রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০০৯

একটা হওয়া না হওয়া নিয়ে খানিক বাচালতা কিংবা আজীবন ভেবে আমি যা ভেবে পেয়েছি


অ.তুমি শুরু করলেই হয়?
এভাবে হবে না কিছুই - যেমন টের পাই
আমার ভেতরে শব্দগুলো হতাশ হয়ে তাকায়
মাথা নেড়ে তারা খুব ম্রিয়মাণ হয়
ধুস্‌শালা! নষ্টমানুষ একটা!
স্ফটিক-বিম্বে বন্দী করছে আমাদের।


আ.কী নিরালম্ব আমাদের ঘুম!
ওভাবেও হবে না- তারা বলে, যখনই আমি সুঁই সুতো দিয়ে বাঁধতে গ্যাছি
"শুয়োরের ছাও, ফটকামি বোঝাও?"
এইভাবে গালি খেয়ে আমি চমকায় গ্যাছি
হাত থেকে সুঁই সুতা পিনপতনের দ্রুততায় হারাইলো
শুয়োরের ছাও হয়্যা আমি পুইড়া গ্যালাম


ই.এই অপার, জীবন হায়?
কোনভাবে হবে- তাও জানি না
যেভাবে শব্দ খেলি
যেভাবে তাদের সাথে শুই
গরম হই, "ওহ! শব্দসুন্দরী আসছে তারা ক্রমাগত একে একে"
ঠাণ্ডা হই, "যাহ্‌, কোথায় গমন গজহীন ভোর, কালকের পরে আর আসেনি তারা"
হাইস্যা ফেলি হা হা হা!
দমকে দমকে আমার শরীর নেতায় পড়ে।


ঈ.যাত্রার শেষ কোথায় হে পালিত পিতা!
সেভাবে হবে- বলে নিমগ্ন কবি
পাশে কাগজ কলম হাতে বসে দুর্দান্ত গতিতে
স্তবক স্তবক নেমে আসে থরথরে
পংক্তি পংক্তি জারি হয় গোলগাল সরব
এক একটা সর্গ রচিত হয় সানন্দেই


...আমি বুঝি আমার হাত নয়, লিখছে অপর মানব কোন ছায়াহীন কায়াহীন
আদ্যোপান্ত গাঢ় রোদ মেখে
শালা... আমার আর হইলোই না!


***

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০০৯

ফেইড-লেদার জুতো

আজ ছুটির দিন সকালে বেরোতে হলো কাজে। এমনিতে আমার ঘুম ভেঙে উঠতে উঠতে বেলা চড়ে যায়। কিন্তু আজকে চাকরির টান, পেটের গান। তাই সকালেই মশারি ভাঙলাম। ধুম ধাশ ঠাশ ধড়ক্কাট ঠুশ। এমন করেই চারকান ছেড়ে মশারিটা ভেঙে পড়ল, যেভাবে ফিনিক্স বিল্ডিংটা ধ্বসে গিয়েছিল, যেভাবে মার্কিন ইকনোমি চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ছে! আমি খুশি হই! কিন্তু আজ দপ্তরে খুটখাট করে কাজ করতে হবে সারাদিন। বাতিগুলোও নিশ্চয়ই বিরক্ত হবে! এরা সারা সপ্তাহশেষেও এসে গা জ্বালিয়ে দিচ্ছে- এমন কথা বলে বিড়বিড় করবে!


জুতো বাছতে গিয়ে ধুলোমলিন ফেইড-লেদারের কাতর চাহনি চোখে পড়লো। "আহা! বহুদিন ঘুরি না দুরন্ত বেগে এই শহরে, সেই কবে বসন্তের শুরুতে বালিমাখা স্মৃতিই এখন সম্বল। নদী, ব্রীজ, কালভার্ট, হাইওয়ে পেরিয়ে সাগরের পারে বালুতে ডুবেছিল শরীর। রৌদ্রের বিপরীতে শাদা ফেনার ছায়ায় ভিজেছে ফেইড-লেদার শরীর আমার!" এমন সবিনয় নিবেদন কী করে এড়িয়ে যাই! পা গলিয়ে বেরিয়ে এলাম। মনে পড়লো জুতোর কথনে, বসন্তের সেই ভ্রমণের কথা। পুরনো স্মৃতির গায়ে একটু সাগরনুন ছিটে গেল কি?


আমি ফিরে এসে ওভাবেই নোনাসমুদ্রী ঘ্রাণমাখা জুতোজোড়া রেখে দিয়েছিলাম। তার ওপরে পরতে পরতে আর জমেছে বিজাতীয় ধুলো, খোলের ভেতরে বাসা বেঁধেছিল নিরীহ মাকড়সা, আজ ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিলাম। ঝুল-জামা পরে ছিল গায়ে, সেটাও ছিন্ন করে বের করে আনলাম, চকচকে নগ্ন ফেইড-লেদার জুতো! বুরুশের ঘনঘন ছোবলে, পর্যাবৃত্তিক ঝড়ে উড়ে খসে গেল সমুদয় ভ্রমণান্ত সুখ।


রিকশা, হাঁটা, রিকশা, আবার হাঁটা, সিঁড়ি বাওয়া, টাইল্‌স, দরজা, টেবিল, রিভলভিং চেয়ার। ব্যস্ত হলাম কাজে। কয়েকটা ই-মেইল এসেছে। আমারও করতে হল আরো কতগুলো। এ.সি. চলছে বিজ্‌বিজ্‌। শান্ত সুনসান সব। একটু পরে কানে এলো ঘুনঘুনে সুরে কান্নার শব্দ। সচকিত হয়ে টের পেলাম, ফেইড-লেদারের ভাঁজ থেকে, হারিয়ে ফেলা ধুলোর আঁচলের শোকে জুতোজোড়া থেকে আসছে ক্রমশ গলনের গান, মিশ্রসুরের ক্রন্দন, অপার্থিব সিম্ফনি!...

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০০৯

অশিরোনাম গ্রন্থনা

...তাকিয়ে থাকার মাঝে এক নিপুণ শিল্প অনেকটাই বিমূর্ত হয়ে লুকিয়ে থাকে। শুধুমাত্র দু'চোখ মেলে তোমার দিকে চেয়ে থাকা যায়। সেই নিস্তরঙ্গ চোখে জল-কাদা-রোদ লেগে ঝাঁঝরা রাতের ঝাঁঝ জমে, আর সেভাবেই তাকিয়ে থাকায় ক্লান্ত না হয়ে খুশি হই আমি।...


