বুধবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১০

এই লেখাটা তার জন্য...

সে আসবে জেনে আমি তেমন কোন আবেগ বোধ করি নি প্রথমে। জেনেছি সে আসছে, খুশি হয়েছি যে খুব তাড়াতাড়ি এই অক্টোবরেই তার সাথে দেখা হবে। সে আসলে তার সাথে বেশ খাতির জমাবো ঠিক করে রেখেছিলাম। এমনিতেই আমি বেশ হাসিখুশি মিশুক মানুষ। প্রাথমিক জড়তা থাকে অপরিচিতের সাথে, সেটা কেটে যেতে একটু সময় লাগে। কিন্তু তারপরে আমি ভীষণ মিশে যেতে পারি কারো কারো সাথে। যাদের ভালো লাগে, তাদের দেখলেই ভালো লাগে। তাই আমি ঠিক করে রেখেছিলাম যে যদি তাকে আমার ভালো লাগে, তাহলে আমি তার সাথে বেশ খানিকটা সময় কাটাবো।

অক্টোবরে বাংলাদেশ খুব সুন্দর হয়ে ওঠে সাধারণত। আমি জানি এই কথার তেমন কোন প্রামাণ্য ভিত্তি নাই। তবে আমার ভালো লাগে। বাংলাদেশ ছোট হতে হতে আমার কাছে এখন খালি ঢাকা শহর হয়ে উঠেছে। আর ঢাকা শহরটাও পুরোটা আমার কাছে নেই, বাসস্থান আর দপ্তরের রাস্তাকতক এদিক সেদিক, দু'তিনটে গাছপালা, কয়েকটা ঘুপচি গলি-উপগলির মোড়, আর অবিরাম যানজট মিলিয়ে এই নগর সংকুচিত এখন। তো যখন অক্টোবর আসে, বৃষ্টি থেমেই গেলো প্রায়। শুকিয়ে এলো ড্রেন নামের নালাগুলো। গাছগুলো একটু হাঁফ ছাড়বার সুযোগ হারালো। ছাতা গুটিয়ে জবুথবু কেরানিগুলো আবার তেলচিটে শার্ট পরে ঘামা শুরু করলো। আমি অবশ্য এগুলোকে তেমন পাত্তা দেই নি। এদের এড়াতে আমি উপরে আকাশের দিকে তাকিয়েছি। তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেছি। থরে থরে শরতের আকাশের হুবহু নকল যেন! অথচ এখন হেমন্ত যায় যায়। ধানক্ষেত তো নেই আশেপাশে, তাই টের পাই না কার্তিকের ঘ্রাণ। খালি সিএনজি গ্যাসে ভরা গাড়ি নাকে ঢুকে যায়। তেল পোড়ে হেঁশেলে, গ্যাস স্টেশনে। মাঝে মাঝে অক্টোবরের বিকেলে বাতাস নামে শহরে, আমি সে সময়ে ঘরের বাইরে থাকি বলে টের পাই... শহরটা গিজগিজ করছে দীর্ঘশ্বাসের তৈরি মানুষে। এই মানুষের ভীড় একেবারে খারাপ না - বৈচিত্র্যময় দারুণ।

তারপরে আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম যে সে আসছে। একদিন হঠাৎ জানতে পেলাম গভীর শেষ রাতে আসবে সে। যখন খবর পেলাম, তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত এগারো পার। আমি ঠিক করলাম যে খুব ভোরে উঠে তার সাথে দেখা করতে যাবো। ততোক্ষণে সে নিশ্চয়ই বেশ ধাতস্থ হয়ে যাবে ঢাকা শহরের চারপাশে। 'ভালোই হবে', ভেবে আমি 'ঘুমুতে গেলাম, যাচ্ছি' করছিলাম। ঠিক তখনই ফোন এলো যে জরুরি খবর - সে আসছে সময়ের একটু আগেই। আমি তড়িঘড়ি তৈরি হলাম, দেরি করা যাবে না। রাতের ঘুমের নিকুচি - তার সাথে দেখা করেই ঘুমাবো 'খন। সাথে করে ক্যামেরাখানা নিয়ে বের হলাম, যদি তার সাথে প্রথম দেখার সময়টা ধরে রাখতে পারি তো বেশ হয়।


মধ্যরাত পেরিয়ে পৌঁছালাম হাসপাতালে, জরুরি বিভাগ - কাচের দরজা - খুলে ঢুকতেই দেখি কান্নার শোরগোল। একটু আগেই একজন প্রৌঢ় স্ট্রোক করে মারা গেছেন। হাসপাতালে আনতে আনতেই ভবলীলা...। তার পুরো পরিবার শোকে থরথর। মনে একটু কু-ডাক দিলো। মৃতের পরিবারের একজন আবার আমার ভাইয়ের পরিচিত। টুকটাক কথা বিনিময় হলো। আমরা শোকার্ত পরিবার পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। কু-ডাক লাপাত্তা হলো তার মায়ের মুখ দেখে। তিনি বেশ চুপচাপ। অস্থিরতা আর দুশ্চিন্তাটুকু প্রকাশ করছেন না। আমি সেই মা হতে চলা আপুকে ডাকি পলিটিশিয়ান, আমার বেশ বড়ো তো, তাই আপুর বুদ্ধিতে বরাবরই ধরা খাই। বন্দোবস্ত হয়ে গেলো। উৎকন্ঠা কমে না। প্রক্রিয়াটাই ঝুঁকিপূর্ণ সবসময়। কয়েকবার করে ডাক্তার দুইজনের সাথে কথা বলে বলে একটু শান্ত হওয়া গেলো।

রাত ধীরে ধীরে চুইংগামের মতো লম্বা হচ্ছে। সেই রাতটুকুকে চিবুতে চিবুতে হঠাৎ খেয়াল করলাম প্রায় দুইটা বাজে। একটু খিদে লেগে গেলো। লাজশরমের মাথা খেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আর কারো পেট ডাকছে নাকি। পেটুকের দলের কোন লজ্জা থাকে না, এই বাক্য প্রমাণ করে ভাই, দুলাভাই ঈষৎ মাথা দুলালো। সে আসুক, নির্ভার হয়ে খাদ্যের ভার নেয়া যাবে। এই অপেক্ষার মধ্যে হাসপাতাল নিশ্চুপ। লোকজন নেই, আমরা কয়েকজন বসে রইলাম। আমি, আপুর ছোটভাই, দুলাভাই, আপুর মা-বাবা-শাশুড়ি। আপুর মা বাবা দুইজনই এই প্রথম নানা নানি হতে চলেছেন। তাই তাদের উদ্বেগ কয়েক হাত দূরে বসেও দিব্যি টের পাচ্ছি। আমি একটু হাল্কা করতে আপুর মাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার সাথে তার কীভাবে দেখা হলো। শুনে একটু হাসলেন, তারপর বলতে শুরু করলেন, 'তোকে দেখে প্রথমে বুঝতেই পারি নি। হাসপাতালের কেবিনে এসে দেখি কাঁথার ওপরে একটা বাবু হাত-পা ছুঁড়ছে। ভেতরে গিয়ে তোর মায়ের দেখা পেলাম, তারপরে সে জানালো বাইরের ঘরে রাখা কাঁথার ওপরের মানুষটাই তুই।' একটু হাসলেন তিনি। অনেক বছর আগের কথা মনে পড়ে গেলো তার। ভালোই হলো, একে একে বাকিদের খবর বেরিয়ে এলো। কে কীভাবে এসেছে, আপুর মায়ের সব মনে আছে। আমি এক মনে শুনছিলাম।

একটু পরে দুলাভাইকে ডেকে নিয়ে গেলো ভেতরে। সময় হয়ে গেছে তার আসার। আমরা দ্বিগুণ উৎকণ্ঠায় বাইরে পায়চারি করছি। আপুর ভাইটা একটু বেশিই অস্থির। ঢোক ঢোক পানি খাচ্ছে, কারণ যদি রক্ত দেয়া লাগে। পানি খাওয়া শুরু হয়েছে সন্ধ্যা রাত থেকেই। এই কারণে একটু পরে পরে নিম্নচাপ - 'এক্সকিউজ মি, বাথরুমটা কোন্দিকে?' আমি বললাম, 'একটু সুস্থির হয়ে বোস। সব ঠিক ঠাক হয়ে যাবে।' ঝামটা এলো উত্তরে, 'আরে তুমি জানো কচু। সাবধানের মাইর নাই। রেডি থাকা ভালো।'

অপারেশন থিয়েটারের দরজাটা একটু খুলে ছিলো। আমি বুদ্ধি করে তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। যদি আওয়াজ পাওয়া যায়, সে এলেই টের পাবো। মাঝে মাঝে আপুর বাবাকে দেখছি খালি করিডোরে পায়চারি করছেন। হাতে তসবি, নিবিষ্ট চোখে প্রার্থনা।

হঠাৎ একটা চিল চিৎকার। রাতের সময় বলে চারিপাশে আর কোন সাড়াশব্দই নাই। 'সে কি এলো?' আমরা একটু শশব্যস্ত হয়ে উঠি। ভেতর থেকে একজন দ্রুত বেরিয়ে পাশে NICU -তে ঢুকে পড়লো। 'নাটক করছে কেন এরা, বলে দিলেই পারে!' ভেতর থেকে সাড়া নেই। অস্পষ্ট কথা শোনা যাচ্ছে। চিৎকারটা একটু পরে আবার শোনা গেলো, স্পষ্টতর, সুতীক্ষ্ণ। 'সে কি এলো?'

আপুর মায়ের চোখে একটা হাসি ঝিলিক দিয়েই উদ্বেগের ভারে চাপা পড়লো। আপুর বাবার হাতের আঙুলে তসবি শ্লথ। আরো তিনচার মিনিট পেরিয়ে গেলে দুলাভাই বেরিয়ে এলেন। মুখে হাল্কা নীল মুখোশ। চোখে হাসি। মাথাটা হাল্কা উপরে নিচে দুলিয়ে বললেন, 'ছেলে'।

আপুর বাবা তখন একদম তৈরি, আজান এই দিলেন বলে। নার্স জানালো আরেকটু অপেক্ষা করেন। নিয়ে আসি তাকে। 'বাচ্চার মা কেমন আছে?' 'এখনো সেন্সলেস, তবে স্টেবল'। পাথর চাপা দুশ্চিন্তা ফুরফুরিয়ে উড়ে গেলো!...


থিয়েটারের ভারি কাচের দরজা ঠেলে সে বেরিয়ে এলো, এসে ড্যাবড্যাবে চোখে টিউব লাইট দেখছে। এতো রাত হয়েছে, কিন্তু ঘুম নেই দেখি! সারা শরীর আঁটোসাঁটো কাঁথায় মুড়ানো। মাথায় তুলোট টুপি। গোলগোল রক্তাভ গাল, ছোট এক্টুস পাতলা ঠোঁট। আর বড়ো বড়ো চোখ। পুরো চোখ খুলতে পারছে না সে। আর একটু কেঁপে কেঁপে উঠছে শীতে। আমি বেশ কিছুক্ষণ হা করে চেয়ে রইলাম তার দিকে। সে বেশ অদ্ভুত দৃষ্টি দিলো এক পলক। তারপরে অন্য দিকে চাইলো একটু। এদিক সেদিক। জঠরের উত্তাপ খুঁজছিলো বোধহয়। তাই তাকে আবার ভেতরে নিয়ে গেলো নার্সটা।

তাকে এক পলক দেখেই আমার মনে হলো তার সাথে আমার আরো অনেক অনেক বার দেখা হবে। কিন্তু তার বিশ মিনিট বয়সের সেই পরিচয়ের মুহূর্তটা আমার পক্ষে ভোলা সম্ভব নয়। সাক্ষাতে দুইপক্ষের সমান আগ্রহ বা মনোযোগ থাকে না জানি। এই সাক্ষাতটাও তেমনি। সংক্ষিপ্ত - সরল - সরাসরি। এই লেখাটা তার জন্যে। অক্টোবরের আধা রাত আধা ভোরে যে এই শহরে এলো, এবং এখন থেকে সে এখানে জল-কাদা-বাতাসে বড়ো হয়ে উঠবে। তার জন্যে।

একটু পরে ফুরফুরে মনে আমরা তিন জন, খেতে বেরুলাম। পেটে ইদুর ডনবৈঠক দিয়ে অনেকক্ষণ আগেই মারা গেছে। তারে দাফন করে আমরা বেশ খানাদানা করলাম। খাবারের দোকান থেকে বেরিয়ে সোজা রাস্তার মাথায় পুব দিকে দেখলাম সূর্যলাল হয়ে উঠছে। মেঘগুলো রঙচঙে হয়ে গেছে বেশ। এতো সাজ! পাখির কিচিরমিচির। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে ভাঙা ভাঙা আলো। পৃথিবীতে আজ সুন্দর ভোর...

এই সুন্দর পৃথিবীতে তোকে সুস্বাগতম জানাই...!!!

মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১০

সান্ধ্যচিন্তা... অপ্রাথমিকতা ও অবিকলতা

=====
ফিলোস-ফিক্যাল
=====
শোনেন, বেশি বুইঝেন না। আর যা বুঝেন না,
সেইটা নিয়া ফটর ফটরও বেশি কইরেন না।
একদিন না একদিন ধরা খাইবেন,
জারিজুরি ফাঁস হইবো
পাবলিক আইসা গদাম মাইর দিবো
যারা শান্তিকামী গান্ধীবাদী,
তারা আপনের বেকুবিতে হাহাহিহি হাসবেন
ফিলোসোফিকে উল্টায় দিলেও ফিলোসফিই থাকে, বুঝছেন?
=====
=====
বেচাল-বিড়াল
=====
জাদুবিদ্যায় পারদর্শী এক অখ্যাত বিড়াল বসে আছে
কমলা কমলা কুমড়োর ওপরে, ক্যামেরার দিকে
আছে ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে, মাথায় কালো টুপিটা
ধার নিয়েছে তার চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে,
আর পাশের বাড়ির সুন্দর মুন্দর মেয়েটা
ওড়না দিয়ে বানিয়ে দিয়েছে অবিশ্বাস্য এক সুপার হিরো!
ক্যামেরাটা ছিলো ভুলোর হাতে, সে রেডি হতেই
ভুলো বলল, "ঘেউ", আর শাটার দিলো চোখটিপ -
ছবিবন্দী হলো পৃথিবীর সেরা জাদুবিদ-অতিনায়ক!
=====
=====
উৎচারণ
=====

তোমার্‌ আমার্‌ এই ভালোবাশাবাশি খুব্‌ এক্‌টা ওভিনবো কিছু না। সবাই যেমোন্‌, তেমোন্‌ ভালোবাশে নানাভাবে অ-ভালোবাশিক্‌ কথাবার্ত্তা বোলে বোলে আবাশিক্‌ জিবোন্‌ কাটাচ্ছে। অ্যাতো কিছু বুঝ্‌তে গ্যালে সারাদিনও জেগে থাক্‌তে হবে। বরোঞ্চ আম্‌রা চোখ্‌ মুদে চলো ভালোবাশাবাশি কোরি!
=====

একটি চুমুতে দ্বিধা জমে ছিলো বাতাসে শুয়ে,
সেখানে সেদিন গটমটে বাঘ ঢুকে দাঁড়ালো ঘাড় ফুলিয়ে।
ঠোঁট বাঁকাতেই বকের গলা, ভ্রূকূটিতে সন্ধ্যা,
বাইকের পেছনে তুমি আর ঘন ঘন ব্রেক।
ঢাকার রাস্তা আস্তাবলে ঘোড়ারা ঘুমায়,
আঁকাবাঁকা গাড়িগুলো অমল ধবল চিত্রলেখ!
=====

১৯.১০.১০

বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১০

পাখি মন্ত্রণা

আর কতোকিছুই তো ভালো লাগে কাঁপনে মিশে থাকে এইসব দিনরাত্রির গান অজস্র কোলাহল আন্তরিক টানটান হলাহল ডুবে থাকে চুলের ভেতর, মৃদু সৌরভ…

আমাকে প্রায়ই অনেকে জিজ্ঞাসা করে, আমি কেমন আছি। আমি খুব সরলমুখে বলে দেই, আমি ভালো আছি; অথবা বলি, এই তো চলতেছে; কিংবা বলে ফেলি, ভালোই আছি। এরকম বেশ কিছু টেমপ্লেট জবাব তৈরি থাকে – বলে ফেলতে এক মুহূর্তও দেরি হয় না। তারপর ভুলে যাই, অন্য বিষয়ে চলে যাই। তাকেও হয়তো পাল্টা জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সেও ভালো থাকার কথা জানিয়ে দেয়। আমরা দুইজনেই তখন ভালো থাকতে থাকতে অন্যান্য জাগতিক বিষয়ে আলাপ করি। আমাদের তুচ্ছ ভালো লাগার চাইতে এইসব মানুষিক ব্যাপার অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

ঠিক সেই মুহূর্তে হয়তো কোথাও বাজ পড়ে। হয়তো কোন একটা গাছের ডাল মড়মড় করে ভেঙে পড়ে, ডালের খাঁজে বাসা বেঁধেছিলো কোন খয়েরি পাখি, বাসার ভেতরে ছিলো তিন চারটে নতুন শিশু পাখি। ডাল ভেঙে যখন মাটিতে নেমে আসে, পাখিগুলো উড়ে চলে যায়… দূরে, অনেক অনেক দূরে…! এই পাখিরাও ভালো থাকে হয়তো, আমার সাথে যদি দেখা হতো, তাহলে আমি তাদের প্রথমেই জিজ্ঞেস করতাম, কেমন আছেন? তারা স্মিতমুখে বলতো, ভালো আছি। আপনার কী খবর? আমি হাতে একটু ভঙ্গি করে বলতাম, ‘এই তো চলতেছে’।

পাখিগুলো মারা গেছেন সবাই। মৃতের সরকারি সংখ্যা ৪, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকটি ডালে বসবাসকারী পাখি জানিয়েছেন, প্রকৃত সংখ্যা ৫। সরকার একটি পাখির মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে নাই। তারা মনে হয় ভুলে গেছে গুনতে। আমি তাদের ভুল ধরিয়ে দেবার জন্যে মৃত-পাখি-হিসাব মন্ত্রণালয়ে ফোন দিলাম। অনেকক্ষণ রিং হচ্ছিলো, কিন্তু কেউ ধরছিলো না। ঘাম-শুকানো দুপুরে আমি চাতালের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে কানে রিসিভার চেপে ধরে রাখলাম। একঘেঁয়ে স্বরে রিং বাজছে, ট্রিং ট্রিং…

এভাবে অনেকক্ষণ, জানি না ঠিক কতোক্ষণ, রিং বাজার পরে একজন ফোন ওঠালেন। আমি চমকে গেলাম, কানের ভেতরে বাজতে থাকা ট্রিং ট্রিং ততোক্ষণে মাথার ভেতর বাজতে শুরু করেছে। সেই বাজনায় চকিত ছন্দপতন। ‘হ্যালো’, খ্যানখ্যানে স্বর শুনে একটু দমে গেলাম। আমি ফোন করেছি সরকারি হিসাবের ভুল ধরতে। যে লোকটি ফোন ধরেছে সে একজন সরকারি কর্মকর্তা। আমি পরিষ্কার দেখছিলাম লোকটা পেটমোটা কুমড়োপটাশের মতো। একটু আগে দুপুরে ভাত খেয়ে এসেছে, সাথে ঝোল ঝোল তরকারি আর সবজি ছিলো। ভাত খেয়ে মোড়ের দোকান থেকে একটা পান কিনেছে। পান চিবাতে চিবাতে এসে আয়েশ করে চেয়ারে বসে ফোন ধরেই গলা খাকারি দিয়েছে, ‘হ্যালো’। মৃত-পাখি-হিসাব মন্ত্রণালয়ে তেমন কাজ নেই বোধহয়! তাই তারা এতো ঢিলাঢালা।

আমি বললাম, ‘আমি আপনাদের ডিপার্টমেন্টের একটা ভুল রিপোর্ট নিয়ে ফোন করেছি’, একটু থেমে আবার বলি, ‘গতকাল খবরে মৃত পাখির সংখ্যা ভুল বলেছেন আপনারা, আসলে মোট ৫টা পাখি মারা গেছেন – আপনারা লিখেছেন ৪টা। একটা পাখির হিসাব দেন নি’। লোকটা বোধহয় একটু অবাক হয়ে গেছে, পান চিবানোর শব্দ পেলাম না, বরং দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে সে বলল, ‘হতে পারে একটা পাখির হিসাব মিলে নাই। তাতে কি হইছে? গাছের ডালে পাখির বাসা, বাজ পড়ে পাখি মরছে, আপনের কি?’


তার তীব্র স্বরে আমি মারা গেলাম। প্রশ্নটা অশ্লীল লাগছে। প্রশ্ন করার ফাঁকে তার দাঁত চিবানো বা পান চিবানো অশ্লীল লাগছে। রিসিভার বেয়ে কানে পৌঁছে যাওয়া তার কণ্ঠস্বর অশ্লীলতায় থকথক করছে। আমি যে হাতে রিসিভার ধরে ছিলাম, সেই হাতটাকে কোনো ঘিনঘিনে কমোডের ভেতরে ডুবিয়ে রেখেছি বলে মনে হচ্ছে। কিছুক্ষণ এই প্রবল অনুভূতিগুলো আমাকে মূক করে রাখলো। টেলিফোন সেটটায় কি কোন সমস্যা আছে? লোকটা ফোন ধরার আগে কানে ট্রিং ট্রিং প্রতিধ্বনি হচ্ছিলো। আর এখন তার শেষ প্রশ্নটা গনগন করছে কানের ভেতর।

‘গাছের ডালে পাখির বাসা, বাজ পড়ে পাখি মরছে, আপনের কি?’

‘বাজ পড়ে পাখি মরছে, আপনের কি?’

‘আপনের কি?’

‘কি?’

আমি একদম নিথর হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। বাইরে স্তব্ধ দুপুর আর ঘোলাটে হলদে আলোটা অনেকটা সময় আমার সাথে স্থির হয়ে থাকলো। তারপরে প্রশ্নটা আমার ফুসফুসে পৌঁছে গেলে আমি রিসিভার আলতো করে নামিয়ে রাখলাম। তারপরে চুপ করে বসে রইলাম। পাখিটি মারা গেছেন। পাখিটি বাজ পড়ে গতকাল মারা গেছেন। আজকে মৃত-পাখি-হিসাব মন্ত্রণালয় তাকে ভুল হিসাব করে গোনায় ধরে নি। পাখিটি ডালের ফাঁকে পাতার গভীরে শুয়ে আছে। তার পেলব বুকে একটা স্পন্দনও আর বাকি নেই। কয়েকটা সবুজ পাতা পুড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। আরো কিছু পাতা এখনও সবুজ হয়ে আছে।

হঠাৎ কেমন বাতাস হলো, মৃদুমন্দ শিহরণ। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম সবুজ পাতা কয়টি পাখির স্পন্দনহীন দেহটিকে ঢেকে দিচ্ছে ধীরে ধীরে।

*****

১৪.১০.১০

শনিবার, ৯ অক্টোবর, ২০১০

জগাখিচুড়ি দুই নম্বর!

 ক্রেজ অর্থাৎ উন্মাদনা টের পেলাম ফেইসবুক থেকে। আমার খোমাখাতা-বন্ধুমহলে অনেকেই তার ভক্ত বলে দেখলাম নতুন গানের খবরাখবর জানতে সবাই ইচ্ছুক। প্রায় দুই বছর হয়ে গেলো তাই সবাই জানতে চাইছে কবে নতুন গান - নতুন অ্যালবাম আসবে। আমিও ইতস্তত ঘুরঘুর করলাম অর্ণবের ফেইসবুক পাতায়। কিছুদিন পরে জানলাম, 'রোদ বলেছে হবে' অ্যালবামের নাম। রিলিজ পেলো এই গত সপ্তাহে। আমি কিনলাম গতকাল।

অর্ণবের গান নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়ে গেছে। গত চার-ছয় বছরে একটা নির্দিষ্ট শ্রোতাগোষ্ঠী দাঁড়িয়ে গেছে তার। 'বাংলা' ব্যান্ডের গীটারিস্ট আর ভোকাল অর্ণব যখন 'সোনা দিয়া বান্ধাইয়াছে ঘর' অথবা 'তুই গান গা' গেয়েছেন, তখন থেকেই তিনি পরিচিত। এরপরে 'সে যে বসে আছে' থেকে যে তুঙ্গ খ্যাতি সেটুকু সরিয়ে তার সাথে নিবিড় পরিচয় হলো "চাই না ভাবিস" অ্যালবামে। অ্যালবামটিকে আমি একশব্দে বলি, 'ভিন্ন', আরেক শব্দে বললে 'অগতানুগতিক'। সেটা অর্ণবের গলা, বা গায়কী ঢঙকে বাদ দিলেও গানের কথা আর সুরের কারণেও অনেকটা, বেশিরভাগটা। সম্ভবত ভার্চুয়াল জগতে আমার দেখা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত গানের কলি "হারিয়ে গিয়েছি" গানটি থেকে নেয়া।

সে যাকগে। অসংখ্য তারিখ-না-জানা রাতের নিঃস্তব্ধতায় যেসব গান সঙ্গ দিয়েছে, সেগুলো না হয় নিজের জন্যেই তোলা থাক। তবে অর্ণব খুব ধুমধাড়াক্কা নন। রক-মেটাল রক জঁরার বাংলা গানগুলো যেমন ব্যান্ডভিত্তিক চর্চিত হয়, সেভাবে দেখলে নতুন বা ভিন্ন ঘরানায় আধুনিক গান ছাড়া কিছু ছিলো না। সেই ক্লিশে গানের কথা, তুমিয়ামির জলো বাতচিত ফেলে দেয়ার সময় অনেক আগেই হয়ে গেছে। ফিউশন থেকে ভাটিয়ালি বা পল্লীগানকে তুলে এনে রিমিক্স করা হচ্ছে নানাভাবে, সেখানেও মৌলিকত্ব হারায় অতিরিক্ত যন্ত্রের মন্ত্রণায়। তাই চুপচাপ অনেকেরই অর্ণব প্রিয়।

"চাই না ভাবিস" -এর পরে "হোক কলরব" আর "ডুব" একদিকে যেমন অনেক রকম খেয়াল খুশিতে গানবাজনা তুলে আনছে, সেখানে অর্ণবের কাছে প্রত্যাশা বেড়েছে দিনে দিনে। 'ডুব'-এর বেশ কিছু গান শুনে মনে হয়েছে কিছুটা কি জনপ্রিয়তার ভূতে ধরলো? কিছুটা কি তরুণ চাপল্যে পেলো তাকে? যে সুরগুলো জমে জমে শ্রোতার ভেতরে জায়গা করে নেয়, তারা এবারে হয়তো একটু লঘু হয়ে উঠেছে। "ডুবে"র পরে তাই আশা করছিলাম পরের অ্যালবামে অর্ণব আরেকটু সচেতন হবেন। সঙ্গীতের এতো এতো দিক, বিচিত্র গলিঘুপচি যেখানে খুঁজলে দারুণ দারুণ সব মণিমুক্তা পাওয়া যায়। তিনি না হয় সেই পথেই হাটুক। প্রথাগত চটুল জনপ্রিয়তা গানবাজনার বারোটা না বাজাক।


তাই "রোদ বলেছে হবে" নিয়ে বেশ আগ্রহ জন্মালো। খাপের ভেতরটা একটু আলাদা। একটা ছোট লিফলেটের মতো বই, লিরিক ভেবেছি। কিন্তু শেষ চারপাতায় পেলাম গানের লিরিক, তার আগের পাতাগুলো অদ্ভুত সুন্দর একটা গল্পে সেজে আছে। অর্ণবের লেখা, ছবিগুলোও তার আঁকা। অর্ণবের আঁকাআঁকি আগে দেখার সুযোগ হয় নি, তাই রীতিমত মুগ্ধই হলাম। ডিজিটাল পেইন্ট নিয়ে দেখাশোনা কম, গ্রাফিক্সের কাজ দেখে তাই আসলেই ভাবছিলাম মানুষের কল্পনা কতো বিচিত্রই না হয়! অনেকটা অর্ণবের মাথার ভেতরে ঢুকে পড়েছি মনে হচ্ছিলো। (Being John Malcovich!) আর যে গল্পটা অর্ণব বললেন, একটা সোনার হরিণ, সেই স্বপ্নপোকা, মায়াঘাত মাখা তীর, দুটো তীব্র আঁধার চোখের আক্রমণের, সেই গল্পটা আমি বলতে চাই না এখানে। কোন অ্যালবামের মাঝে এমন কিছু পাওয়ার জন্যে শ্রোতামন প্রস্তুত ছিলো না!

শেষ কথাগুলো বারবার ভাবছি...


সব সবুজ...
লাল হয়ে উঠছে ...
রোজ
আমার চারপাশে
বাক্স বাক্স ...
আহাম্মক বাক্সের দল!

CD তে মোট বারোটা গান। প্রতিধ্বনি, চিঠি পাঠাও, রোদ বলেছে হবে, মাথা নীচু, ইনিয়ে বিনিয়ে, বিড়ি, কে আমি, আমি যদি, মন খারাপ, একটা মেয়ে, মেঘ ফেটে গেছে, তোমরা যা বলো।

তুলনামূলকতা চলে আসে, প্রিয় গান শুনতে গেলে। তাই প্রতিধ্বনি শুনতে শুনতে হোক কলরব অ্যালবামের ঢঙ মনে পড়লো। গীটারের টোনের দিক থেকে খুব সজীব একটা আমেজ তৈরি হতে থাকে। অবশ্যই তো। তুমি একটা গানের যাত্রা শুরু করছো, সেটা কেন বিষণ্ণভাবে শুরু করবে? আসো, পথে নামি, রওনা দেই।

ঘাসফড়িং ও পাখির বুকে স্বপ্ন যতো
প্রাচীন কিছু সংগ্রহের গান হয় নিহত
সঙ্গীবিহীন সব হারানোর দুঃখ জেনে
রূপকথা তার সময় মতো নিয়ম মেনে।
(কথাঃ রাজীব আশরাফ)

অ্যালবামের সেরা গান সম্ভবত "চিঠি পাঠাও"। বিক্রম সিংয়ের লেখা গানটা আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগে গেছে। গানের মেজাজ সেই পুরনো 'চাইনা ভাবিস'-এর মতো মনকাড়া। প্রতিধ্বনি গানের রেশ কাটতে না কাটতেই অর্ণব হুট করে টেনে নিয়ে গেলেন রাতের বিস্রস্ত একাকীত্বের মধ্যে। সেখানে আমার সাথে কেবল আমি। চারপাশে নিশ্চুপ হয়ে আসা স্ট্রীটলাইটের ক্ষীণ আলো। এই সময়ে আর কিছু দরকার নেই, কিছুই না!

"শীতলপাটি চিনেছে রাত চিরকাঙাল
চির কাঙাল স্নেহের মতো একটু দিন
ভেঙেছে কতো নষ্ট ঢেউ উন্মাদের
কতো না মেঘ মেঘের কাছে বেড়েছে ঋণ।
মেঘের নীচে চাদোয়া নীল মফঃস্বল
মেঘের নীচে হেসেল ঠেলে বিষণ্ণতা।।"
এমন নিবিড় কথা, কবিতাই তো। একই সাথে গোপন আর সৎ, একই সাথে অভিমানি আর নিস্পৃহ। আমি এই গানটিই বারবার ঘুরে ফিরে শুনছি।

এর পরে শিরোনামের গান ''রোদ বলেছে হবে", এবং এই গান হতাশ করেছে 'ডুবের' গানগুলোর মতো। হয়তো ভিন্ন মুডের সাথে এই গানের অন্য চরিত্র ধরা পড়তে পারে, তবে আমার কাছে তেমন একটা আহামরি মনে হয় নি। এটার কথা রাজীব আশরাফের লেখা। তবে 'প্রতিধ্বনি'র কারণে তাকে আর দোষ দিলাম না।

এর পরের গান (মাথা নীচু)-এর কথা সাহানা বাজপেয়ীর। 'স্বপ্ন দেবে ডুব' যেমন ভাবিয়েছিলো, উস্কে দিয়েছিলো অনেক অনেক চিন্তার উনুন, তেমনি এই গানটিও ভাবাচ্ছে। সুরের দিক থেকে একটা থমথমে আবহের সাথে গানের কথাগুলো মিলেমিশে একটা অস্বস্তিকর অনুভব দেয়, যে অনুভব আমাদের বাস্তবতার একটা নিয়মিত অনুষঙ্গ। যেমন প্রতিক্রিয়াহীনভাবে আমরা খানিকটা বিযুক্ত হয়ে আছি আমাদের বাস্তবতায়, সেটারই ছবি এই গানে।
কথার বেড়া গেঁথে দিয়ে গেছে, কবেকার কোন কবি
বলবার কিছু বাকি নেই আর, নিথর নীরব এ ছবি

"ইনিয়ে বিনিয়ে" চমৎকার গান। তাল লয় মিলিয়ে সেই খাপছাড়া অর্ণব। মজা লাগে, এমন বেখাপ্পা তালের গানে মিশ খেতে খেতেও যেমন বেলাইন হয়ে যাওয়া, পাগলামি ঘরানার এই সুরটুকু জমতে জমতে আইসক্রিমের মতো গলে যেতে থাকা। পাহাড় থেকে বরফখণ্ডের গড়িয়ে পড়া বা উঠে উঠে আসা ধোঁয়ার মতো গান। জোহাদের সাহায্যভোকালটাই খালি বাজে লেগেছে। অর্ণবের গলার সাথে মিশেও নাই, পরিপূরকও হতে পারে নাই।

এই সুযোগে অর্ণবের গলা নিয়ে কিছু কথা বলে রাখি। এই অ্যালবাম শুনে মনে হচ্ছে হয়তো তিনি গলার যত্ন কম নিচ্ছেন। ফলস নোটে এতো বেশিবার চলে যাওয়া, লিরিক বেশিরভাগ জায়গাতেই অস্পষ্ট হয়ে ওঠা পীড়া দিয়েছে। হুট করে লিরিক হাতে না নিয়ে গান শুনতে বসে শব্দ বুঝতে না পারা শ্রোতার কাছে বিরক্তিকর, গায়কের জন্যে বিব্রতকর। তার এই দিকে আরো সচেতন হওয়া দরকার। আর ভুল উচ্চারণও পীড়াদায়ক ভীষণ। বানান ভুল যেমন একটা সুন্দর লেখার বারোটা বাজায়, তেমনি ভুল উচ্চারণের গানের আমেজের ক্ষতি করে। বিদেশে দেখি বুড়ো বুড়ো গায়কেরাও কী চমৎকার গলা ধরে রেখেছেন, আমাদের দেশের গায়কেরা কেন গলার বারোটা বাজান? সেটাকে ঠিকঠাক না রাখলে যতোই ভালো সুর আর কথা হোক না কেন, গান শুনতে ভালো লাগে না।

"বিড়ি" গানটার শিরোনাম যতোটা চমক দেয়, গানটি ততোটা মুগ্ধ করেনি। বিড়ি খেলে হয়তো আরো একটু রিলেট করতে পারতাম, তবে সে ব্যাপারেও সন্দিহান। প্রথম লাইন (হাত থেকে বিড়ি পড়ে যায়) ছাড়া বিড়ির গুরুত্ব বুঝলাম না। তাই এটাকে দ্রুত পেরিয়ে যাই।

অ্যালবামের সবচেয়ে শ্রুতিমধুর গান সম্ভবত "কে আমি"। এমনকি লিরিকের হিসেবেও প্রাণবন্ত (রাজীব আশরাফ আবারও)। এই গানে বিশেষ করে যেটা কানে বেজেছে সেটা হলো গীটারের নির্দিষ্ট একটা প্রগ্রেশন। অর্ণবের অ্যালবামে এমন দুয়েকটা গান থাকেই, সেগুলো বাজনার বৈচিত্র্যকে ধারণ করে। 'কে আমি' সেই কানের ক্ষিধেটা খুব ভালোভাবেই মিটিয়ে দিয়েছে। আর এই গানটা শুনে মনে হয়েছে লংড্রাইভে দারুণ মানাবে!

"রোদ বলেছে হবে"তে অর্ণব নিজে দুটো গান লিখেছেন। তার প্রথমটা "ইনিয়ে বিনিয়ে", আর পরেরটা "আমি যদি"। কিছুটা ফোক ঘরানার লিরিক, তেমন নজর কাড়ে নি, তবে এই গানটা অর্ণবের গাওয়ার গুণে একেবারে খারাপ লাগছে না!

বৃষ্টিমুখর দিনে শুনছিলাম, সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো বলে করার কিছু ছিলো না। তাই রাজীব আশরাফের তৃতীয় গানটা খুব ভালো লেগে গেলো। "মনখারাপের একটা সকাল, শূন্য আকাশ সফেদ নীলে, ক্লান্ত কোন চিলের প্রতি, তুমি কি আজ দিয়েছিলে? একটা অচীন ছায়াও তখন তোমার পাশে গোপনে, দাঁড়িয়ে ছিলো একান্তে ঠিক খুঁজতে তোমায় অনুরণে।" মন খারাপ সময়গুলোতে যেসব গান বালিশে ওয়াড়ে মিশে থাকে, আদর করে, সেগুলোকে তো ফেলে দিতে পারি না। সেগুলো মনের ভেতরে, ত্বকের গভীরে সেঁধিয়ে যায় খুউব!

ভালো লাগার দিক থেকে তিন চার নম্বরে যে গানটা, সেটা এর পরেই, শিরোনাম "একটা মেয়ে"। এই গানটার লিরিক এক কথায় অসামান্য লেভেলে ভালো লেগেছে। মেয়েটা হয়তো জানে না, তাকে নিয়ে কি অদ্ভুত গান গাইছে আরেকটা ছেলে। এই অনুভূতিপ্রবণতা, এই অন্যকে বুঝে ওঠার নিরন্তর চেষ্টা মানুষ এখন অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে মনে হয়। ভার্চুয়ালি কতো কতো দূরত্ব পাড়ি দিয়েছি আমরা, তাই তো পৌঁছুতে চাই মনের গহীনে। কী আছে তোমার মনে, মেয়ে? এক এক শব্দে উঠে আসছে টুকরো টুকরো মেয়েটা।
একটা মেয়ে/ কাক ভেজা রোদ/ রোদ পোড়া ঘাস/ কাশফুল/ দীর্ঘশ্বাস/ পথের পাশ/ মনের ভুলে/ রঙিন ফুল

তবে কাব্যিকতায় সবগুলো গানকে ছাড়িয়ে গেছে - মেঘ ফেটে গেছে। এবং আমি খুশি হয়েছি যে এই গানের কথা সাহানা বাজপেয়ীর লেখা দেখে। হুট হুট করে এমন কিছু লেখেন, মুগ্ধ হয়ে যাই!
"কোপাই'র মেটে জল থেকে, বুনো গন্ধে ভিজে
বকের ওই দলটা উড়ে এলো আমার দিকে
গত বিকেলের বার্তাসহ, ডানায় নিয়ে কাশফুলের রোঁয়া।
এই বেশ ভালো
মেঘ ফেটে গিয়ে চুঁইয়ে পড়া একটুখানি আলো"
একু্য়স্টিক গীটারে একেবারে খালি গলায় গান! আহা! চোখ বন্ধ করে ভাবছিলাম, কোন বৃষ্টিশেষের বিকেলে বন্ধুরা মিলে গোল হয়ে এলোমেলো বসে আছে। আর পুরো দলের মাঝে একজনের হাতে গীটার, সে মেঘধোয়া আকাশের দিকে চেয়ে আনমনেই এই গানখানি গাইছে। বাকিরাও হয়তো তার সাথে মিলে মেঘফাটা সেই একটুখানি আলোর দিকে তাকিয়ে আছে!

আর শেষ গানখানা রবিবাবুর। আর অর্ণবের সেই পাগলা অ্যারেঞ্জমেন্ট। সেই বেখেয়াল উদাম গলা, যে গলায় সাধারণত অন্য গানগুলো সে গায় না। ভালোও লাগছে, আবার মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে আসল অ্যারেঞ্জমেন্টটাই ভালো ছিলো। যতোগুলো রবীন্দ্রসঙ্গীত এখন পর্যন্ত অর্ণব গেয়েছেন, সেগুলোর সবগুলোতেই আমার এই রকম মনে হয়েছে। তবু, এই প্রচেষ্টাটুকু 'রক ইউদ রবীন্দ্রনাথ' টাইপের আবালামির চাইতে অনেক ভালো!


(*পুরো অ্যালবামের কৃতজ্ঞতা স্বীকার অংশটা বাংলায় দেয়ার জন্যে অর্ণবকে ধন্যবাদ। সবাই কেন যে এটা ইংরেজি দেয় আমি বুঝি না। বাংলার মানুষ, বাংলায় গান গেয়ে যদি ইংরেজিতে ধন্যবাদ জানায়, তবে কেমন উটকো আচরণ বলে মনে হতে থাকে। সেটা এখানে ঘটে নি।)

সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১০

জগা বললো - জগাখিচুড়ি!


সময় খুব অদ্ভুত জিনিস। এই মুহূর্তে যা ভাবছি, সেই কথাটা হুশ করে আমার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে! এই পৃথিবী যে সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে বন বন করে, সেই ঘূর্ণনের বেগ জানি কতো? ১৬০০ কিলোমিটার প্রতিঘন্টায়! আমি থির হয়ে এক জায়গায় বসে থাকলেও সটান জোরে চলে যাচ্ছি কতো দূরে। এই দূরত্ব অমোচনীয়। আবার দ্রুততায় মিশে যাচ্ছি কারো কারো সাথে। আমাদের এই পরিচয়, এই ক্ষণিকের মিলন ঠিক একটা দেয়াশলাইয়ের অগ্নিকণার সমান। ফপ করে নিভে গেলে ঘুটঘুট্টি।

সময় নিয়ে ভাবতেও সময় লাগে। সেই সময়ের কথা লিখতে আরো একটু সময় চলে যায়। আজ – অদ্য তাই আলসেমি। আড়মোড়া ভাঙি না, ভাঁজ করে রেখে দিই। সময় জানে, আমার সাথে লড়াইয়ে সে সবসময় জিতবে। তাই মুচকি হাসে, তাচ্ছিল্য।

সময় চলে যাচ্ছে এটা হ্যান্নার মুখের দিকে চাইলেও বুঝতে পারি। হ্যান্না ডাকোটা ফ্যানিং। এই তো ক’দিন আগে দেখলাম ছোট্টমণি। সবার সাথে কথা বলে গিড়বিড়-কলকল। কেউ একটু মুখ ভার করে কিছু বললেই ছলোছলো হয়ে ওঠে, টলমল করে কচুপাতার ওপরে একবিন্দু শিশিরের মতো। আবার স্মিত হাসি দিতেই খিলখিল! সেই হ্যান্নার শিশুমুখ কিছুতেই ভুলতে পারি না। সেও বড়ো হয়ে যাচ্ছে তরতর করে – সুইট সিক্সটিন। সেদিন তার ছবি দেখলাম – হাউন্ডডগ। দেখার সময় বারবার মনে পড়ছিলো টেইকেন-এর পিচ্চি অ্যালি’কে। দুটো ছোট ছোট বেণী দুলিয়ে আধো আধো বোলে কথা বলতো মিষ্টি মেয়েটা, আর এখন কেমন গহীন অন্ধকার সব চরিত্র করছে। মানুষের ভেতরের কুৎসিত দিকগুলোর শিকার হচ্ছে রূপালি পর্দায়, তারপরে সেই নীল চোখে তার অশ্রু...। সেই অশ্রু আর টলমল করে না, চোখেই শুকিয়ে ফেলে সে। তারপরে চোয়াল শক্ত করে। পৃথিবী চুরমার হয়ে ঘুরছে, তার সাথে পাল্লা দিতে হবে না! তাই হ্যান্না বড়ো হয়ে ওঠে...

বার বার মনে হয়, এ আমি মানি না।

সেই বেদনাতেই কি না। পৃথিবী ঘুরে ঘুরে আমার সাথে দেখা করিয়ে দেয় এক গাড়ি চোরের। নাম – মিশেল পোয়কার্ড। তার সাথে ঘুরতে ঘুরতে দেখা পাই প্যাট্রিসিয়ার। এরা দুইজনে দেড় ঘন্টা বক বক করে, ঝগড়া করে, মারপিটও করে কিছুটা। দৌড়ে বেড়ায় সাঁজেলিসে'র এভিন্যু ধরে। গাড়ি চুরি করে মিশেল, সেই গাড়িতে চড়ে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করতে যায় প্যাট্রিসিয়া। আর সবচেয়ে ভালো লাগে ৩৯ মিনিট ধরে ছোট একটা ঘরের ভেতর তাদের কথাবার্তা। দুজনে বিছানায় বসে কথা বলতেই থাকে, বলতেই থাকে। এরই মাঝে ক্রমাগত সিগ্রেট ফোঁকে মিশেল। আবোল তাবোল অসংলগ্ন আলাপ।

আপনার কি কখনও এমন হয় নি, কারো সাথে অর্থহীন, লক্ষ্যহীন কথা বলেছেন ঘন্টার পর ঘন্টা। কথা বলার পরে ভুলেও গেছেন যে কি বিষয়ে কথা শুরু করেছিলেন? মিশেল – প্যাট্রিসিয়ার গল্পটাও সেরকম। ছবির শুরুতে একটা খুন করেছে মিশেল, এক পুলিশ ড্রাইভারকে দূর্ঘটনাক্রমে গুলি করে মেরে ফেলেছে সে। তার পর থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। প্যারিসে ফিরে এসেছে জেলের খাঁড়া মাথায় নিয়ে শুধু প্যাট্রিসিয়ার জন্যে। তাকে নিয়ে সে পালিয়ে যেতে চায় ইতালি। সেখানে গিয়ে দুইজনে থাকবে। কিন্তু প্যাট্রিসিয়া যেতে চায় না। গড়িমসি করে। সেই এক ঘরের দৃশ্যে জানায়, তার ভেতরে আরেকজন আসছে। মিশেল আর তার সন্তান। এর জন্যে প্যারিসে থাকতে চায় সে। আর মিশেল তাকে নিয়ে চলে যেতে চায়।

খুব একটা রুদ্ধশ্বাস কিছু নেই। তারপরেও ছবির নাম – ব্রেথলেসজাঁ-ল্যুক গ’দার পরিচালক। সম্ভবত ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিচালক। পঞ্চাশ বছর আগে তার তৈরি এই ছবিটা দেখে রুদ্ধশ্বাস হয়েই বসে থাকি।

পৃথিবী কেন বন বন করে ঘোরে। কেন সে একটু থম ধরে দম নেয় না। চারপাশে এতো বাতাস, এতো হাহাকার মিশে ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাঝে!

আমি একটু নির্জলা বাতাস চাই, বিশুদ্ধ অক্সিজেন না হলেও চলবে। খালি একটু ভেজাল মেশানো, কোমল পানীয়ের মতো, বাতাস ফুসফুসে টেনে নেবো। তারপর একটু সময় বুকের ভেতর চেপে ধরে রাখবো। এভাবে আমার মনে হবে আমার চারপাশে আর কিছু নেই। কেউ নেই। কোন কিছু সত্যি সত্যিই আমাকে আর স্পর্শ করতে পারছে না। এই ভাবনা গাঢ় হওয়ার আগে হুট করে সেই বাতাসটুকু ছেড়ে দিবো। তাহলে মনে হবে আমি বেঁচে আছি। আমি ব্রেথলেস নই। আমার ভেতরে ফুসফুস সর্‌সর্‌ করে কাজ করছে। পেঁচিয়ে উঠছে ধমনীতে রাগ-ক্ষোভ-ভোগের স্রোত। গ’দার জানেন না, তিনি যে বছর মারা গেছেন সেই বছরেই আমি পৃথিবীতে এসেছিলাম। আর এতোটা সময় পরে, তিনি আমাকে ব্রেথলেস করে দিলেন জাম্প-কাট করা ছবির শেষ দশ মিনিট দিয়ে।

সবকিছু আসলে লাটিমের মতো ঘুরছে, এই পৃথিবী, তার মেরুরেখা-বিষুবরেখা, সমুদ্র-হিমাচল, আমাদের খবরের কাগজের প্রথম পাতা, আমাদের মুখ- প্রমুখ সকল কিছুই ঘূর্ণিতে মিশে হারিয়ে যাবার ঠিক আগে আগে ঝলসে উঠছে। এই বিশ্ব-চরাচরে তার অস্তিত্বের চে’ আর জরুরি কিছু নাই!



*****

২১.৯.১০

বৃহস্পতিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১০

সম্প্রতি অথবা-নগরে


কাচের জানালায় জমা হচ্ছে ড্রিজ্‌ল বিন্যাস, সন্ধ্যা খুব মোলায়েম শ্বাপদের ঢঙে হেলে পড়ছে
পুড়ছে দেয়ালে ঘোলাটে রোদের বাকি অংশ – যা জমে ছিলো – জমে থাকে


খোলা চোখে যা যা দেখা যায়, দেখা যেতে পারে, সে সব বিপুল বিভ্রম
গণিতের মতো প্রতিপাদনের উপায় নেই, আমাদের সময় কেমন রঙিন ওড়না হয়ে ভাসছে


গহন শহর ইটের পরতে অযুত গল্প লিখিত হয়, কোনো ইতিহাসে যার লিপি থাকবে না
জানা হবে না, কিভাবে স্ট্যাটাস বদলে যায় কোমল কিশোরীর, ছায়াহীন-নগরের পিঠে


ঘেঁয়ো কুকুরটি গতকাল থেকে ভাসমান ভিক্ষুকদের পিছু পিছু হাঁটছে, পেরিয়ে যাচ্ছে
শামুক–আইল্যান্ড, হৃদয়–ট্রাফিকের গরম চোখ, শহরে গরম ফ্যানের খাদকের অভাব নাই


'ঙ' -তে ব্যাঙ, যে ব্যাঙের গল্প ভাঁটাগুলোর ধোঁয়ার সাথে পাক খায়, নিঃসীমে উড়ে যায়
সেই রাজকুমার আজ মলিন কাচপুর ব্রিজের ওপর দীর্ঘ গাড়িজটে আটকা পড়ে হাই তুলছে


চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর দুটো টিকেট পেয়েছি, তোমার সাথে আমি চলচ্চিত্রের চর্চা করবো
অ্যারোনোফস্কির ছবি আমি বুঝি না, ঘোর ঘোর লাগে। তার চে' তোমার কোমল বাহুর উষ্ণতা শ্রেয়


ছবি দেখার সময়ে তুমি, কেন জানি, আমাকে দেখো না, ছবির দিকেই তাকিয়ে থাকো
তখন আমি তোমার পাশে বসেই তিন মুহূর্তে অসংখ্য দৃশ্যকল্প খুন করি


জঙ্গল কমে গেছে নগরে, তারপরেও হঠাৎ বড়োলোকপাড়ার গহীন গলিতে
আমার শীত লাগে, গাছের ছায়ার তলে আমি রূপকথা মাপি, ঘেয়ো কুকুরের চোখ চাটি


'ঝিনুক নীরবে সহো' বলে দিলে কবির কিছুই হয় না, সে তারপরে নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পারে
খালি ফেঁসে যায় নির্বাক ঝিনুক, ডুবুরি না এলে পরে মুক্তোটাকে তার কুৎসিত লাগে


ঞ্যামন নাঁকে নাঁকে কঁথা বঁলছে জেল-আটক বাবর, তেল চুপচুপে চুলগুলো তার, অনাদরে ধূসর,
ক্রমশ পর্দাজুড়ে বেলেল্লার ফ্রেম – আর সেখানে গোলাপি শাড়ির সাথে ইফতার খায় পাজামা দাড়ি



****

রবিবার, ২২ আগস্ট, ২০১০

স্মৃতিবিমুখ, প্রমুখ মুখ

চিলতে রোদে পাখনা ডুবাই, মুচকি হাসে শহরতলি
রোজ সকালে পড়ছে মনে, এই কথাটা কেমনে বলি?


- “বল, জোরে জোরে বল, ক’য়ে আ-কারে কা, ম’য়ে আ-কারে মা, ন — কামান”
ওপাশে খানিক নিশ্চুপ বিরতি, তার চোখের দৃষ্টি ফ্যালফ্যালে। বোবা।
- “কি হলো? চুপ করে আছিস কেন? কি বললাম, পড়্‌!”

ফ্যালফ্যালে চোখের সামনে শক্ত ঝুঁটি ঝলসে ওঠে। সেই সাথে ঝলসে ওঠে বছর দশ বয়েসী কোমল ধবল হাত। হাতের মুঠোয় ধরা বরইয়ের ডাল নেমে আসে ফ্রকের প্রান্তে। ফ্রকটার বয়েসও মাত্র সাত কিংবা আট। আসলে ফ্রকের নয়, ফ্রক-পরিহিতার। আমাদের সামনে চিরন্তন ফ্রেমে আটকে প্রাগৈতিহাসিক হয়ে উঠতে থাকে দৃশ্যটা। ঝুঁটিবাঁধা মেয়েটার হাতে একটু একটু মার খায় সামনে বসা আরেকটা মেয়ে। ওই মার খাওয়া মেয়েটার কোন দোষ নেই। ওর সামনে খোলা প্লাস্টিকের রঙজ্বলা বই, সেই বইয়ের একটা অক্ষরও সে বুঝতে পারে না। ‘কামান’ শব্দটা সে আগেও শুনেছে। এই তো সেদিন রাতে সবাই গোল হয়ে বসে টিভিটার সামনে। সেখানে শিঙার ফুঁকের সুরে নাটক শুরু হয়েছিলো। সেই নাটকে শুনেছে, “কামান দাগো!” তারপরে টিভির পর্দায় খালি ধোঁয়া ধোঁয়া, আর জোরে একটা শব্দ হয়েছে, দুড়ুম! ঐ কালো কালো নল দিয়ে ধোঁয়া বের হয়ে টিভির পর্দা সাদা করে দিয়েছিলো। মেয়েটার মনে হয় এই ধোঁয়া হয়তো বসার ঘরটাকেও ঢেকে ফেলবে।

তাই আজকে দুপুরে শুনশান ব্যালকনিতে ওর আপুর হাতে ধরা বরইয়ের ডাল যখন সপ সপ করে নেমে আসে, মেয়েটা খুবই অবাক হয়ে যায়! আপু তাকে মারছে কেন! সে কি কোন দোষ করেছে? বা কোন ভুল করেছে? নাহ। ও তো ভাবছিলো কামানের নল, ধোঁয়া আর টিভিটার কথা। আপুর মারগুলো ওর হাঁটুর নিচে এসে পড়ছে আর ওর বুকের ভেতরে গুম গুম করে উঠছে। এক হাত দিয়ে অন্য পায়ের আঙুল চেপে ধরে মেয়েটা চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করে। আমার তৈরি করা ফ্রেমটা গলে অতলান্তিক হয়ে যায়!

সেদিন বিকেলে ওদের শহরতলিতে বড়ো বড়ো কামান আসে। বরইয়ের ডালটা এলোমেলো করে দিয়ে খটাখট বুটের শব্দ উঠে আসে। ওদের বাসা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়! মেয়েটা দৌড়ে বাসার পেছনে কুয়োর ভেতরে লুকায়। ওকে দুদ্দাড় করে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো ওর আপুটাই। তারপরে একটা কচুরির ঢিপি মাথায় চাপিয়ে কুয়োর ভেতরে নামিয়ে দিয়েছিলো।


কুয়োর ভেতরে মেয়েটা বসে ছিলো সন্ধ্যা অব্দি। তারপরে কুয়োর বাইরে লাল লাল আগুন জ্বলে উঠলে ও বেরিয়ে দেখে ওদের বাসার জানালার পর্দাগুলো পুড়ছে। সেদিন থেকে মেয়েটা পুড়ে গেছে ভেতরে ভেতরে। আজ সকালে, এতোগুলো বছর পরে সেই মেয়েটি মারা গেছে। গত তিন বছর সে অ্যালঝেইমারে ভুগছিলো। স্মৃতি কুরে কুরে খেয়ে ফেলেছিলো স-ও-ব। মাথার ভেতরে কী এক কীট ছিলো তার, কেউ কি পুরে দিয়েছিলো? তারপরে হঠাৎই আজ সকালে, যখন একটু একটু করে আলো ফুটছে, তখন সে মশারির ভেতরে যেন সব ফিরে পেলো। আমি পাশে বসে ছিলাম। মশারির ভেতর থেকে কাঁপা কাঁপা একটা হাত বেরিয়ে এলো – রুগ্ন, থরথরে। নিঃশ্বাস নিতেও যার কষ্ট হয়, সে হঠাৎ যেন কী অসুরিক জোর পেয়ে গেলো! আমার হাতের আঙুল জোরে আঁকড়ে ধরে এক দমে বলে উঠলো,
- “বাবু, বাবু! বল তো, জোরে জোরে বল, ক’য়ে আ-কারে কা, ম’য়ে আ-কারে মা, ন — কামান”



*****
- অনীক আন্দালিব
২২.৮.১০

বুধবার, ১৮ আগস্ট, ২০১০

যৌনকর্মীঃ একজন পেশাজীবীর স্বীকৃতি ও তদসংলগ্ন ছেঁড়া চিন্তা

গত পরশু (১৮/৮/২০১০) বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন একটু খবরের শিরোনামে এসেছেন। ধর্মনিরপেক্ষতা বলবৎ করার ব্যাপারে মূল আলোচনা বা বিতর্কের জায়গায় ছিলো সুপ্রীম কোর্ট। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভের একটাকে পুনর্বহাল করেছিলো তারা। আর এখন নির্বাচন কমিশন ভোটার আইডি'তে যোগ করেছেন বেশ কিছু পেশা। তাদের বক্তব্য, নতুন যোগ করা পেশাগুলোকে আগে চিহ্নিত করা হতো না। সেই পেশাজীবী মানুষদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতেই এই উদ্যোগ।

লিস্টিটা দেখলাম- যৌনকর্মী, ইমাম/পুরোহিত/যাজক(clerics), সেবিকা, হেয়ার-ড্রেসার, ধোপী, কাজের লোক (মেইড), মালী, ক্লিনার, বাবুর্চি, দর্জি, ড্রাইভার। তবে এই পেশাগুলোকে নিয়ে তেমন আলোচনা তৈরি হয় নি। বাঙালি মধ্যবিত্তের মননে 'তোলপাড়' তুলে ফেলেছে কেবল যৌনকর্মী পেশাটি। এই নিয়ে এরই মাঝে কিছু ব্লগে কয়েকটা লেখা দেখলাম, মূলত খবরটার প্রতিক্রিয়া নিয়ে। আশা করেছিলাম যেমন, ঠিক তেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে সকলেই আমার ধারণাটিকে বদ্ধমূল করেছেন যে বাংলাদেশের সামাজিক চালচিত্র মোটেই এই পদক্ষেপের জন্যে অনুকূল নয়।

যৌনকর্মী সংক্রান্ত প্রাথমিক 'বুকিশ' আলোচনার দিকে যাবো না, সেদিকে আমি আপনার চাইতে বেশি কিছু জানি না। তাই চলুন একটু অন্যদিকে চোখ ফেরাই। ঐ যে বলছিলাম, নির্বাচন কমিশন এবং সুপ্রীম কোর্ট নিয়মিতই কিছু পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের মাঝে ঘুরে ফিরে উঠে আসছে। এই উঠে আসার কারণ হয়তো তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের সাথে আমাদের মনন, সামাজিক প্রথাবদ্ধতার অমিল মূলাংশে দায়ী। ধর্মপ্রবণ এবং মোটামুটি অশিক্ষিত এই জনপদে গিজ গিজ করছে মাথা, সেই মাথায় চুল গজায় আবার ঝরে পড়ে টাক বিস্তৃত হয় কিন্তু খুলির ভেতরে ধূসর-বস্তুতে খুব বেশি আলোড়ন ওঠে না। যে খুলিগুলোতে কিছুটা রসদ থাকে, সেগুলো ড্রেন দিয়ে বা প্লেনে চড়ে পাচার হয়ে যায় ফর্সা-চামড়ার দেশে। তার এখানকার কালো, কুৎসিত, কুশিক্ষিত মানুষের মনন একটা আধা-ধর্মান্ধ-আধা-সুশীল অবস্থানে আটকে থাকে (আছে)। এই অবস্থায় আমাদের রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা পরপর দুটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। "যুগের অন্ত" আক্ষরিকার্থেই! কারণ, জন্মাবধি কাগজে কলমেও বাংলাদেশ সাড়ে চার বছরের বেশি সময় ধর্মনিরপেক্ষতা ধরে রাখতে পারে নি।

পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির সময়ে যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছিলো যে এই ইসলামিক রাষ্ট্রটি ১০০ বছর বাঁচবে, যুগে যুগে এইখান থেকে তৈরি হবে নব্য-মুসলিম স্কলার, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথে ও সভ্যতার উৎকর্ষে তারা অবদান রাখবেন; সেই সুখ কল্পনা ছেঁড়া কাথার ফুট দিয়ে পালিয়েছে। পেছনে ছিলো সামরিক লাঠির বাড়ি। আধামূর্খ-আধামুসলিম বাঙালিত্বের লুঙ্গি খুলে খুলে যখন পাক-পবিত্র পাকিস্তানিরা চেক করেছে, তখনই বোঝা গেছে পলিমাটিতে মরু-রুক্ষ ইসলাম জমবে না। এখানে পীর-আউলিয়াদের হাত ধরে আগত ইসলাম কেবল আচারে, প্রথায় রাখা যেতে পারে, তার বেশি মানুষ তা মানবে না।

বাঙালি তখন লুঙ্গি ছেড়ে সবে রাস্তাঘাট বানাচ্ছে আর শার্ট-প্যান্টের সাথে জুলপি রাখতে শিখেছে। তাদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতার গ্রহণযোগ্যতা একটা সামাজিক-রাজনৈতিক উল্লম্ফন ছিলো। কিন্তু পুরো শরীর এক সাথে না লাফালে যেমন গোত্তা খেয়ে পড়তে হয়, তেমনি সাড়ে চার বছরেই ধর্মনিরপেক্ষতার ঝুমঝুমি হাত ফস্কে গেছে, একেবারে নিচতলায়, বেইসমেন্টে ধুলো মেখে। আমরা শনৈ শনৈ সামরিক উন্নয়নে ডুবে গেছি, বন্যায় ডুবেও রাস্তাঘাট আর খাল কেটে স্বস্তি পেয়েছি। ব্রিটিশ জুতো, পাকিস্তানি জুতোর পরে বাংলাদেশী জুতোর পাড়া খেতে আমাদের কালো দেহে মন্দ লাগে নি। পরিবারতন্ত্রের রাশান রুলেৎ খেলা "রহমান ডাইনেস্টি" দুটোর ভগিজগিও গত বিশ বছরে সামরিক শাসনের 'সমসাময়িক' হয়ে উঠছে। তো, এবারে নতুন শতকের এক দশক পেরিয়ে গেলে কোন দৈববলে আবার সেই মানিকরতন ফিরে এলো, তাকে নিয়ে আমরা কী করবো; কোলে রাখবো নাকি ছুঁড়ে ফেলবো, এটাই এখনো ঠিকঠাক ঠাহর হচ্ছে না।

তার ওপরে নির্বাচন কমিশন চাপিয়ে দিলেন পেশা-স্বীকৃতির এই 'অভাবনীয়' বিজ্ঞপ্তি! এবারে আমাদের পুরুষালী রোম খাড়া হয়ে গেছে। এই উত্তেজনায় বাকি সবগুলো পেশাজীবীকে বাদ দিয়ে আমরা যৌনকর্মীদের নিয়ে পড়েছি। এমনিতেই তাদের ব্যাপারে ট্যাবু, চাপা-আগ্রহের কোনই কমতি নাই, তার ওপর নিঃকঃ এসে পেশা হিসেবে উন্মুক্ত করে দিলো যেন। এখন হিসেব উঠে আসছে, ঢাকায় ঠিক কতোজন যৌনকর্মী আছেন, ঠিক কোন কোন জায়গায় তাদের ডেরা, বাংলাদেশেই বা কতোগুলো 'নিষিদ্ধপল্লী' আছে ইত্যাদি।

খেয়াল করলাম, যে পেশাগুলোকে নতুনভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই নারীর পেশা। ইমাম/পুরোহিত/যাজক, মালী এবং ড্রাইভারের পেশাতে এখনও পুরুষের একচ্ছত্রতা। সেবিকা, যৌনকর্মী, কাজের লোক এগুলো পেশায় নারীর একচ্ছত্রতাও উল্লেখ করি। বাদ বাকি পেশাগুলোতে ধীরে ধীরে নারীকে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। এই সবগুলো পেশার মধ্যে মিল হলো সচরাচর এগুলোকে সমাজ ও রাষ্ট্র 'চিনতে' চায় না। কাজের লোককে নামমাত্র বেতনে রাখা হয়। ইংরেজি খবরে "ক্লিনার" বলে সম্ভবত মেথর ও জমাদার বুঝিয়েছে, তাদেরকেই বা কতোটা দ্রষ্টব্য ভাবা হয়? সেবিকাদের নামের আশে পাশে 'মহামতি ফ্লোরেন্সে'র নাম নিয়ে তাদেরকেও শ্রমের ন্যায্যমূল্য দেয়া হয় না। হয়তো শুভ্র পোশাকের সেবিকাদেরকে ততোটা 'খেটে খাওয়া' বলে মনে করতে আমাদের 'সুশীল' চোখ অভ্যস্ত নয়। আর সেই সুশীল চোখের কাছে যৌনকর্মীর নাম দূরে থাক, উল্লেখমাত্রই একেবারে অচ্ছুৎ।

তবু নিষিদ্ধের কৌতূহল আর বিকৃত আগ্রহ আমরা নিশ্চিত লালন করি। তাদের জীবন ও জীবিকার খবর জানতে, পরিসংখ্যানের ভেতরে আরো খতিয়ে জানতে অনেকেই উৎসুক। এই ঔৎসুক্য জন্মেছে পারিবারিকভাবে শেখানো ঠুঁটো নিষিদ্ধতার কারণে। যৌনতা এ অঞ্চলে ট্যাবু হলেও অন্তরীণ নয়। সকলেই চর্চা করেন, এখন তথ্যপ্রবাহের ঢেউয়ে তার অনেকটাই জানা যায়। নারী বা পুরুষ কেউই এই চর্চার বাইরে নেই। হয়তো অংশগ্রহণের স্বাভাবিকতায় নারী যুগযুগ জিইয়ে রাখা জড়তা এখনও কাটাতে পারে নাই, তবু প্রায় সমানে সমানেই (আড়ালে বা প্রকাশ্যে) যৌনতার লালন ঘটছে।

সুতরাং এখানে কোন উন্নাসিকতার উপায় নেই, সুযোগ নেই উপেক্ষার। স্বীকার করেই নিতে হয় যে এই আদিমতম পেশাটি বঙ্গ-জনপদে প্রাচীনকাল থেকেই আছে, আছে এর "ভোক্তা" (পুরুষ) ও "কর্মী" (নারী)। সমাজে পুরুষ নিজের সামাজিক প্রতিপত্তি আর পরিচয়ের জন্যে রেখেছে স্ত্রী, আর ভোগ ও লালসার জন্যে রেখেছে যৌনকর্মী। এবং নিজেদের 'সম্মান' ধরে রাখতে এই কর্মীদের নাম দিয়েছে 'পতিতা', 'বেশ্যা' ইত্যাদি। নামগুলো দেখুন, নিছক শব্দ হিসেবেই প্রথম শুনেছিলেনঃ কিশোর বয়সের কথা মনে করুন। তারপরে শিখে গেছেন, এগুলো কতোটা নিকৃষ্ট শব্দ, অশ্লীল, অসভ্য, কুৎসিত। তারপরে পরিচিত হয়েছেন এই শব্দগুলো যাদের সাথে ব্যবহার করা হয়, তাদের সাথে - সেই নারীদের সাথে যারা পতিত, অস্পৃশ্য, নিষিদ্ধ ইত্যাদি। অথচ তারা কোথায় থাকে, কি করে, কারা তাদের কাছে যায় এটা জিজ্ঞেস করলে নিশ্চিত বড়ো একটা ধমক খেতেন। 'চুপ' বলে চেঁচিয়ে উঠতো আপনাকে আদর্শলিপির পাঠ দেয়া 'পুরুষ' চরিত্রটি।
এই চর্চা, আবহমান সংস্কৃতির মতো চলে আসছে। পুরুষ কখনই যৌনকর্মীর কাছে যাওয়া থামায় নি, এবং নিয়মিত খদ্দেরকেই দেখা গেছে তাদের বিপরীতে উচ্চকণ্ঠে। এই দ্বিমুখী আচরণ আসে কুশিক্ষা থেকে, প্রথাবদ্ধতা থেকে, অন্ধের মতো ক্ষমতা দখলের লিপ্সা থেকে। এখানে কেন ক্ষমতার কথা আনলাম? একটু ভেবে দেখলে আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন।

সমাজের ক্ষমতার পিরামিডে এই নারীদের অবস্থান কতোটা নিচে! হয়তো সবার নিচে। এমনিতেই অনগ্রসর ও দরিদ্র জনপদে গড়পড়তা নারীরা ২য় শ্রেণীর নাগরিক, তার ওপরে তাদের মধ্যে যারা দেহব্যবসার সাথে জড়িত, তারা না পান পরিচয়, না পান মূল্য - সামাজিক অবস্থান তো দূরাস্ত। এ অবস্থায় তাদেরকে আলাদাভাবে কেন 'পতিত' বলে চিহ্নিত করা হলো? কারণটা কি খুব স্পষ্ট না? কারণ সমাজের পুরুষের দুশ্চরিত্রের অনেকটা চেহারাই তাদের কাছে উন্মুক্ত। ভ্রষ্ট প্রথা মেনে সমাজে প্রতিপত্তি গড়ে তোলা উপরতলার বেশির ভাগ পুরুষ এই সকল নারীর ভোক্তা। কাঁচা বাজারে গেলে তারা যেমন প্যান্ট উঁচু করে চলেন, কাদা মাড়ালে যেমন তাদের নাক কুঁচকে যায়, সেই সকল উন্নাসিকের গতায়াত এই অঞ্চলে অহরহ। আর সেজন্যেই, যৌনকর্মীদেরকে সমাজের নিচু থেকে নিচুতলায় ঠেলে দিলে এই সব পুরুষদের স্বস্তি হবে। এতোটা নিচুতলা থেকে তারা আর কিইবা বলবে, আর সেটা কে-ইবা শুনবে?

বিষয়টা প্রবলভাবে রাজনৈতিক - ক্ষমতার বন্টনের মতো। কিন্তু সে দিকে না তাকাই। আমরা বরং 'আম' জনতা সেজে থাকি। অন্ধকারে আমাদের মাঝে কে কে এই পল্লীতে এগুবেন সেটা একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার। আমরা সেখানে কোন জাজমেন্টাল অবস্থান নিতে চাই না।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন যৌনকর্মীদের স্বীকৃতি দিচ্ছেন। যুগের পর যুগ ধরে তাদের প্রতি জমে ওঠা অবহেলা, নাক সিঁটকানোর স্বভাবটাকে বদলাতে তারা সমাজের আরো পাঁচজন পেশাজীবীর কাতারে উঠিয়ে নিয়ে আসছেন। এই পদক্ষেপটি যাদের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তারা স্বভাবতই উপরে উল্লিখিত মানুষদের মতো মন-মানসিকতা ধারণ করেন। যতোক্ষণ তাদের সেই কূপমণ্ডুক, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব তারা নিজেদের ভেতর রাখছেন, ততোক্ষণ সেটা নিয়ে মনে হয় না কারো মাথাব্যথা আছে। কিন্তু যখনই তারা গলাবাজি করে সমাজের নৈতিকতা, এবং অনুশাসনের বুলি আওড়াতে যাবেন, তখন মনে করিয়ে দেয়া জরুরি যে এই নারীদের পেশাবৃত্তির ভোক্তাশ্রেণীটি কারা।

যৌনকর্মীদের পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াটা মূলত পুরুষ ভোক্তাদেরকে ভোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সমতূল্য। এই বিষয়টিই হয়তো কাঁটার মতো গলায় বিঁধছে অনেকেরই। তাদের জন্যে প্রেসক্রিপশন, দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার পুরুষতান্ত্রিকতার গলায়, মানবতার ফোরসেপ দিয়ে কাঁটাটি না তুললে অচিরেই সেপটিক হয়ে যাবে। তখন না গোটা গলাটাকেই কেটে ফেলতে হয়!


***
[*নির্বাচন কমিশনে এবং সরকারি কর্তাব্যক্তিদের মাঝে কোটি কোটি দোষত্রুটি আছে। এই সরকার ইতোমধ্যেই বিভিন্ন খাতে ব্যর্থতার পরিচয় 'সগৌরবে' রেখেছে। তারপরেও এরকম কিছু দুরন্ত উদ্যোগের জন্যে তারা সাধুবাদ দাবি করেন। বাংলাদেশে সামরিক ও ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়াশীলতার পিঠে এরকম প্রগতিশীল পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই!]

রবিবার, ৮ আগস্ট, ২০১০

'অমানবিক' !

আমার ঘরে কিছু স্পর্শকাতর মানুষ বাস করে। তারা সামাজিক জীবঃ একা একা চলতে পারে না। থমকে যায়, দু'পা এগোয়, তারপরে থামে আর হোঁচট খায়।


আমার ঘরে কিছু অনুভূতিপ্রবণ মানুষ বাস করে। তারা সাংস্কৃতিক জীবঃ প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতি ধরে রেখেছে। তারা সংস্কৃতি খায়। মাখে। ঘুমায়। চোষে। আমের আঁটির মতো সংস্কৃতির গায়ে কমলা কমলা মাংস কামড়ায়।


আমার ঘরে কিছু বাঙালি-চেতনায় গাঢ় মানুষ বাস করে। তারা হাজার বছরের বাঙালিত্ব লালন করে। বাঙালিত্বের ভারে তারা শ্বেত-শুভ্র হয়ে যাচ্ছে, বাংলায় হাসছে, বাংলায় নিন্দা করছে, বাংলা দিয়ে বাংলাদেশকে করছে।


আমার ঘরে এমন চমৎকার মানুষের ভীড়ে আমি ক্রমশ বর্ণবাদী হয়ে উঠছি। বর্ণবাদী সুশীলীয় শব্দ, এটাকে গালি মনে হয় না। বরং বলতে পারি, আমি রেসিস্ট হয়ে উঠছি। এটা বলামাত্রই মানুষগুলো শিউরে উঠলো, তাদের চোখে আমি নিজের ছায়াকে ধীরে ধীরে এনার্কিস্ট হয়ে উঠতে দেখলাম।


স্পর্শকাতরেরা সামাজিকভাবে আমাকে বয়কট করলো, এই হলো তাদের একুশ শতকের আন্দোলন।
অসহযোগের মতো দাবানল ছড়িয়ে গেলো তাদের মাঝে।


অনুভূতিপ্রবণেরা কমলা সংস্কৃতি খেয়ে রেগে লাল হয়ে উঠলো, তারা পথনাটক আর জনগানে
আমার বিরুদ্ধে মোর্চামিছিল নামিয়ে দিলো গতকাল সাঁঝে।


বাঙালিত্বে উজ্জ্বল মানুষেরা আমাকে বাংলায় তিরস্কার করলো, বাংলায় লিখলো পাতা-পাতা
স্মারকলিপি, প্রতিবাদ-বিবৃতি, রেগে উঠলো বাঙালি ঝাঁজে।


আমি তাদের সবাইকে আমার ঘরে রেখে বেরিয়ে এলাম
বাইরে তখন হলুদ হলুদ রোদ মেখে আকাশ খুব হাসাহাসি করছিলো নীল মেঘের ওড়না ধরে!


***

৮.৮.১০

মঙ্গলবার, ৩ আগস্ট, ২০১০

মুঠোজুড়ে একান্ত গান

don't know what to say, don't know how to say...
let me just be silent, and beside you I stay...

মানুষের জীবন এক ক্ষণিক আচরণ, মুহূর্তিক আবেশ
কাটতেই টের পাই হাতের তালুতে জলকঙ্কাল ছাড়া
আর কিছু নাই। কেউ নাই।

আমাদের জীবনে কিছু নাই আর, স্মৃতিভার ব্যতীত
কিছুই রাখি নাই যত্নে মুঠোর ভেতরে ছিলো তারা
সুখে, সমৃদ্ধিতে, একান্ত গোপন আনন্দে ছড়িয়ে
কণা কণা বালুর মতো নিশ্চিন্ত আনত নয়নে

আশৈশব লুকোচুরির ভয় – চোখের আড়ালে গেলেই
হয়তো পৃথিবীর ঘূর্ণনে হারিয়ে যাবে তুমি, হারানোর নয়
হাতের মুঠোর এই স্মৃতিগুলো। এই স্বাভাবিক পতন
মেনে নিতে পারি, তবু হারানোর ভয় পৃথিবীর ঘূর্ণিতে
হারিয়ে গেলে খুশি হই।

এই মুহূর্তটি কেটে গেলে হয়তো তুমিয়ামি ভুলে যাবো গতকালের গান, আগামীকালের শোক ও আজকের হাস্য-কোলাহল। তারপরেও ভোর হবে, তোমারামার দিন ফুরোবে, পৃথিবী থেকে মুছে যাবে স্মৃতি, হর্ষ ও শ্লোগানসমূহ...


***

৩.৮.১০