শনিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১০

একটি অগল্প-জনিত প্রয়াস বা বিভ্রম

বাইরে যদি খুব তীব্র আলো থাকে, তাহলে ঘরের ভেতর থেকেও সেই আঁচ টের পাওয়া যায়। জানালাটায় পর্দা দেয়া, তারপরেও সূর্যের আলোর তেজ পর্দার ঘেরাটোপ পেরিয়ে চলে আসে। আমি এরকম দিনে খুব ঘরকাতুরে হয়ে পড়ি, এ'ঘর-ওঘর করি। তারপরেও নিতান্ত দরকার না পড়লে বাইরে বের হই না। এখন কোনো কোনো দিন ছুটি থাকে, কোনো কোনো দিন সারাদিন কাজ। যেদিন কাজে থাকি, নিঃশ্বাস ফেলার সময়ও পাই না, সেসব দিনে আমি ভালো থাকি। আর নিজের ঘরে স্বেচ্ছাবন্দিত্বের দিনে আমার কেবলই তাদের কথা মনে পড়ে।

ঝিম ঝিম দুপুর গড়িয়ে গেলে আমার ঘুম ভাঙত। একজন তার অনেক আগেই ঘুম ভেঙে উঠে চলে গেছে। কামলাগিরি করে বহুজাতিকে, সেখানে দশটা পাঁচটা বলে আদতে আটটা-আটটা খাটিয়ে নেয়। খাটতে খাটতে তার খাটিয়ায় ওঠার দশা। ভোরে বের হয়ে যায়, বাস ঠেলে অফিসে ঢোকে। বের হতে হতে নিশুতি। আবার ফিরে আসতে আসতে তার খাওয়ার ইচ্ছাটুকুও থাকে না। আমরা বাকি দু'জন যখন কোন মুভি'টা দেখা দরকার, বা আজকে আসলে ইন্টারনেটে নতুন সাইটটার ভেতরে ঘোরাঘুরি করার ফন্দি কষি, সে তখন ভোসভোসিয়ে ঘুমাচ্ছে। আমরা তাকে বিরক্ত করি না, শান্তিতে ঘুমাতে দেই। তারপরে একটু নেট ঘেঁটে বলি, "নাহ, এই ফেসবুক নামের সাইটটা বেশ মজাদার। এতে ঘোরাঘুরি করতেও মজা লাগছে।"

একটু পরে আমরা নাটক দেখতে বসি। ইংরেজি নাটক, যা কিনা মার্কিন মুলুকে সপ্তাহে সপ্তাহে একদিন করে দেখায়, আর আমরা গরীব দেশে সেটা একবছর পরে একবারে সারাবছরের সব পর্ব দেখি। তাতে ক্ষতি নেই, আমাদের মনে হতে থাকে এটা একটা অন্তহীন মুভি। পর্বে পর্বে চমক। আমরা তর্ক করি কেন সুপারম্যান একটা 'গুড-ফর-নাথিং' লানা ল্যাঙের পিছনে ঘুরছে? কেন সে তার পাশেই ক্লোয়ির দিকে একবারও তাকায় না!

তারপর রাত বাড়লে আমাদের ক্ষুধা পায়। আমরা পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে বের হই আর রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ছাউনির নিচে তাওয়ার কাছে গিয়ে বসি। এখানে তেল তেল পরোটা আর আধাকাচা ডিমভাজি পাওয়া যায়। আমরা সেই আগুনেগরম তেল-পরোটা-ডিম-ভাজি দ্রুত মুখে চালান করে দেই। দেরি করলেই আঙুল নয়তো জিব পুড়ে যেতে পারে। একটু খেয়ে আমার সাথে যে ছেলেটা আছে, সে সিগারেট ধরায়। আমি সিগারেট খাই না। খালি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আমার চারপাশের প্রিয় মানুষেরা সিগারেট কেন খায়, এটা নিয়ে ভাবতে বসি। আমরা দেখি ফাঁকা রাস্তা দিয়ে পরাবাস্তব দৃশ্যের মতোন মহিষের পাল যাচ্ছে। কালো রাস্তার পিঠে কালো কালো মহিষগুলোকে আমাদের অন্যজগতের মনে হয়, কেমন নিঃশব্দ চলাচল তাদের। যেন চোখ বেঁধে নিশ্চিন্তে চলে যাচ্ছে তারা! একবারও ভাবছে না যে কালকেই হোটেলে হোটেলে তাদের মাংস কালাভুনা হয়ে আমাদেরই পেটে চলে যাবে। মহিষের পালের রাখালটাকে আমার ভালো লাগে না, তার চেহারা অস্পষ্ট।

ছেলেটার সিগারেট খাওয়া শেষ হয়। এখন চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠিয়ে আমরা ট্রাফিক সিগন্যালে বসে আছি। জনহীন রাস্তায় সবুজ-লাল বাতি একা একাই জ্বলে! আমরা ভাবি, আবোল তাবোল।



তারপর অনেক দিন পার হয়, এভাবেই। তারপরে আমি ভুলে যাই আমি এরকম দিন কাটিয়েছি। সেই ছেলেটাও ভুলে যায় হয়তো। হয়তো আমি ভুলি নাই পুরাপুরি। ঘুমিয়ে থাকা ছেলেটা চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিদেশ চলে যায়। সিগারেট খাওয়া ছেলেটা বিয়ে করে। বউসমেত বিদেশ যাওয়ার সব ঠিকঠাক হয়। তারপরে আমাদের মাঝে পনের মিনিটের রাস্তা রেখে আমরা চাকরি করতে থাকি। ঘানি টানতে থাকি মহিষগুলোর মতোন। তারপরে আমিও হয়তো অনিশ্চিত কোথাও চলে যাই! কোথায় যাই?



তারপর আর কোন গল্প থাকে না। সেই ফেসবুক নামক চমৎকার সাইটে কয়েকশ বছর আগে তুলে রাখা গোপন অ্যালবামটা ঐ সিগারেটখোর ছেলেটা কোনো এক একলা রাতে খুলে বসে। তারপর সেখানে ছবিতে বসে থাকা মুখগুলো দেখে নিজেকে চেনার চেষ্টা করে। একটু পরে অন্য দু'জন একটা করে নোটিফিকেশন পায়। সবকিছুর মাঝে থেকেও বাকি দুইজনে চুপচাপ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।


*****

সোমবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১০

প্রতিক্রিয়াশীলতার অ আ ক খ




প্রতিক্রিয়াশীলতা আর প্রগতিশীলতা শব্দ দুইটার শব্দার্থ নিয়ে ভাবতেছিলাম। হয় কি, ভাষাবদলের সাথে সাথে শব্দের আক্ষরিক অর্থের গায়ে আঞ্চলিক, জাতিগত আর ঐতিহাসিক তকমা পড়ে। বাংলাদেশে এই শব্দ দুইটা আজকাল অহরহ ব্যবহার হয়, যেন অনেকটা ডালভাত হয়ে গেছে। এই কারণে অনেক সময় না বুঝেই অনেকে ব্যবহার করে ফেলেন। হাস্যকর ব্যাপার হলো, বেশিরভাগ সময়েই ব্যবহারকারী নিজেই ঐ বৈশিষ্ট্য ধারণ করেন। তার আশেপাশে যারা বুঝতে পারেন, তারা মনে মনে ঠা ঠা করে হাসতে থাকেন।


প্রগতিশীলতায় যাবার আগে প্রতিক্রিয়াশীলতা নিয়ে দুইটা কথা বলি। এটার ইংরেজি করলে দুইটা শব্দ পাওয়া যায়- রিয়্যাকশনারি, কনজারভেটিভ। যদিও কনজারভেটিভের আলাদা শব্দবন্ধ বাংলায় ব্যবহার হয় (রক্ষণশীল), তবুও প্রকৃতি-বিচারে দুইখানায় সহোদর ভাই, তাহাদের জুড়ি নাই! রিয়্যাকশনারি অর্থ – "viewpoints that seek to return to a previous state (the status quo ante) in society"। বাংলায়- আগে কী সোন্দর দিন কাটাইতাম, সেটার থেইকে কেন যে বাইরায়া আসলাম। চল চল চল, আবার ফিরে চল। ফলিত অর্থে – এখন যদি কেউ বলেন, পাকিস্তানি শাসনামলই ভালো আছিলো, বা ব্রিটিশযুগেই ভালো ছিলাম – গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ ইত্যাদি চাই, চাই, চাই। বা আরেকটু এগিয়ে কেউ যদি বলেন, এই গণতন্ত্র, আমলাতন্ত্র খুবই খারাপ, বাঙালিকে ডাণ্ডার উপরে রাখতে হয়, এরশাদ্দাদু ভালো ছিলো। এইগুলা খুবই মামুলি উদাহরণ, যারা শব্দটার সাথে একেবারেই পরিচিত নন, তাদের জন্যে দিলাম। কিন্তু বৈচিত্র্য নিয়া আমাদের বসবাস, তাই শব্দার্থে আটকে থাকলে গাড়ি চলবে না। এই প্রতিক্রিয়াশীলতার চর্চা অনেকটা বর্ণবাদের মতোই আমরা অহরহ লালনপালন করতেছি।


কীভাবে?


আচ্ছা, এখনই তেড়ে মেরে এসেন না। আরেকটু গপসপ করি। আগে প্রগতিশীলতার পরিচয়টা বলি, নাহলে তিনি নিজেকে অবহেলিত মনে করতে পারেন। প্রগতিশীলকে ইংরেজিতে বলে প্রগ্রেসিভ, লিবার‌্যাল। আরেকটু খোসা ছাড়াইলে পাই – "Promoting or favoring progress towards improved conditions or new policies, ideas or methods"। খুবই ভালো কথা। তার মানে, বাংলাতে – নিত্যনতুন মতবাদ শুনলে যার মনে হয় "ভালোই তো", যিনি সহজে সামাজিক আর রাজনৈতিক পটবদলকে আত্মস্থ করতে পারেন। সবচেয়ে বড়ো কথা, 'সভ্যতা ও সংস্কৃতি বদলে যাবেই, রেডিও জায়গায় টিভি, টিভির জায়গায় ইন্টারনেট আসবেই', এরকম বদলগুলো যাকে খুশি করে, স্বস্তি দেয়, তিনি প্রগতিশীল। আরো সহজ করে বললে, বর্তমান সমাজের ত্রুটি বদলাতে পুরনো ধ্যান ধারণার চাইতে নতুন ধ্যানধারণাকে বেছে নেয়ার প্রবণতাকে প্রগতিশীলতা বলা যায়।


সংজ্ঞা শুনে প্রতিক্রিয়াশীলকে পুরোপুরি খারাপ আর প্রগতিশীলকে পুরোপুরি ভালো মনে হচ্ছে, তাই না? তারমানে একটা কালো, আরেকটা আলো। সুতরাং বেছে নেয়া খুউব সোজা। কিন্তু সবকিছু সহজ সরলভাবে হলে তো আমরা সুখে শান্তিতে বাঁচতাম। এই মোটাদাগে বিভাজনের বাইরেও কিছু কিছু এলাকা আছে। আসেন, একটু সেদিকে হাঁটি।





একজন ব্যক্তি যে সমাজে বাস করেন, সেই সমাজের ব্যাপারে তিনি কখনই পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেন না। এটা দেশ-জাতি-সময় নির্বিশেষে সকলের জন্যে প্রযোজ্য। নিরানব্বুই ভাগ মানুষ নিজের অবস্থানকে নিয়তি ধরে নিয়ে নীরবে দিনযাপন করেন। তারপর বেলা ফুরালে চুপচাপ মারা যান। ব্যক্তির মৃত্যুর সাথে সাথেই তার সাথে জড়িত সমাজের ধারণা ও উত্তরণের সম্ভাবনার আপাত-সমাপ্তি ঘটে। তারপরে নতুন মানুষ এবং তার সমাজ বদলের নতুন ধ্যানধারণার আগমন। এই চক্র অনাদিকাল ধরেই চলছে। ব্যক্তির হিসাবে এই চক্রাকার পথ কোন ফলাফল দিচ্ছে না, কিন্তু গোষ্ঠীগত বা দলগত হিসাবে চক্রটি ঘোরার সাথে সাথে একটু একটু করে রৈখিক সরণও হচ্ছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা মূলত আমাদেরকে এই ‘big picture’ দেখার মতো করে গড়ে তোলে না। জীবনযাপনের ন্যূনতম কিছু জ্ঞান আর ধারণা দিয়েই ছেড়ে দেয়। কিন্তু মানুষ নিজের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই ‘অবহেলিত’ এই জ্ঞানটুকু সংগ্রহ করে নেয়। তখন সে বুঝতে পারে যে চাকার মতো এই চলনটা কেমন, সেটা সামনে যাচ্ছে না পিছনে, তার নিজের আউটপুট, সেই চাকার মাঝে তার আপেক্ষিক অবস্থানের স্বরূপ। প্রগতি আর প্রতিক্রিয়া, ব্যক্তির মাঝে দুই আচরণের একটি বা উভয়ের চর্চা, এই বুঝে নেয়ার সাথে জড়িত।


সমাজে প্রাধান্যকারী মতবাদ তৈরি করার জন্যে এই ‘বোধসম্পন্ন’ মানুষদের প্রয়োজন। নিজের সমাজের কিসে ভালো হয়, আর কিসে খারাপ হয় সেটা একমাত্র এই অল্প কয়েকজন মানুষই বুঝতে পারে। বাকিরা ব্যস্ত থাকেন নিজেদের জীবনযাপনে আর পরিবর্তনের সময় এলে, নিজ নিজ ধারণাপ্রসূত মতামত কোৎ করে গিলে সেই পরিবর্তনের গড্ডালিকা প্রবাহে তারা গা ভাসান।


তার মানে কোন ভূখণ্ডের সমাজ-বদল, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন এই মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে নির্ভর করে। তারা সেই বদলের চাকাটিকে সামনে বা পিছনে নিয়ে যেতে পারেন। এখন বাংলাদেশে বা এই বদ্বীপের নরম মাটিতে সেই চাকার দাগ কোনদিকে গেছে?


(লিখতে লিখতে ক্লান্ত। বাকিটুক কালকে খতম করবো!)

রবিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১০

অব্যয়িক


এবং প্রকারান্তরে আমি কাশফুল ভালোবাসি
কিংবা উন্মোচনের শরৎ
ঋতুসমূহ আলোচনার উপসংহারে
সেই মত বিবেচিত হয়নি
তাই আদিগন্ত ধূসর গ্রীষ্ম, গাঢ় কাজল হয়
এই ভাবালু অভিমান বেহুদাই
শহরবাসীর ঋতু বিষণ্ণ ওয়ালপেপারের বেশি নয়
এর চেয়ে অ্যাকোয়ারিয়াম ভালো-
মৎস্য-সন্তরণ আমাদের, ক্লোরিনের শরীরে
ঘটনাবাহুল্যে আজ ও ইদানিং ভুলে যাই কোথায় রেখেছি সুর ও শূন্যতার শব্দ

শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১০

রাতচারণ


দুপুর নিয়ে আমার প্রবল উন্মাদনা আছে। উন্মাদনা, অর্থাৎ সাধারণ্যের সমাজ ও প্রথানিয়ন্ত্রিত আচরণের বাইরে আচরণ। আমি এমন করি, জেনেশুনেই বুক-পকেটে উন্মাদনাসমূহ লালন করি বিবিধ বিষয়ে। জাগতিক তাড়না দিয়ে যেগুলো ইস্যু আমার হিস্যা নিয়ে নেয়- অর্থ, চাকরি, খাওন-দাওন এগুলো আমাকে উন্মাদ করে না। আমি হিসেবি ও খেয়াল করে দেখি এটিএম বুথের ভেতরে ছক ছক নম্বরের জোরে আমার প্রাপ্য খটাখট আমার করতলে চলে আসে। পাতলা হয়ে থাকা ওয়ালেটের ভেতরে শৌখিন রোলার স্কেটিং করে নোটগুলো জমা পড়ে।




অথচ আমি দুপুরের আলোতে উন্মাদ হই। জ্ঞান হবার পর থেকে আমি এই উন্মাদনাকে সহজাতভাবেই পেলেপুষে বড়ো করেছি। কখনো বেখাপ্পা লাগেনি নিজের কাছে, মনে হয়নি ভদ্রসমাজে এমন আচরণের কথা ভাবাও অভব্যতা। দুপুর অর্থাৎ দ্বিপ্রহর; সেই সময়টুকু পাহাড়ের চূড়ায় পত্‌পত্‌ করে উড়তে থাকা নিশানের মতোই কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকে। তারপরে হঠাতই গড়িয়ে পড়ে হারিয়ে যায়। হারানোর আগে আগে, স্পষ্ট দেখি দুপুরের ঝিম ধরা আলোর ভেতর থেকে একটা মুচকি হাসি আমার দিকে ফ্যালফ্যালিয়ে তাকাচ্ছে। তাকে পুরোপুরি পড়ে নেয়ার আগেই বিকেল চলে আসে। বিকেলের প্রতি আমার কোন মমত্ব নেই। বিকেলে মরা বিড়াল আবিষ্কার হয়।




আরেক দ্বিপ্রহরও আমাকে উন্মত্ত করে, সে নিকষ, সে তিমির, সে শুনশান। আর আমি সেই অনুভবের স্বরূপ চিনতে পারি নীরবতার মাঝেও, নিঃসন্দেহে বুঝি যে এটা অস্বাভাবিক। এমন স্তব্ধসময়ের প্রতি আমার উন্মাদনা মানায় না। এখন দরকার ধ্যানজ স্থিরতার, পানির উপরিতলের নিস্তরঙ্গতার। মনকে শান্ত করো, ইন্দ্রিয়গুলোর মুখ বুঁজে দাও। মোমের প্রলেপ দিয়ে দাও চোখে, তুলো দিয়ে মুছে দাও ত্বকের প্রদাহ। তারপরে নিঝুম ঘুম! কিন্তু আমি বড়ো বেখেয়ালি হয়ে পড়ি এ'সময়ে। বুঝতে পারি আমার ভেতরের ভাঙন রাত দ্বিপ্রহরকে ছুরির ধারে কাটছে। দেয়ালের ছবি আর মুখগুলো ধীরে ধীরে ধুয়ে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তাদের বিবর্ণতায় আমারও কেমন মরাটে লাগে। বিভ্রম হয়, মনে হতে থাকে এখন বেলা দুপুর। তীব্র ঝমঝমে রোদে পুড়ে যাচ্ছে রঙ। মরা পাতা খটখটে পাঁপড়ের মতো হয়ে উঠছে।




দেয়ালও একটা সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে। যেভাবে দুপুর আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলো, যেভাবে বিকেল এসে আমাকে তীব্র ঠাট্টাভরা অবহেলা করে চলে গিয়েছিলো, যেভাবে সন্ধ্যা খুব সন্দেহজনক হয়ে উঠেছিলো আর আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার সবকিছু ছিনতাই করে চলে গিয়েছিলো, পুলিশবেশী রাত অনেক দেরি করে এসেছিলো- ঠিক সেভাবেই রাত দ্বিপ্রহর আমাকে ফেলে চলে যায়। রাত বাড়তে থাকে তন্বী-কিশোরীর বেণীর মতোন। তার ভঙ্গিমা আমার কাছে অপরিচিত লাগে, দূর্বোধ্য লাগে। আমি আবারও চেষ্টা করি চোখ-কান বুঁজে সমাধির ভেতরে ডুবে যেতে। কিন্তু পারি না। সাঁড়াশির মতো দুটো কঙ্কাল হাত আমার হা-কোটরের ভেতরে আঙুলের হাড় ঢুকিয়ে সেটা খুলে রাখে। চোখবিহীন চোখে আমি চরাচরে রাতের লীলা দেখি। নিশিক্লান্ত অনেক অনেক মরদেহ মাটি ফুঁড়ে উঠে আসে, খেলা করে। তাদের ক্লান্তি কমে না। তারা শ্রান্তিতে টুকরো টুকরো হয়ে একসময় আবার নিজেদের শয়ানে শিশির হয়ে যায়।


হে আমার দেয়ালের মুখ, হে বিবিধ উন্মাদনা, আমাকে ঘুমুতে দাও!




***

সোমবার, ১২ এপ্রিল, ২০১০

সেলাই#৩


বিকেলের আলোমাখা টেবিলে আমরা দুজনে বসে
তোমার খয়েরি চোখের গাঢ় কাজল দেখলাম
চোখের পাঁপড়িগুলো নেই
(কেউ এসে তুলে নিয়ে গেছে)
ডান চোখের কিনার থেকে লাল ঠোঁটের প্রান্ত অবধি ছুরি দিয়ে চিরে দিয়েছে কেউ
ঠোঁট থেকে হাসির কিছু টুকরো কণা চোখের দিকে সিঁড়ি ভেঙে উঠে যাচ্ছে


তোমার কষ্ট লাগছে। তোমার ব্যথা লাগছে। তুমি হাসছো না। তুমি কাঁদছো না।


আসো আমরা এদিক-ওদিক তাকাই। দু’জনের মাঝে কিছু লতাগুল্ম আদরে বেড়ে উঠেছে। তোমার আঙুলে আশ্রয় নিয়েছে তারা। টেবিলের পেট ফুঁড়ে নদী জেগে উঠছে। নদীতে আমি ডুব দিলাম, সাঁতরে ভুস করে ভেসে উঠলাম। তোমার স্ফীত উদরের কাছাকাছি। এই তীরে প্রবল জলের ক্রন্দন।


মৃত-আলোয় নদী থেকে বিন্দু বিন্দু পানি উঠে আসছে তোমার কোলে, আমি সেখানে মাটি খুঁড়তে শুরু করলাম, মাটির ভেতরে শামুক, শামুকের খোলে সে, তার হাতখানা ছোট, হাতের মুঠিতে তোমার চোখের পাপড়িগুলো ঝুরঝুর করে ঝরে পড়লো সেই নদীতে

রবিবার, ২৮ মার্চ, ২০১০

অ-প্রাকৃতিক

[যা ভাবি, যা দেখি, তারে নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছা করে। এর সাথে বালক বয়সের খেলনা নিয়ে অবিমৃশ্যতার মিল আছে। খেলনা ভেঙে গেলে কান্না পেতো, কিছু করার থাকতো না। এখনও মাঝে মাঝে নাড়াচাড়ার ইচ্ছাবশে চারপাশের দৃশ্য ও ঘটনা ভেঙে যায়। দেখি কিছুই নির্মিত হয় না। আবার বাতাসের মতো অবয়বহীনতার এই জগতে কোনটা নির্মাণ কোনটা বিনির্মাণ সে ধন্দও ব্যাপক!]




মাঝে মাঝে জোনাকদের আলোচনায় হুটহাট কবিতা উঠে আসে। এই ঘটনা আপেলপতনের মতো কুটিল হতে পারে, তবুও সেটা ঘটে যায় অনিবার্যতায়।


তো, জোনাকদের আলোচনায় চা-সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে কবিতা উঠে আসে।
এমন না যে কবিতা কোন অবয়বহীন ধারণা, জোনাকদের কাছে তা পুরোপুরি মিশ্ররূপীঃ নারীর মদির নাভির মতোই আকর্ষণীয়, (এবং ক্ষমাহীন সেই মেদাঞ্চল এতো অযুত যোজন দূরে বলে) অদ্ভুত কষ্টকর। যুগপৎ আকর্ষণ ও যাতনা আদায়ের কবিতা জায়গা করে নেয়- তুচ্ছ জোনাকেরা সেই কৃষকের মতো শক্তিশালীও নয় আর সর্বগ্রাসী নদীভাঙনে কৃষকের কিছুই করার থাকে না।


মাঝে মাঝে হুট করে আসা কবিতা আবার হুট করেই চলে যায়, তখন মিটমিটে আলোর সলতে আর কয়েলের লাল চোখ মিশে যেতে থাকে।


দেখা যাক, ঠিক সেই সময় আমরা একটি মুহূর্তকে বাছাই করি দৈবচয়ন পদ্ধতিতে। তারপরে বিশ্ব-চরাচর থামিয়ে দিয়ে সেই মুহূর্তের ভেতরে ঢুকে যাই। আসুন, মুহূর্তটিকে ভালোবাসার চেষ্টা করি, নিদেনপক্ষে তার সাথে কিছুটা যোগাযোগ, কিছুটা ছল- অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের ঢং করি।


মুহূর্তের মাঝখানে কয়েকটি মশা উড়ছে। এই এক মুহূর্তেই তারা কয়েকশ’ বার পাখা ঝাপটে ফেলছে, ঠোঁট চাটছে, পুঞ্জাক্ষি জুড়ে আলোকস্বল্পতা মাপছে।


মুহূর্তেই চায়ের কাপ থেকে দুই জুল তাপ উড়ে গেলো জোনাকদের মাথার ওপর দিয়ে, যাবার সময় কারো কারো চুলে হালকা ছোঁয়াচ…


মুহূর্তের মধ্যেই চায়ের দোকানের লোকটির ঘুম ঘুম চোখ প্রায় মুদে এলো শ্রান্তিতে, “আজকের উৎকট খদ্দেরগুলো সাপ্তাহিক নিয়মে ফিরে ফিরে আসছে, মাত্র একশ তিরিশ টাকায় দুটো বেঞ্চ আর কয়েকশ একর জমি আটকে রাখছে পুরা একবিংশ শতক” -এমন টুকরো টুকরো মৌলিকচিন্তা তার নিউরনে খেলছে বিদ্যুচ্চমকের মতোন।
মুহূর্তের মধ্যেই রাস্তার ঘোলা আলোর উৎসটি জোনাকদের পেরিয়ে গেলো। আলোটি আসার আগে বা পরে তারা কেউ খেয়াল করে নি। তবু অনেক ওপর থেকে কিছু অয়ন বায়ু গুমোট গ্রীষ্মকে পাত্তা না দিয়ে দেখলো তার শরীরে কয়েল ও চা-সিগারেটের তকমা মাখা কিছু ধোঁয়া এসে সাঁটিয়ে চুমু খাচ্ছে!

বুধবার, ১৭ মার্চ, ২০১০

নিরর্থকাব্য

সকালে যখন আবছা ময়লাটে নীল পর্দার পেছনে রোদের হাট বসে একটা তুমুল সিনেমা শুরু হয়, তখন এই ঘরে তেমন একটা আলো এসে পৌঁছায় না। নীল নীল আবছা ঘুম জমে থাকে এখানে। আর আমি পাশ ফিরে শুয়ে উল্টে যাই, পাল্টে যাই একটু, মাত্র এক অথবা দুই ইঞ্চি। তারপরে জানালায় নিবিড় হয়ে মিশে থাকা সবুজ পাতার ডাল নড়ে ওঠে, আর আমিও ঘুমের ঘোরে কেঁপে উঠি। তারও কয়েক মুহূর্ত পরে সমূহ অর্কেস্ট্রা ঝিলমিল বেজে ওঠে, ধাতবের সাথে সবুজের অসম প্রহার!


এ'সময়ে এই ঘরে এক দামাল হাওয়া কিশোরের শরীরে সশব্দে ঢুকে পড়ে, দরোজার মুখ খুলে যায়। দরোজার বাইরে যে, দরোজার ভেতরেও সে, সেখানে সকল সম্ভাবনা। অচেতন-চেতন ঘুমে আমার শরীরকে তুলে ধরে, টেনে ধরে কিশোর দুটো হাত, "ওঠো!" "ওঠো তো!" তার হাতের 'পরে আমি মহাকর্ষে আটকে থাকা পৃথিবী ছেড়ে দেই। কিশোর দামাল হাওয়া সাঁ করে পৃথিবীটাকে ছুঁড়ে দিলো গোবেচারা নীল গ্রহটা পাঁই পাঁই করে ঘুরতেই থাকলো খ্যাক খ্যাক করতে থাকা সূর্যের চারপাশে। আমি আরেকটু দূর থেকে ঘুম-অঘুমের মাঝে সূর্যের খ্যাক খ্যাক শুনি।




এই যে দেখছি একটা সাইকেল চলে গেলো
অনুষঙ্গে কিছু নেই, আরোহী নেই, নেই রোদ
চাকার ভেতরে সেলুলয়েড এবং এক বিভ্রান্তি
বিড়ালটি কেবল ঐ কাঁটার সাথেই যুদ্ধ করে
তার কৃষ্ণতর চোখে স্বৈরাচারী ট্রাক ও রাজা
আমাদের দর্শকমনের ভিতরে অনাদায়ী ঘুম!




চোখের পাতায় মাঝে মাঝে সকল ক্লান্তি এসে জড়ো হয়, আমি তখন মনে মনে চোখ বুঁজে দেখতে পাই অনেককিছু। দেখতে চাইলে তুমিও পারবে, চেষ্টা করেই দেখো না! দেখবে অমল ধবল পৃথিবী নীল নীল চেহারা নিয়ে নির্বিকার ঘুরছে, বন বন করে। তার চারপাশে কালো কালো অন্ধকার আর নৈঃশব্দ্য অথচ সে নিজের শরীরে গেঁথে রেখেছে কিছু দামাল বাতাস আর সশব্দ জল- সশব্দ পাহাড়- সশব্দ গিরিখাত- সশব্দ সবুজ- সশব্দ মানুষ! শব্দের যে কোন অর্থ নেই সেটা সবাই জানে, শুধু নিরর্থক মানুষ জানে না।


দামাল হাওয়া অনেকক্ষণ আমার চোখের ঘুম-অঘুম কাটানোর চেষ্টা করে হতাশ হয়ে নীল পর্দার পেছনে সবুজ পাতাগুলোর সাথে ফ্লার্ট করতে উঠে গেলো!

বুধবার, ১০ মার্চ, ২০১০

মৃ

যে হেসে দিলে দুয়েক মুহূর্তের জন্যে কমলালেবুর মতো গোল পৃথিবী শ্লথ হয়ে সেই হাসি উপভোগ করে যায় সে জানেও না তার স্মিত মুখের বিকীর্ণ আলো কতোটা সুন্দর করছে চারিপাশ, পৃথিবী জানে, পৃথিবী বোঝে, তাই বোঝা কাঁধে চলতে চলতে সে কিছুটা স্থবির হয়ে দম নেয় আর সেই হাস্যাঞ্চলের উল্টোপাশে রাতের আঁধার কিছুটা ফিকে হয়ে আসে

শুক্রবার, ৫ মার্চ, ২০১০

একটি খুব সাধারণ ঘটনা



মৃত্যু খুব সাধারণ ঘটনাঃ
একটা বইয়ের পাতা ওল্টানোর মতোই নিত্যদিনের ঘড়ির কাঁটায় ঘাপটি মেরে বসে আছে।


যেভাবে তুমি চুল আঁচড়াও বা ঘুম ভেঙে দু'হাত আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে এলোমেলো ছড়িয়ে দাও সূর্যরশ্মির মতোন, সেভাবেই মৃত্যু হেঁটে এসে কলিংবেল বাজিয়ে দেয়। সেও আমাদের মতো আধুনিক হয়ে গেছে। যেমন সময় খুব আধুনিক আজকাল, নিয়মিত কোয়ার্টজের অণুতে মিশে থাকে, ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সময় তেমন ভুল করে না, তবে মৃত্যু মাঝে মাঝে ভুল হিসেবে কাছাকাছি চলে আসে খুব- যেমন চড়ুইটা সেদিন হুট করে জানালা গলে আমাদের ঘরে এসেছিলো। তুমি আঙুলের নখ কাটছিলে দাঁতে আর আমি তোমার দিকে তাকিয়ে হেসে দিচ্ছিলাম কপট রাগে, আর তখন চড়ুইটা আমাদের মাঝে অনেক না-বলা কথা হয়ে অযুত মুহূর্ত ঝুলে রইলো।


তারপর?
-তারপর ফুরুৎ


তারপর?
-তারপর ফুরুৎ


কে ফুরুৎ, মৃত্যু না চড়ুই?
-ওমা তুমি বুঝো নাই কে ফুরুৎ? খেয়াল কোথায় থাকে তোমার আজকাল? চোখের নিচে গাঢ় হ্রদের কালো পানির দাগ আর কপালে মরূদ্যানের ভাঁজ কেন! কেন শিথিল হয়ে আসে তোমার হাতের মুঠো? কেন দাঁত কাটার মতো তুচ্ছ মুহূর্তে চড়ুইটা বা মৃত্যুটা এলো আর চলে গেলো? তারপর সব ফুরুৎ।


একটু আগে আমি ভুল বলেছি। সময় ঠিক আধুনিক হতে পারেনি। সময় এখনও চিরপুরাতন মৃত্যুর কাছে হেরে যায় রোজ। প্রতি পদক্ষেপে সে আমাদের থেকে আরো একটু করে ছিনতাই হয়ে যায় মৃত্যুর কাছে।

বুধবার, ৩ মার্চ, ২০১০

Voyeur

চাল্‌সে রোগের চালে বা চাতালে
উঁকি দিয়ে দেখা গেলো
দুরন্ত ভোইয়ারিজ্‌ম।


ভেতরে জমাট গুমোট
খড়িমাটি-প্রবাহ- গতকাল থেকে জমে আছে, বিগত।


"চাহিবামাত্র বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে" জীবাণুকুল,
অনুকূল তাপমাত্রায় মেপে নিয়ে
রেটিনাজগতের রোগশোক, গ্রহ-উপগ্রহ।


গলগ্রহ হবেন হঠাৎ ভিট্রিয়াস ফুল,
লালনীল কোমল কমল!


তারপর সকল ভোইয়ারিজমে ফুলের ভেতর ফুটবে চোখ, রেটিনাক্লান্ত পুলক।


পালক-বিন্যাসে কাজল ছুঁয়ে দিলে,
নজর পড়ে অজান্তেই চুরমার হয়ে যাচ্ছে দেখো সেখানে জমে থাকা রোদ।


রৌদ্‌রো! রৌদ্‌রো!
-বলে কতোদিন চিৎকারগুলো ছুটে গেছে ইন্দ্রিয়ের ভেতরে অশুদ্ধ বিশুদ্ধ ভুল