শুক্রবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১১

একটি বিশেষ সংবিধিবদ্ধ দ্রষ্টব্য

এই গ্রহতে আমাদের অস্তিত্ব যেন অযুত নক্ষত্রচূর্ণের নিরুদ্দেশ উড়ে বেড়ানোর মতো, যেন অযথা অহেতুক। আমাদের ধারণা আমাদের জন্ম, মৃত্যু, ভালোবাসা, প্রেম, যৌনতা, হিংসা, দ্বেষ, বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোনো না কোনো মানে আছে। আছে গূঢ়তর অর্থ, নিজের এবং অপরাপর মানুষের জীবনে। অথচ এ সবই দীর্ঘশ্বাসের টুকরোর সাথে হারিয়ে যাবে মহাশূন্যে। পৃথিবীর ঘূর্ণনের মত, নভোবিশ্বের ধূলিঝড়ের মত এক লহমায় নিশ্চিহ্ন হবে সকল আয়োজন, পরমুহূর্তে খোঁজ করলে কেউই বুঝতেই পারবে না কোনো রঙের হাট কিংবা কোনো মনের মেলা কোথাও বর্তমান ছিল। অনিবার্য হলেও এমন হারানোর নিয়ম নেই - নেই উদার-আগ্রহ কারো। আমাদের হঠাৎ ইচ্ছা করতে পারে সব ছেড়েছুড়ে চলে যাই। ইচ্ছা করতে পারে এই অনিশ্চিত অর্থহীন ক্ষণিক জীবনের কষ্ট মিটিয়ে ফেলি। যা কিছু সঞ্চয়, যা কিছু অপচয় এগুলো ঝেড়ে ফেলি, হিসাব চুকিয়ে দেই।

আমরা জানি যে স্থাবর সম্পত্তির অভিমান নেই। এভাবে সব ত্যাগ করলে শুধু জমানো স্মৃতিই দিশেহারা হবে, ধীরে ধীরে মৃয়মাণ রোদ ঘুমিয়ে যাবে অক্ষিকোটরে। নিশ্চুপ নির্বাক হয়ে যাবে শোরগোল। হয়তো পাততাড়ি গুটিয়ে নেবে প্রকৃতিও; প্রাণ যেখানে নেই, সেখানে কীসের বসত, কীসের মায়া? তখন সেই নিরাক নিস্তব্ধ এলাকায় কোন অনুভব সৃষ্টি হতে পারে? নৈঃশব্দের জন্ম হয় শব্দ ফুরোলে, অন্ধকার জমে জমে থিতু হয় আলোর অভাবে। তেমনই কি অপ্রাকৃতিক কোন অনুভব সৃষ্টি হয় প্রাণহীন ভূমিতে? সেই অভাবনীয় সৃষ্টি কতোটা সুন্দর, কতোটা কুৎসিত, তা আমাদের চিন্তাতেও আসে না। কিন্তু নৈঃশব্দ যেমন সত্য, অন্ধকার যেমন অলঙ্ঘনীয়, তেমনি এই অপ্রকৃতিও প্রাকৃতিক। এই অনুভবের অস্তিত্ব জানান দেয় সন্তর্পণে, খুব সচেতন খেয়াল না থাকলে তা টের পাওয়া দুষ্কর!

নিভু নিভু হয়ে আসছে মোমবাতির আলো। শাদা হলুদাভ একাকী মোমবাতিটার দিকে থির চোখে তাকিয়ে আছে সে। তার চোখের তারায় আগুনের প্রকম্প শিখাটি প্রতিফলিত হচ্ছে। স্ফটিকের মত স্বচ্ছ টলটলে চোখ, উত্তল ভূমিতে পিছলে যাচ্ছে রশ্মিকণা। মোমবাতিটি জানে না, তার আলোর কণায় খুব অল্প জায়গাই আলোকিত হচ্ছে। আর ক্রমশ রশ্মির তেজ কমে আসছে, তার শরীরে আর জমাট মোম বেশি বাকি নেই। সলতের প্রান্তে যে নীলাভ-হলুদ শিখা, সহসাই তা ঝলসে উঠলো যেন। অন্তত তাকিয়ে থাকা চোখ দুটোয় আমরা স্পষ্ট দেখতে পেলাম - নিষ্পলক একাগ্রতায় কোনো কাঁপন নেই, ওই মোমের শিখা আর ওই স্ফটিকস্বচ্ছ দৃষ্টির মাঝে যেন এক টানটান লড়াই! যেহেতু তার দৃষ্টি কাঁপছে না, তাই মোম-শিখাটাই যে হেরে যাচ্ছে, এ সিদ্ধান্তে সহজেই পৌঁছানো যায়। কিন্তু হেরে যাবার আগেও যোদ্ধার শিরায় রক্ত নাচে, খরস্রোতার তোড়ে যে শক্তি, তেমনই তোড়ে জেগে ওঠে বীরক্রম। জেগে ওঠে শেষ আঘাতের সঘন শ্লেষ, মনে এসে ভর করে অসুরিক জিঘাংসা। তাই সে ঝলসে ওঠে, ক্ষেপে ওঠে। মনে হয় সে এক ঝটকায় উড়িয়ে দিতে চাইছে প্রতিপক্ষকে। প্রতিপক্ষ সে, যার চোখ স্ফটিকের মত স্বচ্ছ, তার চোখের তারায় ঝিলমিল করছে মোমালো, সে প্রায় জিতে যাচ্ছিল। অথচ খুব অবহেলায় সে চোখ সরিয়ে নিল। মোমের আলোটুকু নিভে যাবার আগেই আলতো পলক ফেলে সে অন্যদিকে তাকালো। যেন এই যুদ্ধে তার কোনো মন নেই, যেন এ কেবল মিছে খেলা, নিরর্থক ভ্রান্তি! তার এই নিস্পৃহতায় মোমের আলোটুকু বিস্মিত হয়, কিছুটা আহতও হয় এমন অনাগ্রহে। যে প্রাণপণ সংগ্রামে তার শরীর ক্ষয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে, সেটা প্রতিপক্ষের কাছে কিছুই না? এতোটাই তুচ্ছ তার লড়াই, এতোটাই অনর্থক তার অস্তিত্ব?

চোখের ফিরিয়ে নেয়া দৃষ্টির রেখা এখন মোমালোর বলয় থেকে অনেক দূরে, সুদূরতম ঘরের দিকে ফিরে আছে। চোখটি অদ্ভুত, অপ্রাকৃতিক তার আচরণ। প্রায়ই সে নিষ্পলক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সাধারণত চোখগুলো যেমন হয়, যেভাবে তারা যোগাযোগ করে, যেভাবে বার্তাবহন করে, অনুভুতিলাভ করে, কাঁদে, কিংবা রাগে, এই চোখ দুটো তেমন নয়। এর চরিত্রে কোন অস্থিরতা নেই। আদিম ও অকৃত্রিম স্থৈর্যে সে তাকিয়ে থাকছে। এখন যেমন মোমের আলোর প্রতি তার আর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, এক অবিচলতায় তার দৃষ্টি চলে গেছে একটি ঘরের দিকে। ঘরটি দক্ষিণে, পানির ওপর ভাসছে। স্রোতের টানে ঘরের খড়ের চাল কেঁপে কেঁপে ওঠে। যে ঢেউগুলোর ওপর ঘরটি ভাসছে, সেগুলো অপত্যস্নেহে দুই হাতে যেন তাকে ধরে আছে। ছোট্ট শিশুকে যেমন কোলে তুলে আলতো দোলায় দোল দেয় মা, ঠিক তেমনি করে লহরের শীর্ষে দুলছে ঘর। ঘরের মেঝে কাদা মাটি পানিস্পর্শে আঠালো প্যাচপ্যাচে। গলে গলে মিশে যাচ্ছে নোনা পানিতে। মোমের মতই এই ঘরের জীবন স্বল্পায়ু। প্রবল পরাক্রমী নোনাজল তাকে খেয়ে ফেলবে। চোখ দুটো যেদিকে তাকায়, খালি ক্ষয়ে যাওয়া জীবন ও জড়ের প্রাচীর দেখে। এই প্রাচীর তার চারপাশে বৃত্তাকারে ঘিরে থাকে। গোল অক্ষিগোলক ঘুরিয়ে এটুকুই দেখা যায়, উর্ধ্ব-অধঃ-ঈশান-নৈঋত দশ দশ দিকে সন্তর্পণে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে চোখ। পাপড়ি খুলে আসে এমন মূলভেদী ঘূর্ণির টানে। ছেঁড়া পরিত্যক্ত ইলাস্টিকের মত পড়ে থাকে নিচে।

এতোটা নিচে চোখের দৃষ্টি সরে না, তাই সে বিচ্ছিন্ন পাঁপড়ির শোক ভুলে যায়। যে অংশ গত হবার চেতনা নেই, সে অংশ কখনো ছিল না। সে অংশের বিভিন্ন বিকৃতি ও আকৃতি পাওয়া যায়, কারণ তার সঠিক আকার সে জানেই না। অধুনাবিস্মৃত এই পাঁপড়ির অনৈস্তিত্বে বিশ্বাস করতে করতে চোখ ক্রমাগত ঘুরতেই থাকে। তার ত্বরণে মোমের শরীরের লুপ্তি চকিতেই বর্তমান; তার ঘূর্ণিবেগের ঝটকায় অতিকায় ঘরটি পানিমধ্যে লীন। পারিপার্শ্ব-ক্ষয়ে অবিচল নিস্পৃহতায় চোখ ঘুরছে। এই গতির উদ্দেশ্য নেই। এই গতির কারণ নেই। এই গতি ধীরে ধীরে ক্রমশ বেড়েছে, নিষ্কারণ তার প্রসার। তাই অগোচরে অক্ষিগতির রোধ করে নি সে কিংবা অন্য কেউ! বিশ্ব চরাচরের সকল বস্তু ও পরমশূন্যতা একদিন বিলুপ্ত হয়। চরাচর নামক কোন কিছুর অস্তিত্বই আর থাকে না। চোখের তারায় তখন এক অপ্রাকৃতিক নৃত্য স্থাপিত হয় নৃশংসসুন্দর ছন্দে!
এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল