মঙ্গলবার, ১১ মার্চ, ২০১৪

অর্থহীনালাপ

আমি আমার বন্ধুদের অতীত অবয়বগুলোর জন্য প্রবল আকুতি ও বেদনাবোধ করি।


তাদের বর্তমান অবয়ব আমার সাথে মেলে না। শুধু অমিলই না, রীতিমত বিপরীত প্রবণতা দেখি তাদের ভেতরে। এজন্য আমি প্রথম প্রথম খুব ক্ষুব্ধ হতাম। কারণ অতি-পরিচিত এই বন্ধুদের সাথেই তো বেড়ে উঠেছি। আমার সত্ত্বার সাথে তারা মিশে আছে। আমার চিন্তাভাবনার অনেকটাই তাদের ঘিরে গড়ে উঠেছে। এখন হয়তো আমার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু আমি বেড়ে ওঠার সময়টায় তাদের প্রভাবকে কখনই অস্বীকার করি না। অথচ এখন পৃথক ব্যক্তিত্বের কারণে দেখি যে তাদের সাথে আমার মানসিক দূরত্ব যোজন যোজনের। এরকম দূরত্বের কারণে প্রায়ই সম্পর্ক খারাপ হয়। দেখা যায় বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত থেকে তর্ক, সেই তর্ক শেষ হয় কথা বন্ধে। যেহেতু আলাপটা সামনাসামনি না, সেহেতু মীমাংসা হয় না। আমার ধারণা মুখোমুখি আলাপে আমি যতোটা মিশুক বা নমনীয়, ভার্চুয়াল জগতে ততোটা না। তাই বিকট তর্কের শেষে সম্পর্কটা টানাপোড়েনে পড়ে যায়। ভার্চুয়াল জগতের কারণে একটা ভ্রান্তিও কাজ করে, যার কারণে এই ক্ষতিটা গায়ে লাগে না। অবধারিতভাবে আমি ব্যস্ত হয়ে যাই আমার জীবনযাপনে। তারা ব্যস্ত হয়ে যায় তাদের জীবনে। হয়তো অনেকদিন পর খেয়াল করি যে সেই বন্ধুদের সাথে আর কোন আলাপের বিষয়ও নেই। তাদের বর্তমান চেহারাটা এতোটাই অপরিচিত লাগে যে আমি বুঝতেও পারি না কীভাবে পুনরায় যোগাযোগ করা যায়। আমি নিশ্চিত, আমার চেহারাটাও তাদের কাছে অচেনা লাগে। এভাবে অনেকগুলো অপরিচিত মানুষ আমার চারপাশ ঘিরে রাখে। প্রতিটা মানুষের পুরানো একটা রূপ আমার খুব প্রিয়, নানা কারণে। সেই রূপগুলো আর ফিরে পাই না। আস্তে আস্তে স্মৃতিও ফিকে হতে শুরু করবে। ভালো হতো যদি তাদের বর্তমান রূপের স্মৃতি ফিকে হতো, আর পুরানো স্মৃতিগুলো টিকে থাকতো। কিন্তু ঘটে উল্টোটা। নতুন রূপ এসে হটিয়ে দেয় পুরানো রূপ।

আজকাল রাতের খাবার একটু আগে আগে খেয়ে নিই, সন্ধ্যা হতেই। সন্ধ্যার পরের সময়টা একটু লম্বা হয়ে যায় এতে। কাজকর্ম বাকি থাকলে সেরে ফেলা যায়। মাঝে মাঝে এরকম বিদেশ বিভুঁইয়ে বসে দেশের কথা ভাবি। দেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আমার কাছে দেশ ছেড়ে আসার চেহারাটাই স্থির হয়ে আছে। দেশের পরিবর্তন কল্পনায় যেমন ভাবি, সেভাবে নিশ্চয়ই ঘটছে না। যেভাবে যা ঘটছে, সেগুলোর একটা বিশেষ চেহারা অনলাইন থেকে দেখতে পাচ্ছি। হয়তো খবরের ওয়েবসাইটে, কিংবা টিভির খবরের ভিডিওতে, কিংবা ফেসবুকের মাধ্যমে। এগুলো আসলে খণ্ডিত অংশ। এবং আমার নিজের চিন্তাভাবনায় সেগুলোর প্রবেশ ঘটে নিজের মতো একটা অবয়ব দাঁড় করাচ্ছে যা বাস্তব থেকে ভিন্ন হতে বাধ্য। এটা আমি একেবারেই মেনে নিতে পারছি না।

আমার কাছে বিদেশ একটা ছন্নছাড়া অনুভূতি ছাড়া কিছুই না। ছোটবেলা থেকে বাইরে বাইরে থাকার কারণে অভিযোজিত হতে সময় লাগে নি। আর পশ্চিমা বিনোদনের সুবাদে অনেক কিছুই পূর্বপরিচিত ছিল। যে সংগ্রাম বা সয়ে নেয়া, সেটাও অভ্যাস হয়ে গিয়েছে দ্রুতই। কিন্তু দেশের জন্য পেট পোড়া কমছে না। একটা ভাগ হলো বাবা-মা-বোন এবং সংসারের সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর সাথে সাময়িক বিচ্ছেদের কষ্ট, আরেকটা ভাগ হলো দেশে থাকার আপন স্বস্তি। জ্যাম ঠেলে বইমেলায় যাওয়া, কিংবা কোন কাজে শাহবাগের আশেপাশে গেলে আজিজে একটু আড্ডা দেয়া, অথবা অফিসের পরে বাসায় ফিরে মিরপুরের আড্ডা। মজার ব্যাপার হলো এই ভাগটা ভার্চুয়াল জগতের কারণেই তৈরি হয়েছে। আরো মজার ব্যাপার হলো এই জগতের পরিচিত আপন আপন লাগা মানুষগুলোর সাথে যতো আত্মিক যোগাযোগ বেড়েছে, ততোই আমার পুরানো বন্ধুদের নতুন অবয়বের সাথে দূরত্ব বেড়ে গেছে। সমান্তরাল মসৃণ প্রক্রিয়া।

এগুলো আসলে অভিযোগের মতো শোনালেও আসলে তা নয়। আমি ভাগ্যবান যে বিদেশ আমার ভেতর লালসা তৈরি করতে পারছে না। বিদেশের প্রতি জঘন্য লাগার অনুভূতিটা দিনে দিনে বাড়ছে। একইসাথে দেশে ফিরে থিতু হবার আকর্ষণটাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এটা ভাল লক্ষণ। আমি চাই না এই দেশে বাকি জীবন কাটাতে। মাঝে মাঝে খুব ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লে গাঢ় ঘুম হয়। সেই ঘুমের ভেতরেই ঢাকা শহরকে দেখি। ঢাকার রোদ। ধুলা। জ্যাম। ভিড়। ধাক্কা। যখন ফিরে যাবো ঢাকা আরো অনেক বদলে যাবে। ঢাকায় আরো কয়েক বছর থেকে একদিন মৃত্যুও হবে। আমার হাড়মাংস মিশে যাবে ঢাকার মাটিতে, যে মাটি থেকে জন্মেছিলাম, সেখানে ফিরে যাবো। চক্র পূর্ণ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল