শনিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০০৮

কবিদের পরাক্রমশালী উদ্যোগ

রূপসী বালিকার মসৃণ ত্বকের মত পিছলে পড়া রোদ
মাথার উপরের গাছে পড়ে ঝলসে দেয় পাতাদের
তাকিয়ে উপরটায় কিছু দেখি না
শুধু ঘোলাটে চোখের তারায় বৈচি খেলে
বিকিরিত আলোর তীর।


দমকা বিস্রস্ত বাতাসে নিঃশ্বাস মেশে আমার
যতটা বিপ্লব জমে আছে, গুমরে কান্নার মত
হুটোপুটি খায় ফুসফুসে তারা অবোধ আক্রোশে।
মুচড়ে বসে পড়ি শুভ্র বিছানায়, দু'পাশে চলে
রিকশা মোটর সাইকেল; প্রেমিকের বক্ষ ডানহাতে
জড়িয়ে চুল উড়িয়ে চলে যায় তপ্ত তরুণী।


এই রোদে একটি বিশ্বকাব্য লেখা হবে, ভাবি আমি
সব দেশে দেশে দেয়া হবে বুলেটিন, কবিদের ডাকা
হবে ছন্দ মিলাতে পরস্পরের। টাকমাথা, দাঁড়িওলা
বুড়োটে তরুণ কবিগণ গাইবে গান,
তুলবে সপ্তর্ষিসুর কণ্ঠে।
এলোমেলো বাতাসে আর ঘোলাটে তীব্র রোদে
মিশে যাবে অমরতা মানবের।

শনিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০০৮

দুঃসাহস

খালি পায়ে হেঁটেছ কখনো ঝিনুক-গুঁড়ো পথে ?
নরম পায়ের পাতা ফেলে কুচোঁ কুচোঁ সাদা বালুতে
চুলে মেখে নোনা বাতাস ? হু হু বাতাস !
চোখ বেঁধে দিয়েছ কি ঝাঁপ অতলজলে
ডুবে যাবার আগে নিয়েছ তো শ্বাস বুক ভরে ?
তোমার তো ফুলকো নেই, রূপালি ফর্সা মাছের মতো
পানির মাঝে তোমার জন্য নেই বাতাসের গুপ্তকুঠুরি।


বোকা মানুষ ! তোমার ফুসফুসে কত জোর ? নীল জলের
ছুরির মতো ধারে কেটে যাবে ওটার সাদা দেয়াল ।
লাল রক্তে ঢুকে যাবে নীল নোনতা বুদবুদ
পানিতে দিয়েছ ঝাঁপ চোখ বেধেঁ, বোকা মানুষ !

মঙ্গলবার, ২২ জানুয়ারি, ২০০৮

শীত


(জীবনানন্দ দাশ স্মরণে)
বিম্বিসার নগরে উঠেছে ঘোলাটে ময়লা চাঁদ
অরূপাক্ষ নদীতে পড়ে বালুচর। প্রিয়তমার মিথ্যা শরীরে
ডোবে কুহক-পুরুষ, প্রেমিক হতে পারে সে যদিও,
চুপ!- দেখো কুৎসিত কালো জলে ভাসে প্রণয়ের লাশ।


যাবতীয় ব্যর্থতাবাদী-বিধাতা-পূজারী সকল
ঘেটেঘেটে কাদাপাঁক রণে ভঙ্গ দেয় সেই রাতে
বিক্ষোভ মিছিল চলে অবিরাম গতিতে
দেবতাবিহীন রাজার স্বৈরাচারী সাম্রাজ্যে।

বুধবার, ২২ অক্টোবর, ২০০৩

নৃত্য

আমার পড়ার টেবিলের সামনে একটা বড় জানালা আছে। জানালাটা আমার খুব প্রিয়। বাড়ির সামনের খোলা উঠোনটা আর ওপরের বিরাট, বিস্তৃত আকাশের একটুকরো এখানে আটকে গেছে। মনে হয় কেউ যেন টলটলে নদীর মাঝখানে ঘের দিয়ে তার অনেকটা জল আটকে ফেলেছে। কী যে ভাল লাগে! আমরা যখন প্রথম এই বাসায় উঠি তখন ট্রাক থেকে জিনিসপত্র নামানোর আগে আমি বাসায় ঢুকে এই ঘরটার দখল নিয়েছিলাম, দাদা আর নৃত্যর আগে। নৃত্য আমার ছোট বোন। ওর এই নামটা বাইরের সবাইকে বলা হয়। তারপরেও অনেকেই এটাকে ‘নিতু’ বানিয়ে ফেলে। যখন ও একদম ছোট, মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়স, মা ওর মাথায় ছোট ছোট দুটো নরম শিংয়ের মতো ঝুটি বেঁধে দিত। তখন ওকে বাইরের কেউ নিতু বললে ও খুব রাগ করতো। গাল ফুলিয়ে বলতো, “আমার নাম নৃত্য। নয়ে ঋ-কার, ত-য়ে য-ফলা, ‘নৃত্য’। আমাকে কেউ নৃত্য বলবে না।” শুধু আমি যদি ওকে নিতু বলে ডাকতাম, ও রাগ করতো না।


সেই নৃত্য আর দাদার আগেই আমি এই ঘরে ঢুকে তারস্বরে চেঁচাতে লাগলাম, “এটা আমার ঘর, এটা আমার ঘর।”


হাতের বড় বাক্সটা মেঝেতে ধপ্‌ করে রেখে মা বলল, “আচ্ছা বাবু এটা তোর ঘর, এখন জিনিসপত্র নামাতে বাবা আর দাদার সাথে হাত লাগা। তাড়াতাড়ি কর।”


পুরো দুপুর ঘর গুছিয়ে বিকেলে আমি, দাদা আর নৃত্য বাইরে ঘুরতে বের হলাম। আমাদের বাসার চারপাশে গাছগাছালি। উঠোনটা পেরিয়ে একটা লাল লোহার গেট, তার বাইরে ইট বিছানো রাস্তা। রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝে ভট ভট করে ছুটে চলা দু-একটা মোটর সাইকেল ছাড়া আর শোনা যায় রিকশার টুংটাং শব্দ। কত নিঝুম থম্‌ ধরা দুপুরে জানালার পাশে বিছানায় শুয়ে আমি রিকশাগুলোর টুংটাং শুনতাম! কেমন মজার ব্যাপার, রিকশার টুংটাং শুনে মনে হতো ওগুলো যেন অনুনয়-বিনয় করে বলছে – আমার সাথে চলো, চলো না। সেই অনুরোধের সুর আমাকে কেমন উদাস করে দিতো। আর এমন সময় নৃত্য চুপিচুপি এসে ধুপ করে আমার বিছানায় লাফিয়ে পড়তো।
“বাবু, কী কর তুমি? কী ভাবো?” ওর প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগেই আরো গাদা গাদা প্রশ্ন শুরু হতো।


“বাবু, তোমার নীল কলমটা একটু দাও না? তুমি ঐ ... ঐ বাসার ইলাকে চেনো? ও আমার কাছে কলমটা চাইলো যে?”


“বাবু, তুমি কালকে বেড়াতে যাবা? বন্ধুদের সাথে? কখন যাবা? আচ্ছা, যাও, অসুবিধা নাই, কিন্তু আমার জন্য একটা পেন্সিল আনবা রাবার বসানো।”


“বাবু... ?”


অবিশ্রান্ত, অনন্ত। অবিরল প্রশ্ন করে চলে নৃত্য। কোনো প্রশ্নই যেন উত্তর চায় না। যেন এই প্রশ্নগুলো করা পর্যন্তই ওর দায়িত্ব শেষ। উত্তর তুমি দিলে, কি দিলে না, তাতে কিছু আসে যায় না। আর কী অদ্ভুত! ওর সব প্রশ্ন শুধু আমাকে। জ্ঞান হবার পরে কেউ কোনো অজ্ঞাত মন্ত্রবলে ওর মনে জানিয়ে গেছে যে আমিই তার সকল প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বসে আছি।


নৃত্য আমাকে নাম ধরেই ডাকে। মায়ের মুখে শুনে শুনে অভ্যাস হয়ে গেছে। আর দাদাকে আমি ‘দাদা” বলি বলে ও-ও তাই শিখেছে। দাদা আমাদের দু’জনের চেয়ে বড়। একটু চুপচাপ। দাদার মাথার চুলগুলো সবসময় এলোমেলো হয়ে থাকে। আমি একবার চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে ঠিক করে দিয়েছিলাম। চিরুনি রেখে ফিরে এসে দেখি আবার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে দাদা নির্বিকারচিত্তে বই পড়ছে।


এই মফস্বল শহরটা আমাদের খুব প্রিয়। বিশেষত আমার আর নৃত্যের। সকালে বাবার সাথে আমরা দুজন বের হই। আমার কলেজের লাগোয়া স্কুলেই নৃত্য পড়ে। আমরা দু’জন যখন হেঁটে হেঁটে যেতে থাকি তখনও নৃত্য অনর্গল প্রশ্ন করে চলে। আর একটু পরপর বলে, “ওহ্‌ হো, বাবু, তুমি একটু আস্তে হাঁটো তো। তুমি কি ঘোড়া, যে দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছ?” গুটি গুটি পায়ে কেমন টুকটুক করে হাঁটে নৃত্য। হাল্কা নীল পোশাক আর দুধসাদা রিবনের দুটো ঝুঁটিতে ওকে দেখলেই মনে হয় যেন কোন অপ্সরী পথ ভুলে স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে।



আমাদের জীবনটা খুব শান্ত আর নিবিড় ছিল। মা, বাবা, আমি, দাদা আর নৃত্য। মফস্বলে বড় কোনো ঘটনা ঘটতো অনেকদিন পরপর। প্রতিবার পুজোয় আমাদের খুব মজা হতো। এই পাড়াতে আমরাসহ বেশ কয়েকটা পরিবার আছে হিন্দু। আমরা সবাই মিলে চাঁদা তুলে প্রতিমা বানাতাম। ছোট্ট থাকতে নৃত্য খালি বলতো, “বাবু দেখো, দুর্গামার মুখটা একদম আমার মতো না?” কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, এখন ওকে সেই কথা বললে কেন জানি ও খুব লজ্জা পায়। আর এটা নিয়ে প্রতিবছরই পুজোর সময় আমি আর দাদা মিলে ওকে খুব জ্বালাই।


তবে গত কয়েকমাস ধরে চারপাশের লোকজন আর পরিবেশটা খুব বদলে গেছে। আমি খেয়াল করেছি যে দুপুরের সেই রিকশার আওয়াজগুলো কমে গেছে। বরং মোটর সাইকেলের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। সামনে নির্বাচন আসছে বলে মুশকো মুশকো গুণ্ডা চেহারার লোকজন সেই মোটর সাইকেল দাবড়ে বেড়ায় সারা শহর জুড়ে। সেদিন তো কলেজ থেকে ফেরার পথে আমার প্রায় গায়ের উপরই উঠিয়ে দিয়েছিল। আমি জোরে চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও থেমে গেলাম। দেখি পেছনে বসা লোকটা কটমট চোখে আমাকেই দেখছে। দাদাও একদিন বলছিল তাদের এনজিও-তে কী জানি গোলমাল বেঁধেছে। দাদা একটা এনজিওর ফিল্ড অর্গানাইজার। মাঠপর্যায়ের লোকদের একত্রিত করে। তাদের ওখানে ওরা নির্বাচনের ভোট আর চাঁদা চাইতে হাজির হয়েছিল। বেশ উত্তপ্ত অবস্থা। মা ভয় পেয়ে দাদাকে নিষেধ করলো এসবে না জড়াতে।
কয়েকদিন পরই নির্বাচন হয়ে গেল। সবাই ভেবেছিল ক’দিনের এই শোরগোল এর পরেই থেমে যাবে। আমরা আবার আগের জীবনে ফিরে যাব। রাস্তাঘাটে, অফিস-আদালতে যে পোস্টার সাজানো রঙিন অবস্থা, তাও কয়েকদিনের মধ্যেই আটপৌরে হয়ে যাবে। কিন্তু সত্যি সত্যি তা হলো না। প্রথমে চার-পাঁচ দিন তো খুব হৈ-চৈ চললো। তারপর ব্যান্ডপার্টি এনে মহাধুমধাম, স্কুলের মাঠে রাতভর গানবাজনা হলো।


এর কিছুদিন পরে এক বিকেলবেলা। আমি বেরোচ্ছিলাম বন্ধুদের সাথে দেখা করতে। এমন সময় কয়েকজন লোক লোহার গেটটা খুলে ভেতরে ঢুকলো। চার – পাঁচজনের মধ্যে সেই কটমট করে চেয়ে থাকা লোকটাকেও দেখলাম। একজন বললো, “রমাপদ বাবু আছেন? একটু কথা বলব।’’ আমি তাদের বারান্দায় বসতে বলে ভেতরে বাবাকে ডাকতে গেলাম। এর মাঝে দেখি দাদা বেরিয়ে এসেছে। বলল, “বাবা ঘুমুচ্ছে। আপনারা আমাকে বলুন। কী ব্যাপার?”


কটমটে চেহারার লোকটা বলল, “উনি হইলে ভালো হইতো। যাউকগা, আপনে বড় পোলা? আইচ্ছা, দেহেন, ইলেকশানে আমাগো পার্টি জিতেছে। আমরা হেভি খুশি। আপনেরাও খুশি। এই খুশির জন্য আমরা কয়দিন আমোদ ফুত্তি করুম। তাই চান্দা চাইতে আইছি। না করবেন না ভাই। আর হ, এই চান্দা মাসে মাসেই দিবার লাগবো, বুঝছেন নি?”


দাদা এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল, কিন্তু লোকটার কথা শেষ হলেই বেশ জোরে বলে উঠল, “আমরা এতদিন এখানে আছি। কখনো এসব কাজে কাউকে চাঁদা দেই নাই। আপনাদেরও দিব না। আপনারা আসতে পারেন।” এই ফাঁকে একজন ঐ কটমটে লোকটার কানে কানে কী যেন বললো। শুনে লোকটা বলল, “আইচ্ছা, আপনেই তাইলে এনজিউর সেই পাবলিক। সেইদিন তো খুব ফাল পাড়তাছিলেন! অহন তাইলে ডাবল চান্দা দিবেন। দেন, তাড়াতাড়ি দশ – পনরো হাজার যা আছে বাড়িতে বাইর করেন।”


দাদা পুরো হতবাক হয়ে বলল, “আরে, এ দেখি রীতিমতো ছিনতাই! মগের মুল্লুক নাকি? পেয়েছেন কী? বেরোন। বাড়িতে এসে হুজ্জোত করছেন।”
এর মাঝে শোরগোল শুনে বেশ লোক জমে গেছে। সবাইকে জড়ো হতে দেখে দাদা জোর পেয়ে গেলো। বলতে গেলে একরকম ঠেলেই লোকগুলোকে বের করে দিলো। যাবার আগে অবশ্য তারা বলে গেল দেখে নিবে। কীভাবে দেখবে সেটা নিয়ে আমি বা দাদা বা ওখানকার অন্য কেউই তখন খুব একটা ভেবে দেখলাম না।


পরেরদিন দুপুরে আমি কলেজ থেকে ফিরছি। ফেরার পথে নৃত্য স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা একসাথে ফিরি। আমি স্কুলগেটে যাওয়া মাত্রই দারোয়ান দৌড়ে এলো – “ভাইজান, আপামুনিরে একটা মাইক্রোতে ধইরা নিয়া গেছেগা...” – বলে লোকটা হাউমাউ করে আরো কী কী সব বলতে লাগল। আমার মাথায় আর কিছু ঢুকছিল না। মনে হচ্ছে কেউ কানের মধ্যে উত্তপ্ত গলিত সীসা ঢেলে দিয়েছে। আমি কী করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। দুপুরের তীব্র, প্রচণ্ড রোদ চারিদিকে ঠা ঠা করে হাসছে। আমি বাসায় দৌড় দিলাম। পৌঁছে দেখি মা ছাড়া কেউ নাই। দাদা, বাবা দুজনেই অফিসে। আমি মাকে কিছু না বলেই দৌড়ে বের হয়ে এলাম। দাদাকে দরকার, খুব দরকার। আমি অপেক্ষা না করে ইট বিছানো রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে লাগলাম দাদার এনজিও অফিসটার দিকে। দুপাশের দোকানপাট, গাছপালা সব কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আমি দৌড়াতেই থাকলাম, দৌড়াতেই থাকলাম, দৌড়াতেই থাকলাম।




************************************************


পুনশ্চঃ এখন অনেক রাত। কালকের মধ্যেই জমা দিতে হবে... । শেষ করে দেই... । এরকম সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই দেখি গল্পটা আমি শেষ করে ফেলেছি। প্রায় দু’বছর আগের কথা। মানুষ আসলে ভুলে যায়, সব কিছু ভুলে যায়। একটা হিন্দু মেয়েকে এভাবেই ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কারণ তার বড়ভাই লোকগুলোর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিল। তিনদিন পর মেয়েটা ফেরত এসেছিল। তারপর সে আর বেশিক্ষণ বাঁচেনি। বাসার স্টোররুমের ইঁদুর মারা বিষটাই তার শেষ ভরসা হলো। আমি গল্পে মেয়েটাকে মারতে পারলাম না। বারবার আমার ছোটবোনের চেহারাটা ভেসে উঠছে চোখে। মেয়েটাকে আমি কিভাবে মারি?


(সমাপ্ত)

রবিবার, ১৫ জুন, ২০০৩

নামহীন

আজ সকালে একটা মানুষ দেখেছি..............
না, না; রোজ রোজ কত কত হাজার অযুত
সাদা কালো ময়লা নোংরা মানুষ নয়!
শাহবাগের মোড়ে পৌঁছানোর আগেই
দেখি রাস্তার পাশে রাবিশ আর
ভাঙ্গা পলেস্তারা স্তূপ স্তূপ হয়ে আছে,
মনে হলো শক্তি কমিশন আর সম্প্রচার কেন্দ্র
ভেঙ্গে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে।

.......কবিতাটা কি খুব বেশি সুররিয়েলিস্টিক হচ্ছে?
নাকি বোঝার অবোধ্য কোন অনন্ত বোধ
আক্রান্ত করেছে আমায়?
কিন্তু মানুষ একটা আজ আমি দেখেছি
পায়ে শিকল বাধাঁ--দুমড়ে মুচড়ে ঘুমাচ্ছে
তার সেই ঘুম আর ঘুম দেখে মনে হলো
কত-কত-কত বছর ঘুমাই না আমি!

সোমবার, ২ জুলাই, ২০০১

স্বপ্নেরা কথা কয়

স্বপ্নেরা টুপটাপ ঝরে পড়ে হৃদয়ের কার্নিশে
শত কোলাহল যেন স্তব্ধতায় লীন হয়ে যায়
শুধু শোনা যায়, স্বপ্নপতনের ধ্বনিত প্রতিধ্বনি
বাতাসে ঝলসে ওঠে কাতর আর্তনাদ।
প্রেয়সী বাতাস-- তার বুক চিরে যায় চকিতে
হাহাকার মিশে থাকে কনে-দেখা আলোয়
দিগন্তের রেখা মুছে যায় নির্ভুল প্রণয়ে
আর সূর্যের সাথে তার নিবিড় মিলনে।

চরাচর মিশকালো,
হায়েনার চোখ জ্বলে রাস্তায় রাস্তায়
সূর্য ডুবেছে কেন? জানো কি তুমি?
আজ বিকেলের রোদ মরে গেছে
কুকুরের পঁচা-গলা লাশ যেখানে পড়ে আছে।
আকাশের টুকরো টুকরো নেমে এসেছিল
নগরীর প্রান্তে, যেখানে অরণ্য ঘুমিয়ে রয়।
দেখনি তুমি-- মাথার উপরে প্রচণ্ড আকাশ নেই--
আছে তার কঙ্কাল। আকাশের পাঁজরের
হাড়ের ফাঁকে কালো শূন্যতা মুখ ভ্যাংচায়।
অরণ্য আদিম আর নিষ্পাপ থাকেনি
বাতাস তখনো যেন ধর্ষিত হয়নি।
টেট্রন-পলিয়েস্টার, থার্টি ফাইভ- সিক্সটি ফাইভ
কাপড়ের ছেঁড়া টুকরো পড়ে থাকে।

ঘাসেরা বিবর্ণ যেখানে,
কিশোরী ধরণী যখন চুপচাপ প্রলাপ বকে।
তার বুকে শুয়ে থাকে নরমাংস
যার হৃদয় আজ চিরে ফালাফালা
এলোকেশী? তার এলোমেলো চুলগুলো
আমার মুখে জড়িয়ে থাকে, যেন ভেজা গোলাপ।
রাত বাড়ে অরণ্যে, সিক্ত শিশিরের পদশব্দ।
আজিকার বিকেলের মেয়ে--কারা যেন তার
হৃদয়টাকে ছিঁড়ে নিয়েছে।
বুকে তার জমাট বাঁধা আধাঁর হারায়--
নখের আঁচড় আর রক্তের শুকোনো দাগ....
সেখানে ঘাস মাটি প্লাবনে ভেসে যায়
এলোকেশী পঞ্চদশী---
তার রক্তের কুলুকুলু ধ্বনি... শুধু রক্ত বয়ে যায়
এলোকেশী বিস্রস্ত!

বিস্রস্ত সেই প্রতিবিম্ব ঢেকে দেয় আঁধার
এলোকেশী তবু পড়ে রয়।
ঘুমাও তুমি, যেন কতকাল পরে আমি
তোমায় দেখি সেই আঁধার কালো অমানিশায়
রাত বাড়ে অরণ্যে, হলদে হলদে পঞ্চমীর চাঁদ
হাসিমুখে উঠে আসে এলোকেশীর পায়ে।
যেন চুপি চুপি চুমে যায় তার পায়ের ভাঙা নুপুর।

স্বপ্নেরা টুপটাপ ঝরে যায় হৃদয়ের কার্নিশে।

মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০০০

প্রথম দেখা

চারপাশে রোদের ঢেউ আছড়ে পড়ে গালে
পায়ের তলে পিচে ফুটে খই
ধোঁয়া আর ধূলিময় ধরণীতে বসে ভাবি
নরক থেকে খুব দূরে বুঝি নই।
কোথা থেকে নাকে অচেনা গন্ধ এসে লাগে
ক্লেদাক্ত সেই প্রহরের এক অজানা অচেনা সুবাস
মুখ ফেরাতেই.......
হঠাৎ হৃদস্পন্দন যেন থেমে যায়.........
আবর্জনামাঝে কোন গোলাপকেও দেখিনি এত নিষ্পাপ আর পবিত্রসাজে
কালো আকাশের চাঁদও বুঝি লজ্জা পাবে
তাকে দেখে
মূহুর্তেই ইন্জিনের ভট্‌ভট্‌, কালো ধোঁয়া, বাসের হর্ণ আর কোলাহল
রুদ্ধ এই বুকে নিস্তব্ধ নিশ্চল হয়ে যায়।
নির্লজ্জ আমি তাকে দু'চোখ ভরে দেখি--শুধুই দেখি
তাকে--বলিনি কিছুই আমি,--কেন জানি!
বিস্ময় আর আবেগ হয়তো করেছিল গ্রাস, আমার হৃদয়।


উন্নত সেই শহরের অনুন্নত এক যানে
সে আমি মুখোমুখি--তফাৎ শুধু দুইজনের যতদূর
অন্যসময় তাতে সে লজ্জা পেত.................
আমার হৃদয় অস্থির হয় বারেবার
বোঝেনি কিছুই সে, কেন জানি; বড় নিষ্ঠুর!
বাইরে তখন লু হাওয়ার মাতামাতি
ইন্জিন চলে ধুঁকেধুঁকে, যেন যক্ষার রোগি
ফুসফুস ভরে মনোক্সাইড বিষে, করে জ্বালা চোখে
তবু তা নির্নিমেষ, তাকিয়ে রয় -- শুধুই তার পানে
হঠাৎ দমকা হাওয়ায় এলোমেলো হয় সে
হাওয়ায় ওড়ে আঁচল তার, এসে পড়ে আমার হাতে
হয় সে ত্রস্ত-চঞ্চলা
যেন অতিচেনা, এক মেদুর সুবাস পাই--
ফিরিয়ে দিই তার সে আঁচল কাঁপাকাঁপা হাতে
তবু ক্ষণিকের তরে সুমুখে আমার
খুলে যায় এক সোনালি দরোজা
করিনি অনুপ্রবেশ--পাছে ভয়...............
সে যদি কখনো আমার না হয়!
এক টুকরো আকাশ দেখলাম, তার বুকের মাঝে
নরম, পেলব
তার বুক, যেন আজ চৈত্রের দারুন দুপুরে
সেখানে শুধুই নিষিদ্ধ আলো খেলা করে
শুভ্র তার অন্তর্বাস ক্ষণমাত্র ধরে, দেখা দিয়ে যায় হারিয়ে
যা গান হঠাৎ শুনেছিলাম এক প্রভাতে
আমার হৃদয়ে তার কল্লোল, উচ্ছাসে ওঠে মেতে
শুধু সে...........একবার তাকিয়ে চোখ তার নিল ফিরিয়ে
দেখল না, কী আকুলতা আজ আমার চোখের নীড়ে!


নির্লজ্জ আমি তাকে দু'চোখ ভরে দেখি,
কারণ?
এত পবিত্র সৌন্দর্য কখনো দেখিনি আমি আগে!

মঙ্গলবার, ৯ নভেম্বর, ১৯৯৯

কষ্ট

নিজেকে মাঝে মাঝে বড় ক্লান্ত লাগে--
সেই একই কাজের শেষে
ঘর্মাক্ত শরীরে ঘুপচি ঘরে ফেরা।
তালা খুলতেই গুমোট গন্ধটা নাকে লাগে।
তারে ঝোলানো ময়লা তোয়ালে, ভেজা গেন্জি
বিছানায় তেল চিটচিটে বালিশ
টেবিলে আধ কাপ বাসি চা, চায়ের পিরিচে
পিঁপড়ে আর পোকা মাকড়ের ঘর বসতি,
শ্রান্ত ক্লান্ত দেহে যখন গা এলিয়ে দেই বিছানায়
শুরু হয় মশককূলের সুরসঙ্গীতের রেওয়াজ।


একটা সময় ছিলাম আপন ভূবনে
সেই ভূবনের সৌন্দর্যে আমি নিজেই মুগ্ধ হতাম
তারপর.....তারপর একজনের সাথে দেখা হলো
ধীরে ধীরে কাছে আসা, পরিচয়, পরষ্পরকে বোঝা
সে আমাকে স্বপ্ন দেখালো, মায়াবী
সেই অপরূপ স্বপ্লগুলো বাঁচার প্রেরণা দিলো।
এক রূপালি রাতে মাথার ওপরে প্রচণ্ড আকাশ
চাঁদের জ্যোৎস্নাধোয়া চারপাশে এক অপার পবিত্রতা
তখন তাকে দিলাম আমার সবচেয়ে দামী আর প্রিয়
সেই আপনভূবন - সারা জীবনের এক পরম ঐশ্বর্য
সেদিন তাকে লাগছিল যেন পূর্ণিমার প্রতিমা!
যার খোঁজে আর অপেক্ষায় কাটিয়েছি কত দিন, বিনিদ্র রজনী।


দিন যায়, ঘড়ির কাঁটাগুলো অতিক্রম করে দীর্ঘপথ
একদিন অবাক বিস্ময়ে নিজের মাঝে আবিষ্কার করলাম
কেমন যেন অনুভূতি ; প্রেম নয়, ভালোবাসা
তার কাছাকাছি হলেই কেমন নড়াচড়া করে বুকের মাঝে
আর দূরে যাই তো সেখানে অনুভব করি
.............আদিগন্ত বিস্তৃত শূন্যতা।
যে শূন্যতার আছে শুধু কুরে কুরে খাওয়ার ক্ষমতা
আমাকে যা করে দেয় রিক্ত, শূন্য।
আবার সে আসে, যেন এক ঝড়ের মতো
লণ্ডভণ্ড করে দেয় আমার অস্তিত্ব।


তারপর, তারপর হয়তো একদিন, এক ঘোর অমাবস্যায়
সে চাইল মুক্তি, আমার আপাত বিরক্তিকর ( তার কাছে যা অসহ্য )
ভালোবাসার মায়াজাল থেকে। নিজেই পারতো;
কিন্তু মানসিক দুর্বলতার হেতু সে আমার কাছে রেহাই চাইল
অকস্মাৎ অভিমানী বিপ্লবে ডুকরে উঠলাম।


তারজন্য সেদিন নিয়ে এসেছিলাম রক্তলাল গোলাপ
লুকালাম সেগুলোকে দক্ষ ক্ষিপ্রতায়।
কারণ সে এগুলোর প্রয়োজন ফুরিয়েছে আগেই
জানালো তার অপারগতা আর অক্ষমতা, সবশেষে
নিঃসন্দেহ আর্তিতে সে মুক্তি চাইল।


এই আমি ফিরে চলেছি
হাতের গোলাপগুলে যেন কেমন ঠাট্টা করছে
স্ট্রীট ল্যাম্পের সারিবাঁধা দল যেন একাকী দাঁড়িয়ে
গাছের পাতা অল্প অল্প শিরশিরায়
আকাশের তমসাচ্ছন্নতায় হাজার লক্ষ নিযুত কোটি তারা
আমি টের পাই, অন্ধকারে হাতড়ে দেখি নি:সীম শূন্যতা
সাজানো স্বপ্নগুলো ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ে
পারি না ধরে রাখতে, বেঁধে রাখতে,
রেখেই বা কী লাভ?
যাকে প্রবল ভালোবাসায় ধরে রাখতে পারিনি;
তার দেয়া স্বপ্ন গুলো
যাক না হয় ঝরে, যাক না হয় হারিয়ে।
এখন আর কোন কিছুতেই কিছু আসে যায় না।


সবার প্রতি তীব্র অভিমান হলো
অজানা আক্রোশে যখন হৃদয়টা পূর্ণ হলো
তখন চলে এলাম এক নিভৃতে
যেখানে কেউ আসবে না আমাকে কষ্ট দিতে
আমার অসীম নিজস্ব মানবিক কষ্ট নিয়ে
আমি কাঁদব, ঘুমাব, আবার ঘুম ভেঙ্গে কাঁদব
বুকের সেই শূন্যতায় পেয়িং গেস্ট হিসেবে
থাকতে দিয়েছি কষ্টগুলোকে, বড় বেশি চড়া ভাড়ায়
যাতে আর কখনো কেউ সেই শূন্যতা
পূর্ণ করতে না পারে।


আসলেই নিজেকে বড় বেশী ক্লান্ত লাগে।

মঙ্গলবার, ৬ জুলাই, ১৯৯৯

প্রশ্ন

হলুদ আলোয় ভরা এক সিঁড়িতে
সিঁড়ির তৃতীয় ধাপে দাঁড়িয়ে,
নির্দোষ আহ্বানে তাকে ডাকলাম কাছে,
ইতস্তত পদবিক্ষেপে কাছাকাছি হয়ে তার প্রশ্ন-
"কি?"

মনের অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে গলি থেকে
যে প্রশ্নটা হামাগুঁড়ি দিয়ে বেরোলো - তার
মুখাবয়ব অচেনা না হলেও, কেমন যেন
ভয় লাগল প্রশ্নটাকে। হয়ত সেজন্য
নিজের কাছে না রেখে সেটা ছুঁড়ে দিলাম তার দিকে।

বিস্ময়ানুভূতির প্রাথমিক ধাক্কা কাটতেই
সেই হলুদ সিঁড়িধাপ থেকে সে
অবনতিপূর্বক; নিষ্ক্রান্ত হলো।
হয়ত এতেই সে মুক্তির পথ পেয়েছিল।

কিন্তু জগতের সকল পুনরাবৃত্তির ন্যায়
সে ফিরে এলো সেই হলুদাভ সিঁড়িতে-
সেখানে আমি না থাকলেও-
ছিল প্রশ্নের কর্তাকারক।
পরবর্তী কতগুলো মুহূর্তে তার হাতে
জমা হলো ভাঁজকরা কাগজ, যাতে লেখা
একজনের দ্রবীভূত আর আরেকজনের
বাষ্পীভূত হওয়ারই ঘোষণা!

একজন নির্লজ্জ চশমখোর
এই কবিতার লেখক হওয়ায়
নির্লজ্জের মতই তার কাছে পুনরায় প্রশ্ন করি
এবারেরটাকে তো চেনাচেনা লাগছে।

প্রশ্নটা হলো...
আরে! পুনরায় তার নিকট আর কোন
প্রশ্ন করার অবকাশ নেই
কারণ সে মোর বড় আপন ছিল,
কিন্তু এখন বহুদূরের।

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ১৯৯৮

কথোপকথনঃ স্বগতঃ

: কাল রাতে আকাশে কোন চাঁদ ছিল না
চারিদিকে তারাগুলোকে মনে হচ্ছিল,
কালো ছাতার অসংখ্য ফুটোর মতো
যদি তখন তোমাকে দেখতে পেতাম
তাহলে নিঃশ্বাসটাকে আর আটকে রাখতাম না
তাহলে এই বারো বাই বারো ফুট ঘরটাকে মনে হতো-
স্বর্গের তিলোত্তমা প্রাসাদ।


: জানো, মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয়, ঐ উষ্ণ হাতের পরশ
নিজের হাতদুটো দিয়ে ধরে রাখতে।
ইচ্ছে হয়, ঐ অনিন্দ্যসুন্দর চোখ দুটো
নিজের মনের চোখে সারাজীবনের সূর্য বানিয়ে নিতে।


: আজ রাতে আকাশে দেখা দিয়েছে-
ডিঙ্গি নৌকার মতো, সাদা একফালি চাঁদ
আর আমি সেই ঘরের লালচে নীল আলোতে
তোমার কথা ভাবছি--


: হয়তো প্রতিটা মানুষের জীবনে একটা সূর্য আছে
যে সূর্যের সূর্যাস্ত নেই, নেই মধ্যদুপুরের
ঝিম ধরানো রোদ। আছে নরম, আমেজী আলো
মাঠভরা শিশিরভেজা ঘাসে আলোর স্বর্ণবিন্দু।


: আমার মনের বারান্দায় আমি তোমার
পদধ্বনি শুনতে পাই--
কিন্তু এক পদশব্দ আর তার হাজার প্রতিধ্বনি
আমার কানে বাজে, আমি অপেক্ষায় রই--
তোমার--------
তুমি আসো, আবার চলে যাও
সাথে নিয়ে যাও ইচ্ছের ঝাঁপি-- অপূর্ণ
ইচ্ছেগুলোকে বাস্তবতার পাথরচাপা দেই।


: আর আমার মনের সেই সূর্য --
ঢাকা পড়ে ঈশানী-হতাশার মেঘে।
সেই অন্ধকারে ডুবে আমি বিষণ্নতার স্পর্শ পাই,
আমি জেগে উঠতে চাই
কিন্তু যেন আরো অতলে তলিয়ে
বহুদুরের ফেরারী হই।