...সকালে চোখ মেলতেই বুকের ওপর থেকে জোড়া পায়রা উড়ে গেল! ধবল জোড়া কবুতরে থাকে অদ্ভুত শিহরণ, পায়রার বুকে এমন শুভ্রতা বিকিরিত হয়; এবং আমি বুঝে উঠি এই সকল প্রেম, ভালোবাসা, হাসি, কান্না, ঝগড়ার রীদম। পায়রার ডানায় শিশির জমে নতুন ভোরের, বিগত স্মৃতির।...


...হেসে ফেলা রাগী চোখে আমি সরাসরি তাকিয়ে ডানা ধুকপুক পায়রা ধরে আনি। এভাবে একে একে কয়েক অমূল্য মুহূর্ত কাটে, সেখানেও আমি এক দুই তিন চার করে গুনতে থাকি সেকেন্ডের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা। ত্রিমাত্রিক পরিমাপ শেষ হলে বিশুদ্ধ জ্যামিতিক খাঁচা আবিষ্কার করি।...


...অতঃপর আটকা পড়ে কতিপয় বিচ্ছিন্ন ভাবালুতামাখা মুহূর্ত। শেকলে বাঁধা সেকেন্ডের সারিবদ্ধ বন্দীরা একে একে মাথা নিচু করে খাঁচায় ঢুকে পড়ে। নিষ্পলকে খুব ক্রূর ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি, যেহেতু আমি জানি সেখানে কতো বিচিত্র অপরাধী সেকেন্ড আটকা পড়েছে।...


...তোমার চোখেও কেন ভালোবাসার মাঝে এমন বিষাদ, এমন গ্লানি আর এতসব অনুশোচনা জন্ম নিচ্ছে আজ? একটু আগেই শেষরাতের বিচারক রায় জানিয়েছেন। ফাঁসির আদেশে বিমর্ষ হয়েছে আসামীপক্ষ।...


...তাদের জন্যে আমার সমবেদনা তৈরি হতে থাকে। আমি ধীরে ধীরে অবিশেষ কাতরতা, সাধারণ উদ্বিগ্নতা বোধ করি। আমাদের স্মৃতিতে অনেক ভাল সময় জমে ছিল।...


...এইসকল একরকম মোহন প্যারাডক্স! কীভাবে এক মুহূর্তের মাঝে আদ্যন্ত সেঁধিয়ে যায় হা হা করে তাবৎ অতীতকাল? পাশাপাশি কাটিয়ে দেয়া সময়ে আমরা ভাবিনি যে ভালোবাসা জমেছিল ঘাড়ের ওপর, চুলের জড়োমেঘের ভেতর, বাহুযুগল-যুগলের বেষ্টনীর ভেতর, কোমর বুক নাভি জঙ্ঘা কনিষ্ঠায়। জমাট রিক্ততাতেও আমরা অপেক্ষা করিনি। সেই পলেক স্মৃতি কোষান্তর চলাচলে ক্ষয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে, ফুরিয়ে গেছে। জীবন পেরিয়ে যাওয়ার আগে হিসেব মেলেনা, আর যখন তা মেলে, আমাদের জীবনের বাকি থাকে না কিছুই।...

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০০৯

এই পথ আমাদেরওঃ এই শহরের পথে আমি ও কয়েকজন

ইঁটের পাশেই ঘাস, মাটি, ধুলো। সিরামিকের ইটের গাঁথুনি, বিন্যস্ত ঘাট। এই হ্রদের পাশে নগর। বা এই নগরের পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে প্রাগোতীত হ্রদ। নীল ছিল এর পানি বোধহয় এক কালে। এখন শ্যাওলাটে ময়লা; পলিথিন, এবং প্লাস্টিকের বোতল। সজ্জা স্বভাবতই নাগরিকের উচ্ছিষ্ট দিয়ে। এবং এই নগরযাপিত সকল ময়লা ধারণ করছে হ্রদ, নিজের বুকে। খানিকটা নীরবেই এর বুকের ওপরে শহুরে সেতুমালার সেলাই, আমরা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছি কবেই! এখন তার শরীর পাঁশুটে, ম্লান, ক্ষীয়মান। সন্ধ্যে নেমে আসার আগেই আঁধার জমা হতে থাকে হ্রদের বুকে।


আমি যখন একটা সেলাইফোঁড়ের উপর দিয়ে হেঁটে ঘাটের দিকে এগুলাম, দেখলাম চৌকো চৌকো কংক্রীট পাথর ফেলা হচ্ছে হ্রদের পাড়ে। ধ্বস ধ্বস করে আমার বুকেই পড়ছে যেন ওগুলো! মাঝে দেয়া হচ্ছে অমোচনীয় সিমেন্ট। যেন পৌরাণিক কোন বন্য পশুকে বেঁধে ফেলার সকল উদ্যোগ আগেই সেরেছি আমরা, কিন্তু তারপরেও তার সূক্ষ্ণ হুটোপুটি চলছে। স্থানে স্থানে বেরিয়ে আছে কালো মাটি, কাদা, ঘাসের মখমলী একটু একটু। সেটাকেও ঢেকে ফ্যালো, মুড়ে দাও, শেকলে বাঁধো! হত্যার জান্তব দৃশ্য আমার স্নায়ু ভেঙে দেয় বলে আমি স্ল্যাবজমানো শ্রমিক আর সিমেন্টের থালা মাথায় মহিলাটিকে এগিয়ে ঘাটের দিকে এগিয়ে যাই দ্রুত!!


এই ঘাটে আজ মানুষের মেলা। কালো মানুষ আমরা, শরীরে ক্ষীণকায়, ময়লা ত্বক আমাদের, চুলে প্রসাধন নেই, পায়ের চপ্পলেরও টুটাফাটা দশা। জামার ভাঁজহীনতা বলে ওটি বেশ কয়েকদিন হলো ধোপার কাছে যায়নি। তারপরেও আমাদের চোখে মুখে উজ্জ্বলতা! নীরবেই আমরা অর্ধবৃত্তাকার ঘাটের পাশে জমা হয়েছি! ঘাটের সীমানায় চারটা থাম, সামনে ইটবাঁধানো চত্বরেই কয়েকজন যন্ত্রপাতি সাজাচ্ছেন। বড়ো, কালো স্পীকারে টুংটাং টিউনিং চলছে। এখানে থামের গায়ে বড়ো একটা ব্যানার। ব্যানারে নিচে কয়েকজন দাঁড়িয়ে, তাদের সামনে ইটের সিঁড়ি জুড়ে প্রচুর মানুষ! আমি নিজেই এসে একটু ভড়কে গেলাম। ভেবেছিলাম অল্প কিছু ভলান্টিয়ার আর হ্রদে বৈকালিক ভ্রমণে আসা বহুমূত্রাক্রান্ত প্রৌঢ়-প্রৌঢ়াদের দেখবো। হাঁটার ক্লান্তিতে হয়তো তারা সেখানে জিরোচ্ছেন, এমন। কিন্তু দেখলাম টগবগে উচ্ছল একদল নানারঙের মানুষ শান্ত হয়ে বসে আছেন। বন্ধু, বান্ধব, ভাই, বোন, প্রেমিক, প্রেমিকা, পিতা, সন্তান, মাতা। এরা সকলেই নিবিড় ঘনো হয়ে বসেছেন। মাটিতেই, অন্তত কিছুক্ষণের জন্যে জামাকাপড়ে শান্ত ধুলো লাগলেই বা কি? কয়েকটা ফ্রকপরা শিশুও দৌড়ে বেড়াচ্ছে। আহা! ওরা তো আমাদের মতো উদাম খেলার মাঠ পায়নি। বাসার ব্যালকনি, ছাত, বড়োজোর পার্কিং লট। তার বাইরে হিংস্র রাস্তা আর ভয়ানক গতির যান-দৈত্য! ওদের গিলে খাবে বেরুলে। এখানে এই সিরামিকের বৃত্তাকার ঘাটে ওরা পিতামাতা, বড়ো ভাইবোনদের চক্রের মাঝে নিশ্চিন্তে হাসে, দৌড়ায়, আর খিলখিলিয়ে ওঠে আমার বিকেলটা।


তারপরে আমি কিছু পরিচিতমুখ দেখি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, ছোটভাইয়েরা অনেকেই ভলান্টিয়ার, তারা বেশ ব্যস্ত। কুশলালাপের পরেই চলে যায়। আমি আর দত্ত’দা-ই খালি শ্রোতা। বসে পড়লাম একটু জায়গা বানিয়ে। পাশেই অপরিচিত মানুষ। অতিসাধারণ, আমার দেশের নিরীহ নাগরিক। এখানে তাদের সাথে আমিও এসে গেছি। আমরা কত সাধারণ সেই সত্যটা টের পাই। কিছুই ‘করি’ না আমরা কখনো!
বসুন্ধরায় আগুন, আমরা দেখি (টিভিতে বা পান্থপথে ঘাড় উঁচিয়ে)।
র‌্যাঙ’স ভবন ভাঙা হয়, আমরা দেখি। ওখানে লোহার শিকে মানুষ গেঁথে যায়, তারপরেও আমরা কেবল দেখি।
রাস্তায় জ্যাম, ধোঁয়া- তবুও আমরা নিষ্পলকে তাকিয়ে থাকি, তাকিয়েই থাকি!
আরও অনেক কিছু আমাদের সামনেই ঘটেঃ রাজাকারেরা বিবৃতি দেয়, যুদ্ধাপরাধী নাই দেশে। শুয়োরবৎসাকাচৌ অশলীল হাসে টিভিপর্দায়, আমরা তাকিয়েই থাকি।


এসব প্রলয়ঙ্কারি ঘটনাও আমাদের চোখের সামনে সহজাত হয়ে গেছে। আর সাধারণ নারীর লাঞ্ছনা, রাস্তাঘাটে বা কর্মক্ষেত্রে তার উপরে ঘটে যাওয়া টিটকারি, ঈভটিজিঙয়ের বিরুদ্ধে একটা পদযাত্রা হয়েছে শহরে আজকে, তাতে কী যায় আসে। শুনেছি ঢাকা শহরে বাতাসে সীসা, সেই সীসায় আমাদের কান, চোখ, মুখ, ইন্দ্রিয়গুলো ঢেকে বুঁজে গেছে!


এই পদযাত্রার কথা শুনে আমার পঁচাগলা শহরের অনেকেই ভুরু উঁচিয়ে ফেলেছেন! পুরুষাঙ্গে ঈষৎ নাচন ঘটেছে, আহা! গ্রোপিং, আর শ্লীলতাহানি! এগুলা কী, একটু বিশদে বলো- শুনি। কীভাবে নারীর লাঞ্ছনা ঘটে? তাই নাকি?? ছি ছি মানুষ এতো খারাপ!- এগুলো বলে আমরা পা নাচাই তৎসম নাচনেই। সেই ভ্রু-লিঙ্গ-পদনাচন উপেক্ষা করেও অনেকে এসেছেন। পরিবারের সবাইকে নিয়েই এসেছেন। আমার বোন পথে হাঁটে, প্রেমিকা বাসে চড়ে, মা-ও চাকরি করে। আমার অনেকগুলো সহপাঠী বান্ধবীও পড়াশোনা শেষ করে এখন চাকরিতে ঢুকেছে, ওরাও রোজ রাস্তায় যানবাহনে চড়ে। এদের জন্যে হলেও আমি আজকে বিকেলে হ্রদের পাশে গিয়েছি। এবং হতবাক হয়েছি কিছুটা, খুশি তারচেয়েও বেশি। কীভাবে আমরা নীরবেও কত কিছু ‘করি’। না হোক তা একটা বিকেল, একটা পদযাত্রা, একটা সন্ধ্যা। এই নেমে আসা আঁধারের রেশ থাকতেই আমার মনে হয় আস্তে আস্তে একটা আলো জ্বলছে কোথাও কোথাও!


ওখানে গান পরিবেশন করলেন কয়েকজন শিল্পী। গানের আগে পরেও তাঁরা বললেন- নিজেদের নারী হওয়ার কারণে প্রাপ্ত ঠ্যালা, গুঁতা, চিমটি, টিটকারির কথা। তারা অন্তত একটা মাইক্রোফোন পাচ্ছেন। আর অন্যেরা তো তা-ও পাচ্ছে না। এ দেশের অর্ধেক মানুষই মেয়ে, তারা কেউ পাচ্ছে না। আমরা বাকি অর্ধেকের, পুরুষের, সেটা চোখেও পড়ে না। রাস্তায় কেউ পড়ে গেলে কয়েকজন “আহা, আহা!” করে ওঠেন। কেউ কেউ এগিয়ে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেন। যে ঠ্যালা দিয়ে, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে তাকে উত্তম-মধ্যম দেয়ার লোকেরও অভাব হয় না। কিন্তু একটা মেয়েকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে আমরা বীরত্বের হাসি দেই! কী চমৎকার অনুভূতি আমার। তাকে কেউ তুলতে যায় না, গেলেও লোভ জাগে নরোম বাহু চেপে ধরার। টেনে তুলে ‘সাহায্য’ করে আমরা পুঙ্গব হই। শিশ্নে দৃঢ়তা পাই! এই কথাগুলো চিন্তা করতে করতে আমার বুকেও ঐ স্ল্যাবগুলো সিমেন্টের গাঁথুনিতে বসতে থাকে।


এভাবে একদিনের প্রোগ্রামে কিছু হয় না। কয়েকজনের মনে যে শিখা আদৌ জ্বলে ওঠে, সেটাও পরেরদিন জোরালো জীবনের ঝাপটায় নিভু নিভু হয়ে যায়। কিন্তু আজকে আমার মনে হলো, যদি তাই হবে, তাহলে এতোগুলো মানুষ কেন এভাবে একত্রিত হলো? এখানে তো কোন জনপ্রিয় কেউ আসে নাই, পয়সা পাতি বিলানো হয় নাই। যারা কথা বললেন, এমন কেউকেটা কেউ নন। যে গান গাওয়া হলো, সেগুলোও নেহায়েৎ সাদামাটা, মোটেই ধুমধাড়াক্কা কনসার্ট নয়। তাহলে নিশ্চয়ই সেই নির্বাপিত শিখার একটা রেশ কারো কারো মনে ছিল। কেউ কেউ সেই আলোটাকেই আবার উস্কে দিতেই এসেছেন। সাথে হয়তো পরিচিত মানুষদেরও নিয়ে এসেছেন! সীমিত হাতের দৈর্ঘ্য আমাদের তাই আমরা বেশিদূর হাত বাড়াতে পারি না। কিন্তু হাতে হাতে ধরে একটা বাঁধন তৈরি করতেও পারি, করতেই পারি! এই কথাটা মাথায় আসতেই স্ল্যাবের চাপ একটু হালকা হলো।


আরো কত কত চিন্তাও মাথায় আসছিল। ফেরার পথে দত্ত’দার সাথেই ফিরছিলাম। কথায় কথায় বললাম, আদৌ কীভাবে এই মানুষগুলো নিরাপদে রাস্তায় হাঁটতে পারবে? কোনদিন পারবে কী? আমার শহরের রাস্তায় আমি যতটুকু নির্ভার হয়ে হাঁটি, আমার বয়েসী একটা মেয়ে কবে সেইরকম নির্ভরতায় হাঁটতে পারবে?


আমিও কেমন, বে-আদবের মতো স্বপ্ন দেখি!

রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০০৯

দাপ্তরিকের প্রত্যাবর্তন

সাম্প্রতিক


আমি বৈপরীত্য বুঝি, যেভাবে আমাদের আচরণে এই বোধ পালিত হয়।
অসহ্য রোদ ত্বকভেদ করলে আমার কেবলই মনে পড়ে বিগত শীত, ঊলভেজা স্মৃতি এবং ডিসেম্বরের বিকেল। তিন মাসব্যাপী ক্রমশ নিদ্রাহরণ, যুদ্ধযাপন শেষ হয়, চল্লিশ বছরের পুরনো অভ্যাস, এপ্রিল এলেই ভালো থাকি!
আমাদের নিয়ত যুদ্ধসমূহ নথিভুক্ত হয় না।






নদীপ্লট


খুব ভোরেই শহরপত্তনঃ কতিপয় বর্গাকার প্লট
ঘেসোজমিতে বাউণ্ডুলে শিশুগাছ
সিমেন্টের বানানো-
ডি-মার্‌-কে-শন্‌।
আমাদের শহরে রাত হয় না।
ব্লুপ্রিন্টে ভুল নেই বলে
জমি খুঁজে পাওয়া গেছে
আমি খেয়ো-ইঁটপথ ঘুরে ঘুরে নদীর কিনারে এসে
বুঝে নেই ৬০০বাই ৪০০, মন খুঁতখুঁত করে।
এখানে বুঝি দরিদ্র সন্ধ্যা একবার নেমেছিল শত বছর আগে!
নগরে রাত হয় না আমাদের,
আদিগন্ত পৃথিবীতে সবাই নাগরিক স্বপ্ন বেচে খাই।






তত্ত্বসুন্দর


"প্রোফাউন্ড বিউটি বলে কিছু নাই"--
একথা বলে সিরাজুল সাহেব ঈষৎ মাথা ঝাঁকান।
আমার হাতে স্ফটিকের গ্লাস আরেকটু শীতল হয়
ঘনোচুমুকে ছলকে তরলতত্ত্ব আমার মুখে,
গলায়, অন্ত্রে চলাচল সহজেই করছে।
আমি পাশে শায়িত সুন্দরীর লেজ-নাড়া দেখি
মুক্তা-দাঁতে ঝিলমিল বিপনন- আহা বিষণ্ণ প্রোডাক্ট,
কনজ্যুমার বেসিসে তার শরীর আদল বদলায়
এটাও এক গবেষণার বিষয় হতে পারে বই কি?
সুন্দরীর গম-আঙুলে তাবৎ তত্ত্বের মূল রোপন করা, তাই সেই স্মিত হাসি বড়ো মনোহর লাগে!
সিরাজুল সাহেবের জুড়ি মেলা ভার।

মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০০৯

ভ্রমোলগ: ক্লান্ত ঢাকাত্যাগ এবং ক্রমশ সবুজায়ন


ভ্রমণে বেরোলেই অপরিচিত মুখগুলোকে কেন আমার পরিচিত মনে হয়? এমন না যে এটা আজকেই ঘটছে। আমি আগেও খেয়াল করেছি, সহযাত্রীদের, অপেক্ষমাণ মানুষের মুখ আমার কাছে আপন মনে হয় খুব। অথচ সেই মুখটাকেই এই স্টেশন, প্ল্যাটফর্মের বাইরে দেখলে আমি ফিরেও তাকাতাম না! ঘরের বাইরে বেরিয়ে আমি কি কিছুটা বিপন্ন হয়ে পড়ি? এজন্যে অচেনাকেও আপন মনে হয়? অথবা আমি একটু সাহসী রোমাঞ্চপ্রিয় হয়ে উঠি, তাই অপরিচিতকেই ভাল লাগে! এই সব আবোলতাবোল ভাবছিলাম।

রাত বাড়তে থাকে, আমি স্থবির বসে অপেক্ষা করি। আমার চারপাশে মানুষের ভীড় বাড়তে থাকে। তারা সবাই বেরুচ্ছে এই শহর থেকে। ব্যাগগুলো কালো, খয়েরি, নীল, সবুজ, বেগুনি রঙয়ের। পেটমোটা ভারি ব্যাগ কাঁধে হাতে কিংবা টেনে এনে কাউন্টারে রেখে সবাই একটু একটু হাঁপায়। আমি বসে বসে সেই চেহারা গুলো দেখি, মাপি। সেখানে আমি আশাজনক কিছু খুঁজে পাইনা। মুখগুলো ক্লান্ত, বিমর্ষ আর হতাশ।
কেউ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চলে যাওয়াতে হতাশ।
কেউ আওয়ামীলীগ সরকার পত্তনে হতাশ।
কেউ বিএনপি হেরে যাওয়ায় হতাশ।
কেউ হয়তো জামাতে-পিছলামি হেরে যাওয়াতে হতাশ (!)।
কেউ সামরিক অফিসারদের মরে যাওয়াতে ক্ষুব্ধ, কেউ গুলি খাওয়া রিকশাওয়ালা আর সাধারন্যের জন্যে কাতর, কেউবা বিডিআর জওয়ানদের জন্যে সমব্যথী।

আমাদের সকলের চোখে মুখে আমি সেই দুঃখবোধ ঝরে পড়তে দেখি। শাদা-ধূসর হয়ে ওঠে পটভূমি। সেখানে আমি শ্রান্ত রাতের শেষ বাসের তীক্ষ্ণ হর্ণ শুনতে থাকি। সেই অশ্লীল চিৎকার ঢাকতে আমি কানে ধুম ধাড়াক্কা গান গুঁজে দেই।
আমি আজকে এই শহর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি কয়েকদিনের জন্য। আজকের রাতে আটত্রিশ বছর আগে কালো কালো ছোপ ছোপ রক্তে ঢাকা শহর ভিজে গিয়েছিল। কত রক্ত একরাতে ঝরেছিল? মৃত, নিথর মানুষগুলোর শরীরের রক্তে কতগুলো সুইমিংপুল বানানো যেত? সার সার দেহ। আমি ছোটবেলায় যখন প্রথম শাদাকালো ছবিগুলো দেখেছিলাম, আমার ভয় লেগেছিল; আর কান্না পেয়েছিল। আর মনে আছে আমি বইটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কারণ আমি ভেবেছিলাম বই খুলে রাখলে ঐ সার সার দেহগুলো উঠে এসে আমার পাশে দাঁড়াবে হই হই করতে করতে!
কোন কারণ ছাড়াই এভাবে লাশ হয়ে যাওয়া যায়!! এখনও নির্মিত হয় মানুষের লাশ। কোন নিখুঁত কারিগর এই দেহ বানায়, তারপরে সেখানের অণু-পরমাণুর টান তুচ্ছ করে মাংশ-পেশী-রক্ত-চর্বি-হাড়গোড় সব নির্জীব হয়ে যায়! এই সব লাশেরা নোনতারক্ত মেখে আমার কানের ভেতরে ভারি সীসার মত ঢুকে পড়ে। আমার কয়েকজন বন্ধু এসে আমাকে সেখান থেকে টেনে তোলে।

ওদের সাথে অনেকদিন পর দেখা হলো আজ। আমার ভালো লাগতে থাকে। আমি তাদের সাথে গল্প-আড্ডায় মেতে লাশগুলোকে দূরে ঠেলে দিতে চাই। ছবিগুলো ভুলে থাকতে হবে আমাকে। যাবতীয় জাগতিক ভণ্ডদের ছেড়ে আমি কিছুদিন ছুটি নিতে চাই। ওরা সাধারন গল্প ফাঁদে। পুরনো দিনের গল্প, যখন আমরা সবুজ ছিলাম সে সময়ের গল্প। যখন আমরা দুইটাকার চা তাড়াতাড়ি খেতে গিয়ে জিব পুড়িয়ে ফেলতাম, দুপুরে দৌড়াতে দৌড়াতে ল্যাবে ঢুকতাম অ্যাটেন্ডেন্স মিস হয়ে যাবার ভয়ে। তখন আমরা অল্প অল্প ঘুমাতাম, সারারাত জাগতাম আর স্বপ্ন দেখতাম জেগে জেগে। সেইসব দিনের কথা বলতে বলতে আমার চেহারার ময়লা রঙের মাঝে কিছুটা সবুজ ফিরে আসে। লাশেরা কবরের গভীরে নীরব হয়, আপাতত!

আমার যাত্রা শুরু হয়। আমি যাব অনেক দূরে, তিনশ কিলোমিটারেরও বেশি। স্থানিক দূরত্বের চেয়েও আমার কাছে বেশি জরুরি মানসিক দূরত্বটা। আমি এই শহর ছেড়ে বেরুচ্ছি। ঢাকা শহরের মাদকে গত ছয় বছরে আমি ক্রমশ ডুবেছি, ভেসেছি, সাঁতরেছি। এই শহরের সবকিছুই আমার ভাল লাগে। প্রচণ্ড বেহিসেবী জ্যাম, ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়ার মতো ক্লান্ত দিনরাত, ধোঁয়া ধুলো চিৎকার হর্ণ মানুষ গাড়ি বাস সিএনজি রিকশার জটা-কালো সময় আমার হৃদয়ে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে দিয়েছে। আমি অনেকটাই এখন নির্ভর করি ঢাকার উন্মাদনার উপরে। এই শহরের খারাপ জিনিশগুলোও আমার এখন ভালো লাগে।

কিন্তু সেই আমিও এখন একটু নির্ভার হতে চাই, এই শহরটা ছেড়ে কিছুদিন ছুটি চাই। অনেক জোরে জড়িয়ে ধরলে যেমন হাসফাঁস লাগে, আমার কিছুদিন ধরে তেমনই লাগছে বলে আমি পালাতে চাই। রাতের আঁধারে, ব্যাকপ্যাকে করে কয়েকদিনের রসদ নিয়েই আমি পালাই। সাথে একটা ক্যামেরা নিয়েছি গলায় ঝুলিয়ে। আর কানের মধ্যে বেশি করে অর্ণব, ফুয়াদ, রক অন, দিল্লী ৬, কোল্ডপ্লে, ড'ট্রিকে পুরেছি। আমি সব ইন্দ্রিয়গুলোকে একটু ঝালাই করতেও চাই।
সাথে গত পাঁচ বছরের দোসররাও যাচ্ছে। সবারই গত এক বছরে বয়স বেড়ে গেছে, দেখলেই মনে হয় পৃথিবীর ভার একটু একটু করে সবার কাঁধকে ভারি করে দিচ্ছে। কেউ কেউ ইতিমধ্যেই ঢাকা, বাংলাদেশ ছেড়েছে। আরো কয়েকজন এবছরই ছেড়ে যাবে! তাই এই শেষ ভ্রমণ, অনাগত ভবিষ্যতের আগে।

বাসের দোল খেতে খেতে আমি বুঝে যাই এসব কথা। এই দোসরদের সাথে কাটানো এই কয়েকটা দিন পরবর্তীতে অশরীরীর মতো ঘুরে বেড়াবে। আমি ছবি তুলে বেঁধে রাখলেও ফ্রেমের বাইরে চলে যাবে যাবতীয় আনন্দ, হাসি আর গানের সুরগুলো! বাইরে তখন মধ্যরাত পেরিয়ে যাচ্ছে। আমি ঢাকার প্রান্ত ছাড়িয়ে যাচ্ছি। মুজিব হয়েছে বন্দী, পুলিশ লাইনে রক্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে রক্ত ততক্ষণে নালা ভরে ফেলেছে। পরের দিনগুলোতে যারা উর্ধ্বশ্বাসে পালাবে আমিও তাদের মতো পালাচ্ছি। পার্থক্য অনেক; তবুও...

কুমিল্লা পেরোনোর পরে বাস থামল। গিঁটে খিল কাটানোর জন্যে নিচে নামলাম। রাতেও সরব রেস্তোরাঁ। ঘুম ভাঙা মুখে সবাই খাচ্ছে। ভাত, মুরগী, মাছ কিংবা শুধুই চা। আমি পরোটা দিয়ে সব্জি খেলাম, সাথে চা। তারপরে বাসে চেপে বসলাম। গানযন্ত্রের দম ফুরিয়ে গেছে। এখন কান নীরব, চোখ খোলা। চায়ের মাঝে কী ছিল, আর ঘুম আসে না। রাস্তায় হঠাৎ বাসচালকের কী হলো, গাড়ির গতি দেখি বেড়ে গেল। ওভারটেকিং চলছে এদিকে ওদিকে হেলে পড়ে। এই দোলনেই, অথবা বাইরের সরে যাওয়া দৃশ্যপটে ভাসতে ভাসতে আমি আবার ঘুমে তলিয়ে যাই। তবে এই সন্তরণ খুব বিভ্রান্ত। আমি সেইঘুমের মাঝেও টের পাই এগিয়ে চলেছি দ্রুততায়...

বিদঘুটে কিছু স্বপ্ন দেখি সারারাত। অথবা হয়তো আমি দেখি নাই। চলন্ত বাসের ভেতর শীতল বাতাসে স্বপ্ন দেখিনি কিন্তু অস্বস্তিকর যাত্রার কারণে মনে হয়েছে যে দেখেছি। সেটাও হতে পারে। সম্ভাবনার অঙ্কগুলো যে কেন শিখেছিলাম! ভোর যখন আসছে, জানালার বাইরের গাছগুলো ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে উঠছে। আমার গায়ে, মুখে লেগে থাকা ময়লা সবুজটাও ধীরে ধীরে আরো সবুজ হয়ে উঠতে থাকে। আমি সাগরের কাছাকাছি চলে এসেছি। এখন সামনের নীলের তীব্রতায় ঢাকাতে রেখে আসা লাশের স্মৃতি কিছুটা ম্লান হয়। আমি তাদেরকে কিছুদিন ঘুমুতে বলি। আবার ফিরে আসবো এই আশ্বাস পেয়ে তারা আমাকে আগামী তিন দিনের জন্যে ছেড়ে দেয়।

=======
১.৪.৯

শনিবার, ২১ মার্চ, ২০০৯

ভোরের একটু আগে


রাত শেষ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। আকাশের দিকে তাকালে এখনও সময়টা আন্দাজ করা যায় না। আমি উঠে পড়ি। এপাশ ওপাশ অনেকক্ষণ তো হলো! বিছানাবালিশ ধীরে ধীরে উষ্ণ মনে হচ্ছে। আর কতোক্ষণ এভাবে গড়াগড়ি করা যায়?
আমি উঠে পড়ি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি কিছু পরিষ্কার হয় না। তাও কী মনে করে তাকিয়েই থাকলাম। হালকা কুঁজো হয়ে বসলাম। আমি সবসময় এভাবে বসি। ছোটবেলায় নানী রেগে যেত, বলতো "পিঠ সোজা কইরা বয়। ব্যাঁকা হইয়া যাইবো জন্মের লাহান।"
আমার নানী একেবারেই অল্পশিক্ষিতা। মনে হয় তাঁর ছোটবেলার বড়োবোন বা গুরুজন শিখিয়ে দিয়েছিল, পিঠ বাঁকা করে বসলে ওরকমই হয়ে যায়। ভীতু মনে সেটা নিশ্চয়ই গেঁথে গেছে! তাঁর ধমকে আমি তখন তড়িঘড়ি পিঠ সোজা করে বসতাম।
কিন্তু এখন তো আর আমাকে কেউ দেখছে না। তাই আমি জবুথবু হয়েই বসে থাকি। এভাবে থাকতে আমার ভাল লাগে। বৃদ্ধবয়সের অনুশীলন করছি বলে মনে হয়।
পাখিরা ঝাপ-ঝাপ করে উড়তে শুরু করেছে। আকাশ ফর্শা হওয়ার আগেই ওরা উঠে যায়। রাত যে তাড়াতাড়ি এসেছিল ওদের ঘরে, সন্ধ্যে নামতেই। আমি সন্ধ্যের পরে ওদের দেখি নাই। খড়বুননের পেলব সংসার! নিশ্চয়ই অতোটুকুন জায়গার মধ্যে তিন-চারটা জীবন। এখন পাখা ঝাপটে রাতঘুম ভেঙে উঠে পড়ছে। অথচ আমি কেন ঘুমাতেই পারলাম না! ওরা তো এখন হাই তুলবে, পাখা টানটান করে আড়মোড়া ভাঙবে। তারপরে উড়তে বেরুলেই আমাকে দেখে অবাক হবে।
মানুষ-ছানা কেন লাল চোখে, ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে বসে আছে! ওরা তো সারাক্ষণ কথা বলে। হৈহুল্লোড় করে। শব্দ করে গান শোনে।এখন কেন এমন নির্বাক, চুপচাপ? নিশ্চয়ই এসব ভেবে মাথা নেড়ে ওরা চলে যাবে উড়ে। ওদের তো সময় নেই আমার মতো।


“কালকে কয়েকটা চিঠি সকালেই পাঠাতে হবে বাইরে।”
“ক্লায়েন্ট আসবে, অথবা ফোন করবে, কবে আসতে পারে সেকথা জানাতে। টেকনিক্যাল টীমগুলো খুবই চামারের মতোন। এসেই নাক শুঁকতে থাকবে।”
“বসের গত পরশু থেকে মন মেজাজ দেখছি চড়া, কালকে আমার উপরে না ঝাড়লেই হয়।”
এইরকম নানাবিধ চিন্তাগুলো পাখির পাখা ঝাপ্টার সাথে মাথায় ঢুকে পড়ে। কিন্তু এগুলো আমি ভাবতেই চাই না। সারাদিনই তো এসব নিয়ে থাকি। আজকে ফেরার পথেও তো এসব ভাবছিলাম। প্রতিদিনই ভাবি। মানুষ কেমন প্রাণী! একটা সময়ে, যখন শিশুর মতো ভাবতাম, তখন সারাদিনের চিন্তাগুলো কতোই না অন্যরকম ছিল।


“আজকে কি আম্মা আইসক্রিম কিনে দিবে?” (পলিথিনের লাঠির ভেতরে কমলা রঙের আইসক্রিম পাওয়া যেত। ওটা খেলেই মুখে ঠাণ্ডা লাগতো! আর ঠোঁট-জিহ্বা সব লা…ল হয়ে যেতো!) “দিবে তো?”
“কালকেই আমার রাবারটা ফেরৎ নিতে হবে নাজমুলের কাছ থেকে। ওর ভাবভঙ্গি সুবিধার না। নিয়ে নিলে আমি অতো সুন্দর রাবার কোথায় পাব?”
“ইস! খেয়াল করি নাই। জুতাটা ময়লা হয়ে গেল! এখন? আম্মা তো চেইতা ফায়ার হয়ে যাবে। কী বিপদ!!”
এরকম নিরন্তর-দুশ্চিন্তাগুলো কেন হারিয়ে গেল? কবে এভাবে ভাবা বন্ধ করেছি মনে নাই। কোন নোটিশ এসেছিল কি? "অদ্য রবিবার হইতে এই সকল অনুৎপাদনশীল বিচ্ছিন্ন চিন্তাক্রিয়া রদ করিতে নির্দেশ দেয়া হইলো। আদেশক্রমে, কর্তৃপক্ষ।"
কই, আসে নাই তো এমন কিছু। তাহলে আমি কেন এভাবে সব বদলে ফেলেছি? এখন সেগুলো চিন্তা করে হঠাৎ বিষাদ কামড়ে ধরলো। ঘুনঘুনে কাশির মতো দলা দলা দুঃখ বুকের মধ্যিখানে জমে রইলো।
আমি আজকাল কেবলই অফিসের কথা ভাবি। বাবা-মা'র কথা ভাবি, বুড়ো হয়ে গেছেন ওঁরা। মাঝে মাঝেই অসুখ-বিসুখ। বয়স হলে মানুষ একটু ঘ্যানঘ্যান করা শুরু করে। খুব ক্লান্ত থাকলে আমিও হয়তো কটু কথা বলে ফেলি আর একটু পরেই সেজন্যে খারাপ লাগে। তাঁরা তো কিছু বলেন না, অভিমান চেপে রাখার একটা সিন্দুক আছে ওঁদের দু'জনেরই...
আমার বন্ধুগুলোকেও দেখি সবাই ব্যস্ত। চাকরি, সংসার, ছেলে-মেয়ের স্কুল আর বেতন, চাল-ডালের দাম, সরকার, ট্যাক্স, ফ্ল্যাট-লোন এসবেরই চিন্তা করে সারাদিন। কেউ কেউ আরেকটু সময় পেলে ব্যক্তিগত হয়। “মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে, রাতে ঘুম হয় না” ( শুনে আমি তাকে আপন ভাবি, আমার মতোই তো!)। কেউ কেউ “অফিসের সহকর্মীর সাথে...” “বাসায় বনিবনা নাই। ছোট ছেলেটা...” বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে থেমে থেমে। আমি বুঝি, আর দেখি ওদের শার্টে, কামিজে লেগে থাকা শৈশবের সব রঙ, ঝিমধরা দুপুরের ফেরিওয়ালারা নিরাশ হয়ে নিরুদ্দেশ হয়।
আমিও কি ওদের মতোই হয়ে গেছি না কিছুটা? এই জীবনটা, এভাবেই পেরিয়ে যাচ্ছি সব সেকেন্ড-মিনিট-দিন-সপ্তাহ। সারাদিনের একটাই কার্যকর চিন্তা, তা হলো অফিসের কাজগুলো ঠিকঠাক করছি কী না। এমনকি এই ফর্শা হয়ে ওঠা ভোরের কাছাকাছি সময়েও আমি তাই ভাবছিলাম! এখনও?
পাশে হঠাৎ নড়াচড়া শুরু হয়। কাঁথার নিচে পরিচিত শরীর নড়ে। পা দুটো বুঝতে পারি। এমনকি চওড়া পিঠের আদলটাও স্পষ্ট। ক্রমশ ঝটপটানো। পাখির পাখার চেয়েও দ্রুত। ছোটবেলায় একটা খোঁড়া পাখি ধরেছিলাম দু'হাতের মাঝে। সেই ধুকপুকানির মতো বিছানা দুলে ওঠে! কী হচ্ছে! কী ঘটছে! প্রবল আশঙ্কায় আমি আমূল কেঁপে উঠি।
আমি বিছানা থেকে সরে গিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। মনে হচ্ছে ধপ করে পড়ে গেলাম। পায়ের মাঝে একেবারেই সাড় নাই। দ্রুত ভাবার চেষ্টা করি, হয়তো অনেকক্ষণ বসে থেকে ঝিঁঝিঁ ধরে গেছে। এখনই আবার এটাও টের পাই যে আমার পুরো শরীরেই আর কোন ভারবোধ নাই। একটু আগেও যে কুঁজো হয়ে বসে ছিলাম, সেই ওজনটা টের পাই না আর। ফর্শা চাদরের নিচে শরীরটা ততক্ষণে নিথর। বাইরের আকাশটাও চাদরের মতোই... ফর্শা ধাঁধানো রঙ নিচ্ছে। জানালার সামনে তারজালি। মাঝখানে কাঁচ। তার বাইরে গরাদ। ওপাশে দূরে, অনেক দূরে, আকাশের শেষমাথায় নিঃশব্দ দুদ্দাড়ে কমলা ভোর আসছে। ঠিক স্কুলের বাইরের সেই আইসক্রীমের মতোন। আমি ভরহীন হয়ে আশৈশব আকাঙ্ক্ষার কমলা আইসক্রীমের দিকে তাকিয়েই থাকি!




***

সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০০৯

শৈশব-ইন্দ্রিয়ের গান

ঘুড়ির লেজে করে উড়ে গেছে দুরন্ত আটপৌরে রোদ। শরীরে ঘুমপ্রিয় ক্লাশরুমেরা একা একা অযথাই ফাঁকা হয়ে বসে থাকে। ক্লাশের মেয়েরা বেণীর পেছনে মেঘের দরজা খুলে নেমে আসে, ওড়নাপ্রান্তে বেঁধে নিয়ে নিজ নিজ হোমওয়ার্ক। হাত বাড়িয়ে মেঘপ্রান্তের ঢেউ ছুঁয়ে দেখেছি, সেখানে শুভ্র রাতের ওপারে কুসুম কমলা ভোর আঁকা। পানিতে ঢেউ কেটে কেটে একবালিকার অবসন্ন রাত থরথরিয়ে ওঠে, দ্রুত নেমে যায় নিঠুর কাঁপন! যেমন ভেবেছি: কাটাকুটি খেলার গোপন টিফিন-আওয়ার, টয়লেটের দেয়ালে দ্বিমাত্রিক স্তন আর সুগোল উরু ঝাঁজালো অ্যামোনিয়ার সাথে নাসা অন্দরে, চোখের ভেতরে, খুলির নিবিড়ে, গোপনে ঢুকে পড়ে আর প্রসারিত বস্তির উল্লাস মাপে। কাদা-মাখা ন্যাংটো শৈশব হি হি করে হেসে দেয়, জানে উস্থূর নগ্নতায় মিশে যাবে সকল কোলাহল, অবিমিশ্র হাসি আর গান। আহা, বিষণ্ণ দুপুর-ভাঙা হলুদ ফিতে, ছাদে নেড়ে দেয়া ভিজে সালোয়ারের কুঁচি শুকোনোর পরেও সিক্ত মনে হয় আর সেখানে চিলেকোঠার পুরোনো বালিশ গোলাপী দাগের মত সারাদিন তাকিয়ে থাকে।



----

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০০৯

আমরা যেভাবে মেঘ মাপি

বোদলেয়ারে বিশ্বাস নাই, ব্যাটা ভণ্ড প্রতারক
আমাদের চোখে আশ্চর্য মেঘদল গুঁজে দিয়ে
বেকুব মরণের ওপারে চলে গেছে চুপচাপ।
আমরা কতিপয় অসহায় সংহার তার
বিস্ফারিত চোখে খুঁজি ফাঁকা নীলাকাশ,
তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমাদের আকাশ
নীল থেকে ক্রমশ ধূসর হয়;
এবং আমাদের অমনোযোগে
চামড়ায় রেখাপাত,
প্রবল বাতের টান পূর্ণিমায়,
আর গিঁটের অশক্ত কাঁপন জমতে থাকে।
আমরা বেখেয়ালী তবুও আকাশেই মেলি চোখ
নিষ্পলক চাহনি পিঁচুটি জমে ঢেকে যায়
তারপরে আমরা ক্লান্ত হয়ে ঘাড় নামিয়ে আনি।
ঠিক তখনই চতুর শার্দুলের মতোন
উঁচু আকাশের রিখ্টার কাঁটা দুলে ওঠে
আমাদের হেঁট মাথায় ছায়া ফেলে
উড়ে যায় বোদলেয়ারের প্রিয় মেঘদল।

শনিবার, ৭ মার্চ, ২০০৯

রাজপথ


প্রবল আলো-মাখা পথ মৃদু ঝাঁকিতে
আমার সামনে তাতাথৈ নৃত্যে মাতে
আমি শুধু সেইপথে নিজেকে ধরে রাখতে চাই।
আকাঙ্ক্ষার গায়ের রঙ জানা নেই বলে, আমি
নিয়মিত ব্যর্থ হই, মগ্ন হই, শ্রান্ত হই


পরাক্রান্ত গোলাকার অতিকায় মহীরুহ
চোখের সামনে স্ট্রীটলাইট বনে যায়,
কিংবা বিপরীত নিয়মে কিছু হলুদ সোডিয়াম
বিম্বিসার বনের মাঝে আমাকে ডাকতে থাকে।
এহেন চাতুর্যে অবাক হলেও কিছু করার থাকে না
বহুরূপী মানুষের চেয়ে কোমলাভা সোডিয়াম লাইট ভালো


সমুখের রাত তাকে কুর্নিশ করছে- এমন বিভ্রম ঘটে
এবং চকিতেই আমি পুরো ঘটনাটি বুঝে উঠতে পারি
হা লুম্বিনীর রাত!
অবোধ্য চিৎকার মেখে নিথর থমকে থাকো!


জন্মান্তর হবে না জেনে গৌতমের কেমন লেগেছিল
সেই সত্য আমার কাছে পরিষ্কার হয়!




***