রবিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১০

পুরোনো ত্রয়ী

সংকট

হাতের উল্টোপিঠে তারাদের ছাপ তৈরির বিষয়টা অস্বস্তিকর; বড়ো বিস্ময়েরও বটে। আমি যদ্দুর জানতাম, ওরা আজকাল এখানে বাসা বাঁধে না। জমি বিক্রি বন্ধ সেই আদ্যিকাল থেকে, যুদ্ধেরও কয়েক বছর আগে হইতে! তখন খোলা প্রান্তরেও তামাবর্ণ মানুষের হাতে উল্কির মতো, কুষ্ঠের মতো, শ্বেতীর মতো তারাবাজি খেলা করতো। তারপর বহুদিন আগে কোন্‌ দুর্ঘটনায় আদিম তারার নির্দেশে মানুষের করতল থেকে মুছে গেলো উল্কিময় কারুকার্য। তারাদের কাছে আমরা হলাম অপাংক্তেয়।

অথচ আমার হাতের পিঠে সেদিন পুড়ে গেলো চামড়ার তল, অপতলে ফুটে উঠলো বিম্বিত নক্ষত্র! যখন কাঠ, খড়, তুষের সম্বল নিয়ে তারকা-নেতা এলেন, পেছনে সারি বেঁধে এলো তারাসকল, আমি খুবই অবাক বিব্রত ঘাম মুছে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। উদোম হাতের পিঠে ছাই হয়ে গেলো সুন্দরবনের মতো মানচিত্র...


***

ভালোবাসা

শীৎকারগুলো দেয়ালে গেঁথে আছে চিত্রশিল্পের মতো
আর তাদের দুজনের মাথা দুটো, দুভাগ করা লেবুর মতো
দুদিকে এলিয়ে পড়ে আছে। তবুও তাদের রমণ বেগ
অমন্দন গতিশীল নিরাবেগ। যান্ত্রিকও কিছুটা, তাদের
ঘুমের ভেতর বিনিময় হয়ে যায় হাত ও পায়ের আঙুল
নিদ্রাতটের জলদস্যুতায়, তারা চুরি করে
একে অপরের মস্তিষ্ক চিরতরে

আর সকালের রোদে দেখা গেলো তাদের মুখের চামড়া খুলে
ঝুলছে অপরজনের চেহারায়।

টেড হিউজের একটি কবিতা অবলম্বনে

***

একটি নিছক আটপৌরে ঘটনা

যারা রাস্তায় থাকে তাদের কাছে আলোবিহীন সড়ক ভূতুড়ে নয়; তেমন একটা। কিন্তু আমরা যারা দালানকোঠায় বাস করি, আমাদের যাপিত জীবনে আঁধার ও বৈকল্য এক সাথে আসে। আজ কয়েকজনকে দাওয়াত করেছিলাম। নিছক অনেকদিন বন্ধুদের সাথে দেখাসাক্ষাত নেই, ফোনে কথা বলে মনের আশ বা প্রাণের সাধ কোনোটাই মিটছে না। নেহাত বাইরের কোন ফাস্টফুড বা হ-য-ব-র-ল রেস্তোরাঁ আমার পছন্দ না বলে সবাইকে বাসায় ডেকেছি। সবাই বলতে ওরা পাঁচজন, এখন যারা আমার ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছে খুব। তারা হাসি ঠাট্টায় জমে উঠতে উঠতেই হুট করে ইলেকট্রিসিটি চলে গেলো। ধুপ করে সব কালো। চোখ সয়ে এলে আবছা একটা আলো চোখে পড়ে। নীলচে-কালচে আলোতে দেখি বিছানা-চেয়ার মিলিয়ে ওরা চারজন অনাহূত অন্ধকারে কথা থামিয়ে দিয়েছে।

আড্ডা থিতিয়ে এলে জায়গা বা বিষয়বদল দরকার। আমি সফল হোস্ট হতে চাওয়ার লোভে ভুগছি। ভাবছি আজকের গেট-টুগেদারের গপ্পো যদি আগামি এক সপ্তা না চলে, তাহলে আমার এই উইক-এন্ডটাই মাটি! ফেসবুকে ছবি আর নোটিফিকেশনের ঝড় ওঠা চাই। কমেন্টের ফুলঝুরি আর ওয়াল পোস্ট চাই। কিন্তু ছবি তুলবো কীভাবে, কারেন্টই তো নেই! ভেবেই মেজাজ ফট্টিনাইন হয়ে যাচ্ছিলো। তারপর নিজেকে সামলে নিলাম, হোস্ট হয়ে অন্ধকারের মাঝে ঘোস্ট হওয়ার দরকার নেই। বরং জায়গা বদলে দেই। "অ্যাই, তোরা কি ছাদে যাবি?", বলামাত্রই ওরা শশব্যস্তে উঠে দাঁড়ালো। হুড়হুড়িয়ে সবাই ছাদে উঠে গেলো। তেরো তলার উপরে ছাদ। একদিকে এরকমই লম্বা একটা হাইরাইজ ছাড়া বাকি তিনদিকে খালি, মিষ্টি বাতাস বইছে, বসন্ত-সমীরণ।

আমার বন্ধুরা অবশ্য বাতাস উপভোগ করে না। তারা গুমোট বিকল লোডশেডিং থেকে মুক্ত হয়েই খুশি। সবাই মিলে ছাদের রেলিংয়ের দিকে ছুটে গেলো। নিচে তাকিয়ে একজন গাড়িঘোড়া দেখছে। মানুষগুলো পিঁপড়ের মতো। আমাদের বন্ধুদের মাঝে যে সবচেয়ে বিটলা, সে থুক করে একদলা থুতু ফেললো। আমরা 'ইয়াক', 'ঈঊ' করে উঠলাম, "এ কী ধরনের অসভ্যতা! ম্যানারলেস! ক্রাস!" থুতুর মতোই ওর দিকে কতোগুলো গালি ছুঁড়লাম আমরা। ও নির্বিকার হাসলো। যেন এই গালিগুলো আমাদের দিয়ে বলিয়ে নিতেই সে এমনটা করেছে। ওর কারণেই হোক, অথবা নিচের গাড়িমানুষের লিলিপুট ভার্সন একঘেঁয়ে ওঠার কারণেই হোক, আমরা রেলিং থেকে সরে এলাম। রেলিংয়ে হেলান দিয়ে ছাদের কুসুমগরম মেঝেতে বসে পড়লাম সবাই। একটু আগেই বিকেল মরে জেগে ওঠা সন্ধ্যাটা মরে গেছে। চারদিকে আজান তোলা শেষ। এখন খালি রাস্তার আবছা কোলাহল আর নিঃস্তব্ধতা। আমাদের পাঁচটে দেহবিহীন আত্মা তেরো তলার ওপর চৌদ্দ তলা ছাদ থেকে বার বার লাফিয়ে নিচে পড়ে যাবার কসরত করছে।


***

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল