শনিবার, ১১ আগস্ট, ২০১৮

গুজব

তারপর ছায়া সরে যায় একদিন
বেখেয়াল বাসের রুট থেকে হুট করে নেমে
ঝিম ধরা রোদের দুপুর শুনশান ভিড়
কাছেই অজ্ঞান শিশু কোলে ভিখারি
হাত বাড়িয়ে আমার সব নিয়ে নিতে চায়

শান্ত কুকুরের মতো লেজ নাড়াই, আশা
একদিন ঘুম ভেঙে যাবে, দেখবো দিকে দিকে
জেগে উঠছে কান্নাভেজা রক্তলাল সৌধ

শনিবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৭

প্রসাধন

শেষমেশ ঘরে ফিরে আয়নায় দেখা যায়- পলেস্তারা 
খসে খসে জায়গায় জায়গায় ইট, কাঠ, সিমেন্টের বিবিধ 
কাঠামো বেরিয়ে গেছে। ত্বকের গভীরে লুকানো 
রিরংসা গ্লানিময় শৈবালের মতো ছেয়ে গেছে। কোথাও
দগদগ করছে অহমের ক্ষত, কোনো এক অতীত আঘাত- 
আয়নার পেছনের শেল্‌ফ খুলে দেখি, সাজানো ওষুধের
মাঝখানে আত্মরতির মলম, ডাক্তারের নিষেধ-সত্ত্বেও 
বিনা দ্বিধায় মেখে মেখে ঢেকে ফেলি মুখের মুখোশ। 

মঙ্গলবার, ৫ জুলাই, ২০১৬

নট সেইফ ফর ওয়ার্ক | N.S.F.W.

প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ! দোহাই লাগে ওদেরকে ভালোবাসার ঠাপ দিন। ভালোবাসার ঠাপের অভাবে ওরা ধুঁকছে পুরনো দশটনী ট্রাকের এঞ্জিনের মতন। প্রতিটি ভালোবাসার ঠাপ দশ টাকা। কীভাবে ভালোবাসার ঠাপ দিতে হয় সেই ম্যানুয়াল পড়ে নিন অনলাইন সেলিব্রেটিদের লেখায়। তারা বিস্তারিত লিখেছেন কীভাবে ভালোবাসার ঠাপই আইসিসের জঙ্গিদের একমাত্র চাওয়া। এই ঠাপ খেলে তারা বন্দুক হাতে হাসিমুখে ছবি তুলবে না। এই ঠাপ পেলে তারা আর বেকারিতে ঢুকে আস্তে আস্তে জবাই করবে না সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বাকে। চলুন আমরা খুঁজে বের করি আরও অনেক ঠাপাভাবে দুস্থ জঙ্গিকে। যারা এখনো আশা করে আছে কেউ এসে তাদেরকে ঠাপাবে। তবে দ্রুত ঠাপ না পেলে ভালোবাসা না খেলে তারা এদের মতই বন্দুক হাতে ছবি তুলবে। অচিরেই ঢুকে পড়বে অন্য কোন খাবারের দোকানে কিংবা সুপার-মলে কিংবা আবাসিক বারান্দায় কিংবা সংসদে কিংবা পাবলিক বাসে কিংবা এয়ার-কন্ডিশন্ড অফিসঘরে। গলা কেটে দিবে নারীদের কিংবা কিশোরদের কিংবা বৃদ্ধদের কিংবা স্লিভলেস পরিহিতাদের কিংবা শ্বেতাঙ্গদের কিংবা ছাত্রদের কিংবা বন্ধুদের কিংবা মানুষের! আরিফ কিংবা ফারুকী কিংবা আনিসুল কিংবা তাদের লেখায় লাইক চাপা তিন লাখ ভালোবাসার ঠাপ দিতে উৎসাহী বাংলাদেশি তাদেরকে ঠাপায় নি কোনোদিন।

তাই আসুন এই ভালোবাসা দিবসে আমরা ইভেন্ট খুলি। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মিলমিশিয়ে দেই ঠাপাভাবে ভুগতে থাকা এইসব দুস্থ জঙ্গি আর ঠাপাতে আগ্রহীদের। দাতা-গ্রহীতার এই অবোধ্য পাশবিক মিলন ঘটুক আর আমরা বেঁচে যাই বরং!

মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৬

রূপবান!

আজকে একটা দরকারে ডাক্তারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তার কাছে কিছু বিষয় জানার দরকার ছিল। অপেক্ষাগৃহে বসে নামধাম পূরণ করার কিছুক্ষণ পরে ডাক এলো। হাসিমুখে ডাক্তার এসে কথা বললেন। শান্তভাবে সমস্যার কথা জানানোর সময় কম্পিউটারে লিখে নিচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে কিছু প্রশ্নও করছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে সমাধান আর করণীয় ব্যাখ্যা করলেন। কী কী করতে হবে বলার সময় পাশে রাখা একটা নোটপ্যাড নিয়ে লিখে দিচ্ছিলেন। খেয়াল করলাম, ডাক্তার বাঁহাতি। সামনে বসে বাঁহাতি কারো লেখালেখি দেখতে বেশ মজা লাগে, কারণ বেশিরভাগ মানুষই (প্রায় ৮৭-৯২%) ডানহাতি। সচরাচর দেখা যায় না বলে হাতের আঙুলের নড়াচড়াগুলো অদ্ভুত সুন্দর লাগে। যখন ক্যাডেট কলেজে পড়তাম, তখন আমার আগের ক্যাডেট নম্বরের বন্ধু বাঁহাতি ছিল। ভর্তি হবার পরে আমাদেরকে ক্যাডেট নম্বর অনুযায়ী থাকতে হতো। পরে এলোমেলো হলেও ছয় বছরের তিন বছরই এই বন্ধুর পাশের জায়গাতেই থেকেছি। প্রথম দিকে ওর লেখার সময় হাতের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, স্রেফ কৌতূহল থেকেই। ও কেমন করে অক্ষরগুলো লিখছে, দেখতে মজা লাগতো।

বাংলাদেশের সমাজে অজস্র কুসংস্কারের মধ্যে একটা হলো যে বামহাত = খারাপহাত, আর ডানহাত = ভাল হাত। কে কবে কীভাবে এই ফালতু নিয়ম আবিষ্কার করেছে, কে জানে! (আমার আজকাল ধারণা হয় বাঙালিদের কুসংস্কারগুলো পায়খানাঘরে গেলে তৈরি হয়। হাগু করতে করতে অলস সময়ে এসব 'হাগু-ক্যাটাগরি'র আইডিয়া মাথায় আসে।) মানুষ একটা চমৎকার প্রাণী, যার দুইহাতই সমান কর্মক্ষম। আজ আমরা জানি যে বামহাত ডানহাতের কোন ভাল-খারাপ নেই। যে যে হাতে দক্ষ, সে সেই হাতে কাজ করতে পারে। বামহাতকে 'খারাপ' বলার মূল কারণ বাঁহাতিদের স্বল্পতা হতে পারে। সাধারণত বাঁহাতির সংখ্যা ১০%-এর মতো, অর্থাৎ গড়ে প্রতি নয়জনে একজন বাঁহাতি হবে। যেহেতু এটা সচরাচর দেখা যায় না, তাই ওই নয়জনের ডানহাতি হওয়াটাই 'স্বাভাবিক' আর একজনের বাঁহাতি হওয়াটা 'অস্বাভাবিক' বলে মিথ্যা নিয়ম বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। এই নিয়মের চক্করে পড়ে আমাদের দেশের অনেক বাঁহাতিকেই ছোটবেলায় লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হতে হয়। বাঁহাতে লেখা বা ধরার সময় মেরে-পিটিয়ে তাকে ডান হাত ব্যবহার করতে শেখানো হয় (আমার নিজের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেই এমন ঘটনা আছে)। আজ আমরা জানি যে শিশুকে তার দক্ষ হাত ও পা ব্যবহার করতে না দিলে সেটা  তার মস্তিষ্কের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সে যতটা চটপটে হতে পারতো, ততটা হতে পারে না। চিন্তা করুন এভাবে কত মানুষকে কষ্ট করে নিজের কম দক্ষ হাতে লিখতে, খেতে, ধরতে শিখতে হয়েছে!

মানুষ হবার একটা সীমাবদ্ধতা হলো আমরা অন্যের অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারি না। এজন্য অনেকসময়ই তাদের অভিজ্ঞতাকে তুচ্ছ মনে করি। এই হাতের সক্ষমতা তার একটা ভাল উদাহরণ - সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানুষ হবার পরেও পরিসংখ্যানে কম পাওয়া যায় এমন বৈশিষ্ট্য থাকায় একজন মানুষের ওপরে নানাভাবে আমরা অন্যায় বোঝা চাপিয়ে দেই। কখনো বুঝেশুনে দেই, কখনো অজান্তেই দেই। এরকম আরও অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই কালো বা বাদামি বর্ণের। এই রঙের কোন ভাল-খারাপ দিক নেই। তারপরেও যারা অতিরিক্ত কালো বা অতিরিক্ত সাদা, তাদেরকে নানাভাবে হেয় করা হয় না? বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই গড়ে সাড়ে পাঁচ থেকে পৌনে ছয় ফুট (পুরুষ) আর পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ফুট (নারী) হয়ে থাকেন। এই সীমার বাইরে যারা অতিরিক্ত লম্বা বা অতিরিক্ত বেঁটে, তাদেরকে কি হেয় করা হয় না? বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ মুসলমান। এর বাইরে যে যে ধর্মের মানুষ আছেন, তাদেরকে কি নানাভাবে হেয় করা হয় না? এই বৈশিষ্ট্যগুলো কিন্তু কেউ বুঝেশুনে বেছে নেয় না, বা খেটেখুটে অর্জনও করে না। জন্মের আগেই আমাদের ডিএনএ'র সংকেতের মধ্যে লেখা হয়ে যায় আমরা পুরুষ-নারী, লম্বা-বেঁটে, ফর্সা-কালো, ডানহাতি-বামহাতির মধ্যে কোনটা হবো। আমাদের বাবা আর মায়ের জিনের বৈশিষ্ট্যকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই! আর জন্মের পরপরই ঠিক হয়ে যায় আমরা কোন ধর্মের মানুষ হবো। এরকম random, arbitrary, coincidental, accidental বৈশিষ্ট্য দেখে আমরা কত সহজেই মানুষকে অপমান করি, তুচ্ছ করি। 

কী অদ্ভুত পরিহাস! যেটা আমরা নিজেরা বেছে নেই না, যাতে আমাদের নিজেদের কোন হাত নেই, তার কারণে সারাজীবন কষ্ট পেতে হয়। এটাই সমাজের নিয়ম! অথচ যে বিষয়গুলো আমরা নিজেরা ভেবেচিন্তে বেছে নেই, সেগুলোর কারণে আমাদের এতোটা জ্বালা-যন্ত্রণা পোহাতে হয় না।

নিজের ইচ্ছায় বেছে না নেয়া আরেকটা বৈশিষ্ট্য আছে, আমাদের লিঙ্গ (sex) আর যৌন-পছন্দ (sexual preference)।  মনে করার চেষ্টা করুন তো, বয়ঃসন্ধিতে যে মানুষটিকে ভাল লাগতো, সেটা কি আপনি নিজের ইচ্ছায় বেছে নিতেন? নাকি ব্যাখ্যার অতীত এমন এক অনুভূতি এসে আপনাকে টালমাটাল করে দিতো? আপনি ছেলে বা মেয়ে বা বৃহন্নলা, যাই হন না কেন, কাউকে ভাল লাগার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। আপনি বড়োজোর বলতে পারেন পছন্দের মানুষটির কোন কোন দিক আপনার ভাল লাগে। আমাদের যৌন-পছন্দ প্রধানত শারীরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। আমরা অন্য মানুষের শারীরিক কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হই। কিন্তু এটাই একমাত্র নিয়ম না। আমাদের মধ্যেই কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাদের যৌন-পছন্দ মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। শারীরিকভাবে আপনি যতই আকর্ষণীয় হন না কেন, যদি তারা মানসিক আকর্ষণ বোধ না করে, তাহলে আপনাকে ততটা পছন্দ করতে পারবে না। যদি আপনি প্রথম গ্রুপের  হয়ে থাকেন, তারপরেও মানসিক আকর্ষণের প্রভাব কিছু পরিমাণে আপনার মধ্যেও আছে। অনলাইনে বা ফোনে যখন কারো সাথে পরিচিত হয়ে আকর্ষণ বোধ করেন, কাউকে সামনাসামনি না দেখেই, সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? শুধুমাত্র গলার স্বর বা টাইপকরা অক্ষর দেখেই কি আকৃষ্ট হন না? পরে হয়তো শরীরের টান ছাপিয়ে যায়। অন্য গ্রুপের ক্ষেত্রে উল্টোভাবে ঘটে - সামনাসামনি দেখে ভাল লাগা হতে পারে, কিন্তু প্রচণ্ড আকর্ষণ তৈরি হয় মানসিক স্টিমুলেশনে, যা শুধু অন্যজনের কথা বা চিন্তাতেই সম্ভব। এই দুই ভাগ ছাড়াও আরও বিচিত্র ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভাগ আছে।

এখন বলুন, এদের মধ্যে কোনটা খারাপ? আর কোনটা ভাল?

নিয়মটা কি আপনি ভেবেচিন্তে তৈরি করেছেন? নাকি অন্য কেউ আপনার জন্য তৈরি করে রেখেছে? যে তৈরি করেছে, সে যে সবকিছু জানে বা বোঝে  - এমন তো নাও হতে পারে। আগেই দেখলাম যে আমরা অন্যের অভিজ্ঞতা বুঝতে অক্ষম, তাই জেনে না-জেনে অপরকে অপমান করি। ওটা যদি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে এটাও ভুল। অন্যের অভিজ্ঞতা যেহেতু আপনি জানেন না, সেহেতু আপনার কোন অধিকার নেই তাকে হেয় করার। খেয়াল করে দেখবেন, অন্যরা কিন্তু আজ এসে আপনাকে বলছে না যে আপনি নিজের পছন্দমতো কাউকে ভালবাসতে পারবেন না (আজকাল বাবামায়েরাও অনেক সময় বলতে পারে না)। যারা বলে, যারা জোর করে চাপিয়ে দেয়, তখন আপনার কেমন লাগে? খুব খারাপ লাগে না? ভালোবাসার মানুষকে না পেলে সবারই খারাপ লাগে।

আমরা যেসব পুরানো ক্লাসিক গল্পতে মজা পাই, তার প্রায় সবগুলোই প্রেম-ভালবাসার। আর সেসবের অধিকাংশই কোন না কোন কারণে বাধা পেয়েছিল। কখনো পরিবার, কখনো সমাজ, কখনো বয়স, কখনো যুদ্ধ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভালোবাসার মাঝে। মুনীর চৌধুরীর "রক্তাক্ত প্রান্তর" মনে আছে? ইব্রাহিম কার্দি আর জোহরার প্রেম? কিংবা লাইলী-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট, দেবদাস-পার্বতী, অমিত-লাবণ্য, কুবের-কপিলা? এরকম অসংখ্য দুর্দান্ত গল্পের মিল কোথায় বলুন তো? এগুলো সবি মানুষের বিচিত্র, অব্যাখ্যাত, বর্ণনাদুঃসাধ্য ভালোবাসার জয়ের গল্প। পাত্রপাত্রী মোরে গেলেও যেখানে ভালোবাসা জিতে যায়। এগুলোকে আপনি accept করে নিতে পারছেন কীভাবে? পারছেন কারণ এদের প্রেমে আপনার কিছু যায় আসে না। এরা বিয়ে করলে আপনি টাকা পাবেন না, এরা মরে গেলেও আপনার চাকরি চলে যাবে না। সুতরাং কোন দুজন রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষের প্রেমের মাঝখানে বাগড়া দিয়েন না। তারা যদি সরাসরি আপনার কোন ক্ষতি না করে, তাহলে তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দিন। কড়াভাষায় যাকে বলে, "নিজের চরকায় তেল দিন"।

আর তারপরেও হয়তো আপনি ভাবছেন, "আমার কিছু যায় আসে না, কিন্তু তবু এটায় সমাজের ক্ষতি, মূল্যবোধ অবক্ষয়, সংস্কৃতির অপমান" ইত্যাদি। তাই আমি এই বিষয়ের বিরোধিতা করবোই", তাহলে বলতেই হয়, যে আপনি আসলে একজন *** ভাই। আপনার জীবনে কাজের এতোই অভাব যে আপনি অন্যের ভাল থাকা দেখতে পারেন না। পায়খানায় বসে বসে ফন্দি আঁটেন কীভাবে অন্যের ভাল থাকায় বাগড়া দেয়া যায়। সমাজে আপনার ইনপুট অতোটুকুই! আপনি মরে গেলে মাটির তলে পঁচবেন বা আগুনে ভস্ম হবে। দুইক্ষেত্রেই আপনাকে কয়েকদিন পরে সবাই ভুলে যাবে। আর যাদের ক্ষতি করেছেন, বা যাদের কুৎসা গেয়েছেন, তারা উঠতে বসতে গালি দিবে, "শালা একটা *** ভাই আছিলো। মরছে ভাল হইছে!"

বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ, ২০১৬

খেলাখেলি

ছোটবেলা থেকেই আমি খেলাধুলায় তেমন একটা ভাল না। যে কয়টা খেলা শিখেছি, তার কোনটাতেই আমি খুব ভাল করি নাই কখনো। যে দেশে মাঠে-ঘাটে পোলাপান ফুটবল আর ক্রিকেট খেলে, সেখানে আমার ভাল লাগতো ক্যারম আর টেবিল-টেনিস। তবু দেখা যেতো, আমি বারবার হেরেই যাই। সেই হেরে যাওয়া নিয়ে যে খুব দুঃখ লাগে, অমনও না বিষয়টা। এজন্যই কোন খেলাতেই আমি খুব বেশি পারদর্শী হতে পারি নাই।

প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে একটা সূক্ষ্ণ হিংস্রতা (ভালো অর্থে) আছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে জিতে যাওয়ার আনন্দও আছে। সেই আনন্দের জন্যই খেলোয়াড় আর দর্শকরা এতোটা মশগুল হয়। এই হিংস্রতাকে ভাল বলছি, কারণ এর সাথে আমাদের জিনের ভেতরে টিকে থাকার সঙ্কেতের সম্পর্ক আছে। প্রকৃতির প্রতিকূলতা একসময় আমাদের প্রতিপক্ষ ছিল। এর সাথে ক্রমাগত লড়াই করে আমাদের টিকে থাকতে হতো।

এখন আমরা সেই প্রকৃতিকে বশ করে ফেলেছি। হুট করে কোন দুর্যোগেও সাময়িক বিপদ কাটিয়ে আমরা সামলে উঠি। কিন্তু জিনের ভেতরে সেই লড়াইয়ের নির্দেশ তো আর এতো সহজে মুছবে না! তাই লড়াইটা নিজেরা একে অপরের সাথে করাই লাগে। এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বাজে রূপ হলো ক্ষমতার লড়াই, তথা যুদ্ধবিগ্রহ। নিজের প্রজাতিকে নিয়ন্ত্রণ করার লোভে খুন করার এই অভূতপূর্ব "মাইন্ড-বগ্লিং" কাজটা আমরা খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়েছি। আজ যদি বাইরে থেকে কোন বুদ্ধিমান প্রাণী আমাদের মাঝে আসে, তাহলে খুবই অবাক হবে যখন দেখবে যে আমরা মাটিতে কিছু কাল্পনিক দাগ কেটে সেই দাগের দুই পাশে দাঁড়িয়ে পরষ্পরকে কেটে ফেলছি।

এই লড়াইয়ের ভাল রূপ হলো খেলাধুলা। খেলায় জয়-পরাজয়ের হিসেবটা আরোপিত। খেলার নিয়ম-কানুনও আরোপিত। অর্থাৎ আমরা নিজেরাই ভেবে ভেবে এগুলো সৃষ্টি করেছি। আমাদের জিনের হিংস্রতম প্রবৃত্তিটাকে চেপে না রেখে যতটা কম হিংস্রভাবে বের করে দেয়া যায়, সেই চেষ্টাই আমরা সাধারণত করে থাকি। এখানে উল্লেখ্য যে খেলার নামে মেরে ফেলার খেলাও আমরা একসময় খেলতাম। তবে এখন সেগুলো বাতিল হয়েছে, রক্ষা!

আদিম প্রবৃত্তিকে খেলার মাধ্যমে বের করে আনা তো গেল। কিন্তু খেলা শেষ হলে সেটাকে আবার বাক্সে পুরবে কে? এ যেন প্যান্ডোরার বাক্সের মতো, খুললেই বেরিয়ে আসে ক্রোধ, ভেদাভেদ, হিংস্রতা, ঘৃণা, জিঘাংসা, জিগীষা।... সাথে আরও আসে সতীর্থ খেলোয়াড়দের প্রতি একাত্মতা, দলের প্রতি প্রতিজ্ঞা, অধিনায়কের প্রতি আনুগত্য, আত্মত্যাগ, দেশপ্রেমের মতো হিতকর অনুভূতি। এই সবকিছুরও দুইটা ভাগ করা যায় তাহলে - খারাপ আর ভাল অনুভূতি। প্রথমে যেগুলো বললাম, সেগুলোকে আমি খারাপ অনুভূতি মনে করছি। কারণ এই অনুভূতি একদিকে মনকে বিষিয়ে তোলে, অপর মানুষকে শুধুমাত্র একটা প্রতীকে পরিণত করে। মানুষ হিসেবে আপনি আরেকজন মানুষকে শুধুই একটা প্রতীকে চিন্তা করতে পারেন না। যখনই তা করবেন, তখন এক পিচ্ছিল পথ ধরে পড়ে যাবেন। যে পথ দিয়ে আপনার আগে আরো অনেকেই পড়েছে। যে পথের শেষে আছে অপরকে খুন করে সে রক্তে উল্লাসের গন্তব্য। সে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ার আগে ফিরে আসুন। আপনার যদি নিজের দেশকে সমর্থন দেয়ার অধিকার থাকে, তাহলে অপর একজন মানুষেরও অধিকার আছে তার দেশকে সমর্থন দেয়ার। সে যদি ঐ পিচ্ছিল পথে যেতেও চায়, যাক। আপনি কেন যাবেন সে পথে?

পরে যেগুলো বলেছি, সেগুলো হিতকর অনুভূতি। কারণ এর প্রতিটিই আপনাকে আরেকজন মানুষের সাথে ঐক্যের অনুভূতি দেয়। আপনি বোধ করেন যে আপনার সতীর্থরা আপনার কাছের মানুষ। তাদেরকে আপনি আপনার সমান মনে করেন। দেখবেন এই অনুভবটা খুব সুখের, যা দৈনন্দিন কষ্টকেও কমিয়ে দেয়। খেলোয়াড়রা এই অনুভূতিগুলো সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করে, দর্শকরাও করে কিছু কম মাত্রায়, তবে করে বৈ কী! এই যে একতাবদ্ধতা, এই যে অপর মানুষকে সমান ভাবা - এর থেকে আপনার মনে সহমর্মিতার (empathy) সৃষ্টি হয়। আমাদের বিবর্তনে এই অনুভূতিটাই সবচেয়ে হিতকর এবং উচ্চমানের অনুভূতি। প্রতিপক্ষকে হারানোর চেয়েও নিজপক্ষকে জেতানোর দিকে তখন মনোযোগ দেয়া যায়।

পৃথিবীর বিভিন্ন খেলায় যারা সেরার সেরা, তাদের বক্তব্যগুলো একটু খেয়াল করে দেখবেন, তারা কেউই প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করে কিংবা হারিয়ে-জুতিয়ে-মাড়িয়ে ফেলতে চায় নি। তারা শুধুই নিজেদের কৌশল, পারদর্শিতা, দক্ষতাকে সুউচ্চে নিতে চেয়েছেন। যে কোন খেলার গ্রেটদের মাঝে এটা কমন বৈশিষ্ট্য। এটাকে আমরা অনেক সময় বিনয় বলে ভুল করি। যাদের মাঝে এই বৈশিষ্ট্য নেই, তারা সেই খেলায় গ্রেট হতে পারে নি। কোনদিনও পারবে না। লিখে দিলাম, চেক করে দেখতে পারেন।

[২]

খেলা চলছে। খেলার উত্তেজনায় অনেক কিছুই আমরা বলি। ভেতরের কালি বেরিয়ে আসে, যা দিয়ে লিখি উল্লসিত অক্ষর। কিন্তু খেলার পরে সেগুলো থেকে নেতিবাচক অনুভূতিগুলো প্লিজ সরিয়ে ফেলুন। আপনার নিজের জন্যই। ইতিবাচক অনুভূতিগুলোকে সাজিয়ে রাখুন। সেটাও নিজের জন্যই। দেখবেন ভবিষ্যতে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ভাল অনুভূতিগুলোকেই মনে পড়বে।

চারপাশে অনেকেই নেতিবাচকতাকে উসকে দিচ্ছেন। নিজের উগ্র জাতীয়তাবাদের সাপটা ফোঁসফোঁস করছে। সেই সাপকে জাস্টিফাই করছেন "ওরাও তো অমুক তমুক করেছে/বলেছে/লিখেছে/এঁকেছে" ইত্যাদি বলে। সেই পিচ্ছিল পথ! একটা খারাপ তুলনা দেই এ'বেলা। অনেকটা এমন যে, কেউ ল্যাট্রিনের গু তুলে সারা পাড়া মাখিয়ে বেড়াচ্ছে বলে আমিও কিছু গু হাতে তুলে নিলাম। আপনি নিজেও হয়তো বুঝতে পারছেন যে আপনার কথাগুলো উগ্র, এবং এটার সমর্থক অল্প। আপনি যে বা যার কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে এমন করছেন, তারাও 'অধিকাংশ' না, অত্যন্ত ছোট একটা গ্রুপ। আপনারা দুই গ্রুপই বারবার করে এমন করছেন কেন? যাতে দলে ভারী হতে পারেন। একইভাবে বিভিন্ন রাজনীতিবিদও বারবার করে এধরণের কথা বলেন। আস্তে আস্তে তারা দলে ভারী হয়। কেউ উঠে দাঁড়িয়ে তাদের থামতে বলে না। খেলার উত্তেজনা একদিন জাতিগত উন্মাদনায় পরিণত হয়।

প্রতিটি উন্মাদনাই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। কপাল খারাপ হলে চিরস্থায়ী। আজ এশিয়ার উপমহাদেশে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের অসংখ্য কামড়াকামড়ি দেখে ঔপনিবেশিক প্রভুদের প্রেতাত্মারা ফ্যাকফ্যাক করে হাসছে! কী যাদু করিলাম রে বন্ধু - বলে একে অপরের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে। নাতির ঘরের পুতি বুড়ো হয়ে গেল, তবু জাতি-ধর্ম-বর্ণবিদ্বেষ কাটাতে পারলো না। সামান্য সাড়ে তিন ঘন্টার খেলার খোঁচায় দগদগে ঘা বেরিয়ে গেলো!..

[৩]

এই নেতিবাচকতা থেকে মুক্তি অচিরেই আসবে বলে মনে হয় না। দূরে থাকার চেষ্টা করছি যতোটা পারি। আজকে বাংলাদেশ পুরুষ দলের খেলা নেই। তবে বাংলাদেশ নারী দলের খেলা আছে। গত ম্যাচের আগে তাদের ছোট ছোট সাক্ষাৎকার দেখছিলাম। জাহানারা, ফাহিমা, রুমানা, সালমা, আয়েশাদের চোখে মুখে দীপ্ত বিশ্বাস - বিশ্বপ্রতিযোগিতার দরবারে তারা দেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন। নিজেদের সর্বোচ্চ সামর্থ দিয়ে জয় ছিনিয়ে আনবেন। বাংলাদেশের সমাজ নারীদের জন্য ক্রিকেট খেলা বা যে কোন খেলাই পেশা হিসেবে নেয়ার পথে অসংখ্য প্রতিকূলতার কাঁটা বিছিয়ে রেখেছে। তাদের নিবৃত্ত করতে, হতাশ করতে আমরা চেষ্টার কোন ত্রুটিই রাখি না। এই চর্চা ঘর হতে বাহির পর্যন্ত বিস্তৃত। তারপরেও সেসব কাঁটার তোয়াক্কা না করে তারা এতোদূর পৌঁছে গেছেন। অথচ অবাক ব্যাপার কি জানেন? তাদের বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। তারা শুধুই আপনার সমর্থন চান। ভেবে দেখুন, এই প্রতিকূলতার ভগ্নাংশ আপনার স্বপ্নপূরণের পথে থাকলে আপনি কতোটা নালিশ করতেন! তারা সেসব কিছুই না করে নিজেদের স্বপ্নটুকুই সার্থক করতে চলেছেন। (আবারও সেই নেতিবাচক বনাম ইতিবাচকের পাল্লা এবং ইতিবাচকতার জয়)। আজ তাই বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের জন্য শুভকামনা জানাই!

দুটো বিশ্বকাপ চলছে। পুরুষদল ছোট প্রতিপক্ষকে হারালেও বড়োদের এখনো হারাতে পারে নি। মনে মনে আশা করছি নারীদল বড়ো প্রতিপক্ষকে হারাবে আজ। সেই উদাহরণ থেকে পুরুষদলও জয়ের মুখ দেখবে! জয় বাংলা!

বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৬

দেশ

একাকী ছাইগোলা ঘোলাকাশে ধূসর বিমান উড়ে যাচ্ছিল। বিবর্ণ বৃক্ষের বাহু উর্ধ্বপানে বিস্তৃত- আকুল প্রার্থনারত মরণোন্মুখ বৃদ্ধকে মনে পড়ে। মনে পড়ে গত জন্মের ছেড়ে আসা ঘর ফেলে আসা উঠান মুছে যাওয়া ব্যালকনি। সে ঘরে কেউ নেই, সে উঠানে নেই পত্রপল্লবিত ঝিলিমিলি ছায়া, ব্যালকনিতে নেই টাঙানো দড়িতে ভেজা কাপড়ের সারি। মনে পড়ে কোন এক জনপদে আমি ছিলাম। সে জনপদ আর আমি একে অপরকে ক্রমেই ভুলে যাই।

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৫

হিজাবের বিমানবিকীকরণ

প্রায় মাসখানেক আগে হিজাব নিয়ে একটা খবর দেখেছিলাম। তেহরানের কোর্টে দুইজন নারীকে হিজাব ঠিকমতো না পরার কারণে নব্বুই লাখ রিয়াল জরিমানা করেছে। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় বিশ হাজার টাকার সমান। ১৯৭৯ সালের মুসলিম বিপ্লবের পর থেকে ইরানের নারীরা বাইরে বের হলে হিজাব করা বাধ্যতামূলক। সম্প্রতি এরকম অনেকগুলো মামলা হয়েছে হিজাব ঠিকমত না করার অভিযোগে, যার প্রায় প্রতিটাই দোষী নারীকে জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তি দেয়া হয়েছে। যেমন পুলিশ যদি গাড়ি চালানোর সময়ও কোন নারীকে ধরে, যার হিজাব খোলা বা ঢিলেঢালা, তাহলে তার গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

এটা তো গেল ইরানের কথা। বাংলাদেশে নারীদের হিজাব করার ব্যাপারে এমন কোন আইন নেই। যদিও সামাজিকভাবে অনেক নারীই স্বেচ্ছায় বা পরিবারের পুরুষদের চাপে পড়ে হিজাব করেন। আবার পশ্চিমা বিশ্বে, ইউরোপ বা আমেরিকায় মুসলমানরা হিজাব করতে গিয়ে সামাজিক নিগ্রহের শিকার হন। ফ্রান্সের মত কিছু কিছু দেশে যেমন জনসমক্ষে হিজাব পরা নিষিদ্ধ। একমাত্র তিউনিশিয়াতে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও জনসমক্ষে হিজাব করা নিষিদ্ধ।

হিজাব নিয়ে নানারকম ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক মতামত আছে। দেশ, জাতি, ও সংস্কৃতিভেদেও নানাবিধ যুক্তি ও পাল্টাযুক্তিও শুনেছি। হিজাব নিয়ে নারীবাদ এবং সেক্যুলার মতধারা থেকে শুরু করে শরিয়া এবং ইসলামিক মতধারা পর্যন্ত বিভিন্ন ‘স্কুল অফ থট’ বিভিন্ন কথা বলে থাকেন। তাই এই বেলা বলে রাখছি এই লেখার উদ্দেশ্য সেই নানা কথার ভেতরে না ঢোকা, বরঞ্চ সমাজে নারী ও পুরুষের মাঝে হিজাবের প্রভাব নিয়ে একটু চিন্তা উস্কে দেয়ার প্রচেষ্টামাত্র।

হিজাবের প্রবক্তাদের প্রধান যুক্তি এই পোশাক নারীর শালীন আব্রু হিসেবে কাজ করে। একই সাথে তা মুসলিম পুরুষকেও পর্দা করতে পরোক্ষভাবে সাহায্য করে। হিজাব নারীর সৌন্দর্যকে আড়াল করে পুরুষের কামনাকে প্রতিহত করে। পুরুষের চোখে নারী জনসমক্ষে হয়ে ওঠে কামনারহিত অবয়ব, নারীর প্রতি তার আচরণ হয় সুসভ্য। কিন্তু আসলেই কি তা ঘটে? ইরানের এক নারীর বয়ানে জানা যায়, “আমাদের শরীরের প্রতিটি অংশকে ঢেকে রেখেও যৌন-লাঞ্ছনা কমে না, ...বরং বাড়ে।” রাস্তায় হিজাব পরে বের হলেও চারপাশ থেকে ভেসে আসে অশ্লীল হিসহিস শব্দ, টিটকারি, ইঙ্গিতপূর্ণ শিসের ধ্বনি।

ব্যাপারটা কি উলটপুরাণ মনে হচ্ছে? অস্বাভাবিক হলেও একটু ভেবে দেখলে এর কারণ বুঝতে পারা যায়। এক মুহূর্তের জন্য হিজাবের ধর্মীয় পটভূমির কথা ভুলে যান। ধরুন, এটি শুধুই একরঙা একটি কাপড়ের অংশ। হিজাব একজন মানুষের শরীরকে ঢেকে দিয়ে প্রকারান্তরে তার মানবিক অবয়বটাকে আড়াল করে। হিজাব-পরিহিতের বিমানবিকীকরণ (dehumanization) ঘটে। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে আমরা সকলেই জানি যে প্রতিটি হিজাবের নিচে রক্তমাংসের একজন মানুষ আছেন। কিন্তু এমনভাবে ঢেকে দেয়ার কারণে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের আড়ালে চলে যায়। ঠিক একই ধরণের বিমানবিকীকরণ ঘটে সামরিক বাহিনীতে, পুলিশ বাহিনীতে, জেলখানায়, কল-কারখানায়। মূলত যে কোন উর্দি-পরিহিত ‘মানুষ’কে আমরা আর “স্বতন্ত্র মানুষ” বলে চিন্তা করি না। তারা হয়ে ওঠে ‘বস্তু’। সামরিক বাহিনী হয় হাঁটু-বাহিনী, পুলিশ হয় ঠোলা। মুখাবয়ব দেখা যাওয়া সত্ত্বেও স্রেফ উর্দির আড়ালটুকুতেই বিমানবিকীকরণ সহজ হয়ে ওঠে। তাহলে হিজাবের মত সর্বাঙ্গ ঢাকা কাপড়ের নিচে মানুষকে কি আর খুঁজে পাওয়া যায়? দর্শকের চোখে তাই হিজাব-পরিহিত নারী হয়ে ওঠে চলমান কাপড়ের ঢিবিবিশেষ। এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা হিজাবের আড়ালের মানুষটির সুখ-দুঃখকে অনুধাবনের সুযোগটুকুও খেয়ে ফেলে। সবচেয়ে ভয়াবহ যে ব্যাপারটি ঘটে, তা হলো হিজাব-পরিহিতাকে লাঞ্ছিত ও নিপীড়ন করার সুযোগ করে দেয়, কারণ ‘ওটা’ তো কাপড়ের ঢিবি, কোন জলজ্ব্যান্ত মানুষ না!

বাংলাদেশে নারীশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের নারীর অংশগ্রহণের কারণে এই প্রতিবন্ধকতাকে কিছুটা হলেও সীমিত করা গেছে। তবে ইরানের মতো দেশে যেখানে নারীর হিজাব বাধ্যতামূলক এবং আইনের চোখে হিজাব না করা অপরাধ, সেখানে পরিস্থিতি একেবারেই অন্যরকম। নারী পুরুষের মাঝে সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে যোজন যোজন দূরত্ব। ছোটবেলায় স্কুলে শিশুরা একসাথে পড়াশোনা করলেও বড় হবার পরে নারী ও পুরুষের গণ্ডি আলাদা হয়ে যায়। কিছুদিন আগেই ইরানি পুলিশ কফিশপ আর রেস্তোরাঁয় নারীদের কাজ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তেহরানের মিউনিসিপ্যালিটিতে কোন পুরুষ কর্মকর্তার সেক্রেটারি নারী হতে পারে না। এর কারণে গুরুতর একটা প্রভাব পড়েছে সমাজে। ইরানের এক নারীর মতে
, নারী ও পুরুষ যেহেতু একেবারেই পাশাপাশি কাজ করে না, সেহেতু হুট করে কোন পরিস্থিতিতে একজন নারী ও একজন পুরুষকে কোন কাজ করতে হলে খুবই জড়সড় এবং বিদ্ঘুটে মিথস্ক্রিয়া ঘটে। যেন প্রতিটা আলাপই কোন না কোনভাবে প্রচ্ছন্ন যৌনতার সাথে জড়িত। স্বাভাবিকভাবে নারী বা পুরুষ কেউই কাউকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না, তাদের চোখে শুধুই বিপরীত লিঙ্গের পরিচয়টা প্রকট ও মুখ্য হয়ে ওঠে।

ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা মিথস্ক্রিয়ার কারণে নারী এবং পুরুষ উভয়ের মানুষ পরিচয়ের লঘুকরণ ঘটে। তারা একে অপরকে লিঙ্গপরিচয়ে সনাক্ত করে, আর হাজার বছর ধরে বয়ে চলা সংস্কৃতির থাবার নিচে বেড়ে চলে প্রেজুডিস। হিজাবের অন্যতম উদ্দেশ্য নারী ও পুরুষের মাঝে লৈঙ্গিক রাজনীতি ও টানাপোড়েন কমানো। কিন্তু প্রকারান্তরে হিজাব, হিজাবের সামাজিক ভূমিকা ও নারী-পুরুষ গণ্ডি আলাদা করার মাধ্যকে লৈঙ্গিক টানাপোড়েন বেড়েই চলে। সমাজে হিজাব ও পর্দাপ্রথার মাধ্যমে নারী ও পুরুষের সম্পর্ককে হিতকর ও গঠনমূলক করে তোলার কথা ছিল। কিন্তু দিনশেষে সেই সম্পর্ক পুরুষ নারীকে কী চোখে দেখছে (না-মানুষ, নাকি মানুষ) তার ওপরেই নির্ভর করে।

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০১৫

মুখোশের মুখ্য বৈশিষ্ট্য

তার ভেতরে অচেনা কেউ একজন বসবাস করে
মাঝে মাঝে আয়নায় তার মুখ দেখে সে, তার মুখ ফুঁড়ে
আবার হঠাৎই হারিয়ে যায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই।

থেকে থেকে মনে পড়ে ফকির লালন এরকম
কিছু একটা বলেছিল, তোমার ঘরে বাস করে কারা
ও মন জানো না। সে জানে না অজানা কেউ তার
ঘরে কীভাবে এলো তাকে চেনে না সে, বাড়ছে
এখন সদাভয় সদাসন্ত্রস্ততা ও তটস্থ সংশয়!

তারপর সকালে ঘুম ভেঙে গেলে সে টের পেল
আরেকজন কথা বলছে কণ্ঠ চুরি হয়ে গেছে
পথে দেখা হলো কারো কারো সাথে, তারা
হাত মেলালো, হাসিমুখে কিঞ্চিৎ বাতচিত
করা শেষে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপহীন চলে গেল।

বাসে ঝুলে অফিসে যাচ্ছে সে, আচমকা ব্রেক
কারো গায়ে হুমড়ি খেলে স্যরি বললো আরেকজন,
লোকটা তার দিকে কিড়মিড় করে তাকালো,
সে বাস থেকে তড়িঘড়ি নেমে ফুটপাতে উঠে দেখে
আরেকজন হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে তার দেহটা নিয়ে।

সারাদিন আরেকজন তার হয়ে কথা বলে, তার হয়ে
খ্যাক খ্যাক করে হাসে কলিগের অশ্লীল রসিকতায়
ভরাট রিসেপশনিস্টের দিকে আড়চোখে তাকায়
লাঞ্চে কামড়ে কামড়ে খায় চিকেন তন্দুরি, আর
তার হয়ে মোড় থেকে চা সিগারেট খায়।

লিফটের আয়নায় সে দেখে আরেকজনের চেহারা
সেই ভাঁজে ভাঁজে সে নিজেকে আর দেখতে পায় না,
কাজের ফাঁকে বাথরুম পেলে ইউরিন্যালে আরেকজন
নিচে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসে, দৃষ্টি সরাতে গেলে
সে টের পায় আরেকজন তার চোখের দখল নিয়ে নিলো।

বাসায় ফেরে সে আরেকজনের মতো, দুঃস্বপ্ন মনে হয়
তার কাছে। দেখে দরজায় ক্লিপে সাঁটা ভাড়ার নোটিস
আরেকজন ভেতরে ফিক ফিক করে হাসে, টের পায়,
স্বয়ংক্রিয়ের মতো আরেকজন ভাত খায়, খাবারের স্বাদ
নিয়ে নেয় আরেকজন, সে ভাবে সে খড় চিবাচ্ছে।

শোবার আগে দাঁত মাজতে গিয়ে সে একইসাথে শোনার
ও ছোঁয়ার অনুভূতি হারিয়ে ফেলে, অথচ এবার যেন
ভাবান্তরহীন আরেকজন তার বিছানায় শুয়ে পড়ে।
এর পরে সে শুধু মনে করতে পারে চোখ বোঁজার আগে
প্রাণপণে ছাদের ফাটল দিয়ে অজস্র মাকড়শা নেমে আসছিল। 

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০১৫

এখানে কেউ থাকে না এখন

কবিতার প্রতি আমি নিষ্ঠুর অবহেলা দেখিয়েছি।


ঘটনাটা কীভাবে ঘটলো বলি। আমি কবিতার প্রেমে পড়েছিলাম। দিনরাত কবিতা পড়তাম। নতুন কবিতা। পুরাতন কবিতা। চর্যাপদের বিলুপ্ত বাংলায় লেখা কবিতা। ইংরেজি মিডিয়াম বিদেশি শব্দ ভারাক্রান্ত কবিতা। ভেবেছিলাম এত এত কবিতা পড়তে থাকলে প্রেম উড়ে চলে যাবে। বিরক্তি ধরে যাবে কবিতার ওপর। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম চব্বিশ ঘন্টা ধরে এলোমেলো উড়ো পঙক্তি মগজে ঘুরে বেড়াচ্ছে... জোনাকপোকার মতো জ্বলছে... নিভছে...


কবিতার প্রতি এই অদ্ভুত ভালোবাসা লুকিয়ে রাখতাম। আমাদের জনপদে কবিতা হাসিঠাট্টা আর মকারির বিষয়। কবিতা হোপলেসরা লেখে। কবিতা লুজাররা পড়ে। তাই আমি এই প্রেম লুকিয়ে রাখলাম। অমন প্রবল প্রেম এসব কথায় কমে নাই।


কীভাবে অবহেলার শুরু হলো তা ঠাহর করতে পারি না। এমন নয় যে কোনো এক সকালে উঠে কবিতাকে ঠেলে বিছানা থেকে লাথি মেরে ফেলে দিয়েছি। এমনও ঘটে নি কখনো, কবিতা এসে মগজে ঘাই মেরেছে আর মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। হয়তো হিংসুটে সময় আমাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, কিংবা বারবার কবিতা নিয়ে সবার মিথ্যে কথাগুলো শুনতে শুনতে শুনতে আমিও বিষিয়ে গিয়েছি। হেমলকের পাত্রের কোষেও তো কিছু বিষ চুঁইয়ে চুঁইয়ে মিশে ছিল হয়তো...


অথবা হতে পারে এগুলো মিথ্যে অজুহাত, হতে পারে আমি নিজেই ভেঙে চুরে দুমড়ে ছুঁড়ে দিয়েছি কবিতাকে। কবিতার অনেক দাবি। সময় দাবি করে সে, দাবি করে মনোযোগ, তার হাতে লম্বা বাজারের ফর্দ থাকে প্রায়ই, মাঝে মাঝে সে চিৎকার করে ওঠে রাগে... তাই আমি নিজেই সরে গেছি দূরে! কাপুরুষ সাহস করে বিদায়টাও নিতে জানে না।


তারপর কেটে গেছে দিনরাত কবিতাবিহীন উন্মাদনাহীন হীন-দীন দিনযাপনের ফাঁকে টের পাই না কবিতার অনুপস্থিতি। মনের ভুলে দুয়েকটা পঙক্তি মাথায় সেঁধিয়ে যেতো, হুট করে চোখে পড়ে যেতো কারো লেখা কোন অপূর্ব কথামালা, অজান্তেই তাকিয়ে থাকতাম কোন ছন্দোমত্ত স্তবকে...


...শিহরণ!


পুরনো প্রেম কাছে টানে পুরনো কিছুই আর সেরকম নাই যদিও। বদলে গেছি আমি বদলে গেছে কবিতা, তাও সে কাছে ডাকে দুঃসময়ে আর নিরুপায় আত্মসমর্পণ ছাড়া কোন পথ খোলা থাকে না!

বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০১৫

একজন রাখালের কথা, কিংবা ভেড়া হবার আটটি ধাপ

ভূমিকাঃ

মানব সভ্যতার বয়স খুব বেশি না। আমরা জানি যে মানুষ চাষবাস শুরু করেছিল মোটামুটি ১০ হাজার বছর আগে, এভাবেই মানব সমাজ গড়ে উঠেছিল। এই স্বল্প সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা গেছে প্রায়ই কয়েকজন একত্র হয়ে দল বা জোট গড়ে তোলে। বৈচিত্র্যময় সমাজের মধ্যে তারা মূলত একটি নির্দিষ্ট মতবাদকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই মতবাদ সমাজের প্রচলিত এক বা একাধিক নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে থাকে। যেমন, এরকম দল বা জোটের একটি প্রচলিত উদাহরণ হলো ধর্ম। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে একেকটি ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে। ছোট গোষ্ঠীতে কিছু প্রথা ও নিয়ম সৃষ্টির মাধ্যমে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার ভেতরেই ধর্মগুলো এক ধরণের পরিবর্তন সাধন করেছে। ক্রমেই মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা নিছকই কৌতূহল থেকে সেইসব নিয়মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, দল বা জোট বড়ো হয়েছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, একটা সময়ের পরে ধর্মীয় জোটগুলো প্রকাণ্ড প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। মানুষ নেতার জায়গা নিয়ে নেয় ধর্মের মতবাদ বা ডকট্রিন। তখন নতুন দীক্ষিত ব্যক্তিকে পুরাতন অনুসারীই সেই ডকট্রিনের শিক্ষা দিতে পারেন, আদি নেতার বা প্রবর্তকের দরকার পড়ে না। এভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের উদ্ভব ঘটে।

এগুলো ছাড়াও বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন দল গড়ে ওঠে। এখানে উল্লেখ্য যে নিছকই বিনোদন বা শখের উদ্দেশ্য গড়া কোন দলের সাথে এখানে আলোচিত দলকে মিলিয়ে ফেললে ভুল হবে। বিনোদন বা শখের ভিত্তিতে গড়া দলগুলোর মূল লক্ষ্য থাকে মানুষের ফলিত চাহিদা পূরণ। সমাজের মূল কাঠামোকে বিন্দুমাত্র বিঘ্নিত না করেও এসব দল তাদের কার্যক্রম চালাতে পারে। পাড়ায় বইপড়ুয়াদের দল, গানবাজনা দল, কিংবা মামুলি মুভি-থিয়েটার দেখা গোষ্ঠী এসব দলের আওতায় পড়ে। অন্যদিকে উপরে যে দলগুলোর কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের বা চাহিদার উন্নয়নে সাহায্য করে। সমাজের বর্তমান অবস্থায় ব্যক্তি মানুষ যে সীমাবদ্ধতা অনুভব করে, নিজের উন্নতির সুযোগ না পেয়ে যে ব্যক্তি হতাশ, দুর্নীতি ও অনাচারের প্রতাপে যে ব্যক্তি অতিষ্ঠ, তাকে সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যও বিভিন্ন সময়ে এসব দল গড়ে ওঠে। এই দল হতে পারে রাজনৈতিক, হতে পারে ধার্মিক, হতে পারে আদর্শিক, অথবা এই সবকিছুর মিশেল। এসব ফলিত ও মৌলিক দলগুলোর মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলে উভয় দলে ব্যক্তির ভূমিকা। ফলিত শখের দলে প্রতিটি ব্যক্তিই নিজস্ব চর্চাকে লালন করতে পারেন, কিন্তু মৌলিক নিয়মের দলে নির্দিষ্ট নিয়মের বাইরে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর খুবই সংকীর্ণ।

অনেক সময়ই নির্দোষ ভেবে বুঝে ওঠার আগেই এমন দলের অংশ হয়ে যেতে পারি। তাই এসব দলের চরিত্র জানার পাশাপাশি এটাও জানা জরুরি যে, এদেরকে চিহ্নিত করার উপায় কী? প্রথমেই দেখতে হবে এরা ঠিক কীভাবে নতুন সদস্যকে দলে নেয়। একেক দলের কাজ করার প্রক্রিয়া একেক রকম, কিন্তু বিশ্লেষণ করলে মোটামুটি আটটি ধাপ পাওয়া যায়।

প্রথম ধাপঃ নির্দোষ দাওয়াত

কথায় বলে, উঠতি মুলো পত্তনে বোঝা যায়। দলে নেয়ার প্রথম পদক্ষেপই হচ্ছে সক্রিয় কর্মীদের কেউ আপনাকে কোন একটা অনুষ্ঠানে আসতে বলবে। না, তাদের বার্ষিক বা মাসিক গেট-টুগেদারে না। নেহাতই নির্দোষ এবং সাধারণ কোন অনুষ্ঠান হতে পারে সেটা। হতে পারে শুক্রবারের চায়ের দাওয়াত, হতে পারে ফেব্রুয়ারি মাসে বনভোজনে সাভার যাওয়ার দাওয়াত ইত্যাদি। শুরুতেই যদি বলে, "দিন-দুনিয়া পরিবার-স্বজন ছেড়ে দলে যোগ দাও", তাহলে তো আপনি মানে মানে কেটে পড়বেন! এজন্য 'বাজিয়ে' দেখার জন্যেই প্রথমে নিরামিষ কোন অনুষ্ঠানে ডাকা হয় সম্ভাব্য নতুন সদস্যকে। এই ধাপটাকে চিহ্নিত করা খুবই কঠিন, নিতান্তই সন্দেহপ্রবণ মন না হলে ধরাও যায় না। কারণ অন্যান্য শখের বশে গড়ে ওঠা গ্রুপগুলোও এরকম ধরণের অনুষ্ঠানেই দাওয়াত দেয়। আপনার যদি আবৃত্তি করার শখ থাকে, কিংবা গান গাওয়ার শখ থাকে, তাহলে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ডাকলে কি আপনি যাবেন না? আগ্রহী হবেন না? অবশ্যই হবেন। তারপরও চোখ-কান খোলা রাখতে হবে, কারণ এর পরের ধাপ থেকেই দুই ধারার দলগুলো আলাদা আচরণ করতে শুরু করে।

দ্বিতীয় ধাপঃ স্নেহ-ভালোবাসা কারে কয়? 

অনুষ্ঠানের দাওয়াত তো নিলেন, সেজে-গুঁজে আগ্রহ নিয়ে গেলেনও। তারপর দেখলেন দলের পুরানো সদস্যরা দারুণ মাইডিয়ার টাইপের। সবাই হেসে হেসে কথা বলছে আপনার সাথে, আগ্রহ নিয়ে শুনছে আপনি কী বলেন বা ভাবেন, কয়েকজন বারবার খোঁজ নিচ্ছে আপনার কিছু লাগবে কি না, খাওয়া-দাওয়া আরামের ব্যবস্থা হচ্ছে কি না ইত্যাদি। আপনি তো মনে মনে এমন আদর পেয়ে লাটে উঠে যাচ্ছেন। আসলে খাতিরদারি কে না ভালোবাসে! আপনি যদি খুব আত্মকেন্দ্রিকও হন, তাও এমন মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হলে, একটু একটু খুশিই লাগে। এর পেছনের সাইকোলজিটা হলো, দলের সদস্যরা সচেতনভাবে আপনার মনের স্মৃতি ট্যাম্পারিং করছে। আজকের দিনের ঘটনাবলীর সাথে ভালো লাগার বিরল অনুভূতিকে জুড়ে দিচ্ছে। দুয়েকমাস পরে যখন দলের কাজকর্মে বিরক্ত হতে যাইতেন, সেসময় এই প্রথম দিনের স্মৃতি মনে করে আপনার মনের বিরক্তি দূর হয়ে যাবে। মনে মনে নিজেকে বুঝাবেন, "আসলেই তো এরা কতো ভালো ব্যবহার করেছিল আমার সাথে!", আর নিজেকে নিজেই দলের সাথে জুড়ে রাখবেন। অতো দূরের কথাই বা কেন বলি, প্রথম দিনের এই ভালো ব্যবহার ও আপ্যায়নের কারণেই পরের দাওয়াতে আপনি আগ্রহ নিয়ে অংশ নিবেন। তবে দুঃখের বিষয় হলো সময়ের সাথে সাথে এই মেকি উচ্ছ্বসিত ব্যবহার ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু ততদিনে আপনি দলের অংশ হয়ে যাচ্ছেন, এবং পুরানো সদস্যরাও আপনাকে অন্য পন্থায় কব্জা করছে।

তৃতীয় ধাপঃ পুরষ্কারের মুলা, নাকের সামনে ঝুলা  

ধীরে ধীরে বিভিন্ন দাওয়াতে যাওয়া-আসার মাধ্যমে সম্ভাব্য নতুন সদস্যের পরিচিতি ও স্বচ্ছন্দ বাড়তে থাকে। এর পরের পর্যায় থেকেই অপেক্ষাকৃত সিরিয়াস ধাপগুলো আসতে থাকে। আরেকটা ব্যাপার গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো আপনার পক্ষে পুরোপুরি সম্পর্ক চুকিয়ে দল থেকে বেরিয়ে আসার এটাই নিরাপদতম পর্যায়। কারণ এর পরের ধাপগুলোতে যতই এগুবেন, দল ত্যাগ ততই ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে আপনার জন্য। এই ধাপে দলের এক বা একাধিক পুরনো সদস্য আপনাকে মহা-আরাধ্য কামনার বস্তু "পুরষ্কারের" কথা বলবেন। এই দলের মূল কার্যক্রম ব্যাখ্যা করবেন। দলের সাথে সম্পৃক্ত হলে আপনি কী কী সুবিধা পাবেন তা ধীরে ধীরে আকারে ইঙ্গিতে বা সরাসরি আপনাকে বলা হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা আপনার মানসিক বা সামাজিক দুর্বলতাকে টার্গেট করবে। এখানে লক্ষণীয় যে, এই পুরষ্কারের প্রতি যদি আপনার আগ্রহ না থাকে, তাহলে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো আর ঘটবে না। পুরষ্কারের বৈশিষ্ট্যকে আপনি মনে-প্রাণে কামনা করলেই শুধুমাত্র পরের ধাপ সামনে আসবে। অর্থাৎ আকাঙ্ক্ষা জন্ম হতে হবে আপনার মনে, লক্ষ্য তারা তুলে ধরলেও আপনি এক বিভ্রান্তিতে থাকবেন যে এই লক্ষ্য আপনি নিজে নিজেই ঠিক করেছেন।

পরবর্তী ধাপে আপনি পিছু হটার চেষ্টা করলে পুরানো সদস্যরা একটু মনে করিয়ে দিবে যে এক সময় আপনি নিজেই এই লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন। নিজেই নিজের বিরোধিতা করা বা নিজেকে পরাস্ত করা হাজারগুণ কঠিন কাজ। তাই পুরাতন সদস্যদের এই সূক্ষ্ণ চালাকিটুকু আপনার দলে সামিল থাকার জন্য জরুরি।

চতুর্থ ধাপঃ দাও দাও, মোরে আরো দাও

পুরষ্কারের আশার পাশাপাশি আপনাকে বেশ কিছু সাফল্যের গল্প শোনানো হবে। অমুক আপনার মতই পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান থেকে এসে এই দলে যোগ দিয়েছিল। আপনার মতই সে এটা ওটা চাইতো। তারপর অনেক পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের ফলে সে একদিন সেটা অর্জন করতে পেরেছে। এখন তারা সুখে শান্তিতে বাস করছে। অমন সুখ কি আপনি পেতে চান? আপনিও কি চান তাদের মত সফলকাম হতে? যদি চান, তাহলে বলুন আপনি কীভাবে সেই পথে যাবেন? এরকম পর্যায়ে নতুন সদস্যের মনে যেন কিছুতেই দ্বিধার জন্ম না হয়, সেজন্য দলের পক্ষ থেকে এমন সফল কাউকে কাউকেও নিয়ে আসা হয়। স্বভাবতই তার বা তাদের সাথে কথা বলতে বলতে নতুন সদস্যের বিচার-ক্ষমতা প্রভাবিত হতে থাকে। উক্ত সফলদের সফলতাই যে তার নিজস্ব সফলতা নয়, কিংবা তারা যা বলছে সেটাও যে স্ক্রুটিনির প্রয়োজন আছে, সেটা নতুন আপনি চিন্তা করে দেখার সময়ই পাবেন না। ততদিনে আপনার সামনে সাফল্যের হাইওয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, এখন সময় দ্রুত সেই পথে ছোটার। আশেপাশে একটু জিরিয়ে চিন্তা করে দেখার সময় কই?

পঞ্চম ধাপঃ দল আগে, না তুমি আগে?

নতুন সদস্য হিসেবে আপনি অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছেন। দলের পুরানো সদস্যদের সাথে আপনার জোট যথেষ্টই দৃঢ়। বড়শি আপনি ভালোভাবেই গিলেছেন। এরকম "শিওর সাকসেস" অবস্থায় দলের কেউই চায় না আপনি ছুটে যান। এমনকি আপনিও যে পরিমাণ সময় ও চিন্তা লগ্নি করেছেন তাতে আপনিও চান না দলের বাইরে পড়তে। এই ধাপে এজন্য দল থেকে আপনার কাছে দাবি-দাওয়া আস্তে আস্তে বাড়তে থাকবে। বেশি সময় ধরে দলের পেছনে দিতে হবে। এমন কিছু কাজ করতে হবে যেগুলো মন থেকে সায় দিতে পারবেন না। হয়তো আপনাকেই পাঠানো হবে নতুন সদস্য ধরে নিয়ে আসতে। এর মাঝে যদি আপনি বিন্দুমাত্রই উসখুস করেন, বাকিরা আপনাকে আল্টিমেট লক্ষ্যের কথা মনে করিয়ে দিবে। "এরকম ঢিলাঢালাভাবে চললে কখনই সফল হতে পারবে না"। এই পর্যায়ে আপনার যে কোন কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থতাকে বাজেভাবে ট্রিট করা হবে। শুরুর সেই মধুর আচরণ ভুলে যান, এখন আপনি দলের নিয়মকানুন মেনে না চললে যথেষ্ট বিপাকে পড়বেন।

হয়তো ভাবছেন এই ধাপেই তাহলে কেন বেরিয়ে আসবো না? বাস্তব হলো, বহু কারণেই আপনি বেরিয়ে আসতে পারবেন না। প্রথমত, আপনি নিজের অনেকটা সময় এই দলের সাথে দিয়ে ফেলেছেন। এটা আপনার দৈনন্দিন বা সাপ্তাহিক অভ্যাসের অংশ হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, দলের বিভিন্ন সদস্যের সাথে আপনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক । এটা হুট করে কাটিয়ে দূরে সরে যাওয়া সম্ভব না। শুরুতে যখন আপনার ইনভলভমেন্ট কম ছিল, তখন সম্ভব হতো। কিন্তু এখন আপনি প্রায় প্রতিদিনই সবার সাথে দেখা করছেন, সবাই আপনাকে চেনে, জানে, বাসা-বাড়ি, কাজের জায়গা কোথায় এগুলো জানে। কেউ কেউ আপনার বাসায়ও এসেছে, আপনিও গেছেন তাদের বাসায়। এতোগুলো সম্পর্ক চাইলেই কাটানো যায় না। তৃতীয়ত, এই নতুন সম্পর্কগুলোর কারণে আপনার পুরানো বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন দূরে সরে গেছেন। আপনি নিজেই সরিয়ে দিয়েছিলেন এতোদিন। আজকালকার যুগে এসব সম্পর্ক মেরামত করা খুবই দুরূহ। চতুর্থত, আপনার নিজস্ব সফলতা বা সুখের লক্ষ্যটাকে পুরোপুরি বিসর্জন দিতে হবে। দলের ঠিক করা আইডিয়া লালন করতে করতে আপনি এখন নিজেকে তা থেকে আলাদা করতে পারেন না। এত বড়ো আত্মত্যাগ প্রায় কারো পক্ষেই সম্ভব হয় না।

ষষ্ঠ ধাপঃ অনুতাপের দহন

এই ধাপটি নতুন সদস্যের জন্য সবচেয়ে পীড়াদায়ক। আগের ধাপে ক্রমশ বেড়ে চলা দায়িত্ব ও টানাপোড়েন এই ধাপে এসে চূড়ান্ত রূপ নেয়। আপনার মনে দ্বিধা বাড়তে শুরু করেছে। বারবারই পুরানো দিনের কথা মনে পড়ছে, মন চাইছে এইসব ছেড়েছুঁড়ে ফেলে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যেতে। কিন্তু এই পর্যায়েই দলার বাকি সদস্যরা আপনার হাবেভাবে বিরক্ত হতে শুরু করবে। ধীরে ধীরে তারা আপনাকে লজ্জা দিতে শুরু করবে। আপনি দলের প্রতি, আদর্শের প্রতি, মতবাদের প্রতি নিবেদিত নন - এই বিষয়টি উঠে আসবে। অনেকেই আপনার সাথে আগের সৌহার্য্যপূর্ণ সম্পর্ক শীতল করে দিবে। প্রায়ই আপনার উপস্থিতিকে উপেক্ষা করবে। সমসাময়িক সময়ে অন্য সদস্য যারা যোগ দিয়েছে, তাদের কাউকে কাউকে বেশি ফোকাস করা হবে, কারণ তারা দলের প্রতি অনেক বেশি নিয়োজিত। সাফল্যের পথে তারাই আছে, আপনি সরে যাচ্ছেন। ধীরে ধীরে আপনার মধ্যে জন্ম নিয়ে ব্যর্থতার অনুভূতি। এরকম পর্যায়ে আপনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণই ভেঙে পড়বেন এবং স্বতন্ত্র চিন্তাগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিবেন। আপনার মনে হবে, মতবাদকে প্রশ্ন করে ভুল করেছেন, মনে হবে দলের সবার কথা না শোনা ঠিক হয় নি। এটাও মনে হবে যে সেই পুরষ্কার আপনি ডিজার্ভ করেন না, দলের সাহায্যই আপনার একমাত্র সম্বল। তারাও এখন মুখ ফিরিয়ে নিলে আপনি আর কোনদিনই কিছু অর্জন করতে পারবেন না।

এই ধাপে আপনার শোচনীয় অবস্থা থেকে দল লাভবান হবে সবচেয়ে বেশি। কারণ এর ধাপের পরেই আপনি সম্পূর্ণভাবে এই মতের কেনা দাস হয়ে যাবেন। দলের সদস্যরা উঠতে বসলে উঠবেন। বসতে বললে বসবেন। কখনই অথরিটির কোন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার চিন্তাও আপনি আর মাথায় আনবেন।

সপ্তম ধাপঃ পুরষ্কার বনাম তিরষ্কার

ষষ্ঠ ধাপের অনুতাপের ভেতর দিয়ে যদি পার হতে পারেন, তাহলে এক পর্যায়ে দলের বাকিদের মতই আপনার "দলীয়করণ" সম্পন্ন হয়ে যাবে। প্রক্রিয়ার শুরুর আনন্দ ও উত্তেজনা প্রশমিত হয়েছে। মাঝের কার্যক্রম আপনাকে কর্মী হিসেবে গড়ে তুলেছে। আর কর্তাদের পদ্ধতিকে প্রশ্ন করার বা বিরোধিতা করার যৎসামান্য ইচ্ছা যা আপনার বাকি ছিল, তাও গত দুই ধাপে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। এখন আপনি দলের পোড় খাওয়া নিয়মিত অংশ। সবাইকে চেনেন, কী হয় না হয় জানেন। এই পর্যায়ে খুবই মৌলিক দুটো পথে সবকিছুকে বিচার করা হবে। আপনার প্রতি অর্পিত দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করলে পুরষ্কার, কলিগ ও পিয়ারদের কাছে শ্রদ্ধা-সম্মান-প্রশংসা। আর পালন করতে ব্যর্থ হলে ধমক-তিরষ্কার-তাচ্ছিল্য। আপনিও দল ছাড়বেন না ঐ পুরষ্কারের আশা আর শাস্তির ভয়ে। দলও আপনাকে ছাড়বে না কারণ সে আপনাকে দিয়ে যা খুশি করিয়ে নিতে পারবে।

অষ্টম ও শেষ ধাপঃ অস্তিত্ব ও পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ

এটাই মূলত আপনার ও দলের সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতি। মতবাদ ও দল আপনাকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে। প্রতিটি কাজ আপনি সুষ্ঠুভাবে পালন করছেন। পুরানো সদস্যদের কাতারের কাছাকাছি চলে এসেছেন। দলে নতুন সদস্যদের কারো কারো দায়ভারও আপনার হাতে পড়ছে। নেতৃত্বের কাঠামোকে আপনি আর প্রশ্ন করেন না, হাতে যে কাজ দেয়া হয়, তার পেছনের কারণকেও আর প্রশ্ন করেন না।

তারপরেও অনেকে এতোগুলো পর্যায় পার হয়েও দল থেকে ছুটে যেতে পারে। সেজন্য আরো কিছু পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। কোন কোন দল তার সদস্যদের পারিবারিক সম্পর্কগুলো ছেড়ে দিতে বাধ্য করে। দলের সদস্যই হয়ে ওঠে তার একমাত্র পরিবার। অন্য অনেক দলে সদস্যদের মাঝে কৃত্রিম প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কে বেশি নিবেদিত তা প্রমাণের পরীক্ষা নেয়া হয়। এছাড়াও বিভিন্ন দলে বিভিন্ন পরিবেশে নানারকম উদ্ভাবনী উপায় কাজে লাগানো হয়।

তবে সেসব আরো বিস্তারিত ও বহুবিধ ব্যাপার। আমি নিজেও তার সবকিছু বুঝে উঠি নি। এইখানে মূলত ভেঙে ভেঙে দেখানো হলো যে আদর্শিক ও মতবাদভিত্তিক ক্রিয়াশীল দলগুলো কী উপায়ে মানুষকে দলের সদস্যে পরিণত করে। মোটা দাগে, কাউকে যদি এরকম খপ্পরে পড়ে সম্পূর্ণ বিপরীত মানুষে রূপান্তরিত হতে দেখেন, তাহলে বিচার করে দেখতে পারেন যে কীভাবে সে এই দলের খোঁজ পেল, এবং কীভাবে সে এই দলের সদস্যে পরিণত হলো। কম-বেশি এই আটটি ধাপ সহজেই চিহ্নিত করতে পারবেন।