শনিবার, ৭ জানুয়ারী, ২০১২

কর্ণোপকর্ণিকা

শীত শীত বিকেলে গলিতে হাঁটছি। গলিগুলো এখন আর আগের মতো সুকুমার নেই, এখন সেগুলো পাকা রাস্তা, পিচের কালো পরতের 'পর পরত জুড়েছে, আর গলিগুলো ক্রমশ হয়ে উঠেছে দাম্ভিক রাজপথ। পথের দু'পাশে অনেকগুলো বিল্ডিং উঠে গেছে। বিল্ডিংকে বাংলায় বলে ইমারত। কিন্তু আগে'কালের যে ইমারত গড়ে উঠেছিল, এই বিল্ডিংগুলো তেমন না। এরা বিদেশি, আরোপিত পর্দার মতো অশ্লীল, কাচের মসৃণ শরীর, যে কাচের ভেতরে দেখা যায় না। কোনো জানালা নেই, বারান্দা নেই এ'গুলোতে। কেবল সরাসরি জ্যামিতিক লম্বের মতো সুউচ্চে উঠে গেছে নির্বিকার। রাজপথ নয় তবু এই বিল্ডিংয়ের সারি দু' পাশে জমে উঠেছে বলেই এই রাস্তাকে ভীতিকর লাগে। আমি তাই এই রাস্তায় ভয়ে ভয়ে হাঁটি। মনে ভয় হয়, যদি এই বিল্ডিংগুলো একদিন কাত হয়ে পড়তে শুরু করে, তাহলে!

এমন ভাবতে ভাবতে আমি হাঁটতে থাকি। দ্রুত। মাথা নিচু করে। এই গলিতে খালি অফিস আর অফিস। নানারকমের বাহারি অফিসে অনেকে সেজেগুজে চাকরি করে। আমি তাদের অনেককেই চিনি। কিন্তু পরিচয়ের গণ্ডিতে তাদের না রাখতে পারলেই হয়তো আমার ভাল লাগতো। তাই আমি সম্ভাব্য সামাজিকতা এড়াতে মাথা নিচু করে হাঁটি। হনহনিয়ে। দু'পাশের অনেক উঁচু বিল্ডিংয়ের কারণে এই গলিতে একটা চ্যানেল ইফেক্ট হয়েছে, সারাক্ষণ হু হু করে বাতাস বয়। এমন বাতাস ধানক্ষেতের কথা মনে করিয়ে দেয়। আউশ ধানের গন্ধ পাই। চমকে উঠি। এখানে আউশ কোথায়? স্মৃতি থেকে ঘাই মেরে ওঠে গন্ধ। চোখেও কি ভুল দেখি? আইল চোখে পড়লো কি? নাহ, ও কেবল ভ্রান্তিবিলাস। আমি আবার মাথা নিচু করে হাঁটি। এখানে কোনো প্রাগৈতিহাসিক জীবন লুকিয়ে নেই। সব হারিয়ে গেছে এই রাস্তা, এই কালো-পিচ, এই বিল্ডিং ওঠার সাথে সাথেই...


এখানে বিল্ডিং একটা রূপক, রাস্তাটাও রূপক। আগে যে গলি ছিল, আর এখন যে হু হু বাতাস, সেটাও মনে হয় রূপক।

মাঝে মাঝে ভাবি, এই যে দু'চোখের দৃশ্যগুলো কি আসলে সত্যি? যা দেখছি, যা অবলোকন করছি, আবছা দেখার look আর গভীর দর্শনের observe, এত রকমারি দেখার মাঝে কোনটা ঠিক? কোনোটাও কি ঠিক?

প্রশ্নটির উত্তর খুঁজছিলাম। কালো পিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাঁটছি, চোখের সামনে অপরিচিত অপরিবর্তনীয় দৃশ্য। চারপাশে পরিচিত মানুষ আমাকে দেখে কিন্তু এক মনে হাঁটছি বলে কেউ আমাকে হয়ত জ্বালাতে চায় না। বিরক্ত হব বা চমকে উঠব ভেবে চকিতে ডাক দেয় না। বড়ো হয়ে গেলে আমাদের দ্বিধা বাড়ে, সাবলীলতা কমে। চোখের দৃষ্টি ঘোলা হয়ে ওঠে মানুষের মুখ দেখার সময়। কারো মুখের রেখা পড়া যায় না, খালি অবয়ব বোঝা যায়... সব একই মানুষ, একই পুনরাবৃত্তিতে জন্মায়... মরে...


পৃথিবীর বিস্ময়কর দুর্ঘটনা যে এই গ্রহে মানুষ নামের কিম্ভুত এক জীব জন্মেছিল। জন্মেই তার বিশেষত্ব বোঝা যায় নি। ধীরে ধীরে দেখা গেল সে আলাদা হয়ে উঠছে মানুষ হয়ে উঠছে ক্রমশ দাম্ভিক হয়ে উঠছে আরোপিত হয়ে উঠছে বিষাক্ত ও কৃত্রিম হয়ে উঠছে ভাবালু ও বিষণ্ণ হয়ে উঠছে। এমন বিচিত্র হয়ে ওঠার স্বতঃস্ফূর্ততায় তাকে সবাই ভয় পেতে শুরু করল। ভয় পেয়ে দূরে সরে গেল পশু। ডানা ঝাপ্টে দূরে সরে গেল পাখি। চুপচাপ দূরে সরে গেল প্রকৃতি। মানুষ একা হয়ে গেল একাএকাই।


কতোগুলো ছেলে খেলাচ্ছলে একটা বাচ্চা কুকুরের মুখে কতগুলো পটকাবাজি পুরে দিয়েছিল। কুকুর তো, প্রভুভক্ত, নির্বোধ, অবলা। সে ভেবেছে এটা হাড়। দাঁতে চেপে ছেলেগুলোর পিছু। একটা ছেলের কাছে দেয়াশলাই ছিল। একটা কাঠি ফস করে ধরিয়ে পটকার মুখে ধরিয়ে দিয়ে তারা সবাই চলে গেল। কুকুরের বাচ্চাটা একটু এদিক একটু ওদিক তাকিয়ে কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। এখন কেবল ও সুতোটুকু জ্বলে ফুরিয়ে যাবার অপেক্ষা...



[এলোমেলো শীতল সময়ের ক্ষমাপ্রবণ কিছু লাইন]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল