ধর্ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধর্ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৬

রূপবান!

আজকে একটা দরকারে ডাক্তারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তার কাছে কিছু বিষয় জানার দরকার ছিল। অপেক্ষাগৃহে বসে নামধাম পূরণ করার কিছুক্ষণ পরে ডাক এলো। হাসিমুখে ডাক্তার এসে কথা বললেন। শান্তভাবে সমস্যার কথা জানানোর সময় কম্পিউটারে লিখে নিচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে কিছু প্রশ্নও করছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে সমাধান আর করণীয় ব্যাখ্যা করলেন। কী কী করতে হবে বলার সময় পাশে রাখা একটা নোটপ্যাড নিয়ে লিখে দিচ্ছিলেন। খেয়াল করলাম, ডাক্তার বাঁহাতি। সামনে বসে বাঁহাতি কারো লেখালেখি দেখতে বেশ মজা লাগে, কারণ বেশিরভাগ মানুষই (প্রায় ৮৭-৯২%) ডানহাতি। সচরাচর দেখা যায় না বলে হাতের আঙুলের নড়াচড়াগুলো অদ্ভুত সুন্দর লাগে। যখন ক্যাডেট কলেজে পড়তাম, তখন আমার আগের ক্যাডেট নম্বরের বন্ধু বাঁহাতি ছিল। ভর্তি হবার পরে আমাদেরকে ক্যাডেট নম্বর অনুযায়ী থাকতে হতো। পরে এলোমেলো হলেও ছয় বছরের তিন বছরই এই বন্ধুর পাশের জায়গাতেই থেকেছি। প্রথম দিকে ওর লেখার সময় হাতের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, স্রেফ কৌতূহল থেকেই। ও কেমন করে অক্ষরগুলো লিখছে, দেখতে মজা লাগতো।

বাংলাদেশের সমাজে অজস্র কুসংস্কারের মধ্যে একটা হলো যে বামহাত = খারাপহাত, আর ডানহাত = ভাল হাত। কে কবে কীভাবে এই ফালতু নিয়ম আবিষ্কার করেছে, কে জানে! (আমার আজকাল ধারণা হয় বাঙালিদের কুসংস্কারগুলো পায়খানাঘরে গেলে তৈরি হয়। হাগু করতে করতে অলস সময়ে এসব 'হাগু-ক্যাটাগরি'র আইডিয়া মাথায় আসে।) মানুষ একটা চমৎকার প্রাণী, যার দুইহাতই সমান কর্মক্ষম। আজ আমরা জানি যে বামহাত ডানহাতের কোন ভাল-খারাপ নেই। যে যে হাতে দক্ষ, সে সেই হাতে কাজ করতে পারে। বামহাতকে 'খারাপ' বলার মূল কারণ বাঁহাতিদের স্বল্পতা হতে পারে। সাধারণত বাঁহাতির সংখ্যা ১০%-এর মতো, অর্থাৎ গড়ে প্রতি নয়জনে একজন বাঁহাতি হবে। যেহেতু এটা সচরাচর দেখা যায় না, তাই ওই নয়জনের ডানহাতি হওয়াটাই 'স্বাভাবিক' আর একজনের বাঁহাতি হওয়াটা 'অস্বাভাবিক' বলে মিথ্যা নিয়ম বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। এই নিয়মের চক্করে পড়ে আমাদের দেশের অনেক বাঁহাতিকেই ছোটবেলায় লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হতে হয়। বাঁহাতে লেখা বা ধরার সময় মেরে-পিটিয়ে তাকে ডান হাত ব্যবহার করতে শেখানো হয় (আমার নিজের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেই এমন ঘটনা আছে)। আজ আমরা জানি যে শিশুকে তার দক্ষ হাত ও পা ব্যবহার করতে না দিলে সেটা  তার মস্তিষ্কের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সে যতটা চটপটে হতে পারতো, ততটা হতে পারে না। চিন্তা করুন এভাবে কত মানুষকে কষ্ট করে নিজের কম দক্ষ হাতে লিখতে, খেতে, ধরতে শিখতে হয়েছে!

মানুষ হবার একটা সীমাবদ্ধতা হলো আমরা অন্যের অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারি না। এজন্য অনেকসময়ই তাদের অভিজ্ঞতাকে তুচ্ছ মনে করি। এই হাতের সক্ষমতা তার একটা ভাল উদাহরণ - সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানুষ হবার পরেও পরিসংখ্যানে কম পাওয়া যায় এমন বৈশিষ্ট্য থাকায় একজন মানুষের ওপরে নানাভাবে আমরা অন্যায় বোঝা চাপিয়ে দেই। কখনো বুঝেশুনে দেই, কখনো অজান্তেই দেই। এরকম আরও অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই কালো বা বাদামি বর্ণের। এই রঙের কোন ভাল-খারাপ দিক নেই। তারপরেও যারা অতিরিক্ত কালো বা অতিরিক্ত সাদা, তাদেরকে নানাভাবে হেয় করা হয় না? বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই গড়ে সাড়ে পাঁচ থেকে পৌনে ছয় ফুট (পুরুষ) আর পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ফুট (নারী) হয়ে থাকেন। এই সীমার বাইরে যারা অতিরিক্ত লম্বা বা অতিরিক্ত বেঁটে, তাদেরকে কি হেয় করা হয় না? বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ মুসলমান। এর বাইরে যে যে ধর্মের মানুষ আছেন, তাদেরকে কি নানাভাবে হেয় করা হয় না? এই বৈশিষ্ট্যগুলো কিন্তু কেউ বুঝেশুনে বেছে নেয় না, বা খেটেখুটে অর্জনও করে না। জন্মের আগেই আমাদের ডিএনএ'র সংকেতের মধ্যে লেখা হয়ে যায় আমরা পুরুষ-নারী, লম্বা-বেঁটে, ফর্সা-কালো, ডানহাতি-বামহাতির মধ্যে কোনটা হবো। আমাদের বাবা আর মায়ের জিনের বৈশিষ্ট্যকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই! আর জন্মের পরপরই ঠিক হয়ে যায় আমরা কোন ধর্মের মানুষ হবো। এরকম random, arbitrary, coincidental, accidental বৈশিষ্ট্য দেখে আমরা কত সহজেই মানুষকে অপমান করি, তুচ্ছ করি। 

কী অদ্ভুত পরিহাস! যেটা আমরা নিজেরা বেছে নেই না, যাতে আমাদের নিজেদের কোন হাত নেই, তার কারণে সারাজীবন কষ্ট পেতে হয়। এটাই সমাজের নিয়ম! অথচ যে বিষয়গুলো আমরা নিজেরা ভেবেচিন্তে বেছে নেই, সেগুলোর কারণে আমাদের এতোটা জ্বালা-যন্ত্রণা পোহাতে হয় না।

নিজের ইচ্ছায় বেছে না নেয়া আরেকটা বৈশিষ্ট্য আছে, আমাদের লিঙ্গ (sex) আর যৌন-পছন্দ (sexual preference)।  মনে করার চেষ্টা করুন তো, বয়ঃসন্ধিতে যে মানুষটিকে ভাল লাগতো, সেটা কি আপনি নিজের ইচ্ছায় বেছে নিতেন? নাকি ব্যাখ্যার অতীত এমন এক অনুভূতি এসে আপনাকে টালমাটাল করে দিতো? আপনি ছেলে বা মেয়ে বা বৃহন্নলা, যাই হন না কেন, কাউকে ভাল লাগার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। আপনি বড়োজোর বলতে পারেন পছন্দের মানুষটির কোন কোন দিক আপনার ভাল লাগে। আমাদের যৌন-পছন্দ প্রধানত শারীরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। আমরা অন্য মানুষের শারীরিক কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হই। কিন্তু এটাই একমাত্র নিয়ম না। আমাদের মধ্যেই কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাদের যৌন-পছন্দ মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। শারীরিকভাবে আপনি যতই আকর্ষণীয় হন না কেন, যদি তারা মানসিক আকর্ষণ বোধ না করে, তাহলে আপনাকে ততটা পছন্দ করতে পারবে না। যদি আপনি প্রথম গ্রুপের  হয়ে থাকেন, তারপরেও মানসিক আকর্ষণের প্রভাব কিছু পরিমাণে আপনার মধ্যেও আছে। অনলাইনে বা ফোনে যখন কারো সাথে পরিচিত হয়ে আকর্ষণ বোধ করেন, কাউকে সামনাসামনি না দেখেই, সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? শুধুমাত্র গলার স্বর বা টাইপকরা অক্ষর দেখেই কি আকৃষ্ট হন না? পরে হয়তো শরীরের টান ছাপিয়ে যায়। অন্য গ্রুপের ক্ষেত্রে উল্টোভাবে ঘটে - সামনাসামনি দেখে ভাল লাগা হতে পারে, কিন্তু প্রচণ্ড আকর্ষণ তৈরি হয় মানসিক স্টিমুলেশনে, যা শুধু অন্যজনের কথা বা চিন্তাতেই সম্ভব। এই দুই ভাগ ছাড়াও আরও বিচিত্র ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভাগ আছে।

এখন বলুন, এদের মধ্যে কোনটা খারাপ? আর কোনটা ভাল?

নিয়মটা কি আপনি ভেবেচিন্তে তৈরি করেছেন? নাকি অন্য কেউ আপনার জন্য তৈরি করে রেখেছে? যে তৈরি করেছে, সে যে সবকিছু জানে বা বোঝে  - এমন তো নাও হতে পারে। আগেই দেখলাম যে আমরা অন্যের অভিজ্ঞতা বুঝতে অক্ষম, তাই জেনে না-জেনে অপরকে অপমান করি। ওটা যদি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে এটাও ভুল। অন্যের অভিজ্ঞতা যেহেতু আপনি জানেন না, সেহেতু আপনার কোন অধিকার নেই তাকে হেয় করার। খেয়াল করে দেখবেন, অন্যরা কিন্তু আজ এসে আপনাকে বলছে না যে আপনি নিজের পছন্দমতো কাউকে ভালবাসতে পারবেন না (আজকাল বাবামায়েরাও অনেক সময় বলতে পারে না)। যারা বলে, যারা জোর করে চাপিয়ে দেয়, তখন আপনার কেমন লাগে? খুব খারাপ লাগে না? ভালোবাসার মানুষকে না পেলে সবারই খারাপ লাগে।

আমরা যেসব পুরানো ক্লাসিক গল্পতে মজা পাই, তার প্রায় সবগুলোই প্রেম-ভালবাসার। আর সেসবের অধিকাংশই কোন না কোন কারণে বাধা পেয়েছিল। কখনো পরিবার, কখনো সমাজ, কখনো বয়স, কখনো যুদ্ধ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভালোবাসার মাঝে। মুনীর চৌধুরীর "রক্তাক্ত প্রান্তর" মনে আছে? ইব্রাহিম কার্দি আর জোহরার প্রেম? কিংবা লাইলী-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট, দেবদাস-পার্বতী, অমিত-লাবণ্য, কুবের-কপিলা? এরকম অসংখ্য দুর্দান্ত গল্পের মিল কোথায় বলুন তো? এগুলো সবি মানুষের বিচিত্র, অব্যাখ্যাত, বর্ণনাদুঃসাধ্য ভালোবাসার জয়ের গল্প। পাত্রপাত্রী মোরে গেলেও যেখানে ভালোবাসা জিতে যায়। এগুলোকে আপনি accept করে নিতে পারছেন কীভাবে? পারছেন কারণ এদের প্রেমে আপনার কিছু যায় আসে না। এরা বিয়ে করলে আপনি টাকা পাবেন না, এরা মরে গেলেও আপনার চাকরি চলে যাবে না। সুতরাং কোন দুজন রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষের প্রেমের মাঝখানে বাগড়া দিয়েন না। তারা যদি সরাসরি আপনার কোন ক্ষতি না করে, তাহলে তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দিন। কড়াভাষায় যাকে বলে, "নিজের চরকায় তেল দিন"।

আর তারপরেও হয়তো আপনি ভাবছেন, "আমার কিছু যায় আসে না, কিন্তু তবু এটায় সমাজের ক্ষতি, মূল্যবোধ অবক্ষয়, সংস্কৃতির অপমান" ইত্যাদি। তাই আমি এই বিষয়ের বিরোধিতা করবোই", তাহলে বলতেই হয়, যে আপনি আসলে একজন *** ভাই। আপনার জীবনে কাজের এতোই অভাব যে আপনি অন্যের ভাল থাকা দেখতে পারেন না। পায়খানায় বসে বসে ফন্দি আঁটেন কীভাবে অন্যের ভাল থাকায় বাগড়া দেয়া যায়। সমাজে আপনার ইনপুট অতোটুকুই! আপনি মরে গেলে মাটির তলে পঁচবেন বা আগুনে ভস্ম হবে। দুইক্ষেত্রেই আপনাকে কয়েকদিন পরে সবাই ভুলে যাবে। আর যাদের ক্ষতি করেছেন, বা যাদের কুৎসা গেয়েছেন, তারা উঠতে বসতে গালি দিবে, "শালা একটা *** ভাই আছিলো। মরছে ভাল হইছে!"

শুক্রবার, ১৪ মার্চ, ২০১৪

বাণিজ্য

[এই পোস্টটি অনেকক্ষণ ভেবে দিচ্ছি। একান্তই নিজস্ব ভাবনা। লিপিবদ্ধ করে রাখা দরকার মনে করি, আর অন্যদের এই বিষয়ে ভাবনা জানারও আগ্রহ হচ্ছে কিছুটা।] 

প্রথমেই রায়হান আবীর মনে করিয়ে দিল স্ট্যাটাসে যে, “আমরা যা, তা-ই আমাদের সংস্কৃতি” (তথ্যসূত্র/কপিরাইটঃ সামাজিক বিজ্ঞান বই)। এই সুযোগে ওকে ধন্যবাদ দিয়ে নিতে চাই। ডামাডোলে ভুলে যাই এসব সহজ সংজ্ঞা। ছোটবেলায় কত দ্রুত এসব মুখস্ত করতাম, এখন জীবনের পথ চলতে গিয়ে পদে পদে এসব সংজ্ঞার পুনঃপাঠে উপকৃত হই। ভাবি, ভাগ্যিস ছোটবেলাতেই শিখেছিলাম! নয়তো এখন বিভিন্ন জটিল মতামতের তোড়ে খাবি খেতে হতো।
প্রথমে একটু ভূমিকা দেই। দশক বিচারে বাংলাদেশের তরুণদের চরিত্র নিয়ে ভাবছিলাম। আশির দশকে বিশ্ববেহায়া আর্মির চোরটার কারণে যে দমন পীড়ন নেমে এসেছিল, তার প্রতিবাদে তরুণ সমাজের ভেতর একটা চাপা বিদ্রোহ সূচিত হয়েছিল। মাঝে মাঝে সেই বিদ্রোহ ক্ষোভের মতো বেরিয়েও আসতো। রাজনীতি নিয়ে সচেতনতা কতোটা ছিল জানি না, কিন্তু এটা জানি যে বুদ্ধিজীবী সমাজের পা-চাটা কিংবা ভয়ে ভীত হবার স্বভাব তরুণদের মধ্যে ছিল না। তৎকালীন লীগ কিংবা বিএনপির নেতারা কতোটা সক্রিয় ছিলেন, তার কথা জানি না, তবে তরুণদের সাথে তাদের একটা দূরত্ব হয়তো তখন থেকেই তৈরি হয়েছিল। এ কারণে চোর স্বৈরাচারটার বিরুদ্ধের আন্দোলনে সর্বাগ্রে সক্রিয় ছিল ছাত্রসমাজ, রাজনীতিবিদেরা নন। 

নব্বুইয়ের দশক সে তুলনায় বড়ই হতাশার। স্বৈরাচার গেছে, আমলারা এসেছে। প্রাতিষ্ঠানিক দূর্নীতি আর অরাজকতা চেপে বসেছে। ডানপন্থা ধীরে সামরিক উর্দি খুলে ব্লাডি সিভিলিয়ানের পোশাক পরে ভিড়ে মিশে গেছে। জামাত চলে এসেছে সংসদে। শিবির ছড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে। সম্ভবত এই দশক তরুণদের অবক্ষয়ের দশক। সম্মুখে কোন প্রকাশ্য শত্রু নেই। ঘাড়ে হাত দিয়ে যে ছেলে-মেয়ে বসে আছে, গোপনে সে-ই শত্রুশিবিরে নাম লিখিয়েছে। আশির দশকের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে মূলধারার রাজনীতিবিদেরা। তরুণদের সাথে যেহেতু তাদের দুর্নীতিপরায়ণ চরিত্র মেলে না, তাই তরুণদেরকেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্নীতিতে শেখাতে ছাত্র সংগঠনগুলো বটগাছের মতো শেকড় ছড়িয়ে দিল। পলিটিক্স তাই হয়ে গেল খারাপ, রাজনীতিসচেতনতা চলে গেল ক্রায়োজেনিক চেম্বারে।

শূন্য দশকের শুরুতেই আমরা বাংলাদেশে যে জঙ্গিবাদের উত্থান ও প্রসার দেখেছি, তার পেছনে তরুণদের রাজনীতিমনস্কতার অভাব অন্যতম ভূমিকা পালন করে। এক দশকের অজ্ঞান প্রজন্ম তৈরি করেছে শূন্যস্থান, আর সেই শূন্যস্থানে জায়গা করে নিয়েছে জামাত, জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, শিবির, বাংলা ভাই, আবদুর রহমান শায়খরা। বোমার পর বোমা ফেটেছে বাংলাদেশে। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সিনেমা হল অবধি; প্রতিটি জেলায়। এই পুরো সময়টায় স্বৈরাচারী চোরটার মতোই একটা দানবের জন্ম ও বিকাশ হয়েছে। পার্থক্য হলো, স্বৈরাচার চোরটা সামনে ছিল, আর জঙ্গিরা ছিল আড়ালে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তাই হয়তো তরুণদের এক দশক দেরি হয়েছে। শূন্য দশকের শেষ দিকে এসে যে সামরিক শাসন ফিরে এলো ব্লাডি সিভিলিয়ানের পোশাকে, সেটা দেখেই বোধহয় তাদের টনক নড়েছে। ২০০৮ এর নির্বাচনে তরুণরা তাই চালকের ভূমিকা নিয়েছে আবার। চিন্তা করুন, মাত্র ছয় বছর আগেও যদি কেউ বলতো, বাংলাদেশের মাটিতে জামাতের লিডারকে ফাঁসি দেয়া হবে বিচারের পর, সেটা কি কেউ বিশ্বাস করতো? আপনি নিজেও কি করতেন? আমি অন্তত করতাম না। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়েছে তরুণদের কারণেই। 

গত তিরিশ বছরের সমাজে তরুণদের এই প্রভাবকে তাই উপেক্ষা করার উপায় নেই। গত বছর শাহবাগ দেখে যেমন আমরা বিস্মিত ও অভিভূত হয়েছি সেটাও তো তরুণদেরই আন্দোলন। কিন্তু এখন, প্রায় এক বছর পরে এসে পেছনে ফিরলে মনে হয় এই আন্দোলনও এক দিনের নয়। কোন একটা আদর্শের রূপরেখা আমাদের তরুণ সমাজের ভেতর চলনশীল রয়েছে। এক দশকের তরুণরা মধ্যবিত্ত সংসারী হওয়ার সময় সেই আদর্শটিকে পরের দশকের তরুণদের হাতে তুলে দিয়ে যায়। যে নবতরুণ কৈশোরে দর্শক ছিল, তারাই দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। এই চক্র বাংলাদেশে চলমান।



আমরা প্রথম দশকের প্রায় মাঝামাঝি চলে এসেছি। ‘৮০, ‘৯০, ‘০০ এর চাইতে ‘১০ একটু আলাদা হয়ে উঠেছে। হয়তো শাহবাগের কারণেই। আমরা দেখতে পাচ্ছি ধীরে ধীরে তরুণদের হৃত রাজনৈতিক চেতনা আবার ফিরে আসছে। তারা সচেতন হয়ে উঠছেন একদম তৃণমূলের রাজনীতি নিয়েও। কোথাকার কোন এমপি কোন এক অনুষ্ঠানে সিগারেট খেয়েছেন, সেই ছবিটি কেমন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। ক্ষোভের আঁচে তাকে সর্বসমক্ষে মাফ চাইতে হলো। ঘটনাটি অভূতপূর্ব। আমার জানামতে আমাদের পূর্ববর্তী কোন তরুণ এই পর্যায়ের জবাবদিহিতা আদায় করতে পারে নি। অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইন্টারনেট সবাইকে একটি কণ্ঠ দিয়েছে, এর সুবিধা তরুণরা সবচেয়ে বেশি গ্রহণ এবং কার্যকরভাবে করতে পারছে। রাজনীতিবিদেরাও দ্রুত অনুধাবন করছেন যে তাদের প্রাইভেট লাইফটি আর প্রাইভেট নেই। এটা পাবলিক হয়ে গেছে। এখন আমরা যেমন খালেদা জিয়ার লুপ্ত প্রাসাদের ছবি গুগল করলেই দেখতে পাই, তেমন হাসিনা পোলাও রান্না করছে সেটাও দেখতে পাই। এমন সহজলভ্যতা আসলে রাজনীতিবিদদের মিথ থেকে মানুষে পরিণত করছে। আমার অনুমান আর দশ বছরের মধ্যেই আমরা এখনকার তরুণদের অনেককে সক্রিয়ভাবে দেখতে পাবো। তাদের ফেসবুক ফলোয়াররাই মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করবে! (একটু বেশি বলে ফেললাম নাকি?)

শাহবাগের কারণে আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। সেটা হলো বাংলাদেশি বনাম বাঙালি জাতীয়তাবাদের মেরুকরণের তীব্রতা। “জামাত-বিএনপি” মতবাদের বিশ্বাসীরা ফেব্রুয়ারিতে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। শাহবাগকে বিভ্রান্ত করতে তাদের সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার ছিল ধর্ম। তারা সেটা সফলভাবে কাজে লাগিয়েছে। অশিক্ষিতের মতো শাহবাগের পক্ষ-বিপক্ষ সবাই নিজেদের দাড়ির দৈর্ঘ্য এবং পাজামার গিঁটের টাইটনেস মাপতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি এটাও ঠিক যে আওয়ামী লীগ শাহবাগের নন-পার্টিজান চেহারাকে ভয় পেতো, কিন্তু জামাত-বিএনপির আঘাতের পরে তাদের জন্য এটাকে নিজেদের আন্দোলন বানানো সহজ হয়ে পড়ে। টুপিপরা শাহবাগ তাই হয়ে যায় হাসিনার শাহবাগ। দুর্ভাগ্য যে তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা এখনো ততোটা পোক্ত হতে পারে নি, তাই শাহবাগের নন-পার্টিজান অবয়ব তারা টিকিয়ে রাখতে পারলো না। মাঠে এটা হয়ে দাঁড়ালো লীগ বনাম জামাত-বিএনপির দাবাখেলা। এই খেলাটা বুঝতে পেরে যারা সেই খেলার বিরোধিতা করেছিল, তাদেরকে কল্লা কাটা হলো, জেলে পোরা হলো। যেহেতু এই বুঝদারদের কোন রাজনৈতিক মামা নেই, সেহেতু অসহায়ের মতো এই মৃত্যু আর বন্দিত্ব দেখা ছাড়া আমাদের (হ্যাঁ, আমি নিজেকে নিষ্ক্রিয়ভাবে হলেও, এই অংশের একজন মনে করি।) কিচ্ছু করার ছিল না। ব্লগে ব্লগে প্রতিবাদ হয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু আসলে কোন লাভ হয়েছে বলে আমার নজরে পড়ে না। সরকার বাহাদুরের যেদিন ইচ্ছা হয়েছে, সেদিন ব্লগারদের ছেড়েছে। যেদিন ইচ্ছা হয়েছে, শাহবাগের মঞ্চ ভেঙে দিয়েছে। জামাত-বিএনপি তাদের নিজেদের নেতাদের বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে গেছে… 

কথায় কথায় প্রসঙ্গ থেকে সরে গেছি। বাংলাদেশি বনাম বাঙালি জাতীয়তাবাদের মেরুকরণ নিয়ে বলছিলাম। আমাদের তরুণ সমাজের ভেতরে (অন্তত ইন্টারনেটে সচল অংশে) স্পষ্টতই একটা দূরত্বের জায়গা সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের চিন্তা, আরেকদিকে প্রতিক্রিয়াশীল জামাতি চিন্তা। এবার একটু ভেঙে চুরে দেখি।

মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের চিন্তা মানে আওয়ামী লীগের চিন্তা না। তারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাণিজ্য করে। এই বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে ‘০৮-’১৩ সরকারের আমলে। রীতিমত কর্পোরেট বাণিজ্য কোম্পানিগুলো যেমন ভাষা আন্দোলন, শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখ, ও বিজয় দিবস নিয়ে বাণিজ্য করে, ঠিক তেমনি বাণিজ্য করে আওয়ামী লীগ। যে শেখ মুজিব পুরো জাতির অংশ, সেই মুজিবকে তারা নিজেদের পকেটে পুরে রাখতে চায়। স্পষ্টতই তাদের অন্য কোন অনুকরণীয় নেতা নাই। শেখ মুজিবকে সপরিবারে এবং চার নেতাকে জেলে হত্যা করার মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করেছি যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতা জন্মাতে পারবে না। আওয়ামী লীগে যা আছে, তা হলো রাজনৈতিক বেনিয়া, যাদের কাজ বাণিজ্য করা। আর তাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বাণিজ্যের দোসর হলো ভারত। কারো কারো জন্য চীন। আর এই বাণিজ্যে তরুণদের অধিকাংশেরই কোন ভাগবাটোয়ারা নেই। 

প্রতিক্রিয়াশীল জামাত চিন্তা মানে কেবল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা না। এর সাথেও যুক্ত হয়েছে বাণিজ্য। বাণিজ্যটি ধর্ম ও গোঁড়ামোর। বিএনপি এবং জামাত উভয়েই জানে যে এখনকার স্মার্ট তরুণ “সাইফুর রহমান” (কাল্পনিক) খুব বেশি নীতিবাক্য কিংবা ধর্মীয় নৈতিকতা শুনতে চায় না। প্রতি ওয়াক্তে নামাজ পড়তে বললে বিরক্ত হয়। কিংবা ভোগবিলাস ছেড়ে সমাজ ও দেশের কাজ করতে বললে, বিদেশ না গিয়ে দেশে সরকারি চাকুরি করতে বললে সে উল্টে দৌড় দিবে। এখনকার স্মার্ট তরুণ “সাইফুর” স্মার্টফোন ব্যবহার করে এবং তার আছে ইন্টারনেটে ফেসবুক। তাই জামাত ও বিএনপি তাকে ধর্মীয় রস দিয়ে কাছে টানে। ওড়না পেইজ দিয়ে কাছে টানে। মুসলমানিত্ব দিয়ে কাছে টানে। কোরানের দুইটা আয়াতের পাশাপাশি সে নারীর পর্দা নিয়ে তিনটা ভুয়া হাদিস শেয়ার দেয়। শাহবাগে মদ গাঞ্জা খাওয়া হয় – এই শেয়ারের পাশাপাশি ইন্ডিয়ার বিএসএফ-এর অত্যাচারের ছবিও শেয়ার দেয়। এই ফেসবুক জীবন জামাত-বিএনপির কাজ অত্যন্ত সহজ করে দিয়েছে। 

আমি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের চিন্তা বলতে যে অংশটির চিন্তাকে চিহ্নিত করছি, যারা আওয়ামী লীগের এই বাণিজ্যের খেলার বিরোধিতা করে এবং জামাত-বিএনপির ধর্মের মুলার সাথে বাংলাদেশি মুসলমানিত্বের বাণিজ্যের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয়। মুক্তিযুদ্ধ ‘সময়ের প্রয়োজনে হয়েছিল’, কিংবা ‘পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে হয়েছিল’ এবং জনপ্রিয় মতবাদের সাথে আমি একমত না। আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ গড়ার আকুতি থেকে। প্রত্যক্ষ কারণ ছিল পাকিস্তানের আর্মির গণহত্যা, যুদ্ধের আগে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ। কিন্তু অন্তর্নিহিত আকুতিটি ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার, যেখানে সংখ্যালঘু বলে কোন জাতিগোষ্ঠী বা নাগরিককে নির্যাতিত হতে হবে না। বুঝতেই পারি, সেই রাষ্ট্রের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে, আর বাস্তব হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক হত্যা, অ্যাসাসিনেশন, জেলহত্যা, সামরিক শাসন, আমলাতন্ত্র ও রহমান ডাইনেস্টিদ্বয়ের শাসন। এই ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নকালে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতাকে ফিরে আসতে হবে। আর এজন্যই শাহবাগ জরুরি। শাহবাগ সেই কণ্ঠস্বরটিকে স্থান দিয়েছে। সূচনা হয়েছে জামাত-বিএনপির বাংলাদেশি মুসলমান তত্ত্বের বিপরীতে ধর্মনিরপেক্ষতার তত্ত্বের। জামাত-বিএনপির তত্ত্ব ছড়াতে সময় লেগেছে প্রায় ২৪ বছর বা দুই যুগ। আশা করি, ধর্মনিরপেক্ষতার জয় আর দুই যুগের আগেই হবে!

জয় বাংলা! 

[পরিশিষ্টঃ লিখতে বসেছিলাম এক বাণিজ্য (ক্রিকেট ও সঙ্গীত) নিয়ে, লিখে ফেললাম আরেক বাণিজ্যের (রাজনীতি) কথা। পারপেচুয়াল আউট অফ টপিক অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে মনে হয়!]

সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

ডিলেমা

আত্মা বলে কিছু নেই, যা সচলসক্রিয়, তা আমাদের মস্তিষ্ক
হৃদয় বলে কিছু নেই, হৃৎপিণ্ড কেবল রক্তসঞ্চালনে আগ্রহী
হৃদয় বললে বুঝি ওই মস্তিষ্কই!
দ্বিমুহূর্ত পরের মুহূর্তে -
এ সত্য শুরুতে কদর্য লেগেছে।
এ সত্য এক লহমায় সকল উপমা, দৃশ্যকল্প, চিত্রকল্প ও রূপককে
ফাটা বেলুনের মতো ছিন্নভিন্ন করে দিল।
মাধ্যাকর্ষণের টানে ওগুলো ধ্রুব ত্বরণে পড়ে গেল, সুউচ্চ কল্পনার চূড়া হতে।
সত্য উদঘাটিত হলে কদর্যই লাগে। ডিনায়্যাল। অস্বীকৃতির ক্রোধ জাগে। তারপর বার্গেইন করি, মুলামুলি, টানাটানি। ফিরিয়ে দে অলীক রূপকগুলো, আমার বিভ্রান্তিকর মিথ্যা সুখ। ফিরিয়ে দেয় না কেউ। তাই কদর্য সত্যগুলোর দিকে ভ্রূকূটি করে তাকাই। ধীরে ধীরে তারা অবয়ব নিতে থাকে। অ্যামিবার মতো নড়ে চড়ে। পর্দা সরে যায়, ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে রূপ। তখনই দেখি বিস্ময়কর দেহের ভেতর কারুকার্য।
সত্যের মতো সুন্দর এই মস্তিষ্কের ভাঁজ, যেন বয়ামে রেখে দেয়া কিছু। জান্তব। সচলসক্রিয়। নিউরনে বিদ্যুতের বেগে খবর ছড়িয়ে পড়ে। মস্তিষ্ককে চিনে নেয়ার তথ্যটাও জমা পড়ে মস্তিষ্কেই। মস্তিষ্ক ভাবে মস্তিষ্ককে নিয়ে এবং সেই ভাবনা জমা রাখে নিজের ভেতর। আবার মস্তিষ্কের ভাবনার ভেতরেও থাকে মস্তিষ্কই। ইনসেপশন। ঘুলঘুলি।
একটি কথোপকথন -
: জানার কোন শেষ নেই। জানতে কেউ নিষেধ করে নি। জানতে চাওয়া ভুল না। কোরানে কোথাও বলে নি জানতে পারবা না। আল্লাহ বলেন নি যে প্রশ্ন করতে পারবা না।
: কিন্তু সীমানা তো নির্দিষ্ট করে দেয়া। প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্র ঠিক করে দেয়া। সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। নিষেধ করা হয়েছে, তাই না?
: কোথায়? বলো। কোথায় নিষেধ করা হয়েছে?
: উমম, যদি বলি - নিষেধ করা হয়েছে আল্লাহকে নিয়ে প্রশ্ন করতে? যদি বলি তার অস্তিত্বকে মেনে নেয়ার একচ্ছত্র অধিকারকে অস্বীকার করা নিষেধ?
: হ্যাঁ, তা বটে। ইসলাম মানে আত্মসমর্পণ। আল্লাহর অস্তিত্বে নিঃশর্তে বিশ্বাস করতে হবে। প্রমাণ খুঁজলে পাবে না। পেলেও দেখবে, সংশয় দূর হবে না, সারাজীবন এই সংশয়েই কাটাতে হবে। তাই সংশয় দূর করো। বিশ্বাস স্থাপন করো।
: কিন্তু আমি তো এই প্রশ্নের উত্তর চাই। নিরেট, নির্ভেজাল সত্য।
: উত্তর আছে তো! বলা আছে - এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ, সর্বশক্তিমান, অসীম দয়াময়, পরম করুণাময়।
: কিন্তু এটা চাপিয়ে দেয়া উত্তর। সিদ্ধান্ত। এটার প্রমাণ নেই। উপাত্ত নেই।
: (নিশ্চুপ)
ডিলেমা কাটলো না। বিভ্রান্তি দূর হলো না। সংশয় আরো গাঢ় হয়ে উঠলো। ঈশান কোণের মেঘের মতো ঘন থরথরে মেঘ জমে উঠলো। এই সংশয় আমার কাছে কদর্য লাগে, মাঝে মাঝে। যদি সৎবাক্য বলি - হ্যাঁ, মাঝে মাঝে লাগে। কৃষ্ণমেঘ পুষি মনের কোণে। না, না, ভুল হলো - মস্তিষ্কের কোষে। সেখানে লালন-পালন করি সংশয়ী মেঘ। প্রশ্ন আছে - উত্তর নেই। উত্তরহীনতার মাতৃকা মেখে প্রশ্নগুলো হাসে। সে হাসি নিরাবেগ। আমার সে হাসি ভাল লাগে। থাকুক প্রশ্নগুলো, বৃথা রহস্যময়তা আর অত্যাশ্চর্য মিরাকলের আবর্জনায় না মেখেই প্রশ্নগুলো থাকুক। একদিন এদের উত্তর বের হবে - মীমাংসিত সত্য সুন্দর উত্তর। সেই উত্তরের জন্য এক জীবন অপেক্ষা করা যায়। সেই উত্তরের অপেক্ষায় এক জীবনও তুচ্ছাতিতুচ্ছ!

শুক্রবার, ১১ নভেম্বর, ২০১১

চোখ নিয়ে কিছু চোখা কথা

ঈদের ছুটি শেষ হয়ে এলো। আগামিকাল থেকে আবার চিরপুরাতন নিয়মে ফিরে যাবো। বাসায় কিছু ডিজিটাল যন্ত্র যন্ত্রণা দিচ্ছিল - প্রিন্টার প্রিন্ট করে না, ল্যাপটপের মাইক্রোফোন বিদ্ঘুটে শব্দ করছে, এইসব। তো, এগুলো নিয়ে আইডিবি গেলাম, তারপর দুপুরে লাঞ্চ সেরে ভাবলাম পুরান ঢাকার দিকে যাই। বিউটির শরবতের নাম শুনেছি, খাওয়া হয় নি। হল-এ থাকতে কেউ একবার আওয়াজ দিলেই হতো, এখন তো আয়োজন করে এদিকে আসতে হয়। তাই ভাবলাম, ঘুরে আসি। বঙ্গবাজারের চৌরাস্তা থেকে আরেকটু ভিতরে যেতে হয়, গাড়ি রেখে হেঁটেই যাচ্ছি। একটু চিকন রাস্তা, দুইদিক থেকে রিকশা চলছে। পাশে ফুটপাতও নেই, তাই সামলে সুমলে হাঁটছি। আমার সামনেই একটি মেয়ে হাঁটছিল, সাধারণ সালোয়ার কামিজ পরা। আমি একটা প্রজেক্ট নিলাম। অপরদিক থেকে যারা হেঁটে আসছে, তাদের সবার চোখের দিকে খেয়াল করবো। প্রথমেই শাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা-টুপি পরা একজন লোক, দেখলাম তিনি এগিয়ে আসছেন এবং আমার সামনের মেয়েটিকে পেরুনোর আগে আগাপাশতলা যেন স্ক্যান করে ফেললেন। একটু চমকে গেলাম, পোশাক-আশাক যে মানুষকে ভাল বানাতে পারে না সেটা আবারও বুঝলাম। র‍্যানডম স্যাম্পল হিসেবে মাত্র একজনকে দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক না, তাই ভাবলাম, আরেকটু দেখি। এলেন আরেকজন, লাল-কালো চেকশার্ট পরনে, মধ্যবয়স্ক, মাথায় চুল কম, খানিকটা মোটা, তিনিও দেখলাম যাবার সময় এক ঝলক চোখ বুলালেন। এলো আরেকজন, ইনি লুঙ্গিপরিহিত, চোয়ালভাঙা চেহারা, তিনিও মেয়েটির মুখের দিকে তাকালেন আর তারপর বুকের দিকে। না, প্রিয় পাঠক, মেয়েটি ওড়না পরেই ছিলেন, শুধু তাই না, ওড়নাটি "ঠিকভাবেই" পরে ছিলেন। তারপরেও এই স্ক্যানিং।

মোড় থেকে দোকান পর্যন্ত দূরত্ব যতোটুকু, সেখানে আমি প্রায় দশজনকে দেখলাম মেয়েটিকে ক্রস করলো। তাদের সকলেই, হ্যাঁ, সকলেই একইভাবে তাকে স্ক্যান করেছে। যেন এদের সবাইকে স্কুলে পড়ানো হয়েছে "যে কোন নারীকে রাস্তায় পার হবার নিয়মাবলী"। যেমন আমাদের শেখানো হতো রাস্তা পেরুনোর নিয়ম – “প্রথমে ডানে দেখুন, তারপর বামে, তারপর আবার ডানে দেখে রাস্তা পার হউন”। ঠিক তেমনি, “আপনার উল্টোদিক থেকে কোন নারী হেঁটে এলে প্রথমে তার মুখের দিকে তাকান, তারপর তার বুকের দিকে তাকান, তারপর তার শরীরের অন্য কোন অঙ্গ যথা কোমর, পাছা, উরু, পা ইত্যাদি নিয়ে আপনার ফেটিশ থাকলে সেদিকে তাকান, তারপর তাকে পেরিয়ে যান”। এই নিয়মাবলীর সাথে সতর্কতা হিসেবে থাকবে –

কোনো অবস্থাতেই মেয়েটিকে দেখতে গিয়ে সামনের দিকের খেয়াল হারাবেন না, কোন গাড়ি বা ট্রাকের তলায় চাপা পড়ে ভবলীলা সাঙ্গ হতে পারে।

আমি আরো একটু এগিয়ে চিন্তা করলাম। এই দাড়িটুপিওয়ালা লোকটি বাসায় ফিরবে, তার যা বয়স তাতে বিবাহিতই হবেন। তিনি নিশ্চয়ই ধর্মমতে বিয়ে করেছেন, বউয়ের সাথে সহবত করবেন এবং সে'সময় তার মাথায় এই মেয়েটির কথা ভেসে উঠবে। এমন হতে পারে যে তার বউ গ্রামের বাড়িতে আছে, সেক্ষেত্রে তিনি বাসায় বা মেসে ফিরে টয়লেটে পায়খানার ওপর বসে হাত মারবেন। তারপর বাসায় ফোন করে বউ ও বাচ্চাদের খবরাখবর নিবেন। রাত্রে আবার উত্তেজনা এলে হাত মেরে ভাত খেয়ে ঘুমাতে যাবেন। একই সূত্রে লাল-কালো শার্ট পরিহিত ব্যক্তি কিংবা পরের ব্যক্তিগুলোও নিশ্চয়ই তাদের নিজ নিজ কাম-চরিতার্থ করবেন। কেউ বউকে, কেউ প্রেমিকাকে, কেউ গণিকাকে লাগিয়ে ঠাণ্ডা হবেন। নভেম্বর এসে গেল, তবু তাপমাত্রা কমলো না!

আমার চিন্তার দৌড় এই অবধি এসে থেমে গেলে আমি খুশি (!) হতাম। বাস্তবে যা দেখি, সেটা আরো খারাপ। এভাবে ওড়নার ফাঁকফোকর দিয়ে স্ক্যান করতে করতে এদেরই কেউ কেউ সন্ত্রাসী হয়ে ওঠেন। অবদমিত তীব্র কামনা সামাজিক ভগিজগি মানে না। মগজে প্রশ্ন ওঠে, "কিসের সমাজ, কিসের আইন, এই মাইয়ামাগী সব দ্যাখায়া চলতাসে ক্যান?" তখন তারা রাতের অন্ধকার, কিংবা নির্জন জায়গা পেলে আক্রমণ করে ধর্ষণ করেন, কিংবা ভীড়ভাট্টার সুযোগ নিয়ে নিদেনপক্ষে নারীর শরীরে হাত চালান, পাছায় বা বুকে একটা টিপ দিলাম - আহ!

অনেকে এহেন আক্রমণের পরে মেরেও ফেলেন, কী দরকার প্রমাণ রেখে? আমার কেন জানি মনে হয় মেরে ফেলে ভালই হয়। সুবিধা নানাবিধ। এই যেমন ধর্ষিতাকে যে পরিমাণ সামাজিক নোংরামো ও কৌতূহলের শিকার হতে হয়, সেটা থেকে রেহাই মেলে। আবারও ধর্ষিত হবার ঝুঁকি কমে যায়। পাশাপাশি, দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা একজন কমে গেল। কী চমৎকার, তাই না!

ধর্ষণের খবর জেনে আমরা যারা আহা-উহুঁ করি, কিংবা ক্ষেপে উঠি, কিংবা সরকারের মুণ্ডপাত করি, তারা সবাই-ই এহেন স্ক্যানিং করে থাকি। এখানে স্বীকার করার দরকার নাই রে ভাই। আবার অস্বীকার করারও দরকার নাই। যার যার স্ক্যানিং, তার তার কাছে। আপনি নিজেই জানেন আপনি কবে কোন মেয়ের দিকে কোন চোখে তাকিয়েছেন। আর এটা জানেন বলেই আপনার মতো চোরের বড়ো গলা শোনা যায়! আপনি ক্রমাগত দোষের তীরটি ঐ মেয়েটার দিকে তাক করছেন। তার জামাকাপড়ের দিকে, তার চলাফেরার দিকে, এমনকি তার আচার-আচরণের দিকেও! যদিও আপনি জানেন যে আপনার নজর ঠিক নাই। আপনার হাঁটাচলা, বানরের মতো ব্রেইনে চলমান যৌনচিন্তা ঠিক নাই। এগুলো অসুস্থ। সারাক্ষণ সেক্স-ডিপ্রাইভড হতে হতে আপনার চিন্তা ও চেতনা খালি ধোনের গোড়ায় ঘুরঘুর করে।

এই নোংরামো কীভাবে দূর হবে? আমি দুটো পথের কথা ভাবছি। এতোদূর যখন পড়েই ফেলেছেন, আরেকটু ধৈর্য ধরে সেই দুটোর কথাও শুনুন।

প্রথমটি মেয়ে তথা নারীদের জন্য। ‘অবলা’, ‘গৃহিনী’, ‘মায়ের জাত’ ইত্যাদি ফালতু সেন্টিমেন্টাল বিশেষণ তো শুনেছেন। আপনি কি নিজেকে সেটাই মনে করেন? আপনি কি মনে করেন যে আপনার জন্ম হয়েছে একজন ঊন-মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে, যে সারাজীবন অন্য পুরুষের নজর এড়ানোর জন্য ঢেকেঢুকে তাঁবুর ভিতরে ঢুকে বসবাস করবে? কিংবা আপনি মনে করেন, যে সর্বংসহা ইমেজটি ২০ বা ৩০ বছরে গড়ে তুলেছেন – এটাই আপনার জীবনের সেরা(?) কীর্তি। আপনি পড়াশোনা করেছেন, ইন্টারনেট ও ফেসবুক ব্যবহার করতে পারেন। অর্থাৎ আপনার একটি ব্রেইন আছে। কেবল লিঙ্গ নারী বলে আপনি ব্রেইন ব্যবহার করেন না, অন্যে যা বলে, বইয়ে উপন্যাসে যা শেখায়, সেই নারীরূপটাই আপনার কাছে সব। আপনি যে একটা মানুষ এবং অন্য আরেকটা পশু যে আপনার উপরে হামলা করলে তাকে পালটা আঘাত করার শক্তি ও অধিকার আপনার আছে, তা আপনি ভুলে গেছেন। হয়তো সারাজীবনে শিখেনও নাই। এর মূল দোষ সমাজের এবং আপনার পরিবারের, আর খানিকটা দোষ আপনার নিজেরও বটে। আপনার উপর দিয়ে ইচ্ছামত মাড়িয়ে একজন টয়লেটে গিয়ে হাত মারে, এই চিন্তাটা কি মাথায় আগুন ধরিয়ে দেয় না? দিলে আপনি কতো বড়ো কাওয়ার্ড* যে সেটা দূর করতে কোন চেষ্টাই করেন নাই (*এই শব্দটার বাংলা ‘কাপুরুষ’। হায়! ভাবখানা এই যে নারী তো এমনিতেই কাওয়ার্ড, তার জন্য আবার আলাদা শব্দ লাগবে কেন? পুরুষ হবে সাহসী, তাই কেউ যদি সাহসী না হয়, তবে সে পুরুষই নয় = কাপুরুষ!)  ভাবুন। এই আক্রমণ, এই নীরব ধর্ষণ ঠেকাতে আপনি কী করতে পারেন, ভাবুন। খুলির ভিতরে ব্রেইনে দুয়েকটা ভাঁজ ফেলেন। ফেসবুকে শাহরুখ খানের প্রোফাইলে সাবস্ক্রাইব না করে একটু গুগল করুন বিদেশে মেয়েরা নিজেদের সেল্ফ‌ ডিফেন্সের জন্যে কী কী ব্যবস্থা নেয়। সেগুলোর কয়েকটা ব্যবস্থা সময় নিয়ে গড়ে তুলতে হয়, আর কয়েকটা পন্থা একেবারেই সহজ। সামান্য একটু সাহস আর বুদ্ধি কাজে লাগাতে পারেন এই বিষয়ে?

দ্বিতীয় পথটি পুরুষদের জন্য। এই বদমায়েশি থেকে শুরু করে নোংরা আক্রমণ, গ্রোপিং ও ধর্ষণ পর্যন্ত অপরাধগুলো যারা ঘটান, তাদের বাইরে হয়তো অনেকে আছেন, যারা একজন মেয়েকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে শিখেছেন। অনেক পরিবারে ছেলে ও মেয়েকে সমান অবস্থান শেখানো হয়, পরষ্পরকে কেবল মানুষ হিসেবে যে সম্মান দেয়া উচিত, সেটা সেখানো হয়। বিবর্তিত হতে হতে আমরা হোমিনিড থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতি হয়েছি, আর আদিম জিনের নিয়ন্ত্রণ করার নিয়মও শিখেছি। সাধারণ ভাষায় এটাকে বলে সভ্যতা, ভব্যতা, সৌজন্যবোধ। এগুলো হারিয়ে ফেলা ওই দাড়িটুপি, লালশার্ট, লুঙ্গি পরা আদিম জিনের বাহকদের বিলুপ্তি হওয়া দরকার। শুভবুদ্ধির উদয় তাদের আদৌ হবে কি না জানি না, তবে যারা অন্তত এই নোংরামোর বিপক্ষে, তারা সরব হোন। কাউকে এভাবে তাকাতে দেখলে অন্তত একটা ‘হৈ’ বলে আওয়াজ করেই দেখুন না মজা! লোকটি বিব্রত হবে, ছিটেফোঁটা লজ্জা অবশিষ্ট থাকলে হয়তো আর এমন করবে না। (উপজাত হলো আপনি একটু মজার সার্কাস দেখতে পেলেন)। পাশের একজন পুরুষের মতামত ও বিরোধিতা যদি এইসব ব্রেইনলেসের মাথায় ঢোকে (কারণ নারীকে তো তারা মাংশ মনে করেন, নারীদের বিরোধিতার হয়তো ভ্রূক্ষেপও করবে না, উল্টা মেয়েটিকেই গালাগালি খেতে হবে)।

আশা করতে পারি, খারাপকে খারাপ বলার চর্চাটি সামাজিকভাবে আবার আমাদেরই চালু করতে হবে। পুতুপুতু লুলুবাবু হয়ে তো কচুও কাটা শিখি নাই। এখন দুয়েকজন কাম-কাতর লুঙ্গি-বানরের রাডারটিকে যদি নিষ্ক্রিয় করতেও না পারি, তাহলে আর কীসের শিক্ষা, কীসের মনুষ্যত্ব?