রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

পাপবোধ সংক্রান্ত টুকিটাকি বা হেনো তেনো


আমার পাপবোধের অনুভূতিটা বেশ টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আসলে চারপাশের মানুষগুলোর সাথে দিন দিন সম্পৃক্ততা কমে যাবার ফলেই মনে হয় এমন চিন্তার মোড় ঘুরে যাওয়ার সূত্রপাত।


পাপবোধ খুব সম্ভব একটা আপাত আরোপিত অনুভূতি। একটা শিশু কখনোই এই চেতনার অধিকারী হয়ে জন্মায় না। ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে ওঠার সময়টাতে, রঙ-রূপ-বর্ণ-শব্দগুলো চিনে চিনে চারপাশকে বোঝার সময়টাতে কোন এক অদৃশ্য প্রক্রিয়ায় এই অনুভূতি তার ত্বকে অভিস্রবণের মতো ঢুকে যেতে থাকে। মনে হয় সে নিজেও টের পায় না সে কখন পাপী হতে শুরু করে- কিংবা বলা যায় নিজেকে কখন পাপী ভাবতে শুরু করে।


একটি শিশু বড়ো হয়ে উঠতে উঠতে নিজেকে একটা সময় দোষী ভাবছে এই চিন্তাটা পীড়াদায়ক। তার স্বাধীনতার পরিপন্থীও বটে। কেননা মূলত শিশুদের দ্বারা আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হই না। নিতান্ত দুরন্ত শিশুও তুচ্ছ বা মূল্যবান তৈজস ভেঙে ফেলা ছাড়া তেমন কোনও গুরুতর অপরাধ করে না। অথচ সেই সময়টায় তাকে বেশ বিরূপতা পেতে হয়, বাবা-মা- বড়োদের কাছ থেকে। শিখে নিতে হয় উচিত-অনুচিতের লিস্টি। মা-বাবা শিখিয়ে দিতে থাকেন, চলা-বসা-কথা-হাঁটা-থামা। অপরাধী সত্ত্বাটির হয়তো তখনই জন্ম ঘটে।


উচ্চারণে যেসব শব্দেরা দূষিত, বা পঙ্কিল সেগুলো আমরা বড়োরা খুব সযত্নে পরিহার করতে চেষ্টা করি একটা শিশুর সামনে। কেননা একটা সময়ে সে আমাদের সামনে কুৎসিত সেই শব্দ বা ভঙ্গিগুলো শিখে ফেলবে এটা জানার পরেও আমরা সেগুলো যতটা সম্ভব আড়াল করতে চাই। কিন্তু এতে করে যখন তারা শব্দগুলো শেষমেশ শিখেই যায়, তখন সেগুলোকে পরিচয়পত্রসহই শিখে নেয়। এমনকি অভিধানেও আমরা তাদের সেভাবেই চিহ্নিত করে রেখেছি।


এত গেল শব্দেরা, আশেপাশের দৃশ্যাবলিও যথেষ্ট কুৎসিত আমাদের এই জনপদে। বিরাট আকাশ-সংস্কৃতি না হয় ছেড়ে দিলাম, সচেতন অভিভাবকেরা হয়তো বেছে বেছে কাদা-ময়লা এড়িয়ে চলেন। কিন্তু রাস্তাঘাটে, বাজারে, দপ্তরে আমরা ক্রমশই অশ্লীল হয়ে উঠছি দিনে দিনে। ইদানীং কিছু পোশাকে নগ্নতা দারুন প্রকাশ পায়। গোপন রতিতে হয়তো তা দারুন কামনাজড়িত সুখের প্রভাবক হবে, হয়তো পুরুষ বা নারীটির সঙ্গীর দ্বারা প্রশংসিতও। কিন্তু প্রকাশ্যে আমরা চোখ দিয়ে চেটে-পুটে খেয়ে নিতে নিতে ভুলে যাই, পাশেই কোমর-উচ্চতার ছেলেটি বা মেয়েটিও দুচোখে গিলছে। তার দুচোখে নেমে নেমে পড়তে থাকা যুবকের প্যান্ট, আর উঠে উঠে যেতে থাকা যুবতীর টপস্‌ খুব সহজেই জানলা খুলে হাট করে তীব্র রোদ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সাথে করে ব্রীড়াজনিত সঙ্কোচটুকুও ঝরে পড়ছে।


আমরা এগোচ্ছি সামনে, ধীরে ধীরে আমাদের পদক্ষেপের দ্রুততা বাড়ছে। সেক্ষেত্রে বাইরের জগতের আলো প্রবেশ করার সময়ে অতিবেগুনিরশ্মির মতো কিছু রঙ আমাদের বালক-চোখদের খুব দ্রুতই বয়স্ক করে দিচ্ছে। আমি জানি এটা ঠেকানোর কোনও উপায় নেই। ফ্যাশন নামক বিদঘুটে অসংজ্ঞায়িত শব্দটির ফাঁদে পড়ে অশ্লীলতা ক্রমশই শ্লীল হয়ে যায়।


বালক থেকে বড়ো হয়ে উঠলেই অনেকটাই আগল খুলে যায়। অনেক আপাত রহস্যেরা সহজ-কঠিন সত্যরূপে প্রকাশ পায়। শরীর সশব্দ হয়। সেসময়ে ভাঙা-গড়ার খেলা খেলতে খেলতে একেকজনের নিজস্ব পাপবোধ গড়ে উঠে। এখানে ধর্ম হয়ত একটা বিরাট সর্বগ্রাসী ভূমিকা পালন করে। স্কুলের নতুন-বদলি-হয়ে-আসা হেডমাস্টারের মতন খুব সীমা-নির্ধারিত হয় সবকিছুর। ভালো-মন্দকে বার্লিন দেয়াল তুলে আলাদা করে দেয়া হয়। তবে আগের এই একচেটিয়া অধিকারটুকু ধর্ম দিন দিন হারাচ্ছে। সেটা কতটা হতাশার বা কতটা আশার তার তুলনা করা সম্ভব না। তবে তার মসনদে নতুন যে বসবে তাকে ভালভাবে চিনে নেয়াটা জরুরি। আমরা যখন এক স্বৈরশাসককে সরিয়ে আরেক স্বৈরশাসক টেনে আনি- তখন অনেকসময় বেশ দেরিতে টের পাই, আগেরজনই ভালো ছিলো!


ধর্ম খুব প্রয়োজনীয় রূপ ছেড়ে এই ঢাকা শহরের ইট-কাঠের চাপে পড়ে জুম্মাবার আর রোজার মাসে আটকে যাচ্ছে। অন্য ধর্মগুলোর পালন অতো প্রবল নাই। গুরুজনেরা বলেন, আগে সেগুলোর অনেক উচ্ছ্বাস এখন গলাবন্ধ কোটের মতন গরমে আটকে হাঁসফাঁস করছে। আর ইসলাম দারুন জোশে ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যক্তির পালনের মাঝে ধর্মই ঠিক করে দেয় পাপবোধ কেমন হবে। দিনের পর দিন নামাজ ক্বাযা করে আমাদের ত্বকে যে বোধ আঁচড় কাটে না, সেই বোধই সাঁড়াশি আক্রমণ চালায় একদিন রোজা না রাখলেই (যদিও দুটোর মূল্যমান ধর্মমতে সমান)! এখন আমাদের ক্ষয়িষ্ণু প্রজন্ম সেটাও মানছি না। সমস্ত মাল্টিমিডিয়ার তোড়ে নিবিড় ধর্মপালন বইয়ে চাপা-দেয়া ফুলের পাঁপড়ি হয়ে গেছে। সেখানে ধর্মের সামাজিক উচ্চারণ প্রবল উচ্চকিত।


এখানে তখন মনে হয় কোন বোধে তাহলে আজ আমরা নিজকে যাচাই করি? কেউ কেউ হয়ত মধ্যবিত্ত মূল্যবোধগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরছে। বাবা-মায়েরা কুইনাইন-গোলানো গ্লাসে করে তা সন্তানকে গিলিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু তার মধ্যেও এর রূপ পরিবর্তিত হয়। মানুষ থেকে মানুষে যাবার সময়ে বোধেরা বদলে যায়। নজরুল-রবীন্দ্র-গানেদের রিমিক্সের মতোই! বিলাসিতার মাত্রা আর অপচয়ের পরিসীমা নতুন করে নির্ধারিত হয়। টাকার গন্ধ অনেকটা আফিমের মতো রক্তে প্রবেশ করলে আমরা তাতে বিমোহিত আচ্ছন্ন হতে থাকি আর ক্রমশ ভুলে যাইঃ আমাদের প্রপিতামহেরাও দুপুরে খররোদে ঝলসে যেতে যেতে লাঙলে কাঁধ জুড়ে ঠেলে ঠেলে নীরস মাটি খুঁড়ে সোনা ফলাতেন। তার ত্বকের কালোরঙা জিন আমার অসূর্যম্পশ্যা মাতামহী-মাতার শরীর ঘুরে আমার মাঝে আসতে আসতে চাপা পড়ে গেছে। দুধ-সাদা ত্বকে ঘামেরা জমতেও পারেনা। তাই টিনটেড গ্লাসের ওইপাশে দাঁড়ানো বৃদ্ধ হাত বাড়ালে তাকে আমরা চিনতেও পারি না।


এভাবে ভাবনাটা খুবই একপেশে মনে হয়। একটা এক্সট্রিম-কে প্রকাশ করতে মনে হয় আরেকটা এক্সট্রিম-কে টেনে আনতেই হয়। রুপোর টাকার ঝনঝনানিতে কানে তালা লেগে যেতে যেতে আমরা পাপবোধ কাটিয়ে উঠতে থাকি। এই জনপদের অনেক নিচে, অনেক গভীরে আমাদের প্রপিতামহেরা হাড়-গোড়ে শুয়ে থাকতে থাকতে কেবলই ক্ষয়ে যেতে থাকেন!




