্পে, স্কুল-কলেজের সামনেও এমন ব্যানার ঝুলতো। ঘরে ঘরে গিয়ে দাওয়াত দিতো শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানরা, এলাকার প্রভাবশালীদের কাছে। এরা শান্তি কমিটিতে যোগ দিলে তাদের প্রভূত লাভ, গুপ্তচরবৃত্তিতে সুবিধা, লুঠতরাজেও সুবিধা। রাজাকার চরিত্রগুলো সর্বোচ্চ-সৎ অভিনয় দেখিয়েছেন। পরিচালকসহ এই সকল অভিনেতাকে ধন্যবাদ জানাই! অভিনয়ের দিক থেকে জয়া আহসানের অভিনয় সম্ভবত নিখুঁতের কাছাকাছি। এতোটা প্রাণবন্ত, এতোটা ‘ভিভিড’ অভিনয় আমি অনেকদিন দেখি না। বাংলাদেশের নায়িকাদের মধ্যে তো না-ই। যেখানে মেলোড্রামার অভিনয় আর ছলোছলো নির্যাতিত অবলা নারীর বাইরে বাংলা সিনেমার নায়িকাদের কিছু করার থাকে না এবং এটুকু মোটামুটি পারলেই আমরা বাহবা দিয়ে ভাসিয়ে দেই, সেখানে, সেই চর্চার জায়গায় জয়া আহসান একটা উল্লম্ফিত পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। সিনেমার আড়াই ঘন্টায় তার চরিত্রের যে প্রগ্রেশন, যেভাবে তার অনুভূতিগুলো বদলে বদলে যাচ্ছিলো, সেটা অভিনব। বিশেষ করে, ছবির শেষ আধাঘন্টার অভিনয় দেখার মতো, চমকে যাওয়ার মতো, পুরষ্কার দেয়ার মতো।

সিনেমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরে কিছুদিন সময় লাগে আমার ধাতস্থ হতে। সিনেমার ক্ষমতা সম্বন্ধে আমি সততই খুব আশাবাদী, কারণ এই অডিও-ভিজুয়্যাল মিডিয়া আমাদেরকে এক অদ্ভুত বাস্তবতার জগতে নিয়ে যায়। বেশিরভাগ সময় তা কেবলই নিছক কল্পনা, কিংবা নৈর্ব্যক্তিক শিল্প। মাঝে মাঝে এই সিনেমার জগত কেবল কল্পনার বাস্তবতা বা শিল্পের পট ছেড়ে আমাদের বাস্তব জগতে ছড়িয়ে পড়ে। ফিরে আসি ওই প্রশ্নের কথায়। নাসির উদ্দীনের সিনেমা গেরিলা এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। উত্তরটি সত্য ও সৎ উত্তর, একইসাথে প্রচণ্ড বাস্তব ঘনিষ্ঠও বটে। এতোটাই যে হতভম্ব ও বিস্মিত হয়ে গিয়েছি, ধাতস্থ হতে কিছুদিন সময় লেগেছে। আবছা আবছা ‘চেতনা’র ধারণা থেকে এক টানে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে অনেকগুলো ধোঁয়াশা। সিনেমা কতো শক্তিশালি হতে পারে, কতো গাঢ়ভাবে দার্শনিক হতে পারে, সেটার প্রমাণ পেলাম। প্রশ্নটি ছিলো, এই এতো অল্প সময়ে এতো ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড ঘটার কারণ কী? সাথে সম্পূরক প্রশ্ন হলো মুক্তিযুদ্ধের দার্শনিক, বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্দেশ্য কী ছিলো? এই দুটো প্রশ্নের উত্তরে অনেক মুক্তিযোদ্ধাও একটু থতমত খান। যুদ্ধ করার প্রকট উদ্দেশ্য (অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ইত্যাদি) এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকট কারণ (বাঙালি-পাকিস্তান জাতিগত বিরোধ, লোভ ইত্যাদি) ছাপিয়ে প্রচ্ছন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ কারণটি কারো চোখে পড়ে না। মুখেও সরে না। মুক্তিযুদ্ধে এতো বড়ো হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সময় বারবার বলা হয়েছে এই “দুষ্কৃতিকারী”রা পাকিস্তানের শত্রু, ইসলামের শত্রু। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ইসলামিক রাষ্ট্র ভাঙার পাঁয়তারা করছে। সাহায্য নিচ্ছে পার্শ্ববর্তী ভারত থেকে, হিন্দুদের থেকে। বাঙালি হিন্দুদেরকেও মারা হয়েছে, তা তিনি যতোবড়ো গুণী ব্যক্তিই হন না কেন, মেরে রায়েরবাজারে ফেলে রাখা হয়েছে। ধর্মের পরিচয়ে এতো বড়ো হত্যাযজ্ঞ আর ঘটে নি।

এই উত্তর শুনে অনেকেই মাথা নাড়ছেন। বিরোধিতা করতে চাইছেন। দোষ আপনার নয়। আমাদের পাঠ্যপুস্তক থেকে সামাজিক সকল প্রতিষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে গেলে এই উত্তরটি এড়িয়ে যান। মুসলিম মুসলিম ভাই বলে একটা কথা খুব ফোটে আমাদের মুখে, সেটা একাত্তরের বর্ণনায় গিয়ে উচ্চারিত হয় না। খালি পাকিস্তানের খেলা থাকলে শুনতে পাই শ্লোগানের মতো। বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ধর্ম-রাজনীতির আফিম খেয়ে খেয়ে এখন আমরা এটাই মানি, এটাই জানি। নাসির উদ্দীন ইউসুফ সেই জানা ও মানার তোয়াক্কা করেন নি, সরাসরি দেখিয়েছেন কীভাবে মানুষ কোরবানি দেয়া হয়েছে। গরু কোরবানির সময় যেমন আমরা গর্ত করি, মাঠে নিয়ে সেভাবে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধাদের কোরবানি করা হয়েছে ইসলামের নামে। এই ইসলাম ‘প্রকৃত’ কী ‘স্খলিত’, ‘ঠিক’ কী ‘অন্যায়’ সেটা তখনও জরুরি ছিলো না, এখনও না। জরুরি হলো এই খুনিরা, তাদের খুনের বিচার। আমরা যদি এখনও এপোলোজেটিক হয়ে থাকি, ধর্ম-রাজনীতির ফাঁপা বুলিতে বিশ্বাস করে “ভাইয়ে ভাইয়ে ভুল করে মারামারি হয়ে গেছে” ভেবে “মরেই তো যাবে কয়েকদিন পরে” বলে এদেরকে ছেড়ে দেই, তাহলে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, বাংলাদেশ একদিন আবার পূর্ব পাকিস্তান হয়ে উঠবে। ধর্মরাষ্ট্রের কুটিল ভোজালি এসে মানুষের গলা কাটবে। এগুলো কোন ‘ফিয়ার-পলিটিক্স’ না, এগুলো ‘এক তরফা দৃষ্টিভঙ্গি’ না। এই ভবিষ্যদ্বাণী অঙ্কের হিসাবের মতো সরল, অবশ্যম্ভাবী। যদি মানতে না চায় মন, গত মাসে আমিনীর হরতালের সময় বলা কথাগুলো স্মরণ করুন। “পানিবৎতরলং” হয়ে যাবে। নাসির উদ্দীন ইউসুফকে ধন্যবাদ। সৈয়দ শামসুল হককে ধন্যবাদ। কলাকুশলীদের ধন্যবাদ। গেরিলাকে ধন্যবাদ।

সিনেমা হল-এ আলো ফুটে উঠলে দেখলাম, আমার পাশে দুই বয়স্কা নারী শাড়ির আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছেন। চোখ মুছছেন। আমি তাদের দিকে একবার তাকিয়ে বেরিয়ে এলাম। আমারও চোখ ভেজা। নিঃশব্দে দুয়েকফোঁটা অশ্রু না হয় পড়ুক তাঁদের জন্যে।

রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১১

আমার বন্ধু রাশেদ

আমার বন্ধু রাশেদ একটি ভালো ছায়াছবি, মানে ফিল্ম। সিনেমাও বলা যায়। মোরশেদুল ইসলাম একজন ভালো পরিচালক। আমার বন্ধু রাশেদ বইটির লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল একজন ভালো লেখক।

এই তিন লাইনেই আসলে শুক্রবারের সিনেমা-দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ফেলা যায়। কিন্তু তারপর আরো একটু বলতে গেলে আমি কিছুটা মুশকিলে পড়ি। বাক্য-বিন্যাস বা চিন্তা-প্রকাশের মুশকিল। অসুবিধা হয়ে দাঁড়িয়ে যায় কৈশোর ও প্রথম যৌবনের আবেগ। বাস্তবতার ভিতর থেকে অতি সহজেই সিনেমার ভেতরে প্রবেশ করেছি, এখন সেই বাস্তবতার মাঝে ফেরত আসতে ইচ্ছা করে না। সিনেপ্লেক্সের প্রায়ান্ধকার হলরুমটিকেই বাস্তব বলে মনে হতে থাকে। আর সামনে ওয়াইড-স্ক্রিন সিনেমার পর্দাটিকে আয়না বলে ভ্রম হয়। যে রাজশাহী শহরটিকে সেখানে দেখি, শহরতলীর মতো শান্ত, নিবিড়, রিকশার টুংটাং; সেই শহরটিকে সত্য বলে মনে হয়। সত্য বলে মনে হয় শফিক ভাই, অরু আপা কিংবা আজরফ রাজাকারকেও।

সম্ভবত এখানেই সিনেমার মুনশিয়ানা। পরিচালকের একক-দর্শন ছাপিয়ে তা হাজারো দর্শকের মন ছুঁয়ে দিতে পারে, কখনো তাদের হাসায়, কখনো তাদের কাঁদায়, কখনো তারা উল্লাস করে সিনেম্যাটিক বাস্তবতার দৃশ্য দেখে। এই সবকিছুর এক ঝলক পেয়ে গেলাম শুক্রবার বিকেলে।

যখন শহর ছেড়ে চলে গেলো প্রদীপরা, ইবু যখন দেখা করতে গেলো ভোর ভোর বেলায়, প্রদীপ যখন তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, "আজকে থেকে আমরা বাস্তুহারা। আমাদের আর কোনো ভিটামাটি থাকলো না। আর কোনোদিন তোর সাথে দেখা হবে কি না জানি না!", তখন অজান্তেই চোখে পানি এলো। যুদ্ধের দমফাটা আর্তনাদের পিছনেও কতো লক্ষ মানুষের ঘরহারানোর কষ্ট একা একা গুমরে মরেছে! কেউ শোনে নি, কেউ জানতেও পারে নি। ভোর ফোটার আগেই তারা কষ্টগুলো পোটলা বেঁধে রিকশায় করে চলে গেছে সীমান্তের ওপারে। যেতে যেতে পাকিস্তানির গুলিতে মরেছে, বেয়োনেটে মরেছে, ধর্ষণ হয়েও আত্মহত্যা করেছে কতো শতো হিন্দু নারী, কিশোরী। এগুলো দলিলে আসে না। খালি শর্মিলা বসুরা থিসিস করে আর মেহেরজানরা প্রেম করে!

তারপর যখন দেখি, রাশেদ শার্ট খুলে মুখ ঢেকে আজরফ রাজাকারকে ভয় দেখায়। দুই চ্যালা রাজাকার আজরফকে খবর দিতে আসছিলো। রাশেদ আগেই গিয়ে বললো, "মুক্তিযোদ্ধারা এসে গেছে, তোমারে খুঁজতেছে", বলেই দ্রুত পালিয়ে গেলো। তখন আজরফের ভয় খাওয়া, পাতি রাজাকার দেখে মুক্তিযোদ্ধা ভেবে পড়িমড়ি করে দৌড় দেয়া আর রাজাকাররা তাকে ধরে ফেললে হড়বড় করে বলতে থাকা, "আমি বঙ্গবন্ধুর লোক, আমি জয়বাংলার লোক, আমারে মাইরেন না", শুনে হল ভরে তালি বেজে উঠলো। মনে হলো আত্মীয়ের মাঝে আছি, নিরাপদ আছি। এই হলরুমের বাইরেই একটা গোষ্ঠী আছে, যারা বাংলাদেশ চায় নি। তারা এখন বাংলাদেশের মন্ত্রী। দেশের অনেকখানি ক্ষমতা তাদের হাতে। সেই গোষ্ঠী একাত্তরের পরে "বঙ্গবন্ধুর লোক" হয়ে গিয়েছিলো চার বছরের জন্যে। আবার সময় এলে ঘাপটি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। সুবেশি এইসব রাজাকার ও রাজাকারমনা কেউ কি সেদিন হল-এ ছিলো? মনে হয় না।

আমার বন্ধু রাশেদ সিনেমা হিসেবে কেমন? এই বিচার কি আমি করতে পারি? মাঝে মাঝে কিছু সিনেমা নির্মিত হয়, যেগুলোকে সাদা চোখে বিচার করার ক্ষমতা দর্শকদের থাকে না। এর কারণ ছবিটির সাথে অনেক ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক আবেগ জড়িয়ে থাকে। এই আবেগ খারাপ কিছু নয়। আর বাংলাদেশিদের জন্যে এই আবেগ দুর্লভ হয়ে পড়ছে দিন দিন। আমরা এখন রিকনসিলিয়েশনের বাণী শুনি। মিরপুরে পাকিস্তানি পতাকা উড়তে দেখি। এই মিরপুরেই রাশেদের মতো চোখ বেঁধে কতো মানুষকে মেরে ফেলেছিলো আজরফের মতো রাজাকাররা, সেটা ভুলে যাই। অতীতের ভুলচুক!

"You fooled us once, shame on you. You fooled us twice, shame on us." - এই আপ্তবাক্যটি ভুলে যেতে আমাদের বেশি সময় লাগে না। হয়তো রাশেদদের কথাও আমরা ভুলেই গেছি। এখন সেগুলো প্যানপ্যানানি হয়ে গেছে। আমি সিনেমা দেখতে দেখতে খেয়াল করলাম, পিছনে এক ছোট্ট বাবু মায়ের সাথে ছবি দেখতে এসেছে। ক্লাস থ্রি কিংবা ফোর-এ পড়ে। ছবির ফাঁকে ফাঁকে তার প্রশ্নগুলো শুনছিলাম।

কী নির্দোষ, কি সরলমনে সে জিজ্ঞাসা করছে, "ওরা কেন গুলি নিয়ে যাচ্ছে?"
- "যুদ্ধ করার জন্যে, মা।"

"ওদের অনেক সাহস?"
- "হ্যাঁ, মা।"

"রাশেদকে কেন বেঁধে রেখেছে?"
- "মেরে ফেলবে, মা"

"কেন?"
...
...এর পরে আর বাবুটির মা জবাব দেয় না। কেন রাশেদকে মেরে ফেললো, কেনই বা আমরা রাশেদদের কথা বারবার বলি না, সেটা ওই ছোট বাবুটা এখন বুঝবে না। কিন্তু একদিন বুঝবে, সেদিন হয়তো আমাদেরকেই দোষ দিবে। আমরা কেন রাশেদদের কথা মনে রাখি নি, শিখাই নি বলে।

মোরশেদুল ইসলামকে ধন্যবাদ, যে ছবিগুলো নির্মিত হওয়া দরকার, সেগুলোর মাঝে একটি ছবি এত আন্তরিকতা দিয়ে তৈরি করার জন্যে। যে বিষয়গুলো জরুরি, যে কথাগুলো না বললেই না, সেগুলো বলার মানুষ খুব বেশি নেই। এই উপন্যাসটি কিশোর বয়সে কাঁদিয়েছে, ভাবিয়েছে। আর এতো বছর পরে এই ছবিটি আবারও কাঁদালো, ভাবালো। আর কী চাই!
রাশেদ আর ইবুর চরিত্রের অভিনেতা দু'জন চমৎকার অভিনয় করেছেন। হয়তো পেশাদার নয় তারা, কিন্তু যে আন্তরিকতা দিয়ে চেষ্টা করেছে, সেটা খুব ভালো লেগেছে। পাশাপাশি পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় (ইবুর বাবার চরিত্র) -এর গুজব নিয়ে কমিক রিলিফগুলো, কিংবা রাইসুল ইসলাম আসাদের (বড়ো বয়সের ইবু) স্মৃতিচারণের দৃশ্যগুলো মনে দাগ কেটে গেছে।
ছবির নির্মাণ বা কারিগরি দিকের বোদ্ধা আমি নই। কিন্তু এটুকু বলতে পারি যে সিনেমা কতো দ্রুত ও সহজে দর্শকের সাথে জুড়ে যেতে পারে, সেই বিচারে "আমার বন্ধু রাশেদ" অনেক এগিয়ে থাকবে। কিশোরদের জন্যে কিশোরদের অভিনীত ছবি সব-বয়সী দর্শকের চোখে জল আনছে, এই দৃশ্যটি চমৎকার। হল থেকে বেরিয়ে তাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
এখনও সময় যায় নি, এখনও সব ফুরিয়ে যায় নি। টিমটিম করে হলেও আশার প্রদীপ জ্বলছে। বাংলাদেশের সকল কিশোর-কিশোরীর এই ছবিটি দেখা দরকার। তাহলে হয়তো আমরা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারবো, যারা অশ্লীল পাকি-পতাকা নিয়ে অর্ধনগ্ন হয়ে 'খেলার নামে' পাকিস্তান পাকিস্তান জপবে না। যারা রাজাকারদের চিহ্নিত করতে পারবে - দলমত নির্বিশেষে। যারা বাংলাদেশের সঠিক জন্মেতিহাস জানবে। যারা এই দেশের নায়ক ও খলনায়কদের সত্য-পরিচয় জানবে। সেই দিন আসবেই।
রাশেদদের জন্যে রইলো অন্তরতর ভালোবাসা!

শুক্রবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১১

অ্যালেন গিনসবার্গের Howl...

====================
howl [হাউ্‌ল্‌] n. বিশেষত নেকড়ের একটানা হুঙ্কার; (মানুষের) আর্তনাদ; (অবজ্ঞা, কৌতুক ইত্যাদির) চিৎকার।
====================
কিছু কিছু ছবি গুগলের কাছে নিয়ে যায়। ছবি দেখা শেষ হলে, ইচ্ছা করে একটু পিছনের গল্পটা জেনে নেই। কতোটুকু সত্যিই ছিল, কতোটুকু পরিচালকের সিনেম্যাটিক বাস্তবতা, কতোটুকু দর্শক হিসেবে আমার অনুমান। গুগল করে অনেককিছু জানা যায়। অনেকে অজানা খবর ঠিক ঠাক বুঝা যায়। তারপর আবার কিছু কিছু ছবি থাকে, দেখার পরে গুগল করার ইচ্ছা হলেও করি না, তাতে সিনেমার মজাটা হারিয়ে যেতে পারে। অতিবিশ্লেষণ মাঝে মাঝে রসভঙ্গ দেয়। ভাং খাওয়ার পরে কেউ ভাঙের রাসায়নিক কম্পোজিশন কানের কাছে ভ্যান ভ্যান করলে যেমন লাগে, তেমন। Howl দেখার পরে আমি এই দুইদিকের টানাটানিতে পড়ে গেলাম। সিনেমা খুব ভালো লেগে গেছে। ভীতিকর স্বপ্নের মতো ভালো লেগেছে। যেমন স্বপ্ন ঠিক ঠিক দুঃস্বপ্ন না, কারণ দেখার সময় পানিতে পড়ি নাই, স্বপ্নে কোন দুর্ঘটনাও ঘটে নাই। কিন্তু ঘুম ভেঙে সেই স্বপ্নের কথা ভাবলে একটু একটু ভয় হচ্ছে। সেই ভয়ের সাথে আবার অজানা আনন্দও মিশে আছে। আবার সেই ভয়ের অনুভবের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে। 
ছবিটা বিস্ময়কর। একটি কবিতাকে সিনেমায় তুলে আনা দুরূহ কাজ। বেশিরভাগ উপন্যাসকে সিনেমায় আনতে গিয়েই অনেকে হিমশিম খায়, সেখানে গল্প বা উপন্যাস নয়, একেবারে কবিতা! পরিচালকের কি মাথা খারাপ হয়েছিলো? তাও এমন কবিতা যা পঞ্চাশের দশকে পুরো একটা জাতির একটা প্রজন্মকে মোটামুটি তুলে আনতে পারে? কবিতা ছাড়েন, কবির নামটাও আমাদের অজপাড়াদেশের বেশিরভাগ মানুষ জানেন। সেই সুবিখ্যাত কবি, সেই (কু)খ্যাত আন্দোলনের ভেতর দিয়ে সিনেমার দৃশ্য বয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিনতম কাজের একটা। তাই পরিচালক অতিবাস্তব কল্পনার কাছে আশ্রয় নিলেন। সিনেমার অর্ধেক অংশ হলো কবি অ্যালেন গিনসবার্গের সাক্ষাতকার এবং কবিতার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার মামলার শুনানি। বাকি অর্ধেক অংশ কবির কবিতা পাঠ এবং কবিতার পাশাপাশি কবিতাদৃশ্য। এই দৃশ্যগুলো অ্যানিমেটেড। এছাড়া উপায়ও নেই, বরং এটাই সর্বোত্তম উপায়। কবিতার দৃশ্যকে সেলুলয়েডে বাস্তব চিত্র দিয়ে তুলে আনা যায় না। সেখানে কম্পিউটার গ্রাফিক্সের ভরসায় না থেকে পরিচালকেরা সরাসরি অ্যানিমেশনে চলে গেছেন। মাঝে মাঝে বাস্তব জগতের ভেতর থেকে ফুঁড়ে বেরুচ্ছে অ্যানিমেশন, মাঝে মাঝে অ্যানিমেশন মিশে যাচ্ছে সাদাকালো আলোর অ্যালেনের পাঠরত অবয়বের সাথে। চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে আবার পাঠ শুরু করছেন অ্যালেন, একটু দম নিয়ে নিচ্ছেন দুই স্তবকের মাঝে। উদ্দাম কণ্ঠ ছাড়া ছোট হোটেলের পাটাতনে সবাই নিশ্চুপ। সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে, নীরবতার মাঝে শোনা যাচ্ছে টুং টাং গেলাসের আওয়াজ। সব কিছু ছাপিয়ে এক টানা নেকড়ের আর্তনাদ, Howl!! 
পরিচালক দু'জনের নাম রবার্ট এপস্টিন এবং জেফ্রি ফ্রিডম্যান। দু'জনেই এর আগে বেশ কিছু ডকুমেন্টারি বানিয়েছেন। এই ছবিটা ঠিক ডকুমেন্টারি নয়, একটু পুরোদস্তুর মোশন পিকচার। তবে বৈশিষ্ট্য হলো, এই ছবির সকল সংলাপ, বাস্তব। কেউ না কেউ, কখনো না কখনো, কোথাও না কোথাও বলেছেন। যেমন সাক্ষাতকার নেয়ার দৃশ্যে অ্যালেনের বলা সকল কথাই বাস্তবে বলেছেন তিনি। যেমন কোর্টরুমে শুনানির সময় বলা সব কথাই সত্যি। সেইদিক থেকে সিনেমার ভেতরে সংলাপগুলো কল্পনার নয়। তবে তার বাইরে মূল অংশ যে কবিতা, যে কবিতার আলাপ, সেগুলো কল্পনার রঙ ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছে বার বার। এবং দর্শকের চোখে, মনে, মগজে ছাপ ফেলে দেয়ার মতো দৃশ্য। এই দৃশ্য তৈরির জন্য এরিক ড্রুকারকে ধন্যবাদ দিতেই হচ্ছে!
কবিতার শরীরের ভেতর দিয়ে অ্যালেনের জীবন-ছবি ফুটে উঠতে থাকে। ছোটোবেলা, কিশোরবেলা, আবেগ। কিশোরবেলা-যুবকবেলা, প্রেম। অ্যালেন সমকামী ছিলেন, যাদের ভালোবাসতেন, তাদের জন্য তাঁর আকুতির মাঝে আমি কোনো ভেদাভেদ পাই না। অনুভবের কোন লিঙ্গ নাই, তাই একজন বিষমকামী যেভাবে প্রেয়সীকে কামনা করে, যেভাবে কাতর হয়, যেভাবে তার বিনিদ্র রাত জুড়ে থাকে একজনের চুলের সুবাস, ঠোঁটের বাঁকানো হাসি, তেমনভাবেই অ্যালেন তাড়িত হন। সেই উন্মাতাল সময়, মাদক-ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া বাস্তবতা, আর পরাবাস্তব কবিতার সময়ের মধ্যে অ্যালেন জন্মেছিলেন আরেক জন্ম। সেই সময় আমেরিকায় একটা পুরো প্রজন্ম বেড়ে উঠছিলো, অবয়ব পাচ্ছিলো, যাদের নাম বিট জেনারেশন। অ্যালেন সেই জেনারেশনের পুরোধা কবি। 
Howl And Other Poems বইটা অ্যালেনের প্রথম বই। এই কবিতার দায়ে বইটা অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়। মার্কিন আদালতে মামলা চলে প্রকাশক এবং সরকারি পক্ষের মধ্যে। সেন্সরশীপ, অশ্লীলতা নিয়ে সীমারেখার আলাপ উঠে আসে সেই মামলায়। বিভিন্ন অধ্যাপককে জবানি দিতে হয় এই বইয়ের সাহিত্যমূল্য বা সাহিত্যিক গুরুত্ব নিয়ে। এই অংশটুকু মজাদার। বেশ কিছু বুড়োটে প্রতিক্রিয়াশীল হামবড়া বুড়ো-জোয়ান প্রফেসর দেখতে পাই। তারা প্রথাগত কোটরে বন্দি, চোখের সামনে প্রথাগত ঠুলি। ঠুলি চোখে Howl তাদের কাছে অশ্লীল, নোংরা, অশ্রাব্য, হোমোসেক্সুয়াল, ট্যাবু। তাই এই কবিতার নানা অংশ নিয়েই তাদের প্রশ্ন উঠে গেছে। শব্দের শুদ্ধবাদিতা নিয়ে এঁড়োতর্কও জুড়ে দিয়েছেন তারা। এই অংশটা দেখে মজা লাগলো কারণ এখনও চারপাশে এই এঁড়ো ষাঁড় প্রচুর পয়দা হয়ে আছে। এই যুগে এসেও যারা ভাষার গায়ে পোশাক ও অলঙ্কার নিয়ে চিন্তিত। একটা শব্দেই তাদের শুচিতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। 

ভাগ্যিস সেই অত্যাচার বেশিক্ষণ সইতে হয় নি। কালো ফ্রেমের চশমা পরা অ্যালেন এসে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। জেমস ফ্র্যাঙ্কোকে চিনেছি সেই স্পাইডারম্যান (২০০২) থেকে। তবে এই বছরে তার ছবিগুলো প্রশংসার দাবিদার। "127 Days", "Howl", "Eat Pray Love" সবগুলোতেই ফ্র্যাঙ্কো ধীরে ধীরে নিজের জাত চিনিয়ে দিচ্ছেন। যেমন ২০০৮-এ Milk ছবিটা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। হোমোসেক্সুয়াল চরিত্রের জন্যে ফ্র্যাঙ্কো বাঁধা পছন্দ হয়ে যাবেন মনে হয় পরিচালকদের। 
সবকিছু ছাপিয়েও, শেষমেশ ছবি জুড়ে একটা কবিতাই জ্বলজ্বল করছে। অ্যালেন গিনসবার্গকে আমরা সবাই 'যশোর রোড' দিয়ে চিনতাম, এবার আমি 'হাওল' দিয়ে চিনলাম। এবং এই পরিচয় আরো গভীর, প্রোথিত আবেগের, মানবিক, প্রেমাকুল। এক নেকড়ের দীর্ঘ আর্তনাদের মতোই এক টানা জান্তব, অথচ তীব্র কামনাময়!

====================

সম্পূর্ণ কবিতাঃ এখানে
সম্পূর্ণ সিনেমাঃ এখানে

====================






বৃহস্পতিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১০

ভালো কাজ

বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে গিয়ে "মনের মানুষ" ছবিটা দেখে আসছি। গৌতম ঘোষ পরিচালক, দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনার ছবি। অনেক আগে গৌতম ঘোষ পদ্মা নদীর মাঝি বানিয়েছিলেন। দেখে হতাশ হয়েছিলাম। কোন উপন্যাসের লাইন বাই লাইন দৃশ্য রচনা করে জুড়ে দিলেই সেটা চলচ্চিত্র হয়ে যায় না। এইটা গৌতম ঘোষ জানলেও, মানেন না। এদিকে "মনের মানুষ" বইটা পড়া হয় নাই (সুনীল গাঙ্গুলির লেখা), তাই ভাবলাম ছবিটাই দেখে ফেলি। কুষ্টিয়ার ফকির লালন সাঁইয়ের জীবন নিয়ে বানানো ছবি।

লালনের ভূমিকায় প্রসেনজিৎ, লালনের গুরুর ভূমিকায় রাইসুল ইসলাম আসাদ। এখানে গিয়েই বিপত্তি বাঁধলো। এরই মধ্যে লালন হিসেবে আসাদের চেহারা ও অভিনয় মাথায় গেঁথে গিয়েছিলো। সেখানে প্রসেনজিৎকে বসানো খুব কঠিন। আর যেহেতু ওপারের পরিচালক (এবং লেখক) সেহেতু গল্প শুরু হলো লালনের পোর্ট্রেট করছেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর - এই দৃশ্য থেকে। সেখান থেকে ফ্ল্যাশব্যাক। লালনের তরুণ জীবন। বিবাহিত ও সুখী লালন, সরলসোজা, গান গায়, বৈষয়িক তাড়না নাই, গাঁয়ের মোড়ল বা কর্তার ঘোড়ার দেখভালের দায়িত্ব পেলো। দৃশ্যধারণের এই খাপছাড়াভাব দেখে সুনীলের বইটা পড়ার শখ হলো। এখানে কেন এরকম? 'সেইসময়' উপন্যাসে যেমন সুনীল জাম্প-কাট করতেন, সেরকম ভাবে এই বইটাও কি লিখেছেন নাকি? গৌতম ঘোষ কেন এভাবে শুরু করলেন।

ভাবতে ভাবতেই লালনের অসুখ। জলবসন্ত, চিকিৎসাহীন ও নিরাময়হীন। তাই সবাই মিলে গঙ্গায় (পদ্মায়) ভাসিয়ে দিলো। বাঁশের ভেলার ওপর মশারি, শাদা চাদর গায়ে মুমূর্ষু লালনের দেহখানা ভেসে চলছে। ঢেউ ছাড়া চরাচরে কোন শব্দ নাই। এইখানে দৃশ্যের সাথে শব্দের যে মিল, সেটা চমকে দিলো। এখানেই বলে রাখি কারিগরি দিক থেকে ছবিটি দারুণ লেগেছে। লালনের ছবিতে যদি শব্দধারণ ভালো না হতো, তাহলে ভালো লাগতো না। চিত্রগ্রহণের ব্যাপারেও একই কথা, ভোরের কুয়াশামাখা নদীর পাড়, অথবা রাতের চন্দ্রালোকিত কুটির - সবই অদ্ভুত আলো-ছায়া-রহস্যমাখা মনে হয়েছে! লালনের নাম ও জীবনের সাথে যে রহস্যময়তা, সেটা এখানেই ফুটে উঠেছে!

ইন্টারভ্যাল পর্যন্ত জমজমাট ছবি। গান, সুর, অভিনয়। আসাদ-চঞ্চল-পাওলী দাম, তিনজনের চরিত্র খুব চমৎকার লেগেছে। লালনের স্ত্রীর চরিত্রের অভিনেত্রী এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরিত্রও টেনে নিয়ে গেছেন। ডুবিয়ে দিয়েছেন লালনের মায়ের চরিত্রে চম্পা (তার একটা খুব ক্রুশিয়াল দৃশ্যের অতি-অভিনয়ে হলের ভেতরেই লোকজন হাসতে শুরু করলো, অথচ দৃশ্যটা খুবই সিরিয়াস ছিলো), এবং পরে লালনের সেবাদাসী হিসেবে এক অভিনেত্রী। বিশেষ করে পরের জনকে কেন কাস্ট করা হয়েছে তা বুঝলাম না। একেবারেই অভিব্যক্তি নাই!

গৌতম ঘোষের মূল দূর্বলতার জায়গা দেখলাম ক্লাইম্যাক্স এবং ফিনিশিংয়ে। ছবির আমেজ অনেকটাই কেটে গেলো শেষে এসে। তবু কিছু ছবি দেখে এসে যেমন সেই ছবির ভেতরের জীবনধারা নিয়ে আগ্রহ লাগে, একটু গুগল করতে ইচ্ছা করে, একটু জানতে আর পড়তে ইচ্ছা করে, এই ছবিটাও সে'রকমই। গানের মাঝে সবগুলোই ভালো লেগেছে। দুয়েকটা গান শেষে গিয়ে একই থিমের কারণে একটু ধরে আসলেও অসুবিধা নাই। উপরি পাওনা, চঞ্চলের কমেডি। ধীরে ধীরে বাংলা সিনেমার এই ধরনের রোলগুলো তিনি কব্জা করে নিচ্ছেন!

এখন লালনের গানগুলো শুনছি। কিছু কিছু জিনিস অনেকদিন পর শুনলে মন ধুয়ে মুছে যায়। মাঝে হয়তো মনে অনেক শ্রান্তি আর ক্লেশ জমে গেছিলো। সব কেটে যাচ্ছে!

শুক্রবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১০

ওন্দস্কান

মাথা ভার ভার করছে সারাদিন ধরে। অনেক কাজ করছি সারাদিন ধরে। বেশিরভাগ সময় কম্পিউটারের সামনে যারা কাটান, হঠাৎ করে পুরো একটা দিন বা সারা সপ্তাহ ইন্টারনেট আর কম্পিউটার না ধরলে তাদের কেমন লাগবে? ভাবছিলাম। কিছু কিছু ব্যাপার যেমন কল্পনাতেও আসে না, ফ্যান্টাসির চাইতেও বেশি অসম্ভব বলে মনে হয়, এই ব্যাপারটাও মনে হয় সেরকম! আমি প্রায় দশ বছর ধরে নিজের কম্পিউটার ব্যবহার করছি, হঠাৎ করে এক দিন বা দুই দিন কম্পিউটার সচল না পেলে মাথার সার্কিটে কোন একটা 'গিয়াঞ্জাম' লেগে যায় (আগে গিট্টু লাগতো, গিট্টুর পরের দশা হলো গেরো, আর গিয়াঞ্জাম হলো শেষ অবস্থা!)। মনে হতে থাকে একটা হাত নাই; অথবা পেটের ভেতরে পাকস্থলী নাই - খাবার খাইলে সরাসরি তলপেটে চলে যাচ্ছে। এই ধরনের উদ্ভট শারীরিক অত্যাচার সহ্য করতে করতে মনে হতে থাকে যে আমি বোধহয় আসক্ত। নেশাগ্রস্ত।

অনেক আগে একটা ছবি দেখেছিলাম মনিটরের ভেতরে মাথা ম্যাট্রিক্সের মতো গলে গলে ঢুকে যাচ্ছে আর বাকি শরীরটা টার্মিনেটর টু-এর মতো এলুমিনিয়ামের মতো গলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে তেমন লাগে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এটা যে অস্বাভাবিক বা সমস্যা, তা বুঝতে পারি না। স্বাভাবিক মনে হয়। অভ্যস্ত হলে অপ্রাকৃতিক আচরণও ন্যায্য মনে হয়।



কিছু ছবি দেখার পরে অতীতের কথা মনে পড়ে। আমার স্বল্পায়ু অতীত। সুইডেনের ছবি ওন্দস্কান (Ondskan), মানে হলো Evil, শয়তান। ছবিটা যার কাছ থেকে নিয়েছি, সে বলেছিলো যে ক্যাডেট কলেজের কথা মনে পড়বে, দেখেন, মজা পাবেন (সে নিজেও এক্স-ক্যাডেট)। দেখা শুরু করার ২০ মিনিট পরে একটু থামলাম। একটা দৃশ্য দেখালো, বোর্ডিং হাউজে আসার পরে রুমমেটের সাথে কথোপকথন। রুমমেট বেশ পড়ুয়া, ভালো ছাত্র, তবে খেলাধুলায় ভালো না, একটু পৃথুল শরীরের। যে সিনিয়র প্রিফেক্ট নতুন ছেলেটাকে নিয়ে এসেছে, সে এই ব্যাপারটা নিয়ে একটু হালকা ঝাড়ি দিয়ে গেলো। নতুন ছেলেটাই গল্পের মূল নায়ক, রাগী, বয়ঃসন্ধির রাগ, পেটা শরীর, সাঁতার কাটতে পছন্দ করে। আমি থেমে গেলাম কারণ আমি নিজেও খুব একটা ভালো ছিলাম না খেলাধুলায়। খেলতাম, খুব এনজয় করেই খেলেছি দুই তিন বছর। কিন্তু যতো সিনিয়র হয়ে গেছি ততোই খেলাধুলার দিক থেকে মন সরে গিয়েছে। খুব প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমার কখনই ভালো লাগে না। ওপেন চ্যালেঞ্জ, জিগীষার যে খাপ-খোলা-রূপ খেলার মাঠে ফুটে ওঠে, সেটা আমাকে কিছুটা সন্ত্রস্ত করে।

ছবিটা মূলত এই বোর্ডিংয়ের জীবন-যাপন নিয়ে নয়। বরং আরো অনেক গভীর মনস্তত্ত্বে গিয়ে নাড়া দিয়েছে। আর এখন যদি ব্যাখ্যা করতে যাই, পারবো না। এতোটাই সূক্ষ্ণ-উদ্দীপন, যে ভাষায় প্রকাশের ক্ষমতা নাই। ছবিটার নামে যে শয়তানের কথা বলেছে, সেটা আমাদের ভেতরের পাশবিকতা। হিংস্র জানোয়ারের মতো আমরা মাঝে মাঝে দাঁত দিয়ে, নখ দিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে চাই। সামনে পরা মানুষটাকে আর মানুষ বলে মনে করি না। ভায়োলেন্স আসলে খুবই "সাপেক্ষ" আচরণ। যা কিনা পরিবেশ, মুহূর্ত এবং আরো অনেক প্রভাবকের ওপর নির্ভর করে। গিয়ারের দাঁতের মতো, অনেকগুলো ছোটবড় চাকার দাঁত মিলে গেলে ঘোটঘোট করে ঘুরতে থাকে ভায়োলেন্সের চাকা। এর সাথে যুক্ত হয় মব-ফিয়ার, দলগত-হিংস্রতা। কোন র‍্যাশনাল বা ক্রিটিকাল সমালোচনা এখানে তুচ্ছ।

আরেকটা জিনিস খুব ঘটতে দেখেছি, যে কোন বদ্ধ-আবাসিক ব্যবস্থায়। সেটা হলো ব্যবস্থার নিজস্ব একটা চালু 'সিস্টেম' থাকে। এটা অনেকটাই সপ্রাণ। আর প্রাণের বৈশিষ্ট্যই হলো বিবর্তন। সিস্টেম ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়। অনেক বুঝে শুনে নিয়মকানুন বানালেও নিজে নিজে সিস্টেমটা মানুষগুলোকে দিয়ে আরেকটা আলাদা নিয়মকানুনের ইশতেহার বানিয়ে ফেলে। যেন সে বুঝতে পারছে কোনভাবে চললে, কোন নিয়মে চালালে সবচেয়ে স্থিতিশীল সিস্টেম তৈরি করা যাবে। যতোই 'রেড বুক' বা 'নীতিমালা' বানাই না কেন, শেষতক সেই সিস্টেমের-বানানো-নিয়মটাই টিকে থাকবে। এটা যেন নিজেই নিজের জন্য সীমানা তৈরি করে!

আর মানুষ খুবই ফালতু সৃষ্টি। কারণ অধিকাংশ মানুষ এই সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। যারা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকারে থাকেন, তারাও পারেন না। সিস্টেমের হাতে তারাও এক একটা ঘুঁটি। এখানেও লজিক্যাল কোন ডিডাকশন নাই। মেনে চলো। সুখী হবে। এই যে 'সুখ', এটাও সিস্টেম বুঝিয়ে দিচ্ছে। ঠিক ওই ম্যাট্রিক্সের মতোন!

যাস্‌সালা, ঘুরে ফিরে সেই তো গোড়ায় ফিরে এলুম! এই কী গেরো! ( আশার কথা, গিয়াঞ্জাম কেটে 'গেরো'তে এসেছি, গিট্টুতেও চলে আসতে পারবো নিশ্চিত!)

সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১০

জগা বললো - জগাখিচুড়ি!


সময় খুব অদ্ভুত জিনিস। এই মুহূর্তে যা ভাবছি, সেই কথাটা হুশ করে আমার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে! এই পৃথিবী যে সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে বন বন করে, সেই ঘূর্ণনের বেগ জানি কতো? ১৬০০ কিলোমিটার প্রতিঘন্টায়! আমি থির হয়ে এক জায়গায় বসে থাকলেও সটান জোরে চলে যাচ্ছি কতো দূরে। এই দূরত্ব অমোচনীয়। আবার দ্রুততায় মিশে যাচ্ছি কারো কারো সাথে। আমাদের এই পরিচয়, এই ক্ষণিকের মিলন ঠিক একটা দেয়াশলাইয়ের অগ্নিকণার সমান। ফপ করে নিভে গেলে ঘুটঘুট্টি।

সময় নিয়ে ভাবতেও সময় লাগে। সেই সময়ের কথা লিখতে আরো একটু সময় চলে যায়। আজ – অদ্য তাই আলসেমি। আড়মোড়া ভাঙি না, ভাঁজ করে রেখে দিই। সময় জানে, আমার সাথে লড়াইয়ে সে সবসময় জিতবে। তাই মুচকি হাসে, তাচ্ছিল্য।

সময় চলে যাচ্ছে এটা হ্যান্নার মুখের দিকে চাইলেও বুঝতে পারি। হ্যান্না ডাকোটা ফ্যানিং। এই তো ক’দিন আগে দেখলাম ছোট্টমণি। সবার সাথে কথা বলে গিড়বিড়-কলকল। কেউ একটু মুখ ভার করে কিছু বললেই ছলোছলো হয়ে ওঠে, টলমল করে কচুপাতার ওপরে একবিন্দু শিশিরের মতো। আবার স্মিত হাসি দিতেই খিলখিল! সেই হ্যান্নার শিশুমুখ কিছুতেই ভুলতে পারি না। সেও বড়ো হয়ে যাচ্ছে তরতর করে – সুইট সিক্সটিন। সেদিন তার ছবি দেখলাম – হাউন্ডডগ। দেখার সময় বারবার মনে পড়ছিলো টেইকেন-এর পিচ্চি অ্যালি’কে। দুটো ছোট ছোট বেণী দুলিয়ে আধো আধো বোলে কথা বলতো মিষ্টি মেয়েটা, আর এখন কেমন গহীন অন্ধকার সব চরিত্র করছে। মানুষের ভেতরের কুৎসিত দিকগুলোর শিকার হচ্ছে রূপালি পর্দায়, তারপরে সেই নীল চোখে তার অশ্রু...। সেই অশ্রু আর টলমল করে না, চোখেই শুকিয়ে ফেলে সে। তারপরে চোয়াল শক্ত করে। পৃথিবী চুরমার হয়ে ঘুরছে, তার সাথে পাল্লা দিতে হবে না! তাই হ্যান্না বড়ো হয়ে ওঠে...

বার বার মনে হয়, এ আমি মানি না।

সেই বেদনাতেই কি না। পৃথিবী ঘুরে ঘুরে আমার সাথে দেখা করিয়ে দেয় এক গাড়ি চোরের। নাম – মিশেল পোয়কার্ড। তার সাথে ঘুরতে ঘুরতে দেখা পাই প্যাট্রিসিয়ার। এরা দুইজনে দেড় ঘন্টা বক বক করে, ঝগড়া করে, মারপিটও করে কিছুটা। দৌড়ে বেড়ায় সাঁজেলিসে'র এভিন্যু ধরে। গাড়ি চুরি করে মিশেল, সেই গাড়িতে চড়ে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করতে যায় প্যাট্রিসিয়া। আর সবচেয়ে ভালো লাগে ৩৯ মিনিট ধরে ছোট একটা ঘরের ভেতর তাদের কথাবার্তা। দুজনে বিছানায় বসে কথা বলতেই থাকে, বলতেই থাকে। এরই মাঝে ক্রমাগত সিগ্রেট ফোঁকে মিশেল। আবোল তাবোল অসংলগ্ন আলাপ।

আপনার কি কখনও এমন হয় নি, কারো সাথে অর্থহীন, লক্ষ্যহীন কথা বলেছেন ঘন্টার পর ঘন্টা। কথা বলার পরে ভুলেও গেছেন যে কি বিষয়ে কথা শুরু করেছিলেন? মিশেল – প্যাট্রিসিয়ার গল্পটাও সেরকম। ছবির শুরুতে একটা খুন করেছে মিশেল, এক পুলিশ ড্রাইভারকে দূর্ঘটনাক্রমে গুলি করে মেরে ফেলেছে সে। তার পর থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। প্যারিসে ফিরে এসেছে জেলের খাঁড়া মাথায় নিয়ে শুধু প্যাট্রিসিয়ার জন্যে। তাকে নিয়ে সে পালিয়ে যেতে চায় ইতালি। সেখানে গিয়ে দুইজনে থাকবে। কিন্তু প্যাট্রিসিয়া যেতে চায় না। গড়িমসি করে। সেই এক ঘরের দৃশ্যে জানায়, তার ভেতরে আরেকজন আসছে। মিশেল আর তার সন্তান। এর জন্যে প্যারিসে থাকতে চায় সে। আর মিশেল তাকে নিয়ে চলে যেতে চায়।

খুব একটা রুদ্ধশ্বাস কিছু নেই। তারপরেও ছবির নাম – ব্রেথলেসজাঁ-ল্যুক গ’দার পরিচালক। সম্ভবত ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিচালক। পঞ্চাশ বছর আগে তার তৈরি এই ছবিটা দেখে রুদ্ধশ্বাস হয়েই বসে থাকি।

পৃথিবী কেন বন বন করে ঘোরে। কেন সে একটু থম ধরে দম নেয় না। চারপাশে এতো বাতাস, এতো হাহাকার মিশে ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাঝে!

আমি একটু নির্জলা বাতাস চাই, বিশুদ্ধ অক্সিজেন না হলেও চলবে। খালি একটু ভেজাল মেশানো, কোমল পানীয়ের মতো, বাতাস ফুসফুসে টেনে নেবো। তারপর একটু সময় বুকের ভেতর চেপে ধরে রাখবো। এভাবে আমার মনে হবে আমার চারপাশে আর কিছু নেই। কেউ নেই। কোন কিছু সত্যি সত্যিই আমাকে আর স্পর্শ করতে পারছে না। এই ভাবনা গাঢ় হওয়ার আগে হুট করে সেই বাতাসটুকু ছেড়ে দিবো। তাহলে মনে হবে আমি বেঁচে আছি। আমি ব্রেথলেস নই। আমার ভেতরে ফুসফুস সর্‌সর্‌ করে কাজ করছে। পেঁচিয়ে উঠছে ধমনীতে রাগ-ক্ষোভ-ভোগের স্রোত। গ’দার জানেন না, তিনি যে বছর মারা গেছেন সেই বছরেই আমি পৃথিবীতে এসেছিলাম। আর এতোটা সময় পরে, তিনি আমাকে ব্রেথলেস করে দিলেন জাম্প-কাট করা ছবির শেষ দশ মিনিট দিয়ে।

সবকিছু আসলে লাটিমের মতো ঘুরছে, এই পৃথিবী, তার মেরুরেখা-বিষুবরেখা, সমুদ্র-হিমাচল, আমাদের খবরের কাগজের প্রথম পাতা, আমাদের মুখ- প্রমুখ সকল কিছুই ঘূর্ণিতে মিশে হারিয়ে যাবার ঠিক আগে আগে ঝলসে উঠছে। এই বিশ্ব-চরাচরে তার অস্তিত্বের চে’ আর জরুরি কিছু নাই!



*****

২১.৯.১০

রবিবার, ২০ জুন, ২০১০

বাবাদের ছবি - ছেলেমেয়েদের জন্যে! (অথবা বাবাদিবসের বাখানি)

আজকে বাবা দিবস। আমাদের সংস্কৃতিতে এই দিবসটা একেবারেই নতুন, আর নতুনের প্রতি সবারই একটা সন্দেহমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। সেই কারণে ভাবতে গেলে মাঝে মাঝেই নেতিবাচক মনোভাবেরও দেখা পাই। ব্যক্তিগতভাবে আমি একটা মাত্র দিনে ঘটা করে বাবাকে স্মরণ করার পক্ষে নই। আমার মতে মা-বাবা যে কোন মানুষের একান্ত আপনজন, সবচেয়ে নিঃস্বার্থ তো বটেই। তাঁদের জন্যে একটা মাত্র দিনে আলাদা করে উদযাপনের কোন মানে হয় না। তাঁরা চিরন্তন, আমার পার্থিব জীবনের পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান তাঁদের। আমার সুখ, নিরাপত্তা আর মানবিক গুণাবলীর পেছনেও তাঁদের হাত সবচেয়ে বেশি।

হয় কি, সারাদিন পাশাপাশি থাকলে অতি আপনজনদেরও অনেক সময়ে বলা হয় না তাঁরা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ, তাদেরকে আমরা কতোটা ভালোবাসি। সেই কথাগুলো হুট করে বলতেও একটু লজ্জা লজ্জা লাগে। মায়ের আর বাবার জন্মদিনে বাসায় ঘটা করে কেক কাটি, বাচ্চাদের মতো আনন্দ করে তাঁদেরকে একটু হলেও খুশি রাখার চেষ্টা করি। এর পাশাপাশি বাবা দিবস, মা দিবসে আরেকটা সুযোগ/উপলক্ষ্যও পাওয়া গেলো বলারঃ "বাবা, তোমার জন্যেই সব ভালোবাসা। তোমার কাছেই শিখেছি জীবনের কতো পাঠ, প্রথম নামতা, প্রথম সাইকেল চালানো।" প্রথম যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হলো, তুমিই বলেছিলে, "এখন তুমি বড়ো হয়ে গেছো, জীবনের সব সিদ্ধান্ত এখন থেকে তোমাকেই নিতে হবে। খালি মনে রাখবে তোমার কাজেকর্মে যেন অপরের ক্ষতি না হয়, তাহলেই তুমি 'মানুষ' হতে পারবে!"


ইদানিংখুব মুভি দেখছি। পুরনো দেখা মুভিগুলো ঘেঁটে ঘেঁটে দেখছিলাম বাবা-ছেলে অথবা বাবা-মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে ভালো ছবিগুলো কি কি। আমার দেখা সেইসব মুভির একটা সংগ্রহ নিয়েই লিখবো ভাবলাম!



এই মুভিটা নির্বাক যুগের, এবং চার্লি চ্যাপলিনের পরিচালক হিসেবে অন্যতম মাস্টারপিস। অভিনেতাও মূলত দুজনে- চার্লি হলো সেই পুরনো ভবঘুরে, যার কোন চালচুলা নাই, ঘরবাড়ি নাই, টুটাফাটা পোশাক, বোওলার হ্যাট পরে আর ছড়ি হাতে সে ঘুরে বেড়ায়। এভাবে ঘুরতে ঘুরতেই তার দেখা হয়ে যায় এক অনাথ শিশুর সাথে। শিশুটি পরিত্যক্ত, বিনাবাপের ছেলেকে মা জন্মানোর পরেই ফেলে রেখে গেছে। চার্লি সেই ছেলেটিকে তুলে নেয়, তারপরে তাকে পালতে থাকে। নিজের খাওয়ার কোন খবর নাই, কিন্তু সেই নাম-পরিচয়হীন শিশুটির জন্যে সে কত কীই না করলো!
উদ্ভট ভবঘুরের মনুষ্যত্ব দেখে চোখের পানি আটকে রাখাও মুশকিল, আবার দেখা যায় তার কমিক চেহারার নানারকম মুখভঙ্গি আমাদের মুখেও এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলছে! এই ছবিটা সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের আইকনিক প্যাথো-কমেডির (যে ছবির মূল সূর বিষাদাত্মক, অথচ সমাপ্তি মিলনাত্মক) একটা উজ্জ্বল নিদর্শন। দেখার পরে একই সাথে মন খারাপ হয়, আবার মন ভালোও হয়।


এই ছবিটাও অসামান্য খালি বাবা এবং ছেলের অভিনয়ের গুণে! উইল স্মিথকে আমার সবসময়েই বাণিজ্যিক ছবির হালকা চালের অভিনেতা মনে হতো, কিন্তু এই ছবি এবং সেভেন পাউন্ডস দেখার পরে আমি সেই ধারণা বদলে ফেলেছি। গুণী পরিচালক (গ্যাব্রিয়েল মুচ্চিনো) আর দুর্দান্ত চিত্রনাট্য পেলে ছবি ভালো হবেই। সেই সাথে জুড়ে গেছে বাস্তবের পিতাপুত্রের অভিনয় (উইল স্মিথ আর তার ছেলে জ্যাডেন স্মিথ)। আর এই ছবিটা একটা সত্য ঘটনার উপরে ভিত্তি করে বানানো বলে দেখার সময়েই মনে হতে থাকে কারো জীবনের কাহিনী দেখছি!
যাদের কাছে মনে হয় বিদেশের জীবন খুব সুখের আর আনন্দের, তাদেরকেও যে আমাদের মতো জীবনযুদ্ধ করতে হয়, একটা একটা করে পয়সা জোগাড় করতে হয় সেটা এই ছবিটা দেখলে বুঝা যায়!

ডেনিস ডুগানের এই ছবিটাও অনেকটা দ্য কিডের ঘরানার। পার্থক্য হলো এই মুভিটায় অভিনয় করেছেন এডাম স্যান্ডলার। আর তার মধ্যে ট্রাজেডির লেশমাত্র নাই। পুরো ছবিতে তার ছোট ছোট জোক আর পান শুনতে শুনতে হাসি আটকানো মুশকিল। তার চরিত্র (সানি) থাকে কেয়ারফ্রি ধরনের এক যুবক। ঘটনাক্রমে বন্ধুর বিনাবিয়ের ছেলে এসে তার ঘাড়ে পড়ে। সেই বন্ধু আবার তখন আরেক মেয়ের সাথে বাগদান করে ফেলেছে। সামনে বিয়ে। এরকম নাজুক অবস্থায় ছেলের পরিচয় জানলে সমূহ(!) বিপদ, তাই সানির ঘাড়েই পড়ে কিছুদিন সেই বাচ্চা ছেলেকে দেখাভালের ভার। যে মানুষ নিজেরই ঠিকমতো টেক কেয়ার করতে পারে না, সে কী ধরনের মুশকিলে পড়ে, সেটা এই ছবি দেখলে ভালো মতো বুঝা যায়। আর যারা বাচ্চা ভয়ঙ্কর কাচ্চা ভয়ঙ্কর বলে মনে করেন, তাদের জন্যেও শিক্ষামূলক ( ;) ) ছবি এইটা! হা হা হা!
Father of the bride (1950) , (1991)
বাবা হিসেবে সবচেয়ে কঠিন কাজের মধ্যে একটা মনে হয় নিজের মেয়ের বিয়ে। এমনিতেই দেখা যায় মেয়েরা বাবার বেশি কাছের হয়। সব মেয়েরই কমবেশি কিশোরী বয়সের আইডল হলো তার বাবা। সেই বাবার সাথেই তার বেশি খাতির থাকে। তারপরে একদিন সেই বাবা টের পান যে তার মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে! সে এখন একটা ছেলের প্রেমে পড়েছে। তার সাথে বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করতে চায়। সেই সময়ের অনুভূতি সব বাবার জন্যেই মনে হয় একরকম। হঠাৎ করে টের পান মেয়ের চোখে তিনি এখন সেকেন্ড হিরো, নতুন হিরো (নাকি ভিলেইন?) হয়ে দেখা দিয়েছে অজানা এক উড়ে এসে মেয়ের হৃদয়ে জুড়ে বসা কেউ! এই অবস্থায় বাবা'রা কী করেন?
ছবিটা দেখার সময়ে অনেক হাসিঠাট্টার মাঝেও মনে হয়েছে বাবার অনুভূতিগুলো একেবারেই আলাদা! সে না পারে সইতে, না পারে প্রকাশ করতে। ছবিটার দুইটা ভার্সন আছে। একটা '৫০ সালের (স্পেন্সার ট্রেসি-এলিজাবেথ টেইলর পিতা-কন্যার অভিনয়ে), আরেকটা '৯১ সালের (স্টিভ মার্টিন-কিম্বারলি উইলিয়ামস পিতা-কন্যার অভিনয়ে)। দুইটাই সমানভাবে উপভোগ্য, তবে আমার নিজের কাছে পুরনোটা বেশি ভালো লেগেছে। হয়তো দুইজনই দুর্দান্ত অভিনেতা বলে!


                                                                Mrs. Doubtfire (1993) 

ক্রিস কলম্বাসের অসাধারণ সব ছবির মাঝে এই ছবিটা আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য, অনেকগুলো কারণে। রবিন উইলিয়ামস কতোটা শক্তিশালী অভিনেতা সেটা কারণ নম্বর এক। দুই নং কারণ হলো রবিন উইলিয়ামস কতোটা বড়োমাপের অভিনেত্রী সেটা। তিন নং কারণ হলো রবিন উইলিয়ামস একইসাথে পুরুষ ও নারীচরিত্রে কতোটা পারদর্শী সেটার অনবদ্য উদাহরণ এই ছবিটা! সব মিলিয়ে দমফাটা হাসির, একই সাথে ছেলেমেয়ের জন্যে তার অনাবিল ভালোবাসার। বিদেশী সমাজের মতো এখন আমাদের সমাজেও বিবাহ বিচ্ছেদ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এই ছাড়াছাড়িতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সন্তানেরা। সেই সন্তানদের জন্যে বাবা'র থেকে দূরত্ব ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, কারণ দেখা যায় বেশিরভাগ সময়েই কাস্টডি মায়ের তরফে যায়। বাবার সাথে দেখা হয় কেবল উইক-এন্ডের দুই দিন। এই ধরনের ব্যবস্থা মানতে নারাজ ড্যানিয়েল, তাই সে কেয়ার টেকারের বেশ ধরে হাজির হয় নিজেরই বাড়িতে, ছেলেমেয়ের কাছে। দুই ধরনের জীবন হ্যান্ডেল করার ঝক্কি আর ঝঞ্ঝাট নিয়েই এই ছবিটা। এটার একটা মজার রিমেক হয়েছিলো হিন্দিতে (চাচী ৪২০)। সেটাও কমল হাসান আর টাবুর অভিনয় মিলিয়ে দেখতে খারাপ লাগে নি!


এবারে একটু সিরিয়াস ছবি। পিতৃত্বের সাথে কেবল হাসিঠাট্টা বা আত্মত্যাগই জড়িত নয়, একই সাথে দায়িত্ববোধ আর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের সংবেদনশীলতারও গুরুত্ব অনেক। পিতা হিসেবে, আইকন হয়ে ওঠা, বা আইডল হয়ে ওঠার জন্যে যে পরিমাণ দৃঢ়তা দরকার, যে ধরনের একাগ্রতা দরকার, সেটা সবার মাঝে থাকে না। সেটা ধীরে ধীরে চর্চা করে গড়ে তুলতে হয়।

'টু কিল এ মকিংবার্ড' সেই ধরনের গল্প নিয়েই তৈরি। একই নামের উপন্যাস থেকে ছবিটা বানানো হয়েছে, হারপার লি'এর উপন্যাসটি পুলিৎজার পুরষ্কারপ্রাপ্ত। সেটা থেকে ছবি বানানো হয়েছে '৬২ সালে। মূল চরিত্রটি বাবার, অভিনয় করেছেন গ্রেগরি পেক। ছবিটায় তিনি দুই সন্তানের পিতা, মা মারা যাওয়ার পরে যাদেরকে একাই কোলেপিঠে করে মানুষ করছেন। পেশায় আইনজীবি। শান্ত গ্রামের মতো শহরে হঠাৎ একদিন এক শ্বেতাঙ্গ মহিলা নিহত হলেন, সেই খুনের দায়ে অভিযুক্ত হলো এক কালো। সময়টা '৩০-এর দশক, আমেরিকায় তখনও কালোদের নিগ্রো বলা হতো। ছবিটার পরতে পরতে বর্ণবাদ, সামাজিক অনৈতিকতাগুলো উঠে এসেছে। তবে মজার ব্যাপার হলো এর সবকিছুই দেখা হয়েছে একটা কিশোরের চোখ দিয়ে। তার চোখে কী করে তার বাবা নায়ক হয়ে উঠলেন। সাধারণ মানুষ (এবং সাদা) হয়েও একজন কালোর হয়ে আইনি লড়াইয়ে নামলেন সেটার গল্প এই ছবিটা। নিঃসন্দেহে টিন-এজার ছেলেপুলে নিয়ে একসাথে বসে দেখা যায়!


এই অ্যানিমেশন মুভিটা দেখে প্রথম যা মনে হয়েছে, সেটা হলো মাছেরাও মানুষ! তাদেরও আছে বেঁচে থাকার, থুড়ি, বাবা হওয়ার অধিকার। ফাইন্ডিং নিমো সম্ভবত সবাই দেখে ফেলেছেন। তারপরেও যারা দেখেন নি, তারা বিরাট অপরাধী, দ্রুত দেখে ফেলেন সুযোগ পাওয়া মাত্রই। যাদের ৫ থেকে ১০ বছর বয়েসি বাবু আছে, তারা আরো দ্রুত দেখেন। বাচ্চার সাথে সাথে নিজেরও পিতৃত্বের পাঠ হয়ে যাবে!

ক্লাউন ফিশটার নাম মারলিন। তার ছেলের নাম নিমো। ছেলের ব্যাপারে অতিরিক্ত সচেতন থাকেন তিনি, বাস করেন অস্ট্রেলিয়ার রীফের ভেতর। ছেলেকে ভর্তি করেছেন স্কুলে, প্রথম দিন তাকে স্কুলে পাঠানোর সময় সদাচিন্তিত মারলিনকে সবারই ভালো লাগবে। কেউ কেউ নিজের ছায়াও(!) খুঁজে পেতে পারেন। তারপরে এক দুঃসহ দূর্ঘটনায় নিমো হারিয়ে গেলো। সেই খোঁজে বের হলো ছোট্ট মারলিন, আর সেই নিয়েই ছবির গল্প!


সবশেষে ক্রেমার ভার্সেস ক্রেমার। এই ছবিটা একসাথে পাঁচটা অস্কার পেয়েছে। ছবির মূল চরিত্র বাবা এবং মায়ের রোলে আছেন ডাস্টিন হফম্যান এবং মেরিল স্ট্রিপ। এখানেই সম্ভবত ছবিটা কেন দেখতে হবে সেটা বলা হয়ে গেলো। তারপরেও যদি কারো দোনমনা থাকে, তাহলে ছোট বাচ্চাটার অভিনয় দেখার জন্যে দেখতে পারেন। আমার ধারণা, বাবা মায়ের চাইতে সে অনেক বেশি ভালো অভিনয় করেছে।

এই ছবির গল্পটাও বিবাহ বিচ্ছেদের সাথে জড়িত। বাবা মায়ের ছাড়াছাড়ির পরে ছেলেটা থাকা শুরু করে বাবার সাথে। গেরস্থালির কাজে অনভিজ্ঞ বাবার চাকরি জীবনেও ভয়ানক কাজের চাপে থাকেন। ঘর আর বাহির দুইদিক সামলাতে গিয়ে তার হিমশিম খেতে হয়। সেখানে ছেলের দিকেও মনোযোগ দেয়া লাগে।
এরই মাঝে একসময় মা ফিরে আসেন। কিন্তু তাদের মাঝে মিল ঘটাতে নয়, বরং ছেলেকে নিয়ে যেতে। স্বভাবতই বাবার দাবি, এতোদিন ছেলেকে মানুষ করেছেন তিনি, সুতরাং তিনিই ছেলেকে এখন লালন করবেন। আবার মায়ের দাবিও ঠিক, ছেলে এখনও নাবালক, এবং মায়ের কাছেই সে ভালো থাকবে। এই টানাপোড়েন গড়াতে গড়াতে কোর্টতক গেলো।
অদ্ভুত রকমের মানবীয় ছবিটা। বাবা-ছেলের সম্পর্ক, মায়ের প্রতি ছেলের টান, বাবার আবেগ, মায়ের ভালোবাসা সব মিলিয়ে ঝালমুড়ি।

===