মীথবাজি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মীথবাজি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০০৯

Antinoüs

দেখা গেলো প্রচুর রোদ। রোদে সেজে গেছে পাতা ও পথ। পথের পাশে পাথর। এসব ভালো লাগে না। জড়বৎ। এদের কোনো ঘটনা নেই। এবং সে কারণেই দুর্ঘটনাও নেই।
নেই বিপদ, আপদ, ঝঞ্ঝাট বা নিরাপত্তাবোধ। একেবারে বোধহীন শিশুও হয় না। তার চেয়েও অথর্ব এগুলো, চারপাশের উপাদানগুলো।


আমরা কেনো তবে এগুলোকে এতটা মূল্য দেই? এতটা নজর দেই। মানুষের দিকে তাকাই না, মেয়েটার জামা দেখি, জামার ওপরে লাল-নীল ফুল দেখি, জামার নিচে ঘনমেঘ দেখার শখ জাগে। শখের নাম সাধ, যেমন অভিলাষ, যেমন খায়েশ, অথবা যেমন কামনা।


ফুটপাতে হেঁটে গেলে রেলিং দেখি- ওখানে হাতের স্পর্শ করেছিলো কে? কারা যেন ওখানে ঠেশ দিয়েও দাঁড়িয়েছিল প্রতিদিন, বহুক্ষণ! আমাদের জানার আগ্রহ এত কম। তারপরে গাড়িগুলো চলে যাবে আমরা দেখবো হাস্যমুখি টেইল-লাইট। আর ট্র্যাফিকের ময়লা সবুজ পুলিশ। বৃষ্টি নামবে এবং তিনি বর্ষাতি খুলে ছাতার নিচে দাঁড়াবেন। আমরা দেখবো আর ভিজবো।


উপাদান ভুলে এখন বৃষ্টিকে ভালো লাগবে। ভিজে গেলে শব্দটা 'সিক্ত', শুনলে সব শীতল হয়ে আসে। বৃষ্টিও জড়- তবু তাকে নিয়ে কবিতা লেখা চাই। কেন। কেন। চাওয়ার কোনো শেষ নেই বোধহয়। তবে চাইলেই পাওয়া ঠিক নয়। পেলে লোভ বাড়ে। লোভের লেজে করে মেয়েগুলো ফিরে আসে।


এই লেখার মাঝে আমি পুরুষ হয়ে উঠি বারবার। মেয়েদের কথা চলে আসে। কেনো আমি ছেলেদের কথা লিখি না। সুপুরুষ ছেলেরাও সুন্দর, তাদের নিয়েও লেখা যায় তো! আমার লিঙ্গের ছায়া কেন শব্দের গায়ে পড়বে? শিশুদের কথাও তো লিখি বেশ, তারা রোদে দাঁড়িয়ে থাকে। তবে পুরুষেরা কেন রোদে যাবে না? তারা তো কালোই।


রোদগুলো চেনা গেছে। অন্তর্গত আঁধারের ছায়ায় এতক্ষণ চেনা যাচ্ছিলো না। মনে হচ্ছিলো ধাঁধাঁনো আলো। আলোতে সব রঙ থাকে বলে ভাবিনি লাল, কি নীল, কি সবুজ বা হলুদ হাসছে! এখন আঁধার সরিয়ে দেখি বিচিত্র বিভিন্ন রঙালো। নারী বা পুরুষ বা শিশু সকলে এসে গেছে আমার চোখের মাঝে। গোল গোল চোখের মাঝে তারা সকলে হাসিমুখে সেঁধিয়ে যাবে গতকাল থেকে আজ বা পরশুতক।


তারপর, অনেকদিন বাদে বৃষ্টি নামবে। নামার পরে আমরা সকলে কেঁদে ফেলবো। লিরিসিস্টগুলো ছাগলের মতো কেন বৃষ্টিকে আকাশের কান্না বলেছিলো? বেকুবি উপমা ছাড়াও তো জড়কে চেনা যায়। আকাশ কেন কাঁদবে। আকাশের কি লিঙ্গ আছে! অ্যামিবা কাঁদে না, এমনকি অণুজীবেরাও হর্ষবোধে ডুবে না। তবে আকাশ কেনো কাঁদার মতো নির্লজ্জ অধিকার পাবে।


বরং আমরা কাঁদি। ভ্রূণপর্ব থেকে কান্নার শুরু জলজ মাতৃকায় হাবুডুবু কেঁদেছি আমরা, জরায়ুঘর থেকে সেই অশ্রু হারিয়ে মায়ের শরীরে মিশে গেছে। তারপরে মায়ের চোখেও পানির ফোঁটাগুলো শিশুর মতো গড়িয়ে নামছিলো। আমাদের মা তখন কেনো কাঁদতেন রাত জেগে?


অদ্ভুত মাতৃকা শুকিয়ে গেলে আমাদের অশ্রুরেখা করতলে জমা হয়। সেখানে অনেক রোদ। না! সেখানে অনেক আঁধার।




***
নোটঃ Antinoüs-এর সম্বন্ধে আরো জানতে এখানে এবং এখানে দেখুন।

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০০৯

মীথবাজিঃ সিসিফাস ২

আজকাল ডে-লাইট সেভিঙয়ের কারণে বেলা বোঝা যায় না। আমরা, যারা এই বিষুবের কাছাকাছি বাস করে অভ্যস্ত, আমাদের কাছে ছয়টা মানে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা এসে যাওয়া। ধীরে ধীরে আলো কমে আসা। জুলাই মানে বর্ষাকাল, আকাশে গুমগুমে মেঘ বা ঝিরঝির বৃষ্টিতে আরো আগে থেকেই আঁধার ঘনিয়ে আসে। কিন্তু আজকে কাচের দেয়ালে তৈরি অফিস থেকে বের হয়ে সুমনের মনেই হয় না যে ছয়টা বাজে! বাইরে ঝকঝকে রোদ। বাতাস হুটোপুটি খেলছে। কোথাও অনেকদূরে বৃষ্টি নেচে গেছে, তাই বাতাসে গাছের বাকল ভেজা গন্ধ, মাটির ভাপের সুবাস। সুমন নাক একটু উঁচু করে জোরে শ্বাস টেনে নেয়। ছয়টায় তার অফিস শেষ হয়। আগে সন্ধ্যার অন্ধকারে বাসের লাইনে দাঁড়াতে হত, এখন এই ঝকঝকে বিকেলে বাতাসের মাঝে দাঁড়িয়ে সুমন কী করবে বুঝে পায় না!


সে এই চাকরিটা করছে প্রায় সাত বছর ধরে। ফিলোসফিতে পড়াশোনা করে এমন চাকরি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তাই প্রথমে সুমনের মনে হয়েছিল এমন ভাগ্য কয়জনের ঘটে! দুইবছরের মধ্যেই চাকরি পার্মানেন্ট হলো, একটা বিয়েও করে ফেললো সে মায়ের পছন্দের মেয়েটিকে, নাম মৃন্ময়ী। এখন তাদের সাড়ে তিন বছরের একটা ছেলে আছে। সুমনের এই চাকরিতে এখন আর আগের মত ভালো লাগে না। মায়ের শরীর খারাপ থাকে ইদানীং- বয়সের কারণে নানান রোগ-বালাই। মৃন্ময়ীর সাথে সুমনের মানসিক দূরত্ব কয়েকটা ড্রয়িং রুমের সমান। প্রথম প্রথম সে পাত্তা দিতো না ব্যাপারটা, কিন্তু এখন অনেক কিছুতেই খুটখাট লেগে যায়। বিশেষত মায়ের ব্যাপারে (ঘরে কী হয়েছে কে জানে!) ইদানীং মৃন্ময়ী ভীষণ অসহিষ্ণু আচরণ করে। ছেলে বড়ো হচ্ছে তাই চাপা গলায় রাতের বেলা ঝগড়া চলে।


মাঝে মাঝে এই চাকরিটাও অসহ্য লাগে সুমনের। নয়টা-ছয়টা অফিস। সকালে এসে কার্ড পাঞ্চ করে ঢুকে যেতে হয় এই টাওয়ারে। সেভেন্থ ফ্লোরে তার অফিস। আশেপাশের বিল্ডিঙগুলো এমনভাবে ঘিরে রাখে যে দিনের বেলাতেও কোন আলো ঢুকে না। পুরো অফিসে তাই সারি সারি টিউবলাইট দিনরাত জ্বলে। সেন্ট্রাল এ.সি.। এই কারণে কলেজের প্রিয় শখ ধূমপানটাও ছাড়তে হয়েছে ধীরে ধীরে! সুমনের মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে কাচের দেয়াল ভেঙে ঝাঁপিয়ে পড়তে। কিন্তু সেই পথও খোলা নেই, ঝাঁপিয়ে পড়ার মত ফাঁকা জায়গাই তো নেই! অফিসের এক একঘেঁয়ে কাজেও সুমন আর আনন্দ পায় না। একই স্প্রেডশীট, একই রুটিন একই ধরাবাঁধা জীবন। মাঝে মাঝে লাঞ্চের পরে সুমনের দমবন্ধ হয়ে আসে। সে নিজের ভবিষ্যৎ স্পষ্ট দেখতে পায়, এই অফিসের বন্ধ কেবিনের মধ্যে তার সামনের বছরগুলো একে একে কেটে যাবে। তারপরে একদিন চুলে পাক ধরবে, শরীর অশক্ত হবে। রিটায়ারমেন্টের পরে ছেলেমেয়ের আশ্রয়, তারপরে একদিন ধুপ করে মরে যাওয়া। কয়েকদিন কেউ কেউ কান্নাকাটি করবে। তারপরে সব শেষ!


সেন্ট্রাল এ.সি.র ঠাণ্ডা ঘরটাকে সুমনের কাছে পাতালপুরীর কবর বলে ভ্রম হয়।


***


সুমনের সাথে, আমি নিজের মিল পাই। আমার চারপাশে যারা প্রতিদিন ঘুরে বেড়ান, তাদের সাথেও আমি এই একটা জায়গায় মিল খুঁজে পাই। আমারও হঠাৎ করেই নিজের বাস্তবতাকে ভয়াবহতম অ্যাবসার্ড বলে মনে হতে থাকে। একেবারে নিরর্থক এবং নিষ্ফল সংগ্রামের সমষ্টি বলে মনে হয়। আর তখনই মনে পড়ে সিসিফাসকে। হায় পরাক্রান্ত মহারাজ! দেবতাদের সাথে তার ক্রমাগত যুদ্ধ চলেছে। সীমাবদ্ধ মানুষ হবার পরেও সে কোন দেবতাকেই পূজনীয় মনে করেনি। জিউসের সাথে তো অনেক বোঝাপড়া হয়ে গেল, থানাটোসকেও চরম দুঃসময়ে ঘোল খাইয়েছে সে। কিন্তু অমোঘ নিয়তি তার ভবিষ্যত সেই টারটারাসের গহীনেই লিখে রেখেছিল, যা থেকে তার কোন পরিত্রাণ নেই।


নাহলে কিসের জন্য সে তার স্ত্রীর ভালোবাসার পরীক্ষা নিবে? যাকে সে এত ভালোবাসে, যার সাথে তার এতদিনের সংসার, তাকে কেনই-বা মিছে সন্দেহ? সিসিফাসের স্ত্রীর নাম মেরিওপি। খুব সাধারণ নারী, সিসিফাসের চৌকস বুদ্ধির তুলনায় সে কিছুটা আটপৌরেই। তাই যখন সিসিফাস তাকে বললো, "তুমি আমাকে পাবলিক স্কয়ারে জীবন্ত কবর দিয়ে দাও।", তখন সে হয়তো সেটাকে স্বামীর বিচিত্র খেয়ালের বেশি ভাবেইনি। সরলমনে করে ফেলা সেই ভয়ঙ্কর কাজের মানেই হলো সিসিফাস আর কখনোই পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারবে না। মৃতের নগর থেকে কে কবে ফিরে এসেছে!


সিসিফাসের যখন জ্ঞান ফিরলো তখন সে পাতালপুরীতে। বিচার শেষে তার জায়গা হয়েছে অন্ধকার কুঠুরি। সবকিছউ বুঝে উঠতে তার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো, "নির্বোধ নারী!", ভাবলো সে, "আমাকে এভাবে কবরে নিক্ষেপ করতে তার এতটুকুনও বাঁধলো না! এই তার ভালোবাসার নমুনা?" ভয়ঙ্কর রাগে সিসিফাসের মাথায় আগুন ধরে গেল। পাতালের দেবতা হলেন প্লুটো আর দেবী পার্সিফোনি, তাদের কাছে সমানে সে ধর্না দিতে লাগলো। কত তার কথামালা, কত কাতর অনুনয়, বিনয়, আহাজারি। বেশি কিছু নয়, প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর সাথে আর একটি বার দেখা করতে চায় সে। তার সাথে মৃত্যুর আগে ঠিকমত বিদায়ও নেয়া হয়নি তার। প্লুটো ইতোমধ্যে জানেন টারটারাসে কীভাবে থানাটোসকে ঘোল খাইয়েছে সিসিফাস, তাই এইসব কথায় তাই একটুও চিঁড়ে ভিজলো না। কিন্তু পার্সিফোনি তো নারী, তায় আবার অপরূপ রূপসী। সিসিফাসের ক্রমাগত 'তেল' তাকে মোটামুটি পিচ্ছিল করে দিল। রাতের বেলা শুয়ে তিনি প্লুটোকে বলেন, "ওগো, বেচারাকে একটু সুযোগ তো দাও। কেমন কাতরকণ্ঠে আবেদন জানাচ্ছে!"


শেষ পর্যন্ত সিসিফাসের অনুমতি এলো। সে আবারও ফিরে এলো পৃথিবীতে। সেদিন তার যে আনন্দ, তা কী কোনভাবে প্রকাশ করা সম্ভব? একজন মানুষ মৃত্যুর পরের জগৎ থেকে ফিরে এসেছে আবারও এই নশ্বর কিন্তু সদাপ্রাচুর্যময় সুন্দর ভুবনে। সিসিফাস ভুলেই গেল তার স্ত্রীর কথা, যে নারী তাকে জীবন্ত কবর দিয়ে দিল, তার জন্য আর কান্না নয়। সে মহানন্দে ঘুরে বেড়াতে লাগলো পৃথিবীতে। এদিকে পাতালেও খবর পৌঁছে গেছে। প্লুটোর মনে হচ্ছে সিসিফাস আবারও তাকে বোকা বানিয়েছে। কিছুদিন পরপরই তাকে খবর পাঠানো শুরু হলো, "ফিরে এসো পাতালে। পৃথিবীর জীবন তোমার জন্যে শেষ হয়ে গেছে। সেখানে তোমার আর কোন স্থান নেই। এখন সেই পার্থিব জীবনের উপহারস্বরূপ তোমাকে আরেক জীবন দেয়া হয়েছে। তাকে গ্রহণ করো।"


সিসিফাসের এসব এত্তেলায় কিছু যায় আসলো না। সে তার নিজের সুখে মজে আছে। কে বলেছে যে উপহারস্বরূপ দেয়া জীবন উত্তম? তার কাছে তীব্রসুখের মর্ত্যজীবনই ভালো লাগে। সে এখানেই থাকবে। টারটারাস থেকে ধোঁকাবাজি করে ফিরে আসলাম, হুঁহ, আর এখন কোন প্লুটো এসেছে মাইকিং করতে!


এরকম ঔদ্ধত্যের সাথে উচ্চারণ খুব কম উদাহরণ হিসেবে পাওয়া যায়। তার কারণ সম্ভবত পরবর্তী ফলাফলে এই উদ্ধতাচরণ খুব নৃশংসভাবেই দমন করা হয়। সিসিফাসের পরিণতিও হলো সেরকম কিছুটা। সমন জারি হলো, তার শাস্তি হবে টারটারাসে, যেখানে মারাত্মক পাপীদের নির্বাসন দেয়া হয়। যেহেতু সিসিফাস ইতোমধ্যেই "মৃত", সুতরাং তার মৃত্যুর পরবর্তী বিচার করার কোন ব্যবস্থা নেই! তাই সে কখনোই নির্বানলাভ করবে না। টারটারাসে তাকে অনন্তকাল ধরে একটা পাথর ঠেলে ঠেলে পাহাড়ে তুলতে হবে। তারপরে চূড়ায় পৌঁছানোর পরে সেই পাথরটি আবার গড়িয়ে পড়ে যাবে পাদদেশে। সিসিফাসের কাজ সেটাকে আবারও চূড়ায় তোলা। এই অন্তহীন, অর্থহীন শাস্তিতেই তার পরিণতি!


***


যে কোন গল্পের শেষে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পছন্দ করি, সহজবোধ করি। "অতঃপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো" বা "তাদের এই আত্মত্যাগ চিরঅম্লান হয়ে রইলো", এমন উপসংহারে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। এবং গল্পের নায়ক, নায়িকার সাথে একাত্মবোধের স্থানটিও আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়। কিন্তু এই সিসিফাসের গল্পে তো তেমন কোন পরিণতি নেই। সিসিফাসের মরণ নেই, জীবনও নেই সেইভাবে। শীতল, রুক্ষ্ণ এক পাহাড়ের পিঠে ছড়ে ছড়ে তাকে এক জগদ্দল পাথর ঠেলে ঠেলে তুলতে হচ্ছে। এই একঘেঁয়ে পুনরাবৃত্তিমূলকতায় আমরা কী করে খাপ খেতে পারি? এখন সুমনের মত, বাসস্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে আমি শতশত সিসিফাসের মুখ দেখি। শ্রমবিভাগের কুহকে পড়ে আমরা এক একজন পাথর ঠেলা মানুষ হয়ে গেছি। সীমাবদ্ধ, গতিহীন, মূক, জান্তব, একাকী। নিজের পাথরভার নিজেই বয়ে চলেছি একা একা। এত কষ্টকর যাত্রায় আমাদের খেয়ালও হয় না যে আমাদের আশেপাশে কেউ নেই! যারা আছে, তারাও আমাদের মতোই স্বীয় পাথরের ভারে ন্যূজ।


সিসিফাসের মুখোমুখি হয়ে, আমি অবাক হই যখন পাথরটি চূড়ো থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে যেতে থাকে। তখনকার চেহারাটি আমি কল্পনা করতে পারি। সেই মুখের রেখায় কি একফোঁটা হাসিও চোখে পড়ে? টারটারাসে অনেক আঁধার, ঠিক বুঝেও উঠি না আমি। তবে আমি টের পাই, নিজের চরম অ্যাবসার্ড বাস্তবতায় সিসিফাসের মুখ কেন হাসি ফুটে ওঠে। আমাদের জীবন এতটাই নিরর্থক যে সেখানে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে আমরা খুব বেশিই মগ্ন। জীবনের গূঢ় অর্থ বুঝে ওঠার জন্য আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা, পাথর ঠেলার মতোই। আবার সকল চেষ্টার পরিণতিও আমরা জানি, জানি যে সকল উত্তোরণও এক পলকেই প্রবল পতনের সাথে সাথে আমাদেরকে শুরুতে নিয়ে যাবে। সব অনুসন্ধানেই আমাদের এই প্রয়াস মৌলিকভাবে ব্যর্থ হবে।


তাহলেই কেন এই জীবনযাপন? এই কষ্টকর, ক্লান্তিকর, অর্থহীন বয়ে চলা কি কেবল পরকালের লোভেই? সেই নিশ্চিন্তিই বা আমরা কোথায় পাবো? যদি তা অবশ্যম্ভাবীই হবে, তাহলে এত বিভ্রান্তি কেন?


সিসিফাস তো খুব সহজেই পারত আত্মহত্যা করতে। এমন পাশবিক শাস্তিপালনের চাইতে, নিজের জীবন শেষ করে দেয়াটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ হতো, তাই না? এই প্রশ্নের জবাবও আমি পেয়ে যাইঃ হতো না। অ্যাবসার্ড অপশন বলে একটা ব্যাপার আছে। সেখানে আমাদের নিরর্থক জীবনের জন্য আমরা তিনটা আলাদা পথ পেতে পারি। এক. আত্মহত্যা, দুই. নিজের চেয়ে বৃহত্তর কোন শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ, তিন. নিজের বাস্তবতার মাঝে অর্থ ফুটিয়ে তোলার নিরন্তর প্রয়াস।


সিসিফাস প্রথম দুটি পথকে খুব অবলীলায় ত্যাগ করেছে, অনেকটা তাচ্ছিল্যভরেই। দেবতাদের অনুগ্রহ, ক্ষমা কোনটাই সে নিজের জন্য প্রার্থনা করেনি। বরং এই অমানবিক শাস্তি, এই অপরিমেয় জীবনকে পাথেয় করে নিয়েছে। শীতল পাতালের অন্ধকারে সিসিফাস পাথর ঠেলছে। তার চোয়াল শক্ত, পেশী দৃঢ়, এবং আলোহীনতায়ও আমার চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় তার ঘামে ভেজা মুখ! আমি বুঝে যাই সিসিফাসের অর্থ। আমার মুখেও তখন তেমনই এক হাসি ফুটে ওঠে কি?




****

বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০০৯

মীথবাজিঃ সিসিফাস ১

থানাটোসের ঘুম ভেঙেছে সেই ভোরে। সকালে দাঁত মাজতে মাজতে সে দেয়ালে সেঁটে রাখা লিস্টি দেখছিল। মুখ ভর্তি ফেনা থু করে ফেলে দিয়ে কুলি করতে করতে সে শিডিউল মিলিয়ে নেয়। সকালে কয়েকজনের আত্মা তুলে রাখতে হবে। এটা তেমন কোন ব্যাপার না, সকালে সবাই গভীর ঘুমে ডুবে থাকে। খুব সহজেই কাজ সারা যায়। বেলা বাড়লে ঝামেলার শুরু হয়, জান কবচ কি খেলা কথা?! কাজ শুরু করে থানাটোস বেশ অনায়াসের পাঁচ ছয়টা জান কবচ করে ফেললো বেশ তাড়াতাড়ি। এপোলোকে ধন্যবাদ, আজ দিনটা খুবই পয়মন্ত মনে হচ্ছে!


কিন্তু বিধি বাম। একটু পরে হঠাৎই জরুরি তলব পড়লো জিউসের দরবার প্যান্থিওনে। “এই সেরেছে! আবার কি ঘটলো?” ভড়কে গিয়ে ভাবে সে। যে মানুষটার বাসায় গিয়েছিল, তাকে কবচ না করেই ফিরে এল। ব্যাটা আরো কিছুসময় শ্বাস নিক, পরে দেখা যাবে। প্যান্থিওনে পৌঁছে দেখে জিউস দরবারে মাথা নিচু করে বসে আছেন। পুরো দরবার থমথমে।


ঢোকার মুখে কয়েকজন ফিসফাস করছিল, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে। ভেতরে ঢোকার সাহস হচ্ছে না তাদের, ঘটনা গুরুতর! থানাটোস সেখানেই আগে থামল, ঘটনা না বুঝে জিউসের মুখোমুখি হওয়া ঠিক হবে না। যা শুনলো তাতে সে হাসবে না কাঁদবে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। বেচারা জিউস! এতকিছু ঘটলো তাও স্বভাব বদলালো না হুজুরের।


জিউসের অনেক অভ্যাসের মাঝে নারীপ্রীতি ছিল একটা। হঠাৎ করেই জলাপ্সরা দেখলেই কাজকর্ম ফেলে পেছন পেছন রওনা দেন। এসব নিয়ে হেরার সাথে ঝগড়াঝাঁটিও মাঝে মাঝেই ঘটে। ইদানিং শোনা যাচ্ছিল তার এজিনার সাথে বেশ ঘনিষ্ঠতা। এখন থানাটোস বুঝতে পারলো যা রটে, তার কিছুটা ঘটেও বটে! হয়েছে কি, জিউস কিছুদিন ধরেই এজিনা’কে পটাচ্ছে, আর এজিনাও সুযোগ বুঝে লাস্যময় হাস্য দিয়ে তাকে মজিয়ে রাখছে। কিন্তু এজিনার বাবা এসোপাসের এসব পছন্দ হয়নি। একদিন ধরতে পেরে জিউসকে তাড়া লাগিয়েছেন, পুরো দ্বীপ দাবড়ে ভাগিয়ে দিয়েছেন। জিউসেরও মাথা গরম, এজিনাকে উঠিয়ে নিয়ে অ্যাটিকার একটা দ্বীপে লুকিয়ে রেখেছিলেন। তা বাবা, উড়িয়ে নিবি ভালো কথা, একটু বুঝে শুনে করবি তো, নাকি? সারা দুনিয়াকে দেখানোর কীইবা দরকার ছিল?


এদিকে এসোপাস মেয়ের শোকে খোঁজে বেরিয়েছিলেন। পথে কোরিন্থ রাজ্যে দেখা হলো সিসিফাসের সাথে। সিসিফাস সেখানকার রাজা। তাঁর মত বুদ্ধিমান এবং ধুরন্ধর রাজা খুব কমই ছিলেন সেসময়ে। তাবড় তাবড় দেবতারাও তাকে ডরাইতো! এসোপাস তাঁর কাছে ঘটনা বলা শেষ করেছেন কি করেননি, সিসিফাস বলে উঠলেন, “আরে! আমি তো দেখলাম সেদিন একটা ঈগল নখে করে এজিনাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে অ্যাটিকার দিকে! নিশ্চয়ই ওটা জিউসই ছিল!”
এসোপাসের চেহারা রাগে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলো, “বদমায়েশটাকে যদি আমি শিক্ষা না দিছি!”
সিসিফাস বললেন, “আঙ্কেল, দাঁড়ান। হুট করে এত রেগে গেলে তো বিপদ। বুঝেশুনে প্ল্যান করতে হবে, লোকটা জিউস।”


তারপরের কাহিনী পুরো জানা যায়নি, একটা নিঃশ্বাস ফেলে জানালো বক্তা। তবে থানাটোস শিওর যে নিজেকে বাঁচাতেই ব্যাটা সবকিছু বললো না। সেই জিউস ফিরে এসেছেন, এখন মাথা নিচু করে থম মেরে বসে আছেন দরবারে আর থানাটোসকে ডেকে পাঠিয়েছেন। সে ভিতরে ঢুকে কুর্নিশ করে দাড়ানোর পরে জিউস বলে উঠলেন, “থানাটোস! তোমাকে আমি খুবই পছন্দ করি। মর্ত্যের মানুষের জান-কবচের কাজ তুমি খুব নিষ্ঠার সাথে করছো।”
থানাটোস একটা বিগলিত বোকা বোকা হাসি দিল। “থ্যাঙ্কু জিউস!”
“হুম”, গম্ভীর হয়ে বললেন জিউস, “এখন একটা অন্য কাজে তোমাকে ডেকেছি। সিসিফাস নামের এক রাজা আছে কোরিন্থ রাজ্যে। তার উদ্ধত আচরণ আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তোমাকে একটা বিশেষ কাজ করতে হবে।”
থানাটোস বিগলিত হেসে বললো, “সিসিফাসের জান কবচ করতে হবে তো? কোন ব্যাপার না বস্‌!”
“থামো থামো। আগেই লাফ মেরে কথা বলো না।”, জিউস একটু বিরক্ত হলেন, এদেরকে একটু লাই দিলেই কথার মাঝখানে কথা বলে! “জান-কবচ করলে তো মামলা চুকেই গেল। তারপরে সে চলে যাবে প্লুটোর ডিপার্টমেন্টে, পাতালে। আমি চাই সিসিফাসকে আরো বড় শাস্তি দিতে।”, একটু থামলেন জিউস দম নেয়ার জন্য। তারপরে বললেন, “সিসিফাসকে টারটারাসে ফেলে দেয়া হউক। ওখানে তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হবে।”
দরবারের সবাই জিউসের কথা শুনে শিউরে উঠলো! টারটারাস পাতালেরও নিচে এক ভীষণ অন্ধকার আর ভয়ানক স্থান। সেখানে চিরশীতল অন্ধকার তাল তাল বরফের মত জমে থাকে। প্লুটো তো তবুও পাতাল দেখাশোনা করেন, টারটারাসে কেউই তদারকির দায়িত্বে নেই। কে যাবে ওখানে! সব ভয়ঙ্কর পাপীদের আখড়া।


কোন দুর্মুখ একটু সাহস করে বলে বসেছে, “কিন্তু এমন কী করলেন সিসিফাস, যে তাকে একেবারে টারটারাসেই…”
প্রশ্ন শেষ হবার আগেই জিউস পাঁই করে তার দিকে ঘুরে গেলেন। তার তীব্র দৃষ্টির সামনে প্রশ্নকর্তা আমতা আমতা করে চুপ হয়ে গেলেন।
“সে খুবই অন্যায় কাজ করছে পৃথিবীতে। আমার কাছে অভিযোগ এসেছে, সে এজিনাকে ধরে নিয়ে আটকে রেখেছিল। তা ছাড়াও সময়ে সময়ে সে অনেক দেবতারই গোপন কথা ফাঁস করে দিয়েছে। এমন ধুরন্ধর আর উদ্ধত বেয়াদবকে শাস্তি দেয়ার সময় চলে এসেছে। থানাটোস!”
–”জ্বি, জিউস।”
“এই নাও শিকল”, বলে জিউস একগোছা শেকল ছুঁড়ে দিলেন, “এখুনি গিয়ে সিসিফাসকে আটকে ফেলো টারটারাসে।”


শেকলের গোছাটা গুছিয়ে নিয়ে থানাটোস বেরিয়ে আসে। এখনই পৃথিবীতে ফিরতে হবে। বেলা প্রায় দুপুর এখন।


কোরিন্থে গিয়ে সিসিফাসকে পাকড়াও করতে থানাটোসের খুব একটা বেগ পোহাতে হলো না। সিসিফাস খুব সহজেই ধরা দিলেন। মনে মনে থানাটোস ভাবলো, “জিউস এই পাবলিকের কাছে কেমন করে ধরা খেল? মেয়ে মানুষের সঙ্গে থেকে থেকে জিউসের বুদ্ধিশুদ্ধি আসলেই গেছে!” সিসিফাসকে জাপটে ধরে একটানে পাতাল পেরিয়ে এলো থানাটোস, পরের স্টপেজেই টারটারাস। সেখানের ঠাণ্ডা বাতাসে তার নিজেরই হাড়ে কাঁপন ধরছে। তাড়াতাড়ি সিসিফাসকে বেঁধে রেখে ফিরতে হবে। “এর চেয়ে জান-কবচ কতো সোজা!”, একটা নিঃশ্বাস ফেলে ভাবে থানাটোস, “ধরো তক্তা, মারো পেরেক! ঝামেলাবিহীন।”


টারটারাসের পরিবেশে সবকিছুই পাথুরে, পাহাড়ি। গাছপালা বা নরম মাটির কোন চিহ্নই নেই। পাথরগুলোও অসম্ভব রুক্ষ্ণ। হাঁটতে গিয়ে থানাটোসের নিজেরই পায়ে ব্যথা লাগছে। সিসিফাসের অবশ্য এদিকে টুঁ শব্দও নেই। “ঘটনা কী?”, ভাবে থানাটোস, “লোকটার কি কোন অনুভূতিই নেই নাকি?”


–”এই যে সিসিফাস!”, গলা খাঁকারি দিয়ে হাঁকে থানাটোস, “এখানে, এইখানে! এই পাথরের সাথে আপনাকে বেঁধে রাখা হবে। জিউসের নির্দেশ।”


এতক্ষণে সিসিফাস মুখ খোলে, “কেন? আমি কী করেছি? আমাকে কেন এই শাস্তি দেয়া হলো!! আমার তো কোন বিচারও হলো না!”


–”আমি কিছু জানি না। আমাকে যা নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আমি সেটাই করছি। হাইকমান্ড!”


“তা বলে আমি একবার আত্মপক্ষ সমর্থনও করতে পারবো না? আজব! প্লুটো কোথায়?”- সিসিফাস এদিকে ওদিকে তাকায়।


–”এটা প্লুটোর এরিয়া না। টারটারাসে প্লুটোর কোন জুরিসডিকশন নাই।” , থানাটোস বলে, “আপনি যা করেছেন তার জন্য আপনাকে মৃত্যুর অধিক শাস্তি দেয়া হয়েছে। এখানে টারটারাসে আপনাকে শেকলবন্দী করে রাখা হবে অনন্তকাল!”


“হায়!!” কাতর কণ্ঠে বলে ওঠে সিসিফাস, “এ কেমন বিচার! আমার দোষ প্রমাণের আগেই শাস্তি হয়ে গেল?”, ডুকরে কেঁদে ওঠে সে।
সিসিফাসের আর্তনাদে টারটারাসের শীতলতার জমাট বরফ ভেঙে যেতে থাকে। “অনন্তকাল! আমার এমন কী অপরাধ যার জন্য এই শাস্তি হলো? আমি তো কারো ক্ষতিই করিনি। কারো জীবননাশ করিনি! তাহলে কেনই-বা আমার এমন কঠোরতম শাস্তি! কেন? কেন?”


সিসিফাসের আহাজারিতে থানটোস ভীষণ বিপাকে পড়ে গেল। কী মুশকিল! এতক্ষণ ভাবছিল সিসিফাসই দোষী, এখন তার কান্নাকাটি দেখে তো মনে হচ্ছে কোথাও কোন গড়বড় আছে। থানাটোস আবার বেশি চিন্তাভাবনা করতে পারে না, মাথা ভার ভার লাগে। তাই সে তাড়াহুড়া করলো, “আমি অতশত জানি না। আপনি এই পাথরে বাঁধা শেকলটা গলায় পেঁচিয়ে নেন। তাড়াতাড়ি!”


সিসিফাস কান্না-জড়ানো স্বরে বলেন, “কোথায়?”


–”এই তো এখানেই। দেখতে পাচ্ছেন না?” অস্থির হয় থানাটোস।


“নাহ! এত অন্ধকার! আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।” হতাশ স্বরে বলেন সিসিফাস।


থানাটোস শেষমেশ সিসিফাসের হাত ধরে শেকলটা ধরিয়ে দিলো। “এই যে শেকল, এখন তাড়াতাড়ি গলায় বেঁধে ফেলেন।”


“কিন্তু এই শেকল এত ভারি! এটা আমি কীভাবে গলায় বাঁধবো? আমি যে পারি না!”


–”আচ্ছা মুশকিল হলো দেখি! এখন কি এটাও আমাকে দেখিয়ে দিতে হবে নাকি?”, রাগত স্বরে বলে ওঠে থানাটোস।


“প্লিজ! যদি আপনি একটু দেখিয়ে দিতেন, তাহলে খুব খুব উপকার হতো। আমার জীবন তো এমনিতেই শেষ। এই টারটারাসের অন্ধকারেই মাথা খুঁড়ে মরতে হবে। অন্তত শেকলটা ঠিকমত পরে নেয়া দরকার”, সিসিফাসের কাতর কণ্ঠের পেছনে যে সূক্ষ্ণ পরিহাস, তা থানাটোসের নজরে পড়ে না।


“আচ্ছা ঠিকাছে। আমি দেখাচ্ছি”, বলে থানাটোস ভারি শেকলের একপ্রান্ত হাতে তুলে নেয়, “এই দেখেন। এভাবে এক পাক, তারপরে উল্টোদিকে আরেক পাক। এভাবে।” বলে সেই শিকলটা পরে নেয় সে, “এইবার বুঝলেন?”


অন্ধকারে ঘটাং করে একটা শব্দ হলো। থানাটোস ঠিক বুঝে পেলো না ঠিক কোত্থেকে কী হয়ে গেল। কিন্তু হঠাৎ করেই সে শেকলের ভারে হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল। সাথে সাথে সিসিফাসের অট্টহাসি শোনা গেল অন্ধকার টারটারাস জুড়ে। শীতল পাতালেরও অধিক পাতালে, থানাটোস সহসাই বুঝতে পারলো কী হয়েছে। শেকলটা খুলে আনার জন্য যে কড়াটি দিয়ে ঠেস দিয়ে রেখেছিল সে, সিসিফাস এইমাত্র সেটা খুলে নিয়েছে। আর সে পাথরের সাথে শেকলবন্দী হয়ে গেছে!


“অর্বাচীন দেবতা!” হিসহিসিয়ে ওঠে সিসিফাস, “তোমাদের হুজুরের দোষ আমার ঘাড়ে চাপাতে চাইছো? তোমরা মর্ত্যে যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াবে, আর সেজন্যে ভুগবো আমরা! ভেবেছো কি? নির্বোধ অক্ষম মানব, তোমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কীইবা করতে পারবে!”


একটানে থানাটোসের রথে লাফিয়ে উঠলো সিসিফাস। তারপরে সাঁ সাঁ করে ছুটে যেতে লাগলো পৃথিবীর দিকে। তাঁর মুখে তখন ফুটে উঠছে বিজয়ের চতুর হাসি!


~*~*~*~*~*~
পরিশিষ্টঃ থানাটোসের অকস্মাৎ অন্তর্ধানে পৃথিবীতে জান-কবচের জন্য কেউ রইলো না। বেশ কিছুদিন ধরে মুমূর্ষু রোগীগুলোও কীভাবে জানি বেঁচেই রইলো। মর্ত্যবাসী অবশ্য এটাকে বিধাতার অসীম কৃপা ভেবে আরো বেশি প্রার্থনায় মশগুল হয়ে উঠলো। সেই খবর প্যান্থিওনে পৌঁছানোর পরেই সকলের টনক নড়লো, আসলেই তো! থানাটোস কোন চুলোয় গিয়ে মরেছে! জিউস অবশেষে খুনে জাঁদরেল অ্যারিসকেই পাঠালেন থানাটোসকে সেই টারটারাস থেকে ছাড়িয়ে আনতে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সিসিফাসকে শেষপর্যন্ত সেই টারটারাসেই এক কালজয়ী মীথের জন্ম দিয়ে নির্বাসিত হতে হয়েছিল। কিন্তু সে আরেক গল্প, আজকে বরং এখানেই থাক?
(ক্রমশ...)