মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ, ২০১১

একটি প্রস্তাবনা -

Epigraph
ঝিনুক নীরবে সহো ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভিতরে বিষের বালি মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও

Prologue
কবিতার সঙ্গে সম্পর্ক প্রাক্তন-মোহের মতো হয়ে গ্যাছে। ক্রমাগত জীবন যাপনের ক্লেদ ও ক্লেশ কবিতাশূন্য করে দিয়েছে। শুনেছি উদ্দীপনা উপকারী, কিন্তু যদি সকল সময় উদ্দীপ্ত থাকতে হয়, তাহলে সে বড়ো ক্লান্তিকর। স্নায়ু-বৈকলন অবশ্যম্ভাবী। যতোটা বুঝি, আশেপাশের ক্রমাগত পীড়নে সেদিকে স্নোবলের মতো এগিয়ে যাচ্ছি।

গতি ক্রমশ বাড়ছে,
পথের বাধা দেয়ার মতো গাছ-পাতা-বন খড়কুটোসম উড়ে যাচ্ছে,
আমি ক্রমশ স্নায়ু-শক্তিতে প্রকাণ্ড হচ্ছি,
অতি নিচে,
অতি-নিম্ন-নিচে দেখতে পাই খাঁড়ির জল মেলে ধরে হা করে আছে সমুদ্র,
আমাকে গিলে খাওয়ার আনন্দে সে চকচক করছে,
ফেনায়িত করে তুলছে গালের কষ!

এটাও বুঝতে পারছি পতনের সাথে সাথে গলন শুরু হবে আমার। স্নায়ু ও মস্তিষ্ক এই পতন বা গলন ঠেকাতে পারবে না। ন্যূনতম ফাঁক-ফোকর খুঁজছি। পথ বেঁকে অন্য কোথাও আশ্রয় খুঁজছি। শব্দহীন হয়ে ওঠার অভিশপ্ত আবশ্যিক পতন ও গলন ভয়ঙ্কর!

হঠাৎ একটি ঢাল। এক টুকরো চড়াই। উতরাতে গিয়ে মনে হলো আশা পেলাম... মনের বদভ্যাসে আশায় বুক বাঁধি...
Manifesto
মোমালোর শরীর কোমলে কঠিন,
তবুও স্ফূটিত কম্পনে অবয়ব কায়াহীন
লঘুচালে অতীব্র-আবেশে ক্রমকম্প শরীর নরোম
নিভে গেছে সকল ক্ষুধা; অস্থিরতা, নির্ব্যাপী শোক


গলিত জমাট মোমের মতোই জমাট হয়েছে
ধমনীজ নদী, ভরাট হয়ে গেছে কাপুরুষ মেরু
কশেরুকা অনিশ্চিত, ভেঙে যেতে দেখেছি
অস্থিগত আগুনে-লাল অপ্রিয়তম ঋজুতা


শঙ্কাহীনের চোখে দেখি গাঢ় বিদায়ের ঘোর
এ গহ্বর তোমার - আমাদের যাবতীয় জীবন, গহ্বর
অভেদ দেখি না এখানে, প্রতিদিন ঘাসের মতোই
অবিকল্যে বদলে যাচ্ছে পুরোনো কথার পাতা।



Epilogue
নেমেছি অজান্তে অতল অকূলে অনিঃশেষ ঘৃণা শুধু তোমার জন্যে, হে অচল অকাট্য নিস্পৃহতা!

বুধবার, ২৩ মার্চ, ২০১১

ইনসমনিয়া-

ইদানিং ইনসমনিয়া ফিরে আসছে।
ইনসমনিয়ার বাংলা অনিদ্রা। দুটো একই শব্দ, অথচ শব্দ দুটোর চরিত্র কী আলাদা! ইনসমনিয়া শুনলে মনে হয় জ্যাজ শুনছি। নিদেনে কোনো পুরানো ব্লুজ, পঞ্চাশের দশকের পিয়ানোর সুর। সাথে নিশ্চুপ রাত, রাতের পিঠে অন্ধকার সরীসৃপের মতো জানালার বাইরে শুয়ে আছে। শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। হয়তো একটু পরে আমার ঘরে ঢুকে পড়বে। বাইরে সতর্ক পাহারা দিচ্ছে গলির আলোর শীর্ষক। ঘরে মিয়ানো আলো জ্বালিয়ে রেখেছি। রাত গভীর তাই উজ্জ্বল আলোয় চোখ পুড়ে যেতে পারে!
অনিদ্রা শুনলে এরকম কিছু মনে হয় না। বরং কেমন পাঁশুটে বুড়োর মতো লাগে নিজেকে। মনে হয় রোগা জিরজিরে হয়ে গেছি, খুকখুক কাশি জমেছে, মাঝে মাঝে থক করে গলা পরিষ্কার করে আসছি বেসিনে গিয়ে। ঘুম আসছে না, হাসফাঁস গরম কিংবা জলতেষ্টা। বাইরে কে আছে না আছে খবর নেই। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে আছি।
তাই এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা বোঝাতে শব্দ দুটোকেই ব্যবহার করি। এই এখন আমি ইনসমনিয়ায় ভুগছি - আজ রাত কেবলই ইনসমনিয়ার। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ হিউ লরির গাওয়া একটা গান পেলাম। সামনে সলো ব্লুজ অ্যালবাম বের করছেন। একটা গান ফ্রি বিলাচ্ছে। ফেসবুকে ‘লাইক’ দিলেই মেইলে গান চলে আসে! অভিনব প্রচারণা এবং বিনামূল্যে গান ছড়ানো দেখে ভালো লাগলো।
গানের কথাগুলো বেদনা-বিধুর। প্রেয়সী চলে গেছে। অনেক ভালোবাসার কথা, অনেক মায়াময় স্মৃতি ফেলে রেখে নিষ্ঠুরের মতো চলে গেছে। এখন তার কিছুই করার নেই। প্রেমের সময়ে সে টের পায় নি, এরকম কিছু হবে, ভাবতেও পারে নি যে প্রেমিকা এভাবে ছেড়ে চলে যাবে। এই বিরহে, এই যাতনার চোখ কাঁদছে। মন কাঁদছে। এরকম সরাসরি বেদনার কথা এখন আর আমরা বলি না। হয়তো মনে করি কথাগুলো ক্লিশে হয়ে গেছে। সবাই বলে বলে এমন করেছে, যে এই কথা এই অনুভব সত্য হলেও কেউ বিশ্বাস করবে না। চলে যাওয়া প্রেমিকাও বিশ্বাস করবে না! তাই আমরা ভণিতা করি, ভানে ভানে জড়িয়ে, উপমায় ডুবিয়ে বোঝাতে চাই সরল কথাটিকে। হয়তো সেই উপমা আর ভানের ভারে আসল কথা ঠিকঠাক ঠাহরও করা যায় না। বিগত-প্রেমিকা বুঝে কি না ছাই তা কে জানে!
====
You told me you were leaving
After all we’ve been through
Guess I’m a fool
Falling in love with you
There ain’t no use in cryin’
Do what you have to do
Guess I’m a fool
Falling in love with you
You told me that the kind of love we had
Will last for a million years
I believe everything you say
You filled my heart with tears
So long, pretty baby
Go break some other heart and two
Guess I’m a fool
Falling in love with you
=====

এইসব উচ্চকিত, শিল্পিত, চর্চিত অনুভবের প্রকাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ করে সরল-প্রকাশ পেলাম। ভালো লেগে গেলো। ইনসমনিয়ার সময় খুশি হলো। এখন এই ব্লুজে চেপে তোমার কথা ভাববো। মাঝে মাঝে এমন বিশেষ অবকাশ দরকার হয়ে পড়ে! 

বুধবার, ৯ মার্চ, ২০১১

পদার্থের ভান

প্রচণ্ড শব্দের গতি, তারচেয়েও প্রচণ্ড আলোকের বেগ। পদার্থবিদ্যায় পড়েছিলাম, শব্দ ও আলোক শক্তির দুই রূপ। মানব পদার্থ কেবল, ভেতরে অণুপরমাণু তিলে তিলে রক্ত-মাংস গড়ে তুলেছে। শক্তির কাছে পদার্থের হার নিশ্চিত, তাই শব্দে আমাদের ধাক্কা লাগে, আলোকে আমরা পুড়ে পুড়ে যাই!

দুপুর রৌদ্রের রশ্মিগুলো তীব্রতায় একে অপরের সাথে মিশে যায়, খালি চোখে তাকালে গতি-দ্রুততায় আমার ধাঁধা লাগে, বুঝতে পারি না ঠিক কী দেখছি, কেমন দেখছি। রশ্মিগুলো ঠিকরে ঠিকরে চোখের ভেতর সেঁধিয়ে যেতে থাকে আর অনূদিত হতে থাকে যাবতীয় দৃশ্য, পাখি ও বৃক্ষ, রাজপথ ও রাজন্যের শাসন। প্রাচীন শহরে বাস করি, শহর নিজস্ব সময়ে প্রাচীনতার ওপর চাকচিক্যময় প্রলেপ দিয়েছে, সেসব আমাকে প্রতিমুহূর্তে বোকা বানায়। আমি বেকুব থেকে বেকুবতর হই। আপাত-নবীন প্রাণে-প্রাচীন শহরে প্রাগৈতিহাসিক যানে চলাচল করি। যানচালকের লুঙ্গি ও গেঞ্জি কালো শরীরে কালো ঘামে সেঁটে আছে। শরীরের ভেতরে সাপের মতো কিলবিলে পেশী ও ক্ষুধা, আমার সাথে তার লেনদেন রফা হয়েছে দশ টাকা। দশমুদ্রার বিনিময়ে তার কয়েকশো বিন্দু ঘাম ও কয়েক হাজার কিলোক্যালোরি এটিপি কিনে নিয়েছি। রিকশা টানছিলো সে, প্রবল ক্লেশে, দশ মুদ্রার উজান-টানে। ঝাঁঝালো রৌদ্রের তীর পিঠে বিঁধতে বিঁধতে সে ও আমি এগুতে থাকি। আমাদের মাঝে উলম্ব ঝুলছে কতোগুলো প্রথাগত শ্রেণীর সিঁড়ি। সিঁড়িটি তার পিছনদিকে, সেদিকে তার খেয়াল নেই। সিঁড়িটি আমার সামনে, তবে আগ্রহ নেই পেরুনোর।

এই একঘেঁয়ে দৃশ্যটি কেন বর্ণনা করছি? কেন খোল-নলচে খুলে ফেলছি এই দায়সারা যাপনের? কেন চেষ্টা করছি মুহূর্তের ভাঁজের ভেতরের মুক্তোকে তুলে আনার? এরকম আটপৌরে বর্ণন কে শুনেছে কবে? আমারও তো জানা ছিলো না, এই মুহূর্তের পিঠে এক অভূতঘটন ঘটে যাবে। যে ঘটনার সাথে আমি বা সে জুড়ে যাবো না; আবার ভেবে দেখি যে আমি ও সে জুড়ে গেছি নিরুপায়! আমরা উত্তরদিকে যাচ্ছিলাম, ডান গালে হেলে পড়া সূর্যরশ্মির তোড়ে ভাসতে ভাসতে। আমাদের উল্টোদিকের রাস্তাটি ফাঁকা ছিলো, সেখানে কেউ ছিলো না কেবল শব্দহীনতা ও আলোক প্রাচুর্য। আলোর বেগেই এক দ্রুতযান ছুটে এলো। গতিময় দ্বিচক্রযান। মোটা মোটা টায়ারের মোটর বাইক গোঁ গোঁ করে ছুটে যাচ্ছিলো চোখের পলকে। তবু তা একঘেঁয়ে, তবু তার মধ্যে কোন উদ্দীপনা নেই। আমি বা সে কেউই তাকাই নি সে'দিকে। আমাদের পথ ছিলো উত্তরমুখী।

বিকট শব্দের চুম্বক আমাদের টেনে নিলো। প্রকাণ্ড বাজ পড়েছে খালি রাস্তায়। বাতাসের পর্দা ফ্যাড়ফ্যাড় করে চিরে ফেলেছে কেউ। ল্যাতপ্যাত করছে ভাঙা মোটর বাইক। সামনে ছিটকে চলে গেছে অশ্বারোহীর হেলমেটটি। অশ্বারোহী মোটরবাইক থেকে কিছুটা পিছনে। রাস্তার গায়ে এক জ্বালামুখ, আগ্নেয়গিরিসম ফুলকি দেখলাম সেখানে গনগনে ফুটছে। অশ্বারোহীর ছিন্নমুখ, খিন্নচোয়াল, সেখানে কটকট করে তড়পাচ্ছে। আমার ও চালকের প্রবল বমিতে উত্তরমুখী রাস্তাটি ভেসে ভেসে যেতে থাকলো। পদার্থের ভেতর থেকে দুইমুখা রাস্তায় গলগল করে বেরিয়ে আসছে শব্দ ও আলোকরশ্মিময় শক্তি... শক্তি!...

বৃহস্পতিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

মন্তাজ

মাঝে মাঝে এক দুই লাইন কবিতার মতো ভালোবাসার মতো শব্দের পুঞ্জ শান্ত পুকুরে ঘাই মেরে ওঠে, নিস্তরঙ্গে ওঠে ঢেউয়ের স্রোত, ছায়া ছায়া পাড়ে বসে নিজের ভেতরে সেই ঢেউগুলো একটু একটু করে তীরে ভিড়তে থাকে, চুপচাপ দেখি।

এই কবিতার মতো ভালোবাসার মতো পংক্তি কেনই বা জন্মায়, কেনই বা জ্বালায়। সবটুকু গুছিয়েও রাখতে পারি না, আমি বড়োই নিরুপায় অগোছালো। মেঘের মতো সঞ্চয়িতা হতে পারবো না, জেনে গেছি অনেক আগেই, স্কুল পালানোর বেলায় ভয়ে ভয়ে কুড়িয়ে নিয়েছি দুয়েক পশলা বৃষ্টি।

---

নতুন গল্প লিখছি রোজ, রোজ ক্লান্তিহীন নতুন প্রেমে পড়ছি, প্রেমে পড়তে পড়তেই আরো গভীরে ডুবছি। কিছু কিছু ঘটনা ছুঁয়ে যাচ্ছে, কিছু কিছু কথা মনেও থাকছে না। যেন ভেলায় ভেসেছি, নিরন্তর অকূল জলের কোলাহল চারপাশে। যেন তুমুল ব্যস্ত ট্রাফিকে দাঁড়িয়ে আছে, চারপাশ থেকে ছুটে আসছে টেরিফিক ট্রাক, বিবমিষা বাস। ছুটে পালাতে ইচ্ছা করে, অথচ স্থানুর মতোই নিশ্চল হয়ে গতিময়ের প্রেমে মজে গেছি।

এখানে হঠাৎ করেই কিছু বদলে যাবে না। পৃথিবীর সকল আহ্নিক গতির কোন মূল্য এখানে নেই। সবই শান্ত সমাহিত ও ধীর প্রক্রিয়ায় চলবে আরো অনন্তকাল, ঘুরে ফিরে একই সুর গাঁথবে সকলে, একই প্রেমে একে একে মারা যাবো তুমি আমি আমরা। অকস্মাতের অনুপস্থিতিতে আমাদের মাঝে ঘন হয়ে থাকবে ধ্রুবক, নক্ষত্রের আলো, সদ্যই কেউ হারিয়ে যাবে না। বরং অনেক অনেক মায়ায় জড়িয়ে থাকবে আশে পাশে আঁশে পাঁশে

---

ছেলেটি মেয়েটির কথা আর কতো বলবো। তোমরা সবাই জেনে গেছো নানাভাবে। ছেলেটির কোন সহায় ছিলো না, যে বড়ো ছেলেমানুষের মতো ভালোবাসতো। বাস্তবতার ধাক্কা তার গায়েই লাগতো না। সে একদম বোকা বোকা ছিলো। কতো কিছু হতে পারতো সে, বড়ো গায়ক, বড়ো নায়ক, বড়ো ডাক্তার কিংবা ব্যবসায়ী। মেয়েটা তো তেমন ছিলো না, বরং অনেকটাই বিপরীত। মেয়েটা খুব কর্মঠ আর অমিশুক ছিলো। অনেক কাজ করতো, নিজেকে প্রমাণের জন্য, জগতের সাথে যুদ্ধ করতো। ছোট ছোট দুইহাতে শক্ত করে জোয়াল ঠেলে বেড়ে উঠছিলো।

ছেলেটির সাথে মেয়েটির কিছুই মিলছে না। তারপরও তাদের মিলে গেলো। ছেলেটাও বদলে গেলো, মেয়েটাও বদলে গেলো। তারা হুট করে প্রেমে মজে গেলো। কী দেখেছিলো মেয়েটির চোখের তারায়, কী গন্ধ পেয়েছিলো ঘন অবিন্যস্ত চুলের গভীরে, ছেলেটা কাঙালের মতো দু'হাত বাড়িয়ে দিলো। মেয়েটিও কী জাদু দেখেছিলো ছেলেটির হাসিতে, কোথায় দুয়েকটা তারা-খসা আলো চলকে গেছে আকাশের পেয়ালা থেকে। তারা বুঝতেও পারলো না।

সেই বোকা বোকা ছেলেটি, সেই ছোটোখাটো মেয়েটি কোনোদিন এক হবে না। তাদের ভেতরে কোন শিশু জন্মাবে না। তাদের ভেতরের ভালোবাসাটুকু থির জমে থাকবে পদ্মপাতার জল হয়ে। তারপর, অনেক অনেক দিন পর, একদিন পৃথিবীর ঘূর্ণনে তারা ছিটকে ছিটকে হারিয়ে যাবে। তাদের সাথে ঘূর্ণিতে হারাবে চোখের জল, মনের হাহাকার। খালি করে দেয়া কফির টেবিল, গ্লাসের গায়ে দুয়েক ফোঁটা শিশিরও মুছে যাবে। তাদের জন্য আমার মন হু হু করবে, চোখে টলটলে দুয়েক ফোঁটা কুয়াশা জমা হবে। শাদা ক্যানভাস ফেলে আমি একলা হয়ে উঠে যাবো।

মঙ্গলবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

চট্‌-মুহূর্ত

খুব অসামান্য মনে হচ্ছিলো - মুহূর্তটিকে। আমি যে মুহূর্তে তাকে, অর্থাৎ সেই মুহূর্তটিকে যাপন করছি, কিংবা পেরিয়ে যাচ্ছি, ঠিক সে সময়ই বুঝতে পারছি, এই মুহূর্তটি অভাবিত, তুলনাহীন! তাই মুহূর্তটির দিকে আমি তাকিয়ে থাকি। নিষ্পলক, নিনির্মেখ, নিশ্চল। অবশ্য মুহূর্তেরও সময় নেই এক মুহূর্ত। তাই চটজলদি সটকে পড়ে সে চোখের আড়ালে, হারিয়ে যেতে থাকে নিরেট দূরত্বে। মুহূর্তেই বুঝতে পারি আমি পিছিয়ে পড়েছি তার সাথে দৌড়ের রেসে। টগবগিয়ে এগিয়ে গেছে সে - আমি স্থানু।

আগে জানলে খুব সতর্ক থাকতাম, হুট করে এরকম বেখেয়ালে হারাতাম না। একটা ফোরসেপ হাতে, আপনি নিশ্চয়ই দেখতে পেতেন, আমি ঠিক ফার্মগেট কিংবা বাংলামোটর কিংবা নয়াপল্টন কিংবা স্টেডিয়ামের মোড়ে, খুব সতর্ক দাঁড়িয়ে আছি। মুহূর্তটি এসে গেলেই তাকে খপ করে তুলে আনবো সাঁড়াশি-ক্ষিপ্রতায়। তারপর সযতনে রেখে দেয়া যাবে, অনায়াসেই, অবসরকালীন শেলফটিতে। সেখানে অপরাপর স্মৃতি ও ক্রোধের সাথে রোজ ইশকুলে যাবে সে, আর ক্রমাগত আমার অন্যান্য মুহূর্তের সাথে ক্রূর রসিকতা করতে থাকবে...

রবিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

রাস্তাপারিয়া!

প্রথাগত মিশুকটি বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক মাঝরাস্তা বরাবর। হালকা ফুঁসছে। ধিকিধিকি কাঁপছে। বসন্ত এসেছে শুনে বেশ উৎচকিত সচেতন। রূপবতী ও কামুক কিছুটা। দুলছে পেখমের মতো আলো। সবুজ পর্দা। কালোটে রাস্তার পেটের 'পরে নানারঙা গাড়ি।

বাহন মানবের। দরজা আটকে বসে থাকো, কেননা মানুষের প্রকৃতি ছিনতাইপ্রবণ। খুলে নিয়ে যাবে হাড়মাস। জানালা। গলার নেকলেস। খামচে দেবে স্তন। জানালায় কালো পর্দা লাগাও। তুমি মিশুক নও যে ধিকিধিকি কাঁপবে। সে স্বাধীনতা নেই। ঢেকে রাখো।

গুটিবসন্তের মতো টাউনবাস। একেকটি মহা-উপন্যাস। বেঢপ মোটা ও শতপাঠে জীর্ণ, শত-আরোহনে তার প্রবেশপথগুলো কালশিটে কালশিটে। গুটিবসন্তের দাগের মতো কালোটে রাস্তার 'পরে দগদগ করে। ওঠে নামে মানব। কেউ কেউ পা-দানিতে ঝুলে অর্ধেক ভেতরে, অর্ধেক বাইরে। দোলে আর কেঁপে কেঁপে ওঠে।

রাস্তায় খালি পায়ে নামতে হয় না, পা পুড়ে যাবে। সশব্দ চাকা চলে যাবে শরীরের ওপর দিয়ে। মটামট ভেঙে যাবে হাড়গোড়, অস্থি মিশে গুড়ো গুড়ো পাউডার হবে পূর্ণ ননীযুক্ত। তাই ফুটপাতে চলুন - যাই। হাঁটি হকারের লালাভ জিহ্বা পাশ কাটিয়ে। ঘষে দেই যার তার চামড়া। সাথে লেগে যায় অপর-ঘামের স্রোত - নোনাঘ্রাণ মিশমিশে মোটা মানবের কাঁধ ও পিঠ থেকে চলাচল করে।

তবে কেউ কেউ থাকে। অ্যানার্কিস্ট ভিখারি। ভিক্ষা করে হাত বাড়িয়ে কালোটে রাস্তার পরে কালো পর্দার গাড়িতে সবুজ পর্দার খোলা মিশুকে সবুজ গ্রিলের বদ্ধ-নিরাপদ সিএনজিতে গুটিবসন্তের বাসে চেপে বসে তারা দোদুল্যমান মানবের ভেতর সেঁধিয়ে যায় অনায়াসে। অ্যানার্কি এখন সকল যোনিপথ ও গুহ্যদ্বারে চলাচল করছে। সচরাচর আমরা তা টেরও পাই না!

শুক্রবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

কাঁড়া আর আকাঁড়া

ছেলেবেলা ম্যাজিকের মতো ছিল। কতোকিছু জানতাম না। কতোকিছুর কার্যকারণ আর কলকব্জা বুঝতাম না। তাই অজানা ব্যাপারগুলোকে ভেলকিবাজি মনে হতো। স্কুল ছুটি হলে এক আইসক্রিমের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতো, দু’টাকা দিলেই কমলা কমলা পলিথিনে মোড়ানো। একপাশের পলিথিন দাঁতে টেনে ছিঁড়ে ফেলতাম, তারপরে মুখের মধ্যে গলে গলে যেতো কমলার স্বাদ। ঠোঁট আর জিব একদম টকটকে কমলা হয়ে উঠতো। সেই আইসক্রিম বানানোর বিদ্যা অজানা ছিলো, খুব আশ্চর্য হতাম, রোজ এতো এতো আইসক্রিম কোথায় বানায়? কে বানায়? যে বানায়, সে কী জানে আমি এই আইসক্রিম কতো পছন্দ করি? জানলে কতোই না ভালো হতো!
 

তারপর একদিন বছর পাঁচেকের স্কুল-পেরুনো তাগড়া বড়ো ভাই বললো, এগুলো লম্বা লম্বা বরফ বানিয়ে তার ওপর চিনি আর রঙ মিশিয়ে পলিথিনে ভরে বিক্রি করে আর পানি নেয়া হয় মিউনিসিপ্যালিটির কল থেকে ফ্রি ফ্রি – - – শুনে আইসক্রিমগুলো আমার জিবের ওপর থেকে বাষ্প হয়ে চলে গেলো।
 


স্কুল বাসে করে বাসায় ফেরার সময় রোজ একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে স্পিডব্রেকার পড়তো। বাসটা একটু ঝাঁকুনি দিয়ে আবার চলতে শুরু করতো। আমি জানালা দিয়ে বাইরে ফুটপাতের পাশে দোকানপাট দেখতাম। স্পিডব্রেকারের কারণে ওই জায়গার দোকানগুলো নড়ে চড়ে উঠতো আমার চোখে। খুব অবাক হতাম, কোনোদিন পাশের কোন দোকান নড়ে না কেন, এই ভেবে। রাস্তার ওপরে স্পিডব্রেকারকে মনে হতো একটা অচল আঁচিল। কখনই সারবে না এমন দুশ্চিহ্ন। মাঝে মাঝে অনেক স্পিডব্রেকার পেলে মনে হতো হ্যাঞ্চব্যাক অফ নট্‌রড্যামের পিঠে চড়েছি। এবড়ো খেবড়ো কুঁজের ভারে নুয়ে থেবড়ে যাওয়া রাস্তার জন্য মায়া হতো।



একদিন বাস ড্রাইভার মামা বললেন, রাস্তা বানানের সময় কনট্রাকটর ট্যাকা খাইসে, তাই রাস্তাখান বচ্ছর যাইতে না যাইতে এই অবস্তা। ঠিকঠাক বানাইলে মাক্‌খনের লাগান একটা রাস্তা হইতো – - -
আমার ঘোর তখনো ভাঙে নি, তাই ভুল করে জিজ্ঞেস করলাম, স্পিডব্রেকারও কি তাহলে টাকা খাওয়ার কারণে জন্মায়?
 

পানের রসে রক্তজবার মতো কুচি কুচি দাঁত ঝিকিয়ে তিনি বললেন, ‘না গো মামা, ইসপিড বের্কার তো বানাই থোয় আমগো লিগা। আমরা য্যান ইসপিড বাড়াইতে না পারি। রাস্তা বানানের পর ইটা দিয়ে উচা কৈরা দেয় – - -
কুজের মতো, আঁচিলের মতো রাস্তার গা থেকে ধীরে ধীরে সব পচে গলে খসে পড়তে থাকে।
 


এভাবে ক্রমাগত আমার জাদুবিদ্যার ভ্রম ভেঙে যেতে থাকে। আমি এইসব ভাঙনে কষ্ট পাই। নিদারুণ বেদনায় দুঃস্বপ্ন দেখি। তারপর ঘামতে ঘামতে চেঁচিয়ে ঘুম ভেঙে হাতড়ে হাতড়ে জাদুগুলো খুঁজতে থাকি। বিছানার তলে গিয়ে ওগুলো হারিয়ে যায় চুপচাপ। টের পাই না। সদ্য ঘুম ভাঙা কষ্ট নিয়ে ভোর হওয়া দেখি। ভান করতে শুরু করি। ভ্রম ভেঙে গেলেও আমি অনেক কিছু শিখছি। শিখতে শিখতে আমি বেড়ে উঠছি। বুড়ো হয়ে পড়ছি। উঠতে উঠতে আর পড়তে পড়তে আমার ভালো লাগতে থাকে। আমার খারাপ লাগতে থাকে। ভালো লাগা আর খারাপ লাগা নিয়ে আমি একরকম আনকোরা সুখে ডুবে যেতে থাকি।

মঙ্গলবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

সমাবর্তন, বন্ধুর বিয়ে ও অন্যান্য

ডায়েরি লেখার ঝক্কি হলো কিছুদিন পর একটু ঢিলেমিতে পেয়ে বসে আমাকে। সাথে দুই চিমটি একঘেঁয়েমি। আমি যেমন জীবন কাটাই, সেটা খুব একটা ঘটনাবহুল না। তাই বলার মতো ঘটনা কম থাকে। যা করতে পারি, চিন্তাগুলো লিখে রাখা যায়। কিন্তু এই অপগণ্ডের চিন্তা পড়তেও অনেকের কিম্ভুত লাগবে ভেবে সেখানেও বাধ দেই। তাই সেই পুরানো আলাপ, আটপৌরে বয়ান। এই একঘেঁয়েমি কাটানোর সোজা উপায় হলো ঘুরতে বেরিয়ে পড়া। সঙ্গীসাথী ভালুক-বিলাই। কিন্তু এই ভালুক আর বিলাইয়েরাও কাছে পিঠে নাই। চারপাশ আটকে গেছি আটকে গেছি লাগে। ভাবনাগুলো কম্বলের তলে চাপা দিয়ে রাখি। 

এখন ডায়েরি বা জর্নালে তাই পিছু ফিরে দেখা। নিজের ভেতরে আয়না দিয়ে তাকানো। যাকে দেখি, সে অতীতের আমি। আয়না দিয়ে তাকালেও একটু পরের ছবিই দেখি আমরা। মুহূর্তের মাঝে পুরানো হয়ে যাচ্ছি। সেই সাথে শার্ট-প্যান্ট আর চামড়াটাও বদলে যাচ্ছে, কুঁচকে যাচ্ছে। চুলে ঝিলিক লাগছে রুপালি, দেখতে ভালোই লাগে, আবার মাঝে মাঝে বেমক্কা মধ্যবিত্তীয় মৃত্যু চিন্তা পেয়ে বসে বটে!

আগামীকাল সমাবর্তনের মহড়া হবে। সকাল সকাল সেই বুয়েটের মাঠে বোরকার মতো গাউন আর ব্রিটিশ চরিত্রের মতো টুপি পরা লাগবে। পরশু আসল ঘটনা ঘটবে। পাশ করার আড়াই বছর পরে সমাবর্তন পাচ্ছি। একদম অভিনব ব্যাপার। এতো এতো টাকা পায় বুয়েট, অথচ প্রতি বছর কেন এই সমাবর্তন ঘটে না সেটা জাতীয় রহস্য! গাউন আনতে গিয়েও গ্র্যাজুয়েশনের সময়ের মতো ডিফল্টার হলাম। দেখা গেলো, সব এনেছি কিন্তু টুপি আনি নাই। আজকে টের পেলাম, খোঁজ নিয়ে শুনি ওটা আলাদা বিক্রি হচ্ছিলো সামনের গেইটে। আমি তো পিছন দিয়ে গিয়ে কিনে পিছন দিয়েই চলে এসেছি তাই দেখতে পাই নাই। হলের রুমমেটকে বললাম, কিনে রাখো আমার জন্য, মহড়ার আগে নিয়ে নিবো। সকালে জানিয়েছি, বলে গেইটে কেউ নাই, টুপিও নাই। ক্রিকেট ম্যাচের ক্যাপ পরে সমাবর্তন করেন, ইউনিক হবে। আমি ঝাড়ি দিয়ে বললাম লাঞ্চের পরে আসবে মনে হয়, কিনে রাখো মিঞা! অবশেষে বিকালের দিকে পাওয়া গেলো। 

একটু আগে আমার প্রিয় বন্ধুটার বৌভাত খেয়ে আসলাম। অল্পকিছু পুরানো বন্ধুর সাথে দেখা হলো। আলাপ হচ্ছিলো। যথারীতি উষ্ণতর্ক শুরু হলো ডিনারের পর। ভালো খারাপ এথিকস, ধর্মের নৈতিকতা ও সমাজের নৈতিকতা নিয়ে খোঁচাখুঁচি। মজাই লাগছিলো। প্রায় আট-দশ বছর আগে কলেজে থাকতে এগুলো নিয়ে ঘাড় শক্ত করে তর্ক করতাম। তর্ক সরাসরি ঝগড়া ও উত্যপ্ত আলাপে পরিণত হতো। এখন করি না। হাসি হাসি মুখে শুনি, দুয়েকটা কথা বলি। যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করি, উদাহরণ দিলে সেই সীমাবদ্ধ উদাহরণ নিয়েও কথা গড়িয়ে খালে-বিলে চলে যায়। সব শেষে বাসায় ফিরে আসি, যে যার জায়গায়। বন্ধুটা সুখী হোক বিবাহিত জীবনে, এই কামনা করি। নিজের কবে বিয়ে হবে আর তর্কাতর্কি না তুলে ফটাফট ছবি তুলতে পারবো সেটা ভেবে আফসুস খাই। 

কম বয়সে মাথা গরম করলে বড়োরা যেমন স্মিত হাসতো, সেই হাসিটা আজকাল নিজেই দিয়ে ফেললে বুঝি, বড়ো হয়ে গেছি বোধহয়। আবার মাঝে মাঝে ভাঙতে ইচ্ছা করে। চারপাশের সমাজের নোংরামি*, ইতরামি* আর নষ্টামি* দেখি। সবাই খুব কনজারভেটিভ বলে বাংলাদেশের সমাজকে, আমি সেটা খুঁজেই পাই না। সমানে মেলামেশা, অবাধে জীবন, দেখে আশ্বাস পাই যে মানুষ এই দারিদ্র্য আর নিপীড়ন* সহ্য করেও নিজের মতো* থাকতে পারছে। আগের প্রজন্ম যেটা লুকিয়ে করতো, চুরি চুরি করে পালন করতো আর ক্রমাগত পাপবোধে ভুগতো। সমাজ-আরোপিত সেই পাপের ছাপ মুখে পড়ে মুখটাকে বুড়িয়ে দিতো। আমাদের দেশের চল্লিশের গোড়াতেই তাই সবাইকে বুড়োটে লাগতো। এখন তা লাগে না, সবাই কতো ঝকঝকে তকতকে। উপভোগ্যতা মনে হয় মানুষকে সুন্দর করে দেয়। 


***
*সমাজের প্রচলিত অর্থ এগুলো। আমি বা অন্য কেউ এটাকে নিজের মতো করে পাঠ করেন। নিজের চোখে, নিজের জিভে খান।

শনিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১১

ঘোলাপানি...

ফ্যাঁৎ!
  শীত চলে যেতে যেতে আবার ফিরে এলো। দরজা খোলা, আরেকটু অপেক্ষা করলেই বেরিয়ে চলে যেতো, টা-টা দিচ্ছিলো। কিন্তু কী মনে করে আবার ফিরে এলো। এবং একটু অপ্রস্তুত ছিলাম, তাই আবারও ঠাণ্ডা আঁকড়ে ধরলো আমায়। এই ঋতুতে তিন তিন বার সর্দি-কাশিতে জেরবার হলাম। বুঝতেছি না আমার রোগ-প্রতিরোধ কমেছে নাকি নিত্যনতুন ভাইরাসের প্রাচুর্য বেড়েছে। তবে হাঁচতেকাশতেফ্যাঁৎফ্যাঁতাতে আমার কাহিল দশা।

***

ভবিষ্যত!

এরই মাঝে বছর শেষ হয়ে গেলো। এই গত দশক খুব সজাগ কাটিয়েছি। মানে এই দশ বছরে দিন দুনিয়া চিনলাম। দশকের শুরুতে কৈশোর শেষ হচ্ছিলো, আর এখন সামনে তিরিশ হাতছানি দিয়ে হা করে আছে। তিরিশ ছুঁয়ে ফেললে মনে হয় আরো একটু বুড়ো হয়ে যাবার আশঙ্কা আছে। ধীরে ধীরে নখদন্তশ্বাপদ থেকে ভোঁতা হতে শুরু করবো। পুঁচকেদের হিংসা করতে শুরু করবো। খিটখিটে হয়ে যাবো জীবন-যাপনের থাবড়া খেয়ে খেয়ে। আজ যা কিছু আমার নতুন, আমার পরাণ, সেগুলো অতিব্যবহৃত ছোবড়ায় পরিণত হবে। তিরিশ তাই মনে ত্রাসের সৃষ্টি করছে। ভাবছি তিরিশের পর বয়েস গোনা উল্টে দিবো। পরের বছর উনত্রিশ হবো, তার পরের বছর আটাশ, ফের ঘুরপাক মধ্যগগণে! সবাই মানবে না, তাতে কী, আমি কি কাউরে ব'লে ক'য়ে পৃথিবীতে আসছি, না কারো কথায় গুডবাই জানাবো?

***
 
সেলসমাচার!

খালি বিদায়ের কথা বলতেছি। এখন একটু আগমনীবাতচিত করি। গত পরশু নতুন সেলফোন কিনতে গেলাম। বাজারে সবসময় থরে থরে সেট সাজানো দেখি, ঠাটবাট দেখে ভেতো বাঙালি, তাহাদিগকে সম্মান করি। শীতল ধাতব শরীরে চকমকে সেটগুলো আমার কুর্নিশে হালকা মাথা নাড়াতো। সেদিন কিনতে যাবার আগে ভাবলাম খালি বাইরের রূপে ভুলিবো না, ভিতরে কি আছে জেনে যাই। মানুষের ভরসা নাই, তাই ইন্টারনেটে বসে ঘাঁটলাম। আমার ছোটবোন বয়সে ছোট আর মননে বড়ো হওয়ার কারণে এই ব্যাপারে মোটামুটি ডিগ্রিধারী। সেলফোন নিয়ে কয়েকটা সাইট ঘুরে-টুরে বুঝলাম কোনো সেট হাতে নিয়ে "এই ফোনে কী কী আছে?" জিজ্ঞাসা করার চাইতে "এই ফোনে কোন ফিচারটা নাই?" প্রশ্নটা সহজ। দোকানির বলতে কম সময় লাগবে। আমার ভোঁতা-হতে-চলা মগজে যা বুঝ আসলো, এখন সেলফোন সেট একটা ছোটখাটো কম্পিউটার। ওএস আছে - সিম্বিয়ান, উইন্ডোজ, অ্যান্ড্রয়েড। এগুলোর মাঝে শেষেরটা সবচে ভালু মনে হয়। তারপরে আছে লুক-এর ব্যাপার, এখন টাচস্ক্রিনের যুগ। ওএস কতো র‍্যামে চলছে এটাও জরুরি। এটা দিয়ে টাচস্ক্রিনের দ্রুততাও হিসাব-যাচাই করে নিতে হবে। তারপরে আসে ওয়াই-ফাই এর হিসাব। ওয়াইফ হইলো না এখনু তাই ওয়াই-ফাই-ই সই। এটা না হলে চলছে না। এখন এই ওএস আর ওয়াই-ফাই আসলেই সেটের দাম আমার বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে!
এতোসব ঘোরাঘুরির মধ্যে মনে হচ্ছিলো নতুন যারা এখন বিশের কোঠা পেরুচ্ছে, তারা এই নতুন প্রযুক্তিগুলোতে বেশ মানিয়ে নিচ্ছে। এগুলো ব্যবহার করতে করতেই তারা হয়তো নতুন কিছু তৈরি করবে। কেউ কেউ মাথাপাগল জিনিয়াস নতুন ওএস বানিয়ে ফেলবে। আশাবাদী হইলে দিন ভালো কাটে আমার।

***

বইমেলা যাও!

বইমেলা আসতেছে সামনেই, আর দিন আটেক বাকি। প্রতি বইমেলার মাসটা আমার কাছে খুব আনন্দের। কতো কতো নতুন-পুরাতন বই, সেই বাংলা একাডেমীর মাঠ, বিল্ডিংয়ের দোতলার বারান্দা, স্টলের সামনে মানুষের ভীড়! আর পরিচিত আধাপরিচিত মানুষদের সাথে আড্ডা আর সাথে চা। আহ! সারা বছরের সব ঝুটঝামেলা আর কলুষ এক মাসে ধুয়ে যায়। আর বছর দুই ধরে ব্লগারদের সাথে আড্ডা বাড়ছে বইমেলাতে। এক কোণ ফাঁকা পেলেই তিন চার জন মিলে দিকবিদিক ভুলে সন্ধ্যা-রাত অবধি খোশগল্প চলে। রাত জমাট হইলে শেষ চা খেয়ে বাসায় ফিরি। আর শেষ দশ দিনে বেশি বই কিনি, লিস্ট করা শুরু করছি মনে মনে। গতবারের কেনা কিছু কিছু বই এখনো পড়া শেষ হয় নি, সেগুলোও তাক থেকে নামালাম পরশু। এই ধুমে পড়ে ফেলতে হবে!

***

তারপর!

মাঝে মাঝে কারো কারো কথায় হার্ট হই। ভার্চুয়াল জগতে কতো মানুষকে দেখলাম, কতো নটীর নাটক। এইসব দেখে এবং ঠেকে শিখেছি যে টেক্সটকে বেশি ভ্যালু দিতে নাই। ছোটবেলায় শিখেছিলাম ছাপার অক্ষরে ভুল থাকে না। পাঠ্যবইয়ে অঙ্কের ভুল উত্তর লেখা থাকলে সেটা মিলাতে গিয়ে মাথার চুলও ছিঁড়েছি কম না। সেই বেদবাক্যতুল্য অক্ষরকে ভালোবাসতেবাসতে আর সম্মান করতে করতে মজ্জাগত হয়ে গেছিলো। এখন ব্লগে যোগাযোগের অক্ষরগুলোকে তাই আলাদা মূল্যায়ন করা শিখলাম। বুঝে নিয়েছি যে মানুষ সামনাসামনি যেমন সামাজিক ভড়ং, ভণ্ডামি ও দ্বিমুখিতা দেখায়, ঠিক সেরকমই এই ভার্চুয়াল-পীঠ। ভালো খারাপ তকমা দেই না, এগুলো ঠিক যেমন, সেভাবে নেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করি। তারপরেও ভুলভাল হয়। মনের কাজ প্রজেকশন, নিজে নিজে ধইরা নেয় অনেক কিছু। স্টেরিওটাইপিং করে, গোষ্ঠিবাদ করে, ভুল বুইঝা চুপ যায়, ঠিক বুঝলে তেড়ে যায়। এইসব ভ্রান্ত-আচরণের চিপায় পড়ে (পড়ুন, পড়তে) ভালো লাগে না। তারপর মানায় নিতে হয়।
আজকে হঠাৎ মনে হলো, আকাশ ভাইয়ের সিনেস্থেশিয়া নিয়ে দুর্দান্ত পোস্টটা পড়তে পড়তে, যদি আমাদের মুখের অভিব্যক্তিগুলো টেক্সটের মধ্যে দিয়ে বুঝা যাইতো, তাইলে যেমন অনেকের গোমর ফাঁস হয়ে যেতো, তেমনি অনেকের কথার অবমূল্যায়নও বন্ধ হইতো। আমি বুড়োটে হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু হয়তো সদ্য-বিশে পা রাখা কেউ এরকম একটা কিছু আবিষ্কার করেই ফেলবে। তখন এই ব্লগ যারা পড়বে তারা কেমন মজা পাবে ভেবে একটু মুচকি মুচকি হাসলাম!

***

রবিবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১১

হঠাৎই দুইটা লেখা...

(একদিন সবকিছু গল্প হয়ে যায় বলেই আমার চারপাশে গল্প জমে থাকে। চারপাশে গল্পের চরিত্রেরা ঘুরে বেড়ায়, খেলে বেড়ায়। তাদের অনুনয় বিনয়ের ভার আমার বড়ো ভারি লাগে!)


***
দৃশ্যের আগে পরে
 
সন্ধ্যা ধীরে ধীরে নেমে আসে না, অন্ধকার দ্রুত জমাট বাঁধে। সেই জটাজাল কাটাতে গাড়ির হেডলাইট জ্বলে ওঠে নিঃশব্দে। আলো চিরে দেয় ভরাট আঁধারের পেট আর ফুটপাতের পাশে দোকানগুলোতেও জোরে জোরে জ্বলে ওঠে তারাবাতি। অধুনা তারাবাতিতেও তীব্র ঝলক। ঝল্‌কে ঝল্‌কে ওঠে আলো, লাল। নীল। হলুদ। ভেসে যেতে থাকে ছিন্নমূল হকারের বসাতি। হকার এড়িয়ে হনহনিয়ে চলা টবের মতো মানুষ। টবগুলো থপথপিয়ে চলে ফুটপাতে - ফুটপাত থকথক করে। সেখানে সন্ধ্যার পর অনেকটা রাত নেমে এলে একটা মেয়ে এলোমেলো হাঁটে। চুল কাঁধ ছাপিয়ে একটু দূর নেমে এলোমেলো, হাঁটার কারণে আরো এলোমেলো হতে থাকে। পরনের পোশাকে খেয়াল নেই তার, দৃষ্টি উদভ্রান্ত, উন্মুখ। ফুটপাতের খোপ খোপ ট্রাপিজিয়াম পাথরে সে একটু হড়কে হড়কে হাঁটে। 
 
আমরা কেবল দৃশ্য দেখি, আর দৃশ্যের আগে পরে জুড়ে দেই অন্যান্য দৃশ্য। ভেবে নেই আপাত অনুমান। অনুবাদ করি পরিচলনের ইতিহাস। মেয়েটির হেঁটে চলে যাওয়ার দৃশ্যে আমরা তার সঙ্গী খুঁজি, একা এতো রাতে মানুষের ভীড়ে কেন নেমেছে মেয়েটি? কোথায় যাচ্ছে সে? উত্তর কার কার জানা আছে? আমার তো লিখে দেওয়ার কথা, মেয়েটির যাত্রা ও গন্তব্যের ইতিহাস। আমি জানি সে কোনো এক বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। আবার কোনো এক বাড়িতে পৌঁছাতে চাইছে। এই তথ্যে আমাদের কোনো লাভ হলো না। জানা গেলো না মেয়েটি ঠিক কেমন, কী ঘটছে তার জীবনে।

ঠিক তবে, তার চোখের মাঝে দোকানের ওই আলোগুলো পিছলে যাচ্ছে। পিছলে যাচ্ছে শরীরেও। চারপাশে ভীড় করা টবের মতো মানুষ। টবের সাথে ধাক্কা, হেলে যাওয়া টব, পড়ো পড়ো টব, সচকিত টব, বেখেয়াল টব, বেলেল্লা টব। টবগুলোকে হঠাৎই মেয়েটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলতে চায়। একটা টব এসে তাকে চেপে ধরে।

তখন পাশে তীব্র পেটচেরা আলো মুখে গাড়িটা এসে থাকে। টায়ার চমকে ওঠে, সেই সাথে টবগুলোও। সরে ছিটকে যায় এদিক-সেদিক। গাড়ির সামনের দরজা খটাশ খুলে দিয়ে ভেতর থেকে মেয়েটাকে ডাকে একজন। ছেলেটার খোঁচা খোঁচা চুল - হাত কাঁপছে তিরতির, স্টিয়ারিঙে। খসখসে গলায় সে মেয়েটাকে ডাকে, "উঠে আসো", মেয়েটা আরো দু'পা এগিয়ে মুখ ফিরিয়ে থাকে।

এই দৃশ্যের পরে দুই যুগ কেটে গেলে, চারপাশের আলো একটু একটু কমে আসবে। তারপর মেয়েটি গাড়িতে উঠে বসবে। এবং দরজা বন্ধ করে দেবে। তারপর তারা সাঁ করে চলে যাবে। সেই বাতাসে মেয়েটার অবিন্যস্ত কাঁধ ছাপানো চুল আর এলোমেলো হবে না। ছেলেটারও তিরতির হাতে স্টিয়ারিং কাঁপবে না। স্থির ভ্রমণের পর তারা নিশ্চয়ই সুখীই হবে। নাকি?

***


যা ঘটে গেছে
 
মাঝে মাঝে এই শহরে আমি বন্ধুহীন হয়ে পড়ি
দু'কোটি মানুষ আর সাথে তেরো হাজার সিএনজি
এর মাঝে আমার কোন বন্ধু নাই, নাই। নাই এফেনেফ
কম রেটে কথা বলার সাগ্রহ আবেদনময়ী অপারেটর
আমার বন্ধুহীনতায় ক্রমেই দেউলিয়া হয়, আর দেখা
যায় সে'সব মানুষ ও সিএনজির সাথে বেশ ঢলাঢলি করে।
***