বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০০৯

ফেইড-লেদার জুতো

আজ ছুটির দিন সকালে বেরোতে হলো কাজে। এমনিতে আমার ঘুম ভেঙে উঠতে উঠতে বেলা চড়ে যায়। কিন্তু আজকে চাকরির টান, পেটের গান। তাই সকালেই মশারি ভাঙলাম। ধুম ধাশ ঠাশ ধড়ক্কাট ঠুশ। এমন করেই চারকান ছেড়ে মশারিটা ভেঙে পড়ল, যেভাবে ফিনিক্স বিল্ডিংটা ধ্বসে গিয়েছিল, যেভাবে মার্কিন ইকনোমি চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ছে! আমি খুশি হই! কিন্তু আজ দপ্তরে খুটখাট করে কাজ করতে হবে সারাদিন। বাতিগুলোও নিশ্চয়ই বিরক্ত হবে! এরা সারা সপ্তাহশেষেও এসে গা জ্বালিয়ে দিচ্ছে- এমন কথা বলে বিড়বিড় করবে!


জুতো বাছতে গিয়ে ধুলোমলিন ফেইড-লেদারের কাতর চাহনি চোখে পড়লো। "আহা! বহুদিন ঘুরি না দুরন্ত বেগে এই শহরে, সেই কবে বসন্তের শুরুতে বালিমাখা স্মৃতিই এখন সম্বল। নদী, ব্রীজ, কালভার্ট, হাইওয়ে পেরিয়ে সাগরের পারে বালুতে ডুবেছিল শরীর। রৌদ্রের বিপরীতে শাদা ফেনার ছায়ায় ভিজেছে ফেইড-লেদার শরীর আমার!" এমন সবিনয় নিবেদন কী করে এড়িয়ে যাই! পা গলিয়ে বেরিয়ে এলাম। মনে পড়লো জুতোর কথনে, বসন্তের সেই ভ্রমণের কথা। পুরনো স্মৃতির গায়ে একটু সাগরনুন ছিটে গেল কি?


আমি ফিরে এসে ওভাবেই নোনাসমুদ্রী ঘ্রাণমাখা জুতোজোড়া রেখে দিয়েছিলাম। তার ওপরে পরতে পরতে আর জমেছে বিজাতীয় ধুলো, খোলের ভেতরে বাসা বেঁধেছিল নিরীহ মাকড়সা, আজ ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিলাম। ঝুল-জামা পরে ছিল গায়ে, সেটাও ছিন্ন করে বের করে আনলাম, চকচকে নগ্ন ফেইড-লেদার জুতো! বুরুশের ঘনঘন ছোবলে, পর্যাবৃত্তিক ঝড়ে উড়ে খসে গেল সমুদয় ভ্রমণান্ত সুখ।


রিকশা, হাঁটা, রিকশা, আবার হাঁটা, সিঁড়ি বাওয়া, টাইল্‌স, দরজা, টেবিল, রিভলভিং চেয়ার। ব্যস্ত হলাম কাজে। কয়েকটা ই-মেইল এসেছে। আমারও করতে হল আরো কতগুলো। এ.সি. চলছে বিজ্‌বিজ্‌। শান্ত সুনসান সব। একটু পরে কানে এলো ঘুনঘুনে সুরে কান্নার শব্দ। সচকিত হয়ে টের পেলাম, ফেইড-লেদারের ভাঁজ থেকে, হারিয়ে ফেলা ধুলোর আঁচলের শোকে জুতোজোড়া থেকে আসছে ক্রমশ গলনের গান, মিশ্রসুরের ক্রন্দন, অপার্থিব সিম্ফনি!...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল