মঙ্গলবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৩

বৃষ্টিসন্ন

সারাদিন বৃষ্টি, কখনো তুমুল, কখনো ঢিমেতেতালে। পাশুঁটে আকাশ ছড়িয়ে রইলো রুটির ওপরে জমা ছত্রাকের মতো। দিনের বয়স বোঝা গেলো না। রেফ্রিজেটরের ভেতর আরেকটু কুঁকড়ে গেলো শেষ টমেটোর ত্বক। খোঁজ নিলে জানা যাবে মেইলম্যান আজ কাউকে পায় নি ঠিকানায়, দরজায় সেঁটে এসেছে আবার আসার প্রতিশ্রুতি। জেঁকে বসা দীর্ঘ শীতে জমে থাকা ছিন্ন পাতা ও প্রশ্ন ধুয়ে গেলো স্রোতমুখে। জুতোমোজা ভিজে সপসপে, রোডসাইন ঘোলা হলো বাষ্পে। ছাতি চেপে মুষলবৃষ্টিতে চড়াই উতরে দেখি সকালের ক্লাস বাতিল হয়ে গেছে। টুকরো সংলাপ আর এলোমেলো কাদামাখা পায়ের ছাপ এদিক-সেদিক চলে গেছে। কান্নাস্রোতের ঢল নেমেছে পাহাড়ের ঢালে, ফিরতি পথে সেই কান্নার ফোয়ারা ছিটিয়ে গেলো কোনো আন্ডারগ্র্যাডের বিকটদর্শন ট্রাক।
স্মিত হাসি। গোড়ালিতে জমে থাকা বিষণ্ণ ক্রোধটুকু ধুয়ে গেলো।

সোমবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৩

রাজাকারের ফাঁসি ও প্রাসঙ্গিক চিন্তা

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী বাচ্চু রাজাকার ওরফে আবুল কালাম আজাদকে বাংলাদেশের সংবিধানের সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একাত্তরে ফরিদপুর এলাকায় খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ সহ অসংখ্য কুকীর্তির জন্য দায়ী এই বাচ্চু রাজাকার। পাকিস্তানি আর্মির সাথে মিলে যুদ্ধের সময় নিরীহ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে এই কুখ্যাত অপরাধী। তার শাস্তির রায় শুনে মনে যে অভূতপূর্ব আনন্দ হলো তা প্রকাশের ভাষা আমার নেই। এক ঘুম দিয়ে উঠলাম, এখন মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা মাথায় আরো কিছু ব্যাপার চিন্তা করার সময় এসেছে।
১। বাচ্চু রাজাকার পলাতক। রাজাকারদের দোসর-রাষ্ট্র পাকিস্তানে। তাকে ধরা হবে এই খবর পেয়ে সে পালিয়েছে। এখন তাকে ধরে আনা হউক। পাশাপাশি এটাও চিহ্নিত করা হউক যে কে বা কারা তাকে পালাতে সাহায্য করেছিল। রাজাকার ও রাজাকার-সমর্থক কারো ঠাঁই এই দেশে থাকা উচিত না।
২। এই রায়ের বিপরীতে আপিল করবে আসামিপক্ষ। সেই আপিলের সময় ৩০ দিন। তারপরে সেইটাকে আবার খণ্ডন করা হবে। আমার চাওয়া এই আপিল সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক। কোন জামাত-শিবির বা তাদের ভাবসমর্থক যেন বলতে না পারে যে তারা সুযোগ পায় নাই।
৩। এই রায়ে ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য দলীয়ভাবে জামাতকে দায়ী ঘোষণা করেছে ট্রাইব্যুনাল। সুতরাং জামাতের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে মামলা করে বিচার করার সময় এসেছে। উল্লেখ্য ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালেও বেশ কয়েকটি দলের বিচার হয়েছিল। (তথ্যটি পেলাম একরামুল হক শামীমের কাছ থেকে। তাকে ধন্যবাদ।)
৪। বাচ্চু রাজাকার টিভিতে ধর্মীয় উপদেশের অনুষ্ঠান করতো। তাকে এই সুযোগ করে দিয়েছিল এটিএন বাংলার মালিক মাহফুজুর রহমান, এবং পরে এনটিভির মালিক মোসাদ্দেক আলী ফালু। মাহফুজের দুর্নীতি ও পীড়ন নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। ফালুও কী চিজ, কত টাকা দুর্নীতি করেছে, সবাই জানে। এখন সময় এসেছে শক্ত হাতে এদের বিরুদ্ধে আইনী প্রচারণা শুরু করার। রাজাকারের পৃষ্ঠপোষকদের একে একে ধরা উচিত।
৫। জামাতের বর্তমান অবস্থা হলো তারা বিএনপির সাথে মিশে রাজনীতিতে টিকে থাকতে চেষ্টা করছে। অতীতে আওয়ামী লীগের সাথে মিশেছিল। এই অ্যামিবাসদৃশ বর্ণচোরার দল ভবিষ্যতেও আওয়ামী লীগের সাথে মিশতে পারে। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নাই। এখনই সময় এদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। যুদ্ধাপরাধী বিচারের পাশাপাশি জামাতের ধর্মভিত্তিক বদমায়েশি থামানো দরকার। এটা সহজেই অনুমেয় যে তারা ধর্মানুভূতির দোহাই তুলে পাব্লিক সিমপ্যাথি পেতে চাইবে। কিন্তু এই খুনী ও ভ্রষ্ট দলটির ব্যাপারে এখন সতর্ক না হলে পরে সমূহ বিপদ হতে পারে। এমনিতেই এরা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে।
৬। জামাতের পাশাপাশি কিছু বুদ্ধিবেচা বুদ্ধিজীবীদেরকেও ধরার সময় এসেছে। একজন হলো আসিফ নজরুল, ওরফে নজরুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক, যে মতিউর রহমান নিজামী যুদ্ধাপরাধী নন এমন বক্তব্য দিয়েছিল। এছাড়াও নানা সময়ে ট্রাইব্যুনাল নিয়ে তার মহা আপত্তি। এটা ঠিক না, ওটা ঠিক না, এহেন নাকিকান্না সে প্রায়ই টক-শোগুলোতে কেঁদে বেড়ায়। আদালত নিয়ে এমন অপমানজনক কথা বলায় তাকেও বিচারের সম্মুখীন করা উচিত।
৭। আরেকজন অপরাধী আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। ট্রাইব্যুনালের বিচারকের প্রাইভেসি লঙ্ঘনের দায়ে তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়া উচিত। বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে সেও।
৮। সবশেষের পয়েন্টটা সংরক্ষিত তাদের জন্য, সেইসব ভবিষ্যত-দেখে-ফেলা জাতির কর্ণধারদের জন্য, সেইসব হাস্যকর জ্ঞানীর জন্য, সেইসব ডাইকোটামি-কপচানো রিকনসিলিয়েশন-থিওরির প্রবক্তাদের জন্য, সেইসব 'আসল যুদ্ধাপরাধী' খোঁজা গরুচোরগুলোর জন্য, সেইসব কাব্যচর্চা-উপন্যাসচর্চা-সাংবাদিকতাচর্চা করা পাকিস্তানপন্থীদের জন্য। তাদের দেখে আজ হাসছি। অনলাইনে তাদের তুবড়ি ছোটানো পূরীষগুচ্ছ আজ থেকে এতিম হলো। এইসব কুবুদ্ধিপনার জঞ্জাল একদিন শেষ হবে, ধুয়ে মুছে সাফ হবে। আমি সেইদিন এদেরকে নিয়ে আর মাথা ঘামাবো না।

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৩

স্বীকারোক্তিনামা

এই আত্মবঞ্চনা আর অবিশ্বাসের কালে
আশা করি না কারো কাছে কিছু
চাই না ক্ষমা কিংবা নিগ্রহ কোনোটাই,
ক্ষমার্হ কোন লঘুপাপ করি নি, হই নি দুর্বল -
নিগ্রহের কারণ হবার মতো
শংসাবচনে একঘেঁয়েমি জন্মেছে বহু কাল
ঘুরে ফিরে প্রশস্তির ভাষা, আটপৌরে ও মেকি; চাই নি।
দায় নেই কারো কাছেই, না সমাজ, না ব্যক্তি,
প্রভু মানি না কাউকে, দাস পালন করি না কখনো;
সেমিকোলনের মত অর্ধযতি হয়ে আছি।
সমাপ্তি ঘোষণার মত বড় কিছু হতে চাই না

রবিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১২

পাইয়ের জীবন - রূপকজাদু!


আজকে দেখে এলাম লাইফ অফ পাই। ইয়ান মার্টেলের বিখ্যাত বইয়ের চলচ্চিত্ররূপ। অ্যাং লিয়ের কাজ আমার খুব পছন্দের, তার বেশ কয়েকটি ছবি দেখা হয়েছে - যেমন "সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি", "ব্রোকব্যাক মাউন্টেইন", "ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্র্যাগন" ইত্যাদি। ছবিগুলো দেখে তার ব্যাপারে আমার একটা প্রত্যাশার মাত্রা তৈরি হয়েছিল। সব পরিচালককে নিয়েই হয়। আমার কাছে সিনেমার এক এবং একমাত্র শিল্পী হলেন পরিচালক। অভিনেতা, ক্যামেরাম্যান, স্ক্রিপ্টরাইটার - এরা হলেন কেবল সেই শিল্পীর আঁকার ভিন্ন ভিন্ন তুলি, এর বেশি কিছু না। অ্যাং লিয়ের ব্যাপারেও একটা নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছিল আমার, কিন্তু আজকে সেই ধারণা ভেঙে গেল। অ্যাং লি তার পূর্বের সব সীমানা ও সীমাবদ্ধতাকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলেছেন। তার এই ছবিটা সম্ভবত তার কর্মজীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হতে যাচ্ছে। টেরেন্স ম্যালিকের যেমন "ট্রি অফ লাইফ", অ্যাং লিয়ের তেমন "লাইফ অফ পাই"...
ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে হলো Piscine Patel বা সংক্ষেপে Pi, অভিনয় করেছেন ইরফান খান। চরিত্রটির নাম নিয়ে অংশটুকু বারবার ইরফানের আরেক ছবি "দ্যা নেইমসেক"-এর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। সেখানে গোগোলের নিজের নাম নিয়ে যে টানাপোড়েন, হীনম্মন্যতা - তার কাছাকাছি হীনম্মন্যতাও পাইয়ের জীবনে ছিল। ছোটবেলা থেকে পাইয়ের মাঝে যে গভীর আত্মজিজ্ঞাসা, ধর্ম ও জীবনকে বোঝার নিষ্কলুষ চেষ্টা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ছোট ছোট জিজ্ঞাসা তার মাঝে - আমরা কে - স্রষ্টা কে - স্রষ্টা কেমন - ধর্ম কী, এগুলো তো আমাদেরও মনে কখনো না কখনো আসে। সেই ছোট্ট কিশোর পাই-এর আকুতি তাই বড়ো চেনা মনে হয়। পাইয়ের মায়ের চরিত্র করেছেন টাবু, এবং বরাবরের মতই অনবদ্য তার অভিনয়। মুম্বাইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আসলে বুঝলো না টাবু কত বড়ো অভিনেতা, বিদেশি পরিচালক আর মিডিয়া বুঝলো। বলিউডে তাকে সারাজীবন অফট্র্যাক আর বাণিজ্য-অসফল কিছু মুভি করতে হলো। (ব্যাপক আফসোসের ইমো)
তবে এদের দুইজনকেও ছাপিয়ে গেছে সুরজ শর্মা। অভিনয়ে অভিষেক হলো তার এই ছবির মাধ্যমে - এবং এক মুহূর্তের জন্যেও মনে হয় নি কোন অভিনয় দেখছি। তার উৎকণ্ঠা, তার মরণের ভয়, তার বেঁচে থাকার প্রবল চেষ্টা- এই সবকিছুর মধ্যে কতটা বাস্তব আর কতটা অভিনয় ফারাক করা মুশকিল।
ছবিটার গল্প তেমন কিছু বলবো না। আপাতদৃষ্টিতে বেশ সাধারণ গল্প (উপরের লিংকে দেখলেই বুঝবেন)। কিন্তু যেটা নিয়ে বলো সেটা হলো ছবিতে রূপকের অভিনবত্ব নিয়ে। ছবিটি দেখার সময় অবশ্যই হাতে দু'ঘণ্টা সময় নিয়ে বসবেন। যারা দেশে দেখবেন, ভালো প্রিন্টের জন্য অপেক্ষা করুন। এই ছবি বাজে প্রিন্টে দেখলে রীতিমত হতাশ ও ক্ষুব্ধ হবেন। মেজাজ খারাপও হতে পারে। কিন্তু ভাল প্রিন্ট দেখে অনুভূতি হবে ঠিক উল্টোটা! সিনেমাটোগ্রাফি আর ফটোগ্রাফি দেখে হতবাক হয়ে গেছি। আমি ঠিক জানি না এর চেয়ে নয়নাভিরাম ছবি আর দেখেছি কী না। পুনরুক্তি হলেও বলি - ট্রি অফ লাইফ-এ মহাজাগতিক সৃষ্টির যে অসহ্য সুন্দর চিত্রায়ন দেখেছিলাম, তার থেকে সুন্দর লেগেছে লাইফ অফ পাই-এর সমুদ্র-সকাল-ঝড়-বিদ্যুচ্চমক! এমন সৌন্দর্য হতবাক করে দেয়, ইন্দ্রিয় দখল করে নেয়। কিন্তু ছবিটায় কি এগুলোই সব? এত ঠাট-ঠমকের বাইরেও চোখে পড়লো জীবন দর্শন নিয়ে টুকরো টুকরো কথা। রূপকগুলো আমি নিজেও সব ধরতে পারি নি, এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে অপারগতা স্বাভাবিক। এজন্য ছবিটা আরো কয়েকবার দেখবো। বইটাও পড়বার ব্যাকুল আগ্রহ হচ্ছে। যে জীবন দোয়েলের, ফড়িংয়ের - তাকে একবার ছুঁয়ে দেখবার সাধ হচ্ছে।
ছবিটা শেষ করার পর অনেকক্ষণ আমার মাথায় কিছু ঢুকছিল না। কী দেখলাম, কেন দেখলাম। এই দু'চোখে যা দেখি, তার সবই কি সত্যি? তার বাইরে কি আর কোন সত্যি নাই? এমন কি হতে পারে না যে একই জীবনের একাধিক রূপ পাশাপাশি সমান্তরালে চলছে! হতে পারে না যে কোন রূপই আসলে সত্যি না, কিংবা সবগুলোই সত্যি। বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পাইয়ের বাবার একটা উক্তিঃ You can believe whatever you want, but believing everything does not mean anything. It only means you don't believe in anything. (স্মৃতি থেকে লিখছি, মূল উদ্ধৃতিটা পেলাম না)
এ'বছর বেশ কিছু ভাল ছবি বের হয়েছে। আমার প্রিয় কিছু ছবিও আছে। তবে এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারি যে লাইফ অফ পাই এই বছরের সেরা ছবি। শুধু তাই না, এটি সম্ভবত এই দশকের সেরা ছবির লিস্টে প্রথম পাঁচে থাকার দাবি করে।
এর বেশি বললে আসলে ছবিটা দেখার মজা নষ্ট করা হবে। তাই এটুকুই থাক...
আর সব কথা বলা হয়ে গেলে নীরবতার কণ্ঠস্বর শুনবেন কীভাবে?

বৃহস্পতিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১২

আমরা যেমন-

প্রথমেই বলি এটিও আগেরটির মতো একটি ফাঁকিবাজি পোস্ট। অর্থাৎ কাজে ফাঁকি দিয়ে লেখা পোস্ট।
পোস্টের শিরোনাম লিখতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভাবলাম। পাঁচমেশালি পোস্ট বলে শিরোনাম ঠিক করা একটু কঠিন মনে হচ্ছিল। শেষমেশ 'আমরা যেমন-' ঠিক করলাম। তার কারণ গত চার মাসে কিছু নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে, যা ঘুরে ফিরে আমাকে নিজের এবং আমার চারপাশের মানুষদের আচরণের ব্যাপারে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করছে। একে একে বলি:
- প্রথম অভিজ্ঞতাটা হয়েছে সময় নিয়ে। এখানে আসার পর এপার্টমেন্ট ভাড়া করতে হবে। একদিন বাড়িওয়ালার সাথে দুই-তিনটা এপার্টমেন্ট দেখে একটা ঠিক করলাম। পরের দিন বিকেল চারটায় লিজ সাইন করার মিটিং। যে এপার্টমেন্ট ঠিক করেছি, সেখানেই। জেট ল্যাগের কারণে পরের দিন বিকেলে চরম ঘুম দিলাম, তবে ঘড়ির এলার্মের কল্যাণে কোনোমতে তৈরি হয়ে হাজির হলাম দশ মিনিট পরে। বাংলাদেশের হিসাবে এটা কোন ব্যাপারই না। কিন্তু এখানে দেখি বাড়িওয়ালা সেই রকম খাপ্পা হয়ে গেছে! লিজ নিয়ে কটমট করে রিশিডিউল করে চলে গেল (কারণ তার আরেক জায়গায় আরেকটা অ্যাপয়ন্টমেন্ট আছে)। সেদিন লিজ সাইন করা হলো না। করলাম পরের দিন। যা বুঝলাম, এখানে সময়ের হিসাবটা একেবারে GMT-6 হিসেবে। সবার ঘড়ি এক জায়গায়, দুয়েক মিনিটও কেউ এদিক-ওদিক করতে চায় না।

কথায় বলে বুদ্ধিমানরা দেখে শেখে, আর বোকারা ঠেকে শেখে। আমি যেহেতু বোকামানুষ, তাই ঠেকেই শিখলাম। এই জিনিসটা আমাদের দেশে মিসিং।
- আমার শিক্ষক এবং সহকর্মীভাগ্য বরাবরই ভাল। দেশেও দারুণ কিছু মানুষের সাথে কাজ করতাম, যদিও শেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (অর্থাৎ বুয়েটের) শিক্ষকদের বেশিরভাগকেই আমার পছন্দ হতো না। এখানে এসে আমার এডভাইজার (অর্থাৎ বস) আর তার পোস্ট-ডক (অর্থাৎ সেমি-বস) দুইজনের সাথে পরিচয় হলো। সামনা-সামনি এই প্রথম কথা হচ্ছে, তাই যা বলার তারাই বেশি বললেন। এখানে কাগজে কলমে ছাত্রদের কাজ করার কথা সপ্তাহে বিশ ঘণ্টা। কিন্তু কাগজের হিসাব কি আর বাস্তবে মেলে? এই লেভেলে ছাত্র বা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট মানেই সারা সপ্তাহ ল্যাবেই পড়ে থাকতে হবে। ক্লাস থাকলে আলাদা কথা, কিন্তু ক্লাস নাই অথচ তুমি ল্যাবে নাই - এরকম দেখলে খবরাছে! এটা মোটামুটি ভালই বুঝিয়ে দিলেন তারা। অভিযোগেরও কিছু দেখি না, কারণ প্রফেসর নিজেই সপ্তাহে ষাট ঘণ্টা কাজ করেন। (আজকে তার অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছে গেছি মিটিং শিডিউল করতে, কিছু কাগজ সাইন করাতে হবে। কোনোমতে দশ দিন পরে তিরিশ মিনিট সময় পাওয়া গেল!) সুতরাং আমি কোন তুচ্ছপ্রাণ, কাজ না করে কই যামু? যা বুঝলাম, এখানে গাধার খাটুনি দিতে হবে, তবে গাধার মগজ ব্যবহার না করে মানুষের মগজ ব্যবহার করতে হবে। শুধু গাধার মত খেটে গেলে মাইনক্যা চিপায় পড়া সময়ের ব্যাপার।

আরেকটা ভুল ধারণা আছে দেশের মানুষের মনে, যে পশ্চিমের মানুষ সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ করে আর দুইদিন খুব আরাম করে। Not necessarily, sire! এখানে কাজটাই বড়ো কথা। কাজ শেষ না হলে কিসের উইকেন্ড? উইকেন্ডের মজা গজা বানিয়ে খাইয়ে দেবে। বড় কম্পানিগুলো যেমন 'প্রফিট'-ভিত্তিক, এখানে এমন বড়সড় রিসার্চের জায়গাগুলো হলো ডেডলাইন-ভিত্তিক। সামনে ডেডলাইন? নাওয়া-খাওয়া কয়েক সপ্তাহের জন্য ভুলে যেতে পারেন!
- সহকর্মী ছেলেটাকে নিয়ে বলি। খুবই ভাল একটা পোলা। দেখতে অনেকটা দ্যা বিগ ব্যাং থিওরির শেলডনের মত, শুকনা-পাতলা। আমার চেয়ে বয়সে একটু ছোট, কিন্তু পড়াশোনার বহর দেখে আমি রীতিমত টাশকি খেয়েছি। বিজ্ঞানের হেন বিষয় নেই যে বিষয়ে তার আগ্রহ নেই। থোরিয়াম-রিয়্যাকটর থেকে শুরু করে প্লাজমিওন, জিন-বেইজড চিপ থেকে শুরু করে প্রোগ্রামিং সব দিকে সমান আগ্রহ। প্রচুর পড়ে, সারাদিন ল্যাবে থাকে, প্রায় আশিভাগ সময়ই সে কাজ করছে। সবচেয়ে ভাল যে দিকটা তার, সেটা হলো খুবই বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাভাবনা। দেশে এমন কিছু ছেলেপুলের সাথে আমি যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতাম, যারা তাদের চারপাশটাকে নাম-কা-ওয়াস্তে না নিয়ে ক্রমাগত নিরিখ করে দেখতে চায়। এই লাইনের চিন্তাভাবনা খুব উপকারী। তুমি যেমন মানুষই হও না কেন, তোমার মধ্যে এই গুণ চর্চা করে তৈরি করতে হবে। এই গুণ থাকলে প্রশ্ন করার অভ্যাস হবে। প্রশ্ন করার অভ্যাস হলে যাবতীয় ভুল ধারণা ও ভুল প্রথার অন্তঃসারশূন্যতা ধরা পড়বে। আর তখনই কেবল সেগুলো থেকে উত্তরণের রাস্তা বের হতে পারে। এই গুণ থাকলে প্রেজুডিস সহজে তৈরি হতে পারে না। এই ছেলেটার মধ্যেও প্রেজুডিস একেবারেই নেই! বাংলাদেশ নিয়ে তার প্রবল আগ্রহ। আমাকে প্রায়ই প্রচুর বকবক করতে হয় বাংলাদেশ নিয়ে, আমার ভালই লাগে। এই ধরনের মানুষ আমাদের দেশে খুব কম। সবাই যার যার গণ্ডিতে নিজের ধ্যান-ধারণা নিয়েই বসে থাকি। আর আমরা এমন একটা বয়সে পৌঁছে গেছি যে আর বদলানো সম্ভবও না। তবে নতুন প্রজন্মের পক্ষে সম্ভব চর্চা করে এই গুণগুলো আয়ত্তে আনা। (প্রচুর বাকোয়াজ লেকচার কপচে ফেললাম। ক্ষমার্হ...)
- ছোটবেলায় একটা বিরক্তিকর প্রশ্ন ছিল - 'কাকে বেশি ভালোবাসো - আম্মু না আব্বু?'। এখানে আসার পর থেকে এরকম একটা বিরক্তিকর প্রশ্ন আবিষ্কার করেছি - 'পড়াশোনা শেষ করে প্ল্যান কী? দেশে যাবে না এখানেই থাকবে?'। প্রথম দিকে জবাব দিতাম, "চলে যাবো"। কেন যাবো তার কারণ বর্ণনা করার আগেই প্রশ্নকর্তা(রা) বলেন, "এখন এই কথা বলছো, কিন্তু কয়েক বছর গেলে আর বলবে না। ফিরে যাবার সময় হলে দেখবে আর যেতে ইচ্ছে করছে না"। তারা হয়তো অভিজ্ঞতা থেকেই এমন বলে, তাই আমি তর্ক করি না। মেনে নেই। তবে গোপন কথা হচ্ছে, তাদের সবার এই জবাবগুলো শুনে শুনে আমার জিদ চেপে যাচ্ছে। বেশ ছেলেমানুষি-ভরা একরোখা জিদ। কে জানে, হয়তো তাদের ভুল প্রমাণ করতেই তল্পি-তল্পা গুটিয়ে দেশে ফিরে যাবো! 

বুধবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১২

ভিন্‌

হেনরি নামের যে বুড়ো লোকটা আমাদের শাটলের ড্রাইভার, তাকে আমার বেশ লাগে। মিশুক গল্পবাজ। একদিন সকালের প্রথম ট্রিপে উঠেছি, ঘুম ঘুম লাগছে আর ভাবছি ল্যাবে ঢুকেই কফি খেতে হবে। হেনরি কী মনে করে কৌতুক বলা শুরু করলো।
দুই ভাই, জন আর স্টিভ। দুইজনেই মহা চামার। প্রচুর পয়সা বানিয়েছে মানুষ ঠকিয়ে। একই শহরে বাস করে তারা, এবং তাদের খারাপ স্বভাবের কারণে শহরের কেউই তাদের দুই চোখে দেখতে পারে না। একদিন স্টিভ মারা গেল। সৎকার অনুষ্ঠানের আগে আগে জন পাদ্রিকে বললো, "দেখেন, আমি জানি আমার ভাইয়ের ওপর আপনি আর শহরের বাকিরা ক্ষেপে আছেন। কিন্তু আমি চাই তার এই অনুষ্ঠানটা ভালোমত হোক। আপনি যদি আপনার বক্তব্যের মাঝে (যাকে ইংরেজিতে বলে ইউলজি) ওর প্রশংসা করেন, তাহলে আপনাকে এক লাখ ডলার দেব।" পাদ্রি পড়লেন মহা ফ্যাসাদে। একদিকে এতোগুলো টাকার লোভ, আরেকদিকে চার্চের ভেতরে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলতেও মন সায় দিচ্ছে না, তাও আবার পুরো শহরবাসীর সামনে!
যাই হোক, পরদিন অনুষ্ঠানের সময় ইউলজি পাঠ করতে উঠলেন পাদ্রি সাহেব। বলতে শুরু করলেন, "এই স্টিভের মত খারাপ মানুষ হয় না। সে এই শহরের প্রায় সবাইকেই ঠকিয়েছে, মিথ্যা বলতো হরদম, মানুষের সম্পত্তি জবরদখল করেছে। তার পাপকর্মের ইয়ত্তা নাই!...
...
...
...
... কিন্তু তার ভাই জনের অপকর্মের তুলনায় স্টিভ একেবারে ফেরেশতা!"
হেনরি লোকটা সাদাসিধা, হাসিখুশি মানুষ। প্রতিদিন ল্যাবের কাজ শেষে বাসায় ফেরার সময় দশ-পনের মিনিট তার সাথে কথা বলি, সময়টা উপভোগ করি। দেশের কথা তখন আর মনে পড়ে না। বাসায় ফিরে ফেসবুক খুলে দেখি মানুষের ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্না। কখনো ফিলিস্তিন আর কখনো আশুলিয়া। হাসি পায় এমন ছেলেমানুষি দেখে। এগুলো করে কী হবে? কিস্যু না। কান্নাকাটি, চিল্লাচিল্লির কোন দাম নাই। সবই ফাঁপা শব্দমালা।

বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১২

অবিশ্বাস্য

দেখি বিস্তীর্ণ রোদ। সামনেই ঢেউ খেলিয়ে ছলনার ঢঙে চলে গেল,
তাই রোদের দিকে তাকিয়ে অকারণ কারণে দীর্ঘশ্বাস ফেলা হলো না
দীর্ঘশ্বাসের দীর্ঘ মুহূর্তের জন্য আরো ধীরবহ রৌদ্র-নদ প্রয়োজন
ওকে বুকে নিয়ে রোদের অপেক্ষা করছি,
শুনলাম অনেকটা গুজবের মত অবিশ্বাস্য চড়ুইয়ের ডাক!
এই ভূঁইফোঁড় দেশে চড়ুই
কোত্থেকে এলো! পথ ভুলে আমার মতই, হয়তো;
নিজেকে অমন প্রবোধ দিই। কিন্তু মনে মনে
ঠিক জানি, এই চড়ুই আমার মত নয়,
আমার আগমন পথ-বিভ্রান্ত নয়
ক্রমশ ছলনা খেলি নিজের সাথেই
ওই দ্রুতগামী অস্থির রোদটুকুর মত
হয়তো আমাকেও শুনছে কেউ -
আমি যেমন এইমাত্র শুনছিলাম চড়ুইয়ের স্বর,
তেমনি আমাকেও শুনতে পেয়ে অবিশ্বাস্য ভেবে
অবাক হচ্ছে কেউ, বিস্ময়ে নিজেকে ভাবছে
এসব তুচ্ছ ঘটনা - তুচ্ছ রটনা - অস্থিরতার দিনলিপির পাতায় কালো কালো অক্ষর হচ্ছে

রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১২

যাকে আমি ভাল পাই না তাকে আমার সিটিএনঃ একটি রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারী ভাবনা

আদি আরম্ভ ছিল মা, জননী, জনয়িত্রী, প্রসূতি। নাড়ির বন্ধন পেঁচিয়ে কোঁকড়ানো চামড়ার সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিল। আরম্ভের সেই মুহূর্তটিতে আসলে অস্তিত্বের স্বকীয়তা সৃষ্টি হয়। জ্ঞানতঃ ওটাই ব্যক্তির প্রথম পরিচয়। পরিচয়ের আদিবিন্দু। ওই বিন্দুর চলার পথকে রেখা বলা হবে, সেই রেখাটি তার ব্যক্তি পরিচয়ের রূপরেখা নির্মাণ করে। ব্যক্তি তার লিঙ্গনির্বিশেষে এই বিন্দুটিকে চেনার চেষ্টা করে নিজের অজান্তেই! যে কোন ব্যক্তির অস্তিত্বের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো জন্মমুহূর্তের কোনো স্মৃতি তার কাছে নেই। এখানে বলে রাখি যে স্মৃতি কিন্তু হুবহু তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে না। যে কোন ঘটনার একটি বড় অংশ আমাদের স্মৃতিতে থাকে না। আমাদের মস্তিষ্কের অভিনব সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার কারণে হারিয়ে যাওয়া অংশটিকে সে জুড়ে নিতে থাকে আশেপাশের তথ্য থেকে। এজন্য আমাদের সকল স্মৃতির একটি অংশ বানানো, সরাসরি ঘটনাটি নয়। যাক, সে অন্য আলাপ। যা বলছিলাম, ব্যক্তির মস্তিষ্কে তার জন্মমুহূর্তের তথ্য জমা করা নেই। থাকলেও সচেতন মস্তিষ্ক সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। তাই সে ধরে নেয় একটি কল্পনার মুহূর্ত ঘটেছিল তার জন্মের সময়। এই শেকড়ের স্মৃতিটি নেই বলেই তার বিপন্নতা। অস্থিরভাবে সে খুঁজে বেড়াতে থাকে কোথায় শুরু, কোথায় আরম্ভ। এই খোঁজের বিপন্নতা থেকে নানাবিধ অবলম্বন দরকার হয় ব্যক্তির।
আচ্ছা, চলুন তো, এই ব্যক্তিকে ভুলে আমরা একটু নৈর্ব্যক্তিক দিকে যাই। বেশ কয়েকবছর আগে, আমি বান্দরবানের বগা লেক থেকে হেঁটে রুমা বাজার চলে এসেছিলাম বন্ধুদের সাথে। প্রায় ছয় ঘণ্টার পাহাড়ি পথ পিঠে একটি ব্যাকপ্যাক নিয়ে হাঁটতে হয়েছিল। প্রথমে আমরা বগা লেকের পাহাড় থেকে সরু পথ ধরে নেমে এসেছিলাম। আগের রাতে শিশির পড়ে পথটি বেশ পিচ্ছিল হয়ে ছিল মনে আছে, ট্যুর গাইড পাহাড়ি লোকটি বেশ অবলীলায় নেমে যাচ্ছে দেখেও আমরা নামতে পারছিলাম না অনভ্যস্ততায়। সেই পথ থেকে নেমে এসে আমরা প্রায় দুই ঘণ্টা একটি ঝরণার পথ পাড়ি দিয়েছিলাম। ঝরণাটি আসন্ন শীতের কারণে শীর্ণদেহ, ঝিরঝিরি পানি বয়ে চলেছে। চারপাশে বৃহদাকার ধূসর পাথর থম ধরে আছে। পাথরগুলো খুলে খুলে এসেছে দুই পাশের পাহাড় থেকে। পাহাড়ের গায়ে গুল্মের চাদর বিস্তীর্ণ সবুজ হয়ে আছে। পকেটের মোবাইল ফোনটি বের করে দেখলাম কোন নেটওয়ার্ক নেই সেখানে। দুয়েকটা পাখির পাখনার ঝাপ্টানো শোনা যায় কি যায় না। জনবিহীন সেই ঝিরিপথে হেঁটে যেতে যেতে সহসাই আমার মনে হল এই বিপুল প্রকৃতির মাঝে আমি অসহায় ও একাকী হতে পারতাম। এখানে আমি আদিম ও নিরক্ত হতে পারি। এই প্রকৃতি শত শত বছর ধরে এমনই আছে। ঋতুর বদলে তার চেহারা বদলায় বটে, কিন্তু সেটাও পর্যায়বৃত্তিক। আমি ক্ষুদ্র একটা প্রাণী, এখানে এসেছি, এবং আবার চলেও যাচ্ছি। আমার পদচ্ছাপও এখানে থাকবে না। এই প্রকৃতির ত্বক স্পর্শ করে চলে যাওয়া অসংখ্য মনুষ্য প্রাণীর কারো কথাই সে মনে রাখবে না। আমরা তার কাছে সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক। যদি এটাই সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে এই প্রকৃতির স্থায়িত্বের ব্যাপারটিই ধ্রুব, আমাদের চলমানতা আসলে জরুরি না। অসীম ঘটনার অসীম সমুদ্রে একজন ব্যক্তির জীবনের সকল ঘটনা খুব ছোট্ট একটি চলক। তাই এর প্রভাব মূল সমীকরণে উপেক্ষণীয়।
আমরা যে বিষয় ও ঘটনাগুলো আমাদের চারপাশে ঘটতে দেখে সেগুলোর মূল্য ও গুরুত্ব পরিমাপ করি, সেগুলোকে জরুরি বা ফালতু দুইটি প্রান্ত ধরে নানাভাবে মাপি, সেগুলো আসলে লম্বা সময়ের বিচারে কোন আঁচড়ই ফেলতে পারে না। তাহলে এই মুহূর্তেই একটি প্রবোধ দিন নিজেকে। আপনার কাছে জরুরি একটি ঘটনা আসলে জরুরি না। কিছু যায় আসে না সেটাকে নিয়ে মাথা না ঘামালে। ফেলে দিতে পারেন, জাস্ট ফর কিউরিসিটিস সেইক, ফালতু মনে করে ফেলে দিয়ে দেখুন আদৌ কোনো পরিবর্তন হয় কি?
ফুটনোটঃ এই লেখাটি যে মুহূর্তে লিখছি, সে মুহূর্তে প্রায় চৌদ্দ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে একটি মহাসাগর ও দুটি মহাদেশ পাড়ি দিয়ে যদি বাংলাদেশে তাকানো যেতো, তাহলে দেখতে পেতাম কিছু তুচ্ছ ইসলামী দল সেখানে হরতাল করছে। ইস্যুঃ (তাদের দাবিতে) ইসলামের মহানবী মুহাম্মদের চরিত্র হনন করা হয়েছে। তাই জ্বালাও পোড়াও। আবার এটাও শুনেছি যে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদার সফর উপলক্ষে তিনটি জেলায় হরতাল হবে না। সুতরাং, (তারা ছাড়া বাকি সবাই যা বুঝছে) এটি মূলত নাশকতামূলক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠান সরকারি শক্তিগুলো (পুলিশ, র‍্যাব) দমন করছে না, কারণ তাহলে ওই বাকি সবার বুঝটা উল্টে যাবে।
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুনার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
(অদ্ভুত আঁধার এক / জীবনানন্দ দাশ)

শনিবার, ৭ জুলাই, ২০১২

মোনাম্যো'

ভালোবাসায় জোর জবরদস্তি চলে না, এ এমনই এক সর্বগ্রাসী অদ্ভুত অনল
যা হাজার চেষ্টায়ও জ্বলে না, আবার একবার জ্বলে উঠলে ঝড়ঝাপ্টাতেও নেভে না।

Ishq par zor nahin, hai yeh woh aatish Ghalib
Jo lagaye na lage, aur bujhaye na bane

[Love can't be tamed, it's like a fire that overpowers everything else
At times, it doesn't start even after repeated tries; but once started, it's impossible to extinguish.]

পলিমাটির ওপর যে সবুজ ঘাস জন্মেই বেড়ে ওঠে দুরন্ত বাতাসে,
সেই ঘাসের মনের কথা শুনলে হয়ত দেখতে পেতাম এক উড্ডীন শখ তার মনে।
সে ভেবেছে সে একদিন এই পলিমাটি ছেড়ে উড়ে যাবে,
শেকড়ের মায়া তার কাছে বন্ধন, এই অর্গল ভেঙে যাবে
বাতাসের মৃদু হাসি তার শীর্ষ ছুঁয়ে যায়, আলোর রশ্মি তার ত্বকে মোলায়েম পরশ বুলায়
সে অপেক্ষা করে...

পলিমাটির মনের কথা জানতে পেলে দেখবো, অণু অণু মৃত্তিকা কণায় বেঁধেছে সে চিরহরিৎ জাল
তার গোপন প্রেম এই তরুণ ঘাসের সাথে, সে কোন কথা বলে না, শরমে মরমে মরে
তার নিঃশব্দ হাসিই বলে দেয়, প্রেমে পড়েছে সে, তাই নিঃশব্দেই জাল বোনে সে ঘাসের শেকড়ে
কালো নিকষ শেকড়টুকু ঘাস লুকিয়ে রেখেছিল পলিমাটির বুকে, সেই কালোকেই বুকে টেনে নেয় মাটি - বিনা আপত্তি

I hope you don't mind that I put down in words
How wonderful life is while you're in the world

কালো পলিমাটি অবাক হয়ে দুরন্ত ঘাসের সৌন্দর্য দেখে - উজ্জ্বল কান্তি যার, বিশীর্ণ হরিদাভা! ঈষৎ বাতাসে দুলছে সে! কী অপার্থিব কোমল তার শরীর! পলিমাটির বিস্ময় ঘোচে না। সে অপলক তাকিয়ে থাকে...

রাত নামে চরাচরে-

এই চন্দ্র-কাতর রাতের সৌন্দর্য দেখ, তোমার আরক্তিম কুন্তলের 'পরে সে যেন ঝিকিমিকি-মুকুট
তোমার লাল রঙ মেখে সে লজ্জাবনত মিশে যাচ্ছে তোমার আটপৌরে পোশাকের প্রান্তে
তোমার জীবন-ক্লান্ত চোখের কোণে শুভ্রাভা মিশিয়ে দিচ্ছে সে
পথবালিকা, রাজরাণী, আমার অভিবাদন নাও, ভগ্নহৃদয়ের কান্না নাও

La lune trop bleme pose un diademe sur tes cheveux roux
La lune trop rousse de gloire eclabousse ton jupon plein d'trous
La lune trop pale caresse l'opale de tes yeux blases
Princesse de la rue soit la bienvenue dans mon coeur brise

[The moon, all too fair, in your russet-red hair sets a sparkling crown
The moon, all too red with glory, is spread on your poor, tattered gown
The moon, all too white, caresses the light in your world-weary eyes
Princess of the street, do allow me to greet you, my broken heart cries]

তুমি চিরঞ্জীবী-সুধা, তুমিই সৌরভ প্রাণময়
নিশ্চুপ ফিসফাসে আমায় স্পর্শ কর, চাহনিতে ছুঁয়ে যাও
জাগরণে-অজাগরণে তোমায় প্রণমি

Chhooti hai mujhe sargoshi se, aankhon mein ghuli khamoshi se
Main farsh pe sajde karta hoon, kuchh hosh mein kuchh behoshi se

[You are like the fragrance of life itself,
You're the desire that touches me with a whisper and with the silence in your eyes
I bow to you, only partly conscious of myself]

পলিমাটি আর ঘাসের এই গল্পটা অসমাপ্ত থাকুক। কিছু কিছু গল্প চিরন্তন। অনন্তকালব্যাপী সেই গল্পগুলোর অনুরণন হতে থাকে। ক্ষুদ্র আমি সেই গল্পের কতটুকুই বা জানি, আর কতটুকুই বা বলতে পারি?...



*****
[মোনাম্যো' - Mon Amour - My Love]
[কৃতজ্ঞ‌তাঃ জাঁ রেনোয়াঁ, গুলজার, মির্জা গালিব, বাজ ল্যুরম্যান]

বৃহস্পতিবার, ২১ জুন, ২০১২

মানবচরিত বিষয়ক পরীক্ষা

বেশ অনেকদিন হলো একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। অনার্স লেভেলের পড়াশোনা শেষ করে পড়াতে ঢুকেছিলাম, তারপর থেকে এই কাজটাই ভাল লাগে। অনেকের কাছে শিক্ষকতা একটা "বোরিং জব", অনেকের কাছে এটা কেবলই একটা চাকরি, কোচিং করিয়ে টাকা উপার্জন ছাড়া মোটা দাগে এর থেকে পাওয়ার কিছু নেই। সত্যি বলতে কি, এই চাকরিটাকে শুরুতে আমিও এরকমই ভেবেছিলাম। আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে পড়াতে ভাল লাগতো। সেই ছোটবেলা থেকে (এসএসসি পাশের পর থেকে) ছাত্র পড়াচ্ছি। নিজে একটা কিছু মোটামুটি বুঝতে পারছি এবং সেটা আরেকজনকে শেখাতে আমার মজা লাগে। মনে হয় ইলেকট্রন ট্রান্সফার হচ্ছে (খুবই হাস্যকর চিন্তা) দুইজন মানুষের মাঝে! কিন্তু আমি পেশা হিসেবে এটা নিয়ে ভাবি নি। চাকরিতে ঢোকার পরে দুই তিন টার্ম (প্রায় পাঁচ ছয় মাস) তাই এক ধরণের 'চাকুরে' মানসিকতা নিয়ে কাজ করেছি। তারপর হলো কি, বেশিদিন একটা জায়গায় থাকলে কেমন মায়া জন্মে যায়, আমারও তেমনি মায়া জন্মে গেল। একটা সময় পরে দেখলাম আমি এই পড়ানোর কাজটাকে এনজয় করছি।

আমাদের সমাজে শিক্ষকদের কোন স্ট্যাটাস নাই। মুখে মুখে প্রচুর ভাল ভাল কথা বলা হয়, কিন্তু মনে মনে এক টাকার সম্মান দেয়া হয়। শিক্ষকরাই এজন্য দায়ী। আজকের ছাত্রকে গড়ে পিটে মানুষ করার দায়িত্বটা তারা পালন করেন না, যার ফলে বড়ো হয়ে সেই মানুষটা সম্মান দেয়া শেখে না। একইভাবে শিক্ষকদের নিজেদের মনুষ্যত্ব ও বিবেকবোধ নিয়েও আমার সন্দেহ আছে। প্রচুর নিম্ন-মাঝারি মানুষ টিচার হয় যাদের একাডেমিক রেকর্ড হয়তো ঈর্ষণীয় কিন্তু টিচার হিসেবে তারা জঘন্য। নীতি-নৈতিকতার বিবেচনায় তারা হয়তো আড়তদার হবার যোগ্য (নো অফেন্স টু সাকসেসফুল আড়তদারস)। কথাটা এলিট শোনাচ্ছে, শ্রেণীচেতনা ইত্যাদি বিবেচনায় আপত্তিকরও মনে হচ্ছে। তবে আমি মনে করি ভুল শিক্ষকের চেয়ে বিপদজনক আর কিছু নাই। প্রতিটা ভয়ানক নীতিহীন মানুষ বেড়ে ওঠার পেছনে খোঁজা হলে কোনো না কোন শিক্ষককে পাওয়া যাবে (অথবা কোন শিক্ষককেই পাওয়া যাবে না)! কোন দিক দিয়ে দেশ ও দশের চৌদ্দটা তারা বাজান, সেটা শনাক্ত করাও দুঃসাধ্য, কারণ তাদের এই প্রভাব পরোক্ষ।

সে যাকগে, আমি মোটামুটি একটা ধারণে পেয়ে গেছি এই সোসাইটির। এখানে যেমন হাসিখুশি প্যাঁচহীন মানুষ আছেন, তেমনি ঘোরালো-মনের ধান্দাবাজেরও অভাব নেই। গলার জোরে বা প্রভাব খাটিয়ে তারাই বেশি আওয়াজ করেন। পাশাপাশি ছাত্রচরিত নিয়েও খুব মজার অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি যেখানে পড়াই, সেখানে মূলত মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষজন ছেলেপুলেকে পড়াতে পাঠান। খুব বেশি ঠাট-বাট নেই, টিউশন ফি-ও তুলনামূলকভাবে কম। আমাদের সমাজে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে শস্তা জিনিস আসলে ফালতু জিনিস। আমরা ভাবি বেশি দাম দিয়ে কিনলেই "খুব জিতলাম"। সেই ধারাতেই আমরা ভাবি, "অনেক কাড়ি কাড়ি টাকা দিয়ে তিন-চার বছর পড়ে যে ডিগ্রিটা পেলুম, সেটা বেশ দামি"। কিন্তু প্রাইভেট ভার্সিটিগুলোর কর্তাব্যক্তিরা ছাত্রদের মতো ভাবেন না মোটেও। মুখে প্রচুর বারফাট্টাই করা লোকজন আসলে ভিতরে ব্যবসায়ী। ব্যবসার শর্তটা হলো আয় বাড়াও। দাম বাড়াও। ছাত্ররা সব হলো নধর প্রোডাক্ট। আর তারা ছাত্রও পান ভাল। পাবলিক ভার্সিটির সেশনজটে পড়ে আমাদের মতো আবলুস কাঠ কেউ আর হতে চায় না। যাদের সামর্থ আছে, তারা পয়সা খরচ করে টেনেটুনে হলেও প্রাইভেটেই পড়ে। সেইসাথে আছে ভার্সিটিগুলোর নানাবিধ চমৎকার বিজ্ঞাপন ও প্রজ্ঞাপন। এদিক দিয়ে যারা নিজেদের একটা ইমেজ দাঁড় করাতে পারে নি বা চায় নি, তারা স্বভাবতই কম ছাত্র পায়, তুলনামূলক খারাপ ছাত্র পায়।

আমার ভার্সিটিটাও ছোটখাট। ছাত্রগুলো মেরিটের দিক থেকে একেবারেই মাঝারি। মর্নিং শিফটের ছাত্রদের মধ্যে মাঝে মাঝে খুব বুদ্ধিদীপ্ত ছাত্র পাই। প্রচুর পড়তে পারে এবং মেধার দিক থেকে তুখোড় ছাত্র। এদের জন্য সে'সব কোর্সে খাটুনি বেড়ে যায় (হেহেহে)। কিন্তু গড়পড়তা ছাত্ররা মোটামুটি একই মানের, এবং তাদের প্রায় সবাই-ই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কল্যাণে একেকজন মুখস্তবিদ। আমি যে সময় চাকরিতে ঢুকেছি, তখন দেখলাম পরীক্ষাগুলোতে বেশ নকল হচ্ছে। একটা কারণ যে প্রশ্নগুলো প্রথাগত। ক্লাশে যা পড়ানো হচ্ছে বা বইয়ে যা আছে, সেগুলোই যদি পরীক্ষায় আসে, তাহলে নকলের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাছাড়াও শিক্ষকরাও বেশ উদাসীন ছিলেন বা ছাত্ররা বেপরোয়া ছিল হয়তো (কারণ কোন ব্যবস্থা নেয়া হতো না)। আমাদের সিনিয়র দুই-তিনজন ভাইয়াও লেকচারার হিসেবে ছিলেন। সবাই মিলে নকল-উৎপাটনের প্রজেক্ট (!) হাতে নিলাম। পরীক্ষাক্ষেত্র কুরুক্ষেত্র হয়ে গেল। প্রতি পরীক্ষায় সাত-আটটা নকল ধরা পড়তে শুরু করলো। আমরা সেগুলো থ্রু করে দিলাম কর্তাব্যক্তিদের কাছে। ফলাফলে দুয়েকজন ছাত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো। এর পরেই একটু একটু করে নকল করার চল একেবারেই কমে এলো। পরীক্ষার হল আবার শান্ত। নতুন যারা লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছিল, তারাও মোটামুটি সেই মান বজায় রাখলো। আমার এখনও মনে হয় এই কাজটা আমি খুব মনোযোগ দিয়ে করেছিলাম। ক্লাশে যতোটা ভাল বা বন্ধুভাবাপন্ন হবার চেষ্টা করেছি, পরীক্ষার সময় ঠিক ততোটাই কঠোর। তারপরেও বেশ কিছুদিন চলে গেছে, প্রায় বছর দুয়েক হলো এমন চণ্ডমূর্তি ধরতে হয় না।

সেদিন একটু ভিন্ন কিছু করতে গিয়ে অভিনব অনুভব হলো। বেশ তাড়াহুড়া ছিল। আমার একটা কোর্সের ছোট্ট একটা কুইজ নিতে হবে। সন্ধ্যার এই কোর্সটায় ছাত্রসংখ্যা ৪২, বেশ ভরভরন্ত অবস্থা। তাই পরীক্ষা নেয়ার আগে চেয়ারগুলো দূরে দূরে সাজানো লাগে। কিন্তু তাড়াহুড়ায় আমি বলতে ভুলে গিয়েছি, ক্লাশে গিয়ে দেখি সবাই বেশ ঘন হয়ে পাশাপাশি বসে আছে। এদিকে আমি প্রশ্ন এনেছি একটাই সেট, সবার একই প্রশ্নের পরীক্ষা। কী করি? প্রশ্ন দেয়ার আগে একটু বুদ্ধি করলাম। বললাম, "আজকে সবাই এভাবেই কাছাকাছি বসে পরীক্ষা দিবেন, তবে যদি কেউ পাশের জনের খাতার দিকে তাকান, তাহলে সবার নম্বর শূন্য হয়ে যাবে"। বলার সাথে সাথেই সমস্বরে সবার প্রতিবাদ, "না স্যার!", এটাই আশা করছিলাম। আমি তবু আমার সিদ্ধান্তেই অটল। মাঝ থেকে এক ছাত্র বললো, "স্যার, যে আজকে ভাল পড়ে আসে নি, সে তো ইচ্ছা করে দেখে সবাইকে শূন্য পাইয়ে দেবে"। একটু ভেবে বললাম, "বেশ, যার কারণে আপনারা বাকিরা শূন্য পাবেন, তার নামটা বলে দেব"। ম্যাজিকের মতো কাজ হলো। যে অপরের খাতা দেখবে, তার কপালে গণ-মাইর নিশ্চিত! আমিও একটু কৌতূহল নিয়েই পরীক্ষাটা শুরু করলাম।

এখানে বলে রাখি, ওপেন-ক্রেডিট সিস্টেমের কারণে সব কোর্সেই অনেক ব্যাচের ছাত্র থাকে। সবাই সবার ক্লাসমেট না, বন্ধুও না, অনেকে পরিচিতও না। সুতরাং অপরের ওপর ভরসা ও অপরের সততার ওপর ভরসার একটা অভাব এদের মাঝে থাকতে পারে। আমি আরো ভাবছিলাম যে যদি সত্যিই সবাইকে একজনের কারণে শূন্য দিয়ে দেই, এবং তারপর যদি সে কোনোভাবে মার খেয়ে যায়, তাহলে তো সেটা ঠিক হবে না। শিক্ষক হিসেবে এই দিকটাও বিবেচনা করতে হবে। আবার এটাও ঠিক যে একবার যেহেতু বলে ফেলেছি, ক্রেডিবিলিটির প্রশ্ন উঠে যাবে যদি ফলো-আপ না হয়। এসব ভাবনার পাশাপাশি খুব কৌতূহলবোধ করছিলাম যে আসলেই কি এই ডানে-বামে-তাকানোর যুগে এই পরীক্ষাটা সফল হবে কি না।

এসব ভাবতে ভাবতেই দশ মিনিটের পরীক্ষা শেষ। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম, কেউ ঘাড় ঘোরালো না, পাশের জনের খাতার দিকে তাকালো না, এমন কি নিজের খাতা থেকে মাথাই তুললো না। পরীক্ষা শেষ করে অনেকে সময়ের আগে খাতাও দিয়ে দিল! একদম শেষ মুহূর্তে খাতা নেয়ার সময় দুইজনকে দেখলাম পাশের জনের খাতা দেখার চেষ্টা করছে (এটা মনে হয় একটা প্যানিক রিফ্লেক্স!)। মনটা ভরে গেল। পরীক্ষা নিয়ে ছাত্রদের ধন্যবাদ দিলাম, এতোটা আমি আশা করি নি। ওদের বললাম, "আপনারা আজকে যেভাবে পরীক্ষা দিলেন, সেটা আজকালকার যুগে প্রায় অসম্ভবের জায়গায় চলে গেছে। এই তুচ্ছ কুইজের উত্তরে আসলে কারোই তেমন কিছু আসবে যাবে না হয়তো। বেস্ট ফোর আউট অফ ফাইভ গোনা হবে, হয়তো এই কুইজের নম্বরটা গোনাই হবে না। কিন্তু এই পরীক্ষাটা আপনাদের মোরালিটির ব্যাপারে অনেক বড়ো একটা সিদ্ধান্ত দিল। সেটা হচ্ছে- আপনারা ছাত্র যে যেমনই হন না কেন, চাইলেই আপনারা কারো অনৈতিক সাহায্য ছাড়া পরীক্ষা দিতে পারেন। সদিচ্ছা থাকলে আমার এখানে এতোকিছু বলতেও হতো না। তার মানে আপনাদের মধ্যেই ভালোত্বের শক্তি বিরাজ করছে। অথচ পরের ক্লাসের পরীক্ষাতেই আপনারা ঠিক আগের মতো হয়ে যাবেন। আফসোস এটাই যে আপনারা অবলীলায় যে মোরাল ফাইবার ধরে রাখতে পারেন, সেটাকে উপেক্ষা করেন!"

দেখাদেখি করা ওই দুইজনের জন্য বাকিদের শূন্য পাওয়ার কথা ছিল (আমার কথা মতো)। ভেবে দেখলাম, আমাদের সামাজিক জীবনে এই ঘটনাটা অহরহ ঘটছে। আমরা সবসময় কয়েকজন কালপ্রিটের জন্য ভুগে চলেছি। আমাদের একটা চোর ইঞ্জিনিয়ারের কারণে সেতু ভেঙে এই সেদিনই কতোজন মারা গেল! কয়েকজন মহান নেতার কারণে দেশটা আখের ছোবড়া হয়ে গেছে। এমনই উদাহরণ ভুরি ভুরি দেয়া যাবে। অথচ সেই কালপ্রিটদের কিছু হয় না। ক্ষতি হয় বাকিদের। তাই ঠিক করলাম, সবাইকে যার যার প্রাপ্য নম্বরই দেব। তবে ওই দুইজনকে কৃতকর্মের ফল পেতে হবে।

দেশ-দশের দুর্দশা নিয়ে মিথ্যে বানোয়াট ফুলঝুরি ছুটিয়ে অনেকে মুখে মুখে হাতি ঘোড়া মেরে ফেলেন। তিনজন বাঙালি এক জায়গায় হলে দশ মিনিট সরকারকে গালি দেয় (যে সরকারকে তাদের মাঝে দুই জন ভোট দিয়েই এনেছে)। তারপর "এ-দেশের কিস্যু হবে না" বলে হা হুতাশ করতে থাকে। তিনজনের মাঝে একজন হয়তো ফোলানো-ফাঁপানো উপদেশের কথা বলে - আদর্শ, দেশপ্রেম, বিবেক (উচ্চমাধ্যমিক পাঞ্জেরি বাংলা গাইড দ্রষ্টব্য) ইত্যাদি মিশিয়ে একটা ঝালমুড়ি বানায়। সেই ঝালমুড়ি খেয়ে বাকি দু'জন মাথা নাড়ায়। ঘটনা শেষ। আসলে আমরা যেখানে ছিলাম, সেখানেই আছি। একচুলও নড়ি নি। প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীও নিজের অক্ষে শত শত মাইল সরে গেছে ততোক্ষণে। কিন্তু আমরা সেখানেই আছি। কিন্তু আমাদের একটু একটু করে হলেও এগুতে হবে। আমি প্রচণ্ডরকম নিরাশাবাদী চিন্তার জায়গা থেকেও মনে করি, বাঙালির সহজাত ভালোত্ব যে কোন জাতির নিঃস্বার্থবাদী বৈশিষ্ট্যের সাথে পাল্লা দিতে পারবে। একে অপরকে না চিনেও আমরা সাহায্য করতে পারি। নিজের সাময়িক ক্ষুদ্র লাভের চিন্তা না করে সবার ভাল ভাবতে পারি। খালি একটু প্রণোদনা দরকার, একটু ঠ্যালা, একটু বকা।