শুক্রবার, ৮ জানুয়ারী, ২০১০

স্পর্শবিজ্ঞান

তোমাদের যেখানে মন চায় চলে যাও, আজ আমি কোথাও যাবো না। আজকের দিন হোক কেবলই আমার নিজেকে নিয়ে। আমি নিজের ভেতরে খুঁড়ে দেখবো কতোটুকু তোমরা ছুঁতেও পারো নি। আমি এতোদিন আগলে রাখতে পেরেছি! এতো এতো সংগ্রাম অর্থবোধক ভীষণ, আমি কাউকে ছুঁতেও দিবো না সেই কয়েকটুকরো হৃদয়ের জমিন।


কাউকে স্পর্শ করার কামনা কতোটা তীব্র হতে পারে? এই প্রশ্নটা নিয়ে আমি কখনই ভাবি নি। আর ভাবি নি বলেই আমার জানা নেই স্পর্শ করার আকুতিতে মনের ভেতর পুড়ে ছাই হয়ে যেতে বেশিক্ষণ লাগে না। বেশি না। শুধু হাতের আঙুলের আলতো ছোঁয়ার ইচ্ছার শক্তি এতোটাই! আমার বুকের ‘পরে পাথরের মতো চেপে বসতে পারে। মনে হতে থাকে চারপাশে কোথাও কোনো বাতাস নেই। আদিগন্ত ভ্যাকুয়াম। জ্যাজ!


তাই সেদিন থেকে আমি জানার চেষ্টা করি স্পর্শকামনা কেমন। ঠিক কতোটা বিচিত্রভাবে কাউকে স্পর্শ করা যায়! আমি কি শুধু হাসি দিয়ে কাউকে ছুঁয়ে দেয়ার দুরূহ কাজটা করতে পারবো? মুখের হাসি, চোখের হাসি, এগুলো শুনেছি প্রবল সংক্রামক। এক চিলতে হাসি অনেক সময় তলোয়ারের মতো ঝিকিয়ে উঠতে পারে। এই সত্য সম্ভাবনা, কারণ আমি এমন অসংখ্য হাসির কোপে কাটা পড়েছি অনেকবার। বহুবার! তারপর, অবাক হয়ে দেখেছি আমার ভেতরে বিন্দু বিন্দু মুক্তোর কণার মতো ক্ল্যামেন্টাইনের হাসিমুখ। অথবা সুনয়নার, অথবা রাত্রির, হয়তো তোমার!


আমিও হয়তো ওর মতো, ওদের মতো হাসিতে স্পর্শ করতে পারবো যেমন আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে! তাই সেদিন থেকে আমার দিন রাত অবিরাম হাসিহুল্লোড়ে ভরে উঠলো। খলখল-ট্রেনে চেপে বসলো হাসির অমেয়কণিকা আমার… আমি বিস্ময়ে দেখি তারা কী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। তুমি দেখো না? তোমরা দেখো না? আমি আজ ঘরের ভেতরে গুটিশুঁটি খুব হাসছি অবিকল সেই শিশুটির মতো।
শিশুদের কথা আর না বলি? শিশুরা মোটেই ভালো নয়, তারা আমাকে ভুলে যাবে আর কিছু দিন পরেই। আমি জানি। সবাই তাদের বড়ো হয়ে ওঠার গল্প করবে আর এক ফাঁকে টুপ করে ঝরে পড়বে আমার একলা ঘরে বসে থাকার গল্পটা। ধুলোয় মিশে মিশে ওটার চেহারা আর চেনাই যাবে না। তারপরে একদিন জমাদারের ঠেলাগাড়িতে করে আমি হারিয়েই যাবো নির্ঘাত! উহ!


ওই ক্লিষ্ট খিন্ন মুখের দল। হা করে না থেকে আমার কথা শোনো। কান পেতে শোনো আমি হাসছি গ্রামারবিহীন। তোমরা বিরক্ত না হয়ে খেয়াল করলেই দেখবে আমার হাসির শব্দ আর গমক তোমাদের কোষে কোষে ঢুকে গেছে। অমল শিশুগুলো হাসছে, তাদের ওপরে আমার ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ নেই কিন্তু!


কিন্তু আমি আদতে চাইছিলাম কাউকে স্পর্শ করতে, এমনভাবে ছুঁয়ে দিতে যেন সে একটুকরো রুমালের মতো আমার ছোঁয়াটুকু নিয়ে চলে যেতে পারে। সে আমাকে ভুলে গেলেও তার ভেতরে, বাইরে আমার দেয়া আঙুলের ছাপ থাকবে। ছাপ মুছে গেলে উত্তাপ থাকবে। উত্তাপও যেদিন চলে যাবে সেদিন হয়তো আমিই থাকবো না, তাই না?


কলমে আর পেন্সিলে লিখছিলাম। কাগজ আর শীষের শীর্ষের কত গভীর ছিনিমিনি প্রেম। আঠারো আর একুশের প্রেম যেমন! ষোলো আর বিশের প্রেম যেমন। চকিত আর ক্ষণিকেই বুকে গেঁথে ফেলে একশ’ গোলাপ। সুবাসটুক বুক পকেটে নিয়ে অযথাই একুশ আর বিশ ঘুরে বেড়ায়। আঠারো আর ষোলোর কামিজপ্রান্তে তাদের গুমখুনের খবর কেউ জানতে পারবে না। কোথাও কোনো মামলা দায়ের হবে না। খালি বাদী-বিবাদীরা নিরন্তর ক্ষয়াটে এই গ্লোবে আরেকটু সবুজ হয়ে উঠবে। আরেকটু নীল করে তুলবে আমাদের আকাশ। কলম-পেন্সিল আরও কতো কী করে কাগজের বুকে। আমার অক্ষমতা যে আমি তা পুরো বুঝে উঠতে পারি না কখনোই!…

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল