ছোটবেলা থেকেই আমি খেলাধুলায় তেমন একটা ভাল না। যে কয়টা খেলা শিখেছি, তার কোনটাতেই আমি খুব ভাল করি নাই কখনো। যে দেশে মাঠে-ঘাটে পোলাপান ফুটবল আর ক্রিকেট খেলে, সেখানে আমার ভাল লাগতো ক্যারম আর টেবিল-টেনিস। তবু দেখা যেতো, আমি বারবার হেরেই যাই। সেই হেরে যাওয়া নিয়ে যে খুব দুঃখ লাগে, অমনও না বিষয়টা। এজন্যই কোন খেলাতেই আমি খুব বেশি পারদর্শী হতে পারি নাই।
প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে একটা সূক্ষ্ণ হিংস্রতা (ভালো অর্থে) আছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে জিতে যাওয়ার আনন্দও আছে। সেই আনন্দের জন্যই খেলোয়াড় আর দর্শকরা এতোটা মশগুল হয়। এই হিংস্রতাকে ভাল বলছি, কারণ এর সাথে আমাদের জিনের ভেতরে টিকে থাকার সঙ্কেতের সম্পর্ক আছে। প্রকৃতির প্রতিকূলতা একসময় আমাদের প্রতিপক্ষ ছিল। এর সাথে ক্রমাগত লড়াই করে আমাদের টিকে থাকতে হতো।
এখন আমরা সেই প্রকৃতিকে বশ করে ফেলেছি। হুট করে কোন দুর্যোগেও সাময়িক বিপদ কাটিয়ে আমরা সামলে উঠি। কিন্তু জিনের ভেতরে সেই লড়াইয়ের নির্দেশ তো আর এতো সহজে মুছবে না! তাই লড়াইটা নিজেরা একে অপরের সাথে করাই লাগে। এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বাজে রূপ হলো ক্ষমতার লড়াই, তথা যুদ্ধবিগ্রহ। নিজের প্রজাতিকে নিয়ন্ত্রণ করার লোভে খুন করার এই অভূতপূর্ব "মাইন্ড-বগ্লিং" কাজটা আমরা খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়েছি। আজ যদি বাইরে থেকে কোন বুদ্ধিমান প্রাণী আমাদের মাঝে আসে, তাহলে খুবই অবাক হবে যখন দেখবে যে আমরা মাটিতে কিছু কাল্পনিক দাগ কেটে সেই দাগের দুই পাশে দাঁড়িয়ে পরষ্পরকে কেটে ফেলছি।
এই লড়াইয়ের ভাল রূপ হলো খেলাধুলা। খেলায় জয়-পরাজয়ের হিসেবটা আরোপিত। খেলার নিয়ম-কানুনও আরোপিত। অর্থাৎ আমরা নিজেরাই ভেবে ভেবে এগুলো সৃষ্টি করেছি। আমাদের জিনের হিংস্রতম প্রবৃত্তিটাকে চেপে না রেখে যতটা কম হিংস্রভাবে বের করে দেয়া যায়, সেই চেষ্টাই আমরা সাধারণত করে থাকি। এখানে উল্লেখ্য যে খেলার নামে মেরে ফেলার খেলাও আমরা একসময় খেলতাম। তবে এখন সেগুলো বাতিল হয়েছে, রক্ষা!
আদিম প্রবৃত্তিকে খেলার মাধ্যমে বের করে আনা তো গেল। কিন্তু খেলা শেষ হলে সেটাকে আবার বাক্সে পুরবে কে? এ যেন প্যান্ডোরার বাক্সের মতো, খুললেই বেরিয়ে আসে ক্রোধ, ভেদাভেদ, হিংস্রতা, ঘৃণা, জিঘাংসা, জিগীষা।... সাথে আরও আসে সতীর্থ খেলোয়াড়দের প্রতি একাত্মতা, দলের প্রতি প্রতিজ্ঞা, অধিনায়কের প্রতি আনুগত্য, আত্মত্যাগ, দেশপ্রেমের মতো হিতকর অনুভূতি। এই সবকিছুরও দুইটা ভাগ করা যায় তাহলে - খারাপ আর ভাল অনুভূতি। প্রথমে যেগুলো বললাম, সেগুলোকে আমি খারাপ অনুভূতি মনে করছি। কারণ এই অনুভূতি একদিকে মনকে বিষিয়ে তোলে, অপর মানুষকে শুধুমাত্র একটা প্রতীকে পরিণত করে। মানুষ হিসেবে আপনি আরেকজন মানুষকে শুধুই একটা প্রতীকে চিন্তা করতে পারেন না। যখনই তা করবেন, তখন এক পিচ্ছিল পথ ধরে পড়ে যাবেন। যে পথ দিয়ে আপনার আগে আরো অনেকেই পড়েছে। যে পথের শেষে আছে অপরকে খুন করে সে রক্তে উল্লাসের গন্তব্য। সে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ার আগে ফিরে আসুন। আপনার যদি নিজের দেশকে সমর্থন দেয়ার অধিকার থাকে, তাহলে অপর একজন মানুষেরও অধিকার আছে তার দেশকে সমর্থন দেয়ার। সে যদি ঐ পিচ্ছিল পথে যেতেও চায়, যাক। আপনি কেন যাবেন সে পথে?
পরে যেগুলো বলেছি, সেগুলো হিতকর অনুভূতি। কারণ এর প্রতিটিই আপনাকে আরেকজন মানুষের সাথে ঐক্যের অনুভূতি দেয়। আপনি বোধ করেন যে আপনার সতীর্থরা আপনার কাছের মানুষ। তাদেরকে আপনি আপনার সমান মনে করেন। দেখবেন এই অনুভবটা খুব সুখের, যা দৈনন্দিন কষ্টকেও কমিয়ে দেয়। খেলোয়াড়রা এই অনুভূতিগুলো সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করে, দর্শকরাও করে কিছু কম মাত্রায়, তবে করে বৈ কী! এই যে একতাবদ্ধতা, এই যে অপর মানুষকে সমান ভাবা - এর থেকে আপনার মনে সহমর্মিতার (empathy) সৃষ্টি হয়। আমাদের বিবর্তনে এই অনুভূতিটাই সবচেয়ে হিতকর এবং উচ্চমানের অনুভূতি। প্রতিপক্ষকে হারানোর চেয়েও নিজপক্ষকে জেতানোর দিকে তখন মনোযোগ দেয়া যায়।
পৃথিবীর বিভিন্ন খেলায় যারা সেরার সেরা, তাদের বক্তব্যগুলো একটু খেয়াল করে দেখবেন, তারা কেউই প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করে কিংবা হারিয়ে-জুতিয়ে-মাড়িয়ে ফেলতে চায় নি। তারা শুধুই নিজেদের কৌশল, পারদর্শিতা, দক্ষতাকে সুউচ্চে নিতে চেয়েছেন। যে কোন খেলার গ্রেটদের মাঝে এটা কমন বৈশিষ্ট্য। এটাকে আমরা অনেক সময় বিনয় বলে ভুল করি। যাদের মাঝে এই বৈশিষ্ট্য নেই, তারা সেই খেলায় গ্রেট হতে পারে নি। কোনদিনও পারবে না। লিখে দিলাম, চেক করে দেখতে পারেন।
[২]
খেলা চলছে। খেলার উত্তেজনায় অনেক কিছুই আমরা বলি। ভেতরের কালি বেরিয়ে আসে, যা দিয়ে লিখি উল্লসিত অক্ষর। কিন্তু খেলার পরে সেগুলো থেকে নেতিবাচক অনুভূতিগুলো প্লিজ সরিয়ে ফেলুন। আপনার নিজের জন্যই। ইতিবাচক অনুভূতিগুলোকে সাজিয়ে রাখুন। সেটাও নিজের জন্যই। দেখবেন ভবিষ্যতে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ভাল অনুভূতিগুলোকেই মনে পড়বে।
চারপাশে অনেকেই নেতিবাচকতাকে উসকে দিচ্ছেন। নিজের উগ্র জাতীয়তাবাদের সাপটা ফোঁসফোঁস করছে। সেই সাপকে জাস্টিফাই করছেন "ওরাও তো অমুক তমুক করেছে/বলেছে/লিখেছে/এঁকেছে" ইত্যাদি বলে। সেই পিচ্ছিল পথ! একটা খারাপ তুলনা দেই এ'বেলা। অনেকটা এমন যে, কেউ ল্যাট্রিনের গু তুলে সারা পাড়া মাখিয়ে বেড়াচ্ছে বলে আমিও কিছু গু হাতে তুলে নিলাম। আপনি নিজেও হয়তো বুঝতে পারছেন যে আপনার কথাগুলো উগ্র, এবং এটার সমর্থক অল্প। আপনি যে বা যার কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে এমন করছেন, তারাও 'অধিকাংশ' না, অত্যন্ত ছোট একটা গ্রুপ। আপনারা দুই গ্রুপই বারবার করে এমন করছেন কেন? যাতে দলে ভারী হতে পারেন। একইভাবে বিভিন্ন রাজনীতিবিদও বারবার করে এধরণের কথা বলেন। আস্তে আস্তে তারা দলে ভারী হয়। কেউ উঠে দাঁড়িয়ে তাদের থামতে বলে না। খেলার উত্তেজনা একদিন জাতিগত উন্মাদনায় পরিণত হয়।
প্রতিটি উন্মাদনাই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। কপাল খারাপ হলে চিরস্থায়ী। আজ এশিয়ার উপমহাদেশে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের অসংখ্য কামড়াকামড়ি দেখে ঔপনিবেশিক প্রভুদের প্রেতাত্মারা ফ্যাকফ্যাক করে হাসছে! কী যাদু করিলাম রে বন্ধু - বলে একে অপরের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে। নাতির ঘরের পুতি বুড়ো হয়ে গেল, তবু জাতি-ধর্ম-বর্ণবিদ্বেষ কাটাতে পারলো না। সামান্য সাড়ে তিন ঘন্টার খেলার খোঁচায় দগদগে ঘা বেরিয়ে গেলো!..
[৩]
এই নেতিবাচকতা থেকে মুক্তি অচিরেই আসবে বলে মনে হয় না। দূরে থাকার চেষ্টা করছি যতোটা পারি। আজকে বাংলাদেশ পুরুষ দলের খেলা নেই। তবে বাংলাদেশ নারী দলের খেলা আছে। গত ম্যাচের আগে তাদের ছোট ছোট সাক্ষাৎকার দেখছিলাম। জাহানারা, ফাহিমা, রুমানা, সালমা, আয়েশাদের চোখে মুখে দীপ্ত বিশ্বাস - বিশ্বপ্রতিযোগিতার দরবারে তারা দেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন। নিজেদের সর্বোচ্চ সামর্থ দিয়ে জয় ছিনিয়ে আনবেন। বাংলাদেশের সমাজ নারীদের জন্য ক্রিকেট খেলা বা যে কোন খেলাই পেশা হিসেবে নেয়ার পথে অসংখ্য প্রতিকূলতার কাঁটা বিছিয়ে রেখেছে। তাদের নিবৃত্ত করতে, হতাশ করতে আমরা চেষ্টার কোন ত্রুটিই রাখি না। এই চর্চা ঘর হতে বাহির পর্যন্ত বিস্তৃত। তারপরেও সেসব কাঁটার তোয়াক্কা না করে তারা এতোদূর পৌঁছে গেছেন। অথচ অবাক ব্যাপার কি জানেন? তাদের বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। তারা শুধুই আপনার সমর্থন চান। ভেবে দেখুন, এই প্রতিকূলতার ভগ্নাংশ আপনার স্বপ্নপূরণের পথে থাকলে আপনি কতোটা নালিশ করতেন! তারা সেসব কিছুই না করে নিজেদের স্বপ্নটুকুই সার্থক করতে চলেছেন। (আবারও সেই নেতিবাচক বনাম ইতিবাচকের পাল্লা এবং ইতিবাচকতার জয়)। আজ তাই বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের জন্য শুভকামনা জানাই!
দুটো বিশ্বকাপ চলছে। পুরুষদল ছোট প্রতিপক্ষকে হারালেও বড়োদের এখনো হারাতে পারে নি। মনে মনে আশা করছি নারীদল বড়ো প্রতিপক্ষকে হারাবে আজ। সেই উদাহরণ থেকে পুরুষদলও জয়ের মুখ দেখবে! জয় বাংলা!
খেলাধুলা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
খেলাধুলা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ, ২০১৬
খেলাখেলি
মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১১
আমার সন্তানের সন্তান যেন পাকিস্তান পছন্দ না করে
আমি মূলত রাজনীতি বুঝি না। আমি খুব দ্রুত মানুষকে বিশ্বাস করতে পছন্দ করি। যে পরিবারে আমি জন্মেছি, সেখানে নব্বুইভাগ মানুষ খুব ভাল। তারা একান্ত স্বার্থহানি না হলে কারো ক্ষতি করে না। নিজের লাভ দুই শতাংশ কম নিয়ে হলেও তারা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে। তাদের মাঝে কেউ রাজনীতিতে নাই।
আমি ছোটবেলা থেকে পাকিস্তানকে ঘৃণা করি। যে বয়সে মানুষ ডালিমকুমার আর সুয়োরাণী দুয়োরাণীর গল্প শুনে বড়ো হয়, আমি সে বয়সে পাকিস্তানের গল্প শুনতাম। পাকিস্তানের গল্প শুনতে শুনতে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম। আমার ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে স্বপ্ন আকারে পাকিস্তানিরা আসতো। সেই স্বপ্ন আমার কাছে বিজাতীয় এবং দুঃস্বপ্ন মনে হতো। তখন থেকে আমি পাকিস্তানকে ঘৃণা করি।
পাকিস্তানকে ঘৃণা করতে করতে আমার মাঝে অনেক রিপু কমে এসেছে। আমি নিজের পাশবিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছি। আমি মদ ও মাংস নিয়ে স্বেচ্ছাচারকে ঘৃণা করেছি। আমি শিখেছি যে নারীকে মর্যাদা দিতে হয়, সম্মানের সাথে কথা বলতে হয়। পাকিস্তানে নারীকে মর্যাদা দেয়া হয় না। আমি আরো জেনেছি যে মানুষকে হত্যা করা ঠিক না। অনেক দৈবসংযোগে মানুষ জন্ম নেয়, এবং প্রতিটা মানুষ অমিত সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়। তাই তাকে মারা খারাপ। প্রতিটা মানুষের সাথে আরো কিছু মানুষ জুড়ে থাকে, সে মারা গেলে তারাও কষ্ট পায়। তাই মানুষ মারা খারাপ। পাকিস্তান একটি দুইটি না, তিরিশ লাখ মানুষকে মেরে ফেলেছে। এবং তারা এই হত্যাকে জাস্টিফাই করেছে ধর্ম দিয়ে। তারা মাফ চায় নি। তাদের বিচারও হয় নি।
এগুলো জানার পরে আমি পাকিস্তানকে প্রবল ঘৃণা করতে থাকি। তারপর বড়ো হয়ে আমি মাঝে মাঝে জেনেছি যে পাকিস্তানের সবাই খারাপ না। তাদের মাঝেও ভাল মানুষ আছে। আমি তখন 'ভাল'র নতুন সংজ্ঞা শিখলাম - নির্যাতিত হলেই তাকে ভাল বলা হয়। কিন্তু স্কুলে শিখেছিলাম, "অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে"। স্কুলের শিক্ষা মাথায় গেঁথে গেছে। তাই আমি পাকিস্তানের সেই 'ভাল' মানুষদের তৃণের চাইতেও কয়েকগুণ বেশি ঘৃণা করতে শুরু করলাম!
আজ একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আমার সন্তানকে এই ঘৃণাশিক্ষা দিয়ে যাব। বাংলাদেশ এমনিতেই অনেক পিছিয়ে আছে - ভ্রাতৃপ্রেমের বাণী শিখে আর এগিয়ে না গেলেও চলবে। এবং আমি শিখিয়ে যাব যে আমার পৌত্রকেও যেন সে এই ঘৃণার শিক্ষা দেয়। পাকিস্তানকে ঘৃণা করে যে পূণ্যলাভ হবে, তাতে আমি যে স্বর্গ-বেহেশ্ত ও পরপারের সকল পুরষ্কার পাবোই - এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। সুতরাং নিজের লাভের জন্যই আমি এই কাজ করছি। কেউ ভেবে বসেন না যেন, যে দেশপ্রেমের মত বায়বীয় ও সংজ্ঞাহীন মতবাদে আমি আদৌ বিশ্বাস করি!
বুধবার, ৯ জুন, ২০১০
দ্য ডিভাইন পনিটেইল
...dedicated to him that, despite the enemies and the bad luck, was, is and will be always the talent person that the italian football has ever expressed.-Antonio Cavallaro
ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসাডিনায় রোজ বো’ওল স্টেডিয়ামের কথা। সময়টা চুরানব্বুইয়ের সতেরই জুলাই, দুপুর গড়িয়ে বিকেলের রোদ তেরছা হয়ে পড়ছে মাঠের ভেতর। সাড়ে বারোটায় খেলা শুরু হয়েছে, নব্বুই মিনিটের পরে অতিরিক্ত তিরিশ মিনিটের খেলাও শেষ। বন্ধ্যা ম্যাচ, এখনতক কোন গোলের দেখা নেই, পুরো টুর্নামেন্টেই অবশ্য গোলখরা। ফাইনাল ম্যাচ হচ্ছে বিশ্বকাপের, এতোক্ষণ ধরে এই গোলহীন লড়াইয়ের শেষে দুইদলের সব খেলোয়াড়ই ক্লান্ত, বিমর্ষ কোচদের দু’জনের চেহারায় ফুটে উঠছে অনিশ্চয়তার রেখা। টাইব্রেকারের জন্যে অপেক্ষা করছে ৯৪ হাজার দর্শক, তাদের সামনে দিয়ে একে একে দুই দলের চারজন করে খেলোয়াড় প্যানাল্টি কিক করলো। স্কোর ৩-২। পাঁচ নম্বরে পিছিয়ে থাকা দলের যিনি কিক নিতে গেলেন, তার জন্যে হিসাব ছিলো গোল না করতে পারলে হার, আর গোল দিতে পারলেও অপর দল মিস না করলে বিশ্বকাপের আশা শেষ। দর্শকদের নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখা মুহূর্ত পেরিয়ে গেলো, দেখা গেলো সেই পঞ্চম খেলোয়াড়ের সাবলীল মাপা দৌড়, কিক নেয়ার সাথে সাথে বলটা উড়ে গেলো গোলবারের ওপর দিয়ে গ্যালারির দিকে। বিপক্ষদলের সমর্থকদের উল্লাসে রোজ বো’ওল স্টেডিয়াম ফেটে পড়লো। আর সেই আকাশ ফাটা চিৎকারের নিচে দেখা গেলো নির্বাক হয়ে উড়ে যাওয়া বলটার দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি- রবার্তো ব্যাজ্জিও।
আদর করে তাকে ডাকা হতো Il divin codino (দ্যা ডিভাইন পনিটেইল)। কোঁকড়ানো ছোট ছোট চুলের পেছনে একটা ঝলমলে পনিটেইল। বাইশ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রায় বেশিরভাগ সময়েই এটা ছিলো তার আইকন।
প্যানাল্টি কিকের সাথে এ’রকম অম্ল-মধুর স্মৃতি ব্যাজ্জিওর পুরো ফুটবল ক্যারিয়ারে অনেকগুলো। যেমন ফাইনালের ঘটনার চার বছর আগে, ফ্লোরেন্সের মাঠে টাইব্রেকারের সময় জুভেন্টাসের জার্সি পরা ব্যাজ্জিও কিক নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। বিপক্ষ দলটা ছিলো ফিওরেন্তিনা, যে দলের হয়ে ’৮২ থেকে ’৯০ পর্যন্ত খেলেছেন। মাত্রই সেই মৌসুমের শুরুতে রেকর্ড পরিমাণ ট্রান্সফার ফি দিয়ে জুভেন্টাস তাকে কিনে নিয়েছে, কিন্তু এখনও তিনি ফিওরেন্তিনাকে ভুলতে পারেন না। এই ক্লাবই তাকে এতোটা পরিচিতি দিয়েছে, এতোদিনের সেই সম্পর্ক ভুলে তিনি প্যানাল্টি কিক নিতে যান নি। বরং সাইড লাইনের পাশে পড়ে থাকা ফিওরেন্তিনার একটা বেগুনি স্কার্ফ তুলে নিয়ে চুমু খেলেন। পরে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “Deep in my heart I am always purple.” ফ্লোরেন্সের রঙ বেগুনি।
সারাজীবন ক্লাব থেকে ক্লাবে ব্যাজ্জিওকে খেলতে হয়েছে। ভিঞ্চেঞ্জা (’৮২ – ’৮৫), ফিওরেন্তিনা (’৮৫ – ’৯০), জুভেন্টাস (’৯০ –’৯৫), মিলান (’৯৫ – ’৯৭), বোলোনা (’৯৭ – ’৯৮), ইন্টার (’৯৮ – ’০০), ব্রেসিয়া (’০০ – ’০৪)। প্রায় বাইশ বছরে এতোগুলো ক্লাবের হয়ে খেলেছেন, মাঝে দুইবার তার দলবদলের ট্রান্সফার ফি সেই সময়ের সর্বোচ্চ ছিলো। এগুলো হঠাৎ শুনলেই মনে হবে হয়তো তিনি খুবই হিসেবি আর পেশাদার খেলোয়াড় ছিলেন। কিন্তু আসলে ভেতরে ভেতরে ব্যাজ্জিও বরাবরই আবেগি, বলা চলে emotional fool, এজন্যেই হয়তো আটানব্বুইয়ের বিশ্বকাপে মাঠে নামলেন সেই বিখ্যাত পনি টেইল ছাড়া।
ছোট ছোট চুল, পুরো ম্যাচেও কোচ তাকে খেলাতেন না, দেল পিয়েরোর বদলি হিসেবে নামেন শেষ দিকে। ‘বুড়ো’ হয়ে আসছেন ভেবে সবাই হয়তো একটু করুণা কি সহানুভূতি দেখায়- এমন অবস্থা। চিলির সাথে ম্যাচে যখন ইটালি ১-২ গোলে পিছিয়ে তখন বদলি হিসেবে নামলেন। আক্রমণে উঠে ডি-বক্সের কাছাকাছি জায়গায় বল কাটাতে গিয়ে তা চিলির ডিফেন্ডারের হাতে লেগে গেলো। প্যানাল্টি! আবার! চুরানব্বুইয়ের পরে এই প্রথম ব্যাজ্জিও’র সামনে আরেকটা প্যানাল্টি কিক নেয়ার সুযোগ। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে ঠিক সেই মুহূর্তে কী ভেবেছিলেন তিনি! টিভিতে দেখালোঃ হ্যান্ডবল হওয়ামাত্রই রেফারির বাঁশি শুনে একটু ঝুঁকে গেলেন ব্যাজ্জিও। নিজেকে আড়াল করলেন সবার থেকে, তার স্মৃতিতে চার বছর আগের কথাই ভেসে আসছিলো নিশ্চয়ই। একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে প্যানাল্টি কিক নিতে এগিয়ে গেলেন। এবারে ভুল হলো না, তার গোলেই তখন চিলির সাথে ম্যাচে সমতা পেলো ইটালি।
ফুটবলের মাঠে হাজার হাজার সমর্থকদের চিৎকার, কোচের কথা, সতীর্থদের কথা, গেম প্ল্যান, স্ট্র্যাটেজি এই সবকিছু ছাপিয়ে আমার কাছে ব্যাজ্জিওর এই মানবিক রূপটা অদ্ভুত ভালো লাগে। মনে হয় এই লোকটা ফুটবলার হয়ে বিপদে পড়ে গেছেন নিজের বেহিসেবী আবেগ নিয়ে।
এমন না যে ব্যাজ্জিওর ক্যারিয়ারে খালি হা-হুতাশ। পাশাপাশি রাখলে এক বিশ্বকাপ ছাড়া তার পুরো ক্যারিয়ারে তেমন একটা হার নেই। নব্বুইয়ের দশকে জুভেন্টাসের স্কুদেতো জয়ের পেছনে তিনিই ছিলেন মূল শক্তি। লীগের অনেকগুলো ট্রফি জিতেছিলো সেই সময়ে জুভেন্টাস। পঁচানব্বুইয়ে ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ও হয়েছিলেন তিনি, একইসাথে ইউরোপিয়ান বর্ষসেরাও! বিশ্বকাপে ব্যাজ্জিও ইটালির একমাত্র খেলোয়াড় যিনি পরপর তিনটা বিশ্বকাপেই গোল করেছেন। আর চুরানব্বুইয়ের বিশ্বকাপের পুরোটাই তার অনবদ্য খেলার দৃষ্টান্ত।
অনবদ্য এই অর্থে যে তেমন একটা স্কিল দেখিয়ে খেলতেন না। এমনকি পুরো মাঠ দাপিয়েও বেড়াতেন না। যেটা করতেন সেটা হলো সুযোগের সদ্ব্যবহার। তক্কে তক্কে থাকতেন, আর যাকে বলে, ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় থাকতেন, দুর্দান্ত ফিনিশিং ছিলো। খুব বেশি যে কৌশলটা খাটাতেন তা হলো ডজিং। এমন অনেকগুলো গোল দেখেছি, যা কেবল গোলকিপারকে পুরোপুরি নাস্তানাবুদ করেই দিয়েছেন।
পরিসংখ্যান যদিও তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না, ওটা দিয়ে তেমন কিছু বুঝাও যায় না, তবু একটা মজার ফ্যাক্ট পেলাম। যে তিনটা বিশ্বকাপে ব্যাজ্জিও ইটালির হয়ে ১৬ টা ম্যাচ খেলেছেন (’৯০, ’৯৪, ’৯৮), তার প্রতিটাতেই ইটালির বিদায় হয়েছে টাইব্রেকারে। ’৯০-এ আর্জেন্টিনা, ’৯৪-এ ব্রাজিল আর ’৯৮-এ ফ্রান্স। তার মানে কোনবারেই ইটালি সরাসরি কোন ম্যাচ হেরে বাদ পড়ে নি {গ্রুপ ম্যাচগুলোর মাঝে কেবল একটা ম্যাচেই তারা হেরেছিলো (’৯৪) আয়ারল্যান্ডের সাথে}।
আসলেই ফুটবল একটা নিষ্ঠুর খেলা!
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)