***

বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

শ্লেটমুখী ও অন্যান্য

শ্লেটমুখী
অরীয় বেণিদ্বয়ের শামুক-দোলন, সরে
এপাশে ওপাশে প্রতিসম বিস্তার, ভেঙে
বেণিদ্বয় দুলে ওঠে, উঠতেই থাকে,
ঘনোপর্দায় ছায়াগুলো শরীর ঢাকছে, তাই
বেণিদ্বয় সচকিতে
শ্লেটে লেখা এলোমেলো আঁকিবুকি মুছে দেয়।






ঋতুযাপন
মাতৃকোষে জলীয় কিছু ভালোবাসা জমে থাকতো
আসাযাওয়া-জীবন জুড়ে মেলে থাকা
ব্যাপিত শরৎ-
গুমোট ভাদ্রে ভিজে ফেরা ক্যাম্বিস-ব্যাগ,
কিংবা হলদে হারানো ছাতাটি,
সকলেই জমে জমে অপত্য বনে যায়।






অনন্যার আঁচল
নিহত হবার আগে অনন্যা যা দেখছিলো
গ্লু গড়িয়ে সেছবিটা ঘোলা হয়ে গেলে
অনন্যার আঁচল মুক্ত হতে পারে।
জানালার খোলা রোদ এসে শীতলার্ত-
অনন্যাকে ছুঁয়ে বেহাগী চর বসে থাকবে।






রোডোডেনড্রন
ইনসেটের প্রয়োজন ছবিজুড়ে তোমাকে
উৎক্ষিপ্ত করে বিশেষ করার জন্যে-
সেখানে ভূমি-জমিনে সার সার মুখ-চোয়াল-চুল
ক্ষুদ্ধ চোখ আর ময়লা শার্টেরা
সহসাই রোদগন্ধী রোডোডেনড্রন হয়ে যায়।
সাদা কাগজে তখন সহবাসী মৌতাত!






কাঁটাগুচ্ছ ও বিড়াল
বিড়ালটি শুঁকে শুঁকে ঠিকই কাঁটাগুচ্ছের
রসনা টেনে নেবে-
আমি কিঞ্চিত উদগ্রীব, তার চলনোদ্যত
নখ, থাবা, রোম জুড়ে কেমন
অপ্রস্তুত বিকশিত ক্ষুধা!

শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

জোছনা, সেইরাতে তবুও পৌষ মেখেছিলো


চাঁদের সাথে আমার শত্রুতা বহুদিনের
জি থেকে এফ-শার্পে গেলেই
কুহকিনী নেমে এসে ঘাড়ে চেপে বসে,
আঙুল কেঁপে উঠে চোখে ঝাপসা হয় সুর।


ছায়া-ইউক্যালিপ্টাস তবু ফিরে আসবেই
আমি ধুলো ঝেড়ে চারকোল তুলে নিই
তুমি কোলে মাথা রেখে
চুলের নদী বিছিয়ে শুয়ে পড়ো।


ঘাসেদের খুঁজে পেলে দেখি
শরীরপ্রান্তে সুতো ছেড়ে তারাও অবশেষে
খুব কোমল ঘুমে ডুবে আছে-
অবসাদী ঘ্রাণে, মাতে আমার উঠান!


জোছনাও বিরহে মাতেঃ কোন আদিম পৌষ চলে যাবার সময়ে তাকে কথা দিয়েছিলো ফিরে এসে হাতে তুলে দেবে মুক্তো-শিশির, সে আশায় বসে থেকে থেকে আমার কপালে টোকা দেয়, আমি মুখ তুলে দেখি চোখে টলটলে শিশিরের মতোই একফোঁটা জল নিয়ে জোছনা অবিকল- বসে আছে; পেছনে আলগোছে পৌষ হেসে দূরে সরে গেলে আমি অবলীলায় বুঝে যাইঃ এই স্বপ্নঘোর-ঘোর-রাত প্রবল মিথ্যে!
... ...
...আমার স্থানে শুধু জলরহিত অন্ধকার কিছুক্ষণ জমে থেকে
ভোরের আলোয় সরে যায়।
পাশে পড়ে থাকে বাদামী রূপসী জি-শার্প!

মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

জন্মজ


ফিনাইলভেজা টাইলসে কিছু জনমক্লেদ-
জিনোমভেদ জমে থাকে
আগে দেখা কাঠের বেঞ্চ ভেঙে
প্লাসটিক চেয়ারেরা মোড়লের মতো
গ্যাঁট হয়ে বসে আছে।


চারদিকে মলিনাভ সবুজ আর ভয়ার্ত নীল ওয়াড়-
ভীড় করে আসে ঝিলিকদেয়া সাদা অ্যাপ্রন-
তাতে শোক-তাপসমূহ
অ্যান্টিবায়োটিকের মতো মিশে থাকে
অথবা শীতলতায় জমে বরফ হয়।


হিমাঙ্কে রেখে দেয়া হলে জঠরত্যাগী শিশুর ত্বকে হুল ফুটবে জেনেও
আমরা অণুজীব সন্দেহে জর্জর হয়ে নিরুপায়ে মরি।
জন্ম খুব প্রথাগতরূপে নোংরা হলেও
আমরা মৃত্যুকে বীভৎস ভাবি!


শীতল হতে হতে আমি অপেক্ষায় দেখি চারপাশে
তুষারকণারা জমা হতে থাকে,
জানলায়-দোতলায়-বাথরুমে-আস্তিনে।
এর মাঝে শিশুউৎসব জমলে মেলার হাটে
প্রজাপতি পাখা ঝাপটে হারিয়ে যাবেই,
মাতাটিকে ভালবাসতে কোনও শ্রান্তি জমে না,
কেমন ফুলে উঠেই
চামড়ায় এক টানটান সুখ ধরে আছে সে!


ধাঁধালো আলোর ছুরিতে ত্বক কেটে গেলে রক্তাভ শ্লেষমাখা
মাংশপিণ্ড জেগে উঠে সচকিত হয়।
হিম ছুঁয়ে দিলে খুব কোমল স্বরে,
হঠাৎ প্রস্রবণে ঢেউ তুলে নৌকা চিরে যায়।
জন্ম খুব প্রথাগতরূপে নোংরা হলেও
আমরা মৃত্যুকে বীভৎস ভাবি!

শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

দ্বিধা


সন্ধ্যা নেমে এসেছে বলেই মনে হয় এই হলুদ আলোয় ডিভাইডারে বসে রোমেলা দু'হাত মুঠো করে বেশ চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকে। একমুঠোয় সবুজ পাতা ঘিরে থাকা কতগুলো দোলনচাপা। বাদামি ময়লা ফ্রক-পরা রোমেলা তার হতবিহ্বল ভাব কাটাতে রুক্ষ্ণ তেলহীন চুল সরায় মুখের উপর থেকে। একটু আগে একটা গাড়ি-মহিলার কাছে সে পাঁচটা ফুল বিক্রি করেছে। তারপর থেকে ডিভাইডারেই বসে আছে থম্‌ মেরে। কী করবে বুঝতে পারছে না। সামনে দিয়ে হুশহাশ করে গাড়িগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে বা সিগন্যালে পড়ে বুড়োটেগুলোর মতো বসে থাকছে রোমেলাকে না ছুঁয়েই। সকালে মা অল্প একটু পান্তা দিয়েছিলো, সেই থেকে কড়া রোদটুকু সয়ে রোমেলা সারাদিন ফুল বেচেছে। গত তিনমাস। প্রথমে গোলাপে শুরু, কিন্তু কাঁটার মতই খ্যানখ্যানে শরুফা একদিন অনেক থাপ্পর-চড়ে রোমেলাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলো যে সে একাই এখানে গোলাপ বেচবে। সাদা দোলনচাঁপা নিয়ে তার পরদিন থেকে রোমেলা এখানে ছুটে বেড়ানো শুরু করলো আগের মতই, শুধু গালের একপাশে দু'সপ্তা নখের ছড়ে যাওয়া দাগ ছিল। হেসে হেসে এগিয়ে গেলে ফুল বিক্রি হতে পারে এটা শিখে গেছে বলেই সারাক্ষণ মুখে হাসি ঝুলিয়ে রাখতে হয়। মাঝে মাঝে ধবধবে হাতির মতো মোটা কিছু গাড়ি-মহিলার হাঁসফাঁস দেখে ওর এমনিতেই হাসি পায়। তবে রাতে ঘরে ফিরে যাবার সময় রোমেলার মনে হয় এই ছাইভস্ম-মাখা শহরে কেউ হাসে না, সবাই তার মতোই ঝুলিয়ে রাখে। হাতের অবশিষ্ট ফুলগুলোও সারাদিন রোদ-কালি মেখে ছাইমুখ নিয়ে পড়া-না-পারা বালিকার মতো অধোবদন হয়ে থাকে।


আজকে একটু আগেই পাঁচটা ফুল বেচেছে রোমেলা, পাঁচকাঠির দাম বিশটাকা। গলি থেকে গাড়িটা বেরিয়ে সিগন্যালে পড়ার সময়ই ওটার গায়ে বাদামি ঝরনার মতো আছড়ে পড়েছিলো সে। কাচ নামিয়ে গাড়ি-মহিলা পাঁচটা ফুল নিয়ে টাকাটা দেবার আগেই কারেন্ট চলে গেল। অন্ধকারে টাকা দিয়েই ছুটে বেরিয়ে গেছে গাড়ি আর গাড়ি-মহিলা। সবুজ জ্বলজ্বলে আলোর নিচে ডিভাইডারে বসে রোমেলা দেখে ওর মুঠির ভিতর একটা চকচকে একশ' টাকা!

বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

প্রণয় এবং বিচ্ছেদের অবশ্যম্ভাবিতাঃ একটি ময়নাতদন্ত


সম্পর্কের রসায়ন বেশ কুটিল। আমরা মানুষরা একটা নির্দিষ্ট মুখের ভাষায় যে মিথস্ক্রিয়া চালাই, একে অপরের সাথে- তার বাইরেও আরেকটা মানবীয় অস্ফূট ভাষায় ভাব-চলাচল ঘটে। খানিক চাহনি, একটু নীরবতা, শরীরের একটা বাঙ্ময় আলাপ ঘটে চলে অহরহই আমাদের মাঝে। বিশেষ করে নারী-পুরুষের প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে। এই ময়দানে রোজ কত ক্রন্দন-হাস্য আর আনন্দ-বিষাদ মিশে থাকে তা চিন্তা করে বড়ই অবাক হতে হয়! যেন একটা রোলার-কোস্টার রাইডের মতো আমরা দিগ্বিদিক ছুটে শা শা করে চলে যাচ্ছি, গতির তীব্রতায় চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে, পাশের জনের দিকে তাকানোর অবসার নাই, একদণ্ড সুস্থির হয়ে বসে কারো সাথে আলাপন নেই। আমরা কেবলই ছুটছি। এই উন্মাতাল দৌড়ের মাঝে যারা যারা হাতে হাত ধরছি, সেই বন্ধনও টিকছে না। নিজের গতিতেই আবার বাঁধন ছুটে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি।


সম্পর্কগুলোও কেমন অদ্ভুত ভাবে মিলে-মিশে যায়! পথ চলতে কাউকে হয়তো খুব ভালো লেগে যায়। পরিচয়, দেখা-সাক্ষাৎ গাঢ় হয়। হয়তো দুজনেরই ভালো লাগে একে অপরের সাথে সময় কাটাতে। দেখা হলেই মুখটা হাসিতে ভরে ওঠে। কারণে অকারণে খিলখিল হেসে দেয়া হয়। এ যেন একটা মধুর সময় কাটানো। একটা সময় মনে হয় আরো একটু বেশি চাই তাকে। আরো একটু বেশি দেখতে চাই, আরো একটু বেশি তার কথা শুনতে চাই। এই কামনার জন্ম কোথায়? এই আকর্ষণের জন্ম কোথায়? কে বলতে পারে? আমরা খালি যা ঘটে চলে তার স্বরূপ-নির্ধারণেই নাজেহাল, কার্যকারণ কে খুঁজতে যাবে! দুইজনের মধ্যে কেউ একজন একটা সময় বুঝে ফেলে, অন্য মানুষটাকে ছাড়া চলছে না। কোন ভালো ঘটনা ঘটলে প্রথমে তার কথাই মনে পড়ে, ইচ্ছা করে তার সাথে সেটা ভাগাভাগি করি। কখনও খুব বিষন্ন বিকেলে মনে হয় সে পাশে থাকলে অকারণ কথা বলে মনের ভারটুকু হালকা করা যেতো। এই আকুতিই হয়তো টান! এই চাহিদাটাই হয়তো ভালোবাসা!


ধরা যাক দুজনেরই একসময় এই বোধের উদয় হয় আর তারা বুঝে ফেলে যে একজন ছাড়া আরেকজন ঠিক স্বস্তি পাচ্ছে না। তখন একটা ট্যাগের দরকার পড়ে। শুধু বন্ধুত্বে হয়তো চলে না আর, আরো একটু বেশিই হেলে যায় নির্ভরতার ভারকেন্দ্র। একজন আরেকজনকে যেভাবে পড়ে, যেভাবে বুঝে, মনে হয়, এই সেই- যাকে খুঁজেছি, বা যাকে দরকার। মনের ভাব প্রকাশিত হতেও দেরি হয় না। সেই প্রকাশে হয়তো একটা ক্ষণিক টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়। একজন হয়তো একটু দ্বিধায় পড়ে যায়। তবে মনের টান অনেকসময়ই সেই বাধা পেরিয়ে যায়। একটা বোঝাপড়াও হয়তো হয়ে যায় তাহাদের মাঝে। লেখক সেই বিষয়ে পুরোটা না বুঝলেও এটুকু বুঝে নেয়, এরা হয়তো বাকি জীবনের সময়টুকু ভাগাভাগি করে নিতেই পছন্দ করবে।


এই গল্পটা রূপকথা হলে এখানেই আমার প্রচেষ্টা শেষ হয়ে যেতো। "অ্যান্ড দে লিভ্‌ড হ্যাপিলি এভার আফটার..." বলে আমিও শেষ করে দিতাম। কিন্তু আমরা খুব অভিশপ্ত জীবনযাপনে মানিয়ে নিচ্ছি নিজেদের। একেকটা মানুষ কতো কোণে খণ্ডিত, তার কতো ভাঁজ, নিজেও বুঝে না কখন বুকে পলি জমে, অভিমান জমে, ছোট ছোট কতো স্বর নিরুত্তর থেকে যায়। আবার হয়তো আমার আশঙ্কা অমূলক, মানুষ আসলেই পারে একে অপরকে ভালোবাসতে অবিমিশ্রভাবে, পারে মানিয়ে নিতে। অনেকেই তো একজীবন কাটিয়ে দেয় পাশাপাশি- সুখে, দুখে, সংগ্রামে, শান্তিতে। আবার কেউ কেউ পারে না। পথ আলাদা হয়ে যায়, মত আলাদা হয়ে যায়।


সেই জোড়ভাঙার সুর প্রথম কবে দেখা যায়? কিভাবে দুজনে মিলে দেখা স্বপ্নেরা ঝরে যায়? প্রকৃতির বৈচিত্র্যের মতো এই ভাঙনের সুরও বিচিত্র! অনেক সময় ছোট ছোট কথায়, ঝগড়ায় মনে কালোমেঘ জড়ো হয়, মনে হয় আগের সেই ভালোবাসা আর নেই, "ও" বোধহয় আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসে না! এই অনিশ্চয়তা নিমেষেই উড়ে যায় যদি নির্ভরতা মিলে। এতটুকু স্পর্শ, সহানুভূতি বা ধৈর্যশীল আচরণে হয়তো সাময়িক ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটে। আবার অনেক সময় পাশের মানুষটা হয়তো সেটা বুঝতেও পারে না। তখন শুরু হয় অভিমানের ঢেউ। একটার পর একটা ঢেউ এসে মানুষটাকে বিপর্যস্ত, বিস্রস্ত করে দেয়। একবার মনে হয় কেঁদে কেটে রাগ দেখিয়ে বলে দিই, "তুমি এমন কেন? আমাকে কেন বুঝো না? আমাকে কেন কষ্ট দাও?" তারপরেই আরো বড়ো ঢেউ এসে ঝাপ্‌টে ভিজিয়ে দেয়, "আমি কেন বলবো? ও কেনো বুঝে নেয় না? আমাকে এতো কম বুঝে কেন ও?"


এখানে অতীতের সাথে তুলনাও শুরু হয়ে যায়। আমরা অবুঝ হয়তো, তাই বুঝি না যে নদীর পাড়ের মতো আমরা বদলে যাচ্ছি প্রতিমুহূর্তে, আমাদেরও মন বদলায়, আমরা বড়ো হয়ে যাই, পরিবর্তিত হই। সেখানে পাশেরজনকেও একই তালে বদলাতে হয় কিংবা বুঝে নিতে হয় এই বদলে যাওয়াটায় কারো হাত নেই- এটাই স্বাভাবিক। হয়তো একটা সময়ে সম্পর্কের টানেই একজন বুঝে যায় অপরজনের অভিমান। পুরোনো সুর ফিরে আসতে চায়, সেই ভালোবাসার টানেই আবার দুজনে হেসে ওঠে, বুঝে নেয়ঃ সকালের রোদ আর দুপুরের রোদে অনেক ফারাক। তবু বেঁচে থাকা যায় পাশাপাশি, একে অপরকে এখনও কামনা করা যায়! হাতের পাতা আবারও নতুন করে মিলিয়ে নেয়া যায়।


যদি সেটা না হয় তাহলে আরো জড়িয়ে যায় তন্তুগুলো। শুরু হয় টানাপোড়েন- একটা চাপা ক্ষোভ! একটু একটু মনে হয় পাশে থাকা মানুষটা অচেনা, তাকে আর পড়া যাচ্ছে না ঠিকমতো। কেমন যেন বিরক্ত লাগে সবকিছুই। ছোটখাটো বিষয় যা আগে গায়েই লাগতো না, হালকা খুনসুটিতে উড়ে যেত পলকা পাতার মতো, সেগুলোই পড়ে পড়ে দানা বাঁধতে থাকে। ক্ষোভেরা দলে দলে, দিনে দিনে জমা হয়ে একটা দ্রোহে রূপ নেয়! যে মানুষটাকে আগে এতো ভালো লাগতো, তাকে আর ভালো লাগে না। আজকাল কথায় কথায় ঝগড়া হয়। কোথা থেকে কোথায় চলে যায় কথা-সব। দুজন দুজনকে এতো ভালো করে চিনে, তাই কথায় পুরোনো অভিমান, রাগ, ঝগড়াগুলো উঠে আসতে থাকে। দুজনেরই "ইগো" দাঁড়িয়ে যায়। যে টুকরো কথায় আগে মিটমাট হয়ে যেত এখন সেই কথায় কিছুই হয় না। আরো অনেক কথা ব্যয় করে, ক্লান্ত হয়েও মনোমালিন্য কাটে না। কালি জমতে থাকে দুজনের মাঝে। যে ভালোবাসায় একদিন দুজনে একসাথে ঘন হয়েছিলো আজ সেই ভালোবাসাই হারিয়ে যেতে থাকে।


এইসময় নিজেদের অজান্তেই একটা দূরত্ব তৈরি হয়। দূরত্বটা মনের, চিন্তার, পাশাপাশি থাকার, সর্বোপরি ভালোবাসার। অনেক সময় কথা হয় না অনেকদিন। হলেও ছাড়া-ছাড়া, আগের মতো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে না মনের সাথে মন! অনেকসময় এখান থেকেও সম্পর্কেরা বেঁচে থাকে। অনেকে মানিয়ে নেয়। একটা সম্পর্ক সবসময়ই একটা বড় লগ্নি। মানুষ সহজে সেই লগ্নি করা বিশ্বাস, সেই পুঁজিটা হারাতে চায় না। ভারি হয়ে ওঠা কথামালাকে কাঁধে নিয়েও অনেকে পাশাপাশি থাকে।


তখন হয়তো আরো গভীর যন্ত্রণার সূত্রপাত ঘটে। অচলায়তন ভাঙতে যে এগিয়ে আসে, স্বভাবতই সে একটু সুবিধা পায়। টেনে নেয়া সম্পর্ককে সে টিকিয়ে রেখেছে এরকম একটা ধারণা তাকে একটা সুযোগ দেয় অপরজনকে করুণা করার। সেখানে তীব্র না হলেও একটা প্রচ্ছন্ন আধিপত্য তৈরি হয়। অপরজন তখন হয়তো অজান্তেই একটা অপরাধবোধে ভুগতে থাকে। "আমি হয়তো ওর মতো অতটা ম্যাচিওর না!" -এরকম সন্দেহের দোলাচলে সে একটু ম্রিয়মান হয়ে পড়ে। এখানে আরো অনেক সম্ভাবনার সত্যি হওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু সবক্ষেত্রেই আগের সেই ভারসাম্যটি আর টিঁকে থাকে না। যদিও আমরা সর্বদা বলি যে পুরোনো কথা ভুলে গিয়ে নতুন করে শুরু করা- কিন্তু বাস্তব বলে মানুষকে এহেন গভীর সম্পর্কের খুঁটিনাটিগুলোও অনেক বেশি তাড়িত করে।


অনেকে এখানে আরো একটু সুখের আশায় ভারি সম্পর্কের জোয়াল কাঁধ থেকে নামিয়ে ফেলে। "হেথা নয় হোথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে" -এরকম আকূতিতে হয়তো কষ্টের বিষে নীল হয়েও তীব্র বিচ্ছেদের মাঝ দিয়ে যায় মানুষ। একটা বিচ্ছেদ- তা যতই দ্রুত বা ধীরেই ঘটুক না কেন, খুবই বেদনা আর হতাশার। অনেকে নিজেকে দোষারোপ করে, অনেকে অপরজনকে দোষারোপ করে। কিন্তু প্রকৃত দোষ কার? একটা মধুর সম্পর্ক কী করে এরকম বিষিয়ে যায়! ভালোবাসায় উন্মাতাল প্রবাহ থেমে কেন বুকে এই ক্ষোভ জন্মায়? কেনই বা কারো সাথে থাকতে কুণ্ঠায় কুঁকড়ে যেতে হয়, যেখানে একটা সময়ে তাকে নিয়ে গর্ব হতো! এই প্রশ্নগুলো স্বাভাবিকভাবেই খেলা করে মনে।


আমরা অসহায় মানুষ হাতড়ে বেড়াই, উত্তর খুঁজি। কিন্তু হায়! উত্তর মেলে না। ভেবে নিই আরেক মানুষের মাঝে হয়তো সুখী হবো, আগের ভুলগুলো শুধরে ভালবাসবো আবার। আবার হয়তো স্বপ্ন দেখা, আবেগে ভেসে যাওয়া। ভবিষ্যতকে সুন্দর করতে, কারো সাথে জীবন উদযাপন করতে চায় মন। মানুষ তো সততই একাকী, এই একাকীত্ব কাটাতেই জীবনকে নানান উপাচারে ভরে দেয়া, সামাজিকতায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখা। চারপাশে প্রিয় মানুষগুলোকে নিবিড় করে ধরে রাখা যাতে তাদের হৃদয়ের ওমে শীতল-স্ব একটু উষ্ণতা পায়!


এখানে শুধুই বিচ্ছেদের সুরের বিশ্লেষণ। তবে আমি ভাবতে চাই না এভাবে। আমাদের সামর্থ্যের মাত্রা আমরাই জানি না। এক ছাদের নিচে সবসময় হাসি-আনন্দে থাকার জিন নিয়ে আমরা জন্মাইনি। এত বেশি সংঘর্ষ আমাদের নিজেদের মধ্যেই সবসময় ঘটে চলে, আরেকজন মানুষের সাথে তো আরো বেশি ঘটবে সেটা! তারপরও মানুষ ভালোবাসে, আপ্লুত হয় অদ্ভুত আবেশে। অযথাই হেসে ওঠে উদ্দাম! কাউকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে ভাবে বাকিজীবনের আলোছায়ায় তার সাথেই পেরোনো হোক পথ। এই অপার আশাবাদী মানুষকে আমার বড়ো ভালো লাগে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়, আমাদের অতি জটিল পারস্পরিক লড়াইয়ে এক সুপ্রভাতে আমরা সবাই-ই জিতে যাবো!




***

মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

প্রশ্নবোধক-চরিত


প্রশ্নবোধকেরা বড়ো উচাটন, দুপুর ঢলে পড়ছে
সভায় গুঞ্জন-মৃদু, ফিসফাস, চুপচাপ আবার
কালো, মোটা, শ্বেতীপড়া নানান রকম
প্রশ্নবোধকেরা জড়ো হয়ে বসে আছে বেঞ্চিতে
কাঠের খটমটে বেঞ্চিটা বড়ো গায়ে বিঁধে
তবুও সহিষ্ণু প্রশ্নবোধক-দল, শব্দগুচ্ছ দানা বাঁধে।


বড়োকর্তা দাঁড়ি স্টেজ ভেঙে দিলে, ইতস্ততঃ বিভ্রান্ত
বালক, বৃদ্ধ, শিশু-প্রশ্নেরা ক্রমশই ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে-
এ কেমনধারা বিচার! প্রহসন-নির্যাতন মানি না!
চিৎকার জন্মেই দাঁড়ির ভ্রুকূটিতে ম্লান হয়,
মিউ মিউ বেড়ালের মতো ঘরকোণে সরে যায়।


"অতীতে এহেন স্পর্ধা-সঙ্কুল বাড় বাড়েনি" -
ভেবে গম্ভীর মাথা নাড়ে দাঁড়ি, সব দোষে দোষারোপ
অস্থির নেতাটাকে, চক্রাকার মাথা বাঁকিয়ে ক্রূরহাসি মুখে মাখা।
খেপে গিয়ে সশব্দে হাঁকেন দাঁড়ি, "আজ বিচারে
যাবজ্জীবন দিলাম তোমাদের!"
বিমূঢ় হতাশ নেতা-প্রশ্নিকের পিছু পিছু, মৃদুগুঞ্জনে সকলে কুঠুরি-বন্দী হয়।।

সোমবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

বিচ্ছেদের আগে

ঘনো নিঃশ্বাস জমে উঠলে ছেড়ে দিই, নিশ্চুপে
বুকের শ্বাসের সাথে বাতাসে মিশে
যেতে থাকে-
কিছু তাপ,
ঘুমের তারা নামেনি চোখে তখনও - টের পাই
সফেদ রেশম-চাদর সরে যেতে থাকলেঃ আবেশ!


চোখ মুদে এলেও ঘুম আসবে না।
পুনরায় টানাশ্বাসে ক'টি ঘুণপোকা ঢুকে পড়ে।


খোলা-চোখে দেয়ালের মতো পিঠ, কমনীয়
আমার পাশে মৃদু শুয়ে ওঠানামায়-রত
হাত বাড়ালেই তো ছোঁয়া যায়?


পিঠের ওপাশে মরুভূমি গেঁথে ছিলো
জেনেছি তা গত-ভোরে, কূটনীতি-পাঠে।


এখন চাদর সরালে দেখি বালু আর বালু
লাভার মতো চুলেরা বেয়ে এসে ছুঁয়ে গেলে পুড়ে খাক্‌।


আমরা কেবলই পথ পাল্টে ফেলার জন্যে পিঠদ্বয় মুখোমুখি করে দেই।

শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

চতুর্পদী

.
.
.
.
.
.
শুরু.
কাচের ওপাশে দাঁড়ালেই ডাকে রূপসী সাপ
চেরা জিহ্বা টেনে সম্মোহন!
তরল বিষ কাচে বাধা পাবে জেনেও
বিলোপের শঙ্কা জাগছে মনে।
.
.
.
.
.
.
.
বিস্তার.
বিরহ ক্রমশই সুখের বা আত্মতৃপ্তির কুহক জাগায়।
ছলনায় বিশ্বাস নেই তবুও, চাঁদের মতই
অপরপৃষ্ঠে ধরে বিপুল আঁধার, আলোকিত থাকি।
তোমার সাথে কথা বলি না কতদিন, স্বেচ্ছা-নির্বাসনে মর্ষকামী।
.
.
.
.
.
.
.
শেষ.
হৃদয়ের ডাক কীভাবে শুনবে কেউ?
আজ, কাল পেরুলে পরশু বুকে জমাবো পলি
নির্বাণ খুঁজে মরি, ভালোবাসার মাঝে খুঁজি সুর
মানুষ চলে গেলে স্বপ্নেরা যায় কতদূর?

মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

পিতার অনুজ আর অ্যারোপ্লেন


মনে পড়ে পিতার অনুজ, নিয়ে ঘাড়ে
ঘাড়ে করে সারাদিন বনে-বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে
আমার সামনে খুলে দিতো কী জগৎ - আহা!
কোঁচড়ে ভরে এনে দিতো কুল, বরই, শিউলি
শৈশব মাখিয়ে দিতো অপরূপ জোছ্‌নায়!


মনে পড়ে সবুজে হলুদে তার ত্বক রাঙা হলে
কর্কট-বিষ নালী বেয়ে হৃদয়ে পৌঁছে গ্যাছিলো-
আমি বিছানা-পাশে দাঁড়িয়ে লোমহীন ত্বকে
খুব মোলায়েমে আলতো হাত বুলিয়ে দিতাম!
পিতার অনুজের চোখে তখন সূর্যাভা পশ্চিমের।


পথ হেঁটে আজ ঐ শৈশবে ফিরে গেলে দেখি
বিমানবন্দর-রানওয়ে ছেড়ে
পিতার অনুজ উড়ালে উড্ডীন দূর বহুদূর নীলে
অ্যারোপ্লেন-গর্জনে ভীতু বালক
কেঁপেছিলো নিশ্চিত!
ফিরে এলে অনেক জোছনারা শুয়ে ছিলো আলনায়।


মনে পড়ে অ্যারোপ্লেন ভেঙে শবাধার নামলে
ভেঙে ভেঙে পড়ছিলো পিতার কাঁধ, পিতামহী নিথর-নির্বাক।
মাতার আঁচলে দুঃখ বেঁধে রেখে অচিন-বালক
শবাধার খুলে খুব কালোরঙা ঢেউ দেখেছিলো
এক মহাকাল!
সেখানে শুয়ে পিতার অনুজ শুধুই মুচকি হেসেছিলো।

সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

ঘ্রাণসঙ্গম


বিভক্ত ঘ্রাণে মজে গেছে নাসা
শুঁকে শুঁকে সুরসন্ধানে - রক্তে টানি নির্যাস
পাপবোধ ফুরোলে রাতের আগমন,
আমি আস্বস্ত হই।


শশব্যস্ত আলস্যে ঘুমকণারা মাথা পাতে
খুব নিচু এক কাঠবাদামের পাশে
শীতলস্থানে ডাক পড়ে, তখনই
দেখি কুণ্ডলীপাকে জড়িয়ে এক তরুণী
আমার লোমকূপে খুব দ্রুত বিঁধে যায়।
ঠা ঠা হাসে বিদ্রুপী চাঁদ!
কার্ণিশে চড়ুইয়েরা নিবিড় হয়ে এলে
মসলিন-আকাশে জমে কিছু খয়েরী-মেঘ
রোঁয়া ফুলিয়ে ছোটে দিগ্বিদিক; শুঁয়োপোকা!


তরুণী প্রবেশ করলে, দেহজুড়ে ফাটল
বর্ষা-খাল-নদী-কালভার্ট-বোল্ডার
হাতুড়ি নেমে এলে ভাঙে সব-
বর্ষা।
খাল।
নদী।
কালভার্ট।
বোল্ডার।
সবুজে উড়ছে তখনও হিরোশিমা-ছাতা!


ঘ্রাণে আমি সুতো ছাড়লেই
তরুণী নেমে নেমে রক্তে মিশে যায়।
এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল