বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১০

স্মৃতি ও বিস্মৃতি

ডিসেম্বর এলে আস্তে আস্তে শীত বাড়ে। আমার এই শীতকাল খুব মেলাঙ্কলিক লাগে। যে স্মৃতিগুলোকে আগের জন্মের বলে মনে হয়, সেই কৈশোরের সময়টা মনে পড়তে থাকে। সেই সময়ের 'আমি'কে নিজের সত্ত্বা বলতে চিনতে পারি না। অচেনা মানুষের সাথে পরিচয়ে আমি বরাবরই অমিশুক, সন্তর্পণ। তাই সহজ হতে পারি না, চুপচাপ তার কাজকর্ম দেখি। কাজকর্ম দেখি মানে সেই সময়ে 'আমি' কি কি করতাম সেগুলো মনে করার চেষ্টা করি। জীবন যাপন করা তখনও অনেক কঠিন মনে হতো। অথচ তখন যদি জানতাম, এখনের জীবন এমন, এই রূপ, তাহলে হয়তো সেই কষ্টগুলো আর কষ্ট বলে গায়েই লাগতো না!

শীতের সময়ে সম্ভবত আমার প্রথম স্মৃতি তৈরি হয়েছিলো। দুইদিন আগে আমার এক বন্ধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলো, জন্মের পরে প্রথম স্মৃতি কোনটা, কতোদূর পষ্টভাবে মনে করা যায়? বন্ধুটি বেশ শিল্পমনা, রুচিশীল। এমনিতে ফেসবুকে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা কথাবার্তাকে তেমন আমল দেই না। তবে তখন ভাবনা যোগালো, মনে করার চেষ্টা করলাম। প্রথম স্মৃতি। বোনের জন্ম মনে আছে, সেটার বয়স চার। তার আগে? ময়মনসিংহে একতলা বাসায় থাকতাম, বাসার সামনে ইট-বিছানো উঠান ছিলো, পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সেই পাঁচিল ঘেঁষে আকাশছোঁয়া গাছ ছিলো। বাসার সামনের বারান্দা পার হলে বাম কোণে কলতলা ছিলো, টিউবওয়েল ছিলো কিন্তু আমি ওটা চাপতে পারতাম না। নানী ছিলো, ওটাকে চাপকল বলতেন। আমি তাঁর সাদা আঁচল আঁকড়ে ধরে হেঁটে বেড়াতাম।

এগুলো সবই তরতাজা স্মৃতি। ময়মনসিংহের বাসাটায়, আমি যে দেয়াল ভর্তি করে অ আ ক খ লিখতাম, সেটাও চার বছরের স্মৃতি। আরো পিছে যাই। ঝাপসা ঝাপসা লাগে। এর আগে সাভারে ছিলাম, স্মৃতিসৌধে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ঝাপসা খোপ খোপ স্মৃতিসৌধ, ভয় পেয়েছিলাম। মোটেই ছবির মতো সুন্দর বাঁকানো সুউচ্চ মনে হয় নি। আতঙ্কের স্মৃতি খুব সহজে ছাপ ফেলে। আমি বোধহয় স্মৃতিসৌধের ভেতরে ঢুকে কেঁদে ফেলেছিলাম ভয়ে। তারপরে বেরোনোর পরে সামনের ঝিলে শাপলা দেখে একটু থেমেছি, শান্ত হয়েছি। দাদী ছিলেন সাথেই। তবে তার কথা মনে নেই, ছবি দেখে বুঝি এখন।

সাভারের আগে ঢাকায় থাকতাম, সেগুলো ধুয়ে মুছে গেছে। মানুষের এই স্মৃতিগুলো থাকে না কেন? আমার ভাগ্নে আরাভ বড়ো হচ্ছে। বাসায় আমরা মামা-খালা-চাচারা এলেই তাকে নিয়ে নানা আদর-সোহাগ। এগুলোর অমূল্যতা সে কোনোদিন মনে রাখতে পারবে না! আমি জানি আজ থেকে পনেরো বছর পরে তার সাথে আমার এই যোগাযোগ, এই নিবিড়তা থাকবে না। তখন হয়তো এই স্মৃতিগুলো পেলে তার খুব ভালো লাগতো!

জর্নাল জিনিসটা চমৎকার। রোজ রোজ ভাবনার ভার ক্লান্ত করে। আজকের ক্লান্তি একটু কমে গেলো। এখন থেকে লিখবো। অনেক অনেক শব্দ, যেগুলো আদতে একদমই মূল্যহীন! 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই গ্যাজেটে একটি ত্রুটি ছিল