রবিবার, ৩ আগস্ট, ২০০৮

এই লেখাটা তোর জন্যে

আমরা দু’জনে বসেছিলাম। রাত অনেক, প্রায় এগারটা বাজে। একটু দুরে স্ট্রীটল্যাম্পেরা ছাড়া আর কেউ নাই। আমরা দুজন বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে বসেছিলাম। চারপাশে বেশ দমকা বাতাস আজকে। আমি আর তুই কংক্রিটের মাঠে পা ছড়িয়ে বসছিলাম চুপচাপ। আমাদের মাঝে খালি অনিশ্চিত নীরবতা।
তোর সাথে আমার বিরাট ঝগড়া চলতেছে। আমি অনেক নাড়া খেয়েছি ভিতরে ভিতরে। তুই আমার সাথে এরকম করতে পারলি?
ঝামেলাটা কী নিয়ে লেগেছিলো ভুলে গেছি। আমার শুধু ঐ রাতের আধঘন্টার কথা মনে আছে। তুই আমার খারাপ দিকগুলোর কথা বলতেছিলি। বলছিলি আমি একগুঁয়ে, ঘাড়ত্যাড়া, বদমেজাজি, কোন কথা বুঝার চেষ্টা করি না। খামাখা গ্যাঞ্জাম লাগাই। আমার কারণেই এই ঝামেলাটা লেগেছে। এখন তোকে দু’দিক সামাল দিতে হবে। এই উটকো কাজটা তুই আমার জন্য করবি। রাগের মাথায় তুই এরকম কতকিছু বলছিলি!!
আমি শুধু মাথা নিচু করে বসে বসে ভাবছিলাম তুই এত বাজে ব্যবহার কেন করছিস আমার সাথে? মনে হচ্ছিল তুই খুব স্বার্থপর হয়ে গেছিস, অযথা রিঅ্যাক্ট করছিস। এমন কিছু হয়নি যে তোকে সামাল দিতে হবে। হ্যাঁ ঝামেলা পাকাইছি, তো কি হইছে? আমার ঝামেলা আমি নিজেই ট্যাক্‌ল করতে পারি, তোর হেল্প কেন লাগবে? এসব টুকরা টুকরা কথা আমার মাথায় পাক খাচ্ছিল।
তোর মনে পড়ে দোস্ত? আমরা কী দুর্দান্ত ছিলাম! কী ডায়নামিক ছিলাম। পুরা ক্লাসে এরকম আর কয়টা দোস্তি ছিল? একটাও কি ছিল? সেই ক্লাস এইটে একবার সিটপ্ল্যানে স্যার তোকে আর আমাকে পাশাপাশি বসিয়ে দিল। তার আগে তেমন কোন খাতিরও ছিল না। আর তারপর থেকে কীভাবে কীভাবে জানি তোর সাথে দারুন একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেল! একসাথে পড়তাম আমরা মনে আছে। আমি তোরে ঠেলতাম, “ঐ বলদ! এইডা পড়, ফোর্টনাইটে আসবে। আজাইরা টাইম লস করিসনা!”
তুই কম পড়াশোনা করতি। কী কী নিয়ে ভাবতি। হাউসের নানা ফালতু ঝামেলায় জড়াইতি। কে কাকে কি বলছে, কেন বলছে এগুলা নিয়ে গুড ফর নাথিং পোলাগুলার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা ঘোঁট পাকাইতি। একটা সময়ে আবার আমার ঝাড়িতে কাজ হত, ওসব বাদ দিয়ে পড়তে বসতি। এভাবে ক্লাস নাইন, টেন, এসএসসি!
মনে আছে তোর, একবার স্যার সিটপ্ল্যানে আমাদের পাশাপাশি সীট না দিয়ে সামনা-সামনি দিয়েছিল। আমরা দুইজন গিয়ে স্যারকে ধরেছিলাম ঠিক করে দেয়ার জন্য! স্যার একটা দাবড়ানি দিয়ে বললেন, “সারাদিন দেখি দুইটা বকর বকর করতেছিস! সামনা-সামনি বস্‌, তাইলে বদমায়েশি একটু কমবে তোদের! হা হা!” …কমেছিল কি দোস্ত?
এসএসসির পুরা তিনমাস ছুটি আমার কী যে বাজে কাটল! এলাকায় একটা ফ্রেন্ড নাই। গল্পের বই শেষ, টিভি দেখতে দেখতে মুখস্ত হলো “কহো না প্যায়ার হ্যায়”-এর গান! তোর সাথে কথা বলবো তার একটা মাধ্যম নাই। কলেজে ফিরলাম ২২শে জুন, মনে আছে? রেজাল্ট নিয়ে কী আনন্দ! আর তার চেয়ে বড় আনন্দ তোর সাথে এতদিন পরে দেখা, কত গল্প! ছুটির মধ্যে ঈদে তোর সেই ফোনালাপী মেয়েটা, সেই ঈদের শুভেচ্ছা দেয়া। কলেজে এসে সেই মেয়েটাকে কী লেখা যায় তাই নিয়ে আমার সাথে তোর কত পরামর্শ!!!
কী সব দিন গেছে! আর সেই তুই আমার সাথে এরকম করলি? আমার না হয় মাথা গরম, পাগলা থাকি। তুই তো শান্ত-শিষ্ট, মাথা ঠাণ্ডা, আমারে বুঝাইলেও পারতি। রাগের চে’ বেশি জন্মাইছিলো অভিমান। তুই আমারে ক্যামনে ভুল বুঝলি? আজকে আমারে ভূতে পাইল যে আমি এইসব ভাবতেছি। কত বছর আগের কথা সেই বাস্কেটের গ্রাউন্ড? মনে হয় আগের জন্মের স্মৃতি বিধাতা কৌতুক করে ভইরা দিছে মাথায়। সেগুলো আজকে বড় কাঁদায়!
কলেজ ছেড়ে আসার আগে দিয়ে তোর উপর দিয়ে ঝড় যাচ্ছিল। প্রিন্সিপ্যাল, অ্যাডজু’ সবাই তোরে বাঁশ দিতেছিল। পড়তে পারতি না, টাইম পাইতি না। সেই তুই মাঝেমাঝে আমাকে এসে বলতি, “একটু পড়ায়ে দে দোস্ত, এইটা বুঝতেসি না”। আজকে মনে হয়, “আর তো কেউ কোনদিন এভাবে বললো না!” কলেজ ছেড়ে বের হয়ে তুই গেলি আর্মিতে, আর আমি গেলাম বুয়েটে। তাও ভর্তির আগে তবু ঢাকায় ছিলি, ডিসেম্বরে চলে গেলি চিটাগাং। কত দুরে! তোর সাথে দেখা হইতো না, কথা হইতো না, কিন্তু তুই ছিলি। এমন কতদিন গেছে তোর কথা মনেও পড়ে নাই! কিন্তু আড্ডার মধ্যে কেউ বেস্ট ফ্রেন্ড নিয়ে কথা তুললে আমার ঝাঁ করে তোকে মনে পড়ত। তারপর আর কিছুই ভাল লাগত না, ঐ আড্ডা, ঐ হৈচৈ। আমি তখন সেখানে অপাংক্তেয়!
তোর পোস্টিং হলো বগুড়ায়। মাঝে মাঝে ঢাকায় আসতি। দুই একদিনের জন্য। আমি কাজ ফেলে যাইতাম বিকালে বা সন্ধ্যায়, তোর সাথে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতাম! কী অদ্ভুত লাগত তখন বাস্তবতা! আমার মাঝে মাঝে মনে হত এ কেমন জীবনে ফেঁসে গেছি তুই আর আমি! একটা দিন দেখা হলেই মনে হত অনেক পেলাম!!
এখন তুই তো আরো দুরে। কোন সুদুরে আইভরি কোস্টে। কবে ফিরবি রে? তোরে দেখিনা বহুদিন, বহুদিন!!
একটা জীবনে মানুষ কয়টা বন্ধু পায়? কয়জন তাকে পুরোপুরি বুঝে? রেগে গেলে শান্ত করে, ক্ষমা চাওয়ার আগেই ক্ষমা করে দেয়? তোকে একদিন বলেছিলাম, (কবে মনে নাই) “আমি তোর উপরে আর কোনদিন রাগ করবো না। চ্যাত দেখাবো না।” তুই বলেছিলি, “ক্যান?” আমি মুখে বলেছিলাম, “কারণ লাভ নাই, তুই একটা টিউবলাইট। বুঝবিও না যে আমি চ্যাতছি। হুদাহুদি আমার রাগ নষ্ট করমু ক্যান। তুই হালায় একটা ফাউল!”
আসল কারণটা হইল আমি তোর উপ্রে ক্যামনে রাগ দ্যাখাই? তুই যে আমার না জন্মানো ভাই! ভাল থাকিস। আমার এলোমেলো জীবনের সবটুকু ভাল জিনিশ দিয়ে তোর জন্য দোয়া করি, তুই ভাল থাকিস, বন্ধু!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল