বৃহস্পতিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১০

ভালো কাজ

বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে গিয়ে "মনের মানুষ" ছবিটা দেখে আসছি। গৌতম ঘোষ পরিচালক, দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনার ছবি। অনেক আগে গৌতম ঘোষ পদ্মা নদীর মাঝি বানিয়েছিলেন। দেখে হতাশ হয়েছিলাম। কোন উপন্যাসের লাইন বাই লাইন দৃশ্য রচনা করে জুড়ে দিলেই সেটা চলচ্চিত্র হয়ে যায় না। এইটা গৌতম ঘোষ জানলেও, মানেন না। এদিকে "মনের মানুষ" বইটা পড়া হয় নাই (সুনীল গাঙ্গুলির লেখা), তাই ভাবলাম ছবিটাই দেখে ফেলি। কুষ্টিয়ার ফকির লালন সাঁইয়ের জীবন নিয়ে বানানো ছবি।

লালনের ভূমিকায় প্রসেনজিৎ, লালনের গুরুর ভূমিকায় রাইসুল ইসলাম আসাদ। এখানে গিয়েই বিপত্তি বাঁধলো। এরই মধ্যে লালন হিসেবে আসাদের চেহারা ও অভিনয় মাথায় গেঁথে গিয়েছিলো। সেখানে প্রসেনজিৎকে বসানো খুব কঠিন। আর যেহেতু ওপারের পরিচালক (এবং লেখক) সেহেতু গল্প শুরু হলো লালনের পোর্ট্রেট করছেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর - এই দৃশ্য থেকে। সেখান থেকে ফ্ল্যাশব্যাক। লালনের তরুণ জীবন। বিবাহিত ও সুখী লালন, সরলসোজা, গান গায়, বৈষয়িক তাড়না নাই, গাঁয়ের মোড়ল বা কর্তার ঘোড়ার দেখভালের দায়িত্ব পেলো। দৃশ্যধারণের এই খাপছাড়াভাব দেখে সুনীলের বইটা পড়ার শখ হলো। এখানে কেন এরকম? 'সেইসময়' উপন্যাসে যেমন সুনীল জাম্প-কাট করতেন, সেরকম ভাবে এই বইটাও কি লিখেছেন নাকি? গৌতম ঘোষ কেন এভাবে শুরু করলেন।

ভাবতে ভাবতেই লালনের অসুখ। জলবসন্ত, চিকিৎসাহীন ও নিরাময়হীন। তাই সবাই মিলে গঙ্গায় (পদ্মায়) ভাসিয়ে দিলো। বাঁশের ভেলার ওপর মশারি, শাদা চাদর গায়ে মুমূর্ষু লালনের দেহখানা ভেসে চলছে। ঢেউ ছাড়া চরাচরে কোন শব্দ নাই। এইখানে দৃশ্যের সাথে শব্দের যে মিল, সেটা চমকে দিলো। এখানেই বলে রাখি কারিগরি দিক থেকে ছবিটি দারুণ লেগেছে। লালনের ছবিতে যদি শব্দধারণ ভালো না হতো, তাহলে ভালো লাগতো না। চিত্রগ্রহণের ব্যাপারেও একই কথা, ভোরের কুয়াশামাখা নদীর পাড়, অথবা রাতের চন্দ্রালোকিত কুটির - সবই অদ্ভুত আলো-ছায়া-রহস্যমাখা মনে হয়েছে! লালনের নাম ও জীবনের সাথে যে রহস্যময়তা, সেটা এখানেই ফুটে উঠেছে!

ইন্টারভ্যাল পর্যন্ত জমজমাট ছবি। গান, সুর, অভিনয়। আসাদ-চঞ্চল-পাওলী দাম, তিনজনের চরিত্র খুব চমৎকার লেগেছে। লালনের স্ত্রীর চরিত্রের অভিনেত্রী এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরিত্রও টেনে নিয়ে গেছেন। ডুবিয়ে দিয়েছেন লালনের মায়ের চরিত্রে চম্পা (তার একটা খুব ক্রুশিয়াল দৃশ্যের অতি-অভিনয়ে হলের ভেতরেই লোকজন হাসতে শুরু করলো, অথচ দৃশ্যটা খুবই সিরিয়াস ছিলো), এবং পরে লালনের সেবাদাসী হিসেবে এক অভিনেত্রী। বিশেষ করে পরের জনকে কেন কাস্ট করা হয়েছে তা বুঝলাম না। একেবারেই অভিব্যক্তি নাই!

গৌতম ঘোষের মূল দূর্বলতার জায়গা দেখলাম ক্লাইম্যাক্স এবং ফিনিশিংয়ে। ছবির আমেজ অনেকটাই কেটে গেলো শেষে এসে। তবু কিছু ছবি দেখে এসে যেমন সেই ছবির ভেতরের জীবনধারা নিয়ে আগ্রহ লাগে, একটু গুগল করতে ইচ্ছা করে, একটু জানতে আর পড়তে ইচ্ছা করে, এই ছবিটাও সে'রকমই। গানের মাঝে সবগুলোই ভালো লেগেছে। দুয়েকটা গান শেষে গিয়ে একই থিমের কারণে একটু ধরে আসলেও অসুবিধা নাই। উপরি পাওনা, চঞ্চলের কমেডি। ধীরে ধীরে বাংলা সিনেমার এই ধরনের রোলগুলো তিনি কব্জা করে নিচ্ছেন!

এখন লালনের গানগুলো শুনছি। কিছু কিছু জিনিস অনেকদিন পর শুনলে মন ধুয়ে মুছে যায়। মাঝে হয়তো মনে অনেক শ্রান্তি আর ক্লেশ জমে গেছিলো। সব কেটে যাচ্ছে!

বুধবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১০

এ বিট অফ...

আজকে সারাদিন ভ্যানভ্যানে বৃষ্টি হইছে। আমি সকাল সকাল উঠছি। তারপর থেকে মুড ঠিক করার চেষ্টা করছি। মাঝে মাঝে ঠিক হৈছে, তারপরে আবার বিগড়ায় গেছে। কী করবো, ফুয়েল নাই।
শেষে আমার শেষ সম্বল ইউটিউবে ঢুকলাম। এখানে ভালো ভালো জিনিস পাওয়া যায়। চার্লি বিট মাই ফিঙ্গার, আর ফ্রিকের মতো হাসে এমন দুইটা পিচ্চিকে তো আগেই সবাই দেখছেন। সেগুলোর মতো চিজদের পাইলেই আমি দেখে শুনে রাখি। এরা বেশি স্পেশাল।
এরা ছাড়াও আরো কিছু লোকজন আমার খুব ভালো লাগে। একজন জর্জ কারলিন, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান। এরকম আরেকজন আছে, রাসেল পিটার্স । জর্জ কারলিন অনেক পলিটিক্যাল, সোশ্যাল ট্যাবু আর ইস্যু নিয়ে পঁচায়। রাসেল তার বহুসাংস্কৃতিক ও বহুজাতিক বাস্তবতা নিয়ে পঁচায়। এই সুযোগে আরো কিছু কমেডিয়ানের স্ট্যান্ডআপ দেখা হয়ে গেলো।
তবে এদের সব কিছুর চেয়েও ক্লাসিক হলো ব্রিটিশ কমেডি। হলিউড যতোই স্পেশাল ইফেক্ট দিক আর চেষ্টা করুক না কেন, ব্রিটিশ কমেডির মতো দম ফাটানো এবং পেটে খিল ধরিয়ে দেয়ার মতো কমেডি বানাতে পারবে না। ব্রিটিশ কমেডিগুলোর তেমন চাকচিক্য নাই, প্রিন্টও খারাপ। কিন্তু সংলাপ বা ম্যাটেরিয়ালের দিক থেকে এতো দুর্দান্ত কিছু নাই!

 অনেকে House, M.D. সিরিজের অভিনেতা Hugh Laurie - কে চিনতে পারেন। বেরসিক, কাঠখোট্টা, ড্রাগঅ্যাডিক্ট এরকম ডাক্তার রিয়েল লাইফে থাকলে তাকে সবাই ধরে মাইর দিতো। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানে না যে হিউ লরির অভিনয় জীবনের সেরা কাজ এই হাউসে না। হিউ লরি তার নিজের সেরা অভিনয় দেখিয়েছে ব্রিটিশ কমেডিগুলোতে। ব্ল্যাক অ্যাডার-এর তৃতীয় সীজন থেকে শুরু। আর পুরোদমে হিউ লরির ক্যারিশমা দেখলাম A Bit of Fry & Laurie সিরিজে।


মাত্র দুইজন অভিনেতা - Stephen Fry আর Hugh Laurie। "ইত্যাদি" অনুষ্ঠানে যেমন ছোট ছোট স্কিট দেখায়, ছোট ছোট ঘটনা বা জোকস, এই পুরো অনুষ্ঠানটাই সেরকম নানা অংশে ভরা। একেকবার তারা দুইজন একেক সাজে আসে। সাজের সাথে সাথে মুখের ভাষা আর অ্যাকসেন্ট বদলে যায়। আর বেশিরভাগ অনুষ্ঠান শেষ হয় হিউ লরির একটা করে গান দিয়ে। খুব পপুলার একটা পাঞ্চ লাইন ছিলো - ফ্রাই বলতেন, "Please Mr. Music, will you play?" তখন দেখা যেত এক এক রকম সাজে পিয়ানোর সামনে হিউ, বাজাচ্ছেন তার নিজেরই লেখা কোন গান, অথবা কোন বিখ্যাত গানের রিমেক করে বারোটা বাজাচ্ছেন! আজকে অসংখ্য ছোট ছোট স্কিট না দিয়ে খালি গানগুলো দিলাম। পুরাই বিনোদন!!
America: 
=====================================
Mystery:

 =====================================
Little Girl:

 

মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১০

নতুন বাজার

মোড়ের কোমরের কাছে বেঁকে গেছে। গাড়ির হর্ন আর রিকশাওলাদের ক্যাচাল। শীত শীত আরাম বাতাস। একটু আগেই রোদ ছিলো, এখন মেঘ ঢেকে আছে। আমি বেশ ভেঙে ভেঙে এখানে পৌঁছেছি। পকেটে ভাংতি ছিলো না বেশি। রিকশাভাড়া হিসেব করে করে এলাম। মাঝের রাস্তায় মোড়ের এক পার থেকে রিকশা নিলে এক রেট, আরেক পারে গেলে পাঁচ টাকা কম। তাই হেঁটে পার হইলাম ওই মোড়টা।

তো, মোড়ের পরে মোড়, কোমরের বাঁকগুলোকে অবহেলায় এড়িয়ে এসে, আমি নতুন বাজারে বসে রইলাম। সকাল দশটা বাজে। অনেকটা ঘুরে ঘুরে এসেছি। পথে শীতের বাতাস শার্টের বোতামে আটকে গেছে। তারপর সেগুলোর জট ছাড়াতে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম মোড়টায়। এখানে রিকশা, সিএনজি আর মিশুকের খ্যাপ-স্টেশন। জন প্রতি দশ টাকা গুলশান দুইয়ের মোড়। সব পক্ষ খুশি থাকে এরকম বন্দোবস্তে। একসাথে গিজগিজ করে সিএনজি-মিশুকে উঠে যাচ্ছে মোটা-শুকনা লোকগুলো। ভাড়া করা সিএনজি দেখে দেখে অভ্যস্ত চোখে একটু খটকা লাগে। এখানেও এক সিএনজি নানাজনকে টেনে নিচ্ছে পেটের ভেতর। কোনো একজন যদি একা একা যেতে চায় বনানী, কিংবা মহাখালি, এরা যাবে না। পলিগ্যামি!! টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না!

আমি একটু হেঁটে শীত আমেজটা কাটিয়ে দিতে চেষ্টা করলাম। কাজ হলো না। এখনও একটু পরপর বাতাস দিচ্ছে। মোড়ের ওপর চায়ের দোকানে ব্যানার দিয়ে আড়াল করা। বাতাস ঠেকাচ্ছে। দেখে পদ্মার নৌকার কথা মনে পড়লো, আরিচা ঘাট থেকে নগরবাড়ি ঘাট। পালতোলা নৌকার মতো ফুলে উঠছে এই ব্যানারটা। ব্যানারে ছাত্রলীগের দেয়া কুরবানির হাটের খবর লেখা। আমি কুরবানির হাটকে পিঠে রেখে বসলাম, "মামা, একটা চা করেন", চায়ের দোকানদারের হাতের চামচ নড়তে থাকে। দোকানদারের নাম কেরামত। গালে থুতনিতে অল্প দু'গাছা দাড়ি। গলায় মাফলার, পরনের কাপড় পুরনো এবং শীত মানবে না আর কয়দিন পরেই। "নতুন লিকার বসাইসি, একটু ধাগ কম হইবো", বললেন তিনি, "এখনই খাবেন নাকি আরেকটু পরে দিমু?" আমি বললাম, "ঠিকাছে মামা, পরেই দেন। দশ মিনিট।"

দশ মিনিট পরে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে সামনের ওভারব্রিজটাকে দেখি। দুপাশ দিয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ি, রাস্তার ওপারেও একই রকমের সিঁড়ি। দেখে হঠাৎ মনে হয় এই নতুন বাজারে একটা শীর্ণ লোক বুকডন দিচ্ছে। দুই পাশের ফুটপাতে দুই হাত ছড়িয়ে দিয়েছে, আর পিঠ উঁচু করে রেখেছে, যাতে তলা দিয়ে সারসার বাস-ট্রাক-গাড়ি-রিকশা চলে যেতে পারে! নিজের চিন্তায় নিজেই হেসে উঠলাম। পাশে একজন বিড়ি ফুঁকতেছিলাম। হাসতে হাসতে তার বিড়ির দমবন্ধ গন্ধটাও ভালো লাগলো!

চা শেষ হইলো। পাঁচ টাকা হইছে, মামা। এই নেন রাখেন। আমার পকেটে শেষ পাঁচ টাকার কয়েনটাও দিয়ে দিলাম। এখন হালকা লাগছে। কড়কড়ে দুইটা এক হাজার টাকার নোট আছে। এটা এখন আর কেউ ভাঙিয়ে দিবে না। এক হাজার টাকার নোটের মেরুদণ্ড বাংলাদেশের সব চাইতে শক্ত শিশ্নের চাইতেও শক্ত। [অ্যাঅ্যাই! কেউ আমাকে খারাপ ভাববেন না, প্লিজ। আমি বাংলাদেশির মেরুদণ্ডের সাথে তুলনা করছি না বলে দোষ ধইরেন না। ওটা স্পঞ্জের মতো নরম, মুরগির কচি হাড়ের চাইতেও তুলতুলে। ওর সাথে কি 'অভাঙনযোগ্য' হাজার টাকার নোটের তুলনা করা যায়?]

পৌনে বারোটা বাজে। সূর্য বেশ চড়া। এখন আর শীত লাগছে না। ওম ওম উষ্ণতা। কেরামত ভালো থাকুক। ওভারব্রিজটাও ভালো থাকুক। আমি ফিরে চললাম!

সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১০

দুঃস্বপ্ন

খুব বাজে দুঃস্বপ্ন দেখাটা একটা অভিশাপের মতো। দুঃস্বপ্ন সন্তর্পণে এসেছে। ঘুমিয়ে ছিলাম, আর ঘুমটাও এমন যে টের পাচ্ছিলাম অনেকক্ষণ ধরে অনেক আরামের ঘুম হচ্ছে। ঘরে এই পড়ো পড়ো শীতে হালকা করে ফ্যান ঘুরছে। গায়ে পাতলা কম্বল গায়ে দিয়েছি। বাতাস টের পাচ্ছি, কিন্তু শীত লাগছে না। এই ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ দুঃস্বপ্নটা আক্রমণ করে বসলো। মনে হলো, কেউ বুকের বাঁ পাশে গনগনে লোহার বর্শা গেঁথে দিয়েছে। ফুসফুসের কুঠুরিতে সেই গরম বর্শার ফলা বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিষে জরজর হয়ে আমি দুঃস্বপ্নটা দেখতে থাকি। সেলুলয়েডের মতো একটানা চোখের যামনে বয়ে চলছে। এ খুব অবাক ব্যাপার, সুখস্বপ্নগুলো এতো ভিভিড হয় না। ছেঁড়া ছেঁড়া, খণ্ডদৃশ্যের মতো হয়। ঘুম ভেঙে সেগুলো ঠিক ঠাক জোড়া দেয়া যায় না। মাঝে মিসিং লিংক থাকে অনেক। কিন্তু দুঃস্বপ্নগুলো একদম ডিটেইল। আমার বুকে জমে থাকা বাতাস ফুরিয়ে যেতে থাকে। আমি ঘুমের মধ্যেই ছটফট করি। নিঃশ্বাস নেয়ার চেষ্টা করি। আর আমার শরীর থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাবার জন্য আঁকুপাকু করে। জগদ্দল শরীর। অযথা বেহুদা ক্লেশ। শেষ হয়ে গেলে আমি হালকা হয়ে যেতাম, শালিকের মতো। এই অচকিত ভাবনাটাও গরম তাপে মোমের মতো গলে যায়। দুঃস্বপ্নকে এখন আর স্বপ্ন মনে হচ্ছে না। মনে হতে থাকে এটা বাস্তব। আমার যাপিত জীবন!

আমার চোখ ফেটে জল আসে। আমি বুকের শেষ শ্বাসটুকু ছুঁড়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠি। আমার হাত মুঠো হয়ে ওঠে। আমার গলা ভেঙে যেতে থাকে। আমি চিৎকার করতেই থাকি। কে যেন থাইয়ের কাছে করাত দিয়ে পা কেটে ফেলছে। চিৎকারের শব্দ হারিয়ে যায়। আমার শরীর বেঁকে চুরে যাচ্ছে। চিৎকার দিতে দিতেই আমার ঘুম ভেঙে যায়।

ঘর অন্ধকার।

ফ্যান সরসর সাপের মতো ঘুরছে।

আমার গায়ে পাতলা কম্বল।

আমি খুব জোরে চিৎকার করছিলাম, গলা ভেঙে গেছে।


আমি বেঁচে আছি, কিন্তু আমি মরে গেলেই বেঁচে যেতাম।



এখন এই অবশ্যম্ভাবী দুঃস্বপ্নটা সত্যি হওয়া পর্যন্ত আমি সেটা যাপন করবো।

রবিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১০

পুরোনো ত্রয়ী

সংকট

হাতের উল্টোপিঠে তারাদের ছাপ তৈরির বিষয়টা অস্বস্তিকর; বড়ো বিস্ময়েরও বটে। আমি যদ্দুর জানতাম, ওরা আজকাল এখানে বাসা বাঁধে না। জমি বিক্রি বন্ধ সেই আদ্যিকাল থেকে, যুদ্ধেরও কয়েক বছর আগে হইতে! তখন খোলা প্রান্তরেও তামাবর্ণ মানুষের হাতে উল্কির মতো, কুষ্ঠের মতো, শ্বেতীর মতো তারাবাজি খেলা করতো। তারপর বহুদিন আগে কোন্‌ দুর্ঘটনায় আদিম তারার নির্দেশে মানুষের করতল থেকে মুছে গেলো উল্কিময় কারুকার্য। তারাদের কাছে আমরা হলাম অপাংক্তেয়।

অথচ আমার হাতের পিঠে সেদিন পুড়ে গেলো চামড়ার তল, অপতলে ফুটে উঠলো বিম্বিত নক্ষত্র! যখন কাঠ, খড়, তুষের সম্বল নিয়ে তারকা-নেতা এলেন, পেছনে সারি বেঁধে এলো তারাসকল, আমি খুবই অবাক বিব্রত ঘাম মুছে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। উদোম হাতের পিঠে ছাই হয়ে গেলো সুন্দরবনের মতো মানচিত্র...


***

ভালোবাসা

শীৎকারগুলো দেয়ালে গেঁথে আছে চিত্রশিল্পের মতো
আর তাদের দুজনের মাথা দুটো, দুভাগ করা লেবুর মতো
দুদিকে এলিয়ে পড়ে আছে। তবুও তাদের রমণ বেগ
অমন্দন গতিশীল নিরাবেগ। যান্ত্রিকও কিছুটা, তাদের
ঘুমের ভেতর বিনিময় হয়ে যায় হাত ও পায়ের আঙুল
নিদ্রাতটের জলদস্যুতায়, তারা চুরি করে
একে অপরের মস্তিষ্ক চিরতরে

আর সকালের রোদে দেখা গেলো তাদের মুখের চামড়া খুলে
ঝুলছে অপরজনের চেহারায়।

টেড হিউজের একটি কবিতা অবলম্বনে

***

একটি নিছক আটপৌরে ঘটনা

যারা রাস্তায় থাকে তাদের কাছে আলোবিহীন সড়ক ভূতুড়ে নয়; তেমন একটা। কিন্তু আমরা যারা দালানকোঠায় বাস করি, আমাদের যাপিত জীবনে আঁধার ও বৈকল্য এক সাথে আসে। আজ কয়েকজনকে দাওয়াত করেছিলাম। নিছক অনেকদিন বন্ধুদের সাথে দেখাসাক্ষাত নেই, ফোনে কথা বলে মনের আশ বা প্রাণের সাধ কোনোটাই মিটছে না। নেহাত বাইরের কোন ফাস্টফুড বা হ-য-ব-র-ল রেস্তোরাঁ আমার পছন্দ না বলে সবাইকে বাসায় ডেকেছি। সবাই বলতে ওরা পাঁচজন, এখন যারা আমার ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছে খুব। তারা হাসি ঠাট্টায় জমে উঠতে উঠতেই হুট করে ইলেকট্রিসিটি চলে গেলো। ধুপ করে সব কালো। চোখ সয়ে এলে আবছা একটা আলো চোখে পড়ে। নীলচে-কালচে আলোতে দেখি বিছানা-চেয়ার মিলিয়ে ওরা চারজন অনাহূত অন্ধকারে কথা থামিয়ে দিয়েছে।

আড্ডা থিতিয়ে এলে জায়গা বা বিষয়বদল দরকার। আমি সফল হোস্ট হতে চাওয়ার লোভে ভুগছি। ভাবছি আজকের গেট-টুগেদারের গপ্পো যদি আগামি এক সপ্তা না চলে, তাহলে আমার এই উইক-এন্ডটাই মাটি! ফেসবুকে ছবি আর নোটিফিকেশনের ঝড় ওঠা চাই। কমেন্টের ফুলঝুরি আর ওয়াল পোস্ট চাই। কিন্তু ছবি তুলবো কীভাবে, কারেন্টই তো নেই! ভেবেই মেজাজ ফট্টিনাইন হয়ে যাচ্ছিলো। তারপর নিজেকে সামলে নিলাম, হোস্ট হয়ে অন্ধকারের মাঝে ঘোস্ট হওয়ার দরকার নেই। বরং জায়গা বদলে দেই। "অ্যাই, তোরা কি ছাদে যাবি?", বলামাত্রই ওরা শশব্যস্তে উঠে দাঁড়ালো। হুড়হুড়িয়ে সবাই ছাদে উঠে গেলো। তেরো তলার উপরে ছাদ। একদিকে এরকমই লম্বা একটা হাইরাইজ ছাড়া বাকি তিনদিকে খালি, মিষ্টি বাতাস বইছে, বসন্ত-সমীরণ।

আমার বন্ধুরা অবশ্য বাতাস উপভোগ করে না। তারা গুমোট বিকল লোডশেডিং থেকে মুক্ত হয়েই খুশি। সবাই মিলে ছাদের রেলিংয়ের দিকে ছুটে গেলো। নিচে তাকিয়ে একজন গাড়িঘোড়া দেখছে। মানুষগুলো পিঁপড়ের মতো। আমাদের বন্ধুদের মাঝে যে সবচেয়ে বিটলা, সে থুক করে একদলা থুতু ফেললো। আমরা 'ইয়াক', 'ঈঊ' করে উঠলাম, "এ কী ধরনের অসভ্যতা! ম্যানারলেস! ক্রাস!" থুতুর মতোই ওর দিকে কতোগুলো গালি ছুঁড়লাম আমরা। ও নির্বিকার হাসলো। যেন এই গালিগুলো আমাদের দিয়ে বলিয়ে নিতেই সে এমনটা করেছে। ওর কারণেই হোক, অথবা নিচের গাড়িমানুষের লিলিপুট ভার্সন একঘেঁয়ে ওঠার কারণেই হোক, আমরা রেলিং থেকে সরে এলাম। রেলিংয়ে হেলান দিয়ে ছাদের কুসুমগরম মেঝেতে বসে পড়লাম সবাই। একটু আগেই বিকেল মরে জেগে ওঠা সন্ধ্যাটা মরে গেছে। চারদিকে আজান তোলা শেষ। এখন খালি রাস্তার আবছা কোলাহল আর নিঃস্তব্ধতা। আমাদের পাঁচটে দেহবিহীন আত্মা তেরো তলার ওপর চৌদ্দ তলা ছাদ থেকে বার বার লাফিয়ে নিচে পড়ে যাবার কসরত করছে।


***

শুক্রবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১০

ওন্দস্কান

মাথা ভার ভার করছে সারাদিন ধরে। অনেক কাজ করছি সারাদিন ধরে। বেশিরভাগ সময় কম্পিউটারের সামনে যারা কাটান, হঠাৎ করে পুরো একটা দিন বা সারা সপ্তাহ ইন্টারনেট আর কম্পিউটার না ধরলে তাদের কেমন লাগবে? ভাবছিলাম। কিছু কিছু ব্যাপার যেমন কল্পনাতেও আসে না, ফ্যান্টাসির চাইতেও বেশি অসম্ভব বলে মনে হয়, এই ব্যাপারটাও মনে হয় সেরকম! আমি প্রায় দশ বছর ধরে নিজের কম্পিউটার ব্যবহার করছি, হঠাৎ করে এক দিন বা দুই দিন কম্পিউটার সচল না পেলে মাথার সার্কিটে কোন একটা 'গিয়াঞ্জাম' লেগে যায় (আগে গিট্টু লাগতো, গিট্টুর পরের দশা হলো গেরো, আর গিয়াঞ্জাম হলো শেষ অবস্থা!)। মনে হতে থাকে একটা হাত নাই; অথবা পেটের ভেতরে পাকস্থলী নাই - খাবার খাইলে সরাসরি তলপেটে চলে যাচ্ছে। এই ধরনের উদ্ভট শারীরিক অত্যাচার সহ্য করতে করতে মনে হতে থাকে যে আমি বোধহয় আসক্ত। নেশাগ্রস্ত।

অনেক আগে একটা ছবি দেখেছিলাম মনিটরের ভেতরে মাথা ম্যাট্রিক্সের মতো গলে গলে ঢুকে যাচ্ছে আর বাকি শরীরটা টার্মিনেটর টু-এর মতো এলুমিনিয়ামের মতো গলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে তেমন লাগে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এটা যে অস্বাভাবিক বা সমস্যা, তা বুঝতে পারি না। স্বাভাবিক মনে হয়। অভ্যস্ত হলে অপ্রাকৃতিক আচরণও ন্যায্য মনে হয়।



কিছু ছবি দেখার পরে অতীতের কথা মনে পড়ে। আমার স্বল্পায়ু অতীত। সুইডেনের ছবি ওন্দস্কান (Ondskan), মানে হলো Evil, শয়তান। ছবিটা যার কাছ থেকে নিয়েছি, সে বলেছিলো যে ক্যাডেট কলেজের কথা মনে পড়বে, দেখেন, মজা পাবেন (সে নিজেও এক্স-ক্যাডেট)। দেখা শুরু করার ২০ মিনিট পরে একটু থামলাম। একটা দৃশ্য দেখালো, বোর্ডিং হাউজে আসার পরে রুমমেটের সাথে কথোপকথন। রুমমেট বেশ পড়ুয়া, ভালো ছাত্র, তবে খেলাধুলায় ভালো না, একটু পৃথুল শরীরের। যে সিনিয়র প্রিফেক্ট নতুন ছেলেটাকে নিয়ে এসেছে, সে এই ব্যাপারটা নিয়ে একটু হালকা ঝাড়ি দিয়ে গেলো। নতুন ছেলেটাই গল্পের মূল নায়ক, রাগী, বয়ঃসন্ধির রাগ, পেটা শরীর, সাঁতার কাটতে পছন্দ করে। আমি থেমে গেলাম কারণ আমি নিজেও খুব একটা ভালো ছিলাম না খেলাধুলায়। খেলতাম, খুব এনজয় করেই খেলেছি দুই তিন বছর। কিন্তু যতো সিনিয়র হয়ে গেছি ততোই খেলাধুলার দিক থেকে মন সরে গিয়েছে। খুব প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমার কখনই ভালো লাগে না। ওপেন চ্যালেঞ্জ, জিগীষার যে খাপ-খোলা-রূপ খেলার মাঠে ফুটে ওঠে, সেটা আমাকে কিছুটা সন্ত্রস্ত করে।

ছবিটা মূলত এই বোর্ডিংয়ের জীবন-যাপন নিয়ে নয়। বরং আরো অনেক গভীর মনস্তত্ত্বে গিয়ে নাড়া দিয়েছে। আর এখন যদি ব্যাখ্যা করতে যাই, পারবো না। এতোটাই সূক্ষ্ণ-উদ্দীপন, যে ভাষায় প্রকাশের ক্ষমতা নাই। ছবিটার নামে যে শয়তানের কথা বলেছে, সেটা আমাদের ভেতরের পাশবিকতা। হিংস্র জানোয়ারের মতো আমরা মাঝে মাঝে দাঁত দিয়ে, নখ দিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে চাই। সামনে পরা মানুষটাকে আর মানুষ বলে মনে করি না। ভায়োলেন্স আসলে খুবই "সাপেক্ষ" আচরণ। যা কিনা পরিবেশ, মুহূর্ত এবং আরো অনেক প্রভাবকের ওপর নির্ভর করে। গিয়ারের দাঁতের মতো, অনেকগুলো ছোটবড় চাকার দাঁত মিলে গেলে ঘোটঘোট করে ঘুরতে থাকে ভায়োলেন্সের চাকা। এর সাথে যুক্ত হয় মব-ফিয়ার, দলগত-হিংস্রতা। কোন র‍্যাশনাল বা ক্রিটিকাল সমালোচনা এখানে তুচ্ছ।

আরেকটা জিনিস খুব ঘটতে দেখেছি, যে কোন বদ্ধ-আবাসিক ব্যবস্থায়। সেটা হলো ব্যবস্থার নিজস্ব একটা চালু 'সিস্টেম' থাকে। এটা অনেকটাই সপ্রাণ। আর প্রাণের বৈশিষ্ট্যই হলো বিবর্তন। সিস্টেম ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়। অনেক বুঝে শুনে নিয়মকানুন বানালেও নিজে নিজে সিস্টেমটা মানুষগুলোকে দিয়ে আরেকটা আলাদা নিয়মকানুনের ইশতেহার বানিয়ে ফেলে। যেন সে বুঝতে পারছে কোনভাবে চললে, কোন নিয়মে চালালে সবচেয়ে স্থিতিশীল সিস্টেম তৈরি করা যাবে। যতোই 'রেড বুক' বা 'নীতিমালা' বানাই না কেন, শেষতক সেই সিস্টেমের-বানানো-নিয়মটাই টিকে থাকবে। এটা যেন নিজেই নিজের জন্য সীমানা তৈরি করে!

আর মানুষ খুবই ফালতু সৃষ্টি। কারণ অধিকাংশ মানুষ এই সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। যারা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকারে থাকেন, তারাও পারেন না। সিস্টেমের হাতে তারাও এক একটা ঘুঁটি। এখানেও লজিক্যাল কোন ডিডাকশন নাই। মেনে চলো। সুখী হবে। এই যে 'সুখ', এটাও সিস্টেম বুঝিয়ে দিচ্ছে। ঠিক ওই ম্যাট্রিক্সের মতোন!

যাস্‌সালা, ঘুরে ফিরে সেই তো গোড়ায় ফিরে এলুম! এই কী গেরো! ( আশার কথা, গিয়াঞ্জাম কেটে 'গেরো'তে এসেছি, গিট্টুতেও চলে আসতে পারবো নিশ্চিত!)

বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১০

স্মৃতি ও বিস্মৃতি

ডিসেম্বর এলে আস্তে আস্তে শীত বাড়ে। আমার এই শীতকাল খুব মেলাঙ্কলিক লাগে। যে স্মৃতিগুলোকে আগের জন্মের বলে মনে হয়, সেই কৈশোরের সময়টা মনে পড়তে থাকে। সেই সময়ের 'আমি'কে নিজের সত্ত্বা বলতে চিনতে পারি না। অচেনা মানুষের সাথে পরিচয়ে আমি বরাবরই অমিশুক, সন্তর্পণ। তাই সহজ হতে পারি না, চুপচাপ তার কাজকর্ম দেখি। কাজকর্ম দেখি মানে সেই সময়ে 'আমি' কি কি করতাম সেগুলো মনে করার চেষ্টা করি। জীবন যাপন করা তখনও অনেক কঠিন মনে হতো। অথচ তখন যদি জানতাম, এখনের জীবন এমন, এই রূপ, তাহলে হয়তো সেই কষ্টগুলো আর কষ্ট বলে গায়েই লাগতো না!

শীতের সময়ে সম্ভবত আমার প্রথম স্মৃতি তৈরি হয়েছিলো। দুইদিন আগে আমার এক বন্ধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলো, জন্মের পরে প্রথম স্মৃতি কোনটা, কতোদূর পষ্টভাবে মনে করা যায়? বন্ধুটি বেশ শিল্পমনা, রুচিশীল। এমনিতে ফেসবুকে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা কথাবার্তাকে তেমন আমল দেই না। তবে তখন ভাবনা যোগালো, মনে করার চেষ্টা করলাম। প্রথম স্মৃতি। বোনের জন্ম মনে আছে, সেটার বয়স চার। তার আগে? ময়মনসিংহে একতলা বাসায় থাকতাম, বাসার সামনে ইট-বিছানো উঠান ছিলো, পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সেই পাঁচিল ঘেঁষে আকাশছোঁয়া গাছ ছিলো। বাসার সামনের বারান্দা পার হলে বাম কোণে কলতলা ছিলো, টিউবওয়েল ছিলো কিন্তু আমি ওটা চাপতে পারতাম না। নানী ছিলো, ওটাকে চাপকল বলতেন। আমি তাঁর সাদা আঁচল আঁকড়ে ধরে হেঁটে বেড়াতাম।

এগুলো সবই তরতাজা স্মৃতি। ময়মনসিংহের বাসাটায়, আমি যে দেয়াল ভর্তি করে অ আ ক খ লিখতাম, সেটাও চার বছরের স্মৃতি। আরো পিছে যাই। ঝাপসা ঝাপসা লাগে। এর আগে সাভারে ছিলাম, স্মৃতিসৌধে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ঝাপসা খোপ খোপ স্মৃতিসৌধ, ভয় পেয়েছিলাম। মোটেই ছবির মতো সুন্দর বাঁকানো সুউচ্চ মনে হয় নি। আতঙ্কের স্মৃতি খুব সহজে ছাপ ফেলে। আমি বোধহয় স্মৃতিসৌধের ভেতরে ঢুকে কেঁদে ফেলেছিলাম ভয়ে। তারপরে বেরোনোর পরে সামনের ঝিলে শাপলা দেখে একটু থেমেছি, শান্ত হয়েছি। দাদী ছিলেন সাথেই। তবে তার কথা মনে নেই, ছবি দেখে বুঝি এখন।

সাভারের আগে ঢাকায় থাকতাম, সেগুলো ধুয়ে মুছে গেছে। মানুষের এই স্মৃতিগুলো থাকে না কেন? আমার ভাগ্নে আরাভ বড়ো হচ্ছে। বাসায় আমরা মামা-খালা-চাচারা এলেই তাকে নিয়ে নানা আদর-সোহাগ। এগুলোর অমূল্যতা সে কোনোদিন মনে রাখতে পারবে না! আমি জানি আজ থেকে পনেরো বছর পরে তার সাথে আমার এই যোগাযোগ, এই নিবিড়তা থাকবে না। তখন হয়তো এই স্মৃতিগুলো পেলে তার খুব ভালো লাগতো!

জর্নাল জিনিসটা চমৎকার। রোজ রোজ ভাবনার ভার ক্লান্ত করে। আজকের ক্লান্তি একটু কমে গেলো। এখন থেকে লিখবো। অনেক অনেক শব্দ, যেগুলো আদতে একদমই মূল্যহীন! 

মঙ্গলবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১০

এলোমেলো ...

বনানী থেকে ফার্মগেইট হয়ে কাঁটাবনে মাত্র বিশ মিনিটে পৌঁছে গেলে সন্দেহ হয়ঃ ঘড়ি বিকল হয়েছে, অথবা এ শহরে মৃতদের বসবাস। অযুত মাল্টিভার্সের কোনো একটায় হয়তো এটা সম্ভব হতেও পারে। কিন্তু আমি যে শহরে থাকি, সেখানে পথেই আনন্দ!


টুকরো জিনিসগুলোর জন্যে মায়া হয়। অনেক বছর ধরে ওরা আমার সাথে আছে। দিনে দিনে ক্ষয়ে গেছে, সময় খুবলে খুবলে নিয়ে গেছে শরীর-মহার্ঘ্য। আমি কেবল খোলনলচে আগলে রেখেছি - পুরাতন স্মৃতির মতো। টুকরো জিনিসগুলোর ফিডেলিটির কোনো দাম দেয় না কেউ।


চাঁদ পৃথিবীর একটি উপগ্রহ। কোন্‌ কালে পৃথিবীর উদর থেকে ছিটকে গিয়ে জন্মেছে, নাড়ী কেটেছে ভ্যাকুয়াম। তারপরে মায়ের নাড়ীর টানে ঘুরছে। মাঝে মাঝে লুকিয়ে পড়ে, তবে মায়ের চোখ ফাঁকি দিতে পারে না।


মানুষ স্বভাবতই স্ক্র্যুড-আপ। আমি, তুমি, সে, তারা, আমরা, ও, ওরা, তারা, উনি, আপনি, উনারা, আপনারা। সব সর্বনাম বিশিষ্টজন নামসর্বস্ব হলেও, তারা সবাই মূলত স্ক্র্যুড-আপ। আমরা খালি ভড়ঙ আর ভান ধরি, মুখোশ পরি, পরিহাস্যের যাপনকাল।


সেদিন কম্পুখানা মারা গেলো। পাঁচশো গিগাবাইটের স্মৃতি মুছে গেলো এক মুহূর্তেই। জমে থাকা কথাগুলো, চিঠিগুলো, ছবি ও তোমার হাতে ধরে তিরতিরে প্রদীপ - মুছে গেলো। হারিয়ে গেলো খুনসুটির বছর, কান্নার দুইশ বিনিদ্র রাত। তার সাথে চলে গেলো জমিয়ে তোলা সবকিছুই।


সুঁইয়ের ছ্যাদায় সুতো ভরার মতো জীবনের এক ফুটো দিয়ে সব ঘটনা-রটনা পুরে দেয়ার চেষ্টা করছি। ঘটনাগুলোর বেখাপ্পা গড়নের কারণে বারবার হড়কে যাচ্ছে, ঠিকঠাক ঢুকছে না। মাঝে মাঝে করুণ রস জিবে করে ওগুলোকে ভিজিয়ে দিচ্ছি, নরম করে দিচ্ছি। তারপর ক্রুদ্ধ উৎকণ্ঠা, এবারে নিশ্চয়ই জীবন গুছিয়ে যাবে, মৃত্যুর আগেই জিতে যাবো শ্বাসরুদ্ধ।


এভাবে হয় না জেনেও ছেলেটা চেষ্টা করছে। চারপাশে অনেকে হা হা হা হা করে হাসছে তার ব্যর্থতায়। কিন্তু তারা খেয়াল করছে না এই সব ব্যর্থতা এক বিশালকায় স্তুপ তৈরি করে ফেলছে। দূর থেকে দেখলে সেটা পাহাড় বলে বিভ্রম হয়।

শনিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১০

বোদলেয়ার ও মানিকের সাথে টুকরো আলাপ...

যতো প্রযুক্তিই আসুক আর বাংলাদেশে বাস করে যতোই ডিজিটাল হয়ে উঠি না কেন, সেই ছাপার অক্ষরের বইয়ের কাছে ফিরতেই হয়। সেদিন খোলামকুচির মতো বিনা পয়সায় পাওয়া এক বিকালে বেশ মোটা আর গরম মানিব্যাগ নিয়ে বইয়ের দোকানে ঢুকেছি। যে নেশায় ডিভিডি কিনি, তার চেয়েও অবাধে বই কিনতে ইচ্ছা হলো। দুই হাতে বইলে টনটন করে য়্যাতো গাদা বই কিনে আনলাম।

তাদের সাথে উল্টেপাল্টে কথা হয়। এক টানা কোনোটাই বেশি সময় পড়তে পারি না, অন্যজন বেশ লাস্যময়ী 'লুক' দেয়, 'হিন্ট' দেয়। তাই বই থেকে বইয়ে ভাসি। ছাপার অক্ষরগুলো বালিশের সাথে লেপ্টে যায়, আমার সাথেই রাত ফুরোলে ঘুমায়।

বোদলেয়ারের "ক্লেদজ কুসুম" পড়েছিলাম যৌবনের শুরুতে, টগবগে রক্তে আগুন আর মদ ঢুকে গিয়েছিলো কবিতার ছদ্মবেশে। আর এতোদিন পরে হাতে পড়লো "প্যারিস স্‌প্লীন"। বিষণ্ণ কবির মুক্তগদ্য, তথা গদ্য কবিতা। উপমা আর দৃশ্যকল্পে ঠাসা, ছাড়া ছাড়া বুনোটের বাক্য দিয়ে এক একটা লেখা। অনুবাদ পশ্চিম বঙ্গীয়, এবং বঙ্গদেশের বাজে অনুবাদের গৌরব বজায় রেখে এক্কেবারে যাচ্ছে তাই। পড়তে পড়তে ফরাসি ভাষা না জানার আফসোস কামড়ে কামড়ে ধরলো, শেষে ইংরেজি অনুবাদগুলো পড়লাম। বাংলা অনুবাদকারীকে শাপশাপান্ত করতে করতে অগত্যা রস খেলাম অন্যের হাতে, ভিন ভাষায়! তবে বোদলেয়ার-পাঠের আনন্দে এই ভাষা-পথের দূরত্বটাকে পাত্তা দিলাম না।

বোদলেয়্যারের সাথে বাতচিতে মজে আছি, এমন সময় ওপাশে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পর্দার আড়াল থেকে ডাক দিলেন। "অপ্রকাশিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়" বইটা কিনেছি। ডায়েরি - চিঠির যে জঞ্জাল মানিক ফেলে রেখে গেছেন, তার মাঝে নাক ডুবিয়ে দিলাম। বিয়িং জন ম্যালকোভিচের মতো মনে হলো নিজেকে। ডায়েরি পড়তে পড়তে হোঁচট খেতে হয়, দিন পরম্পরা নেই, বিষয় পরম্পরা নেই, গল্পের প্লটের পরেই বাজারের ফর্দ, তার পরেই ডাক্তারের কাছ থেকে 'কিনতে হবে' ওষুধের লিস্টি, পরের পাতাতেই তিন বছর পরের ঘটনা লিখে রাখা (সেদিন বোধহয় ধর্মঘট হয়েছিলো)! মানিকের লেখার সাথে পরিচয় প্রায় দশ বছর, কিন্তু এখন যেন আরেক মানুষকে চিনলাম। রক্তমাংসে গড়া, জ্বল জ্বল করছেন, কষ্ট পাচ্ছেন, রোগে ভুগছেন, খকখক করে কাশছেন, ধুতির খুটে চশমা মুছছেন। আবার এসবের মধ্যেই দুর্দান্ত কোনো গল্পের প্লট লিখে রাখছেন তিন চার বাক্যে!! সুপারম্যান-ক্লার্ক কেন্ট, একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ!!

বোদলেয়ার ততোক্ষণে রুষ্ট কিছুটা। ডেকে নিয়ে এক চোট বকলেন। তারপরে নিচের লেখাটা পড়লাম। থমকে গেলাম মানুষের বর্ণনায় - - - -

Le Chien et le Flacon
"— আমার সুন্দর সারমেয়, আমার কোমল কুকুর, আমার প্রিয় কুতুয়া, এগিয়ে এসে শোঁকো তো, শহরের শ্রেষ্ঠ আতরও'লার কাছ থেকে কেনা এই অপূর্ব আতর!"
কুকুরটা খুব লেজ নাচিয়ে এগিয়ে এলো, মনে হয় আদতে এটা এই অবলা প্রাণীদের স্মিত হাসি আর বক্রোষ্ঠীর প্রকাশ, কৌতূহলভরে এগিয়ে এসে ওর ভেজা নাকটা ডুবিয়ে দিল আতরদানির খোলা মুখে, তারপর হঠাৎই ভয় পেয়ে পিছিয়ে গিয়ে আমার দিকে চেয়ে ঘেউঘেউ করে উঠলো, যেনো নিন্দা করছে।
"— ওরে ও হতভাগা কুত্তা! তোকে যদি আমি একদলা বিষ্ঠা দিতাম তবে তো তুই মহানন্দে শুঁকতি, হয়তো গিলেও নিতি, তুই এমনই আমার বিষণ্ণ জীবনের অযোগ্য সঙ্গী। তুই ঠিক ভিড়ের মানুষগুলোর মতোন, যাদের কোন সুগন্ধি দিতে নেই, তাতে ওরা অতিষ্ঠ হয়, ওদের দিতে হয় বাছাই করা গু।"

মূল লেখা


আমি নিজেও ভিড়ের মানুষ। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে কুকুরের মতো আমরা একে অপরের বগলে-ঘাড়ে ঘামের গন্ধ নিই। ওটাই আমাদের সয়। ফরাসি সৌরভে নাক জ্বালাপোড়া করে।

বোদলেয়ারের কথা শুনে মানিকও তার চশমা ঠিক ঠাক করে গলা খাকারি দিলেন। হাট করে খুলে গেলো নববর্ষের পাতা, ১৯৪৯ সালের, আজ থেকে ৬১ বছর আগের পহেলা জানুয়ারি...


১ জানুয়ারি, ১৯৪৯, শনিবার

এবারও কি সুরুতেই শেষ হবে? দেখা যাক। ডায়েরি রাখতে পারি না কেন? বোধ হয় এই ধারণা থেকে গেছে বলে যে ডায়েরি মানেই নিছক ব্যক্তিগত কথা! কয়েকদিন লেখার পর আর উৎসাহ পাই না।
ট্রামের প্রথম শ্রেণীর ভাড়া এক পয়সা বাড়লো! যাত্রীরা চটেছে মনে হলো না। বেশ খানিকটা হাল্‌কা ভাবেই বৃদ্ধিটা গ্রহণ করেছে। বরং যাত্রীদের এই উদাসীন ভাবে কণ্ডাক্টররা ক্ষুব্ধ — অশ্রদ্ধার সুরে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য শুনলাম দু'একটা, ভাবটা এইঃ কিছু হবে না এদের দ্বারা! মর তোমরা — আমাদের কি! ট্রাম ধর্মঘট ফেঁসে যাবার পর যাত্রীদের এভাবে ভাড়া বৃদ্ধি মেনে নেয়ার ফলে সংগ্রামী ট্রাম কর্মীদের এইরকম মনোভাবই স্বাভাবিক।
আসলে, বাবু যাত্রীদের তলিয়ে হিসার করা নেই — একবার টিকিট কাটতে মোটে এক পয়সা — আজকাল একটা পয়সা সামান্য! এই এক একটা পয়সা থেকে কোম্পানী যে গলা কেটে কতো মোটা লাভ করবে সেটা খেয়ালে আসে না। মনে পড়লেও গ্রাহ্য নেই — ভদ্রলোক তো — নিজের কথাই বড়োঃ আমাকে তো মোটে একটা করে পয়সা দিতে হচ্ছে — মরুক গে যাক! নীতিটা বড়ো নয় — অন্যায় করে একটা পয়সা কেউ আদায় করলে সেটা সহ্য করাও যে কতো বড়ো অন্যায় সে ধারণা নেই। ট্রামে ভীষণ ভীড়!

---০---


মানিক ঠিক ধরেছেন। ধ্বজভঙ্গ মধ্যবিত্তের নীতিবোধ দিনে দিনে আরো সুচারু এবং চালাক হয়ে গেছে। এখন আমরা নীতি নামক বস্তুটিকে জাদুঘরে তুলে রেখে দিয়েছি। ওটাতে তেল দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়, মাঝে মাঝে সপ্তা-এন্ডে জাদুঘরে ঘুরতে গেলে ওটা শিশুদের দেখিয়ে বিস্মিত করে দিই আমরা বয়োজ্যেষ্ঠ মধ্যবিত্তেরা।




মানুষে মানুষে মিল বা অমিল নিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ও চিন্তা বরাবরই ভিন্ন। সেরকম একটা গল্পের প্লট লিখে রেখেছেন, সময়াভাবে হয়তো লিখে শেষ করেন নি, বা করতে পারেন নি। প্লটঃ


গল্পের প্লটঃ বিশ্বাসী নির্ব্বিকার পূজারী — কিছুতেই বিচলিত নন — সন্তানের মৃত্যুতেও নয় — ঈশ্বর অবিশ্বাসী অন্যজন ধর্ম্মের কোন ব্যাপারে বিচলিত নয় — বিগ্রহ চুরি যাওয়ায় প্রথম জনের শোক — সন্তানের মরণে দ্বিতীয় জনের শোক — দুজনের শোক একরকম —


---০---


ডটডটঃ ভাবছি, বোদলেয়ার আর মানিক এই যুগে ব্লগ লিখলে কেমন বেসামাল অবস্থা হইতো?!

বৃহস্পতিবার, ১১ নভেম্বর, ২০১০

নগরাত্মিক


আমি যে শহরে বাস করি, সেখানে ফুটপাতে প্রায়ই পাগল পাওয়া যায়। আপনি যদি ভাবেন এটা উল্লেখযোগ্য কোন বিষয়ই নয়, তবে আপনি ভুল করবেন। পৃথিবীর আর কোথাও এমন বৈচিত্র্যময়, উদ্ভিন্ন পাগল আপনি ফুটপাতে ফুটপাতে বিজ্ঞাপিত হতে দেখবেন না। পৃথিবীর পথেঘাটে এভাবে তাদেরকে ছেড়ে রাখা হয় না। তারা মানব প্রজাতির অমূল্য সম্পদ, তাই তাদেরকে কড়া রক্ষণাবেক্ষণে রাখা হয়। প্রজাতিটির বর্তমান চালু নমুনাগুলো চায় না তাদের এই উন্নত জেনেটিক্স থেকে আরেকটি নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হোক। তাই তারা জননরোধী হয়ে উঠেছে, পাগলের মস্তিষ্কের জিন যেত প্রবাহিত হতে না পারে সকল পাগল-জরায়ু এবং অপাগল-জরায়ুতে, এজন্য তারা পাগলদের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখে।

সে যাক গে, যা বলছিলাম, আমার শহরে এমন কোন সতর্কতা নেয়া হয় নি। ভবিষ্যতেও হবেও না, মেয়রসাহেব সেদিন বললেন। তাই এখানে দেদারসে পাগল ঘুরে বেড়ায় রাস্তাঘাটে। বিভিন্ন আইল্যান্ডগুলোতে তারা ছাপড়া ঘর তুলবে কয়েক বছরের মধ্যেই - এমন চালু গুজব তাই ফুটপাত থেকে ঘোর তপ্ত বাতাসে মিশে পাক খাচ্ছে আজকাল। আমি বেশ পরিপাটি হয়ে রাস্তায় বেরুলে টের পাই বাতাসভর্তি গুজবগুলো আমার গালে ঠাশ ঠাশ করে চড় মারছে। মাঝে মাঝে আমাকে ল্যাঙ মেরে ফেলে দেয়ার চেষ্টাও করে, আমি সতর্ক থাকি। কিন্তু আমার শহরের মানুষগুলো তেমন একটা সতর্ক না, তারা প্রায়ই ল্যাঙ খেয়ে আছাড় খায় ফুটপাতের ওপর। অনেকে হন হন করে হাঁটার সময়ে ভুল করে, উড়ে গিয়ে পড়ে রাস্তার মাঝখানে। তখন কোনো এক পাগল চালক বিনা দ্বিধায় গাড়ির চাকাটা ওই মানুষটার পেটের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেয়। ভগ্ন পেট নিয়ে মানুষটা ল্যালব্যাল করে উঠে দাঁড়ালেও বেশিদিন টিকতে পারে না। আমরা অনেকে এই দৃশ্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলি, আরেকটা জননাঙ্গ কমে গেলো!

এর পরে আছে আরো নানারকমের বিপদ, আর বলবেন না। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় খালি ফুটপাতেই পাগল পাওয়া যায়, কিন্তু আসলে এই সব পাগলের পাগলামি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়েছে। এরা আমাদের দূর্বলতা বুঝে গেছে। বুঝে গেছে যে আমরা বেশ আত্মবিশ্বাসী। স্যুট টাই পরে আমাদের বুক গর্ব ও টাকার গরমে ফুলে ফুলে উঠছে। প্রতিদিন রাতে আমাদের বেশ ভালো জননকার্য এবং ঘুম মিলছে, তাই আমরা পরদিন সকাল সকাল জগিং করতে পারি। শরীরটাকে ফিট রাখতে আমরা কোনো ছাড় দেই না। তারপরে ঘরে ফিরে ফ্রেশ কমলার জ্যুস খাই আমরা। তারপরে সানস্ক্রিন মেখেটেখে ফিটফাট হয়ে বেরিয়ে পড়ি। পাগলের এতোকিছু কপালে জুটে না, তাই তারা তক্কে তক্কে জ্বলতে থাকে। হিংসাও করে আমাদের, ঈর্ষাও করে আমাদের। এই হিংসা, ঈর্ষা, জিঘাংসা মিলেমিশে একটা খিচুড়ি-ক্ষোভ তৈরি হয় তাদের। তারা মাঝে মাঝে আমাদেরকে ওভারব্রিজের ওপর থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। গাড়ি চালানোর সময়ে আমরা একটু বেখেয়াল হলেই এক্সেলেটর চেপে ধরে জোর করে আমাদের গাড়ি-দূর্ঘটনা ঘটায়। এরকম ঘটনা সারাদিন ক্রমশ বেড়েই চলেছে। তাই তো, শহরের বিখ্যাত দৈনিকটির পাতার পর পাতা ভরে থাকে এইসব খবরে। আমরা যারা ধাক্কা খাইনি, বা গাড়ি চালানোর সময়ে দূর্ঘটনায় পড়িনি, তারা আজকাল জগিং করে এসেই খবরের কাগজ ওল্টাই। ভয়ে আমাদের পেটের নাড়িভূঁড়ি সেঁধিয়ে যায়। ওই লোকটা বা সেই লোকটার জায়গায় আমিও থাকতে পারতাম, এটা ভেবে আমরা ভয় পাই।

আমাদের মাঝে আমি সহ অনেকেই এই খবর কাগজ পড়ার কাজটা টয়লেটে সারি। এই শুনুন, নাক সিঁটকাবেন না। প্রাতঃকালীন কর্মটিকে অবহেলা করবেন না। নিষ্কাশ না হলে খাওয়া দাওয়া ভালো হয় না, জানেন? নিয়মিত সেই কর্মটির সুবিধা করতে খবরের কাগজ বেশ উপাদেয় প্রভাবক। এটা আমাদের বৃহদান্ত্রকে ভয় পাইয়ে দেয়, ওই যে বলছিলাম - নাড়িভূঁড়ি সেঁধিয়ে যাওয়া, সেজন্যেই তো আমরা সুস্থ থাকতে পারি। ধাক্কা খেয়ে তিন তলা উঁচু ওভারব্রিজ থেকে পড়ে যাওয়া মানুষ বা রাস্তার ফুটপাতের পাশে দুমড়ে মুচড়ে থাকা টয়োটা গাড়ির চালকের জীবন আমাদের কাছে ইউসুফগুলের ভূষি হয়ে উঠেছে ইদানিং। আমরা খুশি হই, কিন্তু এটা ভুলে যাই যে পাগলেরা ধীরে ধীরে জিতে যাচ্ছে। কে বলেছে, "সহিংসতা নিরুপায়ের শেষ অস্ত্র"? আমি তো দেখছি, পাগলেরা সহিংসতার পিঠে লাগাম দিয়ে দিব্যি আমাদের কোণঠাসা করে ফেলছে।

আর গত কিছুদিন ধরে নতুন পদ্ধতি শুরু করেছে চালাক পাগল-গোষ্ঠী। রক্তারক্তির ঝামেলায় না গিয়ে তারা এখন ঢাকা শহরের আনাচে কানাচে ছিনতাই শুরু করেছে। যাবার সময়ে ওয়ালেটের পাশাপাশি তারা আমাদের সকল জরুরি কাগজ, আর গোপন খবর নিয়ে চলে যাচ্ছে। আমরা এমন দুয়েকটা বিছিন্ন ঘটনায় খুব একটা বিচলিত হই নি। উটকো সন্ত্রাস ভেবে উড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু একদিন হুট করে দেখা গেলো, ছিনতাই হওয়া লোকটা পাগলের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম (এখানে তার পরিচয় প্রকাশ করছি না)। জানতে পারলাম তিনি গত সপ্তাহের রবিবার রাতে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলেন। শহরের খুব দামি এলাকায দিয়ে ফেরার সময় তার ছিনতাই ঘটেছে। কয়েকজন দুরাত্মা তার মানিব্যাগ, ব্রিফকেইস এবং মুখের চামড়া তুলে নিয়ে চলে গেছেন। নাঃ, ভয় পাবেন না, শিউরে উঠবেন না। মানিব্যাগ আর ব্রিফকেইসটাই দুশ্চিন্তার কারণ, চামড়া তো দুয়েকদিন গেলেই আবার গজিয়ে ওঠে। (আশ্চর্য হবার কিছু নেই, এটাই এখানে প্রথা)।

তো, যা বলছিলাম, রবিবার রাতে ছিনতাই হলেন তিনি। বাড়ি ফিরলেন ক্লান্ত বিধ্বস্ত অবস্থায়, তার স্ত্রীটিকে দেখা গেলো বেশ ব্যস্ত হয়ে তার পরিচর্যা শুরু করতে। মানিব্যাগ ও ব্রিফকেইসের শোকে তিনি তখন মৃতপ্রায়। ধীরে ধীরে স্ত্রীর উৎকণ্ঠার সামনে পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন। মানসিক যন্ত্রণার প্রকোপে কেঁদেই ফেললেন প্রায়, স্ত্রীটিও ব্যাকুল হয়ে তাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলেন, "কেঁদো না লক্ষ্মীটি, সব ঠিক হয়ে যাবে"। চামড়াহীন মুখে জর্জেটের শাড়ি ঘষা লাগছিলো, লোকটির আর সহ্য হলো না, "ছাই ঠিক হবে, মুখপুড়ি। চুপ কর্‌! তুই ক্যামনে জানিস আমার কতো ক্ষতি হলো?" স্ত্রীটি বেশ থতোমতো খেয়ে গেলেন, চুপ করে উঠে গেলেন। যাবার আগে লোকটির ঘরের দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে গেলেন। সে রাতটি তারা দুজনেই সঙ্গমহীন কাটালেন। আমিসহ বাকিরা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, আরেকটি বন্ধ্যা রাত কেটে গেলো।

সোমবার পেরিয়ে মঙ্গলবার পর্যন্ত লোকটির চামড়া ঠিক হয়ে এলো, সেই সাথে মনের গভীরের ভয়টুকু কমে আসতে লাগলো। ইনস্যুরেন্স থেকে তার ব্রিফকেইসের কাগজপাতি উদ্ধার করতে পারলেন, ভাগ্যি সবকিছু ব্যাকআপ রাখা ছিলো! মানিব্যাগের শোক সহজে সারার না, তাই সেই শোক মনে চেপেই তিনি শহরের বিখ্যাত বারে রাত একটা পর্যন্ত মদে চুর হয়ে রইলেন। স্ত্রীটির কাজ এই সময়ে বেড়ে গেলো, রাত দুটোর দিকে দেখা গেলো তিনি বার থেকে মদে ঢুলু ঢুলু স্বামীটিকে টেনে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। বাড়ি নিয়ে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছেন। উবু হয়ে জুতো ও মোজা খুলে দিচ্ছেন, টাই খুলছেন ও হাত ঘড়িটিও খুলছেন। এসব খুলতে খুলতে তার থরো থরো হাত ও বুক আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই। আমাদের ভালো লাগে, "আহা, কতোই না পতিব্রতা স্ত্রী! ব্যাটার আসলেই রাজভাগ্যি।"

হঠাৎই শুক্রবার নাগাদ ছিনতাইকারী পাগলদের পুরো চক্রান্ত লোকটি বুঝতে পারলেন। টের পেলেন যে কেবল ছিনতাই করেই তারা ক্ষান্ত হয় নি, আরো বড়ো ক্ষতি ঘটে গেছে তার। সেদিন আর সব শুক্রবারের মতোই তিনি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছিলেন। জগিং সেরে এসে কমলার জ্যুস খেয়েছেন। তারপরে খবরের কাগজখানা বাগিয়ে টয়লেটে ঢুকে গেছেন। পাগলদের হাতে মানুষের হত্যার খবর পড়তে পড়তে চুক চুক শব্দও করে থাকবেন হয়তো! তারপর "আমি একটু বাইরে থেকে আসছি" বলে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছেন। সারাদিন তিনি বেশ কিছু জায়গায় গেছেন, যেগুলোর বিবরণ আমরা জোগাড় করতে পারি নি।

সন্ধ্যার পরে তাকে আমরা দেখতে পেলাম সেই বারে বসে আয়েশ করে মদ গিলছেন। আমরা ভাবলাম, এখন প্রায় ঘন্টা কয়েকের জন্যে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি আর কোথাও যাবেন না, এখানেই রাত একটা পর্যন্ত মদ খাবেন। আমাদের অনুমান ভুল হয় নি, রাত একটার দিকেই দেখা গেলো তার স্ত্রীটি আবার তাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা দেখি ফাঁকা ফাঁকা রাস্তাটা ফটাস করে দুই খণ্ড হয়ে গেলো, যেন নীলনদ। আমরা দেখি মাথার ওপরে জ্বলতে থাকে স্ট্রীট লাইটগুলো আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, সেই আলোতে স্ত্রীটিকে আমরা চিনতে পারি না। আমাদের ভুল হয়, আমরা মনে করি কাঠের স্বামীকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

রাত বিড়ির মতো দ্রুত শেষ হয়ে আসে। আর গিসগিস করতে থাকা শহরে একটু পরে বিড়ির মোথার মতো রাতের শেষ পরশটুকু পড়ে থাকে। শনিবার আরো একটা ছুটির দিন হয়ে খুব কষ্ট করে জেগে উঠতে থাকে, আমি হঠাৎ টের পাই যে পাগলেরা রাতে ঘুমায় নি। আমরা খুব নিশ্চিন্তে দরজায় খিল দিয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম, আর পাগলরা সারা রাত জেগে ছিলো ফুটপাতে ফুটপাতে। তাদের জন্য আমার কেন জানি সেই সকালে একটু মায়া হয়। যুদ্ধে প্রতিপক্ষের প্রতি মায়া দেখানো একেবারেই নিষিদ্ধ, তবু আমি চুরি করে একটু মায়া দেখাই। এক পলকের জন্য ভুলে যাই যে এরা আমাদের শত্রু। হঠাৎ চোখে পড়ে, সেই বিখ্যাত বারের পেছনের দরজার কাছে একটা শরীর দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে। শরীরটি যে বেশ ব্যায়াম করে নিয়মিতই, তা বুঝতে পারি। আরো বুঝতে পারি, সেটি কোন পাগল নয়। পরিপাটি শার্ট, ঢিলে না হওয়া টাইয়ের কোনা দেখা যায়, প্যান্টখানাও নিপাট। দোকানের লোকগুলো ঘুমুচ্ছে হয়তো এখনো। তাই আমার কৌতূহল বাড়তে থাকে। চেহারাটা দেখতে পারছি না, শরীর উল্টে পড়ে আছে অ-পাগল।

আরো প্রায় ঘন্টাখানেক পরে লোকটির ঘুম ভাঙলো। যেন অচৈতন্য থেকে সে একটু একটু করে জেগে উঠছে। হাত পেঁচিয়ে সোজা হয়ে উঠে বসতেই দেখতে পেলাম আমাদের ছিনতাই হয়ে যাওয়া লোকের মুখ। হুবহু একই চোখ, একই চোয়াল, একই এলোমেলো হয়ে থাকা চুল। চমক ভাঙতে না ভাঙতেই বুঝতে পারলাম গত রাতে এই লোকটি বাসায় ফেরে নি। গত রাতে সে এই বারের পেছনের দরজার বাইরে অচেতন হয়ে পড়ে ছিলো। আমিসহ আমাদের ঘাড়ের রোম দাঁড়িয়ে যায়। এটা আমাদের সতর্কতার পূর্বাবস্থা। খুব তাড়াতাড়ি বিষয়টা বুঝে গেলাম বলে আমি বাকিদের সাথে বেশ উত্তেজিত স্বরে কথা বলতে শুরু করি। তাদের বুঝাতে চেষ্টা করি যে এক গভীর ষড়যন্ত্র ঘটে গেছে রাতের আধারে। আমাদের শহরের পাগলেরা একটা বিরাট চাল চেলেছে, একই চালে তারা আমাদের ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। এখনই সময় আমাদের সতর্ক হওয়ার!

মানুষের দলের আমাদের মাঝে অনেকেই আমার কথা মানতে পারলো না। আমি যে অবিশ্বাস্য কথা বলছি, আমি যে উদ্ভট কথা বলছি সে বিষয়ে অনেকেই তখন নিঃসন্দেহ। তাদের চোখে আমার আচরণ কিছুটা অপ্রকৃতস্থ বলে মনে হচ্ছে -- এই কথাও ব্যক্ত করলো কেউ কেউ। আমি অসহায় বোধ করলাম। পাগলদের সাথে যুদ্ধে আমরা হেরে যাবো, এই ভবিষ্যতের আশঙ্কায় আমার বিপন্নতা বেড়ে গেলো। আমি জোরে জোরে চিৎকার করে বলতে লাগলাম কী বিপর্যয় ঘটে গেছে। দিনের আলোর মতো পরিষ্কার ব্যাপারটা, তাও কেউ কেন বুঝতে চাইছে না? আশ্চর্য!

তারা খুব দ্রুত একটা সভা করে নিলো আমার অভিযোগ নিয়ে। বর্তমান পরিস্থিতি যাচাই করে আমাদের নেতারা বললেন প্রমাণবিহীন এই অভিযোগ সত্যি হবার সম্ভাবনা খুবই কম। বলতে গেলে নগণ্য। তাই আমার এই অতি-আশঙ্কা, এই অতিকল্পনার কোন ভিত্তি নেই। আমি যে এমন পাগলের মতো আচরণ করছি, এটাই এক ধরণের অসুখ। পাগল হয়ে যাবার আগে এরকম উপসর্গ দেখা দেয়। এই শহরে এরকম সময়ে কোন চিকিৎসা হয় না বললেই চলে। উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে কতোজনেই তো পাগল হয়ে গেলো এভাবে! তাই সভাসদরা ঠিক করলেন আমাকে অতিসত্ত্বর বিদেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। এই শহরে পঁচে পঁচে পাগল হয়ে যাবার আগেই আমার বিদেশে চলে যাওয়া উচিত। সেখানে চিকিৎসালয় আছে। বিশাল সুরম্য অট্টালিকাগুলোকে চিকিৎসালয় বানিয়ে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে পাগলদের চিকিৎসা করা হয়। তাদের ঘুমের বড়ি খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। এখানে থাকলে আমাকে সারা রাত জেগে থাকতে হবে, আমি আর সুস্থদের মতো রাতে ঘুমুতেই পারবো না। তারপরে একদিন পাগল হয়ে ফুটপাত ঘেঁষে রাত কাটাবো।

আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা আমার ভালো চান। তাই আমি মুখ বুঁজে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। চোখের সামনের দৃশ্যগুলো হঠাৎ আমার কাছে সিনেমার পর্দার মতো মনে হয়, ত্রিমাত্রিক মানুষগুলোকে চ্যাপ্টা লাগে, সামনের টেবিল চেয়ারগুলোকে মনে হয় দেয়ালে এঁকে রেখেছে কেউ। সিনেমার মতোই তারা মাথা নাড়ে, ঘন ঘন হাত উঁচিয়ে ঘড়ি দেখে। তারপরে নিজেরা নিজেরা ফিসফিস করে কী কী যেন বলে, আমাদের দিকে তাকিয়ে পেশাদার হাসি দেয়। কাগজের খসখসাখস শুনতে পাই।

আমার চোখে কোন একটা সমস্যা হয়েছে মনে হয়। ঠিক এই দৃশ্যগুলোর ভেতর দিয়েও আমি লোকটিকে দেখতে পাই। বারের পেছনের দরজার কাছে এলোমেলো পড়ে থাকতে দেখা লোকটিকে না, গতরাতে যে লোকটি স্ত্রীয়ের কাঁধে চেপে চলে গেছে সেই লোকটিকে দেখি। দেখতে পাই গত রাতেও তার স্ত্রীটি তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে, তারপরে জুতো ও মোজা খুলে দিয়েছে। সারা রাত লোকটি ঘুমায় নি যদিও, চোখ বুঝে পড়ে ছিলো (আমি নিশ্চিত)। তারপরে সকালে উঠে ঠিকঠাক অভিনয় শুরু করে দিয়েছে।

আমার সামনের সিনেমার দৃশ্যে আটকে থাকা মানুষেরা বিস্মিত হয়ে দেখলেন যে আমি চেয়ার বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটু একটু মাথা দোলাচ্ছি, আর পাগলের মতো হা হা হা করে হাসছি!