বুধবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

নিবিড় নিশীথ

নিশীথ বানানটা কি ঠিক লিখলাম? দীর্ঘ ঈ-কার হবে? নাকি হ্রস্ব ই-কার? ভাবছি। ইদানিং বানান-ফোবিয়া হয়েছে। বাটে পড়ে কিছু লেখায় বানানশুদ্ধি করতে হয়েছে। ফলে লাভের চাইতে ক্ষতি হলো বেশি। যা বানান ঠিকঠাক জানতাম, শুদ্ধ করতে গিয়ে সেগুলো এখন ভুল জানি। ভুলভাল করে তারপর নিজেই নিজেকে অবোধ দেই, দার্শনিক হয়ে যাই। সক্রেটিস বলেছেন পৃথিবীতে ভুল শুদ্ধ কিছু নাই*। চালাইতে পারলে সবই ঠিক, চালাইতে না পারলে সবই ভুল। কিশোর কুমারের গানের মত ‘ভুল, সবই ভুল’।
ইদানিংকালের কথা বলছিলাম। ছোটবেলায় ইশকুলের মাঠে যেসব খেলা খেলতাম, সেগুলোর একটা কমন ফ্রেম ছিল। খেলার কোন না কোন পর্যায়ে একটা ছক বা গণ্ডির মধ্যে ঢুকতে হত। যে গণ্ডির মধ্যে নিরাপত্তা কিংবা গণ্ডির বাইরে নিরাপত্তা। যেমন ছোঁয়াছুঁয়িতে সেফ-প্লেস থাকত, কিংবা মেয়েদের বউচি টাইপের খেলা। আমার মনে হয় ছেলেবেলায় ওভাবে খেলতে খেলতে সবার আচরণে এটা ঢুকে যায়। গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা। তুচ্ছ একটা দাগ মাটিতে। হয়ত নিজেই দিয়েছি। কিন্তু কী এক অজানা কারণে সেটা পেরুতে পারছি না। নিজেই নিজেকে আটকে বসে আছি! আবার মনের এক কোণে চিন্তাও হচ্ছে – যদি পেরুতে পারতাম, কতোদিন গণ্ডির বাইরে পা রাখি না। আজব ডিলেমা।
ইদানিং বেশি বেশি এই ডিলেমা ফিরে আসছে। বেশিরভাগ সময় মূল কাজটুকু করার আগে পরের এই ডিলেমা নিয়ে ডিল করতেই বেশি সময় আর চিন্তাভাবনা নষ্ট হচ্ছে। ইংরেজিতে মনে হয় এটাকেই প্রোক্র্যাস্টিনেশন বলে। বড়োলোকের রোগ গরীবের হলে সেটাকে বলে ঘোড়া রোগ। আমি শালার হাম-যক্ষা-ম্যালেরিয়া-হুপিং কাশি কিছুর হাতে ধরা খেলাম না, খেলাম তো খেলাম, শেষমেশ ঘোড়া রোগের হাতে!

গণ্ডির মধ্যে ঢুকে থাকলে একটা ইল্যুশন তৈরি হয়। মনে হয় কোন সাবানের বুদবুদের মত বাইরের কিছু আর আমাকে স্পর্শ করতে পারছে না। ‘এই বেশ ভালই আছি’ টাইপের ধারণা হয়। গণ্ডির বাইরের যে দৃশ্যগুলো দেখি, দেখি চারপাশের মানুষ, সাধারণ, মামুলি মানুষ, তারা তাদের সাধারণ চাকুরি, টাকা, জমি, দেনা ও খাবার দাবার নিয়ে দিনাতিপাত করছে। দেখে ভাল লাগে। আমার একটা মস্তিষ্ক আছে এবং সে মস্তিষ্ককে আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি – এটা ভেবে ভাল লাগে। চিন্তা করি নানা কিছু নিয়ে, সেগুলোর সব প্রকাশ করার উপায় নেই। প্রকাশ করতে যে সময় লাগবে, সেই সময়ে আরও কয়েক কোটি চিন্তা করে ফেলবো – সেগুলোর কী হবে? তাই আমি চারপাশ দেখি আর ভালোলাগা জমাই।
গত সেপ্টেম্বর থেকে জীবন একটু বদলে গেছে। পাঁচ মাস ধরে পার্টনার ঘরের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে – খবরদারি করে। অন্যরকম অভিজ্ঞতা। এখন মস্তিষ্ক আমার সাথে একটু বিট্রে করেছে। নিজে নিজে গণ্ডি সম্প্রসারণ করে পার্টনারকে ভিতরে এনেছে – এখন চিন্তাভাবনাগুলো শেয়ার করা লাগে। কিছু কিছু মিলে যায় – সহমত। বেশিরভাগই মিলে না – উপভোগ্য তর্ক। তর্কের এক পর্যায়ে ক্ষান্ত দেই, ঘোড়া রোগের রোগীদের বেশি তর্ক করতে নাই। এ কারণেই বোধহয় ব্লগিং কমিয়ে দিয়েছি। একটা সময়ের পরে সবই রিকারেন্স – সেই একই আলাপ, একই হাসি-তামাশা-ঝগড়া। মতামতের মিল কিংবা মতের অমিল। নিজের কথাও বারবার বলতে ভাল লাগে না, তাই অনেক ক্ষেত্রে নীরবতা শ্রেয় অপশন মনে হয়।
খুব সম্প্রতি আরেকটা বেশ বড়ো ব্যাপার হলো – আমার এই বন্ধুটার সন্তান জন্মালো। ব্যাপারটা কী ভয়াবহ, সেদিনের পুঁচকা, আমার লগে ঝগড়াঝাটি করত, এখন কি না এক পোলার বাপ। এমন না যে সে আমাদের ইনটেকের প্রথম বাপ, এর আগে অনেকেই বাপ হয়েছে, একজন তো দুইবার এই কৃতিত্ব অর্জন করে ফেলেছে এরই মধ্যে। কিন্তু ওর বেলায় আসলে আমার অন্যরকম অনুভূতি হলো। এতো দিনের বন্ধু, বাবা হতে যাচ্ছে, খবরটা পেয়েই খুশি হয়েছিলাম! ওর সবচেয়ে বড়ো গুণের একটা হলো পিতৃসুলভ বৈশিষ্ট্য। বটগাছের মত দাঁড়ায় যায়, ক্রাইসিসে একদম ইস্পাত-স্নায়ু। এরকম সবার হয় না, সবাই পারে না। নতুন অতিথির আগমনী বার্তায় তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। আমিও একদিন পার্টনারকে নিয়ে গেলাম, ছোট ছোট জামাকাপড় কিনে নিয়ে এলাম বন্ধুপুত্রের জন্য। ঘরোয়াভাবে একটা অনুষ্ঠানও হয়ে গেল ওর বাসায়!
ভবিতব্য খুব নিষ্ঠুর ধরণের অদ্ভুত আচরণ করে! তাই ওর ছেলে জন্মানোর এক মাস আগে, ওর আব্বা মারা গেলেন। যেন কিছুই হয় নি, হুট করেই। সকালে বেরিয়েছিলেন বাজার করতে। বাজার পর্যন্ত পৌঁছুতে না পৌঁছুতেই স্ট্রোক। বড়ো ছেলের ঘরে নাতি আসছে – নাম ঠিক করে রেখেছিলেন… সব শেষ।
আমার বন্ধুটিকে আমি এরপরও ভেঙে পড়তে দেখি নি। এক মাস পরে সন্তানের জন্ম। বন্ধুপত্নী বললো, ছেলের নাম রাখবে দাদার নামে।
মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবীটা একেবারে খারাপ জায়গা না। ভুল শুদ্ধ বলেও তাই, তেমন কিছু নাই!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল